Tuesday, July 16, 2024

মহাবিপদ



মরে গিয়ে মহাবিপদে পড়েছি বুঝলেন। এর চেয়ে বেঁচেই ভালো ছিলাম। বড়জোর অফিসে বড়সাহেবের আর বাড়িতে বৌয়ের মুখচোপা শুনতে হত দিনে দু-তিনবার। এ'ছাড়া ছিল নানারকমের ভয়; ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম ফেল করা, সেলস টার্গেট ঝুলে যাওয়া, কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া; আরো কত কী। কিন্তু মরার পর থেকে দেখছি দুশ্চিন্তা হাজারগুণ বেড়ে গেছে। রক্ত নেই, রক্তচাপ বাড়ছে। হৃৎপিণ্ড নেই অথচ বুকের মধ্যে ধড়ফড়। মহামুশকিলে পড়েছি। এ'বার একটু খোলসা করে বলি।

গতকাল রাত সোয়া এগারোটা নাগাদ দু'পেগ হুইস্কিতে ভেসে আমাদের সাত তলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়ে একটু দরদ দিয়ে গান ধরেছিলাম, "আমি যে জলসাঘরে"। দরদের ফোর্সটা একটু এ'দিক ও'দিক হয়ে গেল; কী'ভাবে যেন আমি ব্যালকনির রেলিং টপকে এক্কেবারে সোজা গিয়ে পড়লাম অ্যাপার্টমেন্টের সামনে সুইমিং-পুলসাইডে। পুল-ভিউ ফ্ল্যাট কেনার এ'টা একটা বাড়তি সুবিধে, এই ধরণের দুর্ঘটনায় বেশ একটা সিনেম্যাটিক মাত্রা যোগ হয়।

ব্যাপারটা যা দাঁড়ালো; জলসাঘরের মেজাজ আর হুইস্কি মিলে কিঞ্চিৎ বাড়াবাড়ি। যা হোক, এমন রক্তারক্তি একটা ব্যাপার ঘটে গেল; থানা-পুলিশ তো হবেই। ইন্সপেক্টর গুপ্তর মনের মধ্যে একটা অদম্য গোয়েন্দা বাস করে। বললে বিশ্বাস করবেন না, আমি ওর মগজের মধ্যে ঢুকে দেখে এসেছি; সে'খানে আগাথা ক্রিস্টি আর আর্থার কনান ডয়েলের মাদুর পেতে পাশাপাশি বসে গল্পগাছায় ব্যস্ত। অতএব পেশায় ইন্সপেক্টর আর শখে গোয়েন্দা গুপ্তবাবু যে একটা সাদামাটা ব্যাপারকে সহজেই গুলিয়ে দেবেন, সে'টাই স্বাভাবিক।

মিনিট দশেক পায়চারী করে ইন্সপেক্টর গুপ্ত ঘোষণা করলে, "এ'টা যে দুর্ঘটনা সে'টা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না৷ আত্মহত্যা হতে পারে। এমন কী, খুনও হতে পারে"। আমার শ্যালক অমিয় সে'দিন সন্ধ্যে থেকে আমাদের সঙ্গেই ছিল, আমার গ্যাঁটের টাকায় কেনা হুইস্কি যতটা পেরেছে গিলেছে। বলাই বাহুল্য অমিয় ছোকরাটি হাড়বজ্জাত। কথায় কথায় বড় বড় বাতেলা এ'দিকে কাজের বেলায় লবডঙ্কা। ফিউশন রেস্টুরেন্ট চালানোর নাম করে বাপ-ঠাকুর্দার জমানো টাকাগুলো জলে দেওয়াটাই ওর প্যাশন। ইন্সপেক্টর গুপ্ত যেই বলেছে, "খুন", অমনি সে দুলে-দুলে সায় দিলে, "মার্ডার। মাই গড! জামাইবাবুর এলেম আছি মাইরি দিদি, মার্ডার হয়ে গেল? বিগ ব্রাদার দীনবন্ধু আইচ, তোমার এলেম আছে। আমাদের ফ্যামিলির জামাইদের মধ্যে ডাক্তার আছে, রঞ্জি খেলা ক্রিকেটার আছে, কিন্তু মার্ডার হওয়া কেউ এদ্দিন ছিল না৷ হোয়াট আ ডে। উই শুড অল বি প্রাউড"!

