Tuesday, August 8, 2017

সারাহাহ্

"ঘুম আসছে না"?

কী কাণ্ড! ভালোই আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছে; রাত তিনটে অথচ ঘুমটি-নট। কী অসোয়াস্তি। নতুন বেডশিটের জন্য কী?

"জোর করে শুয়ে থেকে কী হবে? ছাত থেকে ঘুরে আসুন বরং"।
ঢিলের পর ঢিল। বেকারের হদ্দ। তবে ছাতে না গেলেও, ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা জল দু'ঢোক খেলে ভালো লাগবে। আর ফ্রীজে খান দুই ক্ষীরকদম এখনও আছে বোধ হয়।

"নো স্যার, ক্ষীরকদমের বাক্স গতকাল রাতেই ফাঁক করে দিয়েছেন"।
হারামজাদা! ব্যাপারটা বাড়াবাড়ির পর্যায় চলে গেছে। তবে ফ্রীজে রাখা হলুদ বাক্সটা খালি দেখে একটু ঘাবড়ে যেতেই হল।

"ছাতে চলুন। ভালো লাগবে। এত রাত্রে খবরের কাগজ উল্টেপাল্টে দেখাটা অস্বাস্থ্যকর"।
ধুত্তোর। আনন্দবাজারটা দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেললাম। ব্যাপারটা আর সহজ ভাবে নেওয়া যাচ্ছে না।

"ছাতে। নিশ্চিন্ত বোধ করবেন। আর বেশ ফুরফুরে হাওয়া বইছে। রেডিওটা বন্ধ করুন।"।
ঘামতে শুরু করেছিলাম। নিশ্চিত ভাবেই কেউ গলা টিপে ধরতে চাইছে। মোবাইলের এফএম বন্ধ করে ছাতের সিঁড়ির দিকে গেলাম।

"পশ্চিম কোণে গিয়ে নীচের রাস্তায় চোখ রেখে দেখুন না"।
ব্যাপারটা কিছুতেই আর আমার হাতে ছিল না। অবসন্ন মনে এগিয়ে গেলাম ছাতের পশ্চিমের পাঁচিলের দিকে।

"এ'বার বিশ্বাস হল? যে আমি অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার বান্দা নই"?
গা গুলিয়ে আসছিল। নীচের রাস্তায় ফুলদার বন্ধ পান দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসা নীল ফতুয়া আর পাজামা পরা চেহারাটা আমার রীতিমত চেনা।

সদর দরজার সামনে এসে টের পেয়েছিলাম চাবি হারিয়েছি। ডুপ্লিকেট চাবি বাড়ির ভিতরেই রয়েছে। ফুলদার পানের দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলাম। ভোরের আগে তালা ভাঙার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সময় কাটতে চাইছিল না। তারপর হঠাৎ মনে পড়লো নিজের সারাহাহ্ একাউন্টটার কথা। এত লোকের এত গোপন মেসেজ আসে, আমার কপালে কাঁচকলা। নিজেই মোবাইলে নিজের একাউন্ট খুলে মেসেজ টাইপ করতে বসলাম।

ছাতের পশ্চিম কোণের পাঁচিলের ওপার থেকে ঝুঁকে পড়া মুখটা দেখে দিব্যি আনন্দ হচ্ছিল। আমার ভীষণ চেনা নীল ফতুয়া। আহা।

"ডুপ্লিকেট চাবিটা নীচে ফেলবেন প্লীজ? শোওয়ার ঘরের দেরাজে রাখা আছে"?
কী সাহস!  দুদ্দাড় করে ছাত থেকে নেমে এসে শুয়ে পড়লাম।

কী মুশকিল। আমায় এই অবস্থায় দেখেও নীল ফতুয়া হাওয়া!

