Thursday, November 21, 2019

গহর ও রাজলক্ষ্মী

“ইতি তোমার মা” প্রথম পড়েছিলাম ক্লাস এইটে। শ্রীকান্ত অনেক পরে, সম্ভবত মাধ্যমিকের দেওয়ার পর। এই দুটো লেখার মধ্যে আদৌ কোনও যোগাযোগ নেই, কিন্তু কেন উল্লেখ করলাম সে’টা একটু খুলে বলি। সঞ্জীবের ক্ষেত্রে আমার যুক্তিনির্ভর (নিজের বোধ বুদ্ধিতে যতটা কুলোয় আর কী) সমীহ আর “আমার সঞ্জীব” মার্কা অঙ্কহীন ভালোবাসা; দুটোই যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। সেই ভালোবাসার শুরু ওই “রাবণ বধ” আর “ইতি তোমার মা”কে নিয়েই। ছেলেবেলায় ‘ইতি তোমার মা’য়ের শেষ পাতায় দেওয়া মায়ের চিঠিটা যে কতবার পড়েছি আর কতবার যে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। চিঠিতে কী অপরিসীম কষ্ট মিশে রয়েছে অথচ তবু সে লেখা কী নির্মল আর কী ভালোবাসার; দুঃখের ধবধবে সাদা বিছানায় স্নেহের রোদ্দুর মিশে যাওয়ার যে কী মায়াবী টান, কী অপরূপ সৌন্দর্য। ওই আড়াইশো মত শব্দে লেখা মায়ের শেষ চিঠি; “স্নেহের বুড়ো, আর কদিন পরেই আমি চলে যাব” বলে শুরু আর “বিদায়, অনেক ভালোবাসা। জল নয়, আগুন। ইতি তোমার মা”য়ে এসে শেষ। বয়সের মরচে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় মনে হয়েছে চিঠিতে কিছু উপদেশ গুঁজে দেওয়া আছে বোধ হয়। কিন্তু এ চিঠি মন দিয়ে পড়লেই সে জ্যাঠামির ভাঁওতা কেটে যায়; ভালোবাসা আর মায়ের সুবাস ছাড়া এ চিঠিতে কিছুই নেই, এ চিঠি মা “নেই বলেই আর বেশি করে থাকবে”র চিঠি। গোটা গল্পটার ব্যাপারে হলফ করে বলতে পারি না, তবে এ চিঠি থেকে ইহ জন্মে আর আমার বেরোনো হবে না। 

সদ্য শ্রীকান্ত উপন্যাসটা ফের পড়লাম, এর আগে এ বই পড়েছি অনেক আগে। তবে মাঝেমধ্যে তাক থেকে শরৎ রচনাবলী নামিয়ে “শ্রীকান্ত” আর “পথের দাবী” র‍্যান্ডমলি কিছুটা পড়তে দিব্যি লাগে।  ‘ইতি তোমার মা’য়ের মতই এ উপন্যাসেও একটা শেষ চিঠি রয়েছে; রয়েছে গল্পের শেষের দিকেই। 
গহরের শেষ চিঠি। শরৎবাবু যে বিশেষ ফলাও করে সে গোটা চিঠিটা পাঠকের জন্য যে সাজিয়ে দিয়েছেন তাও নয়, স্রেফ সে শেষ চিঠি থেকে দু’লাইন তুলে দিয়েছেন মাত্র। নেহাতই যাকে বলে “পাসিং রেফারেন্স”, অনেকটা গোটা বইতে গহরের উপস্থিতির মতই। কিন্তু যত দিন গেছে, সেই দু’লাইনের ‘ব্রেভিটি’ মনের মধ্যে প্রকাণ্ড হয়ে উঠেছে, আমি জড়িয়ে ধরেছি গহর চরিত্রটি। এই চিঠিতে আমি বার বার ফেরত গেছি; সেই টানেই এ উপন্যাস ফের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়া।

“ ভাই শ্রীকান্ত, 

আমি বোধ হয় আর বাঁচব না। তোমার সঙ্গে দেখা হবে কিনা জানি না। যদি না হয় (এই) বাক্সটি রেখে গেলাম, নিও। টাকাগুলি তোমার হাতে দিলাম। কমললতার যদি কাজে লাগে, দিও। না নিলে; যা ইচ্ছে হয় তাই কোরো। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। - গহর”। 

যদি আপনি শ্রীকান্ত না পড়ে থাকেন, তাহলে অভয় দিয়ে বলি উপরের কোট করা দুলাইনে স্পয়লার নেই আদৌ। কিন্তু রুখাশুখা ক’লাইনে যে কী পরিমাণ স্নেহ আর কী বেপরোয়া ভাবে উজাড় হওয়া রয়েছে তা অনুভব করতে হলে গোটা উপন্যাস পড়া ছাড়া গতি নেই। ওই “ভাই শ্রীকান্ত”র মধ্যে যে বিশ্বাস, “দেখা হবে কিনা জানি না”র মধ্যে যে বিচ্ছেদের ব্যথা, ‘নিও’র মধ্যে যে সমর্পণ; তা বিশদে বোঝাবার ক্ষমতা থাকলে বর্তে যেতাম। 
আর রয়েছে “না নিলে যা ইচ্ছে হয় তাই কোরো। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন”। প্রবল ভাবে ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট এই লাইনে রয়েছে গহরের প্রেম, অভিমান আর বন্ধুত্ব। ওই, আমি আদেখলার মত সস্তা বিশেষণই ব্যবহার করে যেতে পারি; কিন্তু আদত গহরকে অনুভব করতে হলে শ্রীকান্তবাবুর জার্নাল ছাড়া উপায় নেই। জীবনে কিছু বন্ধুর মত বন্ধু জুটেছে বটে; যেদিন সরেটরে পড়ার সময় হবে, সে শালাদের মনে করে আমি গহরের শেষ চিঠিটুকুই বারবার পড়তে চাইব। আমি নিশ্চিত।

