Thursday, February 28, 2019

চিলেকোঠা কনভেনশন


- তুই পারলি কী করে রে বিলু? তোর পিসির ছাদে রাখা বয়াম থেকে চালতার আচার চুরি করতে গিয়ে নন্তু ধরা পড়ল। তুইই পাকড়াও করলি। তা বেশ করেছিস, গীতায় বলেছে ছাদের আচার রক্ষা করতে গিয়ে বন্ধুদের শায়েস্তা করা যেতেই পারে। নিজের পিসির আচার প্রটেক্ট করেছিস, আপত্তির কিছু নয়। সে অধিকার তোর আছে। কিন্তু তাই বলে যে'টুকু আচার নন্তু হাতে খাবলে নিয়েছিল, সে'টাও ওকে ফেরত দিতে বাধ্য করলি? আচার আক্রমণ করতে গিয়ে বন্দী হয়েছে, তাই বলে এমন ইনসাল্ট? আর তার চেয়েও বড় কথা..সে খবরটা তুই নন্তুর মেজকার কানে তুলতে গেলি রে?

- আমার কোনো উপায় ছিল না পুলুদা। পিসি এমন কড়া সুরে বললে...।

- শাট আপ! অক্টোবরে চিলেকোঠা কনভেনশনে স্পষ্ট বলা আছে আচার এবং আম চুরি অভিযানে কেউ বন্দী হলে তাকে অকুস্থল থেকে বের করে দেওয়া হবে ঠিকই কিন্তু তার হাত থেকে আচার বা আম কেড়ে নেওয়া কিছুতেই চলবে না। আর গার্জেনের কাছে কম্পলেইন তো নৈবচ। চিলেকোঠা কনভেনশনের কাগজে পাড়ার আরো চুয়ান্নটা ছেলের সঙ্গে তুই সই করিসনি? সেই চিলেকোঠা কনভেনশনের ডেক্লারেশনের প্রিয়াম্বেলে কি স্পষ্ট ভাবে লেখা ছিল না যে পাড়ার সীমানার মধ্যে কেউ সেই ডেক্লারেশনের বেয়াল্লিশটা ক্লজের খেলাপ করবে না? ক্লজ নম্বর তিনের সাবসেকশন ছয় বেমালুম ভুলে মেরে দিলি রে ব্যাটা কুইসলিং?

- মানছি ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু সে'টা পিসির চাপে বাধ্য হয়ে। তুমি আমার পিসিকে চেনো না পুলুদা! আমার বাবা অমন জাঁদরেল উকিল, কিন্তু পিসি একবার 'ভোম্বল' বলে ডাকলেই বাবা লেবুজল ভেজানো গলায় মিউমিউ করেন।

- চাপ সবারই থাকে চাঁদু। নন্তুর চাপ নেই? নন্তুর ওই মেগা-অসুর মার্কা মেজকার কাছে জ্যামিতি শেখে; রোজ এক ঘণ্টা করে। সেই এক এক ঘণ্টা এক একটা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মত। কিন্তু তাই বলে চিলেকোঠা কনভেনশনকে কাঁচকলা দেখাবে সে? আর আমি সে'টা হতে দেব ভেবেছিস? আমাকে কি সাধে কেউ কেউ ইউএন-দাদা বলে ডাকে রে? আমার দায়িত্বজ্ঞান নেই?

- তুমি ইউএন? ছাই! তুমি নিজের ধান্দায় থাকো, যে তোমায় তেল দেবে তুমি তারই দলে।  নন্তু নিশ্চয়ই তোমায় হাত করেছে।

- শাট আপ বিলু! শাট আপ! কনভেনশন ডকে তুলে আবার গলাবাজি? তুই জানিস কনভেনশনের অ্যানেক্সচার থেকে সতেরো নম্বর ক্লজ ইনভোক করে আমি তোকে আগামী এক মাসের জন্য পাড়ার ক্রিকেট টীম থেকে বের করে দিতে পারি? সে'সব স্যাংশন ঘাড়ে চাপলে তোর কী দশা হবে ভেবেছিস?

