Thursday, November 21, 2024

বাবু ওয়াটসনের বৃষ্টিদর্শন



গত মিনিট দশেক ধরে একের পর এক রকমারি ছাতা এবং ছাতার মালিক-মালকিনদের ব্যস্ততা মুগ্ধ হয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন ভদ্রলোক। থুড়ি, পর্যবেক্ষণ নয়; দেখছিলেন শুধু, তবে মনপ্রাণ দিয়ে৷ এই এক লাল ছাতা মাথায় গৃহিণীর ব্যাজার মুখ, ওই গেল কালো ছাতার নীচে হন্তদন্ত অফিস যাত্রী।

ছাতা দেখছেন, দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। ছাতার নীচে রকমারি মানুষ, তাদের হাবভাব দেখেও আর আশ মিটছে না। আর রয়েছে বম্বের একটানা ঝমঝমে বৃষ্টি; কী অসহ্য, কী বিরক্তিকর অথচ কী অদ্ভুত ভাবে মন ভালো করা।

কিন্তু সর্বোপরি; সে এক অনাবিল পরিতৃপ্তি! ছাতার অবস্থা দেখে মানুষের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের পরিস্থিতি আঁচ করতে হচ্ছে না, ছাতা হাতে মানুষের চলন দেখে তার যমজ ভাইয়ের বাঁ হাঁটুর বাতের কথা ভাবতে হচ্ছে না। বৃষ্টির রাস্তায় গাড়ির চাকার ছাপ দেখে আগামী হপ্তায় কোন দুর্ঘটনার খবর সমস্ত কাগজের প্রথম পাতায় উঠে আসবে, তা নিয়ে ভেবে হন্যে হতে হচ্ছে না।

নাহ্‌, মরিয়ার্টি ভায়া মহাবজ্জাত বটে। তবে শত দু:খের মাঝেও; মাঝেমধ্যে একটা অস্বস্তিকর স্বস্তি মনের মধ্যে টের পান বটে বাবু ওয়াটসন।

প্যারাশুট



পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডের মাথায় প্যারাশুট খোলার কথা ছিল। পঞ্চাশ সেকেন্ড ছাড়িয়ে গেছে; খুললো না। আর খুলবে বলে মনেও হচ্ছে না। আমার প্রাইভেট স্কাইডাইভার কোচ চরণ ব্যাটা আচ্ছে ডোবালে দেখছি। কেন যে খামোখা স্কাই-ডাইভিংয়ের শখ চাপলো। আর কেন যে খামোখা দু'পয়সা বাঁচানোর লোভে ওই ফোর টুয়েন্টি চরণের খপ্পরে পড়লাম; ব্যাটা বলে কিনা বাজারে যা রেট তার চেয়ে অর্ধেক রেটে আমায় প্লেন থেকে ফেলে দেবে। সত্যিই ফেলে দিলো, কিন্তু নরম ভাবে নামানোর ব্যাপারটা বেমালুম চেপে গেলো। দিব্যি ছিলাম ক্লাবে ক্লাবে ব্রিজ খেলে আর মদ গিলে। এই বিটকেল শখ যে কেন মাথায় এলো।

বাষট্টি সেকেন্ড হতে চললো। প্যারাশুট বলে আদৌ কিছু দিয়েছে না তাঁবুর কাপড় পিঠে বেঁধে দিয়েছে কে জানে। কী বেআক্কেলে লোক দেখুন দেখি চরণ। পিওর গাম্বাট অথচ কথাবার্তায় যেন মধু ঝরে পড়ছে। "শরীর ভালো আছে তো স্যার?" "ঝাঁপাতে রেডি তো স্যার?" "ভয় করছে না তো স্যার? আরে আমি তো আছি"। হাতির মাথা আছে, রাস্কেল!

যা বুঝছি আর তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যেই ক্র্যাশ করব, তারপর সবকিছু চুরমার। বেরোনোর আগে মুখে একটু মশ্চারাইজার মেখে বেরোতে পারতাম; ডেডবডি ভাঙাচোরা হলেও চলে; ফাটা ঠোঁট-গাল ব্যাপারটা কেমন বিশ্রী লাগে যেন।

যা হোক, সে'সব ভেবে আর কী হবে৷ শিউলিই যখন আর জীবনে রইল না, এই ভালো। অবশ্য আমাদের ডিভোর্সটা এখনও হয়নি৷ এই ছুটি কাটিয়ে ফিরে, পুজোর পর ডিভোর্সের দরখাস্তে সই করব তেমনটাই প্ল্যান ছিল৷ মাঝেমধ্যে রাগের মাথায় হাত-টাত তুলে ফেলেছি বলে কি প্রেম-মোহব্বতটা মিথ্যে হয়ে গেল? শিউলি খামোখাই জেদ ধরে বসলো৷

