Tuesday, August 16, 2016

জিমনাস্টিকের কবলে

সে'বার। বলা নেই কওয়া নেই।

১৯৮৩র অলিম্পিকে দীপা১, দীপা২, দীপা৩, দীপা৪, দীপা৫, দীপা৬, দীপা৭, দীপা৮, দীপা৯, দীপা১০ আর দীপা১১ চমকে দিয়ে জিমনাস্টিকে সমস্ত মেডেলগুলো জিতে নিলেন। এর আগে দু'একটা টুকরোটাকরা জিমন্যাস্টিকস মেডেল যে এ দেশে আসেনি তা নয়, কিন্তু অলিম্পিকের সমস্ত মেডেল এক সাথে?

ব্যাস। গোটা দেশ হুমড়ি খেয়ে পড়লে জিমন্যাস্টিক্সে। খোকার ঘরের দেওয়ালে দীপা১য়ের পোস্টার, বিজ্ঞাপনে দীপা২, খবরের কাগজ আলো করে দীপা৩ ইত্যাদি।পাড়ায় পাড়ায় দীপাদের সংবর্ধনা। এর ওপরে জুটলো এসে বিসিজিআই, বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর জিমনাস্টিকস ইন ইন্ডিয়া। তারা করলে কী একটা মজবুত ব্যবসা ফেঁদে বসলে। ব্যবসা ফাঁদলে যা হয়, জিমন্যাস্টদের পকেটে টু পাইস এলো, তাদের রোয়াব বাড়লো। আর সস্তা পয়সায় কী না হয়? মানি বিগেটস মোর মানি অ্যান্ড সাকসেস। পয়সার জোরে, ব্যবসার জোরে জিমন্যাস্টিক্সে আরও সাফল্য আসতে লাগলো।

ফলত, তেলা মাথায় তেল। জিমনাস্টিকে টপাটপ মেডেল আর শিরোপা। নজর দিচ্ছি ভাববেন না ভাইটি, জিমনাস্টিকে পয়সা থাকুক, বিজ্ঞাপন থাকুন, সাফল্য থাকুক, কিন্তু সে সাফল্যের ট্যাক্স হিসেবে যে বাকি খেলাগুলো ধুয়ে মুছে যেতে বসেছে।

আমরা খুব সহজে নাম ভুলে যাই।  খুব সহজে। দুরন্ত মারাঠা শচীন তেন্ডুলকারকে মনে আছে? সেই যে সে'বার ২০০০য়ের বিশ্বকাপে টিমকে প্রায় একটা ম্যাচ জিতিয়ে ফেলছিল ছেলেটা। প্রায়। প্রায় জিতে ফেলেছিল আর কী! মনে রেখেছেন তার স্ট্রাগেলের কথা? কী খাটাখাটনি করে ছেলেটা কত অল্প বয়স থেকে ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিল। না।

আপনারা মনে রাখেননি। কারণ আপনাদের মন জুড়ে জিমন্যাস্টিক প্রিমিয়ার লিগের রোশনাই। হিংসে করছি না জিমনাস্টিককে। শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি।

জিমনাস্টিক বজ্জাতি করে স্রেফ সাফল্য আর ব্যবসা দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছে আপনাকে আমাকে সবাইকে। অথচ ভিভিএস লক্ষণের যুদ্ধটা কেউ বোঝে না। কেউ না। হতে পারে তার তেমন কোনও সাফল্য আসেনি, কিন্তু তাই বলে তার স্ট্রাগলটা মিথ্যে হয়ে যাবে? সেই যে'বার তার বদান্যতায় ভারত পাপুয়ানিউগিনিকে হারিয়েছিল, সে'টা আজ আমরা কী সহজে ভুলে গেছি! আমরা মনে রাখিনি যে ক্রিকেটের স্বল্প সাফল্য ইজ নট বিকজ অফ আওয়ার সাপোর্ট বাট ডেস্পাইট আওয়ার অ্যাপাথি। কী ইনফ্রাস্ট্রাকচার দিয়েছি আমরা লক্ষণ শচীনদের? শুধু জিত দিয়ে ওদের বিচার করা যায়?