শ্রীকান্ত উপন্যাসের মূল রস বোধ হয় শ্রীকান্তর ডায়েরিতে বিভিন্ন চরিত্রের আসা যাওয়ায়, তাঁদের জটিল বুনোটে বাঁধার চেষ্টাও করেননি শরৎবাবু। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই “ব্রেভিটি”তেই তাঁরা উজ্জ্বল। অভয়ার জীবনের সুবিশাল ট্র্যাজেডিতে তাই রোহিণীবাবুর নিষ্ঠা ঢেকে যায় না, কমললতার নিষ্পাপ ভালোবাসার দিগন্তজোড়া গল্পের সামনে  তাই আখড়ার বড়গোঁসাইয়ের নিঃশব্দ উপস্থিতি মূল্যহীন হয়ে পড়ে না, আধ-পাতার উপস্থিতিতেও পণের টাকা ফিরে দেওয়া কালিদাসবাবুর দাপট মনে দাগ কেটে যায়, স্বল্প উল্লেখেও আইডিয়ালিস্ট সুনন্দার প্রতি পাঠকের সমীহ এবং আগ্রহ দুইই প্রবল হয়ে ওঠে। 

যা হোক, কৈশোরে শ্রীকান্তর পাশাপাশিই পড়েছিলাম রবিবাবুর গোরা। এই দুই বইয়ের মধ্যে যোগাযোগ বলতে আমার সেই “পাশাপাশি পড়ার” স্মৃতিটুকু। গোরার (বইয়ের কথা বলছি, ব্যক্তি নয়) সুচরিতা আর শ্রীকান্তর (বইয়ের কথা বলছি, ব্যক্তি নয়) রাজলক্ষ্মীর মধ্যে কত তফাৎ। অথচ ফের যখন পাশাপাশি এই দুই বই শেষ করলাম তখন মনে হচ্ছে আইডিয়ালিজমের প্রতি নিজেকে সৎভাবে সঁপে দিতে পারা এমন সরল দুজনের মানুষ যেন একে অপরের কতটা কাছের। পাঠক হিসেবে বয়সের মরচে আর জ্যাঠামোর কথা উল্লেখ করেছিলাম; কোন চরিত্র কতটা “রিয়েল” তা নিয়ে চুলচেরা বিচার করে চোখমুখ কুঁচকে দুচারটে গম্ভীর মন্তব্য করতে না পারলে যেন তৃপ্তি হয়না। সেই পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে বলতেই পারি যে “ধুস, এদের সবেতেই বড্ড বাড়াবাড়ি”। এমন আইডিয়ালিজমে সঁপে দেওয়া চরিত্র হয়ত আজকালকার লেখায় তেমন সহজে নজরে পড়ে না; কারণ তাঁদের স্নেহ, বিশ্বাস ও ত্যাগ যেন কিছুতেই “রিয়াল” বলে বিশ্বাস হয় না। কিন্তু স্বীকার করে নিই যে এ’দুজনকেই ভালো না বেসে থাকা যায় না (আমি অন্তত পারিনি); এঁরা নিজেরা ‘আনরিয়াল’ হতে পারেন কিন্তু পাঠক হিসেবে এদের প্রতি আমার ভক্তিটা ষোলোআনা ‘রিয়াল’। তবে রাজলক্ষ্মী চরিত্রটা আমার বেশি প্রিয়; খানিকটা ওই যুক্তি পেরিয়ে সঞ্জীবকে ভালোবাসার মত। এ বই ফের পড়তে পড়তে আনন্দ সন্ন্যাসীর ওপর খানিকটা হিংসেই হয়েছে; রাজলক্ষ্মীর চ্যালা হয়ে ঘুরঘুর করতে পারলে বোধ হয় কৈলাস ভ্রমণের তৃপ্তি লাভ করা যায়। 

পৃথিবীর সমস্ত গল্পকথা সত্যি হলে নিশ্চিন্তে বলতে পারতাম যে রাজলক্ষ্মীই পরজন্মে “ইতি তোমার মা” গল্পে বুড়োর মা হয়ে জন্মেছেন; শেষ চিঠির সেই স্নেহে যে রাজলক্ষ্মীরই সুবাস মিশে। আর যেহেতু রাজলক্ষ্মীর ভালোবাসা শতজন্মেও ম্লান হওয়ার নয়, সেহেতু এও হলফ করে বলাই যায় যে বুড়োর বাবাটিই আদতে জন্মান্তরের শ্রীকান্ত।  

পুনশ্চঃ 
একটা খুঁতখুঁত আর সামান্য ঘ্যানঘ্যান। 
শ্রীকান্তর বর্মা-ডায়েরীটা শরৎবাবু আরও একটু দীর্ঘ করতেই পারতেন; শ্রীকান্ত উপন্যাসে ওটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় অংশ যে।

Wednesday, November 20, 2019

জী হজৌরি

- হজৌর। 

- কী চাই?

- দুদিনের ছুটির বড় দরকার, হজৌর। 

- চৌবে, তোমার বড় বাড় বেড়েছে। এই না গত বছরই তুমি ছুটি নিয়েছিলে?

- জী হজৌর। দেড় বছর আগে তিন দিনের ছুটি নিয়ে দেশে গেছিলাম বৈকি। 

- লজ্জা করে না  ফের ছুটি চাইতে?

- মিথ্যে বলব না হজৌর। লজ্জা তো করে। তবু…। 

- তবু আমায় জ্বলাতন করার ইচ্ছেটুকুকে সামাল দিতে পারো না, তাই না?

- গুস্তাখি মাফ হজৌর। তবে দু-তিন দিনের ছুটিটা নামঞ্জুর করবেন না। 

- একশোবার করব। বেশি ট্যাঁফোঁ করলে বাইশ দিনের মাইনে কেটে নেব। 

- দুদিনের ছুটির জন্য বাইশ দিনের মাইনে কাটা? হজৌর?