- পুলুদা! পুলুদা গো। এ'বারের মত ম্যানেজ করে দাও প্লীজ। প্লীজ। সবে ব্যাট হাতে একটু ফর্মে এসেছি। ম্যানেজ দাও, প্লীজ।

- ম্যানেজ করব? বাহ্, সে'টাই করি আর কী; ম্যানেজ। আজ তুই এ'টা করলি, কাল কেউ চিলেকোঠা কনভেনশনের বাইশ নম্বর ক্লজ লঙ্ঘন করে অন্যের প্রেমিকাকে গোপন চিঠি দেবে। পরশু কেউ উনচল্লিশ নম্বর ক্লজকে পাশ কাটিয়ে পাশের পাড়ার ছেলেদের পিকনিকে চাঁদা দিয়ে মাংস ভাত খেতে যাবে হ্যাংলাচন্দ্র হয়ে। গোটা পাড়া গোল্লায় যাক আর এ'দিকে আমি বসে ম্যানেজ করি। তাই না?

- পুলুদা! গত ম্যাচেই হাফ সেঞ্চুরি করেছি, এমতাবস্থায় আমায় বাদ দেবে? তাও ওই নন্তুর জন্য? নন্তু যে তোমার নামে কেচ্ছা রটায় পুলুদা। সেদিনের ম্যাচে তুমি ক্যাচ ফেলার পর কী বলছিল জানো ব্যাটা নন্তু? বলে পুলুদার নাম ইউএন কেন? কারণ সে ইউজলেস নিনকমপুপ। আর তাই শুনে সবার সে কী অট্টহাসি। আমি শুধু মুখ গোমড়া করে এককোণে বসেছিলাম। মা কালী বলছি।

- চিলেকোঠা কনভেনশনের  বেয়াল্লিশ নম্বর ক্লজটা নন্তু ভুলে গেছে বোধ হয়। পুলু মল্লিকের কথাই শেষ কথা।  তোকে একটা চান্স আমি দেবো! কিন্তু একটা শর্তে। তোর পিসির চালতার আচার দু'শো গ্রাম আমার চাই। পারবি?

- খুব পারব।

- বেশ তা'হলে স্যাংশন মাফ। কিন্তু আচার ট্রান্সফার ঘটবে গোপনে। মিডিয়ায় বাইট দিয়ে ব্যাপারটা ছড়িয়ে ফেলো না যেন বিলুকুমার। যাক গে! আমি যাই এখন, নন্তুর মেজকার কাছে গোপনে নন্তুর বিড়ি খাওয়া নিয়ে একটা গুজব ট্রান্সফার করতে হবে।

Tuesday, February 26, 2019

যুদ্ধটুদ্ধ


কিছু বই শুরু করে ফাঁপরে পড়তে হয়। এই যেমন উইলিয়াম শিরার সাহেবের লেখা দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ থার্ড রাইখ; আ হিস্ট্রি অফ নাজি জার্মানি। এ মলাট থেকে ও মলাটের মধ্যে অর্ধেক রাশিয়া ঢুকে যায়; এমন সাইজ সে বইয়ের। বইয়ের এক-চতুর্থাংশই পড়া হয়েছে, কাজেই এ বই সম্বন্ধে বিশদভাবে লেখা মুশকিল। শিরার সাহেবের একটা গোলমেলে দিক হচ্ছে তিনি বেশ সোজাসুজি ভাবে হোমোসেক্সুয়ালিটির বিরুদ্ধে; তাঁর লেখায় সে বায়াসের আভাস মাঝেমধ্যে ফুটে উঠেছে। তবে বইয়ের গুরুত্ব অন্য জায়গায়, নাৎসি জার্মানীর শুরুর দিনগুলো থেকে  দুর্দান্ত ডিটেলে লেখা হয়েছে, কোট করা হয়েছে প্রচুর জরুরী দলিল দস্তাবেজ এবং কাগজপত্র। আগ্রহীদের জন্য এ বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

