Sunday, January 24, 2016

খুকুর ভয়

- এই যে আমি ভূত, আমায় ভয় লাগে না?
- ভয় কেন লাগবে?
- আমি ভূত বলে।
- তাতে আমার কী?
- তুমি বাচ্চা। তোমার ভূতে ভয় করবে। নিয়ম।
- সে কী? 
- তাই তো। ভয় করছে না?
- এ কী কথা খুকু। তোমার আপব্রিঙ্গিং এমন বেকায়দা হচ্ছে কেন? বাপ মা তোমায় ভূতের কথা বলেনি কিছু?
- বলে তো। রোজ বলে। 
- তবু ভয় পাচ্ছ না? এত খ্যাকখোকখুক করছি, তাও ভয়ে আসছে না? 
- না। ভূতেরা তো ভালো। তাঁদের ভয় কীসের? 
- ভূতেরা ভালো? কোন রূপকথার গপ্প শোনায় তোমায় বাবা মা?
- ওই যে তাকের ওপর বই। ওই বই থেকে বাবা মা ভূতের গল্প পড়ে শোনায়। আমি কী না ছোট। আমি কী না পড়তে শিখিনি এখনও। তাই বাবা মা বই থেকে পড়ে। 
- ওই বইতে ভূত আছে?
- আছে তো। কত ভূত। 
- বেশ। তাহলে তোমায় বলেই দিই। আমি ভূত নই। আমি চোর। চুরি করতে এসেছি তোমাদের বাড়িতে। তোমার বাবা-মা টের পায়নি। কিন্তু তোমার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছি। 
- ও। তবে তুমি ভূত না? চোর?
- হ্যাঁ। তবে? আমি চোর। কী! এবার ভয় করছে তো? হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে?
- বা রে। ভয়ের কী আছে। চোরেরা তো ভালো। মজার। 
- চোরেরা ভালো? মজার?
- খুব মজার। আর চোরেদের মত ভালো লোক হয় না। 
- এই তোমার বাপ মা শিখিয়েছে?
- হ্যাঁ, গল্প বলে। 
- আর সে গল্প কোথা থেকে জানলে তারা?
- ওই যে। ওই যে বইটা দেখালাম। ওখান থেকেই। 
- যাচ্চলে। 

ঝোলায় শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সমগ্রটা ফেলে, খুকুকে ফ্লাইং কিস্‌ ছুঁড়ে, পাইপ বেয়ে চম্পট দিলেন মিন্টু চন্দ্র দাস। 

Saturday, January 23, 2016

স্নান খাওয়া

জমিতে কান পেতে শুয়েছিলাম। নরম জমি ম্যাজম্যাজ করছিল। শীত কি একটু কম? উষ্ণতা জমি বাওয়া জলের পূর্বাভাস।  

এদিকে  বুকে অল্প ধড়ফড়। বড় দুর্বল বোধ হয়। হবে নাই বা কেন। দেহে পুষ্টি নেই যে। কদ্দিন ভালো কিছু পেটে পড়েনি। কদ্দিন। জমি ছাপিয়ে জল না উঠলে উপায়ও নেই কিছু। জলে জমি ভাসলে খাদ্যফলন হয়, গায়ে গত্তি লাগে। 

বুকে বড় ধড়ফড়। বড় কষ্ট। বড় হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড়। অর্ধেক নিকেশ হয়েছে, আমরা ক'জন ঘাড় বাঁকানো জেদ বয়ে পড়ে আছি। যদি জমি বেয়ে জল উঠে আসে। 

কদ্দিন স্নান করা হয়নি। জল নেই যে। জল নেই। গায়ে ময়লা, কুটকুট, বমিভাব, চুলে জট। বড় মলিন সমস্তটুকু। শুধু আমার না। সক্কলের। যারা বেঁচে আছে; সক্কলের এক দশা। 

জমিতে কান পেতে ঠায় শুয়ে। জল উপচে উঠে আসার মিহি শব্দ আর কম্পন অনুভূত হয়, যারা চেনে তারা রন্ধ্রে সে আগমনী অনুভব করতে পারে। পারা যায়। 

বাতাসের উষ্ণতার ওজন বেড়ে চলেছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে। আজ ভাসাবেই। জমি নরম হয়ে আসবে। খাওয়ার পড়বে পেটে। আমার। ভাগ্নের। আর আমাদের সাথে যারা যারা বেঁচে আছে সক্কলের। তারপর স্নান। 