- মুখে মুখে তর্ক? চুয়াল্লিশ দিন। 

- হজৌর…। 

- ছেষট্টি। 

- আপনার হুকুমুই আমার আশীর্বাদ, হজৌর।

- ন্যাকাপনা শুনে আর বাঁচিনা। যত নেকু খাঁ এসে জুটেছে আমার কপালে।

- হজৌর, পরশু রাত্রের ট্রেনে যাচ্ছি। দারভাঙ্গায় একদিনের কাজ সেরে পরের দিনের ট্রেনেই ওয়াপস। 

- ওয়াপস না আসলেই বা কোন মহাভারত অশুদ্ধ হবে শুনি? আর দারভাঙ্গা কেন, পারলে লাহোর গিয়েই বসে থাকো না চৌবে। তুমি কী ভেবেছ, তুমি না থাকলে আমি জলে পড়ব?

- তৌবা তৌবা হজৌর। চাকর মানুষের থাকা না থাকায় কি বাবুর বিপদ হতে পারে…। 

- হবেই বা কেন। টাকা ছড়ালে খিদমতগারের অভাব হয় নাকি?

- না হজৌর। বিলকুল হয় না। 

- আর তোমার মত নেমকহারাম আমি বাপের জন্মে দেখিনি! দুবছরে দুবার ছুটি। এ যে দিনে ডাকাতি, রাতে সিঁদ।

- দশবার গালমন্দ করুন হজৌর, তবে অত উত্তেজিত হবেন না। সান্যাল ডাক্তার বলছিল আপনার প্রেশারের ভাবগতিক ভালো নয়।

- সান্যাল ডাক্তারের ধান্দা বুঝি না ভেবেছ চৌবে? ব্যাটা স্রেফ ফিয়ার মঙ্গারিং করে আমার সঞ্চয় সাফ করে চলেছে। আজ বলে কোলেস্টেরল বেশি, কাল বলে প্রেশার, পরশু বলে শুগার; মহা ফেরেব্বাজ ডাক্তার। কাজেই আমার সামনে ওঁর হয়ে ফোঁপরদালালি করতে এসো না। 
- জী। গুস্তাখি মাফ। তবু, বেশি রাগধাপ না হয় নাই করলেন, হজৌর। 

- তা এই যে দুদিন আগেই দেশের বাড়ি থেকে ঘুরে এলে…। 

- দেড় বছর আগে হজৌর, দেড় বছর আগে। 

- ফের যদি কথার মাঝে কথা বলেছ চৌবে, তোমার পিছনে আমি উকিল লাগাবো। এই কদিনের মধ্যেই ফের দেশের বাড়ি যাওয়ার মতলব কেন? 

- হজৌর…। 

- ব্যাপার কী চৌবে…। 

- বড় নাতিটা বোধ হয় আর…। 

- সেই যার জন্য তুমি গতবার অমন হন্যে হয়ে ছুটে গেলে?

- জী হজৌর…আপনার দয়ায় সে ব্যাটাকে কলকাতায় এনে কম চিকিৎসা করানো হল না। কিন্তু তবু…।   

- সে গণ্ডগ্রামে তাকে ফেরত নিয়ে যাওয়ার বদবুদ্ধি শুনে আমি তখনই পইপই করে বারণ করেছিলাম…। কে না জানে; সান্যাল ডাক্তার অসাধ্য সাধন করতে পারে। তাঁর সুপারভিসন ছেড়ে ওঁকে নিয়ে গিয়ে খুব অন্যায় করেছ। 

- সান্যালবাবুই জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন হজৌর। তাই আর…। 

- সান্যাল জবাব দিয়েছে? ডাক্তার না ছাই, ব্যাটাচ্ছেলে একটা কোয়্যাক। আহা, অমন ফুটফুটে নাতিটা তোমার; কী নাম যেন? গুড্ডু, আহা। বুক ভরে যায় ওর দুচোখের দিকে তাকালে। জবাব দেওয়ার সাহস পায় কী করে সান্যাল? ব্যাটা হামবাগ! আমি গুড্ডুকেকে বম্বে নিয়ে যাব। 

- হজৌর কিন্তু…। 
- ফের কথার মধ্যিখানে কথা ? প্রয়োজনে আমি ওকে আমেরিকা নিয়ে যাব। তুমি দেখো চৌবে,  গুড্ডুবাবুর কিস্যু হবে না। 

- গুড্ডু আপনার কথা প্রায়ই বলে হজৌর। 

- কেন বলবে না? ওর মধ্যে তো তোমাদের মত বিষ নেই। ও আমার ভালোবাসা চিনতে পেরেছে, কদর করে। তোমাদের মত ট্রেটার সে নয়। যাক গে, আর বাজে কথা নয়। আমি সান্যালকে খবর পাঠাচ্ছি, তাঁকেও না হয় সঙ্গে নিয়ে নেওয়া যাবে। একটা গাড়ি আর একটা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে আমরা সোজা চলে যাব দারভাঙ্গা, ওসব ট্রেনঠ্রেনের ঘ্যানঘ্যানে বাবুগিরি চলবে না। আমার ওই নতুন সেক্রেটারির নামটা যাই ভুলে…কী যেন…ওই মনোজ না হরগোবিন্দ…। 

- সলিল, হজৌর…। 

- ওই হল। ওই সমরকে বলো…। 

- আজ্ঞে সলিল, হজৌর। 

- কে সলিল?

- আপনার সেক্রেটারি হজৌর। 

- তার নাম সলিল যখন সলিল বলে ডাকলেই হয়। তাকে বলো সে যেন এখুনি সব ব্যবস্থা করে ফেলে। আমরা আজই রওনা হব। 

- হজৌর, সান্যাল ডাক্তার কিন্তু বলেই দিয়েছেন…। 

- তোমায় কি সান্যাল মাইনে দিয়ে পুষছে না আমি? চৌবে? 

- আপনিই মাইবাপ, হজৌর। 

- ফের যদি তর্ক করেছ তো অষ্টআশি দিনের মাইনে কাটব। 

- হজৌর, আর কটা দিনই তো, থাক গুড্ডু ঘর আলো করে, মায়ের কোলে। 

- না চৌবে, অমন পেসিমিজম তোমায় মানায় না। তুমি সিংহপুরুষ চৌবে। 

- হজৌর…। 

- চৌবে। তুমি কাঁদছ?

