Saturday, September 30, 2017

পাড়া



সবার একটা পাড়া থাক।

কয়েকটা 'কবে এলি?" কিংবা 'কদিন আছিস তো?"।
কিছুটা কামিনী আর অল্প ছাতিম মেশানো পুজোর সন্ধে খান দুই।
মণ্ডপের এক কোণে টেনে নেওয়া চেয়ারটুকু।
অনভ্যাসের তাসের দুপুর, বা জীর্ণ ক্লাব ঘর থেকে ভেসে আসা জরুরী ক্যারম-তলব।
থাকুক একটা গোপন স্মৃতি ছমছমে  গন্ধরাজ গাছ।
খুব দরকার একটা সাইকেল ধার দেওয়া প্রতিবেশীর।
ছোটবেলার বিকেল স্মৃতি আর বিটনুন ছড়ানো তেলে ভাজার দোকান।
অউর উসকে সাথ; হাড়হিম করা "আমার ডাকে সাড়া দিতে নেই, তাই না রে বাবু?"।

সবার একটা ফিরে আসার পাড়া থাক।

ব্রিজ

- ব্রিজটা কি দুলছে?
- অল্প।
- ভেঙে পড়বে?
- জানি না। অপেক্ষা করে দেখতে পারি।
- স্ট্রেঞ্জ। রোজ সন্ধেবেলা আমাদের ব্রিজে দেখা হয়। দু'চারটে কথা, তারপর আপনি এ'দিকে নেমে যান ডাউনের ট্রেন ধরতে, আমি অন্যদিকে আপের জন্য। অথচ আজ কাঁপছে বলে অপেক্ষা করব? দুদ্দাড় করে বেরিয়ে যাব না?
- কাঁপুনি অনুভব করার সময়ই পালানো উচিৎ ছিল, জিজ্ঞেস করতে গেলেন কেন?
- না, কাঁপুনিটা কতটা সিরিয়াস জানার কিউরিওসিটি ছিল।
- আগুনের টেম্পারেচার দেখতে থার্মোমিটারসহ আগুনে ঝাঁপ দেবেন? তাছাড়া  আমি কোনও দিন কোনও ভেঙে যাওয়া ব্রীজে থেকেছি কি? এ কাঁপুনি সিরিয়াস কিনা কী ভাবে বলব?
- তাও বটে। আজ ওয়েদারটা বেশ ভালো ছিল। ইশ, আজকেই ব্রীজটার এমন দশা হতে হল?
- ওয়েদার ভালো?
- ভালো না? কেমন ফুরফুরে হাওয়া! ভাবলাম আপনার নাম জিজ্ঞেস করে ফেলব আজ।
- এদ্দিন করেননি কেন?
- খুব অ্যাগ্রেসিভ হত।
- আগ্রাসী? আপনি পুরুষ আমি নারী বলে?
- টু সাম এক্সটেন্ট।
- আজ ব্রীজ ভেঙে পড়তে পারে বলে দুঃসাহসী হয়ে উঠেছেন?
- নাম জিজ্ঞেস করব ভেবেছিলাম। করিনি।
- আমাদের প্রথম ব্রীজে কথা হয়েছিল কেন যেন?
- সময়। ক'টা বাজে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমার হাতঘড়ি আর মোবাইল দু'টোই বিট্রে করেছিল, অথচ ট্রেনটা..।
- তারপরের দিন হেসে 'ভালো তো'?
- সে'টা আপনি ইনিশিয়েট করেছিলেন।
- ব্রীজের কাঁপুনি বাড়ল।
- সে'টা বছর দুই আগে হবে, তাই না?
- দু'বছর দেড় মাস স্যার। হপ্তায় পাঁচ দিন, ব্রিজে দেখা।
- আপনার বা আমার ক্যাসুয়াল বা অন্য লীভ না থাকলে, তবেই।
- দেড় দুই মিনিটের অপ্রয়োজনীয় কথা। নিয়মিত।
- মিনিমাম বারো সেকেন্ড। ম্যাক্সিমাম পাঁচ মিনিট বাইশ সেকেন্ড।
- বাহ, সময়ের ব্যাপারে বেশ হিসেবি আপনি। অথচ বছর দুই আগে কিনা আপনারই ঘড়ি বিকল হয়েছিল।
- দু'বছর দেড় মাস ম্যাডাম। অথচ! নামটাই জানা হল না।
- কাঁপুনি বাড়ল। এ'বার বেশ দুলছে।
- কত জরুরী সব ব্যাপার জানা হল না। এ'সব নামঠাম তো তুচ্ছ।
- জরুরী? যেমন?
- ভ্যানিলা না বাটারস্কচ। মাথা দাবানো ডটপেন না ঢাকনি। শৈলেন না সঞ্জীব।
- এ'টা আগেই বলেছি।
- সরি। সরি।
- কাঁপছে। আরও! 
- অ্যানাউন্সমেন্ট শুনেছেন? আমাদের নামতে বলা হচ্ছে!
- শুনেছি। নেমে যান।
- সর্বনাশ, ও'দিকের সিঁড়িটা ভাঙতে শুরু করল ম্যাডাম। চলুন!
- আপনার তো আপ লোকাল। ও'দিকটা অক্ষত। আমার ডাউনটা যখন মিস হচ্ছেই, থেকেই যাই। আপনি আসুন।
- ওহ।
- কই? গেলেন না?
- আমার নাম...।
- আরও মিনিট খানেক সময় আছে তো স্যরবাবু। জরুরী খবর আগে দিই। স্ট্রবেরি, সোনালি ঢাকনাওলা ফাউন্টেন পেন অনলি। আর কিছু স্যারবাবু?
- আচ্ছা ম্যাডামদেবী, মাঝরাতের ছাত না বিকেলের ঘাট?

