Tuesday, March 3, 2020

তাই বন্দুক নিলে হাতে


- ডক্টর চ্যাটার্জী, এমন জরুরী তলব! কী ব্যাপার বলুন দেখি। তাও এমন বিটকেল একটা চেম্বারে। ঢুকেই মনে হয় একটা কোয়্যারান্টাইন কামরা। তবে, বেশ একটা হলিউডি গা ছমছম আছে কিন্তু।  

- এ জায়গাটা ভিড়ভাট্টা থেকে বেশ খানিকটা দূরেই বটে।

- এখানে নতুন চেম্বারটেম্বার ফেঁদে বসার তাল করছেন নাকি? ডুবতে হবে, এই বলে রাখলাম। লোকালয় থেকে এত দূরে লোকজন আসবে ভেবেছেন?

- এ চেম্বারটা ঠিক নতুন নয় অনিলবাবু৷ ইনফ্যাক্ট আমার ট্রীটমেন্টের মূলপর্বটা এখানকার জন্যই তোলা থাকে।

- মানে শহরের চেম্বারটা স্রেফ দেখনাই ডক্টর? এই  পাণ্ডববর্জিত অঞ্চলের আস্তানাটাই মূল?

- না না, তা কেন। ডায়াগনোসিসটা আপনার শহরে বসেই ভালোভাবে হয় বটে। আর এই নিরবিলি চেম্বারে হয় ট্রীটমেন্ট; আদত চিকিৎসা।  

- বেশ হেঁয়ালির মেজাজে রয়েছেন দেখছি।

- সমস্ত খোলসা করতেই তো আপনাকে ডাকা।

- তা আপনার ডায়াগনোসিস কী বলছে। আমার মূল সমস্যা কোথায় বলুন তো। 

- ডায়াগোনিস স্পষ্ট। যে সমস্যায় এ শহরের সমস্ত মানুষ জেরবার; আপনার সমস্যাও তাঁদের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। সমস্যা একটাই; বেঁচে থাকা। আপনার সমস্যা আপনি বেঁচে আছেন।

- এই শুরু হল, হেঁয়ালি থেকে ফিলোসফিতে। 

- হেঁয়ালি নয়। ফিলোসোফি নয়৷ এমন কী কোনো ঠাট্টাও নয়। আবারও বলি; আপনার অসুস্থতা একটাই অনিলবাবু। আপনার বেঁচে থাকা। ও কী.. উঠে দাঁড়ালেন কেন? 

- দেখুন। আমি রোব্বারের ছুটি নষ্ট করে এতটা পথ ঘঁষটে এলাম আপনার "আর্জেন্ট" ডাক পেয়ে। আমি আশা করেছিলাম আপনি বিচক্ষণ আর সুবিবেচক।  শহরে ঘুরে বেড়ানো আর পাঁচটা হাতুড়ের মত টাকাখেকো অকাজের ঢেঁকি নন৷ কিন্তু ব্যাপারটা আপনি যেহেতু সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না..। 

- অধৈর্য হলে চলবে কেন অনিলবাবু? 

- অধৈর্য হব না? একটা জরুরী সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে এদ্দিন ধরে আসছি৷ অথচ আপনার ডায়াগনোসিস কী? আমার সমস্যার মূলে হল আমার বেঁচে থাকা।  ইস ইট আ জোক?

- নট অ্যাট অল। আচ্ছা, আপনার সমস্যাটা ঠিক কী ছিল? আই মীন, কেন আপনি প্রথম আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন?

- নিরানন্দ। অবভিয়াসলি। শহরে আর কোনও রোগ বা সমস্যা তো নেই। 

- গোটা শহরে শুধু একটাই রোগ৷ ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকেনি কখনও?

