Friday, July 24, 2015

সুইসাইড নোট

সুইসাইড নোট লেখা চাট্টিখানি কথা নয়। বেশি লম্বা হলে চলবে না, তাতে পাঞ্চ কমে যায়। আবার এলেবেলে 'চললাম' বললেও ঠিক চলে না। সেন্টিমেন্টের ঘায়ে পাঠককে শুইয়ে দিতে হবে; আবার ইরেস্পন্সিবল কথা ছুঁড়ে দেওয়া চলবে না। প্রতিটা শব্দ হিসেব কষে পাতায় ছাড়তে হবে। সেইসব সাতপাঁচ অনেক ভেবে চিঠিটা লিখতে বসা। 

গুছিয়ে লিখে রেখে যাওয়া যে এক্সট্রা ম্যারিটাল ব্যাপারটা নেহাতই একটা অ্যাকসিডেন্ট দিয়ে শুরু হয়েছিল কিন্তু এখন ক্রমশ নেশার পর্যায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং সুইসাইড যে সেই অপরাধ বোধ থেকেই; সেটা স্পষ্ট করে যাওয়াটা দরকারি যাতে আর পাঁচজনের হয়রানি না হয়। 
"আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। সবাই যেন ভালো থাকে। ইতি, পল্লব"। শেষ লাইনটা লিখে বেশ নিশ্চিন্তে বসা গেল। 

এক গেলাস জল টেবিলেই রাখা ছিল। বিশেষ বড়ি দু'টো জলে ছাড়তেই মিশে গেল; জলের রঙ বদলে গেল না অথচ ওই এক চুমুকেই যুদ্ধ জয়।

**

- আহ, অনিতা কী হচ্ছে কী? রাত একটা বাজতে চলল অথচ এখনও আলো না নিভিয়ে কী সব লিখে যাচ্ছ?
- একটা চিঠি।
- চিঠি? কাকে?
- নিজের জন্য লিখছি। তুমি তো আর কোনদিন আমায় চিঠি লিখে দিলে না। তাই তোমার হাতের লেখা টুকলি করে নিজেকে চিঠি লিখছি।
- বাজে ঠাট্টার সময় এটা নয়। শুতে এস। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। আলোয় অসুবিধে হচ্ছে।
- লেখা হয়ে গেছে গো চিঠিটা এবার শুতে আসব। শোন পল্লব, আজ ডিনারের পর তুমি একদম ভালো করে জল খাওনি কিন্তু। এক গ্লাস জলে এনে দিচ্ছি, খেয়ে তারপর ঘুমোও। 
- এই রোজ শুতে যাওয়ার আগে তোমার জল খাওয়ানো। মায়ের কথা মনে পড়ে যায় জান? দাও দেখি এক গেলাস। আর লাইটটা নেভাও। 

Wednesday, July 22, 2015

প্রোডিউসার

- কহানী তো বঢিয়া আছে শ্যামলবাবু। 

- আপনি পড়েছেন?

- পড়িয়েছি। অফ কোর্স।

- বাংলা পড়তে পারেন তাহলে?

- বাংলা কুছু পড়ে লিতে পারি। লেকিন কহানী পড়নে লায়েক কঁহা! আই হ্যাভ রেড দ্য টেরান্সলেশন। আমার সেক্রেটারি শম্ভু; উ করিয়ে দিল। প্রোডিউস করব, স্টোরি ঠিক সে জানব না?

- হ্যাঁ তা তো বটেই। তাহলে গল্প ভালো লেগেছে বলুন?

- ভালো কী বলছেন? এক্সেলেন্ট। চেতন ভগত টাইপ্‌স। বিউটিফুলি রিটেন। লেকিন...।

- আবার লেকিন কেন?

- দেখেন শ্যামলবাবু। আপনি আমার ডিয়ার ফিরেন্ড আছেন। সওদা তো আজ আছে কাল নেই। ফিরেন্ডশিপ উইল স্টে। এবার শুনেন। একটা মাইনর ইস্যু আছে, সমঝলেন? 

