Saturday, January 26, 2019

লস্ট বয় অফ সুদান


এ বই ছাব্বিশে জানুয়ারি পড়া শেষ হল, সে'টা একটা উপরি পাওনা।

১৯৯০। দক্ষিণ সুদানের এক প্রত্যন্ত গ্রাম; কিমটং।  বিজলিবাতি বা গাড়িঘোড়া বা স্কুল সে গ্রামে ছিল না; শুধু এ'টুকু বললে সে গাঁয়ের অন্ধকার সঠিকভাবে বোঝানো সম্ভব নয়। আসলে আমি কোনো কিছু বললেই সে পৃথিবীর যন্ত্রণাগুলো যথাযথ ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারব না। তার জন্য লোপেজের আত্মজীবনী 'রানিং ফর মাই লাইফ' পড়া ছাড়া গতি নেই।

ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে তখন সুদান তছনছ; লোপেপে (ভালো নাম; লোপেজ লোমং)  নামে ছ'বছরের এক শিশু কিমটং গ্রামের গীর্জা থেকে অপহৃত হয়। লোপেপে একা নয়, প্রতিদিন বহুসংখ্যক শিশুদের তুলে নিয়ে যেত যুযুধান সেনারা। যে পাশবিক পরিস্থিতিতে সেই অপহৃত শিশু ও কিশোরদের রাখা হত, তা'তে অনেকেই মারা যেত অত্যাচার ও অনাহার সহ্য করতে না পেরে। যাদের মধ্যে বেঁচে থাকার দুঃসাহস ও অমানবিক তাগদ থাকত; তাদের জোর করে ভর্তি করা হত সৈন্য হিসেবে। উইকিপিডিয়ায় 'লস্ট বয়েজ অফ সুদান' সার্চ করলে সে বিষয়ে কিছুটা জানা যায়। বাপ-মায়ের কোল থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল লোপেপেকে। তখন সে দুধের শিশু, বন্দী অবস্থার অকথ্য অত্যাচার সহ্য করে তার বেঁচে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু বরাত জোরে সে পালিয়ে বাঁচে।

লোপেপে সীমানা পেরিয়ে এসে পৌঁছয় কেনিয়ার কাকুমা রিফিউজি শিবিরে। সে'খানে দশ বছর কাটায় লোপেপে। এই দশ বছরের যে বর্ণনা বইতে রেখেছেন লোপেজ লোমং, তা পড়ে শিউরে উঠতে হয়।  যুদ্ধবিধ্বস্ত আফ্রিকার যে ভয়াবহ ছবি তুলে ধরেছেন লোপেপে, তা যে কোনো পাঠককে বাধ্য করবে খাবারের প্রতিটি কণাকে বা সাধারণ প্যারাসেটামলের মত ওষুধকে অন্য মাত্রার সমীহ করতে। কেনিয়ার সেই শরণার্থী শিবিরে লোপেপেদের দিনে একবারের বেশি খাওয়া জুটত না, তাও আধপেটা। রিফিউজি, তাই শিবিরের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করার অনুমতিও ছিল না তাঁদের। হপ্তায় একদিন তাঁরা দিনে দ্বিতীয় বারের জন্য খেতে পারত; কারণ সে'দিন শিবির সংলগ্ন ময়লার স্তুপে কাকুমার অন্য প্রান্ত থেকে উচ্ছিষ্ট,ফেলে দেওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার এনে ফেলা হত। সেই ময়লার স্তুপেও চলত কাড়াকাড়ি, হাতাহাতি।  আর পাশাপাশি ছিল মৃত্যু; লোকজনের মরে যাওয়াটা প্রায় এলেবেলে পর্যায়ের একটা ব্যাপার ছিল। বইয়ের প্রথম অংশ লোপেপের সেই সংগ্রামের; অবশ্য সে সময় বেঁচে থাকা ব্যাপারটাই লোপেপের কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদের মত ছিল। সে ধরেই নিয়েছিল বাপ মায়ের দেখা আর সে পাবে না। আর তার সমস্ত যন্ত্রণার মলম বলতে ছিল তিনটে ব্যাপার; ঈশ্বরে আস্থা, দৌড় আর ফুটবল।