- মেডিকাল সায়েন্সের এমন দুর্দান্ত প্রগ্রেস৷ সব সমস্যার সমাধানই তো হাতের মুঠোয় প্রায়। নেহাত এই নিরানন্দ ব্যাপারটা মহামারীর আকার ধারণ করেছে তাই আপনার মত ডাক্তাররা টু-পাইস করে খাচ্ছে। 

- রাইট। সেই টু-পাইসের প্রতি সততা যেহেতু আমার আছে, তাই আবারও বলছি, এ দুনিয়ায় বেঁচে থাকাটাই আপনার এই নিরানন্দের মূলে। এবং এর ওষুধ একটাই...।

- ও কী! আপনি কি উন্মাদ হলেন ডাক্তার চ্যাটার্জী? পিস্তলটা নামান৷ প্লীজ! প্লীজ ডাক্তার। 

- এ দুনিয়া না ছাড়লে আপনার মুক্তি নেই অনিলবাবু। আর ডাক্তার হিসেবে রোগীকে ওষুধ না গিলিয়ে আমি ছাড়ি কী করে বলুন। 

- ও...ও'টা বন্দুক ডাক্তার! আ...আমি...আমি আপনার পায়ে পড়ি...আমায় বাঁচতে দিন...।

- এ বেঁচে থাকা মিথ্যে অনিলবাবু...ডাহা মিথ্যে। এ বেঁচে থাকায় যত জড়াবেন, জানবেন নিরানন্দ তত বাড়বে।

- আমি বাঁচতে চাই ডাক্তার। প্লীজ।

- আলবাত বাঁচবেন। তবে এ জগত দেখে বেরিয়ে৷ 

- ভূত হয়ে বাঁচব?

- ভূত হয়েই আপনি বেঁচে আছেন, এ শহরের বাকি মানুষগুলোর মত। এই বন্দুকেই আপনার মুক্তি।

- ভূত হয়ে বেঁচে আছি?

- কারণ এই মিথ্যে শহরে বাঁচতে গিয়ে আপনি আদত বেঁচে থাকা ভুলে গিয়েছেন অনিলবাবু৷ এই মিথ্যে জীবন না ছাড়তে পারলে আপনার মুক্তি নেই। নিরানন্দের শেষ নেই। ইউ হ্যাভ টু ডাই হিয়ার সো দ্যাট ইউ ক্যান লিভ বিয়ন্ড। সুস্থ ভাবে বাঁচতে গেলে এ'খানে আপনাকে মরতে হবে অনিলবাবু। এ জগতে আপনাকে মরতেই হবে। 

- বন্দুকটা সরান। প্লীজ।

- এ বন্দুকের একটা টেকনিকাল নাম আছে অনিলবাবু; ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেশন বাটন। 

Monday, March 2, 2020

লুচিম্যান


১।

দুর্যোধন - ধনসম্পত্তি তো সবই খোয়ালেন দাদাভাই। এখন পরের দান খেলবেন কী বাজি রেখে?

ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির (লুচি বেগুনভাজা মুখে দিয়ে) - তাই তো হে। এ তো মহাসমস্যায় পড়া গেল। বাজি রাখতে না পারলে তো আবার পাশার টেস্টম্যাচ ছেড়ে ছেড়ে টুয়েন্টি-নাইনের টিটুয়েন্টি খেলতে হবে। রোব্বার সক্কাল সক্কাল টুয়েন্টি নাইন ঠিক জমবে না। কী যে বাজি রাখি...।

দুর্যোধন (এক চামচ দুধ-কর্নফ্লেক্স মুখে চালান করে) - আপনার পাতে অতগুলো লুচি বেগুনভাজা পড়ে। ও'গুলোই না হয়ে দাঁওতে রাখুন...।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির - মুখ সামলে রে রাস্কেল। নিজের পাতের লুচি দিয়ে জুয়ো খেলব? তার চেয়ে বরং...তার চে'বরং...আমার এই ভাইগুলোকে এক এক করে বাজি রাখি...।

২।

কুন্তী (দরজা খোলার আগেই) - পাঁচ ভাই ভিক্ষেতে যা পেয়েছ তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিও।

