Friday, January 13, 2017

যুক্তিযুক্ত

কোনও কাজ যুক্তিযুক্ত ভাবে না করতে পারায় যে কী প্রবল আনন্দ।
কাজ করবও না, অথচ সে "না করা"টা এমন ভাবে জনতার সামনে এসে "হাউ ডু ইউ ডু" বলবে যেন সে'টাই একটা দৃষ্টান্ত।

কত সজীব যুক্তি সাজানো যায় কাজ না করার জন্য। সে সব যুক্তি এতই প্রাঞ্জল যে অজুহাতের মত সরল ট্যাগে তাদের বেঁধে ফেলা যায় না।

যেমন?

"তুই বলার আগে থেকেই আমি তৈরি ছিলাম তোকে হাওড়া থেকে পিক্ আপ করব বলে। কিন্তু কী বলব ভাই, বড্ড গা ম্যাজম্যাজ আর আমার সাইনাসের ধাতটা তো জানিসই। সিজনটাই গোলমেলে। তবে শুনেছি আজকাল প্রিপেড ট্যাক্সির লাইন বেশি লম্বা হয় না"।

"এহ বাবা, কী আনফরচুনেট কোইন্সিডেন্স দেখুন। ঠিক আপনার দরকারের সময়ই আমার ফোনটা কী ভাবে যেন সাইলেন্ট মোডে চলে গেসল। ধুস্"।

"ব্লাড ডোনেট করা আর সোশ্যালি কন্ট্রিবিউট করা এমনিতে আমার প্যাশন। অফিস কামাই করতেও কোনও অসুবিধে ছিল না, কিন্তু ছেলের উইকলি টেস্ট পড়েছে ওইদিন ভাই। ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ। আর এ তো আর আমাদের গায়ে হাওয়া লাগানো জমানা নয়, উইকলি টেস্টের একটা পারসেন্টেজ অ্যাড হয় ফাইন্যালে। ভীষণ প্রেশার। নেক্সট টাইম হলে জানিও, পৌঁছে যাব"।

" যাহ্, তুই একটা ইডিয়ট। আর দু'দিন আগে চাইতে পারলি না টাকাটা? এই জাস্ট গতকাল এল আই সির প্রিমিয়াম দিতে গিয়ে প্রায় ব্যাঙ্করাপ্ট হয়ে গেলাম। তার ওপর তিনটে ই এম আই, বুঝতেই পারছিস।  তুই গত পরশু বললেই হয়ে যেত। অবশ্য এটাও ঠিক, পরশু তো আর তুই জানতিস না যে দু'দিনের মাথায় মেসোমশাইয়ের স্ট্রোক হবে"।

"মন খারাপ ? আগের মত চলে আসব? ঝট্ করে? তোমায় হাইজ্যাক করে তুলে আনব? তারপর নতুন গল্পের বই? দুপুরে শুয়ে গল্প? বিকেলে হন্টন? সন্ধ্যেবেলা খাবারওলার ঝুড়ি থেকে সন্দেশ, লেডিকেনি আর নিমকি? রাতের বেলা দিদার রান্না আধফালি করা হাঁসের ডিমের মশলাদার ঝোল? সঙ্গে পায়েস? রাত্তিরে দু'জনে রেডিও শুনব? নজরুল? রজনীকান্ত?  অতুলপ্রসাদ? ফ্যান চললেও তোমার হাতপাখার হাওয়া চাই? মিঠে লাগে বড্ড? চোখ জড়িয়ে আসে? ক্রিকেটের গল্প শেষ হওয়ার আগেই? চলে আসাই যায়। ঝট্ করে। তবে দাদুভাই, তোমার রেটিনা এখনও ভূত ক্যাপচার করতে শিখেছে কি? মনে হয় না। আর ক'টা দিন যাক। কেমন"?