ও'দিকে আমার বৌ নীলা আপ্রাণ চেষ্টা করছিল একটু কান্নাকাটি করার। কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠছিল না। একটু সিনেমা-সিরিয়াল না দেখলে ওর চোখের জল ঠিক ফ্লো করতে চায় না। কিন্তু খুনের সন্দেহ যে একট অস্বস্তিকর ব্যাপার সে'টা বুঝতে তার অসুবিধে হয়নি৷ খুন শুনেই মোবাইল থেকে মুখ তুলে হাউহাউ শব্দে ইন্সপেক্টর গুপ্তর দিকে তেড়ে গেলো, "কী বলছেন ইন্সপেক্টরবাবু। আমার স্বামী অমন দেবতুল্য মানুষ। তার কি কোনো শত্রু থাকতে পারে? তাছাড়া ঘরে এ সময় ছিলটা কে। আমি, আর অমিয়। আর আমাদের মেয়ে বুল্টি গেছে ওর মেজপিসির বাড়ি। এর মধ্যে কে খুন করবে ওকে"? বরাবরই দেখেছি, নীলার কথার মধ্যে একটা ধারালো ব্যাপার আছে। ইন্সপেক্টর গুপ্ত একটু থতমত খেলেন৷

" ইয়ে মানে", দু'পা পিছিয়ে গিয়ে বলতে শুরু করলেন গুপ্তবাবু, "রেলিঙটা তো যথেষ্ট উঁচু, ও'টা আলোগোছে মনের ভুলে ডিঙিয়ে যাওয়াটা ঠিক.."। শুনে মনে হলো ইন্সপেক্টর গুপ্ত হুইস্কি রস থেকে বঞ্চিত৷ নয়ত মাতালের উটকো ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলার ক্ষমতা সম্বন্ধে অকারণ সন্দেহ প্রকাশ করতেন না৷ ফের আমতাআমতা করে বলা শুরু করলেন, "তবে আপনারা বলছেন যখন..নিশ্চয়ই তাই হবে৷ দুর্ঘটনা.."। গুপ্তদারোগার মনের ভিতর পাতা মাদুরের ওপর তখন আগাথাদিদি আর আর্থারদাদা হেসে গড়াগড়ি যাচ্ছেন৷

নীলা আর একরাউন্ড অশ্রুহীন হাউহাউ দিয়ে ইন্সপেক্টরের পিলে চমকে দিয়ে বললে, "এমন সোনার সংসার। আমার দীনু অকারণ সুইসাইড করতে যাবে কেন"?

ইন্সপেক্টর গুপ্ত পত্রপাঠ বিষম খেয়ে জানিয়ে দিলেন "আপনার দীনুবাবুর পোস্টমর্টেম একটা হবে..তবে বোঝাই যাচ্ছে স্পষ্ট দুর্ঘটনা"। দুর্ঘটনার আশ্বাস নিয়ে নীলা মোবাইলে স্ক্রিনে নিশ্চিন্তে ফেরত গেল৷ অমিয় টলতে টলতে এগিয়ে গেল রান্নাঘরের দিকে, ভাজাভুজি কিছু পড়ে আছে কিনা দেখতে।

এ'দিকে আমার শুরু হলো দুশ্চিন্তা৷ এত খাটুনি সব জলে না যায়৷ আমার দু'পেগ আর অমিয়র চার পেগের মাথায় মাতলমির অজুহাতে শালার গায়ে গিয়ে ঢলে পড়েছিলাম, সে আমায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়৷ অমিয়র নখগুলো জঙলি৷ আমি নিশ্চিত আমার ঘাড়ে অমন অদ্ভুতভাবে তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট আর টাটকা নখের দাগ পাওয়া যাওয়ার ব্যাপারটা পুলিশকে ভাবাবে৷ আড়ালে অমিয়র ফোন হাতড়ে কিছু গর্হিত ইন্টারনেট সার্চও করে রেখেছি, "ক্যান আ পার্সন সার্ভাইভ আফটার ফলিং ফ্রম দ্য ইলেভেন্থ ফ্লোর"৷ ইন্সপেক্টর গুপ্ত কি অমিয়র ফোন বাজেয়াপ্ত করবে না? পুলিশ কি আমার ঘাড়ে অমিয়র ধাক্কা দেওয়া আঙুলের ছাপ বা নখের দাগ খুঁজে পাবে না?
মারাত্মক টেনশন হচ্ছে৷ মারাত্মক৷ অমিয় হয়ত পুরোপুরি ফাঁসবে না, কিন্তু একবারের জন্যও সামান্যতম সন্দেহ ওর ওপর এসে পড়লেই আমার শ্বশুরমশাই ওর পিছনে ক্যাঁক করে একটা কমল মিত্র অন স্টেরয়েড সুলভ লাথি কষাবেন৷ অন্তত বাপ-ঠাকুর্দার রেস্টুরেন্টের ব্যবসাটা নিশ্চিতভাবেই অমিয়র হাতছাড়া হবে গবেটত্বর জন্য৷ আর সে ব্যবসা নিশ্চয়ই নীলা পাবে৷ ওর পাওয়া উচিৎ। নীলা সত্যিই পারবে ও ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে৷ ও অমিয়র মত অকালকুষ্মাণ্ড নয়।