- কিন্তু আপনার ডিরেক্টর তো বললে তার বেশ পছন্দ হয়েছে গল্পটা।

- আরে ডিরেক্টর তো অ্যাকশন বলে আর দু'টো প্রেস কনফারেন্স করে খালাস। ওয়ালেট তো আমি দাঁও পে লাগালম। 

- তাহলে গল্পটা আপনি নিচ্ছেন না?

- বিলকুল নিব। ডেফিনিটলি নিব।

- তাহলে প্রবলেমটা কোথায়?

- প্রবলেম বলছেন কেন। মাইনর ইস্যু বলুন । ওয়ান স্মল পয়েন্ট।

- সেক্স সিনের অভাব?

- সেক্স সিনের কুছু অভাব নেই। আরে সেক্স সিন রাইটার লিখবে কেন? সেক্স তো ডিরেক্টর ইঞ্জেক্ট করবে। ইন্সট্রাকশন হ্যাস বিন গিভেন।  

- সে কী। আমার গপ্পে তো ফিমেল ক্যারেক্টারই নেই।

- উঁহু। নেই তো কী হল? ইম্পোর্ট হবে!

- ক্যারেক্টার?

- গাঁও কি গোরি।

- গল্পটা তো কলকাতা বেস করে লেখা। গাঁও কি গোরি আসবে কোথা থেকে?

- কেন? হিরোর আইডিয়ালিস্টিক বাপ ফ্ল্যাশব্যাকে নিজের জওয়ানিতে ওয়াপিস যাবে। হিরোর বার্থ কে দিখানো হবে; হিরোর বাপ মায়ের রোম্যান্স দিখানো হবে। ঝর্ণা থাকবে, স্নো ক্যাপ্‌ড মাউন্টেন থাকবে।

- কলকাতার ছেলের বাপের গ্রামে ঝর্ণা আর বরফ চুড়ো?

- কাস্টোমার ডিলাইট শুনিয়েছেন তো শ্যামলবাবু?

- না। আমি ছাপোষা পাতি রাইটার। এই আপনারা টু পাইস রেকগ্‌নিশন অফার করছেন বলে একটু করে খাচ্ছি। তা গল্প নিয়ে ইস্যুটা কী ছিল বলছিলেন?

- ইস্যুটা মাইনর। কফি লিবেন?

- এইমাত্রই তো খেলাম এক কাপ।

- আরে অউর এক কাপ লিন। ব্রেজিলের চিজ্‌ আছে। আমার বড় লেড়কা আনিয়ে দিলে।

- দিন। তা ইস্যুটা কী? সেক্স টেক্স যখন নিজেরাই ঢুকিয়ে নেবেন তখন তো আর গল্প নিয়ে চাপে থাকার মানে হয় না।

- চাপ কী বলছেন শ্যামলবাবু? আর এই কহানীতে স্টোরি হোবে সুপার ডুপার হিট। ইতো পয়সা টোলিউড ফার্স্ট টাইম দেখবে শ্যমলবাবু। অল বিকজ অফ দ্য স্টোরি।

- ধুর কাঁচকলা, তাহলে ইস্যুটা কী?

- মাইনর।

- বলুন তো, মাইনর ইস্যুটা কোথায়। 

- ইস্যুটা  আছে ইন দ্য নেম অফ দি রাইটার।

- আমার নামে প্রবলেম? শ্যামল কী দোষ করল?

- কুছু না। জাস্ট কুছু না। 

- তবে?

- হামি শুধু এইটুকু চাইছে ডিয়ার শ্যামলবাবু, এ কহানীর রাইটার হিসেবে আপনার নাম ক্রেডিটে থাকব না।

- সে কী! তবে কার নাম থাকবে?

- উমাচন্দ ঢনঢনিয়া।

- আপনার নামে?