যতটুকু পড়েছি, তা'তে দু'টো ব্যাপার বেশ ইন্টারেস্টিং।

এক নম্বর।
যুদ্ধ থেকে যেনতেন প্রকারেণ গা বাঁচাতে গিয়ে অনেক সময় অনেক দেশ এবং নেতা আরো ভয়াবহ বিপদ এবং খুনোখুনির অন্ধকার ডেকে এনেছেন। ভার্সেই চুক্তিকে হেলায় পাশ কাটিয়ে যখন নাৎসিবাহিনী রাইনল্যান্ডে ঢুকে পড়ে, তখন নাকি জার্মানি কিছুতেই পালটা আঘাত হজম করার পরিস্থিতিতে ছিল না। কিন্তু যুদ্ধবিগ্রহের ঝামেলা থেকে গা বাঁচাতে চুপটি করে বসে রইল ফ্রান্স। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিনও স্পীকটি নট। সে'ভাবেই বেদখল হল অস্ট্রিয়া। এরপর হিটলারের দুঃসাহস আরো মজবুত হল, নজর গিয়ে পড়ল চেকোস্লোভাকিয়ার ওপর। গায়ে পড়া ভালোমানুষির নেশায় চেম্বারলিন সাহেব উঠেপড়ে লাগলেন হিটলারকে তোয়াজ করে যুদ্ধ আটকাতে। প্রায় নিজেই মধ্যস্ততা করে অসহায় চেকোস্লোভাকিয়াকে হিটলারের শ্রীচরণে নিবেদন করলেন, ফের চুপ থাকলে ফ্রান্স। ইতিহাস বলছে তখনও যদি হিটলারকে সম্মুখসমরে আটকানো হত; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দিব্যি রুখে দেওয়া যেত। কাজেই  যুদ্ধের কথা শুনলেই কানে তুলো গুঁজতে হলে মুশকিল; চেম্বারলিন সাহেব তা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলেন।

দু'নম্বর।
যুদ্ধ ভয়াবহই। আত্মরক্ষার খাতিরে যুদ্ধের প্রয়োজন পড়ে, তেমনই দেশের সেনাবাহিনীর প্রয়োজন দেশের এবং দশের সমর্থন; নয়ত তারা প্রাণপণ লড়বেন কী'ভাবে? কিন্তু এই প্রয়োজনের খাতিরে যুদ্ধ ও তার সমর্থন যাতে যুদ্ধ-যুদ্ধ নেশার উদ্রেক না করে, সে ব্যাপারে সচেতন হওয়াও জরুরী।  সামরিক প্রয়োজন অতি সহজে সামরিক জিগিরে পরিণত হতে পারে; ইতিহাসে তার অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। সে জিগির যে কী খতরনাক হতে পারে তা টের পেয়েছিল জার্মানরা। প্রয়োজনের যুদ্ধ অচিরেই পরিণত হয়েছিল খুনে আগ্রাসী হুঙ্কারে।  প্রসঙ্গত,  মহাভারতে কৃষ্ণ বলেছেন প্রয়োজনে যুদ্ধ করতেই হবে। কিন্তু যুদ্ধ যে ফুর্তি আর সেলিব্রেশনের ব্যাপার; তেমন কোনো হিন্ট তিনি সম্ভবত ড্রপ করেননি।

যা হোক, এ বইটা শেষ করা দরকার। যে গতিতে পড়ছি (শুনছি), মার্চের আগে শেষ করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।

Saturday, February 23, 2019

বটু গোয়েন্দার বিশ্বাসঘাতকতা


- কী ব্যাপার? আপনি জেল পর্যন্ত ছুটে এলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে? এখন বোধ হয় কাটা ঘায়ে নুন ছড়াতে এসেছেন। তাই না বটুবাবু?

