Sunday, May 7, 2017

ডাক

- শুনুন।
- আমায় কিছু বলছেন ম্যাডাম?
- গোটা রাস্তায় আপনি তো একাই আছেন।
- কী দরকার?
- এত রাত্রে আপনি বাড়ির বাইরে কেন?
- প্রশ্নটা আমিও করতে পারি!
- করেননি। আমি করেছি।
- তা ঠিক।
- কেন? এত রাত্রে বাড়ির বাইরে কেন?
- আমার অসময়ে হাঁটতে ভালো লাগে।
- ভালো লাগে। ভালো লাগে। ভালো লাগে...।
- ও কী। অমন স্তোত্রপাঠ শুরু করলেন কেন। ভালো লাগতে নেই?
- আমার আলতা ভালো লাগে জানেন।  আর আলপনা। আর মিছিরি ভেজানো জল। আর বিকেল।
- ম্যাডাম, আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন?
- আপনার এই মাঝরাত্রে হাঁটতে ভালো লাগে কেন মশাই?
- মহামুশকিল। জেরা শুরু করলেন দেখছি।
- মাফ করবেন, আমার না মাথার ঠিক নেই।
- সে'টা দিব্যি বুঝতে পারছি। ইয়ে, কিছু মনে করবেন না আপনি যে ভূত নন, সে'টা টের পেয়ে আশ্বস্ত বোধ করছি। দিব্যি আপনার ছায়া পড়ছে ফুটপাথে।
- ভূত নই। তা ঠিক। তবে...তবে একটা সমস্যা হয়েছে!
- সমস্যা? কী রকম? বাড়ি খুঁজে পাচ্ছেন না?
- ব্যাপারটা একটু গোলমেলে...।
- দেখুন ম্যাডাম, এত রাত্রে এমন অন্ধকার রাস্তায় আপনি এই যে এসে গপ্প জুড়ে দিলেন, কোনও বদ মতলব নেই তো? 
- আমায় একটু সাহায্য করবেন প্লীজ?
- কী কেস? পুলিশ টুলিশ ইনভলভড আছে কি?
- আমি গোলমেলে নই, বিশ্বাস করুন।
- টাকা চেয়ে লাভ নেই, রাত্রে হাঁটতে বেরোনোর সময় আমার পকেটে মানিব্যাগ থাকে না।
- ব্যাপারটা তা নয়।
- তবে?
- আপনি..।
- আমি?
- আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায় আমি বড় মুশকিলে পড়েছি।
- সে কী! আপনি কি এখানে বোমাটোমা ফাটাবেন ভেবেছিলেন? আপনি কি উগ্রপন্থী?  তা হলে এমন বিউটিপুল তাঁতের শাড়ি পরা উগ্রপন্থী আমি এই প্রথম দেখলাম।
- আপনি ভুল বুঝছেন। ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়।
- তবে? তবে ডাকলেন কেন?
- আপনাকেই তো ডাকার কথা ছিল।
- তাহলে অসুবিধেটা কোথায়? ডেকেছেন, বেশ করেছেন। ল্যাঠা চুকে গেল।
- সে'খানেই গড়বড়।
- কী'রকম?
- আমার আপনাকে ঘুমের মধ্যে ডাকার কথা ছিল। সে জন্যেই আপনার বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পথেই আপনাকে দেখে কেমন গুলিয়ে গেল। এত রাত্রে না ঘুমিয়ে কেউ হাঁটতে বেরোয় মশাই?
- ঘুমের মধ্যে ডাকার কথা ছিল...কেন? আপনি...আপনি কে?
- আমি...।
- তুই..তুই...?
- চিনতে পেরেছিস বাবু? এত সময় লাগলো চিনতে? এতটা? তোর কী হয়েছে? স্কুল বাড়ির মাঠ, গঙ্গার ঘাট, তোদের ছাদের সন্ধ্যে; সব গুলিয়েছিস? এমন পাগলের মত রাস্তায় রাস্তায় টহল দিস কেন রাত্রে? মন খারাপ? আমায় বলিস না কেন? আমি দূরে চলে গেছি বলে আমায় বলতে নেই?
- এ সব পাগলামি!  ধুস! সবটাই স্বপ্ন। অথবা আমার মাথাটা সত্যিই গেছে।
- তুই ভুল দেখছিস না বাবু! ওই দ্যাখ, ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমার ছায়া।
- তুই অন্য শহরের। অন্য কারুর। অন্য কোনও জগতের। তোর এখানে থাকার কথা নয়। আমি ভুল দেখছি। দূর হ।
- তুই ভালো নেই। তোর জন্য এসেছি। বিশ্বাস কর আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, সেই অন্য শহরে আমার আস্তানায়। কিন্তু নিজের স্বপ্নে অন্যের রিয়েলিটি ফুঁড়ে চলে আসা যায়, যেমন আমি আসতে পেরেছি।  আমি তোকে ঘুমের মধ্যে ডেকে নিতে এসেছিলাম। জানতামই না তোর এই মাঝরাত্রে রাস্তায় হেঁটে বেড়ানোর অভ্যাস হয়েছে। আমার এই আসা মিথ্যে নয়।  আয় বাবু, আয়।