- একটু মার্কেটে সুনাম হোবে। আই অ্যাম সেভেনটি থ্রি নাউ। কিতনা দিন অউর আছি বোলেন?

- তাই আমার লেখা চুরি করে...!

- ছিঃ ছিঃ, আপনি হামায় ইতনা নিচ সমঝলেন? লিখা হামি চুরি করবে কেন? আই উইল অফার দ্য রাইট প্রাইস্‌ ফর ইট। টেন ল্যাখ্‌স।

- যদি রাজি না হই, তাহলে ইউসুয়াল ফীজ্‌ নিতে হবে তো?  ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ?

- আপনি রাজি না হলে এ স্টোরি আমি লিব না। সিম্পুল বিজনেস। 

- কিন্তু ডাইরেক্টর সান্যাল তো অলরেডি জেনে গেছে স্টোরিটা আমার।

- আই ক্যান বাই ইউ। আই ক্যান বাই সানিয়াল। ই ভি সিম্পুল।

- হুঁ। তবে দশ নয়।

- টেন ল্যাখ্‌স ইজ আ লট অফ মানি শ্যামলবাবু।

- বারো। 

- লিখেন ভালো সো ঠিক। লেকিন আপনি বিজনেস ভি জানেন। হে হে। ঠিক হ্যায়। ভদ্দরলোকওয়ালা এগ্রিমেন্ট। হামি বারো দিবে, আপনি কহানীর ক্লেইম ছেড়ে দিবেন।

- বেশ। তবে চেকে শুধু অ্যামাউন্টটা বসিয়ে সই করে দিন ঢনঢনিয়াজী। নিজের নামে এসব কালো টাকা না হয় নাইবা নিলাম। 

- ক্যাশে লিয়ে লিন।

- না না। চেকই দিন। ছেলের নাম বা বৌয়ের নাম আমি সুযোগ বুঝে বসিয়ে নেব।

**

- হ্যালো শ্যামলবাবু?

- কে ঢনঢনিয়াজী? কী খবর?

- হোয়াট নন-সেন্স ইজ দিস?

- কীসের নন-সেন্স?

- সিন্‌মা শুটিং মিড  ওয়েতে। আমার পোয়সা পুরা ইনভেস্ট হয়ে গেল। আর আপনি প্রেস কনফারেন্স করে বলছেন এ মুভি আপনার কহানীতে তৈয়ার হচ্ছে?

- সেটাই তো সত্যি।

- আমি বিজনেসম্যান আছি শ্যামলবাবু। আমার বারো লাখ মেরে দিয়ে আপনি ইখন বলছেন এ স্টোরি আপনার? আমার কন্ডিশন ছিল আপনার সাথে...।

- আপনার কন্ডিশন ছিল এ সিনেমার ক্রেডিটে আপনি কাহিনীকারের নাম হিসেবে শ্যামল চ্যাটার্জীর বদলে উমাচাঁদ ঢনঢনিয়া রাখবেন। আমি এগ্রী করলাম। আর নিজের নামটা পালটে নিলাম। ভদ্রলোকের কথা। অ্যাফিড্যাবিটের সামান্য খরচ আর ঝক্কিটুকু বাদ দিলে এ এমন বড় ব্যাপার নয় বুঝলেন।

- হামি বারো লাখের চেক দিলম শ্যামলবাবু...।

- এবার এই শ্যামল নামটা ত্যাগ করুন। ইট্‌স ঢনঢনিয়া টু ঢনঢনিয়া নাউ। ওই চেকে নাম বসানোর আগে আমি নিজের নাম পাল্টেছি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ডিটেইল্‌স পাল্টেছি; তারপর তাতে নিজের নতুন নাম উমাচাঁদ ঢনঢনিয়া বসিয়ে এনক্যাশ করেছি। সইটাও পালটে গেছে, বুঝলেন! আর হ্যাঁ, গত দু'মাস ধরে আমার এই নতুন নাম দিয়েই আনন্দবাজার আর আরও দু'একটা জায়গায় লেখালিখি করছি; সবাই আমায় এই নতুন নামে বেশ অ্যাক্সেপ্ট করে নিয়েছে। কথার খেলাপ করিনি। আপনি স্বচ্ছন্দে আপনার সিনেমার ক্রেডিটে কাহিনীকার হিসেবে উমাচাঁদ ঢনঢনিয়ার নাম দিয়ে দিতে পারেন।

