Thursday, December 4, 2025

খাবারদাবারের গপ্পগুজব


খাবারদাবার নিয়ে আমাদের আদেখলাপনার পিছনে যেমন আহ্লাদ বা ক্ষেত্রবিশেষে দম্ভ রয়েছে; তেমনি আছে অবসাদ, মনখারাপ, স্নেহ, আকুতি কিংবা ভালোবাসার গল্প।

"এই দ্যাখো আমি গোটাদিনের যাবতীয় ভুলভ্রান্তি বকাঝকা টেনশন উড়িয়ে দিয়ে গেরস্তালির হিসেবনিকেশ হেলায় সামাল দিচ্ছি"; এমনটা বলে তো আর সিংহনাদ করা যায় না। বাধ্য হয়ে বলতে হয় "যা ফ্যান্টাস্টিক ফুলুরি ভেজেছি না...এক্কেবারে মার্ভেলাস"।

"কত কী করার ছিল হে, কিস্যুই হলো না", সে কথা বলে বারবার নাকিকান্না জুড়লে চলবে কেন? বলতে হবে "আরে কড়াপাকের সন্দেশ দুনিয়ায় থাকতে আমি কারুর তোয়াক্কা কেন করবো"! সবাই তো আর কবি নয় প্রেমভালোবাসার অঙ্ক দেখলেই পদ্যের ক্যালকুলেটর খুলে লিলি বোস লিখে সবাইকে চমকে দেবে। তাকে চাপা দু:সাহস নিয়ে বলতে হবে, "ভুজঙ্গদার সেঁকা ভুট্টায় যে কী ম্যাজিক আছে, না খেলে অ্যাপ্রিশিয়েট করা যাবে না। আর তার ওপর একটা লঙ্কাগুঁড়ো মেশানো লবন যা ছড়িয়ে দেয় মাপা হাতে। সে গুরুদেব ব্যাপার বুঝলে..."।

অথচ।
ফুলুরি বিজ্ঞান বুঝে কি কেউ দুনিয়া উদ্ধার করে ফেলেছে?
কড়াপাকের সন্দেশ নিয়ে লিখে কে কবে কেল্লাফতে করেছে?
ভুজঙ্গদা কী এমন হরিদাস পাল আর কে কবে ভুট্টা দিয়ে রাজ্যজয় করেছে?

বলাই বাহুল্য যে সে সমস্ত আস্ফালনই দ্যাখনাই। কিন্তু সাবধানে ঢেকে রাখা "আহা উঁহু ওহো"গুলো, যে'গুলো স্রেফ ভাষা ও মেধার অভাবে বুকের মধ্যে দলাপাকানো অবস্থায় নষ্ট হচ্ছিল, তারাই সেজেগুজে বেরিয়ে আসে খাবারের আলোচনা হয়ে। যতবার মানুষ খাবার নিয়ে হ্যাহ্যা করে মোটাদাগের গপ্প ফাঁদে, ততবার সে প্রমেথিউসকে অগোচরেই "থ্যাঙ্কিউ স্যার" বলে। কাজেই খাবার বিষয়ক কোনো হইহইই ব্যর্থ নয়।

নোট:
১। আজ যথারীতি বম্বের একঘেয়ে বৃষ্টিতে জেরবার ও মুগ্ধ হয়েছি।
২। ছিল রাস্তাঘেঁষা দোকানের কয়লার গনগনে আঁচ এবং ঝলসানো মুর্গি।
৩। রুমালিও যে ছিল সে'টা বলার দরকার নেই।

