Thursday, November 21, 2024

লজ্জাঘেন্না

লজ্জাঘেন্না ত্যাগ না করলে সম্ভবত রাজনৈতিক ক্ষমতা আদায় করে নেওয়া যায় না৷ কাজেই তাঁদের আগডুমবাগডুম কথাবার্তায় আকাশ থেকে পড়ার কিছু হয়নি৷ কিন্তু এই "প্রতিবাদ করছেন তবুও মাইনে-বোনাস নেবেন?" গোছের প্রশ্ন যে যতবার করবেন, ততবার জোরালো গলায় "মিথ্যে বলছেন, মানুষকে টুপি পরাচ্ছেন" বলে সরব না হয়ে উপায় নেই৷

ন্যায্য প্রতিবাদকে ঠেকাতে গিয়ে এই সস্তা-মিথ্যে-বাজে যুক্তিটুকু অনেকেই চালিয়ে থাকেন৷ অনেকে আবার এ'টা বলে ভাবেন "বেশ দারুণ স্মার্ট একটা কথা বলে ফেললাম আর কী"। কিন্তু ক্ষমতাসীন মানুষ, বিশেষত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যখন মারাত্মক রকমের আত্মবিশ্বাস নিয়ে এ'সব গুল (আইনের দিক থেকে, নৈতিকতার দিক থেকে, কমনসেন্সের দিক থেকে) ফায়্যার করেন, তখন মনে হয়ে সত্যিই সব রসাতলে গেছে বটে।

এ'ক্ষেত্রে অবশ্য প্রতিবাদীরা নিজেদের প্রতিবাদের পাশাপাশি নিরলস ভাবে মানুষের জন্য কাজও করে চলেছেন৷ তবে ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তরে অদ্দূর যাওয়ার দরকারটাই বা কী৷ ন্যায্য প্রতিবাদ রুখতে বেতন কাটা আর লেঠেল লেলিয়ে ঘরদোর ভেঙে শায়েস্তা করার মধ্যে খুব বেশি তফাত নেই। এই সহজ-সরল কথাটা না জেনেও জননেতা হওয়া যায়-সে লজ্জা তাঁর নয়, সে লজ্জা আমাদের৷

বই ঠকানো মানুষ



কোনোদিন কোনো বইকে ঠকিয়েছেন?

এই ধরুন একটা বই পড়া শুরু করলেন। খান দশেক পাতা এগোতেই বইটা আপনাকে টেনে ধরলে। সেই টান অবশ্য কলার হিঁচড়ে টানা নয়৷ আপনাকে সে বই ধরে রাখছে স্নেহ-মায়া দিয়ে, বুদ্ধিদীপ্ত স্টাইল দিয়ে, ভালোবাসায় মুগ্ধ করে। হাসিয়ে৷ "ও কিছু নয়, চোখে কিছু পড়েছিল আর কী" মার্কা থমকে যাওয়া দিয়ে৷

আপনার সঙ্গে সে বই সারাক্ষণ ঘুরঘুর করছে। অফিসের ব্যাকপ্যাকে, বালিশের পাশে, খাবার টেবিলের এক কোণে, সোফার কুশনের আড়ালে। সবসময় হয়ত পড়ছেন না, কিন্তু সে বইয়ের মলাটে হাত বুলোচ্ছেন মাঝেমধ্যে, বুকমার্ক হয়ে উঠছে আঙুল। ছ-সাত পাতা আগে ফেলে আসা কোনো ভালো লাগা লাইন বা প্যারাগ্রাফে মাঝেমধ্যেই ফিরে যাচ্ছেন৷ কিছু কিছু পাতা বার বার পড়েও আশ মিটছে না৷ পড়ার গতির তোয়াক্কা করছেন না মোটেও৷ আপনার দিনের প্রতিটা ফ্রেমের মধ্যে বইটার বিভিন্ন টুকরো ছড়িয়ে পড়ছে।

এমন সময়৷ কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে, বন্ধুর বইয়ের শেল্ফ থেকে বা রেলস্টেশনের হুইলার থেকে একটা বই হাতে তুলে নিলেন৷ মলাটের ও'দিকে এগোনোর কথা ছিল না৷ তবে কত কিছুই তো কথার বাইরে যায়৷ দু'পাতা চোখ বুলোনো হলো। ব্লার্বটা পড়ে মাথা নাড়া হলো। প্রচ্ছদটা যে দুরন্ত সে'টাও কাউকে ধাক্কাসহ বলে দিতে হয় না৷ আগ্রহের একটা বিন্দু জমাট বাঁধলো। বইটা সে বন্ধুর থেকে ধার নিলেন অথবা দাম মিটিয়ে ব্যাগস্থ করলেন।