জিত। এই জিতের নেশায় আমাদের বুঁদ করে রেখেছে সর্বনাশা জিমন্যাস্টিকস। চার বছরে একবার ক্রিকেট বিশ্বকাপ এলে আমাদের শচীন প্রেম উথলে উঠবে আর বাকি সময়টা দীপাই আমাদের ভগবান। বছরের অন্য সময়টা শচীন মুখে রক্ত উঠে মারা গেলেও আমাদের কিছু এসে যাবে না কারণ ভারত আগামী ক্রিকেট বিশ্বকাপের মূলপর্বের জন্য কোয়ালিফাই করতে পারেনি।  খেলাটাকে আমরা চিরকাল হারজিতেই দেখে আসব, স্ট্রাগলটুকুর রোম্যান্স বুঝবো না কোনওদিন।

শচীনরা বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইং রাউন্ডে হেরেছে কিন্তু বুক চিতিয়ে লড়াই করে। আমার কাছে শচীন একজন চ্যাম্পিয়ন,  সে বিশ্বকাপ খেলতে পারুক বা নাই পারুক।
দীপা শুধু মাত্র একদল ব্যবসাদারের ঘুঁটি, যার খাতায় সাফল্য হলো একমাত্র অস্ত্র; রোম্যান্সের যেখানে কোনও জায়গা নেই।

এ পোড়া দেশে ক্রিকেট নিজের দোষে মারা যাচ্ছে না, মারা যাচ্ছে টপাটপ জিমন্যাস্টিকস মেডেলগুলোর জন্য। মেডেলই সব নয়, জিতটুকুই শেষ কথা নয়। দীপার ভগবান হয়ে থাকাটাই শেষ কথা নয়।

শচীন না জিতুন, উনি প্যাডেল স্যুইপে বিশ্বের মন জয় করেছেন। ওনার স্ট্রাগল আমরা ভুলবো না। সে'টাই রোম্যান্স, জিমন্যাস্টিক্সের মত সসর্বগ্রাসী ব্যবসা নয়।