"চাবিটা দিন না ভাই"।

হাজার দেড়েক বার একই মেসেজ পেয়ে বাধ্য হয় দেরাজ খুলে চাবি বের করে সদর দরজামুখো হলাম।

১০
অদ্ভুত! তালা খোলার শব্দ হলো। দরজা খুলে গেল। অথচ বাইয়ে সেই নীল ফতুয়া নেই।  বরং একটা দমকা হাওয়া এসে আমায় দিব্যি উড়িয়ে নিয়ে গেল।
ওড়ার আগে শেষ মেসেজ নজরে পড়ল
"ঘুঘু দেখেছ, কিন্তু ফাঁদ আনসীন? টাটা"।

উপসংহার

ঘুম আসছিল না। এ'দিকে ফ্রীজে ক্ষীরকদমও নেই। বিরক্তিতে হাতের কাছের আনন্দবাজার উলটে পালটে দেখছিলাম।
আচমকা ওই উৎকট বিজ্ঞাপনটা নজরে এলো।
"ঘুঘু তান্ত্রিক, সারাহাহ্ বিদ্যায় কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার প্রক্রিয়ায় সহজে ভূত বিদায়"।

তখনই মোবাইলে দেখলাম চার নম্বর মেসেজ:

"ছাতে চলুন। ভালো লাগবে। এত রাত্রে খবরের কাগজ উল্টেপাল্টে দেখাটা অস্বাস্থ্যকর"।

Sunday, August 6, 2017

দিদি ও জনার্দন

১। 

- ভাই, অ্যাই ভাই!
- উঁ। 
- অ্যাইই ভাই। ওঠ না। 
- না। 
- আয়। আয় না। 
- না! 
- ছাতে এক ছুটে যাব, এক ছুটে ফেরত। আয় না ভাই। 
- ঘুমোব!
- রোব্বারে দুপুরে কেউ ঘুমোয়?
- মা বলেছে। তুইও ঘুমো। 
- মা তোকে হিস্ট্রি বইতে লুকিয়ে রোজ সন্ধেবেলা নন্টেফন্টে পড়তে বলে?
- দিদি। বিকেলে যাব। এখন না। 
- তাহলে দেখতে পাবি না। 
- কী?
- সে’টা গেলেই দেখতে পাবি। 
- দরকার নেই আমার দেখে। 
- স্কোয়াশের সরবত বানাবো ছাদ থেকে ঘুরে এসে। ফ্রিজের জল। তা’তে আবার বরফ। 
- ছুট্টে যাব আর ছুট্টে চলে আসব?
- চ’। 


২। 

- অনিন্দ্য। 
- ইয়েস স্যর। 
- প্রেজেন্টেশন রেডি?
- মোটামুটি। 
- মাত্র ঘণ্টা দুই বাকি, এখনও মোটামুটি?
- আসলে স্যর ডেটায় এত গ্যাপ...। 
- এক্সকিউজ অ্যান্ড এক্সকিউজ! মাই গড অনিন্দ্য। তুমি এত বড় অ্যাসাইনমেন্ট যে কী ভাবে ম্যানেজ করবে...। লুক। আই ওয়ান্ট দ্য প্রেজেন্টেশন মেইলড টু মি ইন থার্টি মিনিটস। 
- ইয়েস স্যার। 