Tuesday, January 10, 2017

কবিতার জন্ম

শিরশিরে একটা স্পর্শ, পিঠের নিচের দিকটায়, মেরুদণ্ড ঘেঁষে - কয়েক সেকেন্ডের জন্য অনুভূত হয়েছিল।

আর তারপরই নেমে আসে যন্ত্রণার অমোঘ ভার। দম বন্ধ করা ব্যথা ওর চিৎকারটুকুও গিলে ফেলেছিল। হাফ শার্টের পিঠের জুড়ে তাজা রক্তের উষ্ণতা।

আমহার্স্ট স্ট্রিটের এ অঞ্চলটা নিরিবিলি। আলো কম। দূরের ল্যাম্পপোস্ট থেকে ভেসে আসা ঘোলাটে আলোয় তৈরি করা আবছায়ায় ধুপ্ করে লুটিয়ে পড়ল অমূল্য।

আর তখনই পিছন থেকে যে পাথুরে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, তাকে কফিহাউসের উদ্দাম গমগমের মধ্যেও নিশ্চিন্তে চিনে নিতে পারবে অমূল্য; বিপিনদা। কবি বিপিন দত্ত।

- চিন্তা করিস না অমূল্য, তোর হাতে এখনও মিনিট পাঁচেক সময় আছে।
- বি..ব...বিপিনদা...তুমি? তুমি?
- কবিশ্রেষ্ঠ শ্রী অমূল্য চক্কোত্তি। কবিদের এত সহজে অবিশ্বাসী হতে নেই।
- তুমি...তুমি..উন্মাদ।
- উন্মাদ। তবে ট্রেটর তো নই রে অমূল্য। কবিতাকে বেচে খাইনি।
- ক...কী বলছ?
- তুই ভুলে গেছিস, আমি ভুলিনি। আমাদের দিনের পর দিন আলোচনা চলেছে। কবিতা নিয়ে। কবিতার প্রতি ভালোবাসা নিয়ে। কবিতা ছাড়া কোনও আনুগত্য থাকার কথা ছিল না আমাদের। কিন্তু তুই ছোটা শুরু করলি অন্যদিকে। বড় পাবলিশার। বড় দাদারা। বড় দিদিরা। পুরস্কার।
- আমি সাহিত্য পু..পুরস্কার পেয়েছি বলে...।
- পেয়ে অন্তত তোর মুখোশটা খুলে গেছে। তুই যে আদতে একটা ঢ্যামনা বিজনেসম্যান সে'টা স্পষ্ট হয়ে গেছে। তুই কবিতা লিখতে চাস না। তুই সেলিব্রেটি হতে চাস। তোর ওই ফেমাস দাদা দিদিদের মত তুই ম্যানুফ্যাকচারিং শিখতে চেয়েছিলিস। শোম্যানশিপ। কবিতা ম্যানুফ্যাকচারিং নয় অমূল্য। তোকে শেখানোর চেষ্টা করেছিলাম। তুই শিখলি না। আমার পত্রিকায় লেখা না দিয়ে বড় নাম দেখে লেখা পাঠালি। ভালোই হল। বড় পুরস্কার পেলি। দশটা লোকে তোর কথা জানল। তাই আমিও ভাবলাম তোকে একটা গিফ্ট দিই। কনগ্র‍্যাচুলেশনস।
- আজ...আজ বুঝলাম..।
- কী? কী বুঝলি?
- রে..রেড..রেড ওয়াইন তোমার...তোমার..বুঝলাম তোমার রেড ওয়াইন টক লাগে কেন।

অমূল্যর আরও দু'মিনিট বাঁচার কথা ছিল। কিন্তু ওর শ্লেষ সহ্য করতে পারল না বোধ হয় বিপিন দত্ত। ওর পিঠ থেকে ছুরি খুবলে বের করে দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ বারের জন্য বিঁধিয়ে দিল বিপিনদা, তবে এবার বুকে।

এক সময় অমূল্যকে বড় স্নেহ করতেন বিপিন। ছেলেটার রক্তাক্ত লাশটার দিকে তাকিয়ে সামান্য মায়া হল। শেষকৃত্যর দায় অনুভব করলেন বিপিন দত্ত। নিজের কাঁধের ঝোলা হাতড়ে একগুচ্ছ কাগজ বের করলেন তিনি; গত দশবছর ধরে জমানো বড় প্রকাশকদের অসংখ্য প্রত্যাখ্যানের চিঠি আর বিভিন্ন পুরস্কারের জন্য গোপনে পাঠানো মনোনয়নের ব্যর্থ কপি।