জয় হিন্দ।

Monday, August 15, 2016

বালিশবাবুর অফিসে - ২

- এস ও এস। এস ও এস।
- এ কী! বলা নেই কওয়া নেই, এমন জরুরী তলব?
- 'এ কী' বলে তো আমার চমকে ওঠা উচিৎ। চেয়ার থেকে উলটে পড়া উচিৎ।
- চেয়ার থেকে উলটে পড়া? রিয়েলি?
- আই মিন, চমকে আমার ঘাড় লেতকে যাওয়া উচিৎ। মুখ দিয়ে এক গাদা থুতু বেরিয়ে আসা উচিৎ। 
- কেন! হলটা কী?
- এ'টা আমার গায়ে কী?
- জামা!
- ধেত্তের! এমন বিদঘুটে রঙচঙে কেন?
- বিদঘুটে? ট্রাইকলর তো!
- ট্রাই কী?
- তেরঙ্গা। ঝন্ডা উঁচা রহে হমারা।
- এ'সব কী?
- ভারতের পতাকার রঙের জামা। বুকে গেরুয়া। পেটে সাদা। নাভীতে অশোক চক্র। কোমরে সবজে। আজ দেশের স্বাধীনতা দিবস।
- সাদাটা ঠিক ছিল। গেরুয়া আর সবুজে চোখে কি ঝিলিক দিচ্ছে জানেন? ব্রেনে চাপ পড়ছে জানেন? ম্যাগোহ্‌!
- ব্রেনের কন্ডিশনিং দরকার। দেশকে চেনা দরকার।
- দেশ কে?
- কান্ট্রি। যেখানে আপনার জন্ম!। আমার জন্ম!। আপনার মায়ের জন্ম!
- দেশ হাসপাতাল?
- ম্যাক্রো লেভেলে যেতে আপনার সময় লাগবে।
- আপনার স্বপ্নে আমার অঢেল সময়। বলুন। কেয়া হ্যায় দেশ? দেশের জন্য চোখে ফোস্কা পড়া জামা পরব কেন?
- শাট আপ! স্টপ বিং ইনসেন্সিটিভ।
- জামায় বাহাত্তরটা রঙ থাকলে বেশি সেন্সিটিভ হত?
- এই ট্রাইকলর সিম্বলিক। আপনার দেশের। আপনার পরিচিতির।
- তাই তো জিজ্ঞেস করছি। দেশ কী? যেখানে আমার জন্ম? কলকাতার উডল্যান্ডস নার্সিংহোম?
- নাহ্। যে মাটিতে জন্ম। জননী জন্মভূমিশ্চ...না কী যেন।
- অপারেশন থিয়াটারে মাটি ছিল?
- ধ্যাত্তেরি। যে মাটিতে আপনার বাড়ি, হাসপাতাল! যে মাটিতে আমি টু পাইস করে খাচ্ছি, আপনাকে খাওয়াচ্ছি। বেসিক্যালি যে মাটি আপনাকে খাওয়াচ্ছে। সেই মাটি হচ্ছে দেশ।
- দেশের ব্রেস্ট মিল্ক আছে?
- মেটাফরিকালি আছে।
- রাইট অ্যান্ড লেফ্‌ট, বোথ?
- ইয়ে। টেকনিক্যালি। অ্যান্ড অলসো মেটাফরিক্যালি। ইয়েস।
- তো। দেশ হচ্ছে একটা এনটিটি যাকে মিল্ক করা যায়। রাইট আর লেফ্‌ট ইয়ে থেকে।
- না। ওয়েট। ভুল দিকে টানছেন।
- টানতে হয়। না টানলে ইট ডাজ নট ফ্লো।
- শাট আপ।
- এ কী! ফিজিক্স পড়েননি? আমিও পড়িনি। তবে আপনি দামড়া। যাক গে। রিফ্রেজ করছি। দেশ হচ্ছে লাইক আপনার ওয়াইফ।
- আরেকবার রিফ্রেজ করুন। নিজের মাকে বারবার 'আপনার ওয়াইফ' বলে ডাকাটা অসভ্যতা।
- উনি আপনার ওয়াইফ নন?
- আগে আপনার মা!
- আপনার বিয়ের আগেই আমি জাইগোটে ছিলাম?
- সরি। ইউ আর রাইট। দেশ হচ্ছে আপনার বাবার বৌ। করেক্ট।
- অরিজিনাল ব্রেস্ট মিল্কের জন্য আমায় হাবিজাবি কিছু পরতে হয় না। মেটাফোরিকাল মিল্কের জন্য অ্যাকচুয়াল চোখে সার্ফগুঁড়ো দেওয়া জামা পরতে হবে?
- উফ। জামাটা হচ্ছে আ টোকেন অফ রেস্পেক্ট।
- ফিজিকাল টোকেন অফ রেস্পেক্ট ফর সামথিং মেটাফরিকাল?
- ও'টা আমাদের পতাকা।
- নতুন টার্ম টেনে আনছেন স্যার।
- বাবা বলে ডাকতে পারেন।
- বাবা ডাক ফোটেনি এখনও আমার মুখে।
- বাতেলা ফুটেছে।
- বাঙালি হয়েছি আপনার দোষে। পতাকা কী?
- দেশের প্রতীক!
- বেশ। আমি আমার দেশের প্রতীক হিসেবে হালকা আকাশী নীল রঙ ঠিক করলাম। ও'টাই আমার দেশের রঙ। এবার আমায় ওই নীল জামাটা পরিয়ে দিন। বুকের প্যালপিটেশনটা কমুক একটু।
- না না। ইট ডাজ নট ওয়ার্ক দ্যাট ওয়ে।