৩। 

- ভাই, এই দ্যাখ!
- এ’টা কী? ম্যাগোহ্‌!
- ন্যাকামো করিস না। এর নাম জনার্দন। 
- জনার্দনকে পেলি কোথায়?
- কার্নিশে পড়েছিল। ওই দিকের। আম গাছটার ডাল ভেঙে পড়েছে হয় তো। 
- এ’টা কাকের বাচ্চা না?
- তোকে যদি বিট্টু না বলে মানুষের বাচ্চা বলি শুনতে ভালো লাগবে?
- দিদি, মা দেখলে কিন্তু...। 
- সদ্য ডিম ফুটে বেরিয়েছে হয়ত। জনার্দনকে এখন ছেড়ে দিলে মরে যাবে। বিড়ালে খাবে। তার চেয়ে এই চিলেকোঠার ঘরেই থাক। জুতোর বাক্সটা কাজে লেগে গেল। 
- মা জানতে পারলে...। 
- তুই বলবি?
- আমার পড়তে বসে কমিক্সের বই পড়ার ব্যাপারটা...। 
- আমি মাকে বলব না। 
- জনার্দন খাবে কী?  
- কেন্নো দিলাম, দিব্যি খেয়ে নিল। তুই বিকেলে মাঠের ওদিক থেকে বেশ কিছুটা কেন্নো ধরে আনতে পারবি? চমনবাহারের খালি ডিবে দিয়ে দেব’খন। 
- আমার ঘেন্না লাগে। 
- তুই এত ন্যাকা কেন?
- আমি আজ তিন গ্লাস অরেঞ্জ স্কোয়াশ খাবো কিন্তু। 


৪। 
দীপার চিঠি। অন্তত খান চল্লিশেক। অনিন্দ্য মাঝেমধ্যে উলটেপালটে পড়ে। একমাত্র দীপার চিঠি পড়ার সময় অনিন্দ্য সিগারেট খায়। বেশ একটা ইয়ে লাগে। দীপাকে দিদি অঙ্ক শেখাত। 

ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত পাড়ায় ছিল দীপারা। 
ওঁর বাবার জামশেদপুরে ট্রান্সফার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত গোলমাল হয়ে গেল। এখন অবশ্য ফেসবুকে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হয়। টুকরোটাকরা হোয়াটস্যাপে মেসেজ। তবে এই চিঠিগুলোর কথা দীপাকে মনে করালে ও হয়ত লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। 
দীপার বর ভারী অমায়িক, শুভেন্দুদা। আমেরিকা থেকে আসার সময় অনিন্দ্যর জন্য দামী স্কচ নিয়ে এসেছিল; “তুমি নাকি দীপাকে প্রথম ব্যাটম্যান পড়িয়েছিলে? তার জন্য একটা গোটা ব্রিউয়ারি তোমার প্রাপ্য”। 
কী বাজে ঠাট্টা। দীপা অবশ্য হেসে গড়িয়ে পড়েছিল। 
সেই মদ এক চুমুক খেয়ে দিদিকে ফোন করেছিল অনিন্দ্য। ঘণ্টাখানেক ধরে দিদি ফোনের ওপার থেকে সঞ্জীবের রম্যরচনা পড়েছিল। 

দিদির গায়ে দুপুরের গন্ধ। 

অনিন্দ্য মদটাকে ঠিক গ্রিপ করতে পারেনি। সেই প্রথম ও শেষ চুমুক। 

৫। 

- দিদি, খাবি না?
- তুই যা না ভাই। বলেছি তো খাব না। 
- জনার্দনের বাঁচার কোনও চান্স ছিল না। বাবা বলল তো। 
- ও আমার জন্য মরেছে। কেন যে ওকে কার্নিশ থেকে তুলে আনতে গেলাম। ওখানে থাকলে হয়ত ওর মা ওকে দেখতে পেত, তুলে নিয়ে যেত। ধুস। 
- দিদি। আচ্ছা, তুই না হয় খাস না। কিন্তু কাঁদিস না। প্লীজ। 
- ভাই, তুই প্লীজ যা না। 
- কাল আমার অঙ্ক পরীক্ষা। 
- ফের ভয় পাচ্ছিস?
- তোকে কাঁদতে দেখে আরও নার্ভাস লাগছে। 
- ভালো ভাবে প্র্যাক্টিস করিয়েছি তো তোকে এ’বার। তুই এত হাবা কেন?
- ফেল করলে বাবা খুব...। 
- অনেক প্র্যাক্টিস করেছিস। এরপর ফেল করলে তোর কিছু করার নেই। 
- তবু। বাবা আমায় নিয়ে খুব চিন্তা করে। মাও করে হয়ত। এত খারাপ নম্বর পাই...। 
- ভাই। 
- কী?
- ভয় করছে? শিব্রাম পড়বি? ভয় দুম করে কেটে যাবে। 
- আমার কমিক্স ছাড়া কিছু পড়তে ইচ্ছে করে না।
- আমি পড়ি? তুই শুনে যা, কেমন?
- ভয়ে কমে যাবে?
- তুই অঙ্ক পরীক্ষার কান মুলে দিতে পারবি। দাঁড়া, শিব্রামটা নিয়ে আসি। 