লাইটারে সে কাগজের গোছায় আগুন ধরিয়ে অমূল্যর মুখাগ্নি করলেন বিপিন দত্ত। আর ঠিক তখনই তাঁর আগামী কবিতার প্রথম লাইনটা মাথায় এলো;

"না পাওয়া পুরস্কারের প্রতি কবির লোভ থাকতে নেই..."।

জলভরা

বাক্সের ডালাটা ভিতর থেকে ঠেলে তুলে উঁকি দিলেন অর্ণববাবু।

বাক্সের অন্ধকারে অভ্যস্ত অর্ণববাবুর চোখে বাক্সের বাইরে আলো পড়তেই মগজে ঝিলিক লেগে গেল। আলো সয়ে আসতে তিনি টের পেলেন যে বাক্সের বাইরে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে আদতে একটা প্রকাণ্ড জলভরা সন্দেশ।

গা গুলিয়ে উঠল অর্ণববাবুর। কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে। উলটো ঘটছে সবকিছু। আচমকা ঘোর কেটে গেল নিজেকে কাটা একটা চিমটিতে।

এ'বার নিশ্চিন্ত হয়ে অর্ণববাবু দেখতে পেলেন তার সামনের টেবিলে রাখা নিউ শ্রীকৃষ্ণ স্যুইটসের পেল্লায় বাক্স। আপ্লুত হয়ে সে বাক্সের দিকে হাত বাড়ালেন তিনি আর ঠিক তখনই...।

ঠিক তখনই মিষ্টির বাক্সের ঢাকনাটা আপনা থেকেই সামান্য খুলে গেল আর তার ভিতর থেকে উঁকি মারলে একটা কাচুমাচু মুখ যে'টা অবিকল অর্ণববাবুর মত দেখতে।

অর্ণববাবু টের পেলেন যে তার গোটা শরীরের সমস্ত মাংসপিণ্ডগুলো  নিজে থেকেই বদলে গিয়ে কড়াপাকের নলেন সন্দেশে পরিণত হচ্ছে। মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার আগে তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন যে তিনি মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ছেন একটা জলভরা সন্দেশের মত করে।

Monday, January 9, 2017

সাইকেলের বেল

সে’সব সন্ধ্যেগুলো।
বাবা ফেরার অপেক্ষায় মশগুল। বাবা সাইকেল চড়ে অফিস যেতেন। পরে অবশ্য মোটরসাইকেল এসেছিল, রাজদূত। কিন্তু হারকিউলিস সাইকেলের বেলের ক্লিংকিং ক্রিংই স্মৃতিতে বেশি স্পষ্ট । বাবা বাড়ির সামনের গলিতে ঢুকে বেল বাজাতেন আর টুং করে সন্ধ্যের রঙ পালটে যেত।

এ’বারে সন্ধেবেলা পড়ার বই নিয়ে বসা থেকে সাময়িক মুলতুবি।
এ’বারে ছাতের বেঁকে যাওয়া অ্যান্টেনা সোজা হয়ে যাবে, টিভির ছবি স্পষ্ট হবে।
এ’বারে শিঙাড়া নিমকি চপ।
এ’বারে মায়ের হাতে মাখা মুড়ি বা চিঁড়েভাজা।
এ’বারে কত গল্পের গলগলিয়ে বেরিয়ে আসা; স্কুলের, সিনেমার, বইয়ের।

এ’বারে ক্রিকেট।
ঘরের মধ্যেই। বসবার ঘরের দরজা বন্ধ করে সে’খানে পাপোষ হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে উইকেট হত । রাবার ডিউজ বল আর তিন নম্বরের কাঠের ব্যাট। পঁচিশ বলে ইনিংস, বল ব্যাটে লাগলেই একরান। ঘরের অন্য প্রান্তে রাখা সোফা পর্যন্ত বল পাঠাতে পারলে চার রান। শর্ট মিড অফ অঞ্চলে রাখা শোকেসের কাঁচে বল লাগলে আউট। ওয়ান বাউন্স ক্যাচ। আমি দু’বার আউট হলে তবে ইনিংস শেষ, বাবার অবশ্য দ্বিতীয় সুযোগ ছিল না। বাবা চা শেষ করলে শুরু হত ম্যাচ। রুদ্ধশ্বাস। টানটান। সাধারণত পর পর দু’টো ম্যাচ হত। কোনও কোনও দিন খেলা গড়াত তৃতীয় ম্যাচে। সে’দিন গুলোয় মায়ের মুখ গোমড়া হয় যেত। কারণ বাবার বাজারে বেরোতে দেরী, আমার পড়তে বসায় ফাঁকি।
হপ্তায় অন্তত দিন দুই ক্রিকেটের বদলে থাকতে ক্যারম। সরল নিয়মে আমি প্রত্যেক চালে দু’বার করে দান পেতাম যাতে লড়াই করতে পারি।

