Saturday, April 28, 2018

সোধি সাহাব

উত্তর বিহারের প্রত্যন্ত অঞ্চল, মাইল দুয়েকের মধ্যে কোনো বসতি নেই। অনতিদূরে কোশী নদীর মেজাজ মাঝেমধ্যেই বেয়াড়া হয়ে পড়লেও, গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চল বড় রুক্ষ। মে মাসের দুপুরে রোদের দাপটে পথ চলা দুষ্কর,  আর মাঝে মধ্যেই গরম হাওয়ার ঝাপটায় উড়ে আসে ধুলো। ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে মাঝেমধ্যে দু'একটা সাইকেলআরোহী বা পথচারী দেখা যায়, তাদের সকলের নাকেমুখেই গামছা প্যাঁচানো। রাতের দিকে অবশ্য তাপ গলানো ফুরফুরে হাওয়া বয়।

সে'খানে চলছিল রাস্তা তৈরির কাজ, ন্যাশনাল হাইওয়ে। বড় একটা কন্সট্রাকশন কোম্পানির ক্যাম্প সে'খানে। ক্যাম্পে অফিসঘর,  গুদামঘর ছাড়াও রয়েছে কর্মচারীদের জন্য থাকার জায়গা, মেসঘর আর খানকয়েক গেস্টরুম। আশেপাশে রুক্ষতার মধ্যে ক্যাম্পের ভিতরের পরিপাটি পরিবেশ যেমন বেমানান, তেমনই আরামদায়ক। আমাদের কোম্পানি সে'খানে ফার্নেস অয়েল, ডিজেল আর বিটুমেন সাপ্লাই দিত, সে সুবাদে যাতায়ত লেগেই থাকত। গেস্টরুমগুলো বাতানুকূল,  ছিমছাম; থাকতে কোনো অসুবিধেই ছিল না। তাছাড়া মেসের বিহারী ঠাকুর উমেশচন্দ্রের রান্নার হাতও ছিল সরেস।

সূপল জেলার এক জনহীন প্রান্তে তৈরি সেই কন্সট্রাকশন কোম্পানির ক্যাম্পের মধ্যমণি ছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার 'সোধি সাহাব'।

ক্যাম্পের যাবতীয় দেখভাল ছিল সোধিবাবুর দায়িত্বে আর তাঁর দাপটে পান থেকে চুন খসবার উপায় ছিল না। পঞ্জাবের এই সুপুরুষ মানুষটির  শখ বলতে সকালে নিজের হাতে ঘণ্টা তিনেক ক্যাম্পের বাগান পরিচর্যা আর সন্ধের তিন পেগ স্কচ।

সোধিবাবুর স্কচ মেশানো গল্পে বিহারের কয়েকটা সন্ধে বড় মনোরম হয়ে উঠেছিল। মাঝেমধ্যেই আর্মি ডিসিপ্লিন আর উমশচন্দ্রের পেঁয়াজ-মির্চির পকোড়ার প্রশংসা করতেন দরাজ কণ্ঠে। রাজনীতির বিশেষ ধার ধারতেন না, তাছাড়া সমস্ত ব্যাপারে গল্প ফেঁদে বসতে পারতেন তিনি।

ভদ্রলোকের তিন নম্বর পেগের শেষে ঈষৎ ঝিমিয়ে পড়তেন, তবে গল্প থামত না। সে সময়টা বিড়বিড় করে একাই বকে চলতেন, উত্তরের ধার ধারতেন না। আমি মন দিয়ে শুনতাম। প্রবীণ ভদ্রলোক বড় ভালো মানুষ; অত খোলামেলা আড্ডাতেও কোনোদিনও কখনও তাঁকে পরনিন্দা করতে শুনিনি। ভদ্রলোকের মধ্যে ঈর্ষার ছিঁটেফোটা আছে বলেও মনে হয়নি কখনো।
প্রবল আড্ডাবাজ, অথচ কোনোদিন ওর গল্পে 'গসিপ' খুঁজে পাইনি।

তিন পেগের শেষে ভদ্রলোকের বিড়বিড়ে একদিন জানতে পেরেছিলাম আশফাকের কথা। আশফাকের লাশ দেখেছিলেন সোধি সাহেব। ক্ষতবিক্ষত,  রক্তে মাখামাখি। অন্য অনেক লাশের পাশে পড়ে। দেখে স্বস্তির শ্বাসও ফেলেছিলেন, শত্রু সৈন্য বলে কথা। এমন বহু লাশ দেখেছেন ভদ্রলোক, না দেখে উপায় কী? এদের আটকাতে না পারলে নিজেদের লাশ হয়ে পড়ে থাকতে হত।