**
অনিন্দ্যবাবু ব্রীজের রেলিং পেরিয়ে যখন পরম নিশ্চিন্তে ঝুপ করে নেমে গেলেন, তখনও নিশির "আয় বাবু আয়" ডাক তাঁর কানে ঝুমঝুমির মত বেজে যাচ্ছিল।

Thursday, May 4, 2017

না

- আয়। এ'দিকে আয়।
- না, এই কাগজটা ছোটকা দিয়ে পাঠিয়েছিল। কাকুকে দেওয়ার জন্য। কাকু নেই যখন...থাক্। আমি পরে আসব'খন।
- বাবা নেই বলে আসবি না?
- বাজারে যেতে হবে। মা একটা লম্বা ফর্দ ধরিয়ে রেখেছে।
- আমি কবে এলাম, জানতে চাইবি না?
- মিতুলদি বলেছিল তুই এসেছিস।
- তাহলে আগে দেখা করতে আসিসনি কেন?
- আজও ঠিক..।
- আমি কেমন আছি, জানতে চাইবি না?
- তোরা কেমন আছিস?
- খুব লায়েক হয়েছিস, না?
- কেন?
- তুই চাকরী পেলি, জানাতে নেই?
- ধুস। ও আবার চাকরী। বড়বাজারের গদি। সে'খানে কমিশনে কাজ।
- ব্যাঙ্কের পরীক্ষায় পাশ করেছিলিস, সে'টার কী হল?
- সে কবেকার কথা। ইন্টারভ্যিউয়ের ঠিক আগে পক্স। আজ আসি।
- মামলেট ভাজব? খাবি?
- না।
- খেতে নেই?
- তা না।
- আমায় মেলায় নিয়ে যাবি?
- না।
- চিঠিগুলোর উত্তর দিবি?
- না।

একের পর এক "না" বাতাসে উড়তে থাকে। ঘরের সিলিঙে মেঘ ধাক্কা খায়। সাইকেলের ক্যাঁচরম্যাচর উড়িয়ে চেকহাফশার্ট হলুদ তাঁতের ছলছল ভাসিয়ে দেয়। সহজে।

Wednesday, May 3, 2017

নজরুল ও এয়ারকন্ডিশনিং



- ভাগ্যিস এয়ার কন্ডিশনিং মেশিনটা খারাপ ছিল! দেড় মাস মিটার কম উঠলো। কড়কড়ে কতগুলো টাকা বেঁচে গেল বলো তো!

- অসহ্য!

- গরমটা! তাই না?

- তুমি! তুমি অসহ্য!

- সঞ্জীব বলে গেছেন কষ্ট না করলে উঁচু মানুষ হওয়া যায় না।

- বেশ। তাহলে উঠোনে গিয়ে আধঘণ্টা ওঠবস করো। বেশ কষ্ট হবে। হাইট দু ইঞ্চি বেড়েও যেতে পারে।

- গরমকালে তোমার মেজাজটা চিরকালই একটু ইয়ে..।

- ইয়ে?

- চিড়বিড়ের দিকে থাকে। বৃষ্টি ছাড়া তোমার চলবে না। ঝমঝমে পাওয়ারপ্লে নয়। ঝিরেঝিরে পোস্ট লাঞ্চ সেশন।

- এত কথা বলো কেন?

- অবিশ্যি ওয়েদার আমার হাতে নেই।  তবে নজরুল আছে। শুনবে?

- বাবা গো!

- অরুণ রাঙা গোলাপ কলি,  কে নিবি সহেলী আয়..। সুরের চলকে ওঠাটা নোটিস করেছ? বাতাসে আতরের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে যেন।

- কাল অফিস ফেরতা আমি বাপের বাড়ি যাবো।।

- ওই বুর্জোয়াতন্ত্রের আখড়ায়? যে'খানে পাশাপাশি দু'খানা এয়ার কন্ডিশনারের শনশন?

- ধুত্তোরিছাই! এসি চুলোয় যাক। কিন্তু সব সমস্যায় নজরুল ছুঁড়ে মারলে কাহাতক সহ্য হয়? বাথরুমের কলে জল আসছে না, বাবু গাইছেন নয়নভরা জল। মাসকাবারির লিস্ট বানাচ্ছি আর তুমি গ্লুকনডি গোলা গেলাস হাতে গাইছ "শুনি সাকি তোমার কাছে ব্যথা ভোলার দারু আছে"। আর নয়।

- আমায় ছেড়ে ইকনমিক টাইমসে মলাট দেওয়া পঞ্জিকা রাখা বাড়িতে যাবে?