- হারামি চ্যাটার্জী। রাস্ক্‌ল। 

- দেখুন। খিস্তি মারুন আপত্তি নেই। কিন্তু চ্যাটার্জী বলে আর ডাকবেন না তো। ইয়ে লাগে কিন্তু।

- শুনেন। হামি এটা করেছিলাম আউট অফ মাই লাভ ফর মাই ওয়াইফ। ও চাইত আমি গোটা লাইফ সিনেমা বিজ্‌নেস না করে কুছু ক্রিয়েটিভ করি। আই ওয়ান্টেড টু শো হার হাউ মাচ আই লাভ হার ইটা বলে কি হামি সিনেমার স্টোরি লিখেছে; ডিউ টু হার ইন্সপিরেশন। ইউ হ্যাভ রুইন্‌ড ইট। পইসার ডর ঢনঢনিয়া পায় না। বাট নাউ আই আম আ লায়ার ইন ফ্রন্ট অফ মাই ওয়াইফ বিকজ্‌ অফ ইউ। 

- আপনি সেটাই মিস্টার ঢনঢনিয়া। সেটাই আপনি ডিজার্ভ করেন। কেমন লাগল রিয়েল লাইফ সিনেমাটা? ওহ হো! আপনার বোধ হয় ভালো লাগেনি না? কারণ আমার লেখা এই গপ্পে তো আর আপনি সেক্স সিন ইঞ্জেক্ট করতে পারবেন না। তাই না উমাচাঁদ ঢনঢনিয়া সিনিয়র? হে হে হে হে হে।

**

- ছেড়ে দিন আমায়। আমি আপনার পায়ে পড়ছি। প্লীজ। আমি আপনার মেয়ের বয়েসি।

- সরি মিসেস্‌ চ্যাটার্জী। ওহ সরি। আপনি তো এখন মিসেস্‌ ঢনঢনিয়া আছেন। বাট ইউ সি; আপনার হাজব্যান্ড ভি উমাচাঁদ ঢনঢনিয়া, আর হামি ভী ওহি - উমাচাঁদ ঢনঢনিয়া। উমাচাঁদ ঢনঢনিয়া কে নিজের বডি রিফুজ করিয়েবেন কেনো?

- প্লীজ ডোন্ট ডু দিস টু মি।

- আপনার হজব্যান্ড। রাইটার নিউ ঢনঢনিয়া আমাকে আমার ওয়াইফের সামনে লাইয়ার প্রুফ করে বলল ইটা রিয়েল লাইফ মুভি আছে। ই রিয়াল লাইফ স্টোরি নাকি উ রাইটার এমন লিখেছে যে হামি চাইলেও এই স্ক্রিপ্টে সেক্স ইঞ্জেক্ট করতে পারব না। বাট হামি উকে গলত প্রুফ করবে। আই উইল প্রুভ দ্যাট রিয়েল লাইফের স্ক্রিপ্ট্‌ও রাইটারের মর্জিতে চলে না, প্রোডিউসারের মর্জিতে চলে। হামি প্রোডিউসার আছি। যে কোন স্টোরিতে  সেক্স সিন ইঞ্জেক্ট করার মর্জি হলে আমি করবে। নো ওয়ান ক্যান স্টপ মি। নো রাইটার ক্যান স্টপ আ প্রোডিউসার ফ্রম ইঞ্জেক্টিং আ সেক্স সিন। আসেন মিসেস্‌ নিউ ঢনঢনিয়া।    