- না সামন্তবাবু।

- আমি আপনার সঙ্গে আর দেখা করতে চাইনা। আপনি আসুন।

- আমাদের আরো মিনিট পাঁচেক সময় আছে। থাকুন না, তারপর না হয়ে সেলে যাবেন। দু'টো কথা ছিল। দারোগাবাবুকে অনেক রিকুয়েস্ট করে আপনার সঙ্গে দেখা করতে হয়েছে।

- আপনি একজন অপদার্থ বটু গোয়েন্দা! আপনি একটা কাগুজে বাঘ। আপনাকে ভরসা করে যে আমি কী ভুল করেছি...।

- আই অ্যাম সরি মিস্টার সামন্ত।

- সরি? সরি বলে কী হবে? দেখুন, এই যে। আমার হাতে হাতকড়া।  আমি নিজের ছেলের খুনের দায়ে জেলে এসেছি। নিজের অসহায় হুইলচেয়ারে আটক ছেলেটা চোখের সামনে  মরে গেল, ট্রাকটা ওকে পিষে দিল...আর সবাই ভাবল আমিই...। ছিঃ! জেলে পচতে কষ্ট নেই, কিন্তু এ ভার নিয়ে বাঁচব কী করে বটুবাবু? আর আমার দুরাশা দেখুন। আমি আপনার ওপর ভরসা করেছিলাম।

- আমি জানি যারা আপনাকে হুইলচেয়ারকে ট্রাকের সামনে ঠেলতে দেখেছিল তাঁরা ভুল বলছিল। আমি জানি সামন্তবাবু।

- থামুন! আপনার জানায় আমার লাভটা কী হল? প্রমাণ করতে পারলেন না। অথচ আপনি নাকি ধন্বন্তরি! আপনি একটা ভণ্ড বাতেলাবাজ শুধু।

- আমি সত্যিই দুঃখিত সামন্তবাবু। ঘটনার তিনজন সাক্ষী বলেছে যে তাঁরা দেখেছে যে আপনি আপনার ছেলের হুইলচেয়ার চলন্ত  ট্রাকের চাকার সামনে ঠেলে দিচ্ছেন। অথচ আপনি আদতে হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়ে রিফ্লেক্সে বাবলুর হুইলচেয়ার ধরতে গিয়ে তা হাত ফস্কে তা ঠেলে দেন, দূর থেকে দেখে যাই মনে হোক; তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত।

- এ'টা আমি জানি। আর কেউ তা জানে না। তারা শুধু জানে আমি আমার পঙ্গু ছেলের দায়ভার থেকে মুক্তি পেতে চাওয়া একজন জানোয়ার। আপনার কাজ ছিল সে'টা ভুল প্রমাণ করার। সে'দিন আমি রাস্তার শ্যাওলায় পিছলে গেছিলাম...। বার বার বলেছি।

- অথচ আপনার সে'দিন পরা জুতোর সোলে শ্যাওলার সামান্য দাগটুকুও নেই।

- আর কতবার বলব আমি জানিনা তা কেন নেই...। তাই তো আমি আপনাকে এনগেজ করেছিলাম বটুবাবু! আমি ভুল করেছিলাম...আমি বুঝিনি যে আপনি পারবে না!

- এ'টুকু অন্তত বুঝেছি যে আপনার জুতোর তল থেকে শ্যাওলা পরিষ্কার করে সে জুতো ফের রাস্তায় ঘষে নেওয়া হয়েছিল। প্রমাণ এ'দিক ও'দিক করে আপনাকে ফাঁসানো হয়েছে।

- মানে? হোয়াট ডু ইউ মীন? এ'সব এখন কী বলছেন?

- আপনার জুতো থেকে শ্যাওলার দাগ তুলে ফেলে রাস্তার পিচে ফের ঘষে নিয়েছেন কেউ। দুর্ঘটনা ঘটে বিনোদ দত্ত স্ট্রিটে; সেখানে সদ্য সারাইয়ের কাজ হয়েছে, সে রাস্তার বিটুমেন এখনও সামান্য তাজা। দুর্ঘটনার পর সেই স্পট থেকেই আপনি সোজা অ্যাম্বুলেন্সে করে আপনার বাড়ির বাঁধানো উঠোনে এসে নামেন। ফেরার পর থেকে আর সে জুতো পরেননি। অথচ আপনার জুতো সোলে শ্যাওলার দাগ তো নেই বরং বিনোদ দত্ত স্ট্রিটের তাজা বিটুমেনের ওপর বহু পুরনো বিটুমেনের ছোঁয়া। অর্থাৎ কেউ সাবধানে আপনার জুতোর তল থেকে শ্যাওলা সাফ করে তা রাস্তায় ঘষে নিয়েছে, যাতে মনে হয় আপনি শ্যাওলায় পা ফেলেননি আদৌ।

- মাই গড বটুবাবু! এ'সব আপনি এখন কেন বলছেন? আপনি জানেন কে এমন করেছে? আমার এমন সর্বনাশ কে চাইতে পারে?