যুধিষ্ঠির - এক মিনিট। আজ আমি ভিক্ষেতে লুচি মোহনভোগ পেয়েছি৷ এর ভাগ চাইলে আমি কালই কৌরবদের কোম্পানিতে ক্লার্ক হিসেবে জয়েন করব। এই বলে রাখলাম। 

৩।

কৃষ্ণ - দ্রোণকে না আটকালে সমূহ বিপদ।

যুধিষ্ঠির - হোক গে বিপদ। তাই বলে ধর্মপুত্র হয়ে মিছে কথা বলব? অসম্ভব। 

কৃষ্ণ - বুড়ো যে'ভাবে যুদ্ধ করছে তা'তে আমাদের সব সৈন্য আজকের মধ্যেই সাবাড় হয়ে যাবে যে।

যুধিষ্ঠির - হোক গে। কিন্তু কেশব, অধর্মে মত দিই কী করে বলো...। বাজারে আমার একটা রেপুটেশন আছে..।

কৃষ্ণ - আরে কী মুস্কিল...যুদ্ধে হারলে তোমার রাজ্য যাবে, মানইজ্জত যাবে...।

যুধিষ্ঠির - ধর্ম তো থাকবে ভায়া৷ রিল্যাক্স৷ 

কৃষ্ণ - হারলে সপরিবারে জঙ্গলে ফেরত যেতে হবে ধর্মপুত্তুর। আর জঙ্গলে তো জানোই, রোব্বারের জলখাবারে লুচি-ছোলারডালের বদলে শাঁকালু আর শসা।

যুধিষ্ঠির - আকাশের রং খয়েরী৷ আমার নাম অরবিন্দ কেজরিওয়াল৷ শুয়োরদের আমি পেখম তুলে নাচতে দেখেছি৷ বুলাও দ্রোণকে। দেখাচ্ছি মিথ্যের ফুলঝুরি কাকে বলে। 

৪।

ঈশ্বর - আসুন ধর্মপুত্র৷ আসুন আসুন। কী সৌভাগ্য আমার। কী সৌভাগ্য৷ নশ্বর মানুষ হয়েও পায়ে হেঁটে স্বর্গে এসে পৌঁছলেন, এ কি কম কেরামতির ব্যাপার? ব্রাভো। ব্রাভো। 

যুধিষ্ঠির - হেহ, থ্যাঙ্কিউ, থ্যাঙ্কিউ৷ তা বলছিলাম যে..।

ঈশ্বর - এ যে কী ফ্যান্টাস্টিক ব্যাপার৷ অমন মহীয়সী দ্রৌপদী পাহাড়ের রাস্তায় ফসকে গেল। নকুল সহদেবের মত স্মার্ট দু'জন টেঁসে গেল। বীর অর্জুন ডাহা ফেল করে নিকেশ হয়ে গেল। আর এমন মহাশক্তিমান ভীম, সেও পুজোপ্যান্ডেলহপিং লেভেল হাঁটাহাঁটির চোটে খতম। এক তুমিই নিশ্চিন্তে হেঁটে স্বর্গলাভ করলে...।

যুধিষ্ঠির - সে'সব তো হল কিন্তু...।

ঈশ্বর - তুমি জিনিয়াস...। তুমি ঘ্যাম। 

যুধিষ্ঠির - আরে ধুর সে'সব তো বুঝলাম৷ দেখুন,সোজাসুজি বলছি। আমি স্রেফ টপ-কোয়ালিটি লুচি ভাজার গন্ধ পেয়ে... একটানা হেঁটে...পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে..লুচির সুবাসের উৎসে এসে পৌঁছলাম। আপনার হেঁসেল কে সামলায় বলুন দেখি? ভারী চমৎকার লুচি ভাজে তো। আমায় আগে সেই লুচির কাছে নিয়ে চলুন প্লীজ। এদ্দূর হেঁটে এলাম...আর গড়িমসি সহ্য হচ্ছে না।

ঈশ্বর - তুমি সত্যিই মহাত্মা হে যুধিষ্ঠির। গোটা স্বর্গই যে লুচি ভাজার সুবাসে পরিপূর্ণ। ওয়েলকাম ব্রাদার, ওয়েলকাম।