আর বড়জোর আঠেরো সেকেন্ড বাকি৷ অথচ আমার এত সম্পত্তি-টাকাপয়সা ছেড়ে মন পড়ে রয়েছে শিউলিতে৷ ইজ দিস নট ট্রু লাভ? সে শুধু মারধোরই দেখলে? স্নেহ, মায়া আর প্রেমটা দেখলে না? কেউ ভালোবাসে কবিতা লিখে, কেউ গান বেঁধে৷ আমার স্টাইলটা একটু না হয় অন্যরকম৷ এই যে বিয়ের পর শিউলির চাকরিটা ছাড়িয়ে দিলাম, সে'টাও তো ভালোবেসেই৷ আমার এত টাকা, আর আমার বউ কিনা খেটে মরবে? রামোহ্‌, রামো্‌হ।

আর দশ সেকেন্ড৷ পড়ে রইল বালিগঞ্জের জোড়া ফ্ল্যাট, বোলপুরের বাগানবাড়ি আর কার্সয়াঙের কটেজ৷ পড়ে রইল ব্যবসাপাতি আর সুদের কারবার৷ কত করে বোঝালাম শিউলিকে, আরে পোস্টঅফিস ক্লার্কের মেয়ের অত দেমাক দেখানো ভালো নয়৷ ডিভোর্স না করলে সে কত ফুর্তিতে থাকতে পারবে৷ তা নয়, ডিভোর্সই চাই৷ শেষ দিকে অবশ্য নরম হতে শুরু করেছিল৷ হঠাৎ বলেও ফেলেছিল পুজোর আগে ডিভোর্স দেবে না, স্যুইট গার্ল সে'দিক দিয়ে৷

যা হোক..এ'বার তবে...এই এক মিনিট..এই থামাও..এই কেলো করেছে..ডিভোর্স অ্যাপ্লাই করিনি যে এখনও..আমার সব টাকাপয়সা তা'হলে ওই বজ্জাত মেয়েটা পাবে? এ বাবা! হায় হায় হায়!

দু'সেকেন্ড পরেই ইম্প্যাক্ট!
কী সর্বনাশ!
এই এক মিনিট!
এক মিনিট!
এ সেরেছে!
শিউলি হারামজাদির উকিলের নাম উমা দত্ত না?
আর ওর লেটার হেডে ইউ সি দত্ত লেখা থাকত না?
উমা সি দত্ত?
উমা চরণ দত্ত?
চরণ?
হে ভগবা...!

(ছবি: জেমিনাই)

ঘোরা



"এইবেলা ঘুরতে বেরোন৷ আজই, এখুনি! বিদেশবিভুঁইয়ে পাহাড়ে সমুদ্রসৈকতে মরুভূমিতে নিজের পদচিহ্ন রেখে আসুন৷ টাকাপয়সা আজ গেলে কাল ফিরে আসবে কিন্তু নষ্ট-সময় আর ফিরবে না"৷
কিঞ্চিৎ সন্দেহ হচ্ছে যে কথাটা ডাহা গুল।

'টাকাপয়সা আজ গেলে কাল আসবে' স্লোগানটার থেকে বোধ হয় গা বাঁচিয়ে চলাই ভালো৷ শ্রী শ্রী টাকাপয়সা মারাত্মক চালিয়াত; "এই দু'মিনিটে আসছি" বলে বিশ বছর গা ঢাকা দিয়ে থাকা চিজ তিনি। কাজেই বয়সকালে কমা মেডিক্লেমের ব্যথা গুলমার্গের বরফের স্মৃতি ঘেঁটে কমবে বলে মনে হয় না৷

ঘুরতে বেরোনো অতি চমৎকার ব্যাপার। জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ যে তা'তে হয় সে'কথা অনস্বীকার্য। গল্পের ভাঁড়ার স্ফীত হয়। মন চওড়া হয়৷ সবচেয়ে বড় কথা; বন্ধু জোটে৷ তবে ভাবগতিক যা বুঝছি, তার জন্য সামান্য হিসেব কষে আর বাজেট মেপে এগোনোই ভালো।

সময় চলে যাচ্ছে অথচ অরোরা বোরিয়ালিস দেখা হলো না বা কলোম্বোয় বসে চিংড়ি চেবানো হলো না বলে ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে এসআইপি ডকে তুলব, সে রোম্যান্টিক ফাঁদে পা না দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছি৷ বিশেষত গো-লিভ-ইওর-লাইফ এক্সপিরিয়েন্স দাদা-দিদিদের ফিলোসোফি টিউশনি থেকে তফাতে থাকছি।