- সামন্তবাবু, বাবলুর রক্তাক্ত দেহটা আপনি তার মায়ের কোলে তুলে দিয়েছিলেন। বাবলুর রক্ত মাখা সে শাড়ি মিসেস সামন্ত যত্নে তুলে রেখেছেন। কিন্তু সে শাড়ি আপাতত কিছুদিন আমি নিজের হেপাজতে রেখেছি।

- আপনি কী পাগলের প্রলাপ বকছেন আমি কিছুই...।

- সে শাড়ির পরিষ্কার দিক দিয়েই দিয়েই মিসেস সামন্ত আপনার জুতোর সোল থেকে শ্যাওলা মুছেছেন। সে দাগ আমার নজরে পড়েছে, আর পুলিশ যাতে সে শাড়ি নিয়ে গবেষণা শুরু না করে তার জন্যই তা আমি সরিয়ে নিজের কাছে রেখেছি কিছুদিন। জুতোর তলার বিটুমেন আর ধুলো দিয়েও আমি প্রমাণ করে দিতে পারতাম মিসেস সামন্তর অপরাধ।

- মিনু! শেষ পর্যন্ত মিনু...।

- সরি সামন্তবাবু, মক্কেলের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে না পারা আমার কাছে যন্ত্রণার। কিন্তু বাবলুকে আপনি ট্রাকের তলে ঠেলে না দিলেও খুন আপনি করেছেন। আপনার শাস্তিটা দরকারি ছিল, অন্তত মিসেস সামন্ত তা'তে খানিকটা শান্তি পাবেন।

- এ'সব কী? কেন? মিনু এমন কেন করতে গেল?

- আমেরিকায় বারো বছর কাটিয়ে ফিরেছিলেন আপনি মিস্টার সামন্ত। সে'খানেই আপনি ভিড়ে যান অ্যান্টি-ভ্যাক্স ব্রিগেডে। মিসেস সামন্তর কাকুতিমিনতি সত্ত্বেও আপনি বাবলুকে পোলিওর টীকা নিতে দেননি। বাবলুর তো সে'দিন হুইলচেয়ারে থাকারই কথা নয় মিস্টার সামন্ত। তাকে ঠেলে ট্রাকের তলে আপনি পাঠাননি, কিন্তু বাবলুর খুনের দায় যে আপনাকে নিতেই হবে মিস্টার সামন্ত। আই অ্যাম সরি, কিন্তু এ'টা আমায় করতেই হত।

- বটুবাবু...প্লীজ...।

- আমি আজ আসি।

অস্ত্র


- মহারাজ!

- সঙের মত দাঁড়িয়ে না থেকে খবরটা বলো!

- ওদের অ্যান্টিডোট...।

- তা'তে কী? সে অ্যান্টিডোটে কী হয়েছে মন্ত্রী?

- আমাদের যন্তরমন্তর ঘরের জাদুর প্রভাব কাটিয়ে দেওয়া যাচ্ছে তা'তে!

- বটে?

- আজ্ঞে!

- এ তোমার মনের ভুল নয়ত?

- হাজার হাজার শ্রমিক চাষি গরীব প্রজা জটলা পাকাচ্ছে মহারাজ। এক দু'দিনের মধ্যেই হয়ত কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে...। সেনাবাহিনীর মধ্যেও অসন্তোষ।  কাজেই...।

- বৈজ্ঞানিক কী বলছে?

- সে পালিয়েছে!