Tuesday, July 21, 2015

ছোটমামার তিন

১। মামা ও সেকুলারিজ্‌ম।

-রিয়েল সেকুলার কে বল দেখি?
-তুমিই বল মামা।
-মন দিয়ে শোন। পারলে টুকে রাখ।
-বেশ।
-যে কাতলা মাছের ডিমের বড়া আর মামলেটকে সমান সমাদরে জিভে টেনে নেয়।
যে বেগুনী পেয়ে কুমড়ো ফুলের বড়া কে অবহেলা করে না।
আলু পোস্তে ও পেয়াঁজ পোস্তে যার সমান নোলা টসটস।
চানাচুর চিবুতে গিয়ে যে কচুভাজা ভুলে যায় না।
আদত সেকুলার সেই।

২। মামার মাঝরাতের এস-এম-এস

"এইমাত্র মেঘ ডাকলো। গর্জনের যা ভাইব্রেশন; মনে হল আকাশ পলকা টিনের ছাদের মত ভেঙে পড়তে পড়তে পড়ল না।
ধুম বৃষ্টি।
কিন্তু হে সিভিলাইজেশন অফ স্টিরিওটিপিকাল এলিমেন্টস; গান বাঁধতে শিখলে, প্লুটোর পাশে পায়চারী করতে শিখলে অথচ মাঝরাতে মশারির কম্ফর্ট ভেঙে বেরিয়ে এসে ফুলুরি ভাজতে শেখনি? ধুর!" 

৩। বাজে রাগ

- আচ্ছা মামা, তোমার রাগ সঙ্গীতে ইন্টারেস্ট আছে?
- অফ কোর্স।
- প্রিয় রাগ কোনটা?
- সকালে হেমন্ত রাগ, বিকেলে শ্যামল রাগ, রাত্রে মান্না রাগ।
- ধুর।
- আরও আছে।
- কিশোর রাগ?
- না। অফিস ফেরতা দেরীর তালে তোর মামীর "সাপের পাঁচ পা দেখেছ?" রাগ।
- ধুর ধুর।
- এতেই ধুর ধুর? সবচেয়ে প্রিয় রাগটার কথা তো বলিইনি এখনও।
- বলে ফেলো।
- বরযাত্রীর দলে থাকলে আমি পান প-রাগ প্রেফার করি।

ডমিনো

লাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে একটা বেশ চনমনে মন কেমনের ভাব আসে। ব্লজ্ঞপ্রাণের মনের মধ্যেও সেইরকমই একটা শিরশিরে ভাব। খানিকক্ষণ ছটফট করেছিল বইবপনবাবু মারা যাওয়ার আগে। বইবপনের বুকে ছুরিটা বসাতে একটুও ভুল হয়নি ব্লজ্ঞপ্রাণের। দু'টো পাঁজরার মাঝখান দিয়ে সটান ঢুকিয়ে দেওয়া। সঠিক পয়েন্ট জানা থাকলে বুকে ছুরি ঢোকানো এক তাল নরম মাখনে ছুঁচ ঢোকানোর চেয়েও সহজ।
মৃতদেহর প্রতি মায়া বোধ হয় খুব সহজে আসে। ব্লজ্ঞপ্রাণের চোখে সামান্য স্নেহ চিকচিক করে উঠছিল বোধ হয় বইবপনের লাশটার দিকে তাকিয়ে। অথচ খুন করার আগে ব্যাটার দিকে তাকিয়ে এক ফোঁটাও অনুকম্পা আসেনি। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করলে ব্লজ্ঞপ্রাণ। 
**

