Friday, January 16, 2026

মনমোহিনীর জানালা


মনমোহিনীর জানালার সঙ্গে সম্পর্কটা বড় মজবুত। এমনিতে হাবেভাবে সে বড়ই চঞ্চল, দুদ্দাড় করে গোটা বাড়ি মাথায় তুলছে। এই খামোখা উৎসাহে লাফাচ্ছে, তো এই অকারণ আনন্দে গড়াগড়ি যাচ্ছে।

কিন্তু সে'টা তার বাইরের পরত। নিপাট শান্ত ভিতরটা বেরিয়ে আসে সে যখন জানালার পাশে এসে বসে। তখন সে নরম। মধুবাবু কাছে এসে বসলে সে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখবে, ওই একটা "এসেছ? এসো" ভাব। তারপর ফের জানালার বাইরে চোখ। গাছের পাতার ঝিরঝিরে মুভমেন্ট যে চোখের জন্য এত মোলায়েম সে'টা মধুবাবুকে শিখিয়েছে মনমোহিনী। দেওয়াল বেয়ে পিঁপড়েদের হেঁটে যাওয়াও যে এত 'সুদিং', সে'টা মধুবাবু এদ্দিনে বুঝতে পেরেছেন। নীচের দিকে তাকালে দেখা যায় উঠোনে ছেলেমেয়েদের ছুটোছুটি, অদূরে রাস্তায় মানুষজনের হেঁটে যাওয়া। দু'মিনিট দেখলে মনে হয় সমস্তটাই এলোমেলো, র্যান্ডম। মিনিট দশেক সে'দিকে তাকিয়ে থাকলে বিরক্তি আসে। কিন্তু একটানা মিনিট কুড়ি তাকিয়ে থাকার পর মনের মধ্যে প্যাটার্নটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে; অতি র্যান্ডম দুনিয়ায় প্যাটার্ন চিনতে পারার মত আরামদায়ক ব্যাপার খুব কমই আছে। সে আরাম মধুবাবু চিনেছেন জানালাপ্রেমি মনমোহিনীর থেকে।

বাড়ির এই জানালাটার একটা নাম রেখেছেন মধুবাবু; "নেটফ্লিক্স"।

স্বপ্নরীল

স্বপ্নে দেখলাম আমাদের স্বপ্ন ডাইরেক্টলি টেনে নিয়ে রীল হিসেবে প্রকাশ করছে ফেসবুক। আর হয়েছে কী; আমার একটা মামলেট বানানোর স্বপ্ন রীল ট্রাম্পের সমস্ত রীলের চেয়ে বেশি লাইক পেয়েছে। তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে, ট্রাম্প সোফাসমেত আমায় ওয়াশিংটনে তুলে নিয়ে গেছে।

"কী ব্যাপার ভাইটি, এমন রাষ্ট্রবিরোধী স্বপ্ন দেখার তুমি সাহস পেলে কী করে"? স্পষ্ট বাংলা। যা শুনে স্বপ্নের আমি তো থ, "চুপ করে থাকলে পার পাবে না। চটপট জবাব দাও"।

"আমি তো আমেরিকার সিটিজেন নই স্যার। কাজেই আমার স্বপ্ন আপনার রাষ্ট্রবিরোধী হতে পারে না"।

"ওই কে কোথায় আছিস এ ব্যাটার দেশকে আমাদের বাহাত্তর নম্বর রাজ্য হিসেবে জুড়ে দে। দিয়েছিস? দিয়েছিস তো? ভেরি গুড। হ্যাঁ, কী বলছিলে"?

"বলছিলাম মামলেট রাষ্ট্রবিরোধী কেন"?

"রবীন্দ্রনাথ কি মামলেট খেতেন"? স্পষ্ট উৎপল দত্তের কণ্ঠস্বর নকল করে বললেন, আমি রবি ঘোষের মত বিব্রত হলাম।

"রবীন্দ্রনাথকে তো আপনি গত পরশু ব্যান করেছিলেন আপনার থেকে একটা নোবেল বেশি পাওয়ার অপরাধে। অতএব তাঁর মামলেট খাওয়া না খাওয়ায় কী এসে যায় বলুন"।

"এই কে কোথায় আছিস। একে মিউট কর"। মার্কিন টেকনোলজির বহর দেখে আমি তো হতবাক, সত্যিই কথা বন্ধ হয়ে গেল আড়ালে কেউ কোনো সুইচ টেপায়।

"হ্যাঁ, যা বলছিলাম", ট্রাম্প বলা শুরু করলেন, "এই যে তুমি আমার হাতে-পায়ে ধরে এতক্ষণ কান্নাকাটি করলে তাতে আমার মন গলেছে"।

আমি প্রতিবাদে মাথা নাড়তে গেলাম। টের পেলাম মাথা-ঘাড়ও মিউট করে দিয়েছে। কোথায় লাগে চীনের টেকনোলজি।