বইয়ের পরের অধ্যায় লোপেপের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ছুটে যাওয়া নিয়ে। লোপেপে প্রথম অলিম্পিকের কথা শোনে পনেরো বছর বয়সে, প্রথম পাউরুটি চেখে দেখার সুযোগ পায় তারও পরে; যখন ভাগ্যের দুরন্ত মোচড়ে সে আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পায়। আমার খানিকটা মনে আছে প্রথমবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সময় লালমোহনের উচ্ছ্বাস। লোপেজ 'লোপেপে' লোমং; ষোলো বছর বয়সে বহু কাঞ্চনজঙ্ঘা উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে শুরু করে যখন সে প্রথম জানতে পারে পেট ভরে যাওয়া বলে একটা ব্যাপার থাকে, বাথরুম বলে একটা ব্যাপার আছে, আছে পরিষ্কার কাপরজামা পরার একটা নিশ্চিন্দি। লোপেপের চোখ দিয়ে চারপাশের সাধারণ জিনিসগুলো দেখতে শুরু করলে তাজ্জব বনে যেতে হয়। গত দু'দিন ধরে চানাচুরের একটা দানা প্লেটের বাইরে পড়লে লজ্জা হচ্ছে।এই লজ্জাটা শৌখিন এবং সাময়িক, সে'টাও স্বীকার করে নেওয়াই ভালো।

বইয়ের বাকি অংশ জুড়ে 'ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা' আর ফেলে আসা মাটির টান। লোপেপের লেখায় একটা সরল প্রশ্ন বার বার উঠে এসেছে; জন্মসূত্রে পাওয়া পদবীর মতই, জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্বের প্রতি আনুগত্যই দেশাত্মবোধের শেষ কথা হতে যাবে কেন? লোপেপের জীবন ও বেঁচে থাকা সম্পূর্ণ ভাবে পালটে যায় এক আমেরিকান দম্পতির স্নেহে; আমেরিকায়। লোপেপেও আমেরিকাকে ভালোবাসতে কসুর করেনি; আমেরিকাকে ততটাই আপন করে নিয়েছে যতটা একজন সাতপুরুষ পুরনো মার্কিনীর পক্ষে সম্ভব। লোপেপে যেমন আমেরিকার ছত্রছায়ায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে, হয়ে উঠেছে সে দেশের অন্যতম সেরা ট্র‍্যাক অ্যান্ড ফিল্ড অ্যাথলিট এবং বেজিং অলিম্পিকে মার্কিন পতাকাবাহক; আমেরিকাও ততটাই সমৃদ্ধ হয়েছে লোপেজ লোমংয়ের মত সুনাগরিক পেয়ে। নিজের পিতৃপরিচয়ের মতই, জন্মভূমি বেছে জন্ম নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের পছন্দসই দেশ বেছে নেওয়ার পথটা সরল নয় কেন? লোপেজ পেরেছেন, বেশিরভাগ 'লস্ট বয়েজ অফ সুদান' পারেনি।

লোপেজ নিজের ফেলে আসা জগতকে মনে রেখেছেন, স্মৃতি আগলে রেখেছেন; বার বার ফিরে গেছেন। দেখেছেন যুদ্ধ থামলেও সে'খানকার অবিশ্বাস্য অন্ধকার ফিকে হয়নি এতটুকু। সে'খানে আজও সামান্য পেনিসিলিনের অভাবে শয়ে শয়ে শিশু মারা যাচ্ছে, আজও স্কুল নেই। আশা নেই, স্বপ্নও নেই। নিজের জন্মভূমিতে সেই আশা ও স্বপ্ন পৌঁছে দেওয়ার ইচ্ছের কথা লিখেছেন লোপেজ, আর লিখেছেন আমেরিকার প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা। লোপেজের মত কিছু নিবেদিতপ্রাণ নাগরিক পেলে যে'কোনো দেশে বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে যাবেই। এ বই পড়ে মনে হয়, একদিন সমস্ত দেশের ইমিগ্রেশন পলিসি ঢেলে সাজানো হবে। একটা ফুটবল টীমের স্কাউটরা যে'ভাবে গোটা দুনিয়া চষে বেড়াতে পারে ভালো খেলোয়ার 'রিক্রুট' করতে, একটা দেশ আদর্শ নাগরিকদের খোঁজ করবে না কেন?

