Wednesday, December 7, 2016

পাসেং ও পিতা

মঠের ভাঙা দেওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধ। বয়সের হিসেব তাঁর দাড়ির কালোর মত হারিয়ে গেছে। হাড় জিরজিরে, চামড়া ঝুলে পড়েছে। উত্তুরে কনকন হাওয়ায় ধবধবে লম্বা চুল এলোমেলো ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর গোটা মুখে। উজ্জ্বল সাদা আলখাল্লায় বৃদ্ধটি মেঘ কালো আকাশের গায়ে চকের দাগ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যেন।
কে বলবে এখন দুপুর, চারপাশ সবজে-অন্ধকারে থমথমে।

বৃদ্ধ শীতে কাঁপছিলেন একটানা। কিন্তু আকাশের কালো থেকে কিছুতেই চোখ সরতে চাইছিল না। একটা কান ফাটানো গুড়গুড় শব্দে মাটি কেঁপে উঠল। বৃদ্ধ কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে ফের তাকালেন আকাশের দিকে। আবার কোনও দেওয়াল ধসে পড়ল বোধ হয়। বা মঠের কোনও ঘর।

"বাবা" ডাকে বৃদ্ধ এবারে ঘুরে তাকালেন। পাসেং। তাঁর আদরের পাসেং। উচ্ছ্বল যুবক পাসেং। উজ্জ্বল চক্ষু পাসেং। আড়াই মাস বয়েসের যে রুগ্ন শিশুকে মঠের দুয়ারে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন তিনি, তার সাথে এ অগ্নিপুত্রের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