ভজন ও রাজকন্যা


কাঠমিস্ত্রি হিসেবে ভজনের সুনাম রাজ্যের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল একসময়। বিশেষত আরামকেদারা আর পালঙ্ক বানানোর ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ভজনের বয়স বড়জোর চব্বিশ অথচ তাঁর হাতের কাজের প্রশংসা রাজার কান পর্যন্ত পৌঁছে গেছিলো। ভজনের বানানো আরামকেদারা আর পালঙ্ক নাকি দেব-ভোগ্য ব্যাপার। কিন্তু রাজার কান তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়, তাঁর সঙ্গে জুড়ে থাকে রাজার গোলমেলে মেজাজ। অতএব সেই সুনামই ভজনের কাল হলো। একদিন রাজা ঠিক করলেন যে ভজনের বানানো পালঙ্ক রাজকন্যাকে উপহার দেবেন। কথা মত ভজনের কর্মশালায় রাজার 'অর্ডার' পৌঁছে গেলো, বড় টাকা দিয়ে বায়নাও করা হলো। রাজার অর্ডার বলে কথা, এমন এক পালঙ্ক যাতে রাজকুমারী ঘুমোবেন। কাঠ সংগ্রহের কাজে অন্যকে ভরসা না করে নিজেই কুড়ুল কাঁধে জঙ্গলে গেলো ভজন। চারটে গরুর গাড়িতে চাপিয়ে কাঠ এলো। ছেনি-হাতুড়ি ইত্যাদি সরঞ্জাম প্রস্তুত। শুভদিন দেখে কাজে হাত দিলেই হয়। এমন সময়; ভয়ানক ঝড়বৃষ্টিতে ভজনের কর্মশালার চালাঘর ভেঙেচুরে সে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড। ভিজে কাঠ দিয়ে কাজ শুরু করা চলে না। এ'দিকে মাসখানেক সে বৃষ্টি থামলো না, সূর্যের মুখও দেখা গেলো না। ও'দিকে রাজরাজড়াদের অত বুঝদার হলে চলে না, পালঙ্কের কাজ শুরু না হওয়ায় রাজামশাই রেগে ফায়্যার হয়ে রাজপুরোহিতকে বললেন, "ওই ব্যাটাচ্ছেলেকে আমি কোতল করতে পারতাম। কিন্তু তার চেয়েও বড় কোনও শাস্তি দিতে চাই। ওর গলা কেটে হাত পা ভেঙে আমি শান্তি পাবো না। রাজকন্যার জন্মদিনে ও খাট আমার উপহার দেওয়ার কথা। এখন কোনও স্বর্ণকারকে দিয়ে পাতি সোনারূপোর খাট বানিয়ে বেচারিকে আমার তুষ্ট করতে হবে। যাক গে, রাজপুরোহিত, তুমি ব্যাটাচ্ছেলে ভজনকে এমন জম্পেশ একটা অভিশাপ দাও যাতে ওর মৃত্যুর চেয়ে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হয়"। আর রাজপুরোহিতেরও বলিহারি। তাঁর কাজই হলো ওই, রাজার স্বপ্ন অ্যানালাইজ করে আগডুম বাগডুম বলা অথবা এলেবেলে মানুষকে অভিশাপ দিয়ে অতিষ্ঠ করে তোলা।