সবশেষে দু'টো কথা বলা দরকার।

এক, লোপেজের ঈশ্বর-বিশ্বাস। পাঠক নিজে ঈশ্বর-অবিশ্বাসী হতেই পারেন, কিন্তু লোপেজের ঈশ্বরকে অবিশ্বাস করা অসম্ভব।  মাঝেমধ্যে মনে হবে লোপেজ যেন দাদার কীর্তির কেদার আর ঈশ্বর হলেন ভোম্বলদা; মাঝেমধ্যে ফাঁপরে ফেললেও, উতরে তিনিই দেবেন।

দুই, অলিম্পিকে মেডেল জেতা হয়নি লোপেজের। তবে হেরে যাওয়া রেসের শেষে গেয়েছিলেন আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত, তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়েছিলেন খেলা দেখতে আসা প্রচুর মার্কিনী দর্শক। এই অভিজ্ঞতার কথাটা লোপেজের ভাষায় পড়া দরকার। (প্রসঙ্গত, আজ দেখলাম দীপা কর্মকারের বই বেরিয়েছে, দেখা যাক)।

'হেরে যাওয়া রেস' বললাম কি? লোপেপে হেরে যাওয়ার বান্দাই নন।

Friday, January 25, 2019

মুঝে ইয়াদ আতি হ্যায়



"...অপনে দেশ কি মিট্টি কি খুশবু
মুঝে ইয়াদ আতি হ্যায়
মুঝে ইয়াদ আতি হ্যায়
কভি বেহলাতি হ্যায়
কভি তড়পাতি হ্যায়
মুঝে ইয়াদ আতি হ্যায়"।

মাটির টান, দেশের টান, ফেলে আসা সময়ের টান; এ'সবের মিশেলে বোধ হয় এমন সুরই তৈরি হয়। আর গানের কথায় এত সহজে কী ভাবে যে মায়ের আদর আর সোঁদা গন্ধ মিশিয়ে দেওয়া যায়; তা জাভেদবাবুই জানেন। পতাকা, পার্লামেন্ট আর সিলেবাসের ইতিহাস; এ'সবের বাইরে যে দেশটুকু; এ গান একান্তভাবে সেই দেশের।

প্রত্যেকটা মানুষ নিজের মধ্যে যত্ন করে বয়ে নিয়ে চলে একটা দেশ; 'আমি-রিপাবলিক'-
কারুর কাছে সংবিধান বলতে মায়ের সাতপুরোনো গানের খাতা, আবার কারুর কাছে আয়নার এক কোণে সাঁটা লাল টিপ।
কারুর পতাকা বলতে শিব্রাম, কারুর দেরাজে যত্নে রাখা ফেরত-না-দেওয়া রুমাল।
কারুর মুক্তিযুদ্ধ লোকাল ট্রেনের মান্থলিতে, কারুর ইতিহাস জমাট বেঁধে আছে অজস্র পোস্ট না করা চিঠিতে।

খোদ ভারতবর্ষের বুকের মধ্যে ধুকপুক করে চলেছে একশো কোটিরও বেশি দেশ। এ গান তেমন যে কোনো দেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে উঠতে পারে। এই গানের মধ্যে আছে সেই অগুনতি দেশের জার্নাল। আর আছে সেই সমস্ত দেশের  কাছে ফিরতে চাওয়ার কাঙালপনা।

আমার দেশের চেহারার সঙ্গে আপনার দেশের চেহারায়
ও চরিত্রে বিস্তর ফারাক। যেমন মিনিবাসের জানালায় কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে যে মেয়েটি গা এলিয়ে বসে; তাঁর দেশে হয়ত সদ্য ভাঙা প্রেমের অনাবৃষ্টি। আবার প্রায় অনাহারে বেড়ে ওঠা যে কিশোর তেরো বছর বয়সে প্রথম পাউরুটি চুরি করেছে, তার দেশ জুড়ে তখন ফরাসী বিপ্লব মিইয়ে দেওয়া অভ্যুত্থান।