- কেন?
- পতাকার রঙ প্রি ডিসাইডেড!
- কে করলে? কেন করলে? দেশ আমার, পতাকা আমার। মাহ্‌ লাইফ মাহ্‌  দেশ, মাহ্‌ রুলস মাহ্‌ পতাকা।
- নো স্যার।
- নো মানে? মগেরমুলুক নাকি?
- আরে এ'সব ন্যাশনাল আইডেন্টিটির ব্যাপার।
-ন্যাশনাল কী?
- দেশ সম্বন্ধীয়।
- দেশ কার?
- আমার। আপনার। সবার।
- আমারটুকুর পতাকা ফতাকা আমি বুঝে নেব।
- আরে বাবা তা হয় না। দেশের সবার পতাকা এক।
- কন্সেপ্টে গলদ আছে। আপনার পতাকা আমার কাছে ক্যাটক্যাটে। আমার দেশকে আমি ও পতাকায় স্ক্যান্ডালাইজ হতে দেব না। আমি বরং ভাবছিলাম স্কাই ব্লু ব্যাকগ্রাউন্ডে নেভি ব্লু ফ্লোরাল ডিজাইন। মাঝে মাঝে কার্টুন ডাইনোসর।
- এই ভাবে হয় না বস্ ।  আপনার মধ্যে ন্যাশনাল প্রাইড ইঞ্জেক্ট করার দরকার আছে। জন গন মন।
- জন গন মন কী?
- জাতীয় সঙ্গীত।
- তাতে কী?
- দেশের গান। দেশের পতাকার মত। জাতীয় গর্বের আধার।
- আমার দেশের গানও আমায় ঠিক করতে হবে।
- আরে বাবা আপনার দেশের গান পতাকা সবই ঠিক করা আছে। আগে থেকে। সবুর করুন, গর্ব জেনারেট হলো বলে।
- দেশের গান পতাকা নিয়ে গেল কাকে, আমি কাকের পিছনে দৌড়ব? তা'তে গর্ব হবে?
- নিয়ম।
- নিয়ম করে গর্ব?
- নিজের দেশ। গর্ব করবেন না?
- লে হালুয়া।
- লে হালুয়া কে শেখাল?
- দেবু কাকা।
- দেবুর কোনও সেন্স নেই। রাস্কেল।
- আজ আরেকটা শব্দ প্রথম শুনলাম। শিখলাম।
- কী?
- রাক্সেল।
- না। চোপ।
- রাস্কেল। রাস্কেল। এবার বলুন। দেশ কে নিয়ে কীসের গর্ব? আরও আছে তো? অন্য দেশটেশ?
- আলবাত। শয়ে শয়ে দেশ। কিন্তু সকল দেশের সেরা, আপনার দেশ।
- সকল দেশের সেরা? কে বলেছে? আমি বলিনি।
- গুনীজনে বলেছেন। সারে জঁহা সে অচ্ছা।
- বেসিস?
- ভায়ের মায়ের এত স্নেহ, কোথায় গেলে পাবে কেহ! গান আছে। শুনে দেখবেন, বুক চিনচিন করবে।
- দেবুকাকা ইয়ে কালি কালি আঁখে গাইলে আমার বুকে চিনচিন হয়।
- দেবুটা হারামি।
- আর একটা শব্দ। শিখলাম।
- উফফ। শুনুন। আপনি দেশকে ভালোবাসবেন। সে ভালোবাসা তৈরি করা আমার রেস্পন্সিবিলিটি।
- আলবাত ভালোবাসবো দেশকে। কিন্তু শয়ে শয়ে দেশ। একটু বুঝেশুনে নিতে হবে না?
- কী বুঝে নিতে হবে?
- কোন দেশকে ভালোবাসা দরকার। মানে..কার পতাকা ভালো, চোখে জ্বালা করে না। কার জাতীয় সঙ্গীতের সাথে কালি কালি আঁখের মিল আছে। সেই দেশ বেছে নিয়ে গর্ব করব'খন।
- আরে ধ্যার রে বাবা। ইট ডাজ নট ওয়ার্ক দ্যাট ওয়ে। আপনার দেশ ফিক্সড। পতাকা ফিক্সড।  ন্যাশনাল অ্যান্থেম ফিক্সড। গর্ব জেনারেট যা করার এই নিয়েই করতে হবে।
- হারামি। রাস্কেল।
- চোপ। চোপ। এ'টা কী হল?
- না মানে, দেশের চয়েসেও ফ্লেক্সিবিলিটি নেই?
- নেই।
- মানে। জাস্ট লাইক চয়েস অফ ফাদার।
- রাইট।
- লে হালুয়া।
- চোপ।
- জাইগোটেই মনে হচ্ছিল সামথিং ইজ অ্যামিস।
- সরি।
- ইটস ওকে। এই ক্যাটক্যাটে তেরঙ্গা নিয়ে তো আপনাকেও দাঁত বের করে চোখ ছলছল করে থাকতে হয়।
- না মানে, এত মিল্ক করছি, এ'টুকু অ্যাডজাস্ট করব না?
- হুঁ। তবে শুনুন। এবারে আমার অফিস ছেড়ে বেরোন। সোফায় ফিরে যান, যেখানে আমা কোলে নিয়ে বসে ঢুলছিলেন। এমার্জেন্সি।
- এক নম্বর? দুই?
- বমি। গেরুয়া সবুজ মিলে ব্রেন এমন ঘেঁটে গেল। জাগুন। জাগুন। জয় হিন্দ।