কত বইই তো আসে যায়৷ এই নতুন বইটারও আপাতত ব্যাগের মধ্যেই থাকার কথা৷ ভালোবাসার যে বইটা গত কয়েকদিন ধরে আপনি ধীরেসুস্থে পড়ে চলেছেন, আপাতত ফোকাস এবং যত্ন সে'খানেই থাকার কথা। কিন্তু ওই যে বললাম, কত কিছুই তো কথার বাইরে যায়। এদ্দিন এই ভালোবাসার বইটার সিংহভাগ পড়া হয়েছে নতুন প্রেমে পড়ার কবির স্টাইলে৷ কিন্তু বাকি থাকা সত্তর আশিটা পাতা আচমকা রুদ্ধশ্বাস গতিতে পড়া শুরু হলো; ঠিক যেন দেশে যুদ্ধ এসে পড়েছে, এ'টা শশব্যস্ততার সময়৷ যে'খানে এসে প্রতিটা শব্দের ওপর স্পটলাইট পড়ার কথা, সে'খানে মনে হচ্ছে প্রতি লাফে হাফডজন সিঁড়ি ভেঙে এগিয়ে না গেলে চলবে না৷ মন তখন নতুন বইয়ের কবলে চলে গেছে, আর রক্ষা নেই৷

বই-ঠকানোর ইস্পাত শীতল অনুভূতি কখনও টের পেয়েছেন কি? কখনও?
(ছবি: জেমিনাই)

রেলস্টেশনের অপেক্ষা



দূরপাল্লার ট্রেন ধরার ব্যাপারে এই আমার এক সমস্যা- ঘণ্টা দেড়-দুই আগে রেলস্টেশনে পৌঁছে গিয়ে অস্থির পায়চারি৷ এ'টা এক ধরণের প্যারানয়্যাই বটে৷ যদি স্টেশন যাওয়ার পথে ট্যাক্সি বা অটোর ইঞ্জিন বিগড়ে যায়? যদি অকারণ ট্র্যাফিক জ্যামে আধঘণ্টার পথ মরুতীর্থ হিংলাজে পরিণত হয়? যদি প্ল্যাটফর্ম গোঁসা করে হাফ কিলোমিটার দূরে সরে গিয়ে চুক্কি দেয়? সে কতরকমের দুশ্চিন্তা৷

তার চেয়ে এমন সময় পৌঁছনো ভালো যখন রেলের লাল কালো ডিজিটাল বোর্ডে সে ট্রেনের আসার ঘোষণাও দেখা যাচ্ছে না৷ তার আগে অন্তত একুশবার দেখে মোবাইল ব্রাউসারে দেখে নেওয়া সে ট্রেন কত নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসবে, কোচ পোজিশনের হিসেব কী, ইত্যাদি৷ দেখেশোনা হয়ে গেলে এক পরিচিতকে ফোন করে নিতে হবে সে সে সেই স্টেশনের হালহকিকত সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।

- হ্যালো! হ্যাঁ রে, একটা আর্জেন্ট ব্যাপার। অমুক এক্সপ্রেসটা সাধারণত কত নম্বর থেকে ছাড়ে রে?
- দু'নম্বর।
- তুই শ্যিওর?
- জন্মিলে ঘোল খাইতে হবে, শ্যিওর কে কোথা কবে৷ দু'নম্বরই হওয়া উচিৎ৷ তবে চোখ কান খোলা রাখিস ভাই৷

লে হালুয়া, চোখ কান খোলা রাখতেই যদি হয় তবে গায়ে পড়ে ফোন করছি কেন৷ যা হোক, ইন্টারনেট বলছে দু'নম্বর প্ল্যাটফর্ম। পরিচিত কণ্ঠ বলছে সম্ভবত দু'নম্বর৷ কুলি বা চায়ের দোকানির কাছ থেকে আর এক প্রস্থ ঝালিয়ে নেওয়া গেল যে দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মেই যেতে হবে৷ এরপর রেলের শিডিউল বোর্ডের সামনে ধীরেসুস্থে অপেক্ষা; শেষ পর্যন্ত দুই নম্বরই থাকবে তো?

