Sunday, June 1, 2025

ব্যান্ডস্ট্যান্ডের চিঠি



ব্যান্ডস্ট্যান্ডের সিঁড়িগুলো বেয়ে নেমে এসে একটা জুতসই পাথর বেছে নিয়ে ছড়িয়ে বসলেন অমিতাভ। ঢেউগুলো খানিকটা দূরেই ভেঙে যাচ্ছে, জলের ছিঁটে আসছে না বটে কিন্তু মোলায়েম শব্দ আর হাওয়া মিলেমিশে একটা ভালো ইয়ে তৈরি হচ্ছে। ইয়ে শব্দটা মাঝেমধ্যেই ব্যবহার করেন অমিতাভ; শব্দটা ভারি কাজের; "এফিশিয়েন্ট"।

ইয়ে প্রসঙ্গে অমিতাভর মনে পড়লো বুক পকেটে রাখা চিঠি। চিঠি, এই শব্দটাই আজকাল কত কম ব্যবহার হয়। বুক পকেটে হাত রাখলেন ভদ্রলোক, সুতির ও'পাশে কাগজ। নরম অথচ খসখসে, বেশ একটা ইয়ের ব্যাপার। ভালো লাগাটাকে পাত্তা দিয়ে ঠ্যাঙজোড়া সামান্য লম্বা করলেন তিনি। হাওয়া উড়তে থাকা চুলে আঙুল চালালেন। চেষ্টা করলেন তপন সিনহার নির্দেশনার ফিল্টারে নিজেকে নায়ক হিসেবে ভাবতে। ইয়েটা জমাট হলো।

অমিতাভ মনে মনে হিসেবে করার চেষ্টা করলেন, ঠিক এই মুহূর্তে ক'জন চিঠি পকেটে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে? এই মুহূর্তের পৃথিবীতে ঠিক সেই মানুষগুলো অমিতাভর আত্মীয়। নাহ, সমুদ্রের মধ্যেই একটা বিশ্রীভাবে ভালোলাগা ইয়ে আছে।

সাইকেল থেরাপি



ডেকাথেলন থেকে কেনা সাইকেলটার বয়স প্রায় এক বছর হতে চললো। দিব্যি চলছে। একটা ফ্রি সার্ভিসিং পাওনা ছিল, দিন দুই আগে করিয়ে আনলাম। তা'তে ব্যাপারটা আরও স্মুদ হয়েছে। আমাদের সাইকেলের ব্যবহার ঠিক ফিটনেস এন্থুসিয়াস্ট হিসেবে নয়। বাবা ও'টা চালিয়ে রোজ রীতিমতো বাজারঘাট ঘুরে আসে, পঁচাত্তর বছর বয়সে অবশ্য সে'টাকে জিম হিসেবে ধরে নেওয়া উচিৎ । ছুটির দিন সকালে বা অফিস থেকে ফিরে সন্ধের দিকে আমি মাঝেমাঝে সাইকেল নিয়ে বেরোই, স্রেফ হাওয়া খেতে। ঢিকিরঢিকির স্পীডে ধীরেসুস্থে প্যাডেল করি যাতে ঘামটাম ঝরে না, দু'চার কিলোমিটার দূরেই আরবসাগর, অতএব রাতের দিকে সমুদ্রের হাওয়া টেরো পাওয়া যায়। আমাদের বাড়ির পাশেই একটা তুলনামূলকভাবে নিরিবিলি রাস্তা রয়েছে, নিশ্চিন্তে সাইকেল চালানোর চার কিলোমিটার। সে'টার খান দুই পাক খাওয়া মানে মেজাজ ফুরফুরে।

হাঁটতে গেলে কানে ইয়ারফোনে গোঁজা থাকে।সাইকেলে সে'সব চলে না। সমস্ত ফোকাস রাস্তায়, শোঁশোঁ বেরিয়ে যাওয়া মোটোরসাইকেল গাড়িদের স্পীডে ভড়কে গেলেও চলবে না। পান দোকানে দাঁড়ানো যেতে পারে, কেনা যেতে পারে আইস্ক্রিম; কিন্তু সাইকেল ব্যাপারটা এতই মনোরম যে দাঁড়িয়ে পড়তে ইচ্ছে করে না। সাইকেলটা এমনিতে মাখন, কিন্তু সেই মাখন সাইকেলেও প্যাডেল আর চাকার ঘষটানি মেশানো একটা আরামদায়ক মোলায়েম শব্দ আছে, যে'টা পা বেয়ে উঠে আসে।