- ক্রমশ-

Sunday, August 14, 2016

জানালা ধরে

- ও মশাই। লোয়ার বার্থটা আপনার?
- হ্যাঁ।
- আচ্ছা। আমার আপার বার্থ, এই আপনার মাথার ওপরেরটাই।
- আই সি।
- একটা কথা ছিল।
- কী?
- বলছিলাম যে, এই লোয়ার আপনার, কিন্তু জানালার সিট আমার। কেমন?
- নাহ। তার দরকার দেখছি না। লোয়ারও আমার, জানালার পাশের সিটেরও আমার।
- নাহ্।
- না মানে? আলবাত আমার। আমি জানালার সিটে বসে আছি বলে আমার। আপনি বরং এই পাশে এসে বসুন।
- পাশে?
- আজ্ঞে। পাশে।
- অর্জুন গাণ্ডিব ছেড়ে গদা নিয়ে কেরদানি দেখাচ্ছে, তেমনটা কোনও দিন শুনেছেন?
- আপনি অর্জুন? এই জানালা গাণ্ডিব?
- এখন একটা কুরুক্ষেত্র বাধলে তার ডেমোন্সট্রেশনও পেয়ে যাবেন।
- শুনুন। জানালার পাশে আমি বসে আছি। এবং আমি উঠব না। আপনার বসতে না হলে বসবেন না।
- আহ। আপনি জানালার পাশে বসে থাকলে তবে তো উঠে যাওয়ার প্রশ্ন। আপনি তো জানালার পাশে বসেই নেই। শুধু একটু সরে আসুন, নয়তো আমার ও জানালার পাশে বসা হবে না। আর ট্রেনের জানালার পাশে কেউ না বসলে বেচারি জানালাদের প্রাণে কেমন মার্ডারাস বজ্রপাত হয় জানেন?
- আমি সশরীরে জানলার পাশে বসে আছি, আর আপনি বলছেন আমি জানালার পাশে নেই?
- আপনি জানালার পাশে নয়, জানালা অবস্ট্রাক্ট করে বসে আছেন।
- মানে? হাউ?
- এমন মন কেমন করা ফুরফুরে হাওয়া, মন কেমন করা আকাশ!  দিব্বি সবুজ চারপাশ হুশহাশ বয়ে যাচ্ছে জানালার ও পাশে, আর আপনি খবরের কাগজ চোখের সামনে মেলে বসে আছেন। অমন ভাবে ট্রেনের জানালাদের থার্ড ডিগ্রি দিতে নেই মশাই। আসুন। সরে আসুন। আমি জানালাটার পাশে গিয়ে বসি, বেচারি একটু স্বস্তি পাক।

Thursday, August 11, 2016

দু'জন

প্রথম দৃশ্য

সকালের শশব্যস্ত ফুটপাথ। জায়গাটা ঢাকুরিয়া হতে পারে, টালিগঞ্জ হলেও কিছু আটকাবে না।
এক ভদ্রলোক একটা ঠেলার পাশে দাঁড়িয়ে ঘুগনির স্টিলের প্লেট চেটে সাফ করছিলেন।বয়স এই তেত্রিশ চৌত্রিশ। গালে খোঁচা দাড়ি, নাক দৃষ্টিকটু ভাবে বাঁকা,  কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, পরনে হালকা নীল হাফ শার্ট আর খয়েরী ট্রাউজার। পায়ে চামড়ার চটি।এমন সময় পিঠে একটা হালকা টোকা পেতে ভদ্রলোক ফিরে তাকালেন।

পিছন ফিরতেই দেখলেন সেই ভদ্রলোককে।বয়স এই তেত্রিশ চৌত্রিশ। করছিলেন।বয়স এই তেত্রিশ চৌত্রিশ। গালে খোঁচা দাড়ি, নাক দৃষ্টিকটু ভাবে বাঁকা,  কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, পরনে হালকা নীল হাফ শার্ট আর খয়েরী ট্রাউজার। পায়ে চামড়ার চটি। মুখের মিলটাও চোখে পড়ার মত, তবে সম্ভবত অবিকল নয়।   