আচ্ছা, আগে স্নান করে তারপর খাওয়া উচিত, তাই না? বেশ পরিষ্কার হয়ে, ছিমছাম মেজাজে বাবু হয়ে পাত পেড়ে খেতে বসা। সেই ভালো, তাই না? অবিশ্যি এতদিনে জমানো খিদে...স্নানের অপেক্ষা সইবে? দু'মুঠো মুখে দিয়ে বরং গা মাথা ভিজিয়ে নেওয়া যাবে। অবিশ্যি যে উপচে আসা জলেরও রকম ফের আছে। জল কখনও নোনতা কম, তাতে চান ভালো হয়, কিন্তু খাওয়ারের ফলন কমে। আবার কখনও জল ভরপুর নোনতা, প্রচুর খাওয়ার কিন্তু স্নান করে দিল খুশ হয় না; গায়ে খরখর ভাব রয়ে যায়। 
একেক সময় একেক রকম জল আসে জমি বেয়ে। কিন্তু আসে। খেয়ে নাইয়ে কেটে যায়। কিন্তু এবারের মত এমন ভয়ানক সময় বহুদিন আসেনি। জমি খটখটে হয়ে পড়ে রয়েছে কদ্দিন। কদ্দিন। হাজারে হাজারে মারা গেল। বেঘোরে, না খেয়ে , না নাইয়ে। যে ক'জন বেঁচে রয়েছি, তাঁদেরও হালত নড়বড়ে। জমি বেয়ে জল না এলেই নয়। নয়। 

- "মামা, ও মামা!", ভাগ্নের ডাকে ভাবনাটা ছিঁড়ে গেল। 
- "গলা নামিয়ে, গলা নামিয়ে, শুনতে দে"। 
- " মামা গো, জল আসছে?"। 
- "মনে তো হচ্ছে, তবে বেশি আশা করিস নে"। 
- "আর যে পারা যায় না মামা"। 
- "আজ আসবে। আসবে রে আসবে"। 
- "আসবে মামা?"
- "বিলকুল আসবে, বাতাস ভারী হয়ে আসছে টের পাচ্ছিস না? জমি নরম হয়ে আসছে বুঝছিস না?"। 
- "স্নানের জল না খাওয়ার জল মামা?"
- "ভিখিরির আবার স্নান খাওয়া। যেটুকু যা আসবে তাই দিয়েই স্নান খাওয়া সব করতে হবে। অত ভেবে কাজ নেই"। 

** 
কাঁপা হাতে ফোনটা রাখল সুমনা।  শরীরের ভিতরটায় ভীষণ একটা আনচান। আনন্দের ঢেউটাকে বুকের ধারেকাছে ঘেঁষতে দিতে ভয় হচ্ছিল তার। ভীষণ ভয়। 
তবে খবরে ভুল নেই। অনিকেত মারা যায়নি। বাস অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়নি। সাময়িক অ্যামেনেসিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পাহাড়ি কোন একটা গ্রামে  পড়েছিল। স্মৃতি ফেরত আসেনি কিন্তু সিক্কিম পুলিস তাকে খুঁজে পেয়েছে। দশ মাস পরে হলেও পেয়েছে। 
ওরা অনিকেতকে ফেরত আনছে। সুমনা একা নয়। একা নয়। 

দশমাসে একটি বারের জন্যে কাঁদতে পারেনি সুমনা। পারেনি। বুকের ভিতর দম বন্ধকরা অস্বস্তি বয়ে বেরিয়েছে। মরে যেতে চেয়েছে কিন্তু পারে নি। মরতে পারেনি। কাঁদতে পারেনি সুমনা। 

ফোনটা রেখে আজ হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ল সুমনা। হাউহাউ করা কান্না জমিয়ে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। নয়। মিলু "কার ফোন ছিল মা?" জিজ্ঞেস করতেই কান্নায় চোখ ঝাপসা হয়ে গেল সুমনার। 

**
- "সামহালো, সামহালো", চিৎকার করে উঠতেই হল, "জল বেয়ে উঠছে। উঠছে। উঠছে"। 
- "জল আসছে মামা? খাব? নাইব?"। 
- "সমস্ত রে। সমস্ত। ভাসিয়ে নিয়ে যাবে"। 
- বাঁচলাম গো মামা"। 
- "হ্যাঁ, এ যাত্রা বেঁচে গেলাম। মানুষের চোখের জমি চষে খাওয়া ব্যাকটেরিয়া হয়ে বাঁচা চাট্টিখানি কথা নয় রে। নে খা"। 

ডার্বি

- মোহনবাগান না ইস্টবেঙ্গল?
- হুঁ?
- কাল আপনি কোন দিকে?
- কার কোন দিকে?
- মোহনে না ইস্টে?
- ইস্ট তবু একটা ডাইরেকশন। মোহন কী?
- ওয়েস্ট। বাঙালি হয়ে ডার্বির কথায় এমন চমকে যাচ্ছেন? ছিঃ!
- ওহ। ফুটবল। কলকাতার ফুটবল।
- ইয়েস। বাঙালির পরিচয়, বাঙালির গর্ব। সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল। আপনি আমায় অবাক করলেন মশাই।
- লজ্জা। এ লজ্জা আমার। 
- আলবাত লজ্জা। কলকাতার মানুষ হয়ে ময়দান ফুটবলের বেসিকসের খবর রাখেন না! এহ হে।
- কলকাতার ফুটবল।
- বাঙালির ফুটবল। যে খেলা স্বামীজি গীতার চেয়েও দরকারি বলে গেছিলেন। সেই ফুটবল।
- সেই ফুটবল তো,  কলকাতায় যার সেরা মাঠ থেকে ম্যাচ সরিয়ে দেওয়া হয় আইপিএলের ওপেনিং সেরিমনির জলসার জন্য?