বিয়ের পর এতগুলো বছরে নীলার মেজাজটা ভারি তিতকুটে হয়ে গেছে৷ বাইরে থেকে সবাই দেখে ভাববে কী'রকম জাঁদরেল স্নেহহীন নিরেট মানুষ৷ আমি জানি নীলা এমনটা ছিল না চিরকাল, আমিই ওকে যথেষ্ট ভালো রাখতে পারিনি। মিইয়ে যেতে যেতে কেঠো হয়ে গেছে একসময়৷ ওর পরিবারের পুরুষরা ওকে তেমন পাত্তা দেয়নি কোনওদিন, বিয়ের পর আমিই বা কদর করলাম কই৷ ডাক্তার সান্যাল যে'দিন রিপোর্ট দেখে আমায় জানালেন যে আমার হাতে আর বড়জোর মাসচারেক, তখনই ঠিক করেছিলাম নীলার জন্য কিছু করার শেষ চেষ্টা একটা করতে হবে৷ আশা করি ডাক্তার সান্যাল রিপোর্টটা গোপন রাখার কথাটা ভুলবেন না।

এই মুহূর্তে ইন্সপেক্টর গুপ্ত নিজের কাজে ব্যস্ত৷
বেয়াদপ অমিয় রান্নাঘরের মেঝেতে বসে পা ছড়িয়ে বেগুনি চিবুচ্ছে।
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে নীলা একমনে মোবাইলের স্ক্রিন দেখে যাচ্ছে৷ ওর মনের মধ্যে একটু ঢুঁ মেরে দেখলাম; সে'খানে একটা নিরিবিলি বারান্দার গ্রিলে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে নীলা; কলেজে পড়া নীলা৷ সে বারান্দায় ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ ইচ্ছা হল ওকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু আমি তো ইচ্ছে-অনিচ্ছে পেরিয়ে বহুদূর চলে এসেছি৷ আচমকা সেই তরুণী নীলা ঘুরে তাকালো৷ ও নির্ঘাৎ আমায় দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু আমি দেখলাম ওর দু'চোখ ঝাপসা৷

একটা শেষ চেষ্টা করে দেখলাম নীলার হয়ে৷ ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াচ্ছে সে'টা না জানা পর্যন্ত আমার দুশ্চিন্তা কাটবে না।

ছোটর সঙ্গীত

- মেজদা৷

- আবার কী হলো..।

- সব কথায় অত খেইমেই করে উত্তর দাও কেন?

- রাত্রি কত হলো সে'খেয়াল আছে? ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাস না৷ যা ভাগ।

- রাত গভীর হয়নি৷ তবে জমাট বেঁধেছে।

- এই সেরেছে৷ কাব্য ফাঁদতে এলি নাকি?

- তা ঠিক না৷ তবে গান পেয়েছে। শোনো।

- তোকে আমি ত্যাজ্যভ্রাতা করব।

- মাইরি। একটু হেমন্ত, দু'কলি মান্না৷ শুনিয়েই চলে যাব৷ পেলে তো আর চেপেচুপে রাখা যায় না।

- রাত পেরোলেই সোমবার ছোট৷ আমার অফিস, তোর কলেজ। প্লীজ।

- বেশ তো৷ এ গান শুনলে বুকে বল পাবে।

- গান না শুনিয়ে ছাড়বি না?

- তোমার মন না ভরিয়ে ছাড়ব না৷ হারমোনিয়ামটা এ'খানেই পাতি?