আশফাকের পিঠের ব্যাগের বিভিন্ন কাগজপত্র হাতড়ে ওর জন্মদিন জানতে পেরেছিলেন। সোধি সাহেবের ছেলে সোনুর জন্মও ওই একই দিনে, একই বছরে। ছ'বছর বয়সে আচমকা ম্যালেঞ্জাইটিসে মারা না গেলে  সোনুও এমনই গাঁট্টাগোঁট্টা জওয়ান হত। সোধি কেঁপে ওঠেননি, দায়িত্বে নড়বড়ে হয়ে পড়েননি এক মহূর্তের জন্যও। শুধু সোনুর ছবির সঙ্গে তাঁর মানিব্যাগে চিরকালের জন্য ঠাঁই পেয়েছিল আশফাকের আই-কার্ডের সাদাকালো ছবি।

'ইউ নো মুকর্জি, কমিট ইওরসেল্ফ টু প্রিন্সিপাল, নেভার আন্ডারপারফর্ম ইন ইওর ডিউটিস; বাট নেভার সাকাম্ব টু ইন্ডিভিজুয়াল হ্যাট্রেড। অ্যান্ড ট্রাই নট টু বার্ন ব্রিজেস'।

সেই একবারই ভদ্রলোককে চতুর্থ পেগের আশ্রয় নিতে দেখেছিলাম।

Tuesday, April 24, 2018

খুচরো দুই

১- ক্যালামিটি।

অমিত রায়ের হাবেভাবে গায়ে পড়া ঘ্যানঘ্যান না থাকা,

উত্তমের উৎপল-কণ্ঠী ওথেলোতে সুচিত্রার চোখ ছলছল না থাকা,

আজহারের ব্যাটিং স্টান্সে গলার তাবিজের দুলুনি না থাকা,

আনন্দের শায়রির ডায়েরিতে শুকনো ফুলের স্মৃতি-ফসিল না থাকা,

'বুঝলে ভায়া'র আরামে পাহাড়ি সান্যালিস্ট আশ্বাস না থাকা,

আর

রাতের ফ্রীজে ক্ষীরকদম না থাকা।

***

২- সজনে।

সর্ষে পোস্ত দিয়ে জমাটি ভাবে রাঁধা সজনে চিবুতে পারায় রয়েছে স্বর্গসুখ।

রাতে খেতে বসার আগে লেবু সাবানে স্নান করে, গায়ে পাউডার ছড়িয়ে, ফতুয়া চাপিয়ে তবে সজনের বাটি নিয়ে বসা উচিৎ।

মনে থাকবে মৃদু গুনগুন;
সজনা হ্যায় মুঝে সজনে কে লিয়ে,
সজনা হ্যায় মুঝে সজনে কে লিয়ে।

জোড়া খুচরো

১- কর্পোরেট কনক্লেভ।

- একটা কর্পোরেট কনক্লেভে আপনাকে ইনভাইট ছিল আপনার জন্য। আমরাই অর্গানাইজ করছি।

- কনক্লেভ? কর্পোরেট?

- হুজ হু অফ ইন্ডাস্ট্রি থাকবে।

- থীমটা কী?

- বিসনেস চ্যালেঞ্জেস ইন দি নিউ...।

- ধুর, লাঞ্চে কী? কন্টিনেন্টাল? ইন্ডিয়ান? চাইনিজ?

***

২- খাবার অর্ডার

- অর্ডার লিখে নিন।
- বলুন।
- মটন কষা এক প্লেট। মটন রোগনজোশ এক প্লেট। আটটা পরোটা। একটা থামস আপ এক লিটার।
- পয়লার বাজার; দেরী করে ফেলেছেন। তবে চিন্তা নেই। চিকেন দোপেঁয়াজা আছে, চিকেন টিক্কা মশলা আছে, চিকেন ভর্তা...।
- রিভিশন।  লিখে নিন। দু'টো ডিম তড়কা। এক্সট্রা ডিম। আটটা রুমালি। একটা ফ্যান্টা, এক লিটার।
- আহ্, চিকেনে আরো আছে। হরিভরি মুর্গ, চিকেন লাবাবদার...।
- পয়লাতে ব্রয়লার খেয়ে চোয়াল ইনজিওর করব, এমন গবেট নই। ক্যুইক স্যর, তড়কা-রুটি-ফ্যান্টা।

মিস্টার স্মিথ



বড় হওয়ার প্রসেসে একটা জব্বর 'বাগ' রয়েছে। মাঝেমধ্যেই মনে হয় 'অ্যাই যে, এইবারে বেশ দাঁড়িয়ে গেছি। দেওয়াল ঘড়ির ব্যাটারি পাল্টাবো। চালানি কাতলা চিনে ফেলে নাক সিঁটকবো। খোকাটি পেয়ে শুকনো বাঁধাকপি গছিয়ে দেবে, তেমন বান্দা আর কেউ থাকবে না চারপাশে'। তখন মনে হয় বুড়োদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলি; 'আরে আমি থাকতে তোমার সাতপাঁচ ভাবার আছেটা কী'? 