টুঁটি টিপে মেরে ফেলাটা সহজ নয়। তবে এই কাজটাতে শ্রীমান ফেবুপেমনকে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। অভ্যাসে কী না হয়। ব্লজ্ঞপ্রাণ সিগারেট ঠোঁটে ঝুলিয়ে সবে পাঞ্জাবীর পকেট হাতড়াতে শুরু করেছিল দেশলাই খুঁজতে। ঠিক তখনই পিছন থেকে এসে ডান হাতটা দিয়ে সাঁড়াশির মত ব্লজ্ঞপ্রাণের গলাটা চেপে ধরে ফেবুপেমন। পাক্কা আড়াই মিনিটের ব্যাপার। মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটি বের হয়নি ব্লজ্ঞপ্রাণের; অল্প সময়ের মধ্যেই ঠোঁটের বাঁ দিক ঘেঁষে একটা রক্তের ধারা নেমে আসে।

অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে ব্লজ্ঞপ্রাণের নিথর দেহটা ফুটপাথে শুইয়ে রেখে পাশের বাস স্টপের বেঞ্চিতে একটু এলিয়ে বসে ফেবুপেমন। বড় ঝক্কির দিন গেছে। ব্লজ্ঞপ্রাণের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাইটা আগেই বের করে রেখেছিল সে। সিগারেট ধরিয়ে চটপট কয়েকটা ধোঁয়ার রিং ভাসিয়ে দিল ফেবুপেমন। আহ! তৃপ্তি। গুনগুন করে " ছু কর মেরে মন কো কিয়া তুনে কেয়া ইশারা"র সুর ভাজতে শুরু করলে সে।

**
ট্যুইটঙ্কার মুখার্জির ভারী মিষ্টি লাগছিল জানালার ধারে বসে থাকতে। রাত দেড়টার সময় শহরটা এত শান্ত হয়ে যায়, যে তাকে ঘুমন্ত কুকুরছানার মত আদর করতে মন চায় ট্যুইটঙ্কারের।

ট্যুইটঙ্কারের আট তলার জানালার নিচেই বড় রাস্তা। রাস্তার ওপারে বাস স্টপ। বাস স্টপের পাশে বেঞ্চি। স্ট্রীট ল্যাম্পটা বিগড়েছে আজ, তাই আবছায়াতে বেঞ্চিটাকে কালো মনে হচ্ছিল; যদিও ট্যুইটঙ্কার জানে যে বেঞ্চির রঙ আসলে সবুজ। বেঞ্চিতে যে একটা আবছা অবয়ব বসে; সে প্রায় অন্ধকারে মিশে থাকলেও ট্যুইটঙ্কার জানে যে তার নাম ফেবুপেমন। ট্যুইটঙ্কার আশা করেছিল যে ফেবুপেমন আজ এসে এই বেঞ্চিতে বসবে। যাক। স্নাইপারের নলটা জানালায় গুঁজে স্নাইপার-ফোকাসে চোখ রাখলে ট্যুইটঙ্কার। ফোকাসটা অ্যাডজাস্ট করে ফেবুপেমনের মাথাটা নিশানায় মেপে নীল সে। ট্রিগারে আঙুল রেখে মিহি সুরে গান ধরলে ট্যুইটঙ্কার; "...বদলা ইয়ে মউসম, লাগে পেয়ারা জগ সারা..."।


**
ট্যুইটঙ্কারের ভূমিকায় - 
ট্যুইটার পেজ https://twitter.com/mtanmay


ফেবুপেমনের ভূমিকায় - 
ফেসবুক পেজ https://www.facebook.com/bongpen.net


ব্লজ্ঞপ্রাণের ভূমিকায় - 
ব্লগ www.bongpen.net


বইবপনের ভূমিকায় -
অচেনা পুরনো বই 
http://www.amazon.in/Bong-Pen-Tanmay-Mukherjee/dp/1621543471/ref=la_B00J4T7038_1_1?s=books&ie=UTF8&qid=1437418287&sr=1-1