৬। 

দিদির গায়ে দুপুরের গন্ধ। দিদির যে কোনও গল্পে পুজো ছুটির প্ল্যানের চনমন। দিদি মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে মনে হয় সামনেই গরমের ছুটি। বাবার দু’কাঁধে দুই ভাই বোনে থুতনি রেখে জব্বর ঘোরার প্ল্যান। ট্রেনের আপার বার্থটা কে নেবে, টিফিন কেরিয়ারে লুচির সঙ্গে আলুর দম না ছক্কা, কতগুলো গল্পের বই ব্যাগে নিলে ওজন বাড়াবাড়ি হবে না; এমন কত কী। 

দিদি অঙ্কে একই ভুল বার বার করলে রেগে যেত। কাউকে কটু কথা বললে দুঃখ পেত। বেড়াল কুকুরকে অবজ্ঞা করলে ওর মুখ কালো হয়ে যেত। ভয় পেলে দিদি জড়িয়ে ধরত। দিদি গল্পের বই পড়লে মনে হত হাওয়ায় একটা মাদুরে ভাসতে ভাসতে সিনেমা দেখা চলছে। 

মায়ের বায়পসি রিপোর্ট পেয়ে দিদিকে ফোন করেছিল অনিন্দ্য।
টেলিফোনের ও’পার থেকে অনিন্দ্যর হ্যালো শুনেই আঁচ করেছিল দিদি। 
- এ’বার মাকে বলে দিই তুই হিস্ট্রি বইয়ের মধ্যে নন্টে ফন্টের বই লুকিয়ে পড়ায় ফাঁকি দিতিস?
- হুঁ।
- ভাই...। 
- উঁ?
- জনার্দনকে মনে পড়ে? 
- হুঁ। 
- কষ্ট হচ্ছে?
- হুঁ। তোর?
- খুব। 
- তোর বেশি কষ্ট রে দিদি। 
- কেন? তোর কম?
- কমই তো। 
- কেন?
- আমার তবু তুই রইলি। 
- ভাই, তোর মনে আছে জনার্দন মারা যাওয়ার পর মায়ের কান্না? 
- হুঁ। 

***
মা টের পেলেন অনিন্দ্য দিদিকে ফোনে সঞ্জীব পড়ে শোনাচ্ছে। আহা রে, এখনও কমিক্স পড়া ছেলেটাকে কী সব রিপোর্ট আনতে হাসপাতালে ছুটতে হয়। 
মা রিপোর্ট আঁচ করতে পারেন।

ভাই বোন একে অপরের বন্ধু হতে পেরেছে, তাই চিন্তা কম। অনিন্দ্যর জন্য কড়া মিষ্টি দিয়ে এক গেলাস অরেঞ্জ স্কোয়াশ না বানালেই নয়; ছেলেটা এক হাজারটা অঙ্ক পরীক্ষার ভয় এক সঙ্গে পেয়ে বসেছে।     

Saturday, August 5, 2017

শারদীয়া খবর ও গল্প

-খবর-

সুখবর।

আইআরসিটিসিতে টিকিট নেই।
মেকমাইট্রিপে খোঁজ নেওয়ার দম নেই।

সোশ্যাল প্রেশারে নার্ভফেল করে পুজোর ছুটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে বাইরে যেতে হচ্ছে না।