অন্য বেয়াল্লিশ



- গুরু, খৈনি হবে?
- মাইরি ডগলাস, তোমার মত ফচকে ছোকরা আর দুটো দেখিনি। আমি কি তোমার পাড়ার মোড়ের বেঞ্চিতে বসে আড্ডা দেওয়ার ইয়ারদোস্ত? ব্রহ্মাণ্ড চালাতে হয় আমায়। তোমার মত ছিচকে ভূত নই।
- আরে অত ঘ্যাম নিয়ে কী হবে গুরু। বেশ তো চুনে খৈনিতে ডলছিলে৷ দাও দেখি এক চিমটে।
- সাহেবসুবো মানুষ তুমি। এ'সব বিশ্রী নেশা তোমায় মানায় না।
- ঈশ্বর হয়ে মুখ টোপলা করে দিনরাত বসে আছ গুরু। আমি কৌনসি খেত কা মুলি৷ দাও গুরু। এক চিমটে দাও।
- এসো। 
- আহা, অমৃত। আচ্ছা গুরু, এত জটিল হিসেবকিতেব সামাল দাও কী করে বলো দেখি। যখনই দেখি খৈনি ডলে যাচ্ছ; ঈশ্বর হয়ে দুনিয়া সামাল দাও কখন?
- আমি ক্লার্ক নই ভায়া ডগলাস যে মুখ গুঁজে ফাইল ঘঁষটে যাব। সিস্টেম নিজের মত চলছে, আমি শুধু মাঝে মধ্যে "নাজুক নাজুক" বলে চলকে উঠি বা "তৌবা তৌবা" বলে চুকচুক করি।
- সিস্টেম। নাকি?
- এক্কেবারে ট্রায়েড অ্যান্ড টেস্টেড।
- সিস্টেমটা একটু খোলসা করো না গুরু৷ তোমারও কাজ নেই, মড়া হয়ে আমিও ফ্যা-ফ্যা করে টহল দিচ্ছি। একটু না হয় ভালো ভালো কথা শুনি।
- এ যে সব প্রশ্নের সেরা প্রশ্ন ভাই ডগলাস।
- উত্তরটা ছাড়ো না। 
- বলি?
- খৈনিদাদা, বলেই ফেলো।
- বেয়াল্লিশেই জবাব।
- বেয়াল্লিশ? লেগপুল করছ গুরু?
- না না, যাকে খৈনির ভাগ দিয়েছি, তার ঠ্যাং টানব কেন। তবে সিস্টেমের সিক্রেটটা বেয়াল্লিশ দিয়ে বোঝালে তুমি বুঝবে ভালো। 
- হেঁয়ালি না করে ঝেড়ে কাশো দেখি গুরু।
- পৃথিবীর কথাই বলি। আজ সক্কাল সক্কাল এক বাড়িতে সুতীব্র কথা কাটাকাটি শুরু হল। ব্যাপার তেমন গায়ে মাখার মত নয়। যা হয় আর কী; গরীবের সংসার, দানাপানি নেই। খিদের জেরবার খোকাখুকুদের কান্না থামারও নাম নেই। বিশাল সংসারে আয়ের মানুষ দু'জন। সেই খোকাখুকুর বাপ আর তাদের দাদু। ঝগড়া বেঁধেছিল সেই বাপ আর দাদুর মধ্যে; সক্কালসক্কাল।
- ঝগড়া কেন? আর এর সঙ্গে বেয়াল্লিশের কী সম্পর্ক?
- খৈনি চিবোনো আর গল্প শোনার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো সমীচীন নয় ডগলাস৷
- বেশ। বাপ-দাদুর ঝগড়া। কেন?
- দিন আনি দিন খাই সংসার। নাতিনাতনির কান্নার শব্দ সহ্য করতে না পেরে জঞ্জালকুড়িয়ে দাদু চাইছে কাজে বেরোতে। কিন্তু বাপ বলছে ঘরে দানাপানি না থাকলেও কাজে বেরোনো অসম্ভব। সেই নিয়ে ঝগড়া। 
- ও মা! ঘরে খাবারদাবার নেই, এদিকে কাজে বেরোবে না? 
- শহরে দাঙ্গা লেগেছে যে। বিস্তর কাটাকাটি রক্তারক্তি। রাস্তায় প্রাণ হাতে করে বেরোতে হচ্ছে। আর বড়লোকদের না হয় বাতেলায় দিন কেটে যায়। গরীবদের ভয় বেশি। 
- ওহ্।