Friday, September 29, 2017

মনখারাপবাবু

- এ কী! আপনি এইখানে?
- রিল্যাক্স মিস্টার চ্যাটার্জী। আমি আশ্চর্য প্রদীপ নই। পুজো প্যান্ডেলের ভিআইপি পাস নই। এমনকি কোনও স্ক্র‍্যাচকার্ডও নই। আমি মনখারাপ। ইউ আর সাপোসড টু রান অ্যাওয়ে ফ্রম মি।
- অমন করে বলবেন না স্যার। আপনি যে কী ভীষণ কাছের।
- রোম্যান্টিকালি বলছেন নাকি?
- যাক গে, কোথায় ছিলেন বলুন তো মশাই? মাস খানেক এক্কেবারে উধাও! পুজোর ক'দিন থেকে থেকেই আপনার কথা মনে পড়ছিল, জানেন? শেষে যে চাঁদুদার চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে ঘুগনির প্লেট হাতে আপনাকে দেখব, তাও নবমীর সন্ধেয়; এ'টা কিছুতেই ভাবতে পারিনি। হোয়াট আ সারপ্রাইজ।
- আচ্ছা, আমার কথা মনে পড়ছিল কেন?
- কী কেন?
- আমার কথা মনে পড়ছিল কেন? মতলবটা কী? হিডেন মোটিভ কোনও?
- মতলব ছাড়া আপনার কথা মনে পড়তে নেই?
- না পড়াটাই মঙ্গল।
- মনখারাপবাবু!
- কী চাই?
- আমার সঙ্গে কিন্তু আজ যেতেই হবে আপনাকে।
- কিন্তু...।
- কোনও কিন্তু শুনছি না!
- তাই বলে পুজোর হুল্লোড়ের মধ্যে আপনি আমায় বাড়ি নিয়ে যাবেন? বৌ মেয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কত প্ল্যান থাকার কথা...।
- আরে ধুর মশাই।
- ধুর মানে?
- কেউ কোত্থাও নেই। চারদিকে ট্রানজাকশন! ফেলো কড়ি মাখো তেল। অপরচুনিটি কস্ট দেখে ঠিক করে নেওয়া একে অপরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙব কি না। অপরচুনিটি কস্টে আপনি বেনিফিসিয়াল হলে তবেই সম্পর্ক। নয়ত কাঁচকলা। এই এক আপনি ছিলেন তাই..।
- তাই?
- মনে হয় একলা নই। আপনি থাকলে গান শুনি। দু'টো সৎচিন্তা করি। আপনাকে ছুঁয়ে বই পড়তে ইচ্ছে করে। ছাত ভালো লাগে। ইন্টারনাল সিস্টেম পার্জ করা কান্না। নো অপরচুনিটি কস্টের ক্যালকুলেশন স্যর। আজ আপনাকে ছাড়ছি না।
- মিস্টার চ্যাটার্জী।
- ইয়েস মনখারাপবাবু।
- আমার ওপর ভর দিয়ে আর কদ্দিন চলবে?
- যদ্দিন তদ্দিন।
- কেউ নেই? যার পাশে গুটিসুটি বসে আপনি সারেন্ডার করতে পারেন? আসলে আমার শিডিউল এত টাইট...।
- সারেন্ডার? বললাম যে; অপরচুনিটি কস্ট সর্বত্র। অপরচুনিটি কস্টে মাইনর মুনাফা দেখলেই সারেন্ডারের স্যান্ড গেঞ্জি হিঁচড়ে খুলে ঘর মোছার ন্যাতা করা হবে স্যর। প্লীজ স্যার, দিন দুয়েক অন্তত থাকুন। দ্বাদশী পর্যন্ত ছুটি। আমি স্যর ধোপার গাধা লেভেলের, কাজে ঢুকে পড়লেই আপনার মত ফাইনার এলিমেন্টকে বয়ে চলতে পারব না। তখন চারদিকে দিব্যি 'হ্যাঁ স্যার',  'হ্যাঁ গো', 'হ্যাঁ রে' বলে চালিয়ে দেব। কিন্তু কয়েক দিন থাকুন স্যার। মাঝরাতে দু'জনে ছাতে উঠে যাব'খন। মায়ের কথা ভেবে হেঁচড়েছেঁচড়ে যাব। প্লীজ। না বলবেন না মনখারাপবাবু!
- এত ইনসিস্ট করছেন যখন...আর এক প্লেট ঘুগনি অর্ডার করুন আমার জন্য। উইথ ডিম সেদ্ধ। আর ইয়ে, নজরুলের যে প্লে-লিস্টটা গতবার আমরা দু'জনে মিলে বানিয়েছিলাম, সে'টা আছে তো?