-গল্প-

খরগোশ আর কচ্ছপ দৌড়বে।

প্রতিযোগিতা বলে কথা।

টান টান উত্তেজনা। উত্তেজনা ঠিক নয়। উল্লাস।
"খরগোশ জিতছেই" বলে কাগজে হেডলাইন। গাজর মার্কা তুবড়ি আর রংমশালে বাজার ছয়লাপ।

এমন সময় জানা গেল খরগোশের নাম "পুজো আসছে"।
আর কচ্ছপের নাম? "মানিব্যাগ খালি হচ্ছে"।

সেই যে খরগোশ গেল ভেবড়ে, তারপর কিছুতেই কিছু হল না। ফিনিশিং লাইন যখন খরগোশ পেরোলে তখন ওদিকে কচ্ছপ বাবাজী চিৎ হয়ে শুয়ে কীর্তন গাইছেন।

Wednesday, August 2, 2017

স্যাম্পেল টেস্টিং

- হজৌর!
- আরে এজেন্ট যে! এতক্ষণে আসার সময় হল তোমার? আর আধ ঘণ্টা দেরী হলে তোমায় নিকেশ করার হুকুম জারি করতাম।
- হজৌরের হুকুমনামায় মউত। সে তো খুশনসিবি।
- থামো থামো, ক্রমশ অয়েল মিল হয়ে উঠছ। পৃথিবীতে তোমার পরিচয় গোপন আছে তো? বাঙালিরা চিনে ফেলেনি তো তোমায়?
- জী বিলকুল গোপন।
- আর কাজের কাজ হল কিছু? স্যাম্পেল?
- আজ্ঞে হজৌর, স্যাম্পেল প্লান্ট করে দেওয়া হয়েছে।
- গুল নয় তো?
- তৌবা হজৌর তৌবা। হজৌরকে গুল দিলে আমার জিভে যেন সয়াবিনের কোপ্তা পড়ে।
- সয়াবিন? সে'টা কী?
- পৃথিবীর এক প্রত্যন্ত প্রদেশের খাদ্য। বহুত দর্দনাক হজৌর। তা সেই প্রদেশেই আমরা স্যাম্পেল প্লান্ট করে এসেছি।
- দেখো বাবা এজেন্ট! বিষ এক্সপোর্ট করতে গিয়ে ইম্পোর্ট করে ফেলো না। শেষে আমরা সবাই মিলে নিকেশ হই।
- আজ্ঞে হজৌর, দেড় ঘণ্টা কুলকুচি করেছি। জিভ এখন বিলকুল সাফ।
- তা স্যাম্পেল কোথায় পুঁতে এলে?
- বাংলায়। শুরুটা সে'খান থেকে করাই সুবিধে। আলাভোলা মানুষজন। একটা অদ্ভুত মন্ত্রপাঠ করে চলেছে সারাক্ষণ!
- মন্ত্র? কী মন্ত্র?
-ওই...কালচারকালচারকালচারকালচারকালচার...।
- বাপ রে! ওই মন্ত্রে হয় কী?
- কিচ্ছু না। ও'টা কিছু না হওয়ার মন্ত্র।
- কিছু না হওয়ার মন্ত্র?
- জী হজৌর। ওই প্রদেশের সক্কলে ত্রস্ত হয়ে আছে। যদি কিছু হয়ে যায়? যদি কেউ নড়চড় করে? যদি হাওয়া দেয়? তাই সবাই মন্ত্র পড়ে যায়, যাতে কিছু না হয়।
- ওই কালচারকালচারকালচারকালচারকালচার?
- জী হজৌর। ও মন্ত্র অব্যর্থ।
- গোলমেলে ব্যাপার তো হে এজেন্ট।
- কিন্তু স্যাম্পেল টেস্ট করার জন্য সেরা স্যাম্পেল পপুলেশন যে ওই প্রদেশেই হজৌর।
- তা স্যাম্পেল কাজ কেমন করছে?
- দুরন্ত হজৌর। দুর্দান্ত। সবাই মগ্ন। সবাই হারিয়ে যাচ্ছে। সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। সবাই নিজের ব্রেনে সেম সাইড গোল ঝেড়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা সফল। আমাদের রাস্তা সাফ। এই ভাবে গোটা পৃথিবীকে বিকল করে দেওয়া যাবে সহজেই।
- তারপর গোটা পৃথিবী আমাদের! এই ব্যাজার মার্কা গ্রহে আর পড়ে থাকতে হবে না।
- জী হজৌর। শুধু ওই সয়াবিনের বড়ি এড়িয়ে চলতে হবে।
- তা, এই বাংলা প্রদেশের স্যাম্পেল টেস্টিং প্রজেক্টের কী নাম দেওয়া হয়েছে?
- আজ্ঞে হজৌর; টেস্টনি।

