Monday, October 31, 2016

ডাব্লু টি এফ

চলন্ত মিনিবাস থেকে হুড়মুড় করে নামতে গিয়ে ধাক্কা লাগলো রবীন্দ্রনাথের সাথে।
ভদ্রলোকের দাড়ির আড়াল থেকে ফিক হাসি স্পষ্ট দেখা গেল।

"ডাব্লু টি এফ", বলে মাথা চুলকে নিলাম খানিকটা। একটা পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ওপর আর্টিকল পড়তে পড়তে চোখ লেগে এসেছিল।

এখন হয় কন্ডাক্টর এসে ঘুম ভাঙাবে অথবা...। শিউরে উঠতে হলো। অথবা আমি সত্যিই চলন্ত বাস থেকে নেমেছিলাম কিন্তু...।
স্পটডেড না স্বপ্ন?
ধ্যেত্তেরি, ভদ্রলোকের দাড়ি কাঁপানো মিচকে হাসি তবু থামে না।

**

বাইশ বছর ধরে কন্ডাক্টরি করছেন অনন্ত হালদার। কত রকমের প্যাসেঞ্জারই না দেখলেন। কিন্তু এই প্রথম কেউ তাকে টিকিট ফাঁকি দিয়ে কেটে পড়লে। খানিক আগেও বাঁ দিকের দ্বিতীয় সারির জানালায় নীল হাফশার্ট পরা ভদ্রলোককে দেখেছিলেন, গোলপার্ক থেকে উঠেছিলেন সম্ভবত। মৌলালির হট্টগোলে হাওয়া।

নীল হাফশার্টের ভদ্রলোকের বদলে যিনি এখন সে'খানে বসে তিনি দিব্যি রবীন্দ্রনাথের সেজে বেরিয়েছেন। থিয়েটারের লোক? দাড়িটাড়ি তো প্রায় রিয়েল বলে মনে হয়। জব্বর মেকআপ।

**

ও'দিকে ততক্ষণে রবীন্দ্রনাথের মিচকি হাসি হাওয়া, গলা শুকিয়ে কাঠ।

Sunday, October 30, 2016

সামন্তবাবুর বাতিক

রাত বারোটা কুড়ি নাগাদ উঠেছিলেন সামন্তবাবু। ডায়াবেটিসে এই এক অসুবিধে।

ঘুম মাখানো চোখে বারান্দায় এলেন তিনি, বারান্দার ও'পাশে বাথরুম।
থমকে গেলেন বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা থান গায়ে জড়ানো মহিলার দিকে তাকিয়ে। বারান্দার আলোটা অল্প পাওয়ারের। সে ঘোলাটে আলোয় সেই থান জড়ানো মহিলাকে দেখেই বুক হিম হয়ে গেল সামন্তবাবুর। এমন বিধবা তো এ বাড়িতে কেউ নেই। ভূত? উফফ!

চোখ রগড়ে নিলেন, তবুও সে মহিলা স্থির দাঁড়িয়ে।  গলা শুকিয়ে আসাটা বেশ টের পাচ্ছিলেন সামন্তবাবু। ঠিক তখনই মহিলার ফ্যাকাশে সাদা মুখটা নজরে এলো। চেনা, বড্ড চেনা। সে মুখে যেন একরাশ ভয় আর আতঙ্ক জমে আছে।

"ওহ হো। ও'টা তো নীলিমা", সামন্তবাবুর স্বস্তি পেয়ে আপন মনে বলে উঠলেন, "আহা, এই সবে তিনদিন হলো বেচারি বিধবা হয়েছে, তাই খেয়াল থাকে না।  নিজের বৌ বলে বলা নয়,নীলিমার মত মেয়ে হয় না। তবে আনন্দের খবর এই যে ডায়াবেটিসের দুশ্চিন্তাটা গেছে তাহলে। বাথরুমের দিকে রাতবিরেতে হেঁটে যাওয়াটা স্রেফ বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে"।