ওই।
আমি দু’বার আউট হলে তবে আউট।
পরপর দু’বার গুটি ফেলতে না পারলে তবে দান শেষ।
ওই।
বাবার বিরক্ত না হওয়া।
বাবার সাইকেল। ক্রিং ক্রিং।
রাজদূত মোটরবাইক।

বাবা রবিবার অফিসে গেলে বেজায় খুশি হতাম। ঝুলে পড়তাম বাবার সাইকেলে বা বাইকের পিছনে। বাবার অফিসে যাওয়ার পথে রাস্তার দু’পাশ দিয়ে ইউক্যালিপটাস, বাতাস তার নরম সুবাসে হামেশা ভারী হয়ে থাকত। বাবার অফিসের কম্পিউটারে ডস-বেস্‌ড রেসিং গেম। বাবার অফিসের একটা নীল টেলিফোনে জিরো ডায়াল করলে এক অচেনা কণ্ঠ বিড়বিড় করে অনেক কথা বলে যেত।
বাবা।
আমার বাবা। আমার দু’বার আউট আর দু’বার গুটি ফেলার সুযোগ দেওয়া বাবা। গায়ে ছায়াগন্ধ বয়ে বেড়ানো বাবা।
“ঠিক সামলে নেবে” মার্কা বাবা।

রোজ সন্ধেবেলা মনে হয় বাবার জন্য বসে আছি। অফিসে হোক, গাড়ির স্টিয়ারিঙের পিছনে হোক, ভিড়ে হোক, হুল্লোড়ে হোক, গোলমালে হোক। টের পাই বাড়ির সামনের গলিটার টুং শব্দে আলোময় হয়ে যাওয়া।  
আমায় একবারে আউট করা যাবে না। এক দানে গুটি ফেলতে না পারলে পরের দান আছে।
বাবা আছে। বাবা সামলে নেবে।
 এই বিস্বাদ সিলেবাস ছুঁয়ে বসে থাকা দেখনাই মাত্র, বাবা অফিস থেকে ফিরল বলে।

Sunday, January 8, 2017

সান্যালদের ডুয়েল আর বটু গোয়েন্দা

- ডুয়েল?
- যদি ধক্‌ থাকে। তবেই। এই রইলো এক জোড়া রিভলভার। লোডেড।
- শ'দুয়েক বছর আগে সাহেবরা এমন ছেলেমানুষি করে থাকতেন শুনেছি।
-  ছেলেমানুষি? তার আর বাকিটা কী আছে বলতে পারিস দাদা?
- দ্যাখ বিনু, পাপ কম করিনি। তবে এই বিকেলবেলা নিজের ভাইকে খুন করতে মন চাইছে না।
- খুব কনফিডেন্ট মনে হচ্ছে তোকে।
- আমার থেকে পঞ্চাশ হাত দূরে রাখা একটা বেড়ালের লেজের ডগাকে বেঁধার ক্ষমতা আমার আছে বিনু। তুই জানিস।
- এত কথা বলছিস কেন? রাজী থাকলে চ' নীচের মাঠে। এখনও আলো আছে। কত ধানে কত চাল...।
- মরতে চাইছিস কেন? বিনু?
- বাজে কথা না বলে নীচে চল।
- কেন?
- কাউকে তো মরতে হবেই। আমার গুণ্ডা তোর ফ্যামিলির পিছনে লেগেছে, তোর গুণ্ডা আমার ফ্যামিলিকে ফলো করছে। কিডন্যাপ খুন হল বলে লোকজন।
- এত সহজে কেঁপে যাওয়ার লোক তো তুই নোস। মনে হচ্ছে সস্তা হুইস্কি শুধু তোর লিভার নয়, নার্ভকেও অ্যাফেক্ট করছে।
- ডুয়েল লড়বি কিনা বল।
- ফের বাজে কথা। তুই বরং সম্পত্তির ওপর সমস্ত দাবী ছেড়ে দে। এ খুনোখুনির খেলাও শেষ হয়ে যাবে।
- তখন আমার বৌ ছেলে খাবে কী? আমি মরলে বরং ইন্স্যুরেন্সে প্রচুর টাকা পেয়ে একটা হিল্লে হয়ে যাবে ওদের। আর তোকে মারতে পারলে তো কথাই নেই।
- ফের বলছি। ছেলেমানুষি করছিস বিনু।
- তুই করছিস না? ছেলেমানুষি? আমার হকের আধাআধি ভাগ দিতে তোর অসুবিধে কোথায়?
- লোভ খুব খারাপ জিনিস বিনু। আর আমি লোকটা সুবিধের নই। তবে লোভ আমার যতই থাক, এ'সব ডুয়েল টুয়েলে আমি নেই।
- বেশ, তাহলে এই রিভলভার নিয়ে আমিই তাহলে...।
- খুন করবি? না সুইসাইড? বিনু?