অনবরত নিজের দেশের স্মৃতি হাতড়ে চলা আর ক্রমশ  সে দেশ থেকে দূরে সরে যাওয়া; হারিয়ে যাওয়া; এই দোলাচল রয়েছে এ গানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। 'দেশ'য়ের রেসিপি একেকজনের কাছে এক এক রকম আর সঞ্চিত স্মৃতির হাত ধরে নিজের সে দেশকে চিনে নিতে পারাটা যে কী প্রবল ভাবে কলম্বাসিও! দেশকে চিনে নিতে পারার নিবিড় ভালোবাসা মেশানো সুরটুকু সবার বুকেই ইতিউতি বাজে; এ গান সেই সুরকে বড় মোক্ষম ভাবে ধরেছে।

এ'খানে সুরে বাজিমাত নেই, জলপটি আছে।
এ গানের কথায় বিদ্যুৎ নেই, আছে মায়ের কাঁধ;  যে'খানে থুতনি রাখলে সমস্ত জমাট বাঁধা অভিমান গলে জল হতে বাধ্য।

Thursday, January 24, 2019

মনোজ দত্তর চিঠি



- চিঠি? আমার নামে?

- অনিল হালদার আপনি হলে, ইয়েস।

- তোমায় দেখে তো ঠিক ক্যুরিয়র কোম্পানির লোক মনে হয় না হে..।

- ও মা। না না, আমি পোস্টম্যান বা কুরিয়রের লোক নই।

- তা'হলে আমার অফিস বয়ে এলে যে...।

- শুধু তাই নয়, আগাম অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসিনি। তাই আপনার সেক্রেটারি ঝাড়া তিন ঘণ্টা বসিয়ে রেখেছিলেন।

- খামের গায়ে তো কিছুই...।

- লেখা নেই..। জানি।

- এ চিঠি কার লেখা? তুমি নিয়ে এসেছ কেন?

- এত মন দিয়ে লিখলাম চিঠিটা, তাই ভাবলাম আমিই নিয়ে যাই। ওহ, আমার নাম মনোজ দত্ত।

- সশরীরেই যখন এলে, তখন চিঠির কী দরকার ছিল..ব্যাপারটা কী...। আজকাল ছেলেছোকরাদের ব্যাপারস্যাপার বোঝা দায়। চাকরীর আবেদনটাবেদন নয় তো?

- লেফাফা খুলে দেখুন না স্যর। 

- তোমার হাবভাব কেমন সাসপিশাস মনে হচ্ছে, খামে গোলমেলে কিছু নেই তো?

- গুড নিউজই আছে স্যার। খুলেই দেখুন না।

- নিজেই লিখেছ যখন, বলেই দাও কী আছে এতে। বৃদ্ধ বয়সে এই অকারণ কায়দা বরদাস্ত হয় না।

- আপনি এত স্কেপ্টিক কেন বলুন তো অনিলবাবু?

- আমি? স্কেপ্টিক? শোন হে ছোকরা, বাতিকগ্রস্ত হলে কলকাতার বুকে এত বড় ব্যবসা ফেঁদে বসতে পারতাম না। রেন্টেড টেবিল দিয়ে শুরু বছর কুড়ি আগে। আজ আট হাজার স্কোয়্যার ফিটের অফিস।  গারমেন্ট ইম্পোর্টে গত দশ বছরে শহরের আর কোনো ফার্ম এত প্রগ্রেস করেনি। আর ব্যবসায় এগিয়ে যেতে হলে নির্ভয়ে ডিসিশন নিতে হয়। আমায় স্কেপ্টিক বললে ধর্মে সইবে না।

- তা'হলে খুলেই দেখুন ন। খামে কী আছে।

- তোমার নামটা কী বললে যেন হে?

- মনোজ। দত্ত। নামটা চেনা ঠেকছে কি?