- কিন্তু বাপ যতই আপত্তি করুক, দাদুটি তো বাপের বাপ। সে কথা শুনবে কেন? খোকাখুকুর দাদু খোকাখুকুর বাপের কথায় পাত্তা না দিয়ে থলে কাঁধে বেরিয়ে পড়ল!
- এতে বেয়াল্লিশ কী? আর সিস্টেমই বা কোথায়?
- ধৈর্য ডগলাস। ধৈর্য। 
- যেয়াজ্ঞে। অতঃপর?
- তা দাঙ্গার চোখরাঙানি অগ্রাহ করে দাদু বেরিয়ে পড়ল কাজে। কারণ সে নিশ্চিত লোকের এ পাগলামি বেশিদিন চলতে পারে না, দাঙ্গা এখন স্তিমিত। কাজকর্ম বন্ধ করে ঘরে বসে থাকাটা পাপ। খোকাখুকুর খিদের কান্না সহ্য করাটা পাপ। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। আর সেই বিশ্বাসের ভরসায় সে বৃদ্ধ কাজে বেরোলেন; দিনের শেষে যদি দু'টো রুটির ব্যবস্থা করে ফেরা যায়।
- তারপর? গুরুদেব?
- সন্ধ্যে হল কিন্তু গেরস্থালীতে রুটি এলো না, ফিরল দাঙ্গার টাটকা শিকার; দাদুর লাশ। তবে অন দ্য প্লাস সাইড; বুঝলে ভায়া ডগলাস, দাদুর লাশ দেখা যন্ত্রণায় নাতি-নাতনিরা একটা রাত্রের জন্য অন্তত খিদের জ্বালাটা ভুলতে পারল। 
- ওহ...কিন্তু গুরু, এ'তে বেয়াল্লিশ কোথায়?
- শহরের দাঙ্গায় সে খোকাখুকুর দাদুই যে বেয়াল্লিশ নম্বর লাশ ভায়া ডগলাস। বেয়াল্লিশের উদাহরণ দিয়ে সিস্টেমের মূলমন্ত্রটা তোমায় বোঝাতে সুবিধে হবে বলে মনে হল। অন্ধকার যতই বেড়ে চলুক, মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করে পথে নামবে আর বারবার সে বিশ্বাসভঙ্গ হবে৷ এ'ভাবেই বিশ্বাস আর বিশ্বাসভঙ্গের ইতিহাস চক্রাকারে ঘুরে চলেছে এবং চলবে। যদ্দিন তদ্দিন। ঈশ্বর হয়ে আমারও কিছু করার নেই৷ আর এক রাউন্ড খৈনি ডলি বরং, কী বলো ভাই ডগলাস?
পুনশ্চঃ
১। ধর্মের কথাই যখন হচ্ছে, তখন স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে "অতিরঞ্জন" এ পাতি ব্লগারের ধর্ম৷ তবে বেয়াল্লিশ নম্বর লাশের খবরটা নেহাত ভ্রান্ত নয়। ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০; "দ্য হিন্দু"র প্রথম পাতার খবর - Delhi Violence: 1 killed in fresh attack; toll touches 42।
২। ডগলাস অ্যাডামস সাহবের হিচহাইকারস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি অনেকেই পড়েছেন৷ যারা পড়েননি (এইবেলা পড়ে ফেলুন), তাঁদের জন্য কোট করলামঃ
"The number 42 is, in The Hitchhiker's Guide to the Galaxy by Douglas Adams, "The Answer to the Ultimate Question of Life, the Universe, and Everything", calculated by an enormous supercomputer over a period of 7.5 million years. Unfortunately no one knows what the question is." (এই লেখা সে বইয়ের রিভিউ বা সে বই প্রসঙ্গে আদৌ নয়)