রাজপুরোহিতের অভিশাপে ভজন কাঠের কাজ গেল এক্কেবারে ভুলে। সে বেচারি একলা কাজ-পাগলা মানুষ। কাঠের কাজই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা। সেই কাঠের কাজের তপস্যা ভুলে যাওয়ায় সে কেমন খ্যাপাটে হয়ে গেলো। ঘর থেকে বেরোনো বন্ধ করে দিলো। মাঝেমধ্যে নিজের ছেনি-হাতুড়ি ধরে দেখতে গেলেই হাতে জ্বালা অনুভব করতো। জমিয়ে রাখা কাঠের দিকে চোখ পড়লেই শিউরে উঠতে হত। অসহ্য যন্ত্রণায় দিন কাটছিলো। ক্রমশ মানুষের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎটুকুও বন্ধ করে দিলো। সে ভুলে গেল কাঠের কাজের স্মৃতি, পালঙ্ক তৈরির কথা। রাজার অর্ডার আর রাজপুরোহিতের অভিশাপ, সবই মনের মধ্যে থেকে হারিয়ে গেলো। দু'দলা সেদ্ধ-ভাত কোনোদিন খেত, কোনোদিন খেত না। এমন সময় একদিন দুপুরবেলা, যখন সে তাঁর খাটের পাশের জানালায় থুতনি রেখে বসেছিল, তাঁর আলাপ হলো কনিয়ার সঙ্গে। কনিয়া একটি চড়ুইপাখি। সে নিজেই সেধে এসে নিজের পরিচয় দিয়ে আলাপ জমিয়েছিলো। ভজনের ধারণা ছিলো চড়ুইপাখিরা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে না, এবং তাঁদের কিচিরমিচিরের মানেও মানুষ ধরতে পারে না। কী অদ্ভুত, কনিয়ার সঙ্গে আলাপ জমাতে ভজনের কোনও অসুবিধেই হলো না। ভজনের মনে হলো তাঁরা মাথাটা গেছে হয়তো, নইলে কিনা সে পাখির সঙ্গে গল্প জুড়তে পারে? কিন্তু কনিয়া এমন সদালাপী, সে'সব বাজে ভাবনাকে বিশেষ পাত্তা দিলো না সে। অনেকদিন পর এই কনিয়ার সঙ্গে কথা বলতে পেরে যে বুকের মধ্যে সামান্য বল পেলো ভজন। এইভাবে মাসদুই কত গল্প চললো, কনিয়ার প্রশ্ন শেষ হতেই চায় না। পাশাপাশি ভজনের গল্পও শেষ হতে চায় না যেন। গল্পে গল্পে কী'ভাবে যেন ভজনের ঘায়ে মলম পড়া শুরু হলো। হঠাৎ একদিন টের পেলো যে আশেপাশে পড়ে থাকা কাঠের টুকরোর দিকে তাকিয়ে সে আর শিউরে উঠছে না। এ'ভাবেই হঠাৎ একদিন সে কনিয়াকে বলে উঠলো, "জানো কনিয়া, আমি এককালে এ রাজ্যের সেরা কাঠমিস্ত্রি ছিলাম। আর...আর...আর সে কাজ বোধহয় আমি একদম ভুলে যাইনি"। সে কথা শুনে কনিয়ার সে কী ডানা-ঝাপটানো আনন্দ।

দিন কয়েকের মাথায় ফের কাজে বসলে ভজন। রাজকন্যার পালঙ্কটা এ'বারে বানিয়ে না ফেললেই নয়। সন্ধে পর্যন্ত কাজে ব্যস্ত থাকে ভজন, গোটা ঘর জুড়ে টুকুর টুকুর ঠুকঠাক দুমদাম শব্দ; সে শব্দগুলোকে গানের মত এসে ঠেকে ভজনের কানে। আর সেই গানে নিজের কিচিরমিচির দিয়ে তাল মেলায় কনিয়া। তিন হপ্তার মাথায় একদিন; অপরূপ সে পালঙ্কে শেষ পালিশ চালিয়ে জানালার দিকে তাকাতে ভজন টের পেলে কনিয়া আর নেই, সন্ধ্যে হয়ে গেছে। আবার সে আসবে আলো ফুটলে। কিন্তু কী আশ্চর্য, পরের দিন সকাল হলো, সকাল পেরিয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যে। কনিয়া আর এলে না। ফিরে পাওয়া আনন্দ ফের ম্লান হয়ে গেল যেন, মুষড়ে পড়লে ভজন। দিনের হপ্তা গেল, কনিয়া কই?