"আর এই যে তুমি তোমার স্বপ্নগুলো আমায় সতেরোটাকায় বেচে দিতে চেয়ে অনুরোধ উপরোধ করছ, তা'তে আমি আর না বলতে পারছি না"।

আমি হাত পা নেড়ে প্রতিবাদ করতে গেলাম। টের পেলাম গোটা শরীর অবশ।

"জানো", ট্রাম্প বেশ ইয়ারদোস্তির সুরে বললেন, "গতকাল আমি বাংলায় একটা গান লিখে পোস্ট করলাম। জীবনে কী পাব না, ভুলেছি সে ভাবনা। আড়াই কোটি লাইক এলো আড়াই সেকেন্ডে। বিউটিফুল না? যাক গে , শোনো। আমায় না বলে তুমি আর স্বপ্ন দেখো না, কেমন"?

বাহাত্তর বার না বলার চেষ্টা করলাম অথচ গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। কিন্তু যেই বলতে চাইলাম "তাই হবে স্যার", আমার গলা বেয়ে বাহান্নটা অমিতাভ বচ্চনের কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এলো।

মনোহরবাবুর বিকেল



বেশিরভাগ বিকেলে ওই কোণের চেয়ারটাতে একা এসে বসবেন মনোহরবাবু। এক কাপ চা নিয়ে মন দেবেন খবরের কাগজে। মনু ছাড়া অন্য কোনো ওয়েটার তাঁর অর্ডার নেবে না। অবশ্য অর্ডার বলতে দু'কাপ চায়ের মাঝে একটা মাখনরুটি। মনোহরবাবুর ভাগ্য ভালো এ রেস্টুরেন্ট বয়স ও জীর্ণতার দিক থেকে প্রায় তাঁরই মত; অতএব এ'খানে তেমন ভিড় হয় না। আর কোণাটা যেহেতু মাত্রাতিরিক্ত ঘিঞ্জি তাই সে টেবিল খালিই থাকে। কালেভদ্রে সে টেবিল খালি না থাকলে মনোহরবাবু পাশের পার্কের বেঞ্চিতে বসে দিনের বাসি কাগজটা পড়ে শেষ করেন।

এখানে চা যে খুব ভালো বানায় তা নয়। কিন্তু অভ্যাসগুলো ত্যাগ করতে মন চায় না। খবরের কাগজেও আজকাল আর খবর কই, শুধুই বিজ্ঞাপন আর রাবিশ। কিন্তু ওই, অভ্যাস ছেড়ে কোথায়ই বা যাবেন। গান শুনতে ভালো লাগে না, টিভি তো দু'চোখের বিষ। অহেতুক অগভীর আড্ডা ব্যাপারটাকে কিছুতেই নিজের অভ্যাসের গণ্ডিতে টেনে আনতে পারেননি মনোহর। অতএব একপ্রকার বন্ধুহীন জীবন, অবশ্য এ'টা তাঁর কাছে স্বস্তির বলে মনে হয়।
মনোহরবাবু অভ্যাসপ্রিয়। আর তাঁর প্রিয়তম অভ্যাস হলো রাণুর কথা ভাবা। রাণুর না থাকাটাও অবশ্য তাঁর অভ্যাসের লিস্টে ঢুকে গিয়েছে। কী আশ্চর্য, আচমকা রাণু ফিরলে কি অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটবে? দ্বিতীয় চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার সময় কাগজটা মুড়িয়ে সরিয়ে রাখেন। তখন এইসব হিজবিজ ভাবনা মনে আসে। মনু রোজ এসে "সত্তর টাকা" বলা মাত্র ভাবনার সুতো কেটে যাবে। সে সুতো কেটে যাওয়াটাও অভ্যাসের ফর্দে ঢুকে গেছে। এ টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ারে রাণু বসেছে কয়েকবার, হলুদ আলোয় তাঁকে মনকেমনভাবে সুন্দর লাগতো। "মনকেমনভাবে" কথাটা সম্ভবত বিটকেল বাঙলা, রাণুর অভ্যাস ছিলো এ'টা বলা। রাণু থাকতে কতবার শুধরে দিয়েছেন। রাণু নেই, তাই তাঁর ভুলচুলগুলোকে বড় আপন বোধ হয়, মনকেমনভাবে আপন। হলুদ আলোয় রাণুর না থাকাটায় এই রেস্টুরেন্টের বিকেলগুলো ন্যালাক্যাবলা হয়ে পড়েছে। হঠাৎ যে আজ কী হলো, মনুর "সত্তর টাকা"র উত্তরে পকেট হাত না দিয়ে মনোহর বললেন, "আর এক কাপ চা দিও মনু"।