Sunday, July 19, 2015

বোমা ও বেহেস্ত



আদেকুম্বির মনে হচ্ছিল আহ্লাদে বুঝি সে পাগল হয়ে যাবে। ভোরের আকাশের মত মেঝে, ঘাস সবুজ ছাত। কতরকমের কত রঙের প্রজাপতি যে উড়ে বেড়াচ্ছে চারিদিকে তার ইয়ত্তা নেই। হাওয়ায় গরম ভাত আর ভ্যানিলা আইসক্রিম মেশানো মন পাগল করা গন্ধ। আদেকুম্বি আহ্লাদে লাফিয়ে নিল। দশ বছরের জীবনে এমন জায়গা সে কোনোদিন দেখেনি।

ঘরের মধ্যে বয়ে যাচ্ছে নদী; মজার ব্যাপার হল কুলুকুলু শব্দে না - নদী চলেছে টুংটাং শব্দে। সবুজ রঙের কাঠবেরালি, হলুদ ময়ূর, মিষ্টি পাউরুটির গাছ; কত আজব সুন্দর জিনিষ যে তার নজরে পড়ছে একের পর এক। আদেকুম্বি দেখে আর হাততালি দিয়ে ওঠে। আদেকুম্বি যেদিকেই ছুটতে যায় সেদিকেই রয়েছে মজার কিছু। জ্যান্ত সোনার উট তার চোখে বসানো হীরে, গোলাপি লোমের ভল্লুক- কত কী।

ছুটতে ছুটতে আদেকুম্বি হঠাৎ একটা শ্যাওলা মাখানো ঘরে ঢুকে পড়লে। এই ঘরটা বিচ্ছিরি। মেঝেয় শ্যাওলা, ছাতে শ্যাওলা, হাওয়ায় শ্যাওলা উড়ছে- ভ্যাপসা গন্ধ। আদেকুম্বি ছুট্টে সে ঘর থেকে পালাতে যাবে এমন সময় তার কানে ভেসে এলো হাউহাউ কান্নার শব্দ - একজন, দু'জন নয়- বহু লোকে একসাথে কাঁদছে। কান্নার শব্দ ধাওয়া করে আদেকুম্বির দৃষ্টি ঘরের কোণের দিকে গেল আর সে অবাক হয়ে দেখলে একদল মানুষ সেখানে কান ধরে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে। মানুষগুলো প্রত্যেকে আদেকুম্বির দিকে তাকিয়ে হাপুস নয়নে কেঁদে যাচ্ছে।

বিব্রত হয়ে আদেকুম্বি জিজ্ঞেস করলে; "তোমরা কে গো?"।
প্রত্যেকে চিৎকার করে নিজের নাম বলে গেলে। শয়ে শয়ে নাম; আদেকুম্বি এত্তটুকু মেয়ে, সে কি পারে সব নাম মনে রাখতে? কয়েকটা নাম শুধু মনে রয়ে গেল; দ্য ভিঞ্চি, রবীন্দ্রনাথ, গালিব, চ্যাপলিন, ম্যান্ডেলা; আরও খটমট কত নাম।

