Wednesday, April 11, 2018

মেমোরিস ইন মার্চ


মিসেস মিশ্র আর অর্ণব।

ওদের আবারও দেখা হবে। মাস তিনেকের মধ্যেই,  সম্ভবত দিল্লীতে।

মিসেস মিশ্র অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখা মাছের খবর নেবেন।

অর্ণব ব্যস্ত হয়ে ঘুরে দেখবে মিসেস মিশ্রর বাড়ি, খবর নেবে কলকাতা থেকে বয়ে আনা বইগুলো কোথায় রাখা হয়েছে।

আবার ওরা নিজেদের তফাৎগুলো হাতড়ে মরবেন আর শেষ 'তা বেশ, এই ভালো' বলে থামবেন। 'এম্প্যাথি' ব্যাপারটা সেই সব মাতব্বরদের জন্য নয় যারা কথায় কথায় "আমি ঠিক" বলে অন্যের গলা টিপে ধরেন (সে মাতব্বর ঈশ্বরের মত নির্ভুল হলেও নয়)।

দু'জনে পুরনো অ্যালবাম উল্টেপাল্টে দেখবেন; পাশাপাশি বসে। মিসেস মিশ্রর আপত্তি অবশ্যই থাকবে না অর্ণবের বানানো কফিতে। আর অর্ণব? তিনি হো-হো হেসে সোফা থেকে কুশন-বুকে মেঝেতে গড়িয়ে পড়বেন; থেরাপিস্ট দেখানোর উপদেশ শুনে।

রাতের দিকে মিসেস মিশ্র টের পাবেন অর্ণবের এই সময় দিল্লী আসার কারণ। তাঁর মতই, অর্ণবও প্রিয় মানুষদের জন্মদিন গুলিয়ে ফেলেন না।

মিসেস মিশ্রর জন্মদিনের ডিনার বাইরেই সারার প্ল্যান হবে; অর্ণবের ট্রীট। ওদের সঙ্গে বেরোবে সিড।

অনশন

- দত্ত, এসো। এসো।
- কী ব্যাপার স্যর? এত জরুরী তলব?
- রাজনীতি হে দত্ত। তিষ্ঠোবার উপায় আছে? সারাক্ষণ মাথায় স্ট্র‍্যাটেজি কিলবিল করছে। যাক গে। চটপট কাজে লেগে পড়ো।
- কাজ? কীসের কাজ?
- বাহ্! আজ বাদে কাল অনশনে বসব। কত আয়োজন করতে হবে।
- অনশন?
- অনশন।
- কেন?
- তোমায় ডেকেছি কি আমার মুখ দেখতে? কীসের জন্য অনশন করব তার একটা যুতসই কারণ খুঁজে বের করো দেখি। অপোনেন্টরা ভেবড়ে যাবে এমন একটা কিছু। আর যে'টা মিডিয়া আর পাবলিক খাবে। প্রতিবাদি। সত্যাগ্রহী গোছের। চটপট একটা মোটিভ খুঁজে বের করো। আগামীকাল আমি অনশনে বসছি। ক্যুইক দত্ত। ক্যুইক। হাতে সময় খুব কম। আজ সন্ধের মধ্যে মিডিয়াকে বাইট দিতে হবে।
- আমরণ?
- ব্রেকফাস্ট ডিনার লাঞ্চ টিফিন বাদ দিলে জীবনটাই তো আমরণ অনশন। তবে এ'ক্ষেত্রে আমরণ না। টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স।
- ও, আচ্ছা।
- আমার সঙ্গে পার্টির ছেলেছোকরারাও উপোস করবে।
- উপোস?
- আহ্, অনশন। ওদের জন্য পরের দিন দুপুরে মাংস ভাতের ফীস্টি অর্গানাইজ করতে হবে। আর পার হেড হাফ বোতল ব্লেন্ডার্স প্রাইড। নোট করে নাও। তুরন্ত।
- ভেন্যু?
- অনশনের জন্য একটাই তো জায়গা ভাই। গান্ধী মূর্তির পাদদেশ। সে'টা নড়চড় হওয়ার উপায় নেই।
- সে'খানে আবার আগামীকাল ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প আছে।
- ও আমি পুলিশকে বলে দেব। পারমিশন উইথড্র করে নেবে। তুমি ওখানেই শামিয়ানা খাটাও। লাউডস্পিকার চাই। কারার ওই লৌহকপাট। মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় গোছের গান বাজবে। পরের দিন ফিস্টিতে অবশ্য তাম্মা তাম্মা চাই। ছেলেদের মনোবল নুয়ে পড়লে চলবে না।!
- আজ্ঞে। নোটেড।
- আরো চাই। ফেস্টুন। ব্যানার। শহরজুড়ে প্রতিবাদি পোস্টার।
- পার্টি ফান্ডের একটু টানটান অবস্থা। সামনেই আবার ইলেকশন।
- সিংঘানিয়ার কারাখানার লাইসেন্স হয়ে গেছে না?
- আজ্ঞে। গতকাল পার্টি অফিসে মিষ্টির বাক্স নিয়ে ঘুরে গেল।
- ন্যাকা, কোটি কোটি ব্ল্যাক টু হোয়াইট করবে আর আমাদের বেলায় এক বাক্স ক্ষীরকদম? ওকে বলে দাও। আমার অনশন স্পন্সর করবে। ইয়ে, আমিই বলে দেব'খন। পুরনো হিসেবেও কিছু একটা বাকি আছে; ঝালিয়ে নিতে হবে।
- বেশ। চিন্তা নেই স্যর, হয়ে যাবে। দত্ত থাকতে আপনার কোনো চিন্তা নেই। কিন্তু ইয়ে, স্যর। কালকেই অনশনটা করতে হবে কেন?
- গিন্নী পঞ্জিকা দেখে নিজে রেকমেন্ড করেছে। নির্জলা উপোস করতে হবে। কালকেই। সন্তোষী মা না শেতলা কিছু একটা ব্যাপার আছে। গেরস্তের মঙ্গল অমঙ্গল বলে কথা। রিফিউজ করি কী করে বলো দত্ত। তাই ভাবলাম রিলিজিয়াস উপোসটাকে যদি অপ্টিমাইজ করে রিভোলিউশনারি অনশনে কনভার্ট করা যায়।
- নোশনাল অনশন। দিব্যি। তা পরশুর ব্লেন্ডার্স প্রাইডে আপনি থাকছেন কি?
- নাহ্ দত্ত। আমার জন্য সুইট লাইম সোডা। অনলি। তবে তাম্মা তাম্মা থেকে আমায় আবার বঞ্চিত কোরো না, কেমন?