হপ্তাখানেক পর, দুপুর নাগাদ। কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলে হতবাক ভজন। সামনে যে অপার্থিব সুন্দরি দাঁড়িয়ে, তাঁর রূপের বাহার আর পোশাক-আভরণের জেল্লা দেখলে বোঝাই যায় এ নিশ্চয়ই এ রাজ্যের রাজকন্যা।
শশব্যস্ত হয়ে নুইয়ে দাঁড়ালে ভজন।
"আমার পালঙ্ক তো তৈরি, তবু আমায় ডাকলে না কেন"?
"আপনি...আপনি কী করে জানলেন এ পালঙ্ক তৈরি"?
"আমি যে কনিয়া। তোমার কনিয়া। আমার বাবার বিশ্রী খামখেয়ালের বশে রাজপুরোহিতে তোমায় অভিশাপ দিলে। দেবতা সে অভিশাপ ঠেকাতে পারেনি কিন্তু ব্যাপারটা ভালো চোখেও দেখেনি। দেবতা বাবা ও রাজপুরোহিতকে শায়েস্তা করতে আমায় চড়ুইপাখি বানিয়ে দিলে। এও বললে যে ভজনকে কাজে ফেরাতে না পারলে আমার মুক্তি নেই"।
"ওহ..."।
"অভিশাপ মিথ্যে হওয়া বড় সহজ কথা নয়। আমি ততদিন তোমায় কাজের দিকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি যতদিন শুধু নিজের মুক্তি কথা ভেবেছি। পেরেছি...তখনই পেরেছি...যখন...।
"যখন"?
"যখন আমি তোমায় ভালোবেসেছি, ভজন। মন দিয়ে ভালোবেসেছি, তাই তোমায় ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। এ'বার এ পালঙ্ক আমায় দাও, আর আমার ভালোবাসাটুকু নাও"।
"রাজকুমারী, এ পালঙ্ক আপনার জন্যই। আপনার ভৃত্যদের পাঠিয়ে দেবেন, এ পালঙ্ক তাঁরা রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাবে"।
"কিন্তু আমি তো পালঙ্কের জন্য আসিনি ভজন..."।
"আপনি আসুন রাজকন্যা, আর আমায় আপনি ক্ষমা করবেন"।
"কিন্তু ভজন..."।
"আপনি রাজকন্যা, মহীয়সী। ইয়ে, সমস্যাটা হলো, আপনি যে আমার কনিয়া নন"।

রাজকুমারী বিদায় নিলে সদর দরজা বন্ধ করে নিশ্চিন্তে একটা আরামকেদারা ঘষামাজার কাজে মন দিলেন ভজন।
***
(ছবি: জেমিনাইতে বানানো)

সুবিমল সান্যালের বেড়াল

"এর নাম হলো শ্রীমান রুমাল", হাড়-জ্বালানো আহ্লাদি সুরে জানালেন সুবিমল। পোষা বেড়ালটা ভদ্রলোকের কোলে জাঁকিয়ে বসে, ঘাড়ে আঙুল-বোলানি মৌজ করে উপভোগ করার পাশাপাশি আমার দিকে মারাত্মক সন্দেহের চোখে তাকিয়ে। বেড়াল নিয়ে আদেখলামো আমার মোটে সহ্য হয় না, কিন্তু বড় কষ্ট করে সুবিমল সান্যালের ইন্টারভিউ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। লেখক হিসেবে ভদ্রলোকের আজকাল বেশ নামডাক। ওর সাম্প্রতিক নভেলটা বাংলার পাঠকমহলে বেশ সাড়াও ফেলেছে। কিন্তু বাজারে খবর হলো লেখার হাতটি সরেস হলেও ভদ্রলোক সামান্য ছিঁটগ্রস্ত। একা মানুষ অথচ নিজের বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার অভ্যাস আছে। এই খিটমিট করছেন তো পরক্ষণেই দিলদরিয়া। অমুক সম্পাদক বা তমুক সাংবাদিককে বাড়িতে ডেকে "একটু বসুন, আমি ভিতরের ঘরের জানালাগুলো বন্ধ করে আসি" বলে উঠে গিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে; লুঙ্গিফতুয়া গায়ে হাওড়া স্টেশন পৌঁছে পাঞ্জাব মেলে বসে পড়েছেন। এ'ছাড়াও নানাবিধ অদ্ভুতুড়ে গল্পগাছা ভদ্রলোককে নিয়ে বাজারে ছড়িয়ে আছে। অতএব এহেন মানুষের আদরের বিড়ালের প্রতি বিরক্তির ছায়াটা কিছুতেই মুখের ওপর পড়তে দেওয়া চলে না। আমি এ লাইনে নতুন, সুবিমল সান্যালের একটা ইন্টারভিউ আমায় বেশ ভালো একটা পুশ দেবে।