**

- আমার যা বলার পুরোটাই বলেছি বটুবাবু।
- আজ্ঞে।
- ইন্সপেক্টর দত্ত নিজে এসেছিলেন ইনভেস্টিগেট করতে। উনি নিজে ক্লীন চিট দিয়ে গেছেন।
- শুনেছি।
- লাশের হাতে যে রিভলভার ধরা ছিল..।
- আপনার ভাইয়ের লাশের হাতে...।
- হ্যাঁ। সে রিভলভারেরই গুলিই ওর মগজে পাওয়া গেছে। সে পিস্তলের বাটে ট্রিগারে শুধু বিনুরই হাতের ছাপ পাওয়া গেছিল। এ'সব থানায় গেলেই আপনি জানতে পারতেন।
- জানি তো। সমস্তটাই।
- তাহলে আমার পিছনে লেগেছেন কেন?
- আসলে বিনয়বাবুর স্ত্রীর সন্দেহ যাচ্ছে না। ওঁর স্বামী নাকি সুইসাইড করার মত মানুষ নন। এ কাজটা উনিই আমায় দিয়েছেন।
- ব্যাপারটায় আমিও সারপ্রাইজড হয়েছি বইকি। তবে বিনুর বৌ এবার বাড়াবাড়ি করছে। আর সেই বাড়াবাড়িটা আমি ভালো চোখে দেখছি না।
- এ ঘরেই বিনুবাবু মারা যান, তাই না?
- ও ডুয়েল লড়ার অফার নিয়ে এসেছিল। সাথে দু'টো রিভলভার। ভাবুন কী লেভেলে মাথা খারাপ হয়েছিল ওর।
- অভাবে কার না মাথা খারাপ হয় মিস্টার সান্যাল। তবে মাথা খারাপের বশে সুইসাইড না করে আপনাকে খুন করায় ওর প্রফিট অনেক বেশি ছিল।
- থ্যাঙ্ক গড সে'টা ও করেনি।
- মিস্টার সান্যাল, এ বয়সেও আপনার স্কিনের গ্লো চোখে পড়ার মত।
- হোয়াট?
- স্কিনের গ্লো। চোখের পড়ার মত। শুধুই দামী স্কচের কামাল ভেবেছিলাম প্রথমে। আপনার টেবিলে বোরোলিনের টিউবটা দেখে নিশ্চিন্ত হচ্ছি।
- কলকাতায় শীত পড়ুক না পড়ুক, চামড়া আর ঠোঁট ফাটবেই। আর বোরোলিনে আমার বিশ্বাস সেই ছেলেবেলা থেকে। প্রতি ঘণ্টায় একটু মুখে ঠোঁটে না লাগালেই অসোয়াস্তি বুঝলেন...। বিশেষত এই জানুয়ারিতে।
- আপনার ভাই সে'দিক থেকে কেয়ারলেস। পোস্ট মর্টেমের আগে লাশ যা দেখলাম, ঠোঁট গালের চামড়া ফেটে একাকার।
- পুরুষ প্রসাধনীর আলোচনাটা না হয় অন্য কোনও দিন সেরে নেওয়া যাবে বটুবাবু। এখন আসতে পারেন।
- আসলে...আসলে বোরোলিনের সুবাসটা আমায় বড় টানে মিস্টার সান্যাল।
- আমার সময় নষ্ট হচ্ছে বটুবাবু।
- রিভলভার দু'টো ছিল।
- দু'টোই পুলিশ নিয়ে গেছে। এবং দু'টোর একটাতেও আমার হাতের ছাপ নেই। আছে বিনুর হাতের ছাপ। আর ওর হাতে ধরা রিভলভার থেকেই গুলি ওর মাথায় ঢোকে। এবং আমি এ'সব আপনাকে কেনই বা বলছি...।