- তুমি এসেছ? যাক্‌।
- আজ যে আসতেই হত বাবা।
- হ্যাঁ। আজ তো আসতেই হত।
- এ সমস্তই তো আপনার জানা ছিল, তাই না?
- সমস্ত। এমনকি এই আকাশের এমন রঙও আমার কাছে অচেনা নয়।
- এখনই সমস্ত শেষ?
- আর কয়েক মুহূর্ত। আর সামান্য একটা কাজ।
- আপনি বলেছিলেন আশা আছে।
- আশা খুঁজছ কেন পাসেং? বাঁচার লোভ? এ নোংরা পৃথিবী আঁকড়ে থাকার লিপ্সা?
- আমি লোভী নই বাবা। আপনি আমায় সে'ভাবে মানুষ করেননি।
- তবে?
- মিসুং।
- মিসুং। তোমার পুত্র। আহ্‌। বড় মায়া ওর চোখে।
- মিসুং তো কোনও দোষ করেনি বাবা।
- দোষ? এর আগে যত শিশু মারা গেছে আমাদের পাপে, তাদের কোনও দোষ ছিল পাসেং? কিন্তু তাদের মরতে হয়েছে।
- দৈব।
- দৈব? বটে।
- শিশুহত্যার দায় জমতে জমতে যেদিন উপচে পড়বে, সেদিন পৃথিবী নষ্ট হবে। আকাশে তিনি বসে গুনে চলেছেন। প্রতি নিয়ত। শিশুর রক্ত উপচে গড়িয়ে গেলে পৃথিবীকে ভেঙ্গেচুরে নতুন ভাবে গড়বেন তিনি। যেমন এর আগেও হয়েছে। হাজার হাজার বার।
- তাহলে এবারেই বা ব্যতিক্রম হবে কেন পাসেং?
- পৃথিবী ধ্বংসই যদি হয়, তাহলে কোথায় আমি আর কোথায় মিসুং। নিজের ছেলের বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য লড়ব না বাবা?
- তুমিও থাকবে না যদি পৃথিবী ধ্বংস হয়। আমি বাবা নই? আমার দুঃখ হবে না?
- পৃথিবীকে বাঁচান তাহলে। ঈশ্বরের পুত্র আপনি বাবা। ঈশ্বরের এ অন্যায় বরদাস্ত করবেন কেন?
- ঈশ্বর অন্যায় করেন না পাসেং। সে'টা মানুষের কাজ। তিনি শুধু মানুষের পাপের হিসেব রাখেন। শিশুহত্যার পাপ। সংখ্যা পূর্ণ হয়েছে, পাপের ঘড়া উপচে পড়তে আর মাত্র একটা শিশুহত্যা দরকার।
- বন্ধ করুন। পৃথিবীটাকে থাকতে দিন। এই হাওয়া, মাটি, পাহাড়; আমার মিসুংকে অকালে হারাতে দেবেন না বাবা।
- মিসুং আমার সাথে থাকে পাসেং। ওকে আমি তোমার চেয়ে কম ভালোবাসিনা। ওর অধ্যয়ন আমার সাথে, আমার সাথে ও আহারাদি গ্রহণ করে। আমরা দৈনিক একসাথে সূর্যোদয় দেখি। কিন্তু এ পৃথিবীর সময় শেষ। আমাদের চারদিকে পাহাড় ভেঙ্গে পড়া শুরু হয়ে গেছে পাসেং। নদীর জল আগুন রাঙা হয়ে ধোঁয়াময় হয়ে উঠছে। বাতাসে মিশছে বিষ। এ মঠ ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য, তাই এর দেওয়াল ভেঙ্গে পড়া শেষ হয় সবার শেষে। পিছনের ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকাও, তবে বুঝবে যে বিনাশকাল এসে পড়েছে। সবার শেষে ভেঙ্গে পড়বে মঠের মূল মন্দিরের ওই চুড়ো, আকাশ জ্বালানো এক বিদ্যুৎ শিখা এসে তাঁকে ধূলিসাৎ করবে। আর তার জন্য দরকার আর একটি শিশুর মৃত্যু। তারপর সমস্ত শেষ। সমস্ত কিছুর ধুলোয় মিশে যাওয়া। প্রতি পঞ্চাশ হাজার বছর অন্তর আমি এমন ভাবে একা হয়ে যাই পাসেং। বড় বেদনার সে একাকীত্ব। আবার ছেনি হাতুড়ি নিয়ে আমি মঠ গড়তে শুরু করব, আর ঈশ্বর ফের বসবেন পৃথিবীতে পাহাড়, নদী, বর্ষা তৈরি করতে। আবার নতুন করে মানুষ। আবার সভ্যতা। আবার অসভ্যতা। শিশুহত্যা। পাসেং। এ অমোঘ, এ অবিচল।
- এ ধ্বংস আটকানোর কোনও উপায় নেই?
- উপায়? আছে। নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সে উপায় তোমায় বলাটা আমার উচিৎ নয়। তবু। বলব। কারণ জানো? হাজার হাজার পৃথিবী পেরিয়ে এসেও পিতৃ-স্নেহ কোনোদিন অনুভূত হয়নি এর আগে। পাসেং। আমার খোকা তুমি, আদরের, স্নেহের।
- উপায় কী বাবা?
- মঠের সব ছেলেমেয়েরা চলে গেছে। রয়ে গেছে শুধু মিসুং। তোমার অপেক্ষায় রয়েছে সে।
- উপায় কী?
- দু'টো খুন।
- বাবা!
- দু'টো খুন পাসেং। তোমায় মিসুং আর আমাকে হত্যা করতে হবে। শিশু হত্যার পাপ উপচে পড়ার পর আমি বধযোগ্য হই যতক্ষণ না নতুন পৃথিবী গড়ে উঠছে। আর নতুন পৃথিবী গড়ে ওঠার আগে যদি আমায় খুন করা যায় তবে এ ভাঙ্গাচোরা পৃথিবী সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে না। সে'টাই নিয়ম। তুমি আর যে দু'চারজন বেঁচে থাকবে সেই বিষাক্ত পৃথিবীতে, সবাই মিলে ঠিক পারবে ঘুরে দাঁড়াতে। নিশ্চিত। মিসুং না থাকলেও তুমি থাকবে সে’খানে। সে পৃথিবীতে সুবাতাস ফিরে আসবে। নতুন পৃথিবী নির্মাণের প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু তার জন্য তোমায় আগে মিসুংকে খুন করতে হবে, তারপর আমায়।
- কী বলছেন বাবা!
- বাবা রে, তুই আমার চোখের মণি। মারা যাসনে পাসেং। বাঁচ। এ দুনিয়াটাকে বাঁচার একটা সুযোগ দে। বের কর ছুরিটা...আর আমাদের...।
- পিতৃস্নেহে অন্ধ হয়ে আপনি আমায় বলছেন আমার পুত্র আর পিতাকে খুন করতে?