ঠিক তখুনি দুম করে একটা 'ভুল' ঢুকে পড়বে; আর সমস্ত গুবলেট, গোটা ইকুইলিব্রিয়াম জলে। পায়ের তলার মাটি ঝুরঝুরে হয়ে পড়বে, চেনা মানুষগুলোর গা থেকে পাওয়া যাবে অন্য গ্যালাক্সির গন্ধ। কিছু হাত নরম 'আছি তো'র সুরে পিঠে নেমে আসে, কিন্তু তবু ধুকপুকানি বাড়তে থাকে। সমস্ত মাটি করে ফেলার অপরাধবোধ গলা টিপে ধরে।

তখন এই দামড়ামোর খোলস ছেড়ে বেরোনো জন্য যে কী প্রাণান্তকর আইঢাই। আর এই দুর্বিষহ বয়স আর পাপ ঝেড়ে ফেলার একটাই জায়গা আছে বোধ হয়; মা-বাবা। ভুল স্বীকারের এমন নিশ্চিন্ত আশ্রয় আর নেই। কাঁধে বাপের হাতের মত সৎসাহস আর হয় না। 

র‍্যান্ডি পশ্ বলেছিলে সরি বলার তিনটে ভাগ আছে;
- দুঃখপ্রকাশ।
- দোষ নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া।
- দোষগুলো শুধরে নেওয়ার জন্য সমস্ত কিছু করতে চাওয়া।

স্মিথের 'সরি' সে অর্থে 'কপিবুক'। আর সবচেয়ে বড় কথা;  স্মিথ ভেঙে পড়েছিলেন বুড়ো বাপের জন্য; লজ্জায়, দুঃখে, অনুশোচনায়। খোকার পাশে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা; যদ্দিন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তদ্দিন ঈশ্বরেরও ক্ষমতা নেই খোকার শৈশব কেড়ে নেওয়ার।

তবু। কোথাও কারুর হত মনে হবে গিমিক, সাজানো। জানি না। তবে আত্মসমর্পণের অন্ধকারে খোকার পাশে আলো হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা, আমার বাবা-বিশ্বাসী চোখে সে'টুকুই আশ্বাস। 
শাস্তিটুকু থাক, আর শাস্তির ও'পাশে থাকুক ভালোবাসায় মজবুত খোকা। 

ফিরে আসুন স্টিভ। ফর ইওর ওল্ড ম্যান। আমরা অপেক্ষায়।

গরম্য

এপ্রিল পেরোনোর আগেই কলকাতা তন্দুর সেঁকা হয়ে পড়বে। এ ভ্যাপসা গরম এমন বিটকেল যে প্রতিদিন নিয়ম করে শরীরের সমস্ত ঘ্যাম ঘামে শুষে নেয়।

হাতের পাঁচ বলতে মাঝেমধ্যে আইআরসিটিসিতে লগ ইন করে শেয়ালদা টু নিউজলপাইগুড়ির টিকিট দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য প্রাণ ঠাণ্ডা করা। গরম বাড়াবাড়ি রকমের দিকে গেলে অবশ্য উইকিপিডিয়ায় লাদাখের গল্প না পড়ে উপায় থাকে না। গুগল ইমেজেস আর ইউটিউবও যথেষ্ট কার্যকরী। গতবার আধঘণ্টা ধরে বরফে মোড়া কানাডায় ছবি ও ভিডিও দেখে সর্দি লেগে গেছিল।

অবস্থা আরো সঙ্কটজনক হলে অবশ্য দু'চার পেগ গেলা ছাড়া উপায় থাকেনা; বরফলেবুজলের পাতিয়ালা পেগ যে কত চিড়বিড়ে দুঃখকে চাবকে সোজা করার ক্ষমতা রাখে।

মূল সমস্যাটা শুরু হয় মে-মাসের মাঝামাঝি গিয়ে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের চোটে যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, ট্রাম্পবাবু আর বছর খানেক মন দিয়ে চেষ্টা করলেই নর্থ পোলের কোনো এক মোড়ে দাঁড়িয়ে দিব্যি ফতুয়া গায়ে ঘুগনি-ডিমসেদ্ধ খাওয়া যাবে। তা গতবছর বৌ বলল এই সময় ফ্লুইড ইনটেক না বাড়ালে সমস্যা হতে পারে। আমি মাথা নেড়ে সাজেশন দিয়েছিলাম এই হরেন্ডাস গরমের নিজেদের হাইড্রেটেড রাখতে কিছুদিন আমাদের উচিৎ এক বাটি মাংস প্রতি মিনিমাম দু'বাটি করে ঝোল খাওয়া। সম্পর্কে সেই থেকে একটা বিশ্রী চাপা অবিশ্বাস ঢুকে গেল।