- তার ব্যবস্থা আমি করব। তার চামড়া তুলে গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে ভাজাভাজা না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। কিন্তু তার আগে বজ্জাত প্রজাগুলোর একটা ব্যবস্থা করতেই হয়।

- যন্তরমন্তর ঘরই যখন বিকল তখন আর উপায় কী!

- থামো! যত ন্যাকাচন্দ্রের দল জুটেছে মন্ত্রীসভায়। প্রজাদের ওপর আদত অস্ত্র প্রয়োগ করার সময় এসেছে।

- আজ্ঞে?

- নেকু সেজে থেকো না। আদত অস্ত্র। যার কাছে যন্তরমন্তর ফিকে।

- আদত অস্ত্র!

- বুঝেছ তা'হলে।

- মহারাজ! এ যে যন্তরমন্তরের চেয়েও পাশবিক।  মহারাজ, একটিবার ভেবে দেখুন...।

- তুমি চাও আমি তোমায় কোতল করি?

- মাফ করুন রাজন, কিন্তু..।

- কোনো কিন্তু নেই...কালেই দেশের সমস্ত ঘরে টেলিভিশনে পৌঁছে দাও, পৌঁছে দাও আমাদের নিউজচ্যানেল; আমাদের আদত অস্ত্র!

Tuesday, February 19, 2019

কাশ্মীরি পরোটা

প্রবল দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। আর মাঝেমধ্যেই মাথার মধ্যে ভাবনাচিন্তা উঁকি দিচ্ছে, সে’ ব্যাপারটা মোটে অভিপ্রেত নয়। অফিস যাওয়া, বাড়ি ফেরা, খাওয়াদাওয়া, হ্যাহ্যা, নেটফ্লিক্স, সোফা, বই; এর বাইরে কোনো চিন্তা মগজে ঘোরাফেরা করলেই ভয় হয়; বখে যাচ্ছি না তো?

এই যেমন সকালে পরোটা আর আলুচচ্চড়ি চেবানোর সময় মোবাইলে দেখলাম সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম কাশ্মীরীদের বয়কট করার দাবীতে। কোথাও আবার তাদের ওপর আক্রমণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এগুলো কি গুজব? হতে পারে; আজকাল অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে সুপ্রিম কোর্ট বা মা মাথায় গাঁট্টা মেরে না বললে কোনো কিছুই মেনে নিতে মন সরে না। তবে এর সামান্য অংশও যদি সত্যি হয় তা’হলে ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে খুব গোলমেলে; অন্যায়ও বটে।

এতটুকু ভেবেই পরোটা চেবানো থামালাম। মাথায় একটা চিন্তা এসেছে; কাজেই টুক করে সে’টা সোশ্যাল মিডিয়াতে যদি না লিখি তবে সে চিন্তা ভূত হয়ে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাবে।  সাতপাঁচ ভেবেই একটা হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপে লিখেছিলাম; খামোখা কাউকে পেটানো বা কেউ অমুক এলাকার মানুষ বলেই তাকে বয়কট করব – ব্যাপারটা নেহাত সরেস নয়। আমি বাঙালি বলেই কেউ যখন আমায় আলসে বলে তখন গায়ে একটু চিড়বিড় করে বইকি (ব্যক্তিগত লেভেলে আমি আলসে হতে পারি, তাই বলে ‘বাঙালি’ বলে খোঁটা দেবে? স্যাট করে সোফা থেকে দু’টো সঞ্জীবের লাইন ছুঁড়ে প্রতিবাদ করব না?)।