ফার্স্ট পার্সন


ঋতুপর্ণবাবুর মুখে ও কলমে বাংলাভাষা জ্বলজ্বল করে ওঠে। আমি ভাষার দুরূহ টেকনিকালিটি তেমন বুঝি না, কিন্তু আর পাঁচটা ধান্দাবাজ মানুষের মত নিজের আত্মার আরামটুকু দিব্যি টের পাই। ঋতুপর্ণবাবুর কথায় ও ভাষায় সাজানো ওঁর ভাবনাচিন্তা আর গল্পগুলো মনের মধ্যে সত্যিই আরাম বয়ে আনে। অগাধ পড়াশোনার মধ্যে বহুমানুষই থাকেন, ইন্টেলেক্টের ব্যাপারেও যে ঋতুপর্ণ শেষ কথা; সে নিয়ে কথা বলার যোগ্যতাও আমার নেই। তবে সিনেমাটিনেমা যদি বাদও দিই, কথাবার্তায় ওর সততা, সারল্য, যুক্তিনিষ্ঠা এবং সর্বোপরি ওর ভাষার যে 'সুমিষ্ট স্মার্টনেস'; সে'সব মিলে আধুনিক বাঙালি ঋতুপর্ণর ভক্ত না হয়ে যাবে কোথায়? (এটা অতিশয়োক্তি হল কিনা জানিনা, তবে আমি নিজে যেহেতু ঋতুপর্ণর "ভক্ত্", সে'সব নিয়ে "কেয়ার" করা আমার সাজে না)। তবে এই সততা, সারল্য, যুক্তিনিষ্ঠা আর ভাষার স্মার্টনেসের বাইরে গিয়ে দু'টো ব্যাপার ঋতুপর্ণকে অনন্য করে তোলে;
এক, ওঁর "এমপ্যাথি"।  
দুই, যে মধ্যবিত্ত আটপৌরে প্রিজমের মধ্যে দিয়ে ভদ্রলোক পৃথিবীর ইয়াব্বড় ব্যাপারস্যাপারগুলো দেখতে ও অনুভব করতে পারতেন৷