Monday, July 31, 2017

করোলারি

- এতক্ষণে আসার সময় হল হে রাখহরি?

- বৃষ্টি দেখেছেন চক্কোত্তিদা? ক্যাটস অ্যান্ড ডগস। আপনার অ্যাসিস্ট্যান্টটিকে একটু বলুন দেখি এক কাপ দার্জিলিং সাপ্লাই দিতে। আমার আবার শুগারলেস। 

- কলিংবেল শুনেই সে ইন্সট্রাকশন চলে গিয়েছে শিবুর কাছে। 

- আগের দিন পেঁয়াজিগুলো বড্ড কড়া করে ফেলেছিল। আজকে একটু কেয়ারফুলি ভাজতে বলবেন প্লীজ। 

- আজ করলা স্পেশাল ফ্রাই। 

- করলা?

- অবহেলা কোরো না ভাই। করলার যে এমন ট্রান্সফর্মেশন হতে পারে সে'টা কামড় না বসিয়ে টের পাবে না। তিল, চালবাটা আর দু'চারটে সিক্রেট ইনগ্রেডিয়েন্ট মিলিয়ে...আমার স্পেশাল রেসিপি। 

- যা হোক। শিবুকে বেগুনীর কথা বলে দিতে হয়। করলা যদি বাই চান্স মুখ থুবড়ে পড়ে?  

- চান্স নেই। তবে বেগুনীতে কারুর কোনওদিন ক্ষতি হয়েছে বলে শুনিনি । সে ব্যবস্থা করা যাবে। যাক গে, 'বার আসল মালটা বের করো দেখি বাবা রাখহরি। 

- এত ইম্পেশেন্স নিয়ে আপনি যে কী করে রেসের মাঠে নার্ভ ধরে রাখেন চক্কোত্তিদা। 

- আরে ফটোফিনিশে পঞ্চাশ হাজার ফসকে গেছিল এইটিট্যুতে। তা'তেও টেন্স হইনি। পঞ্চাশ হাজারের আজকের দিনে ভ্যালু ভেবেছ? ক্যালিফোর্নিয়া ক্রোম শেষ মুহূর্তে চোক না করলে আজ আমায় লুঙ্গি ফতুয়া পরে সোদপুরের ফ্ল্যাটে বসে থাকতে হত না। যাক গে, আমায় ইমপেশেন্ট ভেবো না রাখহরি। এ'বারে জিনিসটা বের করো। 

- এই যে। 

- 'টা?

- ব্যাগটা খুলেই দেখুন না। 

- খুললাম। এই...এই...ডিবেতে আছে?

- আজ্ঞে।

- এই? 

- স্ট্রেট ফ্রম তিব্বত। 

- দেখতে তো হোমিওপাতির দানা মনে হচ্ছে। অবশ্য হলদেটে রঙ। 

- খান পঞ্চাশেক বড়ি আছে। ও'তেই আপনার চলে যাবে। 

- এই বড়িই স্বয়ং দালাই লামা হন্যে হয়ে খুঁজেছেন? কিন্তু পাননি?