Thursday, October 27, 2016

কুঞ্জবনে

- গুরু!
- ইয়েস বস।
- আরেক টান হবে নাকি?
- নাহ্। এটুকুই। থাক বরং।
- মিইয়ে গেছ দেখছি?
- আমি? মিইয়ে? আরে না না! আর্কিমেডিস এখন আমায় দেখলে ইউরেকা ইউরেকা বলে লাফাতে পারতেন। ফ্লোট করছি কিনা। দুঃখের যতটা ওজন, ততটাই স্ফুর্তির জল ডিস্পলেস করছি। উথাল পাথাল, কিন্তু ডুবে যাওয়ার চান্স নেই।
- দুঃখ? গুরু? আমি থাকতে তোমার দুঃখ?
- আসে, যায়। যায়, আসে। দে। অত জোর করছিস যখন। বামুন মানুষ, দু'টানে তো আর জাত যাবে না। না নিলে বরং তুই খারাপ পাবি।
- এই যে গুরু।
- আহহহহহহহ, বুকের আগুনপানা স্টোভে কেউ জল ছিটিয়ে দিলে রে।
- বল না গুরু। অমন ম্যাদা মেরে কেন রয়েছ!
- ম্যাচোমাস্তানদের ম্যাদা মারতে আছে রে পাগলা?
- বত্রিশ বছর ধরে ট্রাকের খালাসি গুরু। অল ইন্ডিয়া পারমিটের। তার মধ্যে সাড়ে একত্রিশ বছর তোমার পায়ের কাছে বসে "ডাইনে লেও বাঁয়ে লেও" করে গেছি। তুমি হ বলতে আমি হরিদাসের ধাবার ডিম তড়কা বুঝি গুরু। ডবল ঝাল।
-  হ'য়ে হরিদাসের ধাবার তড়কা। আহা। তোর এ জীবনে কবি হওয়ার কথা ছিল রে। ট্রাক ধুয়ে আর মুন্নি বদনামে উজাড় হয়ে গেলি। একটু যদি কেউ তোকে বিভূতিভূষণে ঠেলে দিত। সময়মত। তবে। তবে আমিও তো ঠেলিনি। তোর কোনও দোষ নেই রে। কবিদের কোনও দোষ থাকে না।
- গুরু। কী হয়েছে?
- কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স শুধু নয় রে, ইউনিভার্সিটি কাঁপানো রেজাল্ট।
- জানি গুরু। তুমি কলেজে টপাটপ পাশ দিয়ে ট্রাক চালাতে এসেছো। কিন্তু সে তো বছর পঁয়ত্রিশ আগের কেস! এখন ব্যথা শুরু হল?
- ধুর। ট্রাক আর ন্যাশনাল হাইওয়ে তো আমার হিমালয় রে! শুধু কৌপীনের বদলে লুঙ্গি।
- তবে? গুরু? নেতিয়ে পড়েছ যে বড়?
- জানিস...।
- গুরু!
- "কোয়েলা ডাকল আবার, যমুনায় লাগল জোয়ার; কে তুমি আনিলে জল ভরি মোর দুই নয়নে"!
- আইব্বাস!
- কী?
- তোমার গলায় সুর রয়েছে গুরু!
- গাঁজা। গাঁজা সুর ঢালে। গলায় না। কানে।
- গুরু! গাও না।
- সন্ধ্যের বারান্দা জানিস। বৃষ্টির।  ঝিরঝির দেখা যায় ল্যাম্পপোস্টের বাতির তলে। উঠোনের জুঁইয়ে বাতাস ভার। মা গানের ভালো লাগায় চোখ বুজে ফেলেছেন। আমি ভ্যাবলার মত বসে মায়ের আঁচল চিবুচ্ছি। দু'জনেই অপেক্ষায়। বাবা আসার সময় হয়ে এসেছে। মা গাইছেন। গাইছেন। সেই। গানে জুঁইয়ে ডুবে ভাসছি। সন্ধ্যে মায়ের গান বেয়ে তরতর করে এগিয়ে চলেছে। "আজি মোর শূন্য ডালা, কী দিয়ে গাঁথব মালা? কেন এই নিঠুর খেলা খেলিলে আমার সনে, কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে, হৃদি মোর উঠল কাঁপি চরণের সেই রণনে"।
- গুরু। আঁখো মে পানি। ম্যাচো মাস্তানা?
- হেহ। শোন। বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছিল। বারান্দার বাইরের সে অন্ধকারে রাস্তার আবছা হলদে আলোর মায়া আর মা মেশানো। বারান্দার গ্রিলে মাথা রেখে মা গুনগুনিয়ে চলেছিল; "হয় তুমি থামাও বাঁশি, নয় আমায় লও হে আসি-ঘরেতে পরবাসী থাকিতে আর পারি নে, কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে"।
- আহ। গুরু।
- আসেনি।
- হুঁ?
- বাবা। আসেনি। আর কখনও। ট্রাকচাপা পড়ার পর ফিরলে অবশ্য ব্যাপারটা ভয়েরই হত।
- ও।
- সেই শেষ মাকে গাইতে শোনা। জানিস! সেই শেষ। মা আর কথাই বলতে পারতেন না, তো গান। গান ছাড়া মাকে চিনিনি। গান যাওয়াতেই মা চলে গেছিল। তাই গান ছাড়া মাকে ছেড়ে আসতে কোনও কষ্ট হয়নি।
- গুরু। আরেক টান নেবে?
- আজ...আজ নাকে ফের জুঁইয়ের গন্ধ এলো। মাই ডিয়ার খালাসিবাবু, দ্য কুঞ্জবন ইস ডেসার্টেড। বাট দ্য মিউজিক প্লেস অন। আমি এদ্দিন শুধু শুনতে পেতাম না। মাকে পাথর ভেবে পালিয়ে এলাম অথচ সে সুর ডাকাত হয়ে কলার টেনে রাখলে।
- গুরু।
- মা! মাগো। আয়দার লেট দ্য মিউজিক গো অর পুল মি ক্লোজার। ক্লোজার। "হয় তুমি থামাও বাঁশি, নয় আমায় লও হে আসি - ঘরেতে পরবাসী থাকিতে আর পারি নে"।
- জী। গুরু। এ'বার চলো।
- হুঁ। এইবার।