দে'জ থেকে প্রকাশিত ঋতুপর্ণর " ফার্স্ট পার্সন" বইজোড়ার পাতায় পাতায় সেই স্নেহ মাখানো মানুষটা৷ এদ্দিন কেন পড়িনি কে জানে, না পড়ে অন্যায় করেছি৷ যা হোক, গতকাল আমি প্রথম খণ্ডটা পড়ে শেষ করলাম৷ 
গত বছর দুয়েকে বেশ কিছু বায়োগ্রাফি পড়েছি আর অবশ্যই ঋতুপর্ণর এই বই কোনও মতেই জীবনী নয়,বরং পূর্ব প্রকাশিত গদ্যের সংকলন৷ অথচ এই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লেখাগুলোর মাধ্যমে কী চমৎকার ভাবে একটা নন-লিনিয়ার জীবনী তৈরি হয়েছে। বায়োগ্রাফি যদি স্রেফ "হিসেব সর্বস্ব" হয় তবে তা বেশ একঘেয়ে ঠেকতে পারে; "আমি এই করলাম, তারপরে ওই হল, তারপর আমি অমুক সাফল্য পেলাম আর শেষে গিয়ে তমুক হল"। এই "হিসেব সর্বস্বতা" র জন্যেই মাস্টারব্লাস্টার শচীনের জীবনীর চেয়ে মঞ্জরেকারের জীবনী অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক। অমুকবাবুর জীবনীতে আমি স্রেফ উইকিপিডিয়া গোছের 'এন্ট্রি' গড়গড় করে পড়ে যেতে চাইনা, বরং আমি চাই অমুকের চোখ দিয়ে অমুকের পৃথিবীটাকে চিনতে। যে কোনও জীবনীতে আমি ইনফর্মেশন নয়, গল্প (আষাঢ়ে নয়) খুঁজে বেড়াই। আর সে'খানেই "ফার্স্ট পার্সন" য়ের প্রথম খণ্ডটা পড়ে মনে হল, কী চমৎকারভাবে ঋতুপর্ণবাবুর জীবনটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। অঙ্ক মেনে ছকে, জার্নাল লেজার ঘষেমেজে লেখা জীবনীর চেয়ে এ'টা একদিক থেকে ঢের বেশি ভালো। 
চাকরী সূত্রে আমার গত আটবছর কেটেছে যোধপুর পার্ক, প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড অঞ্চল ধরে; কলকাতার এই পরিচিত এলাকাগুলো ঋতুপর্ণর ছোটবেলার চোখ দিয়ে দেখতে পাওয়াটা একটা বাড়তি পাওনা। 
প্রথম খণ্ডের একজায়াগায় ঋতুপর্ণ নিজের মায়ের চলে যাওয়ার কথা লিখছেন৷ পাশাপাশি তুলে ধরছেন বৃদ্ধ অসহার পিতার একাকিত্ব। ও অংশটায় আমি বার পাঁচেক ঘুরপাক খেয়েছি। এবং তারপর থেকে সে অংশটুকু আমার মনের মধ্যে ক্রমাগত ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে। নিজের সেই একঘেহে সঞ্জীব-ঘ্যানঘ্যানানিতে ফিরে গিয়ে বলি; ঋতুপর্ণ সঞ্জীবের গল্পের রূপকথা-মার্কা চরিত্রদের মত করে ভালোবাসতে পারতেন বলেই আমার মনে হয়৷