- এ বড় স্বার্থপর কান্না হজৌর। আমার ছেলেটার জন্য বড় কষ্ট হয়, গুড্ডুর কিছু হলে ও বেচারা আর ওর পরিবার যে প্রতিদিন একবার করে মরবে। 

- চৌবে। তোমার ছুটি নামঞ্জুর। 

- জী হজৌর। আপনি যেমনটি বলবেন। 

- আমি ছ’মাসের জন্য দারভাঙ্গায় থাকব, তোমায় আমার খিদমতে সেখানেই থাকতে হবে। কাজেই ছুটি ক্যান্সেল। কথার নড়চড় হওয়ার উপায় নেই কিন্তু। ফের যদি ছুটির জন্য প্যানপ্যান করেছ আমি তোমায় কতল করাবো। 

- না হজৌর, আপনি এ বয়সে সেখানে গেলে থাকতে পারবেন না…। 

- এ বয়সে কলকাতার পলিউশন এমনিতেও সহ্য হচ্ছে না। তোমাদের বাড়িতে তো দারভাঙ্গা থেকে কিছুটা দূরের সেই অজগাঁয়ে। সেই বরং ভালো। সকাল থেকে সন্ধে গুড্ডুবাবুর সঙ্গে লুডো আর ক্যারম খেলব আর রাত্রে সান্যাল ডাক্তারের সঙ্গে দাবা। থাকার ব্যবস্থা তোমার চিন্তা। আর দেরী নয়, আমার সেক্রেটারি…ওই অনিন্দ্য না মনমোহন কী যেন একটা নাম…ওকে চট করে সব বুঝিয়ে দাও। 

- হজৌর, আপনি অতদিন সেখানে থাকবেন কেন? না না…আপনি এখানেই থাকুন…। 

- চৌবে, তোমার বাপের কোলেপিঠে মানুষ হলাম। ছেলেবেলায় প্রত্যক্ষ করেছি; কাকার তোমায় নিয়ে সে কী দুশ্চিন্তা। তুমি ছেলেবেলা থেকেই হাড়বজ্জাত কিনা; হপ্তায় চারদিন ভুগতে জ্বরে আর তিন দিন বিছানায় লেপটে থাকতে পেটের গোলমালে। তোমার যন্ত্রণা তুমি কতটা ভোগ করতে জানি না, কিন্তু কাকা কাটা পাঁঠার মত ছটফট করত তোমায় কষ্ট পেতে দেখলে। নিজের বাপকে বেশি দিন কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আমি স্নেহ যেটুকু পেয়েছি তা কাকার কাছ থেকে। তুমি এমন ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললে চৌবে, এ সময় তোমায় আমি ভেসে যেতে দেব ভেবেছ? আর ওপরে কাকা ছটফট করে মরুক আর কী। 

- হজৌর…। 

- না কোরো না ভাই চৌবে। পায়ে পড়ি তোমার। 

- তৌবা হজৌর। তৌবা। 

- ধ্যাত্তেরিকা তৌবার নিকুচি করেছে। আজ থেকে ছ’মাস আমি তোমার খিদমতগার। কেমন? সেখানে গিয়ে আমি মোটে বাবুয়ানি করে দিনগুলো নষ্ট করব না...শুধু তোমার ফাইফরমাশ। 

 - ছিঃ হজৌর। 

- ফের কথার মাঝে কথা? তোমার একশো দশ দিনের মাইনে কাটব! হুঁশিয়ার! 

Sunday, November 17, 2019

পোয়েট

- কী মেলাই না বসিয়েছিলে চার্নক সাহেব। তোফা..। তোফা..।

- টুমার পসন্দ হইয়াছিল? ব্রাদার?

- এসেছিলাম দায়ে পড়ে। দেখলাম পাড়া মন্দ নয়। 

- টুমার এই ভারান্ডাটিও মন্ড নহে।

- ভূত হওয়ার তো এ'টাই সুবিধে; পছন্দসই ছাত পেলেই তা পার্সোনাল বারান্দা। হাত পা ছড়িয়ে গান ধরলেই হল। তাই ডাকলাম তোমায় সাহেব।

- ট্রু পোয়েট টুমি ওয়াজিদ। আ ট্রু পোয়েট।

- বিরিয়ানির ওই আলু; পোয়েট্রি ছাড়া পেতে কি?

Friday, November 15, 2019

ওয়েটিং রুম

স্বভাব-কবি আর হওয়া হল না হে। তাই আমি ঠিক করেছি স্বভাব-মাতাল হয়েই যতটা সম্ভব রোম্যান্স আদায় করে নেব। পারলে পুরোপুরি মাতাল হওয়ার দিকেই ঝুঁকতাম। কিন্তু আজকাল আমার জিভের পশমে মদের পেরেকের ঠোকাঠুকি সহ্য হয়না। তাই ঠিক করেছি অল্টারনেট পথে গিয়ে যতদূর সম্ভব ঝিমঝিমে নেশা সংগ্রহ করে ক্রমাগত নিজের অন্তরকে সমৃদ্ধ করে যাব।
শুনেছি চলন্ত ট্রেনের খোলা জানলার পাশে বসে দুঘণ্টা কাটাতে পারলে নাকি তিন গেলাস সিদ্ধি-পানের সমান স্নেহ-লাভ ঘটে। কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়, হাওড়া টু মেমারি লোকাল ট্রেনের জানালার পাশে আলুথালু বসে দেখেছি; অল্পেতেই চোখে মায়া লাগে, বুকে ওম। এক সময় শৌখিন জমায়েতে স্কচে চুমুক দিয়ে দেখেছি; বাবুরা যাকে বলে স্মুদ। কিন্তু ব্যাপারটা তলিয়ে দেখে বুঝেছি এই যে স্কচিও সেই স্মুদনেস বুদ্বুদ হয়ে উড়ে যায় যখন সোফায় লেপটে শিবরাম পড়তে পড়তে হোমমেড বরফলেবুজলের চুমুক দিই। অ্যাবসোলুট ভডকায় আত্ম-নিবেদন করাই যায়, কিন্তু নিজেকে অ্যাবসোলিউট-ভাবে সঁপে দিতে চাইলে দরকার বালিশের নীচে রাখা পূর্ণেন্দুবাবুর কবিতার বই