Wednesday, October 26, 2016

অন্য গাল

গান্ধী – কেউ এক গালে থাবড়া মারলে আর এক গাল এগিয়ে দাও। অপর পক্ষের রাগ ডায়লুট হতে বাধ্য।

রাবণ – অন্য গাল এগিয়ে দিলে দুশমনের রাগ পড়বে বলছেন?

গান্ধী – আলবাত!

রাবণ – রাগ পড়লে ভালো, না পড়লেও অন্তত নরম হয়ে আসবে। তাই তো?
গান্ধী – নিশ্চিত।

রাবণ – দু’নম্বর গাল এগিয়ে দেওয়ায় রাগ একটু নরম হয়েছে দেখলেই তিন নম্বর গাল এগিয়ে দেব। কেমন হবে? আফটার অল গালের তো অভাব পড়েনি।

গান্ধী – গুড। তুমি বুঝেছ। ও’তেই হবে।

রাবণ – ও’তে হলেই বা হতে দিচ্ছে কে? রাগ গলে জল না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত গাল ফায়ার করে যাব! তিনের পরে চার, চারের পরে পাঁচ।

গান্ধী – হয়েছে। হয়েছে। সমঝদার ছেলে তুমি। তবে ওই, কোনও কিছুতেই বাড়াবাড়ি ভালো নয়!

রাবণ- রাগের শেষ দেখে ছাড়াটাই কর্তব্য...। অতএব পাঁচের গালে থাপ্পড় শুষে নিয়ে ছয় নম্বর গাল এগিয়ে দেব! ছয়ে পরে সাত...!

গান্ধী – বোঝ কাণ্ড!