**

পাসেংয়ের নিথর দেহটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, ওর বুকে বসানো ছুরিটার দিকে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধ।
বাবা। বাবার পাঁজর যে কতটা যন্ত্রণা বহন করতে পারে তা আঁচ করতে পারছিলেন। মনে হচ্ছিল বুকের মাংস আগুনে কাটছে, গোটা গায়ে কেউ বিঁধিয়ে দিচ্ছে বিষ মাখানো ছুঁচের ডগা। বৃদ্ধের সাদা আলখাল্লা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। চোখের জল মুছে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।


মুঠো শক্ত করলেন তিনি।
অস্ফুটে বলে উঠলেন "আমিও ঈশ্বরের বরপুত্র। যার দুনিয়ায় পিতাদের এত যন্ত্রণা, তাঁর নিয়মে নিজের আত্মাকে কোটি কোটি বছর ধরে যন্ত্রণাবিদ্ধ করার কী মানে? সন্তানের দুঃখে পাসেং আত্মহত্যা করল, আহ সে যে কী যন্ত্রণা। সে যন্ত্রণার আগুন ঈশ্বরকে স্পর্শ করবে না, তা কী করে মানা যায়?"
জোব্বার ফোঁদলে রাখা ছেনি হাতুড়ি বের করে খাদে ছুঁড়ে ফেলে খোকার বুক বসানো ছুরিটা বের করে নিলেন বৃদ্ধ।


"খোকা ক্ষমা করিস। মিসুং, ক্ষমা করিস। কিন্তু এ পৃথিবীকে রেখে যেতে হবে। সমস্ত পিতার জন্য যন্ত্রণা রেখে যেতে হবে। হবেই। আর আমার পিতাও যে যন্ত্রণার বাইরে থাকবেন না।", বিড়বিড় শেষ হলে মিসুংয়ের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন বৃদ্ধ।

**

পৃথিবীর ভাংচুরের শব্দ বেশ আসছিল। খাতা কলম নিয়ে আরামকেদারায় সবে গা এলিয়ে দিয়েছিলেন ঈশ্বর। কত হিসেব কষতে হবে, কত অঙ্ক। কিন্তু আচমকা ভাংচুরের শব্দ ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আর তখনই একটা বিকট যন্ত্রণা বুকে বিঁধল, মনে হল যেন বুকের মাংস আগুনে কাটছে, যেন গোটা গায়ে কেউ বিঁধিয়ে দিচ্ছে বিষ মাখানো ছুঁচের ডগা।

"খোকা ঠিক আছে তো? বোধিসত্ত্বের কোনও ক্ষতি হয়নি তো?", ককিয়ে উঠলেন ঈশ্বর।

Monday, December 5, 2016

মোহনবাবুর সারপ্রাইজ

- কইসন হো?
- বঢিয়া। ডিনার মা মাটনবা রহিস।
- তবিয়ৎবা?
- তন্দরুস্ত। পাশবালিশ জড়াইস।
- দিলওয়া?
...
- খুশ। হাত মে কিতাব। ঘনাদা সসুরা বকরবকর করত হো।
- উঁহু। কুছ তো গড়বড়াইস। ম্যাদামারা কাহে গইল বা?
- সোমবার আ গইল।
- কিচেন মে রেকাবিমা ক্ষীরকদম ভইল।
- কা বাত করত হো। ক্ষীরকদম তো হম কব কা খা গইল হো।
- দু'গো ছুপাইকে রখতলা। তহর লগি সারপ্রাইজ।
- সজনী, হমৌ তু কা সরপ্রাইজ রখত।
- কা?
মোহনবাবুর ঘুম ভাঙলো পাশের বাড়ির মেনি বুকিকুমারির ছটরফটরের শব্দে। অ্যাডাল্ট স্বপ্নটা মাঝপথে সুতো কাটা ঘুড়ির মত লেতকে পড়ায় মনটা হু হু করে উঠলো। দলা পাকিয়ে রাখা খিদেটাও ওয়াপিস এলো। ব্যাচেলর সংসারে মাঝরাত্তিরের খিদে বলতে লেড়োর বয়াম। তবে বিস্কুটে কামড় দিয়েই মোহনবাবু বুঝলেন যে স্বপ্নের প্রভাবে মুখের সোমবারি তিতকুটে বিস্বাদভাবটা বিলকুল গায়েব।
অনেক চেষ্টা করেও সেই মুখাবয়ব মনে এলো না মোহনবাবুর। সে, যে দু'টো ক্ষীরকদম সরিয়ে রেখেছিল আদুরে সারপ্রাইজ দেবে বলে। মনে মনে মোহনবাবু তার নাম দিলেন রাই। পরনের শাড়ির রঙ সাদা হলুদ মেশানো ছিল কি?