এদ্দূর বলে অমিয়বাবু থামলেন।

সামান্য ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলাম আমার এই সস্তা হুইস্কি আপনার রুচবে কিনা সেটা আপনার স্পীচ শুনে ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না

অমিয়বাবুর সঙ্গে আলাপটা এই সদ্য হয়েছে ঝাঝা স্টেশনের ওয়েটিং রুমে। আমাদের দুজনের গন্তব্য আর ট্রেন এক; কাজেই সে সন্ধ্যের ট্রেন যখন সাত ঘণ্টা লেট চলছে খবর এলো তখন অগত্যা এই ওয়েটিং রুমে এসে গা এলিয়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর উপায় ছিল না। এই ওয়েটিং রুমের অবস্থা তেমন জুতসই নয়, রীতিমত অপরিষ্কার এবং ঘিঞ্জি। লেট ট্রেনের জন্য হন্যে হয়ে অপেক্ষারত যাত্রীর সংখ্যা এ স্টেশনে নেহাত কম নয়, তবে এই বিশ্রী ওয়েটিং রুমের দিকে কেউই ঘেঁষছে না। এমন ভ্যাঁপসা ঘরে আটক হয়ে থাকার চেয়ে প্ল্যাটফর্মে পায়চারী করা অনেক ভালো। আর জনমানবহীন বলেই এই ওয়েটিং রুমটি আমার এত পছন্দ হয়েছে। শুকনো গলায় এতক্ষণ অপেক্ষা আমার সইবে না অথচ প্ল্যাটফর্মে বসে লুকিয়েচুরিয়ে দুঢোক গলায় ঢালতে গিয়ে যদি ব্যাপারটা রেলপুলিশের চোখে পড়ে; তাহলে ফের হাজার রকমের হ্যাপা হজম করতে হবে।

আধো-অন্ধকার ওয়েটিং রুমে ঢুকে সুটকেসটা বেঞ্চির ওপর রাখলাম আর তারপর সন্তর্পণে বের করলাম বোতলটা। সঙ্গে সোডাজলের বোতল এবং চানাচুরের ডিবে থাকেই, আয়োজনের অভাবে আমায় ভুগতে হয়না। সুটকেস দিয়ে সামান্য আড়াল তৈরি করে ওয়েটিং রুমের বেঞ্চিতে সমস্ত সাজিয়েগুছিয়ে সবে বসেছি; এমন সময় ওয়েটিং রুমের পশ্চিম কোণের অন্ধকার ভেদ করে কেউ বলে উঠল;

হুইস্কি মনে হচ্ছে”?

চমকে উঠেছিলাম। গায়ে কালো চাদর জড়িয়ে এমন ভাবে অন্ধকারের সঙ্গে মিশেছিলেন ভদ্রলোক যে ঘরে ঢোকার পর থেকে টেরই পাইনি যে এ ওয়েটিং রুমে অন্য কেউ রয়েছে। ভদ্রলোক বেঞ্চি ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই ঘরের মধ্যে জমে থাকা ঘোলাটে হলুদ আলোয় দেখলাম ভদ্রলোক বৃদ্ধ; বয়স সত্তর বাহাত্তরের কম হলে অবাকই হব। মাথার চুল যে কগাছি অবশিষ্ট আছে তা প্রায় সম্পূর্ণই সাদা, গালের চামড়া ঝুলে পড়েছে। তবে ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে আসতে বুঝলাম যে তাঁর চোখ জোড়া এখনও এতটাই উজ্জ্বল যে বয়সের ভার ছাপিয়ে তাঁর ধারালো ব্যক্তিত্বটা প্রকট হয়ে পড়ে।


সাবধান হলাম তবে আশঙ্কার কোনও কারণ দেখলাম না। বললাম;


- আমি ঠিক বুঝতে পারিনি এখানে আপনি
- না না, আমি মাইন্ড করিনি। প্লীজ, আপনার সাধনায় ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনি মোটেও। স্রেফ কিউরিওসিটির বসেই

ভদ্রলোকের গলায় কোনও রকম উষ্মা বা বিরক্তি আছে বলে মনে হল না। নিশ্চিন্তে গেলাসে চুমুক দিয়ে আলাপ জুড়লাম। মদের সঙ্গে চানাচুরের চেয়েও বেশি জমে সামান্য গল্পগুজব। অল্প সময়ের মধ্যেই জানা গেল যে ভদ্রলোকের নাম অমিয় মজুমদার, আসানসোলের মানুষ। রেলের অবসরপ্রাপ্ত ক্লার্ক, গল্পের বইয়ের পোকা। মদের নেশার জ্বালায় বইপড়ার নেশা জলাঞ্জলি দিতে হলেও; সাহিত্য-প্রীতি খানিকটা আমারও আছে, কাজেই গল্প জমে উঠল সহজেই।

তিন নম্বর পেগে এসে মনে হল যদিও ভদ্রলোক বয়সে আমার জ্যেঠুর সমান; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে হুইস্কি অফার করাটা বোধ হয় সৌজন্যের মধ্যে পড়ে। আমার সেই সৌজন্যের উত্তরেই ভদ্রলোক নিজের মদ-হীন-মাতলামি নিয়ে বাহারে কথাগুলো বললেন। আমার মনে হল ভদ্রলোকের ইচ্ছে আছে সামান্য চেখে দেখার কিন্তু সাহস পাচ্ছেন না।

অসময় অস্থানে হুইস্কি পানের সঙ্গী পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়, পাঁড় মদ্যপরা এর মূল্য নিশ্চিত ভাবেই বুঝবেন। নরম সুরে বললাম;