গাড়ি হোক, মোটোরসাইকেল স্কুটার হোক কী সাইকেল; যন্ত্রটাকে আপন করে চিনে নিতে পারায় যে কী গভীর আনন্দ। সে'টাকে মনের সুখে ব্যবহার করা এবং সে'টার যত্নআত্তি করা; এক্কেবারে সুপারফাইন কোয়ালিটির তৃপ্তি।

পিঠ চাপড়ানি

অনির্বাণ কম্পিউটারটা শাটডাউন করে অফিসের চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিলেন। এখন রাত সোয়া দু'টো। অবশেষে প্রজেক্ট রিপোর্ট সাবমিশন হলো। গোট অফিসে এ সময়ে মাত্র দু'জন, অনির্বাণ আর পিওন সুমিত। সুমিত নিশ্চয়ই এতক্ষণে প্যান্ট্রিতে এক রাউন্ড ঘুম সেরে নিয়েছে। গোটা দিন যা ধকল গেছে, সে বেচারাকে দোষ দেওয়া যায় না। এ'সময়ে এক কাপ কফি হলে মন্দ হতো না কিন্তু সুমিতকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে হলো না। নিজে প্যান্ট্রিতে ঢুকে এক কাপ ব্ল্যাক কফি বানিয়ে নেওয়াই যায় কিন্তু তা'তেও নির্ঘাৎ সুমিত ব্যাটার তন্দ্রায় ব্যাঘাত ঘটবে।

পাশে রাখা জলের বোতল, সে'খান থেকেই দু'ঢোক গলায় দিয়ে কফির তেষ্টাকে বাগে আনার চেষ্টা করলেন অনির্বাণ। রিপোর্টটা বেশ ভালোই তৈরি হয়েছে। তা'ছাড়া পর পর তিন রাত জেগে কাজ করার ব্যাপারট টীমে কারুর নজর এড়াবে না। দু'একটা পিঠ চাপড়ানি, "এবার একটু রেস্ট নাও" গোছের স্নেহ-মিশ্রিত কঙ্গ্রাচুলেটরি কথাবার্তা; এ'সব জুটবে। সুকুমারদা তো রিপোর্ট পড়ে অন্তত একবার ওঁর সেই উদার কণ্ঠে "ব্রাভো" বলবেনই। এ'সব ভেবে একটা বেশ তৃপ্তি অনুভব করছিলন অনির্বাণ।

সবাই ভাবে অনির্বাণ কেরিয়ার বলতে পাগল। সবাই ভাবে অনির্বাণ অফিসের একজন "গুড বয়"। ভবিষ্যতের বোর্ডরুমের একটা চেয়ার তাঁর মত ব্রাইট চ্যাপের জন্য নির্ঘাৎ রিজার্ভ করা আছে। কিন্তু অনির্বাণ নিজে মনে মনে জানেন যে কেরিয়ারের প্রতি তাঁর সবিশেষ আগ্রহ নেই। চেয়ারম্যান ডিরেক্টর হওয়ার কথা ভাবলেও তাঁর গায়ে জ্বর আসে। কিন্তু সহকর্মী অভীকের "কী করে এতো খাটতে পারো তুমি অনিদা" অথবা ওই সুকুমারদার "ব্রাভো"- এ'রকম হাজারখানা অদরকারী মৃদু-প্রশংসা আদায় করে নেওয়া ব্যাপারটা ভালো লাগে অনির্বাণের। বারবার মনে হয়, "এইত্তো, ওরা আমায় দেখছে। আমার চেষ্টাগুলো জলে যাচ্ছে না। একজন মানুষের খাটনি ওদের চোখে পড়ছে"। এই "চোখে পড়ছি" আশ্বাসটা একটা বিরাট মায়ার মত টেনে রাখে তাঁকে। সেই টানেই রোজ এই অফিস ছুটে আসার প্রতি তাঁর এত আগ্রহ।