হোয়্যাটস্যাপে বন্ধুদের একটা গ্রুপে লিখে ফেললাম; “কাশ্মীরিদের গণ-বয়কট বা মারধোর করা অনুচিত”।  
ট্যাং করে এক বন্ধুর উত্তর এলো;
“দেশের কথা ভাববি কেন রে? তোকে তো আগে সেকু ভাব দেখাতে হবে”।
দেশ, সেকু এ’সব প্রসঙ্গ এসে পড়ায় নড়েচড়ে বসতে হল। দেড়খানা পরোটা প্লেটেই পড়ে রইল; আমি হোয়্যাটস্যাপে মন দিলাম।
বললাম;
“দেশের আবার কী হল। কাশ্মীরিদের দেখলেই রেগে উঠতে হবে কেন”?
ফটাশ করে উত্তর এলো;
“তোকে তো গিয়ে জঙ্গিদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয় না! তুই এ’সব কথা বলতেই পারিস”।
মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেল; মিইয়ে গেল পরোটা, তিতকুটে হল চচ্চড়ি।
প্রমোশন ইনক্রিমেন্ট নিয়ে রগড়ে থাকা ধান্দাবাজ চাকুরে মানুষ। কাশ্মীরিদের ভালোমন্দ নিয়ে চিন্তা গেল গুবলেট হয়ে। ঝাঁপিয়ে পড়ে বললাম;
“আহ্‌, এতে সেনা আর দেশের কথা এলো কেন। দেশের আমি, দশের আমি। আমি তো দেশের পক্ষেই রে ভাই। শুধু বলছিলাম...”।
কিন্তু ততক্ষণে ঘুড়ি সুতো ছিঁড়ে গেছে উড়ে আর লাটাই লটকে ছাতে।
“তুই কী বলতে চেয়েছিস সে’টা আমি বুঝিনি ভাবছিস”?, হাড়হিম করা উত্তর।
“না না, ও মা”, মনে হল আক্রমণের চেয়ে কাকুতিমিনতিতে বেশি কাজ হবে, “বিশ্বাস কর ভাই আমি গোলমেলে কিচ্ছু বোঝাতে যাইনি”।
“তোদের মত লোকের জন্যই আজ দেশের এমন বিপদ। তোদের জন্যই আজ শত্রুরা লাই পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠে কিতকিত খেলছে। তুই মনে মনে এ’টাই তো চাস, যে ভারতের মাথা খেয়ে পাকিস্তান চাঙ্গা হোক। সে’টা চাইলেই তো তুই নিজেকে ইন্টেলেকচুয়াল বলে প্রমাণ করতে পারবি”।
“সর্বনাশ! না না না ! আমি আদৌ তা বলিনি বা বলতে চাইনি”।
“তোকে তো শত্রুর আরডিএক্স হজম করতে হয় না। বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে পা দোলাবি আর বড় বড় বাতেলা ঝাড়বি দেশের বিরুদ্ধে”।
“আরে আমি শুধু বলতে চেয়েছি...”।
“সব বুঝি। সব বুঝি। ছিঃ”।

“ছিঃ”খানা হোয়াটস্যাপ থেকে উঠে এসে বুকে অ্যাসিডিটি হয়ে ঝরে পড়ল। বলতে ইচ্ছে হল “আমি শুধু বলেছি যে কাশ্মীরিদের গণ-বয়কট বা মারধোর করা অনুচিত”। এ’টার মধ্যে দিও কোনো হাতিঘোড়া চিন্তা পাচার করতে চাইনি, বন্ধুটিকে এ’টাও বলা হল না যে “হাতের কাছে কাশ্মীরি পেলে তুইও অকারণ তাঁর গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে যাবি না কারণ তুই উন্মাদ নোস”।
তবে প্লেটে যেহেতু দেড়খানা পরোটা আর পেটে সামান্য খিদে তখনও অবশিষ্ট ছিল, তাই আর কমনসেন্স নিয়ে বেশি ফেরেব্বাজি না করাটাই সমীচীন মনে হল। মিষ্টি করে বললাম;
“থাক না ভাই এ’সব কাশ্মীর দেশ আর আরডিএক্স। তার চেয়ে বরং চ’ একদিন একটু অলিপাবে ঘুরে আসি। কদ্দিন ভালো করে আড্ডা দেওয়া হয় না। কী বলিস”?
অমনি সে বন্ধুর রাগ গলে জল আর ক্ষোভ ফুড়ুৎ করে হাওয়া।
আমাদের প্লেটে পরোটা, উইকেন্ডে মদ আর মেজাজে ‘এনটাইটেলমেন্ট’ যদ্দিন আছে;  কোনো চিন্তা নেই।