"জানেন তো, বেশিরভাগ গপ্পের প্লটগুলো এই রুমালই আমায় ধরিয়ে দেয়", দরাজ হাসলেন সুবিমল। পরিস্থিতি ঘোরালো, মিনিট দশেক গল্প হল অথচ বেড়ালের গপ্পের বাইরে আনা যায়নি ভদ্রলোককে। "প্লট রুমালই ধরিয়ে দেয়" প্রসঙ্গে সামান্য হোঁচট খেতে হলো।
"মানে, আপনি বলতে চাইছেন যে আপনার পোষা বেড়াল শ্রীমান রুমালের সঙ্গে গল্প করার সময় আপনার মাথায় বিভিন্ন গল্পের প্লট আসে"?
" না না। রুমাল নিজেই আমায় সে সব গল্প সাজিয়ে গুছিয়ে বলে। এইটুকু মাথায় যে কী করে এ'সব জটিল মনস্তাত্ত্বিক নভেলের প্লট দাঁড় করায়। ভেরি ইম্প্রেসিভ। রুমাল না থাকলে সুবিমল সান্যালকে আপনারা চিনতেনই না"।
"আপনি বোধ হয় এই সাক্ষাৎকারটাকে সিরিয়াসলি নিতে পারছেন না"।
"সে কী। ষোলোআনা সিরিয়াস"।
"রুমাল আপনার সঙ্গে কথা বলে"?
স্মিত হাসলেন সুবিমল।

হাসিটায় গোলমেলে অথচ মোলায়েম একটা ব্যাপার ছিল। মাথায় সামান্য ঝিম লাগলো, আমি যেন আর সুবিমলের সামনের সোফায় বসে নেই।প্রবল অস্বস্তি নিয়ে টের পেলাম বেশ নরম আদরে মোড়া পরিস্থিতিতে শুয়ে আছি। কেউ ঘাড়ে বড় সুমিষ্টভাবে মালিশ করে দিচ্ছে, দু' আঙুলের ডগায় সে কী ম্যাজিক। চোখ বুজে আসছে যেন। বুকের ভিতরটা সামান্য ছ্যাঁত করে উঠলো, আমি সুবিমলের কোলে শুয়ে। আমার উল্টো দিকের সোফায় আবছায়ার মধ্যে যে মানুষটা বসে আছে সে আমার চেনা, অবিকল আমার চেহারা যে। কিন্তু সেই আমির মুখ দিয়ে কথার বদলে শুধুই ম্যাঁও ও মিউ বেরোচ্ছে।

স্পষ্ট দেখলাম সুবিমল সান্যাল মাথা নামিয়ে আমার নতুন চোখ জোড়ার দিকে চেয়ে বললেন, "সাংবাদিক মশাই, এ'বার ক'দিন আপনার বাস আমার পোষ্য হয়ে। আপনার লেখার হাত যে ভালো, আমি সে খবর নিয়েছি। এ'বার দু'তিনটে জমকালো প্লট গুছিয়ে আমায় বলতে পারলে তবেই আপনার ওই ভদ্রলোকী শরীরে ফিরে যাওয়া। কেমন? টের পাবেন বেড়ালের জিভ ঠেলে কী সুন্দর বাংলা কথা বের করে আনা সম্ভব। আগে যান, ওই দেখুন ঘুরের কোণে এক বাটি দুধ রাখা আছে, খেয়ে আসুন। তারপর প্লট নিয়ে গল্প হবে"।