দ্বিতীয় দৃশ্য

শহরের কোন একটা পার্ক। দেশপ্রিয় হতে পারে, অন্যকিছুও। একটা বেঞ্চি; কাঠের না হয়ে লোহার হওয়াই ভালো।
দুই ভদ্রলোক পাশাপাশি বসে।
-   দিলেন তো অফিসটা মাটি করে। ধুস!
-   কী আশ্চর্য! আপনিও তো আমার অফিস মাটি করলেন।
-   আরে আমার অনেক কাজ ছিল।
-   আমায় দেখে মনে হয় আমি ফাঁকিবাজ? আমি অফিসে ঘুমোই?
-   না। আপনাকে দেখে আমার মতই মনে হয়।
-   সে’টাই তো সমস্যা। বাস সিগনালে দাঁড়িয়ে আর আমি বাসের জানালায়, হাতে আনন্দবাজার। ফুটপাথের দিকে নজর যেতেই বুকে ধড়াস। দেখলাম আমি ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ঘুগনির প্লেট চাটছি। দু’সেকেন্ড পরে বুঝলাম, আমি বাসেই। ঘুগনির আমি আমি না। তাই হুড়মুড় করে নেমে এলাম।
-   অসোয়াস্তি অন্য জায়গায়।
-   কোন জায়গায়?
-   জামা কাপড় চটির এমন ভাবে মিলে যাওয়া। আচ্ছা, আপনার পকেটে রুমাল আছে?
*পাশের ভদ্রলোক পকেট থেকে কালচে নীল রুমাল বের করলেন*
*দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপর ভদ্রলোক নিজের রুমাল বের করে অন্যজনের সামনে মেলে ধরলেন, অবিকল এক কালচে নীল রুমাল*।
- আচ্ছা, আপনার মানি ব্যাগে কত আছে?
- আমার মানিব্যাগে?
- কত আছে?
*মানিব্যাগ বের করে গোনা শুরু*
- ছ’শো বত্রিশ। আপনার কাছে?
*মানিব্যাগ বের করে গোনা শুরু*
- আহ্‌! যাক। এগারোশ বত্রিশ। আমার কাছে। যাক। তাহলে সব মিলে যায়নি। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো মশাই। তাহলে...ওঠা যাক।
- এক্সকিউজ মি ঘুগনীবাবু।
- কী হল?
- আমি একটু কশাস।
- তো?
- মানে আমার প্যান্টের একটা চোরা পকেট আছে। ওখানে আমি সিকুইরিটি মানি রাখি। *নিজেকে আড়াল করে প্যান্টের গোপন অঞ্চলে হাত চোরা পকেট হাতড়ানো আর বের করে আনা একটা পাঁচশো টাকার নোট*। ছ’শো বত্রিশ প্লাস পাঁচশো। টোটাল এগারোশো বত্রিশ।
*অন্য ভদ্রলোকের ধপ্‌ করে বসে পড়া*
- যাহ্‌ শালা!
- অদ্ভুত। তাই না?
- আপনার মোবাইলটাও দেখলাম নকিয়ার। পুরনো মডেল।
- এগারোশো। মডেল নাম্বার।
- না বললেও হত। আমারটাও তাই।
- আমার কিন্তু দিব্যি লাগছে জানেন!
- কচু দিব্যি! অসোয়াস্তি হচ্ছে না?
- তা ঠিক না। তবে অবাক লাগছে। ফ্যান্টাস্টিক ব্যাপার। আচ্ছা আপনার বাড়িতে কে আছে?
- আমি একা। আপনারও তাই কেস নিশ্চই? বাপ মা অল্প বয়েসে হাওয়া? মামার কাছে মানুষ? বিয়ে থা করা হয়নি?
- কে বললে? বাড়িতে বাবা, মা, ছোটবোন, মেয়ে বাবলি ক্লাস টু তে পড়ছে, দিব্যি রাইম্‌স বলছে।
- ওহ! যাক।



তৃতীয় দৃশ্য

পাড়া। বিকেলের পরিচিত ইতিউতি শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে চারদিকে। এক ভদ্রলোক একটা সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছিলেন। বয়স এই তেত্রিশ চৌত্রিশ। গালে খোঁচা দাড়ি, নাক সামান্য  কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, পরনে হালকা নীল হাফ শার্ট আর খয়েরী ট্রাউজার। পায়ে চামড়ার চটি।
একটা বছর পাঁচেকের মেয়ে হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে জড়িয়ে ধরবে ভদ্রলোককে।
-   বাবা, তোমার অফিস আজ তাড়াতাড়ি ছুটি হল?
-   হল।
-   তুমি আমার জন্যে নতুন পেন্সিল বক্স আনোনি?
-   এ বাবা! নাহ্‌!
-   তুমি বলেছিলে আনবে।
-   একদম ভুলে গেছি। কাল ঠিক আনবো দেখিস।
-   ভুলবে না তো?
-   কদম নাতোর মা কোথায় রে বাবলি?



চতুর্থ দৃশ্য

শোওয়ার ঘর। বাবলি নামক মেয়েটা চওড়া বিছানার এক কোণে ঘুমিয়ে কাদা।
ভদ্রলোক খাটের এক কোণে বসে। ভদ্রমহিলা ঘরের অন্যপ্রান্তে। জানালার শিকে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে। বয়স ছাব্বিশ কি সাতাশ, মুখে শ্রান্তি, বিহ্বলতা। চোখ অস্বস্তিকর ভাবে স্থির। পরনে হলদে ছাপার শাড়ি, সবুজ ব্লাউজ।
ভদ্রলোক সামান্য কেশে বলতে শুরু করলেন;
-   তুমি গত এক ঘণ্টায় কিছুই বলোনি মিনু।
-   আমায় মিনু বলে ডাকবেন না দয়া করে। তুমিও বলবেন না। আপনি ও নন।
-   আমি সরি বলেছি।
-   এ’টা সরি বলার মত ঘটনা? আমাদের জীবন শেষ করে দিয়ে বলছেন সরি?
-   আসলে আমি চিরকালের একলা। তার মধ্যে ভদ্রলোকের সাথে মিলগুলো দেখে এমন ভেবড়ে গেছিলাম যে মাথা কাজ করছিল না। আচমকা এই ভরা সংসারের গল্প শুনে ঠিক...মানে...মাথায় কী যে হলো! আমি খুন করতে চাইনি।
-   কিন্তু করেছেন। আমার বরকে খুন করেছেন। আর সে’টা আমাদের বিছানায় বসে আমায় জানাচ্ছেন।
-   আমি সংসারটা ম্যানেজ করে নেব মিনু। এই খুনটা ভুলের, কিন্তু কেই কিচ্ছুটি টের পাবে না।বাবা,মা এমনিতেই বয়সে অথর্ব।বাবলি সোনার এইটুকু বয়স... আমি সব...।
-   প্লিজ আমায় ও নামে ডাকবেন না। ওঁদের বাবা মা বলে ছোট করবেন না। বাবলিকে সোনা বলবেন না।
-   আমি ম্যানেজ করে নেব।
-   আপনি কি মানুষ?