অ্যাপয়েন্টমেন্ট

- অমল। তাই তো?
- আজ্ঞে না। সুবিমল।
- সুবিমল? সে কী!
- সত্যিই সুবিমল।
- রিয়েলি? আপনার নামটা অমল ছিল না?
- নিজের নাম স্যর। অমলই যদি হবে তা'হলে খামোখা সুবিমল বলব কেন।
- তা ঠিক। যাকগে। তা অমলবাবু, আমার কাছে কী মনে করে?
- সুবিমল। সু বিমল।
- কে সুবিমল?
- আমি।
- তাই তো বললাম।
- না, আপনি অমল বললেন।
- ওহ। তা সুবিমলবাবু। আমার কাছে কী মনে করে?
- না মানে...।
- না মানে নো। ইংরেজিতে।
- তা নয়...।
- নিশ্চয়ই তাই।
- আসলে আমায় আপনি ডেকেছেন।
- আমি? আপনি কি প্লাম্বার? অমলবাবু?
- সুবিমল। আমি সুবিমল।
- আপনি কি প্লাম্বার? আমার বেসিনটা লীক করছে তাই...।
- না না..।
- না মানে? আমার বাথরুমের বেসিন, আমি জানব না?
- তা নয়।
- তাই। আমার বাথরুমের মেঝে ভিজে যাচ্ছে। এ'দিকে।আমি মোজা পরে বাথরুমে যাই। ক্যালামিটি।
- মৈত্রবাবু। আমি অমল নই, সুবিমল। আর আমি প্লাম্বারও নই। আমায় আপনি ডেকেছেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে তবে এসেছি।
- আমি ডেকেছি?
- কবিতা লেখা শেখাতে। মাইনে ভালোই অফার করেছেন। ভুলে গেছেন? একদম?
- ওহ ওহো। সুবিমলবাবু। এইবারে মনে পড়েছে। কবিতার টিউশনি। বটেই তো। বটেই তো। তা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন। আপনি শিক্ষক, আমি ছাত্র। প্লীজ, বসুন।
- ধন্যবাদ। ঘণ্টায় হাজার টাকার ব্যাপারটা। ভুলবেন না প্লীজ।
- চেক চলবে? মাসের শেষে ঘণ্টা হিসেব করে। নাকি অ্যাডভান্স মাস্ট?
- না, মাসের শেষে দিলেই হবে।
- গুড। শুরু করুন তা'হলে।