সাহাবাবুর রেসিগনেশন

সহকর্মী হিসেবে সাহাবাবুর তুলনা হয় না৷ কর্মঠ, সৎ, এবং হাসিখুশি। কাজে ফাঁকি একদম বরদাস্ত করতে পারেন না, অথচ কী ভাবে যেন ইঁদুরদৌড় থেকে গা বাঁচিয়ে দিব্যি কর্মজীবনটা কাটিয়ে দিলেন৷ গপ্প-আড্ডায় মাঝেমধ্যেই বলতেন, "কম্প্রোমাইজ করবো না কোনোদিন বুঝলে। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব করতে রাজি কিন্তু নিজের হিসেবে, নিজের মত করে কাজ করব। জোরজুলুম হুজ্জুতি কিছুতেই মেনে নেবো না। আর যে'দিন দেখব নিজের মত করে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না, সে'দিন? চিঠি রেডি রেখেছি"। এই বলে নিজের টেবিল ড্রয়ার খুলে একটা ভাঁজ করা কাগজ দেখিয়ে মুচকি হাসতেন ভদ্রলোক। সাহাবাবুর ড্রয়ারে মজুদ রেসিগনেশন লেটারকে আমরা বলতাম সাহাস্ত্র। সাহাবাবু মুচকি আসতেন।

আজ ভদ্রলোকের অফিসের শেষ দিন। সন্ধেয় ফেয়ারওয়েল ফাঙশন। দুপুরের দিকে আমি আবদার করলাম, "ও চিঠির তো আর কোনো কাজ নেই। আজ আমাদের দেখান না"। নির্দ্বিধায় সে কাগজ ড্রয়ার থেকে বের করে আমায় দিলেন সাহাবাবু। সে ভাঁজ খুলে দেখলাম সে'টা মাসকাবারির ফর্দ। চাল, ডাল, তেল, নুন, আটা, মশলা আর যা কিছু আটপৌরে। আমায় হতবাক দেখে ভদ্রলোক অমায়িক সুরে বললেন, "ব্রাদার। ওই লিস্ট আমি প্রতি মাসের পয়লায় বানাই। যখনই মনে হয়েছে নিজের মত করে কাজ করাটা কাজের চেয়েও জরুরি, তখনই একবার টুক করে এই কাগজ খুলে নজর দিয়েছি। ম্যাজিকের মত কাজ দিয়েছে"।

"তা'হলে এ'টা রেসিগনেশন লেটার নয়"?

"রেসিগনেশনই তো ভায়া। তবে নিজের কাছে। সাহাস্ত্র টু কন্ট্রোল দ্য গ্রেট সাহা।।রেসিগনেশন টু সেল্ফ"।

সন্দীপনের ভ্যান


সন্দীপন ভ্যান চালান। এ মাল ও মাল, এ'খান থেকে ও'খান। ভোর থেকে সন্ধে, হপ্তায় ছ'দিন। বাড়তি রেটে পয়সা দিলে রোববারও বেরিয়ে পড়তে আপত্তি নেই তাঁর। টাকা জিনিসটা দরকারি, দরকারকে উড়িয়ে দেওয়ার বিলাসিতা সন্দীপনের না-পসন্দ। তবে সে দরকারটার বাইরে গিয়ে সন্দীপন গান ভালোবাসেন, ভালোবাসেন গুনগুন করতে। কিশোরকুমারের একটা ছবি তাঁর বাড়ির দেওয়ালে টাঙানো, সে ভালোবাসাটা নেহাত দেখনাই নয়।

ফুডডেলিভারি অ্যাপের দুনিয়ায় মাঝে একবার ঢুঁ দিয়েছিলেন। দু'পয়সা বেশি কামিয়ে নেওয়ার একটা সুযোগ ছিল। এবং সেই প্রতিনিয়ত দশ মিনিটের যুদ্ধে কিশোরকুমার বিদেয় নিয়েছিলেন। বিদেয় নেওয়াটা বড় কথা নয়। সন্দীপন আজও ভেবে অবাক হয়ে পড়েন যে কিশোরকুমারের সেই চলে যাওয়াটাকে পাত্তা দেওয়ার সময়ও তখন তাঁর হাতে ছিলো না।

টের পেয়েছিলেন আচমকাই। দশ মিনিটের হুড়মুড়ে একদিন তাঁর স্কুটারের চাকা ফসকে সে একটা বিশ্রী ব্যাপার। ছ'মাসের কাজ না থাকার সময় কিশোর ফিরেছিলেন। পেটের খিদে সে ভদ্রলোকের গানগুলোকে তেমন ম্লান করতে পারেনি দেখে বেশ অবাক হয়েছিলেন সন্দীপন। বেশ একটা নিশ্চিন্দি ভাবও টের পেয়েছিলেন।

সন্দীপন ভ্যান নিয়ে দিব্যি আছেন। কিশোরে ফিরেছেন। আর আবিষ্কার করেছেন যে বোগানভেলিয়া তাঁর বড় প্রিয়।