এই বলে আমায় মেঝেতে নামিয়ে দিলেন সুবিমল সান্যাল।

রিউতিসিউ

"তখনও আলোর ও সময়ের জন্ম হয়নি। সময়ের যেহেতু জন্ম হয়নি সেহেতু 'তখনও' কথাটা বলা ঠিক হলো কিনা জানি না। মুম্ফাসাইরসের মানুষরাও এ সম্বন্ধে নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারবে না, যদিও এ রূপকথা তাদেরই। তখন ছিলো বলতে শুধু হেকেথা; আদিম নিষ্প্রাণ পৃথিবী। হেকেথার বুকের মধ্যিখানে রয়েছে সিতেগস নামের নিস্তরঙ্গ সমুদ্র। মুম্ফাসাইরসি ভাষায় সিতেগস মানে অশ্রু। বিষণ্ণতার ভার বইতে না পেরে সিতেগসের বুক চিরে অবশেষে জন্ম নেয় স্রিয় আর তিরা; আলো আর সময়। হেকেথার চিরবিষন্ন অবিচলতা ছিন্ন হলো, নেমে এলো অস্থিরতা বা স্নেম।

স্রিয় আর তিরার সন্তান ওয়েব্বেজা, আকাশ; মুম্ফাসাইরসিদের প্রথম ঈশ্বর। ওয়েব্বেজা সৃষ্টির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে আর সেই গোলমাল বাঁচিয় হইহল্লা এড়িয়ে সিতেগসকে বুকের আড়ালে রেখে দিলে হেকেথা। আদিম আদরের এই অনুভূতি-সমুদ্রকে তো আর ময়লা হতে দেওয়া যায় না। সিতেগসকে মনে রাখলে শুধু হেকেথা, স্রিয়, তিরা ও ওয়েব্বেজা।

প্রতি দশ হাজার বছরে একবার স্রিয় ও তিরা সিতেগসের সৈকতে এসে বসে। এ সাগর আজও নিস্তরঙ্গ, বিষন্নতায় অবিচল। ওয়েব্বেজা তাদের সকলকে জড়িয়ে রাখে। স্রিয়-তিরার এই দশহাজারি 'ডেট'য়ের জন্য সারা বছর সুরাসংগ্রহে ব্যস্ত থাকে ওয়েব্বেজা। সে সুরার নাম ভিসিতেগসো; মানুষের কান্না। স্রেফ সেই ভিসিতেগসো সংগ্রহের জন্য যত আয়োজন, যত উৎসব। হ্রুই অর্থাত মেঘ, রিউতিসিউ অর্থাৎ বৃষ্টি, ঘ্রঙসং অর্থাৎ বজ্রপাত। আর অতি অবশ্যই রয়েছে ত্যিউ, অর্থাৎ মানুষ"।

এদ্দূর একটানা বলে ডাক্তার ঢকঢক করে অর্ধেক গেলাস জল সাবাড় করলেন। মনুবাবু ড্যাবাড্যাবা চোখে গল্প শুনছিলেন, ডাক্তার এমন হাত পা নেড়ে গালগল্প ফাঁদেন যে চোখের ভিজে ভাব উবে যেতে বাধ্য। জলের গেলাস নামিয়ে রেখে পকেট থেকে ধবধবে সাদা ইস্তিরি করা রুমাল বের করে ঠোঁট এবং গোঁফ মুছলেন ডাক্তার।

"কাজেই যা বলছিলাম মনু, বৃষ্টিতে একা থাকলেই যে কান্না-কান্না বাইটা তুমি অনুভব করো, সে'টা এলেবেলে নয়"।

"আমার চোখের জল ঈশ্বরের ওয়াইন"?

"মাইন্ড ইউ, ধান্দাবাজি চোখের জল হলে চলবে না। অন্তর থেকে উঠে আসা বেদনা চাই। পিওর কোয়ালিটি গ্রীফ ছাড়া ও জিনিস তৈরি হয় না। আরে বাবা আলো ও সময়ের ওয়াইন, তা'তে কি আর ভেজাল চলে"!

"ডাক্তার, তোমার গপ্প শুনে বড্ড স্নেম অনুভব করছি"।

"কী অনুভব করছো"?