**

কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথের পুরনো বইয়ের আস্তানায় কত রকমের বিচিত্র বই দেখতে পাওয়া যায়। খোঁজার চোখ থাকা চাই। এই যেমন গত শনিবার। পুরনো বইয়ের ঢিপির মধ্যিখানে সাতপুরনো বাঁধাইয়ের ইংরেজি বইটা চোখে পড়েছিল; 'প্ল্যানচেট ফর ব্রিঙ্গিং ব্যাক দ্য ডেড এলিমেন্টস ফ্রম ইনসাইড ইওর সোল'। লেখক বাঙালি আর লেখকের নামটা তাঁর নিজের নামের বেশ কাছাকাছি ; অমল মৈত্র।

লোভে পড়ে বইটা ঝুপ করে কিনে ফেলেছিলেন মানিতলার সুবিমল মৈত্র।

Friday, April 6, 2018

লুঠ

- কোনো ত্যান্ডাইম্যান্ডাই নয়। এই যে রিভলভারটা আপনার কপালে ঠেকানো, এ'তে চারটে গুলি আছে। দু'টো কাল খরচ হয়ে গেছে। এক মাল বটুয়া দিতে দু'সেকেন্ড দেরী করে ফেলেছিল। কাজেই, বেশি চালাকি নয়।
- কম চালাকি কী ব্যাপার?
- দেব নাকি? ঠুকে?
- নিজে ভুল বলবে তারপর আবার মেজাজ। বেশি চালাকি নয়; এ আবার কেমন কথা। অপটিমাম চালাকি মাপার কোনো উপায় আছে নাকি? কোনো চালাকি নয়; সে'টা বরং বলতে পারতেন। আকাট গাধামো তাও চেষ্টা করলে ডিফাইন করা যায়।
- মানিব্যাগ দেখি। চটপট।
- আসুন। এই যে।
- আর কী আছে?
- বলছি। তার আগে মানিব্যাগের ফয়সালা হয়ে যাক।
- মানে?
- বাইশ'শো আছে। আমায় তিরিশ টাকা দেবেন প্লীজ? ফেরাটা রিক্সায় হলে একটু সুবিধে। রাহাজানির পর হেঁটে বাড়ি ফেরা যে কী ট্যাক্সিং। সে'বার জসিডিতে এ'রকম একটা সিচুয়েশনে পড়েছিলাম। সে'টা অবশ্য ঠিক ডাকাতি নয়, পকেটমারি। কাজেই মিষ্টি হেসে রিক্সার ভাড়া চাওয়ার স্কোপ পাইনি।
- এই নিন, পঞ্চাশ। যত বাজে কথা। এ'বার আর যা আছে...।
- এই সেরেছে। পঞ্চাশের ভাঙানি দেবে ভেবেছেন অত সহজে? ব্যাটাদের কথায় কথায় তর্কের অভ্যাস।
- এই যে। তিনটে দশটাকার নোট। শান্তি?
- এ মা! আপনি নিজের মানিব্যাগ বের করে আমায় খুচরো দিলেন? বড্ড মাইডিয়ার তো। এই লাইনে পোষাচ্ছে?
- দেব খুলি উড়িয়ে?
- খুচরো দিয়ে খুলি উড়িয়ে কী লাভ বলুন। জুতো মেরে গোদানের চেয়েও লোয়ার লেভেলের কথা বলে ফেললেন তো।
- উফফফফ!
- আহ্। পেশেন্স। যাক গে, মানিব্যাগ ছাড়া রয়েছে হাতঘড়ি। বিয়েতে শ্বশুরমশাই গিফট করেছিলেন। ভিন্টেজ এইচএমটি।
- খুলবেন না মালাইচাকিতে গুলি করব?
- আদেখলার ঘটি হল, জল খেতে খেতে প্রাণ গেল। একটা পিস্তল যোগাড় করে কী তম্বি।  যাকগে, এই রইল ঘড়ি। ওহহো। এক মিনিট, ঘড়িটা পাঁচমিনিট স্লো চলছে। ঠিক করে দিই।
- চোপ! কিচ্ছু করতে হবে না। দেখি ঘড়ি। আমার হাতে দিন।
- বাস ট্রেন মিস হলে আবার আমায় বাপান্ত করবেন না যেন। ও, শুনুন। মানিব্যাগে আমার বৌয়ের দু'টো পাসপোর্ট সাইজ ফটো আছে। কাইন্ডলি বের করে দিন।
- আচ্ছা ভোগান্তি হল মাইরি। এই। এই যে। আপনার বৌয়ের পাসপোর্ট সাইজ ছবি। এ'টা আদেখলাপনা নয়?
- আমি তো আর আমার বৌকে আপনার কপালে ঠেকিয়ে আপনার মানিব্যাগ চেয়ে বসিনি। আমার আদেখলাপনায় গাজোয়ারি নেই।
- ছবি দেখে মনে হল বৌদির শুগার আছে।
- পরস্ত্রীর চোখের কোলের দাগ অমন মন দিয়ে দেখতে নেই।
- আহ, আমি মোটেও সে ভাবে দেখিনি।
- আই সী। তা বলছিলাম যে; একটা আংটি আছে। অল্প সোনা, বড্ড বেশি খাদ। চাই?
- থাক বরং।
- ক্যাশেই সুবিধে, তাই না?
- তা তো বটেই। ঠিক আছে। ঘড়িটাও ফেরত নিন। কত আর পেতাম ও'টা বেচে।
- এহ্, এ'বার আমার খারাপ লাগছে। আমি ওই ভাবে বলিনি। ঘড়িটা রাখুন না।
- ধ্যার! বলছি ফেরত নিতে। নিন রাখুন।
- মোস্ট কাইন্ড অফ ইউ।
- ইয়ে, শুনুন। মেজাজ নড়ে গেল। ধুত। এই নিন আপনার মানিব্যাগ। যত্তসব আপদ।
- ছিঃছিঃ! প্রফেশনাল কম্প্রোমাইজ করাটা বাড়াবাড়ি। মানিব্যাগটা অন্তত রাখুন না প্লীজ। নয়ত আমি মরমে মরে থাকব।
- দেব? ট্রিগার টেনে?
- বলেছি না। আদেখলার ঘটি। যাক গে। থ্যাঙ্কিউ ফর দ্য মানিব্যাগ। আর সাবধানে যাবেন, কেমন? দিনকাল ভালো নয়।