- ঠিক। দু'টো বন্দুকেই বিনুবাবুর হাতের ছাপ রয়েছে। হাতের ছাপ অবিশ্যি খুন করার পরেও বন্দুকের বাটে নিয়ে নেওয়া যায়...।
- ননসেন্স।
- আর বন্দুক থেকে আঙুলের ছাপ মুছে ফেলাও শক্ত নয়।
- কী বলতে চাইছেন আপনি?
- আঙুলের ছাপ মোছা গেলেও বোরোলিনের সুবাস মুছে ফেলার উপায় কিছু নেই সান্যালবাবু। আর আমার নাকে এক হপ্তা পুরনো বোরোলিনের গন্ধও পোষা কুকুরছানার মত এসে অল্ফ্যাক্টরি সেলসে বসে লেজ নাড়ে। এ খুন তো গতকালের।
- রামদয়াল, বটু হারামজাদাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দে...।
- আপনার সমস্ত বডি গার্ড ইতিমধ্যেই পুলিশের হেফাজতে।  এ বাড়িটাও পুলিশ ঘিরে রেখেছে।
- কিন্তু...কিন্তু...বটুবাবু....আমি...আমার কোনও উপায়...।
- উপায় ছিল না। জানি। ইন্সপেক্টর দত্ত, এবার আপনি সামনে আসতে পারেন। এবার শুনুন দারোগাবাবু।বিনুবাবু ওনার দাদাকে খুন করতে রিভলভার তাক করেন। খুন করতেন না কি শুধু থ্রেট সে'টা আর জানার উপায় নেই। তবে তৎক্ষনাত টেবিল থেকে দ্বিতীয় রিভলভার তুলে ফায়ার করেন সান্যালবাবু। দাদার ক্ষিপ্রতায় বিনুবাবুর মুখ হা হয়ে যায় আর দুরন্ত টিপে সান্যালবাবুর গুলি ওর মুখের মধ্যে ঢুকে যায়। ফরচুনেটলি ফর সান্যালবাবু, পিস্তল হাতে সুইসাইড বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মুখের ভিতর বন্দুকের নল পুরে হয়। বুলেটের ডিরেকশনটা তেমনই ছিল। এরপর মিস্টার সান্যাল বিনুবাবুর হাতের রিভলভারটি টেবিলে রাখেন আর নিজের হাতের বন্দুক লাশের হাতে ধরিয়ে দেন। অবশ্যই তার আগে বন্দুকের বাট থেকে নিজের হাতের ছাপ মুছে। কিন্তু, ট্র‍্যাজেডি ঘটল অন্যত্র।  যে তর্জনীতে বোরোলিনের ফোঁটা নিয়ে ঠোঁটে ক্রমাগত ডলে চলেন সান্যালবাবু, সে তর্জনী দিয়েই তিনি ট্রিগার টেনেছিলেন।
- বটুবাবু, ইন্সপেক্টর দত্ত। আমার কোনও উপায় ছিল না। হি উড হ্যাভ কিল্ড মি।
- সম্ভবত তাই। কিন্তু খুনের প্রমাণ লোপাট করার অপরাধও কোনও অংশে কম নয় মিস্টার সান্যাল। ইন্সপেক্টর দত্ত, অল ওভার টু ইউ। আর ইয়ে মিস্টার সান্যাল, আপনার টেবিলে রাখা বোরোলিন টিউবটা আমি রাখলাম। গালটা সামান্য চড়চড় করছে।