ঝাড়া চল্লিশ মিনিট পর বোর্ডে ভেসে উঠবে দু'নম্বর প্ল্যাটপফর্মের আশ্বাস৷ তখন নিজেই নিজেকে বলতে হবে, "যাক বাবা৷ দু'নম্বর প্ল্যাটফর্ম। তবে কিছুই বলা যায় না৷ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চোখকান খোলা রাখতে হবে৷ কখন কী পালটে যায়.."।

কিন্তু এত ভ্যানতারার পরেও যখন টের পেলাম যে ট্রেন আসতে এখনও প্রায় এক ঘণ্টা মিনিট দেরী, তখন মনে হয় রেলের কোনো কর্মীকে ডেকে বলি স্টেশনেও সিকিউরিটি চেকের ব্যবস্থা শুরু করতে আর বই-বাদে-আর-সব-ফাজিল-জিনিসপত্রের ব্যাপক স্টক-সমৃদ্ধ বুকশপ খুলতে। তা'তে যদি খানিকটা সময় কেতাদুরস্ত ভাবে জলে দেওয়া যায়৷


সে উপায় যখন নেই, তখন খাবারদাবারের দোকান জরীপ করে সময় কাটাতে হয়৷ সে'দিক থেকে ভাজাভুজির স্টলের বর্ণে-গন্ধে সুরাট রেলস্টেশনের লাগোয়া বাজার আর সে স্টেশনের দু'নম্বর প্ল্যাটফর্ম হতাশ করেনি। বিকেল আর সন্ধের মাঝামাঝি সময়, এ সময় প্রায় বেশির ভাগ দোকানেই তেলেভাজার নতুন লট কড়াইয়ে পড়ছে৷ ধোকলা-টোকলা আছে বটে, তবে এ'অঞ্চলে অন্তত দেখলাম হট কচুরিজের মত বিক্রি হচ্ছে হট কচুরিজ এবং হট শিঙাড়াজ (সামোসাজ বলা উচিৎ বোধ হয়)। এ'ছাড়া রয়েছে বড়াপাও পকোড়া গোছের জিনিসপত্র৷ ভাজাভুজির মনোরম গন্ধে ভেসে ভেসে দিব্যি কেটে গেলো মিনিট চল্লিশ৷ ট্রেন এ'বার আসবে৷ দু'নম্বর প্ল্যাটফর্মের আশ্বাস টিকে আছে কিনা সে'টা এইবেলা আরেকবার যাচাই করে নেওয়া দরকার৷

হাফপ্লেট



বছর সাতেক পুরনো ছবি, কলকাতায় তোলা৷ কোন অঞ্চল সে'টা সঠিক মনে পড়ছে না, সম্ভবত যোধপুর পার্কের আশেপাশে৷

যা হোক, এই ফর্ম্যাটের রোল-চাউমিনের দোকান কলকাতার রাস্তাঘাটে যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে৷ রোলের মধ্যে পাওয়া যাবে এগ, ডবল এগ, এগ চিকেন, ডবল এগ চিকেন আর ডবল এগ-ডবল চিকেন৷ মাটন রোল পাওয়া গেলে বুঝতে হবে এ দোকান একটু উঁচু স্তরের৷ চাউমিনের মধ্যে পাওয়া যাবে ভেজ, এগ, চিকেন আর এগ চিকেন৷ আবার এ'টা উঁচু স্তরের দোকান হলে ডিম-মুর্গির সঙ্গে কুচো চিংড়ি দেওয়া মিক্সড চাউমিনও পাওয়া যাবে। উপরি থাকবে কাচের শোকেস আলো করা চিকেন পকোড়া আর স্টিলের গামলায় রাখা চিলি চিকেন যে'টা পিস হিসেবে বিক্রি হয়।

এ'সব দোকানে আমার পছন্দ হলো গিয়ে চাউমিন; হাফপ্লেট কিন্তু ডবল ডিম দেওয়া৷ স্টিলের প্লেটে চাউমিনের ঢিপি ঘেঁষে দু'টো বিটনুন ছড়ানো চিকেন পকোড়া, যে'গুলো চাটুতে আর একবার সেঁকে তারপর প্লেটে দেওয়া হয়েছে৷ চাউমিনের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হবে চিলিসস, টমেটো সস আর পেঁয়াজ-লঙ্কাকুচি৷ আর সবার ওপরে পড়বে, স্পেশাল রিকুয়েস্টের মাধ্যমে আদায় করে নেওয়া চিলি চিকেনের গ্রেভি৷