- আলবাত। 

- অথচ তুমি পেলে?

- আপনি এত অবিশ্বাসী কেন বলুন তো চক্কোত্তিদা?

- টুয়েন্টি থাউজ্যান্ড নিচ্ছ ভাই রাখহরি। টাকাটা কম নয়। 

- অ্যাডভান্স তো মাত্র পাঁচ হাজার দিয়েছেন। পনেরোর পোস্ট ডেটেড চেক। কাজ না হলে চেক আটকে দেবেন। মিটে গেল। 

- পাঁচটা তাহলে ভোগে? এ বড়ি কাজে না লাগলে?

-   আপনি একটা নেগেটিভিটির ডিপো। আমি কি মাদুলির সেলসম্যান? যে আজ আছি আর কাল নেই?  

- একটা কথা বলো, এ বড়ি টেস্ট করে দেখেছে তুমি?

- না। আমার হাইটের ভয় আছে, জানেন তো। আমি যখন কলেজে তখন মেজজ্যাঠা নিকোবারে একটা কন্ট্রাক্টরির কাজ করত। আন্দামান ঘুরে যাওয়ার জন্য আমায় প্লেনের টিকিট কেটে দেবে বলে ঝুলোঝুলি; আন্দামান দেখার লোভ থাকলেও প্লেনে উঠতে রিফিউজ করেছিলাম। শেষে গিয়েছিলাম জাহাজে। দার্জিলিং পর্যন্ত এড়িয়ে চলি, অলটিচিউডের বাড়াবাড়ি আমার ধাতে সয় না। কাজেই এই বড়ি খেতে যাওয়ার কোনও মানেই হয় না। 

- তাহলে কাজ যে দেবেই সে'টা এত নিশ্চিত হলে কী করে? 

-  কারণ আমি মহান জামইয়াংকে দেখেছি। যার আবিষ্কার এই বড়ি। তিনি নিজে এ বড়ি খেয়ে ডেমনস্ট্রেশন দিয়েছিলেন। সেই জামইয়াং যার টিকির দেখা স্বয়ং দালাই লামাও পাননি। 

- তুমি কোনও দিন তিব্বত গেছ বলে তো...। 

- জামইয়াং কি শশীবাবু? শ্যামবাজারের বাইরে যার খোঁজ পাওয়া যাবে না? আরে জামইয়াংকে বেঁধে রাখবেন তিব্বতের মধ্যে? শুনে রাখুন, জামইয়াংয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা মৌলালির কাছে। সে এক লম্বা গল্প। যাক গে। এই রইল বড়ির ডিবে। শিবুকে ডাকুন দেখি। চা না পেলে চলছে না আর।


***

তিন দিন হয়ে গেল সিলিং থেকে নামা হয়নি চক্রবর্তীবাবুর। একটা মাত্র বড়িতেই এই। তাও ভালো বড়িটা বাড়ির বাইরে গিয়ে খাননি, নয়তো এতক্ষণে ভাসতে ভাসতে বঙ্গোপসাগরের ওপর গিয়ে  পড়তে হত। বে অফ বেঙ্গল পুরীতে বাদাম চিবুতে চিবুতে ভালো লাগে, ফর্ম্যাট পালটে কেমন লাগবে বলা মুশকিল।
সিলিং ফ্যানের ব্লেডগুলোকে সেন্টার টেবিলের মত ব্যবহার করতে হচ্ছে, শিবু মই বেয়ে উঠে সে'খানে চা খাবারদাবার রাখছে আর নামিয়ে আনছে। রাখহরি এর মধ্যে একদিন দেখা করে বাকি টাকার জন্য তাগাদা দিয়ে গেছে। সেই জানালে যে জামিয়াংয়ের হিসেব বলছে যে বড়ির প্রভাব কাটতে আরও দিন দুই লাগবে।