- আবার হারমোনিয়াম কেন৷ খালি গলাতেই তো বেশ।

- অমন দায়সারা ভাবে মিউজিক হয় না মেজদা।

- তাও ভালো আমায় তবলা বাজাতে বলিসনি।

- বলব কী করে বলো, বড়দাকে সাধ করে একটু তাল ঠুকতে বললাম৷ কান মুলে তবলা বাজেয়াপ্ত করে রেখে দিলে৷ কী ডেঞ্জারাস৷ বাবা ঠিকই বলে, বড়দা মামাদের ধাত পেয়েছি৷ রসকসহীন। ভাগ্যিস তাও সময়মত হারমোনিয়ামটা তুলে পালিয়ে আসতে পেরেছি৷ নাও, আমি মাদুর পাতছি৷ বিছানা থেকে নীচে নেমে এসো।

- হ্যাঁ রে, এই যে বাবার ধাত পেয়েছিস৷ গানের আসরটা বাবার কানের কাছে গিয়েই বসা না৷

- আরে বাবার পাশে তো মাও শুয়ে আছে। মা তো ডেফিনিটলি বাবার ধাত পায়নি৷

- শোন, আগে একটা রফি হোক বরং। হিন্দি।

- বহুত খুব। নেমে এসো।

- ছোটো৷ মনখারাপ?

- সঙ্গীত৷ সঙ্গীত আমার মনের ওপর ভর করেছে৷ এর কোনো খারাপ ভালো হয় না৷

- ছোটো৷ সুতপা তোকে রিজেক্ট করেছে?

- মেজদা। তোমার কপালে আজ সতীনাথ নাচছে। আর আড়াইশো গ্রাম মানবেন্দ্র৷ ধরি?

- ধর৷

ক্যাসিওয় নিবেদন



হাতঘড়ির ব্যাপারে আমার তেমন শখ-আহ্লাদ নেই। স্মৃতি কিছু আছে। ক্লাস এইট নাগাদ মা একটা টাইমেক্স ঘড়ি কিনে দিয়েছিল। তখন শুধু পরীক্ষার সময় ঘড়ি পরে যেতাম। কালচে সবুজ ব্যান্ড, ম্যাটম্যাটে হলদেটে ডায়াল। ডায়ালের একটা ছোট্ট খোপে তারিখ দেখা যায় - শুধু ১ থেকে ৩১য়ের মধ্যে একটা সংখ্যা; মাস বা বছর নয়। ও'টা যে আমার কী প্রিয় ছিল, পরীক্ষায় লিখতে লিখতে কতবার অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছি বাঁ হাতের কব্জির দিকে। সেকেন্ডের কাঁটা বারোরা ঘর পেরোলেই মিনিটের কাঁটায় যে সামান্য ঝাঁকুনি , সে'টা দেখে ভারি তৃপ্তি-বোধ হত। মাঝেমধ্যেই হাত থেকে খুলে রুমাল দিয়ে পুছে নিতাম। কলেজে যাওয়ার আগে উপহার পেয়েছিলাম একটা স্টিল ব্যান্ডের টাইটান ঘড়ি। ও'টায় বেশ একটা ভারিক্কি চাল ছিল। কবজিতে সে'টা আঁটসাঁট করে বাঁধা থাকতো না, সে'টাই সে স্টিল ব্যান্ডের ঘ্যাম। বছর পাঁচেক সে'টা নিয়েই দিব্যি কেটে গেছিল। এরপর বেটারহাফ একটা জবরদস্ত বিদেশী ঘড়ি দিয়েছিল, যে'টার বয়স এখন আমাদের বিয়ের থেকে মাস কয়েক বেশি। প্রমাণ সাইজের সাদা ডায়াল, সেকেন্ডের কাঁটা লাল, চামড়ার ব্যান্ড। সে ঘড়ি আমার সবচেয়ে শৌখিন সম্পত্তিগুলোর মধ্যে একটা। আজও ও'টা হাতে পরলে মনে হয় মনের মধ্যে একটু বাড়তি পালিশ যোগ হলো। ও ঘড়ি হাতে দিয়ে কোথাও দেরীতে ঢুকলে মনে হয় লজ্জায় মাথা কাটা গেল, সে ঘড়িই যেন আমায় ধমকে দেবে। অমন মখমলে জিনিস হাতে নিয়ে ব্যাকরণ ভুল করাও হয়ত ঠিক নয়, এমন তার রোয়াব। দেড়-দশক পরেও সে ঘড়ি দেমাক নিয়েই চলছে।