রাবণ - সাতের পরে আট, আটের পরে নয়...!

গান্ধী – অন আ সেকেন্ড থট, থাপ্পড়ের রেসপন্সে বেশি মেনিমুখো না হওয়াই বোধ হয় ভালো...।

রাবণ – নয়ের পরে দশ নম্বর গাল। দশের পরে এগারো!

গান্ধীর – ইন ফ্যাক্ট বেশি গড়বড়ে মেজাজ দেখলে পালটা দু’ঘা বসিয়ে দিলে মন্দ হয় না মনে হচ্ছে!

রাবণ – এগারোর পরে বারো, বারোর পরে তেরো নম্বর গাল...।

গান্ধী – ডাব্লু টি এফ?

রাবণ – চোদ্দ, পনেরো, ষোলো...! গালে গলিয়ে ছাড়বো! সতেরো...আঠারো...।

গান্ধী – ব্যাটাচ্ছেলে!

রাবণ – উনিশ...।

*গান্ধীর থাপ্পড়ে রাবণের পতন ও মূর্ছা*

Monday, October 24, 2016

বড়

হাওড়া ব্রীজটাকে লম্বায় বড় জোর একফুট মনে হচ্ছিল অনিন্দ্যর। এই যে হুগলীর জলে পা ডুবিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে তার গোড়ালিটুকুই ভিজেছে বড় জোর। তার পায়ের পাতার সামান্য নড়চাড়াতেই জলোচ্ছ্বাস স্ট্র‍্যান্ড রোড ভাসিয়ে দিচ্ছিল। ইতিমধ্যে অন্তত খানকুড়ি বাস ট্যাক্সি ভেসে গেছে।

তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনিন্দ্য। এত উপর থেকে সমস্ত মানুষকে খুদে খুদে পোকার মত মনে হচ্ছে, এ'দিক ও'দিক বেপরোয়া পা ফেলেলেই শয়ে শয়ে মরবে। দূর থেকে পুলিশের ফায়ারিংগুলো হাঁটুর আশেপাশে চোরকাঁটার মত বিঁধছে।

অর্ধেক কলকাতাটা দিব্যি দেখতে পারছিল অনিন্দ্য। তবে এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করার মানে হয় না। কয়েক পা ফেলে সে এগিয়ে গেল লেকটাউনের দিকে।

অতিসাবধানে পা ফেলেও দু'একটা ফ্লাইওভার আর খান দশেক ফ্ল্যাটবাড়ির ধসে যাওয়া আটকাতে পারলে না সে।

মিতালি দাঁড়িয়েছিল বাড়ির ছাদে। খুদে, এই এত্তটুকু। আঙুলের ডগায় পিঁপড়ের মত নিয়ে নেওয়া যায় ওকে।
অত নিচে কিছুই ভালো করে দেখা যায় না, তবে অনিন্দ্য বেশ বুঝতে পারছিলো যে মিতালির চোখে জল। অনিন্দ্যর মাথায় একটা প্লেন গোঁত্তা খেয়ে টলে পড়লো। ভাগ্যিস প্লেনটা মিতালিদের বাড়ির থেকে দূরে গিয়ে ধসে পড়েছিল।

মিতালি বোধ হয় কিছু বলছিল, কিন্তু এত ওপরে ওর কথার আওয়াজ এসে পৌঁছচ্ছিল না। অবশেষে অনিন্দ্য মৃদু স্বরে জানালে;

"সরি মিতা, আসলে তোমার বাবা যেদিন বলেছিলেন যে তোমায় পেতে হলে আমায় আরও বড় হতে হবে, সে'দিনই কেমন মাথায় একটা রোখ চেপে গেছিল। বায়োকেমিস্ট মানুষ, কী করতে কী করে ফেলেছি। প্লীজ ক্ষমা করো"!

নতজানু অনিন্দ্যর হাঁটুর চাপে নিউটাউনের অর্ধেকটা ধুলোয় মিশে একাকার হয়ে গেছিল।