**

ও'দিকে বুকিকুমারির মালকিন সন্ধ্যে থেকে বড্ড বিরক্ত। বলা নেই কওয়া নেই বাক্স থেকে দু'দু'টো ক্ষীরকদম গায়েব। বুকিকুমারি আজকাল চুরি করে মিষ্টি খাওয়াও ধরল নাকি? এদিকে বদ বিড়ালিটাকে একটু চোপা করবেন, সে সুযোগও নেই। সে গোটাদিন শুধু পাশের বাড়িতেই পড়ে থাকে আজকাল।

Saturday, December 3, 2016

এক ও অন্য

এক

ট্যাক্সি চলে যেতে ঘরে ফিরে সোফায় গা এলিয়ে দিলেন বিমল।
প্রত্যেকবার এমনই হয়।

ট্যাক্সিতে দেহকে বসিয়ে এই ওয়ান বিএইচকের কলকাতাটুকুতে এসে বসে হাঁফ ছাড়েন তিনি।

অন্য

মৃণাল ভৌমিকের জ্বলে ছাই হওয়া দেহটাকে অ্যাশট্রেতে ছুঁড়ে ফেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন গোল্ডফ্লেকবাবু।

মনের খচখচটা অবশ্য সম্পূর্ণ কেটে গেল সোফা থেকে ভেসে আসা মিস ক্লোরমিন্টের উড়ন্ত চুমুতে।

কিছুই কিছু নয়

- কোনও কিছুই কিছু নয় হে দত্ত।
- আমায় কিছু বললেন স্যার? দস্তুরের ফাইলে প্রচুর ফাঁকফোকর, খুব কনসেন্ট্রেট করতে হচ্ছে।
- দস্তুর?
- নতুন কনসাইনমেন্ট যারা পাঠিয়েছে।
- নতুন কনসাইনমেন্ট?
- যে'টা বম্বে থেকে এলো?  ডি এন দস্তুর! বান্দ্রার বান্দা।
- ওহ। সেই দস্তুর। তুমি দেখছি দস্তুরমত নিরেট।
- কেন স্যার?
- ফাইলে মুখ গুঁজে দিন কাবার করলে হবে দত্ত?
- বিজনেস আপনার স্যার, আমি তো কর্মচারী।
- বিজনেস। মুনাফা। ব্যালেন্স সিট। এ'টুকুই চিনলে দত্ত। কিন্তু কোনও কিছুই কিছু নয়।
- স্যার, স্যাড?
- দুঃখ ছাড়া কোনও লাস্টিং ইম্প্রেশন আছে দত্ত?
- ফিলসফি, ওহ। আমার আবার গত হপ্তায় যে রুট ক্যানালটা করিয়েছি সে'টা ঠিক খাপে খাপ হয়নি। একটা কনকন রয়ে গেছে।
- গ্রাউন্ড লেভেল দুঃখ নিয়েই নষ্ট হয়ে গেলে দত্ত।
- গ্রাউন্ড লেভেল দুঃখ?
- দাঁতের ব্যথা। ট্রেনে ভীড়। মাইনে নিয়ে ঘ্যানঘ্যান। ছেলের পরীক্ষার নম্বর। বৌয়ের থাইরয়েড। ধুর।
- ও। এ দুঃখ দুঃখ নয়?
- বাংলা কি মাল নয়? তাই বলে স্কচ চিনবে না  তা কী।করে হয় দত্ত?
- স্কচ লেভেলের দুঃখ?
- বেহালা বাজাতে পারো?
- না।
- পাথরে ছেনি হাতুরি ঠুকে নারী দেহ রূপে গুণে রসে ফুটিয়ে তুলতে পারবে?
- না।
- টপাটপ হাইকু লিখে প্রেম নিবেদন করতে পারবে?
- আমার স্টাইল ছিল অন্য। কাউকে পছন্দ হলেই বলতাম 'দুপুরের শোয়ের দু'টো টিকিট কেটে ফেলেছি'।
- ঘরের দুধ ছেঁকে রাবড়ি বানাতে জানো?
- না।
- এত না পারা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছ, দুঃখে ভেসে যেতে ইচ্ছে হয় না? দত্ত?
- বেহালা হাইকু এ'সব আপনি পারেন?
- আদৌ না। তবে আমার মধ্যে না পারার দুঃখ আছে। যে দুঃখ সাজানো বাগানের মত আমার অন্তর সুগন্ধে ভরে রাখে। তোমার মত নির্লিপ্ত নই, অন্তরে মৃত নই।
- আমার অন্তরের ডেডবডি আপনার বাগানের মাটি ফার্টিলাইজ করছে স্যার। দস্তুরের এ ফাইল সন্ধ্যের মধ্যে ক্লীয়ার না হলে আপনার বাগানে আলকাতরা বৃষ্টি হবে।  তখন সত্যিই বেহালা শিখে ফুটপাথে বসে বাজিয়ে টু পাইস কামাতে হবে।
- দত্ত, তুমি একটা প্লাস্টিকের টুকরো। আমি মাটির মানুষ। তুমি আমায় অনবরত কন্টামিনেট করে চলেছ।
- যা হোক। এ'বার এই ফাইলটায় একটা সাইন করে দিন। অমনি দস্তুরের পকেট থেকে কড়কড়ে আশি হাজার টাকা আপনার ট্যাঁকে ঝরে পড়বে। ভুল সাপ্লাইয়ের ইনডেমনিটি।
- আশি হাজারের উইন্ডফল? বলো কী দত্ত? চলো নরওয়ে ঘুরে আসি। মুড়ি চানাচুর চিবুতে চিবুতে অরোরা বোরিয়ালিস।
- ডিসেম্বরে শিউরি যান না কলকাতার চেয়ে শীত বেশি বলে। আর আশি হাজারে নরওয়ে? সাইকেলে যাবেন? তার চেয়ে আমায় ক্রিসমাস বোনাস হিসেবে ট্রান্সফার করে দিন।
- সামান্য ক্লোরোফিল তোমার মধ্যে রয়ে গেছে দত্ত। ইজি মানির সালফিউরিক অ্যাসিড ঢেলে তোমায় কোরাপ্ট করতে মন সরছে না। অগত্যা নিজের নামেই ফিক্স করে রাখব। টাকা জলে দেওয়ার জন্য ফিক্স করাই সেরা উপায়। একবার ফিক্স করলে তা আর ভাঙা যায় না। লোভ। মায়া। ভাঙবে পঞ্চভূতে, লুটবে অন্যে। থাম্ব রুল অফ ফিক্স ডিপোজিটস।
- স্যার। মাইরি। আপনার ইয়ে আছে বটে।
- ইয়ে? কোনও কিছুই কিছু নয় হে দত্ত। কোনও কিছুই কিছু নয়।