-"তোমরা এমন ভাবে কাঁদছ কেন?", চিৎকার করে জানতে চাইলে আদেকুম্বি।



-"তোমার জন্য", সক্কলে কোরাসে জবাব দিলে।
-"এ মা, আমার জন্য কাঁদছ কেন? আর এমন ভাবে কান ধরে হাঁটু গেড়েই বা বসে কেন তোমরা?"
-"আমার নিজেদের শাস্তি দিয়েছি মা। অবশ্য কোন শাস্তিই যথেষ্ট নয়। তবুও দিলাম। তোমার এই কষ্টের জন্য তো মামনি আমরাই দায়ী", এবারও কোরাসে উত্তর।
-"আমার কষ্ট কিসের? আমি তো বেহেস্তে এসেছি গো?", আদেকুম্বি এ কথা বলতেই কান্নার রোল আরও ঘনীভূত হল।
-"এ বেহেস্ত নয় বেটি। এ তোর মনের ভুল। অবশ্য অন্যায় আমাদেরই। আমরাই তোর জন্য সঠিক পৃথিবী রেখে যেতে পারিনি মা আদেকুম্বি। তাই তো দশ বছর বয়েসে তোকে সুইসাইড বম্ব হয়ে মসজিদে ঢুকতে হয় মানুষ খুন করতে। এ ভুল তোর নয় মা। আমরাই তোর অপরাধী। আমরাই পৃথিবী থেকে বিষ শুষে নিয়ে আসতে পারিনি। আমাদের কবিতা, গান, আবিষ্কার, সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান সমস্ত মিথ্যে মা। যে মানব সমাজে তোর দাম নেই, সে মানব ইতিহাসের দাম নেই মা। সেই সমাজ, সেই ইতিহাসের মলিকিউল যে আমরাই। আমাদের ক্ষমা কর"।
-" বেহেস্ত নয় কেন বলছ? ওই যে দেখলাম টুংটাং সুর তোলা নদী, সবুজ কাঠবেরালি, পাউরুটির গাছ; আরও কত কী! ঠিক যেমনটা বলেছিল সেই কাকুটা যে আমার বুকে পেটে বোমা বেঁধে দিয়েছিল। এটা বেহেস্তই তো"।
-"ওসব তুই যা দেখেছিস মা সেগুলো তোর মাথায় গুঁজে দেওয়া ভাঁওতা। ওটা বেহেস্ত নয়। বাস্তব নয়।এই শ্যাওলা ঘরের মধ্যেই তোকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে মা। তোর মুক্তি নেই। তোর দুঃখের ভাগ নিতে আমরা এ ঘরে এসেছি", ঠাণ্ডা কান্নায় ফ্যাসফ্যাসে গলায় কোরাস বললে।
শিউরে উঠে আদেকুম্বি দেখলে সত্যিই এই শ্যাওলা মাখানো বদ্ধ ঘরের দরজাটা আর দেখা যাচ্ছে না।

-"তোমরা খারাপ লোক, তোমরা আমায় বেহেস্তে ফেরত যেতে দাও", আদিকুম্বি এবার কেঁদে উঠলে।
কান্নার কোরাস আরও জোরালো হল।
দাড়িওলা লোকটা এবার উঠে এসে আদেকুম্বিকে জড়িয়ে ধরলে।

-"তুমি কে? আমায় বেহেস্তে যেতে দাও...", আদেকুম্বির মনে হল সে অজ্ঞান হয়ে আসছে।

-"আমার নাম রবীন্দ্রনাথ রে মা", লোকটা আদিকুম্বির পেট থেকে বেরিয়ে আসা নাড়িভুঁড়ি আদিকুম্বির পেটে ঢোকাবার চেষ্টা করতে করতে বললে, "সমস্ত মিথ্যে আদিকুম্বি। তোর বেহেস্ত মিথ্যে। যারা মানুষ খুন করতে দশ বছরের শিশুদের ব্যবহার করে তারা মিথ্যে। এমনকি আমরাও মিথ্যে- আমাদের সৃষ্টি সমস্ত মিথ্যে। শিশুরা যেখানে বলি যায় মা, সে ইতিহাস তো পুরোটাই মিথ্যে। আমরা, এখানের এই বুড়োগুলোও সেই ইতিহাসেরই অংশ রে মা। আমাদের কাউকে ক্ষমা করিস না আদেকুম্বি। ক্ষমা করিস না। ঘুমিয়ে পড়ার আগে আমাদের অভিশাপ দে মা। অভিশাপ দে আমাদের সভ্যতা কে, ইতিহাস কে। আমাকে। কাউকে ছাড়িস না রে মা। কাউকে ছাড়িস না। আমরা সবাই মিলে সত্তর হাজার বছর ধরে তোকে খুন করার ছক কষেছি। ক্ষমা করিস না আমাদের। ক্ষমা করিস না"।

(খবর/ স্ক্রিনশট সূত্র - বিবিসি)