বাঘবন্দীর খেলা


- অভ্র, শুনলাম তুই মিছিলে যোগ দিবিনা বলেছিস..।
- ঠিকই শুনেছ।
- লাইটার আছে? আমারটা কে যে ঝেড়ে দিলো।
- এই যে।
- একটা সিগারেট না ধরালেই নয়..থ্যাঙ্কস। 
- মনোজদা, ও মিছিলে আমি বেরোব না।
- ভেবে বলছিস তো?
- তুমি তো জানো, আমি চিরকালই এক কথার মানুষ।
- তোর এই ট্রেটটা আমার বরাবরই ভালো লাগে। তুই ইউনিভার্সিটিতে থাকতেই তোকে মার্ক করেছিলাম কি সাধে? তোর মধ্যে একটা ডিসাইসিভ ব্যাপার আছে, তোর ফোকাস আছে,জেদ আছে, অধ্যাবসায় আছে৷ পলিটিক্সে এই ব্যাপারগুলো খুবই জরুরী৷ 
- এ'টা মিছিল নয় মনোজদা...পরিকল্পিত হামলা৷ 
- তুই লম্বা রেসের ঘোড়া৷ পার্টিতে তোর একটা ব্রাইট ফিউচার আছে৷ হাইকম্যান্ড তোর এনার্জি আর ইন্টেলিজেন্সকে যথেষ্ট সমীহ করে। কিন্তু এখন তোকে যদি সহজপাঠ ধরে পড়াতে হয়....দ্যাট ইজ আনফরচুনেট। দ্যাখ অভ্র, প্রতিটা মিছিলই পরিকল্পিত আক্রমণ৷ সে আক্রমণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, পচাগলা সিস্টেমের বিরুদ্ধে। 
- কিন্তু তোমাদের আজকের এই পরিকল্পিত আক্রমণ অন্যায় বা পচা সিস্টেমের বিরুদ্ধে তো নয়। 
- আমাদের? এ পার্টি তোর নয়? 
- কিছু অসহায় মানুষকে মারধোর করে, তাদের দোকানপাট জ্বালিয়ে তোমরা নিজেদের পলিটিকাল ক্যাপিটাল জড়ো করছ৷ এ কাজ করতে তো আমি পার্টিতে আসিনি মনোজদা...।
- এ'সব ফাঁপা বুলি আউড়ে...।
- কোনো লাভ নেই জানি৷ তবে আমায় ডেকেও কোনও লাভ হবে না মনোজদা। 
- বেশ। তবে তোর লাইটারটা বরং আমার কাছেই থাক...। মিছিলে তো আর স্লোগান থামিয়ে অন্যের কাছে দেশলাই চাওয়া যায় না...কী বলিস? আসি৷ মিছিলে না যাস, কাল অফিসে আসিস। একটা ভালো বই পড়াব। কেমন?
- বেশ। 
***
- অভ্রকে আনতে পারলে না তো মনোজদা?
- বড্ড জেদ। আজ ছেলেটা এলোই না রে পটা। 
- বড্ড রোয়াব মালটার। পার্টির স্বার্থে নিজের আইডিয়াল কিছুতেই ছাড়তে রাজী নয়...এদিকে আমরাই হলাম কুলিমজুর মানুষ...মিছিলের পতাকা হোক বা পেট্রোল বোমা; সে বোঝা আমাদেরই বইতে হবে। 
- আইডিয়াল নাকি? হেহ্।
- হাসছ যে বড়?
- পলিটিক্স শুধু রাজনৈতিক ঝাণ্ডা বাগিয়েই হয় রে? পার্টির লাইন মত দু'চারটে মানুষ প্যাঁদানোই দলের একজন হয়ে ওঠার একমাত্র উপায় ভেবেছিস? 
- অত র‍্যালার কথা আমার মাথায় ঢুকলে আজ রাস্তায় নেমে দাঙ্গা না বাঁধিয়ে পার্টি অফিসে বসে টিভি চ্যানেলদের ইন্টারভিউ দিতাম গো মনোজদা।
- শাটাপ রাস্কেল! কতবার বলেছি মিছিলকে মিছিল বলবি। দাঙ্গাটাঙ্গা আবার কী ছোটলোকের মত ভাষা! বল প্রতিরোধ! বল সংগ্রাম!
- ওই হল। ক্যালানি দেওয়ার আগে কত যে ঢ্যামনামো মারাতে হয়। যাক গে, ঝাণ্ডা না বাগিয়ে রাজনীতি কীভাবে করা যায় মনোজদা?
- ধরিমাছনাছুঁইপানিবাজ আইডিয়ালিস্টদের চিনতে পারা; ওটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ক্ষমতা। সে ক্ষমতা আছে বলেই আজ আমি নেতা আর তুই স্রেফ কর্মী। 
- ধ...ধরিমাছ...ধরিমাছ...।
- ধরিমাছনাছুঁইপানিবাজ আইডিয়ালিস্ট। এই যেমন অভ্র। এই আইডিয়ালিসম বেচে ও একদিন বড় কলেজের প্রফেসর হবে, টেড-টক দেনেওলা ইন্টেলেকচুয়ালও হতে পারে। অথচ দ্যাখ, আমি আগুন লাগাতে বেরোচ্ছি জেনেও ও কেমন নিশ্চিন্ত মনে আমায় নিজের লাইটার ধার দিল৷ আইডিয়াল নিয়ে ও আছে; থাকুক। কিন্তু এই টোকেনিজমটুকুকে ত্যাগ করতে পারলে না যখন, ওর মুক্তি নেই রে।
- মুক্তি নেই? 
- আজ অভ্রর লাইটার মিছিলে বেরোবে, তা দিয়ে দু'চারটে দোকানপাট জ্বালাব। কাল অভ্র নিজের বেরোবে মশাল হাতে হারেরেরেরে সুরে। আর এই অভ্রদের সাইলেন্স চিনতে পারি বলেই আমি নেতা...কী বুঝলি? 
- তোমার কাছে বিড়ি আছে গুরু?