পার্পল রোজ অফ কায়রো- ২.০

সিনেমাটা দিব্যি চলছিল। টানটান প্লট। রোম্যান্টিক।

প্রেম অনুরাগ যখন তুঙ্গে, তখন। লাস্যময়ী নায়িকা খাট আলো করে শুয়ে, অনতিদূরে দাঁড়িয়ে প্রেম-বিহ্বল চুমুন্মাদ নায়ক, তাঁর দাঁতে চেপে ধরা একটা আগুন রাঙা গোলাপ। নেশা ধরানো চোখে যখন নায়িকা নায়ককে খাটে আসতে বললেন, তখন সিনেমা হলের প্রত্যেকটা সীটে হুহু। হু হু। হু হু। এই বুঝি প্রেমের ঢেউয়ে সমস্তই ভেসে যায়।

এই বুঝি। এই বুঝি।

কিন্তু কী বিপত্তি। নায়ক খাটের কাছে এসে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। বসলেন না। তাঁর মুখ সামান্য বিচলিত।

"কই গো, খাটে এসে বসো", নায়িকা বাধ্য হয়ে ডাইরেক্ট অ্যাকশনে নামলেন।

নায়ক তবু গোঁয়ারতুমি ফলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন; তাঁর মুখ থেকে গোলাপ গেছে খসে, কপালে ঘাম।

"কই গো! পাশে বসবে না নাকি"?, নায়িকার মেজাজের পারদ চড়ছে। গোটা হল জুড়ে বিরক্তি দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে।

অগত্যা নায়ক বলেই ফেললেন "বসতে চাইলেই কি বসার উপায় আছে গো? কোনও ব্যাটাচ্ছেলে দর্শকাসনে বসে সেই তখন থেকে গুনগুনিয়ে জনগণ মন অধিনায়ক গেয়ে চলেছে। বসব কী করে মাইরি?"।