Thursday, September 28, 2017

থার্মোকলের বাটি

গোটা পিঠ রামথাপ্পড়ে ভাইব্রেট করে উঠল। পিছনে ঘুরতেই দেখি দীপুদা। সেই একগাল হাসি। সেই উষ্কখুষ্ক চুল। ফতুয়াটার বোতামগুলো আগের মতই খোলা। এক গাল খোঁচাখোঁচা দাড়ি। ময়লা পাজামা।

মণ্ডপের পিছনের দিকটা অন্ধকার। কামিনী ফুলের গাছটা নুয়ে পড়েছে সুবাসে। সিগারেট ধরাতে হলে এ'দিকে আসে ছেলেছোকরারা।

- দীপুদা! তুমি?
- ভুলিসনি তা'হলে!
- কবে ফিরলে?
- ফিরিনি।
- তবে?
- বুড়ি ছুঁয়েই কেটে পড়ব। কিছু কাগজপত্রে সই করার জন্য দাদারা ডেকেছিল। বাবার সম্পত্তির ভাগ কোনওদিন চাইব না সে'টা আগেই জানিয়ে ছিলাম। তবে লিগাল ভ্যালিডেশন ছাড়া দাদারা নিশ্চিন্ত হতে পারছিল না। অবলাইজ করতে চলে এলাম।
- কখন নামলে?
- আট সতেরোর কাটোয়া লোকালে নেমেছি। সাড়ে এগারোটাত ব্যান্ডেলে ফিরছি। হাতে এখনও দেড় ঘণ্টা সময় আছে। ভাবলাম তোর হালহকিকতের খবর নিয়ে যাই।
- দীপুদা, মণ্ডপে চলো!
- পাগল? সিগারেট দে।
- এই যে।
- থ্যাঙ্কস।
- কোথায় ছিলে এদ্দিন?
- হুঁ?
- এই পাঁচ বছর, কোথায় ছিলে?
- পরিব্রাজক। দিল্লী টু বলরামপুরম...ট্রেনে, বাসে, জাহাজে, পদব্রজে।
- বলরামপুর?
- পুরম। কেরলের একটা গাঁ। স্প্যানটা বোঝতে বললাম। গুজরাত, মহারাষ্ট্র, ছত্তিসগড় ; কিছুই বাদ যায়নি।
- কাজকর্ম?
- যখন যেমন।
- দীপুদা...।
- স্টেশন যাবি? সী অফ করতে?
- যাব তো।
- গুডবয়। শান্টুদার দোকান থেকে রুটি তড়কা প্যাক করিয়ে নেব।
- দীপুদা। থাকবে না?
- এলাহাবাদ যাচ্ছি রে। একটা কাপড়ের মিলে অ্যাকাউন্টান্টের চাকরী পেয়েছি। আপাতত মাসখানেক সে'খানেই।
- ভোগ বিতরণ শুরু হবে দীপুদা।
- ওহ, ঠিক হ্যায়। আয়। আমি ওয়েট করছি।
- দীপুদা, একবারের জন্য আসবে না?
- না।
- বাবানদা, শঙ্কর জ্যেঠু; আরও কত লোকজন আছে। তোমায় দেখলে সবাই কী খুশি হবে দীপুদা। ভোগ বিতরণ তুমিই সুপারভাইজ করতে তো। তোমার অ্যাসিস্ট্যান্টরা সবাই আছে। একবারে জন্য প্লীজ...।
- কদ্দিন পর পুজোয় বাড়ি ফিরলাম রে...।
- কেমন আছ দীপুদা?
- যেমন। তেমন।
- এ'ভাবে কদ্দিন?
- যদ্দিন। তদ্দিন।
- দিদিভাই এসেছে। মণ্ডপেই আছে এখন।
- ভোগ বিতরণ শুরু হবে। মাইকে বোধ হয় স্বদেশ জ্যেঠু, তাই না রে? আয় এ'বার।
- তুমি বোধ হয় বেরোবে...।
- দশটায় একটা ব্যান্ডেল আছে।
- দীপুদা...।
- আসি রে।
- এলাহাবাদের কোন মিল?
- ভাবছি চাকরীটা আপাতত থাক। ঝাড়খণ্ডের একটা গ্রামের স্কুলে ভলেন্টিয়ার দরকার। মাইনে নেই কিন্তু থাকা খাওয়া ফ্রী। পিকচারেস্ক ল্যান্ডস্কেপ রে।
- কোন গ্রাম?
- তারপর তোর দিদিভাই তোর আর্মট্যুইস্ট করে লোকেট করে নিক? নাকি? আসি!
- দীপুদা!
- হ্যাঁ রে, এখনও ভোগ শালপাতার দোনায় দেওয়া হয় না থার্মোকলের বাটি এসে পড়েছে? 