"ওই যে। স্নেম। মুম্ফাসাইরসি ভাষায় যে'টা হলো গিয়ে অস্থিরতা"।

"রাইট রাইট। তোমার মত হাইকোয়ালিটি শ্রোতা আছে তাই এ'সব অমূল্য গপ্প মাঝেমধ্যে ঝুলি থেকে বের করি"।

"এ দু:খ ফেলনা নয়, তাই না ডাক্তার"?

"সিতেগস থেকে আমরা সবাই বেরিয়েছি যে মনু। নিখাদ দু:খ যে'টুকু যা আছে বুকের মধ্যে, সে'টুকুই আসল। বাকি সমস্তই ওয়েব্বেজার ছেলেমানুষি খেলনাবাটি আর কী"।

প্রাণখোলা একট হাসি ভেসে উঠলো মনুবাবুর মুখে। কিন্তু চোখ ফের ভিজে। বাইরে বৃষ্টি ফের শুরু হয়েছে। মনু্বাবু অস্ফুটে বলে উঠলেন, "রিউতিসিউ"।

"তোমার চা পাতার কৌটোটা খালি নেই আশা করি" বলে ডাক্তার চেয়ার ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেলেন হেঁসেলের দিকে। বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন মনুবাবু।

জানালার বাইরে সন্ধের গুমড়ে ওঠা আকাশের দিকে তাকিয়ে মনু বিড়বিড় করে বললেন, "ডাক্তার শালা বড় ফেরেব্বাজ, বড় আপন"।

সমঝদার ও ফেরেব্বাজ


সাদামাটা সমস্যাগুলোকে পেল্লায় প্রমাণ করতে গিয়ে আমরা এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে জীবনের আদত জটিলতাগুলো নিয়ে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করা হয়না। অদরকারী ব্যাপারস্যাপারে গা ভাসিয়ে দিন কেটে যাচ্ছে আর এ'দিকে জীবনের দরকারি বিষয়গুলোকে ধামাচাপা দেওয়াটাকে আমরা প্রায় আর্টের পর্যায় নিয়ে গেছি। কিন্তু গা বাঁচিয়ে এ'ভাবে আর কদ্দিন চলবে?

অতএব আজ আমি বাদামসমস্যাটার কথা বলি। রোজ অফিস ফেরতা বি-কে-সি থেকে বেরিয়ে ওয়েস্টার্ন এক্সপ্রেসওয়েতে উঠি বান্দ্রার কাছে। সন্ধে মানেই বিশ্রী ট্র্যাফিক জ্যাম। তবে মাঝেরহাটের ব্রিজভাঙা বেহালায় স্টিয়ারিং ঠেলেছি বেশ কয়েক বছর, ও'সব জ্যামফ্যামকে আমি পাত্তা দিইনা। অডিওবুক, গান ইত্যাদির জমানায় রাস্তায় ভিড় তো না; লক্ষ্মী। তা, বান্দ্রা এলাকা ছাড়িয়ে অল্প এগোলে ভিড় আরও জমাট হয়। আর এক্সপ্রেসওয়ে সান্তাক্রুজের মুখে পড়তেই ঝাঁকে ঝাঁকে বাদামওলা এগিয়ে আসেন (বৃষ্টি তাদের দমিয়ে রাখতে পারে না, বম্বের স্পিরিট ইত্যাদি)। কাগজে মোড়ানো 'প্যাকেট', দশ টাকার ও কুড়িটাকার ইউনিটে। আমি নিয়ম করে দশের দু'প্যাকেট কিনি। ওই একটাই আ্মার নিয়মিত নন-ডিজিটাল খরচ। যা হোক, টুকটুক করে বাদাম খেতে খেতে এগোনো। প্রতিটা দানা হিসেব করে খাই, এককুচি বাদামও এ'দিন ও'দিক হওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটা মুচুরমুচ মন দিয়ে শুনি এবং অনুভব করি। দু'নম্বর প্যাকেট শেষ হওয়া মানে এয়ারপোর্ট অঞ্চল পেরিয়ে গেছি। একদম অঙ্কের হিসেব। আর সে অঙ্ককে অবহেলা করেই বিশ্রী পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হলো। ভারী অস্বস্তিকর।