পঞ্চম দৃশ্য

মিনু টিফিনবাক্স রেডি করে অফিসের ব্যাগে ভরছিল। ভদ্রলোক জড়সড় হয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে। পরনে আকাশী কালো চেক হাফ শার্ট আর কালো প্যান্ট।
অসোয়াস্তি কাটিয়ে মিনু বললে;
-   টিফিনে আজ নিরামিষ। সকালে তো আর বাজার গেলে না। আর ফেরার পথে আজ বাবলির পেন্সিল বাক্সটা আনতে ভুলো না। গতকাল মেয়েটা খুব দুঃখ পেয়েছিল। কেমন?  


ষষ্ঠ দৃশ্য

অফিস টাইমের শহর। চারপাশে ভিড় আর ঘামে হাঁসফাঁস অবস্থা। শহরের হুড়মুড়ে ব্যস্ততা এ সময়ে যেন কানের মধ্যে একটানা গিজগিজ করে চলে।
ফুটপাথের এক পাশ আলো করে দাঁড়ানো ঘুগনি পাউরুটির ঠেলাটার পাশে দাঁড়িয়ে; আকাশী কালো চেক হাফ শার্ট আর কালো প্যান্টে পরা ভদ্রলোক দিব্যি ঘুগনির প্লেটে লাগা ঝোলের শেষ রেশটুকু জিভে মাখিয়ে নিচ্ছিলেন।
প্লেটের বিটনুন লেবু ছোঁয়ানো অন্তিম পেঁয়াজ কুচিটুকু চেটে নেওয়া মাত্রই চোখ গেল লাল সিগন্যালে দাঁড়ানো মিনিবাসটার দিকে। অসহ্য বুকের ধড়ফড়ের মধ্যেও বাসের দরজায় বাদুড় ঝোলা হয়ে থাকা লোকটার আকাশী কালো চেক হাফ শার্ট আর কালো প্যান্ট চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হল না তার।