সাতপাঁচ ভাবনার সুতো আচমকা ছিঁড়ে গেলো খটাস শব্দে। সুমিত কফির কাপ রেখেছে সামনে। "বাঁচালে ভাই সুমিত", অস্ফুটে অনির্বাণের আন্তরিক কৃতজ্ঞতাটা প্রকাশ পেলো।

"এমন খাটছেন স্যার, কফি-টফির দায়িত্বটা তো অন্তত আমায় নিতে হবে নাকি"।
"কাজ কিন্তু শেষ সুমিত, তুমি এবারে এসো। এত রাত্রে ফিরতে অসুবিধে হবে না তো"?
"স্কুটার আছে তো। ফাঁকা রাস্তায় বড়জোড় মিনিট কুড়ি। আপনিও বেরোবেন তো"?
"এই। এখুনি। তুমি এগোও"।

সুমিত চল গেলো। এ'বারে বাড়ি ফেরাই যায়। কিন্তু রোজকার মত আজও ছুটে ফেরার আগ্রহটা টের পেলেন না অনির্বাণ। সুকুমারদা, অভীক, সুমিত; এর অনির্বাণের কেউ নন। তবু, অসময়ের কফি আর ছেঁদো ব্রাভোর প্রতি অনির্বাণের বড় লোভ; ওটুকুতেই তাঁর নিজেকে দেখতে পারা।

অস্বস্তিটা সরিয়ে রেখে কম্পিউটারটা স্যুইচ অন করলেন অনির্বাণ।

চরিত্র টনিক

মিনমিনে চানাচুর খেয়ে খেয়ে মানুষ ক্রমাগত মিইয়ে যাচ্ছে।

চরম ঝাল, জম্পেশ মিষ্টি, খানিকটা টক;
এই সব হাইভোল্টেজে এসে মিশলে তবে জানবেন সে চানাচুর আদত চানাচুরত্ব লাভ করেছে।