গোলমালের সূত্রপাত বাদামদাদাদের দু'টো দশের বদলে একটা কুড়ির প্যাকেট গছাতে যাওয়ায়। কী মুস্কিল, রোজই সেই এক ঘ্যানঘ্যান। আমার দশেরদু'প্যাকেট নিতে ভালো লাগে। এক প্যাকেট শেষ করে বেশ জল-চুমুকের ইন্টারভ্যাল নিয়ে পরের প্যাকেট খোলা যায়। সবচেয়ে বড় কথা আমি নিশ্চিত ছিলাম দু'টো দশের প্যাকেটে বাদামের পরিমাণ নিশ্চয়ই একটা কুড়ির প্যাকেটের চেয়ে বেশি। তেমনটাই তো হওয়ার কথা। কিন্তু ওই, মানুষের মন ভারী বিষাক্ত; সন্দেহে ভরা। অতএব পরিমাণ ব্যাপারটা ঝালিয়ে না দেখলে চলছিল না। স্রেফ জ্ঞানার্জনের জন্য দু'টো দশ আর একটা কুড়ি প্যাকেট কিনলাম। দু'টো একই রকম কাচের গেলাসে ঢাললাম। এবং, অবাক হলাম। একটা কুড়ির প্যাকেটে বাদামের পরিমাণ দু'টো দশের কোয়ান্টিটির চেয়ে অন্তত ১০% বেশি। পৃথিবীটা দুলে উঠলো; আফটার অল আমি মানুষ।

গোলমালটা বয়েলিং পয়েন্টে পৌঁছে গেলে যখন আজ পঞ্চাশ টাকার নোট আর পুরনো খদ্দের দেখে বাদামদাদা পঞ্চাশে তিনটে কুড়ির ঠোঙা অফার করলে। বাজিয়ে দেখলাম, কিন্তু পঞ্চাশে ছ'টা দশ টাকার প্যাকেট দিতে কিছুতেই রাজী হলে না। ঘায়েল হতেই হলো। নিলাম আজ পঞ্চাশে তিনটে কুড়ির প্যাকেট। তিন দিনের বাদামের হিল্লে হয়ে গেলো, প্লাস সামান্য বাড়তি বাদাম। আজকালকার ডেঁপো ছেলেমেয়েরা বলবে "টোটাল উইন"। যুক্তি বলবে "বাহ, ভাই তন্ময়, এই তো চাই"। অঙ্ক বলবে "ব্রেভো বন্ধু। সাবাশ"। কারণ অজস্র ঠোঙা বাদাম-কিনিয়ের কাছে সবটুকুই তো ছকে বাঁধা, হিসেব এ'দিক ও'দিক হওয়ার উপায় নেই।

দিব্যি স্টিফেন ফ্রাইয়ের কণ্ঠে ইলিয়াডের গল্প শুনতে শুনতে স্টিয়ারিং হাতে আল্ট্রা ঢিমেতালে এগোচ্ছিলাম। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত দুটো দশের প্যাকেট শেষ হয়। আজ যখন এয়ারপোর্টের বোর্ড দেখলাম তখন বুকের ভিতরটা ছ্যাঁকা খেলো যেন। হা ঈশ্বর, আমার হাতে তখন অর্ধেক উড়ে যাওয়া তিন নম্বর কুড়ি টাকার বাদামের প্যাকেট। কোথায় যুক্তি, কোথায় অঙ্ক। ভুলে গেছিলাম যে বাদাম-কিনিয়ে মহশয় অতিশয় সমঝদার কিন্তু বাদাম-খাইয়ে বাবাজী মহাফেরেব্বাজ।

সাজানো হিসেব শুকিয়ে গেলো। কাল থেকে আবার নতুন ভাবে ব্যূহ-রচনা।