Friday, January 22, 2016

আজকাল

হোয়াট আ প্রেমিক থিঙ্কস টুডে
আ ডায়েরি ডাইজেস্টস টুমরো

হোয়াট আ ডায়েরি থিঙ্কস টুডে
আ চপ ভাজা কিল্‌স টুমরো

***

চপে প্রথম কামড় দিতেই ঠোঙার গায়ে চোখ গেল নিবারণের। বারোই অগস্টের ডায়েরির পাতা মুড়ে ঠোঙা। বার্ন্স অ্যান্ড রুফের ডায়েরি। পাঁচ বছর আগের।
লেখাটা চেনা। তেলে ল্যাপ্টানো লেখাটা ডজ্‌সন ফাউণ্টেন পেনের। হাতের লেখাটা কাঁচা। স্টাইলে টুকলি আছে, অনুভূতিতে নেই।

নীহারিকা চিঠিগুলোকে যত্নে রাখেনি তাহলে।

সামন্তবাবুর মন খারাপ

বিকেল নামলেই মন খারাপ হয় মোহন সামন্তর। অফিসের চেয়ার ছেড়ে উঠতে হবে ভেবে।
সন্ধ্যের শেষ দিকে গিয়ে আবার মন খারাপ জাঁকিয়ে বসে মনে। ট্রামের সিট ছেড়ে উঠতে হবে বলে।
রাতের দিকে টিভির সামনের সোফা থেকে উঠে যেতে তার গায়ে জ্বর আসে।
আর সকালে বিছানা ছাড়বার সময় মনে হয়ে মরে যেতে।

অফিসে ভালো লাগে না সামন্তবাবুর। ট্রামের ডেলি প্যাসেঞ্জারিতে ঘেন্না হয়। টিভির যত প্রোগ্রাম অখাদ্য লাগে, বিশেষত খবর আর সিরিয়াল। আর সকালে বাজার যেতে তো একদমই ইচ্ছে করে না।

এক জায়গা থেকে না নড়া। এটাই তার হবি, ভালো লাগা, প্যাশন, জুনুন, নেশা, আগ্রহ, আহ্লাদ। অফিসের চেয়ার, ট্রামের সিট, ড্রয়িং রুমের সোফা আর বেডরুমের খাট; মোহন সামন্তের ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ববেদ। মোহন সামন্ত হৃদয়-ঋষি।

কলকাতার অন্তরে হিমালয় ইঞ্জেক্ট করতে চেষ্টার কসুর করেননি সামন্তবাবু। নীলাকেও ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিলেন পার্কের বেঞ্চে তিন ঘণ্টার বেশি বসতে চাইত না বলে। প্রমোশন হেলায় হারান, কথায় কথায় চেয়ার ছেড়ে বড়সাহেবের রুমের দিকে ছুটে যেতে পারেন না বলে।

সেদিন হঠাৎ নীলার সাথে দেখা হয়েছিল। ট্রামে। বছর সতেরো তো হবেই; এদ্দিন পর দেখা। নীলাকে ভারী সুখী দেখাচ্ছিল। কপালে ইয়া বড় সিঁদুর। হালকা সবুজ তাঁতের শাড়ি। আরও ফর্সা হয়ে গেছে। চেহারায় অবিশ্যি বয়েস বিশেষ জড়ো হয়নি, মুখশ্রী আগের চেয়েও ঝলমলে। সঙ্গে বোধ হয় ওর ছেলে ছিল; রাজপুত্রের মত চেহারা। বুকের ভিতরটা চিনচিন করে উঠল। বড় সাধ হয়েছিল ভিড়ের ঠেকে নীলাকে ডাকতে। কিন্তু পরে খেয়াল হল নীলা দাঁড়িয়ে, তাক ডাকলে বসার সিট অফার করে নিজেকে দাঁড়াতে হবে। বুকের ভিতরে ভালোবাসাটা গুমরে রইল, ছলছলে চোখ নিয়ে ট্রামের জানালার বাইরে তাকালেন মোহন সামন্ত।

সাধে কি কলকাতার কবিতার অভাব হয় না?