- এ হুইস্কি সস্তা হতে পারে তবে চোলাই নয়। টলে পড়বেন না এটুকু আশ্বাস দিতে পারি।
- আরে না হে না। আমায় অত ভীতু ভেবো না। আর এক সময় যে নেশাভাং করিনি তাও তো নয়। তবে ওই যে বললাম
- এখন মদ-হীন মাতলামির দিকে ঝুঁকেছেন, এই তো?
- করেক্ট। তবে তোমার সঙ্গে গল্প করতে দিব্যি লাগছে কিন্তু।
- দিব্যি কেন লাগছে বলুন তো? আমার ধারণা ছিল যে আমার মত বেহেড মাতাল সবারই বিরক্তির কারণ।
- বেহেড মাতলামিকে আমিও যে খুব ভালো চোখে দেখি তা নয়। কিন্তু এখনও যা দেখছি; তোমার হেড তো দিব্যি ঘাড়ের ওপর স্টেডি হয়ে বসে। বরং প্রতিটি পেগের সঙ্গে তোমার কথাবার্তা আর ধারালো হচ্ছে। তা, দুনম্বর পেগ শেষ হল নাকি? তুমি কিন্তু নিশ্চিন্তে তিন নম্বরটি ঢালতে পারো।

এমন ভাবে ঘণ্টাখানেক কাটলো। এই সদ্য পরিচিত বৃদ্ধের সঙ্গে গল্পআড্ডা এমন সহজ হয়ে আসবে তা ভাবিনি। ভদ্রলোক কৌতূহলী কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানোর বিন্দু মাত্র আগ্রহ নেই। আর সত্যিই বাংলা সাহিত্যের সমঝদার, এমন কী ভদ্রলোকের রাজনীতি বিষয়ক জ্ঞানও বেশ রসালো। আগেও বলেছি, সাহিত্য-প্রীতি আমার সামান্য আছে বটে কিন্তু এই অমিয়বাবুর জ্ঞানের ব্যাপ্তি অবাক করার মত। রাজনৈতিক মতবাদেও গা-জ্বালানো বায়াস নেই, বরং চুলচেরা বিশ্লেষণের দিকেই তাঁর আগ্রহ বেশি। মোট কথা, এমন জমাটি আড্ডা-সঙ্গী পেয়ে যেন ঘিঞ্জি ওয়েটিং রুমের গ্লানি অনেকটাই কেটে গেল, ট্রেন-লেট হওয়ার বিরক্তিও গেল কমে।

পাঁচ নম্বর পেগের শেষে মাথার মধ্যের ভালোলাগা ঝিমঝিমটুকু পরিণত হল সামান্য অস্বস্তিকর টিপটিপে ব্যথায়, বুঝলাম এবার থামতে হবে। নয়ত ট্রেনে ওঠার সময় গোলমাল ঘটতে পারে। তখন বিভূতি আর শরদিন্দুর লেখার স্টাইল নিয়ে মনোগ্রাহী দুচার কথা বলছিলেন অমিয়বাবু, হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন;
- আপত্তি না থাকলে দাও একটা ছোট পেগ আমার দিকে এগিয়ে। শেষ ও জিনিস স্পর্শ করেছি অন্তত বছর তিরিশ আগে। এমন চমৎকার আড্ডাও দেওয়ার সৌভাগ্যও যে শেষ কবে হয়েছে তা মনে করতে পারিনা।
- বেশ তো, তবে গেলাস যেহেতু একটাই
- তোমার গেলাসেই না হয়

হেসে একটা প্রমাণ সাইজের পেগ বানিয়ে অমিয়বাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম;


- তাহলে এ আসক্তি এক সময় আপনারও ছিল?
- আসক্তি নয়, প্রবল নেশা। ইন ফ্যাক্ট; ব্যাপারটা প্রায় অসুস্থতার পর্যায় চলে গেছিল। থেরাপি, কবিরাজি; অনেক চেষ্টাই ফেল পড়েছিল।
- স্বীকার করে লজ্জা নেই, আমার ব্যাপারটাও কতকটা তেমনই।
- সে আমি বেশ বুঝেছি।
- জানতে বেশ আগ্রহ হচ্ছে, এমন জাঁদরেল নেশা ছাড়ার মত অসাধ্য সাধন আপনি করলেন কী করে।
- ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং বুঝলে। সেই মিরাকেলটা ঘটেছিল তিরিশ বছর আগে ঠিক এখানেই।
- এই ঝাঝা শহরে?
- এই প্ল্যাটফর্মে। এই ওয়েটিং রুমে বসেই।
- বলেন কী! মেগা কোইন্সিডেন্স যে।
- না হে। তা ঠিক নয়। বরং নির্ভুল প্ল্যানিং বলতে পারো।
- ঠিক বুঝলাম না।
- নিমু তান্ত্রিক শুরুতেই বলেছিল, এসব তাবিজেটাবিজে কাজ হওয়ার নয়। বাপের বকুনি, মায়ের স্নেহ আর বৌয়ের ঘ্যানঘ্যানেও এ রোগ যাওয়ার নয়। কাজ হবে যদি নিজে নিজেকে বোঝতে পারি। অর্থাৎ নিজের কাউন্সেলিং নিজে; সেটাই একমাত্র পথ।
- নিমু তান্ত্রিক?