ভুলে গেলে চলবে না যে খাঁটি চানাচুর আদতে চরিত্র গঠনের টনিক।

নবারুণের শাস্তি



- শুভ নববর্ষ নবারুণ।
- শুভ নববর্ষ। এই শুভদিনে আজ আবার এ পাপের জায়গায় কেন স্যার..। এ'সব রাউন্ড লাগিয়ে সময় নষ্ট না করে সাততাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরুন বরং।
- এ'টাই তো আমার কর্মস্থল হে, তা'তে আবার পাপ কীসের।
- তা বটে। যাক, সেল নম্বর বাহাত্তরে আপনার জন্য কাল্পনিক লাল কার্পেট বিছিয়ে দিলাম।
- সিগারেট খাবে?
- যাবজ্জীবন কয়েদি আমি। দারোগার দেওয়া সিগারেট পেটে সইবে কেন বলুন।
- আমিই ধরাই তা'হলে।
- বেশ তো।
- নবারুণ, তোমার তো এ'টা দ্বিতীয় বছর চলছে। তাই না।
- বছরমাস এ'সবের হিসেব রেখে লাভ দেখছি না বিশেষ।
- তোমার গুড বিহেভিয়ার মাথায় রেখে একটা ভালো চিঠি হেডকোয়ার্টারে কাল পাঠাচ্ছি।
- কাগজ, কালি এবং আপনার অতি মূল্যবান সময়ের বিশ্রী অপচয়।
- কী ব্যাপার বলো দেখি, তোমার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই দেখেছি একটা বিশ্রী নেগেটিভ মাইন্ডসেট।
- খুন করা আসামী। আমার মাইন্ডসেট তলিয়ে দেখবেন না প্লীজ।
- শাস্তি তো পাচ্ছোই, পাবেও। কিন্তু তোমার মধ্যে একটা পসিবিলিটি আমি দেখি অনবরত নবারুণ। একটা স্পার্ক।
- আমার ভদ্রলোকের মত ব্যবহার দেখে ইম্প্রেসড হচ্ছেন? পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ খুনিরা যে মিটমিটে শয়তান সে'টা আশা করি আপনার মত দুঁদে দারোগাকে বলে দিতে হবে না।
- আরো খুনটুন করার ইচ্ছে আছে নাকি?
- যে একবার খুন করেছে, তার মধ্যে পসিবিলিটি তো রয়েইছে।
- তুমি কি আজ একটু বেশি ডিসটার্বড নবারুণ?
- না। দিব্যি আছি।
- তুমি প্রায় আমার ছেলের বয়সী। তোমার মনের অবস্থা আমি কিন্তু কিছুটা হলেও...।
- বয়স দেখিয়ে নিজের সুপিরিয়রিটি এস্টাব্লিশ করার কী দরকার দারোগাবাবু। আপনি আইনের রক্ষক। আমি খুনি। বয়সের হিসেবটা উল্টো হলেও আপনি স্নেহ, কমপ্যাশন ইত্যাদির ব্যাপারে আমার চেয়ে এগিয়েই থাকতেন।
- আজ তুমি এতটা বিরক্ত কেন বলবে? পয়লা বৈশাখ, বাড়ির কথা মনে পড়ছে?
- না। আমার ধারণা এই জেলের মধ্যে আমি বেশি সিকিওরড। বাড়ির চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিন্দি এ'খানে।
- চা খাবে? ব্যবস্থা করতে পারি কিন্তু।
- আপনার এই সিম্প্যাথিতে লজিক সবিশেষ নেই স্যার। যে'টা আছে সে'টা হলো একজন সো-কল্ড আপারক্লাস ভদ্রসন্তানের প্রতি আর এক ভদ্রসন্তানের টান।
- বড্ড তিতিবিরক্ত হয়ে আছো ভাই। কী ব্যাপার বলো দেখি আজ। বলো না।
- জানেন স্যার। অন্যায় করেছি, শাস্তি পাচ্ছি। এই স্পষ্ট ধারণার মধ্যে এক ধরণের অদ্ভুত স্বস্তি আছে। একটা লিনিয়ার প্রসেস যার অন্যথা হওয়ার নয়। সে'টা ভেবে বেশ লাগে। কিন্তু এই মাঝেমধ্যে এক একটা দিন মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত ধান্ধাবাজি সুড়সুড়ি দেয়।
- ধান্দাবাজি?
- মনের মধ্যে লতায়পাতায় গজিয়ে ওঠে বিভিন্ন যুক্তি। মনে হয় অপরাধটা না করে আমার কোনো উপায় ছিল না।
- তোমার কেসফাইল পড়ে আমারও কিন্তু মনে হয়েছে যে ব্যাপারটা একতরফা নয়...।
- কেসফাইলের কথা বলছি না স্যার। ওই র্যাশনালাইজ করার প্রসেসটার কথা বলছি। এই যেমন আজ বারবার মনে হচ্ছে ওই বিশ্রী কাজটাই গোটা দুনিয়া দেখলো জানলো অথচ কী'ভাবে তিলে তিলে একটা খুনীকে গড়ে তোলা হলো সে'টা কেউ কখনও জানবে না!
- নবারুণ..শোনো..।
- নিজে নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া যায় না। এই না পারাটার কথা ভেবে বড় অসহায় লাগছে দারোগাবাবু। আর সেই বিরক্তি ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই।
- সমস্তটা হয়তো বুঝছি না তবে তুমি আজ ভালো নেই।
- আমি জানি আমার অপরাধটা। এ শাস্তি থেকে পালিয়ে যেতে চাইনা একটুও। দারোগাবাবু, তবু ভালো থাকতে চাই। কী বিশ্রী নেশা, তাই না?
- তাই তো। আর সে নেশাতেই তো সবারই প্রায় যাবজ্জীবন অবস্থা।
- এই দ্যাখো..।
- কী হলো?
- আরে দারোগাদাদা, আপনারও যে মেজাজটা আজ অফ দেখছি। আপনিও কি এই অধমের সেলে বসে নিশ্চিন্ত বোধ করছেন?
- ননসেন্স।
- হুম। একিলিস হীলে ছুঁচ ঠেকিয়ে ফেলেছি মনে হচ্ছে।
- চায়ের অফারটা আর একবার দিলাম। এ'বারেও রিফিউজ করবে?
- হোক। ইয়ে, সঙ্গে লেড়ো হবে?