***

- মনোজ দত্ত, নামটা মনে পড়েছে। ট্যু লেট। বাট মনে পড়েছে।

- অন্ধকারে ঘরে আপনার মাথাটা দিব্যি খোলতাই হয় যায় দেখছি অনিলবাবু।

- এ জায়গাটা কোথায়?

- খামের ভিতর। অফ কোর্স।

- ওহ, ম্যাজিশিয়ান মনোজ দত্ত। অফ কোর্স। আমার তোমায় চট করে চিনে ফেলা উচিত ছিল।

- সং সেজে টুপি থেকে খরগোশ বের করা খোকাভোলানো ইউজলেস ফেলো। আপনার দেওয়া লম্বা কমপ্লিমেন্ট ভুলিনি স্যর।

- তাই আমায় খামের ভিতর পুরে ফেলতে এত বছর পর ফিরে এসেছ! ইডিয়ট। এ'সব তুকতাক আর শয়তানি ছাড়া যে তোমার আর কোনো মুরোদ নেই তা আমি আগেই বুঝেছিলাম। রিভেঞ্জ নিতে এসেছ! রাস্কেল। মেঘার নখের যোগ্য তুমি ছিলে না।

- রিভেঞ্জ? না অনিলবাবু। আদৌ না। প্রতিহিংসার জন্য আপনাকে টুপিতে হাপিশ করে সহজেই খরগোশ করে বের করতে পারতাম। সে এলেম আমার আছে। আপনি এ আর্টকে নীচু চোখে দেখতেই পারেন, তা'তে আর্টের কিছু এসে যায়না। আমি আর্টিস্ট স্যর, আমি রিভেঞ্জের মানু্ষ নই। আমি সত্যিই আপনার মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম জানেন, মেঘাও আমাকে ভালবেসেছিল।  আপনি ওকে বাধ্য করেছিলেন আমার থেকে দূরে সরে আসতে। তবে বিশ্বাস করুন, ওর আত্মহত্যার জন্য আমি আপনাকে দায়ী করিনি কোনোদিন।

- শাট আপ। ইডিয়ট। এত বছর পর এই ডার্ক ম্যাজিকে আমায় বিপদে ফেলবে ভেবেছ?

- না হালদারবাবু। আমি মেঘার ভালোবাসায় ফিরে এসেছি, আমি জানি আপনি বড় যন্ত্রণায় আছেন। আমারই মত। আমি আপনার জন্য এসেছি স্যর। থাকবেন আমার সঙ্গে এই জগতে? নাকি ফিরে যাবেন? ব্যবসায়, কলকাতায়, অফিসে, হেরে যাওয়া জগতে...। এ'খানে মেঘার সুবাস আছে; আমার ভালোবাসার জোরে তার সুবাস এখনও টিকিয়ে রেখেছি। থাকবেন এখানে? মেঘার সুবাস দু'জনে ভাগ করে কাটিয়ে নেব?

- কী হচ্ছে কী এ'সব!

- আপনি চাইলেই আমি আপনাকে খামের বাইরে ছেড়ে আসতে পারি। কিন্তু সে'খানে দেওয়ালে টাঙানো মেঘার ছবি আছে হালদারবাবু। মেঘা নেই। মেঘা এ'খানে আছে। আমার মধ্যে। থাকবেন প্লীজ?

- ফ্রড! এ'সব মিথ্যে!

**

ঝিমটি ভাঙতেই হালদারবাবু টের পেলেন টেবিলে কেউ বেনামী খাম রেখে গেছে। সেক্রেটারি কিছুই বলতে পারল না, এমন কী সিসিটিভিতেও কাউকে তাঁর ঘরে এ খাম নিয়ে আসতে দেখা যায়নি। ভোজবাজিই বটে।

হালদারবাবু মিচকি হেসে মাথা নাড়লেন; আজ মেঘার জন্মদিন। কতদিন মেয়েটার গায়ের মায়াবী গন্ধ এমন ভাবে নাকে এসে ঠেকেনি। কতদিন। মনোজ ছোকরাটার এলেম আছে। আর বেশি চিন্তা না করে উকিলকে ফোন করলেন অনিল হালদার; উইলের ব্যাপারটা ঠিকঠাক করে তারপর এ খাম খুলতে হবে। আজই।