- ভগবান, আমার যে মরণ কেন হয় না।

- জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কোন ব্যাটা কবে। মরণ ইস  অমোঘ অ্যান্ড অবিচল। ভগবানের কাছে কিছু চাইতেই হলে নজরুলে ভেসে যাওয়ার সুযোগ চাও!

- উফ মা গো!

- ভেসে যাওয়ার সুযোগ চাও।

- গাইব। কিন্তু খবরদার যদি তুমি টেবিল ঠুকে তাল দিয়েছ। ওই বেতাল ঘামের প্যাচপ্যাচের চেয়েও খারাপ।

- তোমায় ঠিক পারসুয়েড করেই ফেলি। দেখো, এমনভাবেই একদিন ঠিক এসির মেকানিক ডেকে ফেলব, ঝপাৎ করে! আজ বরং আমার গহীন জলের নদীটা ধরো। সে সুরে গায়ে দিব্যি বাতাস লাগে।

গ্রম্

সকাল থেকে যতটা ঘেমেছি তা দিয়ে একটা দেড়কিলো সাইজের মেঘ তৈরি করা যেতে পারে।

ঘামাচি শস্য হলে আমার নাম নবান্ন হত।

মেজাজ চাটু হলে সে'টাকে ইগলুর মাথায় রেখেও তা'তে অমলেট ভেজে খেতে পারবেন।

জল গিলে গিলে পেটে বে অফ বেঙ্গল অথচ গলা জিভ জুড়ে কালাহারি।

ফ্যানের হাওয়া গরম, বাতাস গুমোট। প্রতিটা অক্সিজেনের দানায় ছুঁচের ডগা।

আমাদের গোটা ইভোলিউশনের স্ট্র্যাটেজিই ভুল ছিল। হাঁটতে না শিখে আমাদের মাছের মত জলের তলায় নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য গিল গজিয়ে নেওয়া উচিৎ ছিল। দিব্যি চৌবাচ্চায় চুবনি খেয়ে দুপুর কাটানো যেত।

Tuesday, May 2, 2017

জাপানী অ্যালার্ম

- এই যে। এই যে স্যার! শুনছেন?
- উঁ।
- স্যাটারডে সকালে বাড়তি ঝিমটি দেবেন, তা'তে ক্ষতি নেই। কিন্তু বেলা কত হল খেয়াল আছে কি?
- উঁ, উঁ।
- মানে মানে উঠে পড়বেন না পায়ে সুড়সুড়ি দেব?
- কী হচ্ছেটা কী?
- আপনাকে ঘুম থেকে তোলাটা দরকারি।
- কে বলেছে দরকারি?
- আমি অ্যালার্ম ঘড়ি, মানুষকে ঘুম থেকে তোলা ছাড়া আমার অবভিয়াসলি আর কোনও কাজ নেই। কাজেই আপনার ঘুম সময়মত ভাঙিয়ে দেওয়া আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
- জাপানীরা যে কী সর্বনেশে ঘড়িই বানালে। আর আমি কী কুক্ষণেই যে গতকাল এস্পল্যানেড থেকে কিনতে গেলাম।
- কথায় কথায় জাপানী বলবেন না, আমি বাঙালি ঘড়ি হিসেবে কনফিগারড।
- স্নুজ মেরে চুপটি করে বসুন। আরও আধ ঘণ্টা লাগবে আড়মোড়া ভাঙতে।
- অসম্ভব। লুচি ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
- কী?
- লুচি। মিইয়ে যাচ্ছে। উঠুন।
- ধ্যার। আমাদের বাড়িতে ও'সব হয় না। সবাই ক্যালরি কনশাস।
- মাইরি। গড প্রমিস। আজ আপনার জন্য লুচি। সারপ্রাইজ রেখেছেন বৌদি।
- রিয়েলি?
- জি এম টির মত।
- ইউরেকা!

**

- মিতুলামসি ঘাঘামাচি, হাকুচি মোকানুচো মিচ্যনুক তানুকাসি?
( পাঠকদের স্বার্থে অনুবাদ: বলেন কি ডক্টর ঘাঘামাচি, এই অ্যালার্ম ঘড়ি বাঙালিদের ল্যাদ ঘুম ভাঙাতে পারবে?)

- ওকাচোকি ওকাচোকি, মুশ ওকাচোকি। মুচ হাকুচি চুনাকানোচি মগিয়ামা।
(পাঠকদের স্বার্থে অনুবাদ: পারবে পারবে নিশ্চই পারবে। এ ঘড়িকে আমি ডাহা মিথ্যে বলতে শিখিয়েছি)।