***

মনোহর বুঝলে আজ আর ডাকাতির চেষ্টা করে লাভ নেই। তাই সোজা গিয়ে বসল শেষ শান্তিপুর লোকালটায়। আজ বড় মনকেমন, আজ বড় মনভালো।

কদ্দিন পর মিনুর দেখা পেল। কদ্দিন পর। মিনু কি তাকে মনে রেখেছে? নিশ্চয়ই রেখেছে। ঘাটের ধারে বাদাম ভাজা খাওয়া আর সিনেমার গল্প করা কি অত সহজে ভোলার? তবে মিনুর বাবা বিচক্ষণ, ভাগ্যিস মনোহরের হাতে তুলে দিয়ে মেয়েটাকে ভাসিয়ে দেননি।

মিনুর বর বড় ভালো, মাটির মানুষ; ওকে খুব ভালোবাসে।
কিন্তু মিনু নিজের শরীরের এত অযত্ন করে কেন? এই বয়সে হাই-শুগার, এ'টা কোনো কাজের কথা নাকি?

Wednesday, April 4, 2018

ইভোলিউশন

- খিস্তির ইভোলিউশনে গতি নেই রে। 
- নেই বলছ?
- কচু আছে। সেই মান্ধাতা আমলের চার অক্ষরে আটকে রইল জেনারেশনের পর জেনারেশন। আমার বাপ জ্যাঠার মুখখারাপ আর আমার মুখখারাপে কোনো স্কেল চেঞ্জ হল না। 
- চার অক্ষর আউটডেটেড বলছ?
- আউটডেটেড নয়? একশো এমবিপিএস ব্রডব্যান্ডের যুগে ইনল্যান্ড লেটারের জন্য পোস্ট অফিসে লাইন দেব? 
- অলটারনেট খিস্তি ভেবেছ? আপগ্রেডেড?
- মুশকিল কী জানিস, আমার মোবাইলে জিও সিম থেকে কী হবে যদি বাকি সবার ট্যাঁকে নকিয়ার স্টোনএজের ফোন থাকে। মিউচুয়াল এক্সচেঞ্জ না হলে সমস্ত ইনোভেশন জলে।
- তবু। দু'এক পিস শুনি। চার অক্ষরের বদলে কী বলে তৃপ্তি পাবে?
- বেহালামেট্রো। 
- কী?
- আজকাল কাউকে বোকাইয়ে বললে সে ভাবে মাই ডিয়ার সুরে কথা বলা হচ্ছে। ইম্প্যাক্ট ঝুলে গেছে। কিন্তু তাকেই বলে দেখ 'তুই বেহালামেট্রো, তোর গুষ্টি বেহালামেট্রো'। তার গা থেকে চামড়া খুবলে উঠে না এলে আমি এক বছর খিস্তি দেওয়া ছেড়ে দেব।
- নেক্সট অপশন?
- রোলেসস্। 
- রোলেসস্?
- রোলেসস্। ঢ্যামনা বলার চেয়ে অনেক বেশি ধারালো। 
- বুঝলাম।
- বুঝিসনি। না বুঝে রোলেসসাচ্ছিস। 
- এই আবার শুরু হল তোমার বেহালামেট্রোমো।
- দেখেছিস? শুনেই কেমন ফ্লপিড্রাইভ জ্বলে যায় না?