এক পিস গ্র্যান্ড ভ্যাকেশনিও পোলাও-মাংসের লোভ যেন ইচ্ছমত পুরী-ভ্রমণের দুধ-ভাতকে ভুলিয়ে না দিতে পারে - এই হলো মনের কথা৷

সাইকেল ও বম্বে



মুম্বই আসার পর থেকেই মনে হচ্ছিল যে আশেপাশে ঘোরাঘুরির জন্য চার-চাকা ব্যাপারটা মারাত্মক রকমের গোলমেলে। পেট্রোলের শ্রাদ্ধ, সময়ের অপচয়। সর্বোপরি মারাত্মক ঝকমারি; খোঁচা দেওয়ার ভয়, খোঁচা খাওয়ার ভয়, পার্কিং নিয়ে জেরবার৷ চারবাংলো বাজারে গিয়ে শান্তিতে মাছ উল্টেপাল্টে দেখব তার উপায় নেই৷

কাজেই বছর দেড়েক রকমারি স্কুটার নিয়ে রিসার্চ করলাম৷ একশো দশ সিসির ইঞ্জিন না একশো পঁচিশ সিসির ইঞ্জিন, পেট্রোল না ইলেক্ট্রিক, মাইলেজ না পার্ফর্ম্যান্স; এ নিয়ে বেশ দাঁত চিবিয়ে কথা বলা এক্সপার্ট হয়ে উঠলাম৷ আর এদ্দিন রিসার্চের পর আজ কিনে ফেললাম একটা সাইকেল৷ অতি রিসার্চে গাজন নষ্ট কথাটা নেহাৎ মিথ্যে নয়৷


ক্লাস নাইন থেকে টুয়েলভ স্কুল-টিউশনি করেছি একটা হিরো ইম্প্যাক্ট সাইকেলে চেপে৷ তখন সে'টাই আমার রয়্যাল এনফিল্ড। যা হোক, এদ্দিন পর প্যাডেল করতে দিব্যি লাগছে৷ পাঁচ-সাত কিলোমিটারের রেডিয়াসে স্কুটির তুলনায় সাইকেল মন্দ হবে না৷ খরচ ঝক্কি দুইই কম৷ আর খানিক কসরতও হবে৷ তা'ছাড়া মুম্বইয়ে তেমন বিশ্রী গরম বছরে বড় জোড় বছরে দু'আড়াই মাস৷ কাজেই সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতে তেমন অসুবিধে হওয়ার কথা নয়৷

খটকা একটা ছিল এই চারমাসের বৃষ্টি নিয়ে৷ অবশ্য ছাত স্কুটারেও নেই৷ আজ প্রথম দিন; কাজেই হুজুগ সপ্তমে৷ অতএব বিকেলের দিকে বৃষ্টি ঠেলেই বেরিয়ে পড়লাম। লোখন্ডওলার যমুনানগর (যমুনা নেই, ধারেকাছে একটা সাত ময়লা চওড়া 'নালা' আছে) থেকে 'ব্যাকরোড' হয়ে চারবাংলা মার্কেট৷ ঝমঝমে বৃষ্টি হলে দাঁড়াতেই হয়, কিন্তু ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর নিরিবিলি রাস্তা দেখলাম মারাত্মক ভালো কম্বিনেশন- মনের মধ্যে লাকি আলি আর সেকেন্ড ইয়ার সদর্পে জেগে ওঠে৷

চারবাংলোয় মাছ-ভ্রমণে আসব ছুটির সকালে৷ আজ ফিরে এলাম বেলফুল কিনে, সে মালার অর্ধেক গেল খোকার দখলে, বাকিটা বেটারহাফের খোঁপায়৷

কোলেস্টেরল ও বর্ষা



- কী বিশ্রী ওয়েদার দেখেছেন?

- বাইরে বেরোতে হলে বিরক্ত হতাম বটে৷ কিন্তু অফিসে বসে এ'সব গায়ে লাগে না৷

- এই বৃষ্টির জানালার পাশে বসে ফাইল ঠেলা যায়?

- ফাইল সময়মত ঠেলতে পারলে দেখবেন কফিতে ফোকাস করে আনন্দ পাচ্ছেন৷ আমি তো বলি, তিরিশ মিনিটের কাজ পঁচিশে সাফ করে পাঁচ মিনিট ধরে ক্যান্টিন-সম্রাট শ্রীকান্তর পকোড়া উপভোগ করুন৷ দেখবেন ওয়েদারকে বিউটিফুল মনে হবে৷

- কোলেস্টেরল রিপোর্ট দেখে মশাই এন্তার পকোড়া সাঁটানোর কথা ভাবতেও গা কাঁপছে৷

- কোলেস্টেরলে ঘায়েল মানুষের জীবনে বর্ষা বিষয়ক হুহুর স্থান নেই৷ বাজে গল্প বন্ধ করে এক্সেলে মন দিন৷