জুতোবাজ



এক বন্ধু রেকমেন্ড করেছিল 'বিসনেস ওয়ার্স' পডকাস্ট। পেপসি-কোকের পর নাইকি এবং অ্যাডিডাসের বাজারদখলের লড়াই নিয়ে রোমহষর্ক কয়েকটা এপিসোড শুনেছিলাম। আর তার কয়েকদিনের মাথায় নজরে পড়ল এই বইটা; নাইকির ফিল নাইটের আত্মজীবনী। সোজাসাপটা ভাষা, কিছু কিছু জায়গায় প্রায় ডায়েরির মত গড়গড়িয়ে লেখা। আর সোজাসাপটা লেখার যে কী গুণ; মনে হয় টেবিলের ও'পাশে বসে কেউ গল্প বলছেন। এ চ্যাপ্টার থেকে ও চ্যাপ্টার যাওয়ার সময় মনে হয়; "এক মিনিট স্যার, চট করে চানাচুরের ডিবেটা নিয়ে আসি"।

এ'বারে র‍্যান্ডম অবজার্ভেশনগুলোঃ

১. আমেরিকানদের খেলাধুলোর প্রতি আগ্রহের সঙ্গে আমাদের কিছুতেই তুলনা চলে না। আগাসি বা ফিল নাইটরা ব্যতিক্রমী, তাঁদের দৃষ্টান্ত দিয়ে গড়পড়তা আমেরিকানদের বিচার করা অবশ্যই অনুচিত।  কিন্তু এই দু'জনের আত্মজীবনী পড়ে  বুঝেছি যে সে'দেশে স্পোর্টস ব্যাপারটা সিস্টেমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে ভাবে মিশে আছে; বিশেষত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে। এবং সবচেয়ে বড় কথা হল অলিম্পিয়ান বা সেলেব্রিটি হওয়ার লোভটুকুই স্পোর্টসের শেষ কথা নয়। আগাসির টেনিস বা নাইটের দৌড় নিয়ে গল্প লেখা হয় বটে কিন্তু তাঁরাই শুধু ক্রীড়াবিদ নন। অফিস ফেরতা মানুষের জগিংয়ে বেরোনো বা ব্যাডমিন্টন খেলতে যাওয়ার মধ্যেও রয়েছে সার্থকতা; সে'খেলাটুকুও সিরিয়াসলি নেওয়ার দরকার আছে, সে'টুকু খেলার মধ্যেও নিয়ম আর ভালোবাসা টিকিয়ে রাখাটা জরুরী। বিভিন্ন চাপে যতবার ফিল নাইট পর্যুদস্ত বোধ করেছেন; ততবার তিনি দৌড়েছেন মাইলের পর মাইল। ফিল নাইট ব্যবসায়ী হিসেবে যতটা সফল, তাঁর জীবন ততটাই সার্থক ক্রীড়াবিদ হিসেবে; যদিও তেমন মেডেলটডেল কোনোদিনই জোটাতে পারেননি তিনি।

২. প্রতিটা সফল ব্যবসার গল্প যত্ন করে বলতে পারলে বোধ হয় এমন কিছু রোম্যান্টিক  মুহূর্ত, অ্যাডভেঞ্চার ও ঘুরে দাঁড়ানোর রূপকথা ভেসে উঠবে যা যে কোনো নভেলের কান মুলে দিতে পারে। ফিল বড় যত্ন করে সমস্ত গল্প বলেছেন। কফিকাপ হাতে বারান্দায় বসে যে সুরে গপ্প ফাঁদা উচিত, সে'ভাবেই।