এত রাত্রে এ'সব ভেবে জিভ জলে টইটম্বুর। বিস্কুট-চানাচুর ছাড়া আর কোনো গতি নেই৷ কাজেই মন-মেজাজ মারাত্মক উদাস হয়ে পড়েছে৷ ভয় হচ্ছে খসখস করে দু'চারটে কবিতাফবিতা না লিখে ফেলি।

টুংটাংটুংটাং



সাইকেলের জয়যাত্রা অব্যাহত৷ আজ জুহু চৌপাটি ঘুরে এলাম৷ আমাদের আস্তানা থেকে আসা-যাওয়া মিলিয়ে বড়জোর ষোলো-সতেরো কিলোমিটার পথ, খোশমেজাজেই ঘুরে এলাম৷ আর একটানা বৃষ্টিতে ধীরেসুস্থে প্যাডেল ঠেলার আনন্দই আলাদা। ডিমার্টের পাইকারি কাপড়জামার স্তুপ থেকে সম্প্রতি সস্তায় একটা রেনজ্যাকেট হাঁকিয়েছি, অতএব বৃষ্টিতে থেমে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না৷

তাড়াহুড়ো আমার না-পসন্দ৷ ঢিকিরঢিকির করে এগোই, সুবিধে মত দাঁড়িয়ে পড়ি৷ চায়ে চুমুক দিই, বিস্কুটে কামড় দিই; ফের এগোই৷ ঘ্যামস্য ঘ্যাম৷ যে রাস্তা দিয়ে এদ্দিন নিয়মিত গাড়িতে, মোটরসাইকেলে বা অফিস বাসে যাতায়াত করেছি, সে'গুলোকে নতুনভাবে চিনছি। কত চায়ের দোকান বা ভাজাভুজির স্টল যে এদ্দিন আড়ালে-আবডালে পড়েছিল; সে'সব এখন সুড়সুড় করে চোখের সামনে বেরিয়ে আসছে।

যা হোক৷ একটা জরুরী অবজার্ভেশন৷ হর্ন জিনিসটা বিশ্রী৷ শব্দদূষণ তো বটেই; ও জিনিস মেজাজ খিঁচড়ে দেয়, মুখ তিতকুটে করে দেয়, আর এন্তার হাড় জ্বালায়৷ হর্ন যত কম বাজাবেন, তত দেশের দশের ও আপনার নিজের মঙ্গল৷ কিন্তু সাইকেলের বেলের ব্যাপারে সে খিটখিট খাটে না৷ আর আমার সাইকেলে যে বেল বসানো আছে, সে'টা ঠুকলে আবার ক্রিংক্রিংও নয়, বেরিয়ে আসে মৃদু-নরম-কানেমধু লেভেলের টুংটাং৷ ও জিনিসকে বেল না বলে "ট্র্যাফিক নুপুর" বললে মানায় বেশি৷

সামনের অটোরিকশা বা গাড়িকে "প্লীজ দাদাভাই" গোছের আওয়াজ দিতে হবে? টুংটাংটুংটাং৷
হঠাৎ বৃষ্টি নামায় মেজাজ খুশ?
টুংটাংটুংটাং।
আচমকা স্পীড তুলে মনে হচ্ছে হাওয়ায় ভেসে যাওয়ার মত ব্যাপার?
টুংটাংটুংটাং।
সামান্য ক্লান্ত হয়ে হেলেদুলে এগোতে এগোতে মনকে একটু চনমনে করে তোলার দরকার?
টুংটাংটুংটাং।
ট্র্যাফিক সিগনালে পাশে দাঁড়ানো বাসের জানালা থেকে কোনো খোকা ড্যাবাড্যাবা চোখ নিয়ে সাইকেলের দিকে তাকিয়ে?
টুংটাংটুংটাং।

মোটের ওপর ওই টুংটাংটুংটাংই হলো সাইকেল চালিয়ের ধিতাংধিতাং, সে'টার ওভারডোজ হলে ক্ষতি নেই।