Tuesday, August 9, 2016

আলোচনা

- বলেন কী মশাই, সুইসাইড?
- ইচ্ছে আছে।
- হঠাৎ?
- ইচ্ছে হল।
- চাকরী নট?
- প্রমোশন হচ্ছে এবার।
- প্রেম?
- বেড অফ রোজেস।
- কবিতা লিখছেন?
- দাঁতে ব্যথা।
- লাঞ্চে লাউ ছেঁচকি ছিল?
- কাতলার কালিয়া। সাথে হাফ কোয়া লেবু। গতকাল ছিল পাঁঠা। আজ ফিরব গড়িয়াহাট হয়ে, পাবদা মনে টান দিচ্ছে।
- তবে?  রশখ?
- স্রেফ।
- নিহিলিস্ট?
- ডেফিনিশন জানি না।
- এক্সট্রিম ল্যাদ?
- হতে পারে।
- লাগবে না?
- কীসে?
- মারা যেতে? লাগবে না? ঝাঁপ, ঝুলে পড়া, পোড়া...।
- আমার আবার সেন্সিটিভ স্কিন। সে'টাই বদার করছে।
- কোন ভাবে স্পেসে গিয়ে স্পেস্ক্র‍্যাফট থেকে ফ্লোট করে বেরিয়ে যেতে পারলে বেশ হত.. ভাসতে ভাসতে এক্কেরে গ্র‍্যাভিটি পুলের বাইরে..কাজ হতে পারে।
- লাইক ক্যাপ্টেন্ড হ্যাডক? তবে ওই...বর্দ্ধমান ইউনিভার্সিটি। বিকম। অনার্স বাদে। নাসা নেবে? নাহ!
- ঘুমের ওষুধ?
- থ্রিল নেই। টুপটাপ মরে গেলেই হল? ইম্প্যাক্ট চাই। মেট্রো আটকে যাবে। বাড়িতে আগুন। মেঝেতে রক্ত।
- চা খাবেন?
- দুধ চা ভাই। আড়াই চামচ চিনি।
- ওয়েটার ভায়া, এদিকে। হাঁ, দু'টো চা। বাড়তি চিনি দিয়ে যাবেন। আর চিকেন ওমলেট দু'টো। নহি। অউর কুছ নহি। হুঁ। এবার বলুন।
- কী বলব?
- সুইসাইড। হঠাৎ এমন ইচ্ছে হল কেন?
- শখ। বললাম যে।
- এমন শখ কেন?
- শখের প্রাণ গড়ের মাঠ, শোনেননি?  শখ থ্রাইভস অন বেসলেসনেস।
- কিন্তু এই যে আপনার ডেলি প্যাসেঞ্জারি থাকবে না, আলুর চপ থাকবে না, নিউজচ্যানেল থাকবে না, চায়ে আড়াই চামচ চিনি থাকবে না, মন খারাপ হবে না?
- ধুরধুর। সব বিষ। বিষ।
- প্রেমিকা থাকবে না। মায়ের ভাত বেড়ে দেওয় থাকবে না।
- প্রেমিকার নতুন প্রেমিক হবে, তার অনার্স থাকবে। মা দাদাকে ভাত বেড়ে দেবে।
- হুঁ। তাহলে ডিসাইডেড?
- কনফার্ম। টোটালি।
- মেথড?
- চায়ে আড়াই চামচ করে। প্রত্যেকবার। দিনে দশবার। ক্রমশ রক্ত ক্রিস্টালাইজ করে যাবে।
- সিরিয়াসলি?
- সিরিয়াসলি? মাথায় আসছে না। মানে প্রসেসটা সাংঘাতিক কিছু হওয়া উচিৎ।  সাপও মরবে আবার লাঠিও দিব্যি চুরমার হবে  গোছের।
- বুঝলাম না।
- মানে ধরুন, একটা এক্সপ্লোশন! সে'টা একটা অর্গ্যাজম হতে পারে, জিভে একটা দুরন্ত স্বাদ হতে পারে, অবিস্মরণীয় কোনও দৃশ্য হতে পারে। এমন একটা বিস্ফোরণ যাতে হৃদযন্ত্র যাবে আটকে।
- কিন্তু তার জন্য আপনার আমায় দরকার হল কেন? এমন হুড়মুড় করে আমায় এই কেবিনে ডেকে আনার কী মানে? আমি কী করে সেই বিস্ফোরক সুইসাইড টেকনিক আপনাকে বাতলে দেব?
- আপনি বাতলে না দিলে কে দেবে? আপনার মত অ্যাপ্টিচিউড বা সেনসিটিভিটি আমার চেনা আর কারুর আছে বলে মনে হয় না।
- ফ্ল্যাটার্ড। কিন্তু ইউটোপিয়ান সুইসাইডের টিপ দেওয়া আমার কাজ নয়। বললাম তো।
- অমন ডিসমিস করে দেবেন না। বড় আশা করে আপনাকে ডেকেছি।
- আচ্ছা আপনার ব্যাপারটা কী বলুন তো? প্রত্যেক মঙ্গলবার কোন না কোন অদ্ভুতুড়ে সাব্জেক্ট আলোচনা করতে আমাকে ডাকেন এই কফি কেবিনে। কোনওবার সিরিয়াল কিলার হওয়ার ব্যাপারে সাজেশন চান, কোনওদিন প্ল্যানচেট নিয় গল্প, কোনওদিন অর্গি, কোনওদিন জিরাফ পোষার প্রস অ্যান্ড কনস। আজ সুইসাইড। আরে মশাই আপনি পেয়েছেনটা কী বলুন তো?
- চটবেন না প্লিজ। চটবেন না। আপনি ছাড়া আর কে আছে বলতে পারেন? যে শুনবে? যে বুঝবে? যার মুখোমুখি বসে দু'চারটে মনের কথা আগুপিছু না ভেবে বলা যায়? আছে কি কেউ? নেই। নেই। নেই। আপনি চটবেন না প্লিজ।

**

ওয়েটার ১ -  এগারো নম্বর টেবিলে ফের সেই মাল এসেছে! ওই যে! ছিটগ্রস্ত!

ওয়েটার ২ - ওই সেই উদ্ভট স্যাম্পলটা তো? ওই একটানা বিড়বিড় করে যাওয়া ভদ্রলোক? প্রতি মঙ্গলবার এসে যে নিজের জন্য জোড়া চা আর জোড়া অমলেট অর্ডার করে?