এবারে গলাটা কেমন শুকোতে আরম্ভ করেছিল। সাহস করে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম;
- আপনি কি সাইঁথিয়ার নিমু তান্ত্রিকের কথা বলছেন অমিয়বাবু?
- হি ইজ দ্য ওয়ান।
- আমিআমিএই দুদিন আগেই তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি। ওই, আমার বউই ওঁর খবর জোগাড় করেছিল, মন্ত্রবলে নাকি মদ গাঁজা সবই ছাড়ানোর ক্ষমতা রাখেন তিনি। আমার ঠিক বিশ্বাস হয়নি জানেন; আসলে একদিনে কম বুজরুক তো দেখলাম না। কিন্তু বউয়ের ঘ্যানঘ্যানে বাধ্য হয়েই একপ্রকার গেছিলাম, দিন পনেরো তাঁর আশ্রয়ে থেকে নিরন্তর তাঁর সেবা করলাম। কিন্তু সে বাবাজী না দিলেন ওষুধ আর না দিলেন কোনও তাবিজ। আমাকে ওই একই কথা বললেন ; নিজে নিজেকে না বোঝানো পর্যন্ত এ নাগপাশ থেকে নাকি মুক্তি নেই। আর টোটকা বলতে সে এক উদ্ভট ব্যাপার। আমার এই সদ্য সীল ভাঙা হুইস্কির বোতলে সামান্য ছাই মিশিয়ে দিয়ে বললেন; এ মদ খেয়ে ফেল। বুঝুন কাণ্ড তবে, যার কাছে মদ ছাড়বার টোটকা চাইতে এসেছি সেই বলে কিনা। মাফ করবেন, সেই ছাই মেশানো হুইস্কিই আপনাকে অফার করতে হল
- নিমু তান্ত্রিক হেলাফেলার মানুষ নয়। হুইস্কিতে ও ছাই মেশালে সে হুইস্কি চরণামৃতের সমান।
- কে জানে। কিন্তু আমার দ্বারা মদ ছাড়া সম্ভব হবে কিনা জানি না। মদের নেশা চাপলে নিজের নামও ভুলে যাই, জানেন অমিয়বাবু? এমন এ পাগলামো। ভাববেন না বাড়িয়ে বলছি। একটা কথা জানেন; আপনাকে দেখে আজ আমার সত্যি লোভ হচ্ছে; এমন লোভ আগে কখনও কাউকে দেখে হয়নি। আপনি এ নেশার বিষ ছাড়তে পেরেছেন, আপনার জ্ঞানের পরিধি কতটা ব্যাপ্ত। এ বয়সেও আপনার চিন্তাভাবনা কতটা উজ্জ্বল। অথচ আমি বেশ দেখতে পারছি এভাবে চললে আমি স্রেফ ভেসে যাব, আমার সংসারটায় ভেসে যাবে। কিন্তু সব জেনেবুঝেওকিছুতেই মদ ছাড়তে পারছি না। এ যে কী জ্বালা। অবিশ্যি আজ আপনাকে দেখে আমার ভারী লোভ হচ্ছেখুব ইচ্ছে করছে আপনার মত হতে। বিশ্বাস করুন। আমি মদের নেশায় নিজের নাম ভুলে যাই এ কথা সত্যি কিন্তু অমিয়বাবু, এই স্বল্প আলাপেও আপনার প্রতি আমার এই সমীহটা কিন্তু একদম খাঁটি
তোমায় অবিশ্বাস করার স্পর্ধা আমার নেই। আমি জানি মদের নেশা যখন বিষাক্ত জন্তুর মত তোমায় গিলে খায় তখন তুমি নিজের নামও ভুলে যাও অমিয়
- অমিয়? আমার নামও অমিয়? ও...ওহ তাই তো...আমিও অমিয় মজুমদার। এ যে দেখি গ্র্যান্ডফাদার অফ অল কোইন্সিডেন্সেস! অথচ আমার আর আপনার মধ্যে কতটা তফাৎ...।
- নিমু তান্ত্রিকের কথা মিথ্যে নয়। নিজে নিজেকে বোঝাতে না পারলে এ নেশা ছাড়ানো সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ তো তাঁর মত মহাপ্রাণের কাছে অজানা নয়, তিনি জানতেন মদ তুমি ছাড়বেই। বরং তোমার পনেরো দিনের সেবায় খুশি হয়ে তিনি এমন ব্যবস্থা করে দিলেন যে মরার আগে তুমি যেন একবারের জন্য সামান্য হুইস্কি চেখে যেতে পারো; কারণ যে নেশা বেঁধে রাখে না, তার স্বাদ নেহাত মন্দ নয়।
- আপনিআপনি
- আমিই। আমিই তুমি । নিমু তান্ত্রিক ভবিষ্যৎ থেকে আমায় তুলে আনলে তোমায় বোঝাতে। এবং তুমি দিব্যি বুঝেছ হে। আমারও দিন ফুরলো; মরার আগে নিমু তান্ত্রিক এই পেগ মদ চাখিয়ে নিলেন; তাঁকে সেবা করার জন্য সামান্য বখশিশ আর কী। থ্যাঙ্ক ইউ অমিয়, চিয়ার্স।
- চিয়ার্স অমিয়বাবু।

বৃদ্ধ গেলাসে তৃপ্তির চুমুক দিলেন।

সামনে বসে থাকে বৃদ্ধের দিকে মাথা নাড়িয়ে চিয়ার্স বললাম বটে, কিন্তু বোতলটা বেঞ্চির তলায় গড়িয়ে দিতেই তা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বেশ বুঝতে পারছিলাম মাথার ঝিম ভাবটা কেটে যাচ্ছে, মুখের হুইস্কি-তেতো ভাবটা উবে গিয়ে চরণামৃতর স্বাদ টের পাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হল আমার ওই ছাইপাঁশের দরকার এবারে ফুরিয়েছে। বৃদ্ধ অমিয় হালদারের গেলাসের মদ শেষ হতেই ভদ্রলোক ওয়েটিং রুমের পশ্চিমের কোণের অন্ধকারে ফের মিশে গেলেন।

আমিও সেই ভ্যাঁপসা ওয়েটিং রুম থেকে বেরিয়ে প্ল্যাটফর্মে বেরিয়ে এলাম; ঝাঝা স্টেশনের বুক স্টলে বিভূতিভূষণ বা শরদিন্দুর বই পাওয়া যাবে কি?

