চলন্ত মিনিবাস থেকে হুড়মুড় করে নামতে গিয়ে ধাক্কা লাগলো রবীন্দ্রনাথের সাথে।
ভদ্রলোকের দাড়ির আড়াল থেকে ফিক হাসি স্পষ্ট দেখা গেল।
"ডাব্লু টি এফ", বলে মাথা চুলকে নিলাম খানিকটা। একটা পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ওপর আর্টিকল পড়তে পড়তে চোখ লেগে এসেছিল।
এখন হয় কন্ডাক্টর এসে ঘুম ভাঙাবে অথবা...। শিউরে উঠতে হলো। অথবা আমি সত্যিই চলন্ত বাস থেকে নেমেছিলাম কিন্তু...।
স্পটডেড না স্বপ্ন?
ধ্যেত্তেরি, ভদ্রলোকের দাড়ি কাঁপানো মিচকে হাসি তবু থামে না।
**
বাইশ বছর ধরে কন্ডাক্টরি করছেন অনন্ত হালদার। কত রকমের প্যাসেঞ্জারই না দেখলেন। কিন্তু এই প্রথম কেউ তাকে টিকিট ফাঁকি দিয়ে কেটে পড়লে। খানিক আগেও বাঁ দিকের দ্বিতীয় সারির জানালায় নীল হাফশার্ট পরা ভদ্রলোককে দেখেছিলেন, গোলপার্ক থেকে উঠেছিলেন সম্ভবত। মৌলালির হট্টগোলে হাওয়া।
নীল হাফশার্টের ভদ্রলোকের বদলে যিনি এখন সে'খানে বসে তিনি দিব্যি রবীন্দ্রনাথের সেজে বেরিয়েছেন। থিয়েটারের লোক? দাড়িটাড়ি তো প্রায় রিয়েল বলে মনে হয়। জব্বর মেকআপ।
রাত বারোটা কুড়ি নাগাদ উঠেছিলেন সামন্তবাবু। ডায়াবেটিসে এই এক অসুবিধে।
ঘুম মাখানো চোখে বারান্দায় এলেন তিনি, বারান্দার ও'পাশে বাথরুম।
থমকে গেলেন বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা থান গায়ে জড়ানো মহিলার দিকে তাকিয়ে। বারান্দার আলোটা অল্প পাওয়ারের। সে ঘোলাটে আলোয় সেই থান জড়ানো মহিলাকে দেখেই বুক হিম হয়ে গেল সামন্তবাবুর। এমন বিধবা তো এ বাড়িতে কেউ নেই। ভূত? উফফ!
চোখ রগড়ে নিলেন, তবুও সে মহিলা স্থির দাঁড়িয়ে। গলা শুকিয়ে আসাটা বেশ টের পাচ্ছিলেন সামন্তবাবু। ঠিক তখনই মহিলার ফ্যাকাশে সাদা মুখটা নজরে এলো। চেনা, বড্ড চেনা। সে মুখে যেন একরাশ ভয় আর আতঙ্ক জমে আছে।
"ওহ হো। ও'টা তো নীলিমা", সামন্তবাবুর স্বস্তি পেয়ে আপন মনে বলে উঠলেন, "আহা, এই সবে তিনদিন হলো বেচারি বিধবা হয়েছে, তাই খেয়াল থাকে না। নিজের বৌ বলে বলা নয়,নীলিমার মত মেয়ে হয় না। তবে আনন্দের খবর এই যে ডায়াবেটিসের দুশ্চিন্তাটা গেছে তাহলে। বাথরুমের দিকে রাতবিরেতে হেঁটে যাওয়াটা স্রেফ বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে"।
হাওড়া ব্রীজটাকে লম্বায় বড় জোর একফুট মনে হচ্ছিল অনিন্দ্যর। এই যে হুগলীর জলে পা ডুবিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে তার গোড়ালিটুকুই ভিজেছে বড় জোর। তার পায়ের পাতার সামান্য নড়চাড়াতেই জলোচ্ছ্বাস স্ট্র্যান্ড রোড ভাসিয়ে দিচ্ছিল। ইতিমধ্যে অন্তত খানকুড়ি বাস ট্যাক্সি ভেসে গেছে।
তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনিন্দ্য। এত উপর থেকে সমস্ত মানুষকে খুদে খুদে পোকার মত মনে হচ্ছে, এ'দিক ও'দিক বেপরোয়া পা ফেলেলেই শয়ে শয়ে মরবে। দূর থেকে পুলিশের ফায়ারিংগুলো হাঁটুর আশেপাশে চোরকাঁটার মত বিঁধছে।
অর্ধেক কলকাতাটা দিব্যি দেখতে পারছিল অনিন্দ্য। তবে এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করার মানে হয় না। কয়েক পা ফেলে সে এগিয়ে গেল লেকটাউনের দিকে।
অতিসাবধানে পা ফেলেও দু'একটা ফ্লাইওভার আর খান দশেক ফ্ল্যাটবাড়ির ধসে যাওয়া আটকাতে পারলে না সে।
মিতালি দাঁড়িয়েছিল বাড়ির ছাদে। খুদে, এই এত্তটুকু। আঙুলের ডগায় পিঁপড়ের মত নিয়ে নেওয়া যায় ওকে।
অত নিচে কিছুই ভালো করে দেখা যায় না, তবে অনিন্দ্য বেশ বুঝতে পারছিলো যে মিতালির চোখে জল। অনিন্দ্যর মাথায় একটা প্লেন গোঁত্তা খেয়ে টলে পড়লো। ভাগ্যিস প্লেনটা মিতালিদের বাড়ির থেকে দূরে গিয়ে ধসে পড়েছিল।
মিতালি বোধ হয় কিছু বলছিল, কিন্তু এত ওপরে ওর কথার আওয়াজ এসে পৌঁছচ্ছিল না। অবশেষে অনিন্দ্য মৃদু স্বরে জানালে;
"সরি মিতা, আসলে তোমার বাবা যেদিন বলেছিলেন যে তোমায় পেতে হলে আমায় আরও বড় হতে হবে, সে'দিনই কেমন মাথায় একটা রোখ চেপে গেছিল। বায়োকেমিস্ট মানুষ, কী করতে কী করে ফেলেছি। প্লীজ ক্ষমা করো"!