Monday, September 25, 2017

ফিলিপ্সের রেডিও

দাদুর একটা ফিলিপ্সের রেডিও ছিল। তিনটে বড় ব্যাটারির। এভারেডির লাল ব্যাটারি ছাড়া ভরসা করতে পারতেন না। প্রতি মাসে ব্যাটারি বদল করতে হত। গোটাদিনের সঙ্গী ছিল সেই রেডিওটা। এফএমে অভ্যস্ত হতে পারেননি। খবর শুনতেন। যে কোনও খেলার ধারাবিবরণী শুনতেন মন দিয়ে। আধুনিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত,  অতুলপ্রসাদী, নজরুলগীতি, বাউল; কোন ফ্রিকুয়েন্সিতে কখন বাজবে, সে খবর রাখতেন। টপ্পা ভালোবাসতেন। হেমন্তকে ভালোবাসতেন। ধীরেন বসুর কণ্ঠস্বর পছন্দ করতেন। কবীর সুমনে সবিশেষ আগ্রহ ছিল।

দৃষ্টিশক্তি যত ক্ষীণ হয়েছে, দাদুর বই পড়া তত কমেছে। বেড়েছে রেডিও শোনা। মামাবাড়ি গেলেই আমার রাতের শোওয়ার ব্যবস্থা হত দাদুর পাশে। রাতে বহুক্ষণ খুব লো ভল্যুমে রেডিও চলত খাটের পাশে।

জানালার একটা পাল্লা খোলা থাকত, তা'দিয়ে স্ট্রিটল্যাম্পের ঘোলাটে আলো ঘরের মেঝেতে এসে পড়ত। মাঝরাতের রেডিওর মিনমিনে সুরে সে আবছা হলুদ আলো মিশে যেত দিব্যি।

কখনও অনেক রাতের দিকে ঘুম ভেঙেছে। তখন ঘরময় ঘোলাটে আলো। কোনও একটা ফ্রিকুয়েন্সিতে সে সময় প্রতি রাত্রে খেয়াল বাজত বোধ হয়। তখন বছরের এই সময়টায়; জানালার খোলা পাল্লা বেয়ে অল্প শীতের আমেজ এসে ঘরের বাতাসে  মিশে যেত। দাদুর একটা শাল আমার গায়ে জড়ানো থাকত। সেই ফিলিপ্সের রেডিও থেকে ভেসে আসা সুরের গুণ এমনই ছিল যে তা রাতের নিস্তব্ধতাকে নষ্ট করত না।

"জেগে গেলে নাকি ভাই"? রেডিওর খেয়ালের সঙ্গে দাদুর একটা হাত আমার কাঁধে এসে পড়ত। ঘুম না আসলে পাশে সরে এসে বলত;
"সুরে মন দাও, কেমন? সুরে মন দাও। খেয়াল করলে বুঝবে কেমন ভাবে সুর কান বেয়ে গলা দিয়ে বুকে নামে, তারপর হাত পা মাথায় ছড়িয়ে পড়ে, তাই না ভাই"?

ঘুমিয়ে পড়ার মুহূর্তের মধ্যে দাদু চিরকালের জন্য সুর মিশিয়ে দিয়ে গেছেন।