Thursday, November 14, 2019

খোকার ভিটেমাটি





























- বলছিলাম খোকা, একটা অসুবিধে দেখা দিয়েছে।
- কী কেস বাবা?
- কিছুদিন আগে কৈকেয়ীকে মুখ ফসকে একটা বর কমিট করে ফেলেছিলাম..
- মেজমা ফের বিয়ে করবেন? সে কী! ভরত ভেঙে পড়বে যে।          
- আহা তা নয়, তা নয়। অন্য বর। গ্রান্টিং উইশ আর কী।
- ওহ হো। যাক, বড় চিন্তায় পড়ে গেসলাম।
- সে বর হলেই ভালো হত বাপ। বরে চিন্তা বাড়বে বই কমবে না।
- যত বয়স বাড়ছে তত আপনার হেঁয়ালি করার অভ্যাসটা মেনাসিং হয়ে উঠছে। যা হোক, খুলেই বলুন।
- হ্যাঁ মানে, তোমার রাজ্যাভিষেকটা বোধ করি।একটু উইথহোল্ড করতে হবে।
- কেন? পঞ্জিকা দেখে কোনো অসুবিধে ঠাহর হচ্ছে? আপনার নামে কোনো পৈতে বা মুখেভাত  বা গৃহপ্রবেশের নিমন্ত্রণ এসে পড়েছে?
- আহা তা নয়। শুধু...শুধু তোমায় একবার কিছুদিনের জন্য বনে যেতে হবে।
- ক্যাম্পিং? রাজ্যাভিষেকের আগে আউটবাউন্ড ট্রেনিং? মেজমার ইচ্ছে? সে তো ভালো কথা। 'দিন ধরে আমিও ভাবছিলাম যে একটু ফ্রেশ এয়ার হলে মন্দ হয় না।
- কতকটা তাই। তবে..
- লক্ষ্মণ আমার সঙ্গে যাবে কিন্তু। আমার আবার শোওয়ার আগে দু'দান দাবা না খেললে মন বসে না।
- বেশ তো। হবে'খন। সে যাবে না হয়।
- আর সীতাও সঙ্গে চলুক। এখানে বসে কীই বা করবে। ক্যাম্পে গিয়ে না হয় হপ্তাদুই হাওয়া খেয়ে আসবে। এমনিতেও অযোধ্যায় যা পলিউশন যা বেড়েছে, রাস্তায় রথের সংখ্যা এখুনি রেগুলেট না করলে ফাঁপরে পড়বেন ; এই বলে রাখলাম।
- সীতামা গেলেও আমার আর আপত্তি কী। শুধু ক্যাম্পিংটা দু'হপ্তার একটু বেশিই করতে হবে৷ মানে, কৈকেয়ীর তেমনই ইচ্ছে।
- তিন হপ্তা?
- তিন হপ্তা ঠিক নয়...ওই ধরো চোদ্দ...
- ফোর্টিন উইকস?
- ফোর্টিন। ইয়েস। তবে, হপ্তা নয়। বছর।
- চোদ্দ বছর?
- কৈকেয়ী তাই চাইছে।
- বোঝো কাণ্ড।
- খোকা, রিয়েলি ভেরি সরি।
- বাবা, এর জন্যে সরি বলবে?
- তোর জীবনের চোদ্দটা বছর...
- তা'তে কী? ভেসে তো যাচ্ছি না বাবা।
- আমি ভাবছিলাম কৈকেয়ীকে বলে কয়ে..
- কথার খেলাপ! সে কী তোমায় মানায় বাবা?
- কিন্তু খোকা..
- না বাবা। তুমি আটকিও না আমায়। এই 'দিনই তো, ঘুরেই আসিনা। বেশ হবে।
- তোর জন্ম এখানে, ভিটেমাটি এখানে, তোর ফ্যান ফলোয়ার সব এখানে.. এদের ছেড়ে এদ্দিনের জন্য তোকে দূরে ঠেলে দিই কী ভাবে খোকা..
- জন্ম, ভিটেমাটি আঁকড়ে থাকাটাই সব হল বাবা? আমার চিন্তাভাবনাকে এত ঠুনকো মনে করো তুমি? না বাবা, মেজমার মনে 'টুকুর জন্য দুঃখ দেওয়ার মত পলিটিক্স এখনও আমি আয়ত্ত করতে পারিনি।
- কিন্তু ওই ওরা...ওরা যে রেগে আগুন হয়ে উঠেবে...তারপর কিছু একটা অনর্থ ঘটলে সে দায় যে আমাকেই নিতে হবে..
- ওরা বলতে আমার ফ্যানক্লাব আর ফলোয়াররা?
- হ্যাঁ, তুই ভিটে ছাড়লে ওরা যে ভেঙে পড়বে।
- মনখারাপ হয়ত হবে, কিন্তু ভেঙে পড়বে কেন? আমি নিজেই মনের আনন্দে বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ছি যে। আর আমি যখন পারছি..আমার ফ্যান-ফলোয়ারদেরই বা অত ঠুনকো ভাবছ কেন বাবা? তোমার ভারী অন্যায়।
- খোকা রে, তুই যে কত বড় হয়ে গেছিস... রাজ্য, ভিটেমাটি 'সবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনিসপত্রে তোকে বেঁধে রাখার ক্ষমতা আমার সত্যিই নেই।
- আমার ফ্যান-ফলোয়ারদেরও কোনো অংশে কম ভেবোনা যেন বাবা। ধৈর্য, ত্যাগ ভালোবাসায় তাঁরা যেন তোমার খোকার চেয়েও বড় হতে পারে; সেই আশীর্বাদই কোরো, কেমন? যাই, মেজমার শুনেছি গতকাল নারকোল নাড়ু বানিয়েছে। ভরত আপাতত রাজ্যের হ্যাপা সামলাক কিছু বছর৷ আমি বরং তাঁকে ফাঁকি দিয়ে মেজমার নাড়ুর ডিবেগুলো বগলদাবা করে সরে পড়ব ভাবছি। প্ল্যানটা বেশ ডিলাগ্র‍্যান্ডি, তাই না বাবা?
(ছবিটি জাগরণ জংশন ডট কম থেকে সংগৃহীত)