৩. ক্রমশ বিশ্বাস মজবুত হচ্ছে যে আত্মজীবনীতে নিজের কথা বলার চেয়ে ভালো স্ট্র‍্যাটেজি হচ্ছে আশেপাশের মানুষগুলোর কথা গুছিয়ে বলা। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, রাগ, প্রতিশোধ,  হাসিঠাট্টা; সমস্ত ফিল্টার দিয়ে নিজের চারপাশের মানুষগুলোকে স্পষ্টভাবে দেখাতে পারলেই নিজের জীবনের গল্পটা দিব্যি বলা হয়ে যায়; এবং স্টাইল হিসেবে সে'টাই মনোগ্রাহী। ফিল এই কাজটা খুব ভালোভাবে করেছেন। প্রায় গোটা বই জুড়েই নিক একজন অবসার্ভার; ব্লুরিবন থেকে নাইকি হয়ে ওঠার গল্প এগিয়ে চলে অন্যদের সাফল্য আর ব্যর্থতায় ভর দিয়ে।

৪. ফিল বহু বছর লড়াই করবেন নিজের বাবার চোখে পুত্র-গর্বের ঝিলিক দেখতে।  আর বহু বছর পর বুঝবেন যে সে লড়াইটা অদরকারী ছিল। তবে সে যাত্রাপথটা অদরকারী ছিল না। আর সে যাত্রাপথের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর নিজের চোখ ঝাপসা হয়ে আসবে নিজের বৃদ্ধ পিতার জন্য গর্বে। ফিলের বাবা ছিলেন ভুলেভ্রান্তিতে ভরা, ঠিক ম্যাথুর বাবার মতই। ম্যাথু কে? ফিল নাইটের বড় ছেলে, যার অকালমৃত্যুর ধাক্কা সহ্য করত হবে নাইটকে।

৫. নাইকির মাধ্যমে কিছু জবরদস্ত বন্ধু জুটিয়েছিলেন ফিল। নাইকির সাফল্য সে'সব বন্ধুত্বের গল্পও বটে। আর বড় চিত্তাকর্ষকভাবে সে'সব বন্ধুদের কথা বলেছেন ফিল। বন্ধুদের সাহায্যে  নাইকি তৈরি করেননি ভদ্রলোক, বরং নাইকির মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছেন সে'সব বন্ধুদের। খুঁজে পেয়েছেন জীবনসঙ্গিনীকে। এমন কি নাইকি নামটাও ফিলের দেওয়া নয়, বরং স্বপ্ন হাতড়ে সে নাম পেয়েছিলেন তেমনই এক বন্ধু। পড়তে দিব্যি লাগে সে'সব গল্প।

৬. জাপানি ও মার্কিনীদের তফাৎ, মিল ও ব্যবসায়িক রসায়ন নিয়ে বেশ জরুরী কিছু কথা রয়েছে এ বইয়ে।

৭. এক্সেলেন্সের প্রতি আনুগত্য; আমার আদৌ নেই। কিন্তু জবরদস্ত  মানুষজনের থাকে। সে জন্যেই আজকাল বিভিন্ন বায়োগ্রাফি পড়ার চেষ্টা করছি।  ভালো লাগে, মাঝেমধ্যে গায়ে কাঁটা দেয়। এক্সেলেন্সের একটা বড় দিক বোধ হয় মানুষকে সম্মান করতে পারা। এই একটা গুণের জন্যেই হাজার গলদ সত্ত্বেও  ফিল নাইটরা ব্যতিক্রমী; এ জন্যেই হয়ত তাঁদের জীবনী হয়ে ওঠে 'গ্রিপিং'। সেল্ফ-হেল্প বই আমার ধাতে সয় না, কিন্তু এ'বইগুলো বেশ চমৎকার।

ভাঙা প্রেম


প্রত্যেক ভাঙা প্রেমের শেষ দৃশ্যে এক থালা বিরিয়ানি থাকলে ভালো হয়৷ থালার একপাশে হেরো প্রেমিক, অন্যপাশে পর্যুদস্ত প্রেমিকা।

বিরিয়ানি সুবাসের পাশাপাশি ইতিউতি "খাচ্ছ না কেন?" ভেসে বেড়াবে বাতাসে। আর সরু চালচাপা-নরম আলুর মত ঘাপটি মেরে পড়ে থাকবে "আর দেখা হবে না, না?"র ধান্দাবাজ প্রশ্ন।

বিরিয়ানি আর ভাঙা প্রেমে তাড়াহুড়ো চলে না, সে'টাই বাঁচোয়া।