মনটা বেশ চনমনে লাগছিল চক্রবর্তীবাবুর। সিলিংয়ে বসে বসেই নেমন্তন্নের লিস্টটা ফাইনাল করে ফেললেন তিনি।
প্রমোশনের নামে প্রহসনওলা বস।
অকারণ হেনস্থা করা সহকর্মীগুলো, বিশেষ করে সমাদ্দারের ব্যাটা।
দেশের বাড়ির বিধুবাবু, অকারণে মামলা করে দু’বিঘে হাতিয়ে নিলেন ভদ্রলোক।
মধু মাছওলা এন্তার ঠকিয়েছে গত কুড়ি বছর ধরে। হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার।
প্রতিবেশী কমল শিকদার, রোজ খবরের কাগজ নিয়ে আর ফেরত দেওয়ার নাম নেই।
কালনার মেজপিসি, সেই দশ বছর ধরে বলছেন পুকুরের মাছ পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু আদতে লবডঙ্কা।

এমন আরও জনা পঞ্চাশেক। পাড়ার ক্লাবের মাঠ ভাড়া করে বিশাল আয়োজন হবে। শামিয়ানা থাকবে না। সমস্ত আপদের দলকে ভুঁড়িভোজ খাওয়ানোর অছিলায় উড়িয়ে দেবেন। স্রেফ উড়িয়ে দেবেন। সাত দিন ধরে এঁরা উড়বে। কেউ পৌঁছবে ভ্ল্যাডিভস্টক তো কেউ জাফনা। কেউ হয়ত প্রশান্ত মহাসাগরে তলিয়ে যাবে।

যাক গে।

একটা বদলার মত বদলা হবে।

***

-      চক্কোত্তিদা! আপনি...আপনি পাগল হলেন নাকি? কলার ছাড়ুন আমার!

-      রাখহরি‍! আমার সঙ্গে চালাকি নয় বাছাধন। আমার সঙ্গে চালাকি নয়। বারো ক্লাস পর্যন্ত নরেনবাবুর কাছে কুস্তি শিখেছি। আমার সঙ্গে চুক্কি চলবে না।

-      আরে হয়েছেটা কী?

-      ওই ডিবের বড়িগুলো। সব ফাঁকি। অকাজের। ইউসলেস।

-      মানে? দিব্যি তো আপনি সাত দিন ভেসে রইলেন। আমি নিজে গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করে এলাম। কলার ছাড়ুন!
-      শাট আপ! ওই একটা বড়িই কাজের ছিল। বাকি সব ফাঁপা! অকাজের। কেউ উড়ল না। প্রত্যেকটা করলা ফ্রাইতে একটা করে বড়ি দেওয়া ছিল। সবাই খেলে, কিন্তু কেউ ভেসে গেল না।

-      কী? কেউ ভেসে গেল না মানে? ও বড়ি আপনি অন্যদের খাওয়াতে গেছেন?

-      আমার বড়ি আমি যাকে খুশি খাওয়াব! কিন্তু বড়ি কাজ করবে না কেন?

-      আরে! বড়ি অর্ডার নেওয়ার সময় আমি আপনার থেকে আধার কার্ডের জেরক্স নিয়েছিলাম ভুলে গেলেন?

-      তা’তে কী?

-      ওই বড়িগুলো আপনার আধার নম্বরের সঙ্গে লিঙ্ক করা যে চক্কোত্তিবাবু! অন্য কেউ খেলে কাজ করবে কেন?।

-      যাহ্‌, সাপও মরল না। এ’দিকে বিস্বাদ বড়ি মিশিয়ে আমার করলা ফ্রাইয়ের স্পেশাল রেসিপিও জনতার কাছে তিরস্কৃত হল। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এ আমি কী করলাম হে রাখহরি। এ আমি কী করলাম!