মাঝে বছর ছয়েক ঢুকে গেলাম ফিটনেস ট্র্যাকারে। ভালো-মন্দ নিয়ে বলার আমি কেউ নই। তবে ও জিনিসে আমার কিঞ্চিৎ উপকার হয়েছে বটে। দশ হাজার স্টেপ নিচ্ছি কিনা, যথেষ্ট ঘুমচ্ছি কিনা, হার্ট-রেট কেমন চলছে; এ'সব কতটা জরুরী কে তা বিশেষজ্ঞরাই বলবেন। তবে নিয়মিত ডেটার দিকে তাকানোয় যে'টা হয়, সচেতনতা খানিকটা হলেও বাড়ে। এ ক'বছরে হাঁটার ব্যাপারে একটা ডিসিপ্লিন আয়ত্ত করা গেছে। তা আমার ফিটনেস ট্র্যাকার সম্প্রতি খারাপ হয়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও সে'টাকে সারানো সম্ভব হলো না।

এরপর কী শখ উদয় হলো, একটা নতুন ঘড়ি কিনে বসলাম। একটা ডিজিটাল ঘড়ি, ফিটনেস ট্র্যাকার নয়। আচমকা মনে হলো হাঁটার অভ্যাসটা যখন দাঁড়িয়ে গেছে, তখন আর ফিটনেস ঘড়ির খুড়োর কলের কী দরকার (হয়ত এই ধারণাটা ক'দিন পরেই পালটে যাবে, কে জানে)। আরও মনে হলো, আমি কোনোদিন ডিজিটাল ঘড়ি পরিনি। সেই ছেলেবেলায় যেমন দেখতাম, পাড়ার দাদাদের হাতে; ক্যাসিওর ডিজিটাল ঘড়ি। তা'তে অ্যালার্ম দেওয়া যায়, অন্ধকারে একটা সুইচ টিপে ডায়ালে আলো ফেলা যায়। আর ও জিনিসের এমনই চাল যেন তা পরে অবলীলায় স্পেসশিপে ঢুকে পায়চারি করা যায়। নিজের হাতের টাইমেক্স ঘড়িকে কতবার বিবর্ণ মনে হয়েছে সে'সব ডিজিটাল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে। যা হোক, সে শখ এইবারে পূরণ করাই যায়।

আমি কিনলাম ক্যাসিওর এফ-নাইনটি ওয়ান ডাব্লু। হাজার টাকা মত খরচ হলো। ১৯৮৯ সালে এ ঘড়ি প্রথম বাজারে ছেড়েছিল ক্যাসিও, আর এ জিনিস এখনও হট কচুরির মতই বিক্রি হচ্ছে। খোদ আমেরিকার ওয়ালমার্টে এ ঘড়ি নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে, বাজারে আসার পঁয়ত্রিশ বছর পরেও। একসময় ওবামা এই ঘড়ি হাতে দিয়েছেন। আবার ইয়ে, একসময় ওসামাও এই ঘড়ি হাতে দিয়েছেন; এ ঘড়ির ব্যাপ্তি এতটাই। গত ছ'বছরে স্মার্টঘড়ি চার্জ করার একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছিল। ক্যাসিওর এই ঘড়ির ব্যাটারি নাকি বছর সাতেক চলবে। এ ব্যাপারটা ভেবে আমি মাঝেমধ্যেই হেসে উঠছি। নিজের হাসি তো নিজে সবসময় দেখা যায় না, তবে আমার ধারণা এ হাসি যথেষ্ট স্মিত। এ হাসি দেখলে বুদ্ধ আমায় পিঠ চাপড়ে দিতেন নির্ঘাত। সবচেয়ে বড় কথা, স্মার্টঘড়িতে হাজার ধরণের 'ফেসিলিটি' আছে, কিন্তু তা সবসময় চেখে দেখা হত না। অথচ এই ঘড়ির জটিল অ্যালার্ম দেওয়ার পদ্ধতিতে সড়গড় হয়ে মনে হচ্ছে কেল্লাফতে করে ফেলেছি। মাঝেমধ্যেই অ্যালার্ম সেট করছি। একটু পরে মিটিং আছে। লাগাও অ্যালার্ম। একটু পরে নেটফ্লিক্স দেখব। লাগাও অ্যালার্ম। একটু পরে ও'পাশ ফিরে শোব। লাগাও অ্যালার্ম। কিছুই ভালো লাগছে না, লাগাও অ্যালার্ম। মেজাজটা ফুরফুরে, লাগাও অ্যালার্ম। আর এ অ্যালার্ম বাজার সুমধুর পিকপিক, আহা, সঙ্গীত। আর সর্বোপরি প্রতি ঘণ্টায় একটা করে সুমিষ্ট পিক্‌, উফ্‌। কানে-প্রাণে যেন এক টুকরো স্নেহ হয়ে ঝরে পড়ে।

তা'ছাড়া এ ঘড়ি সত্যিই পালকের মত হালকা, হাতে তারকেশ্বরের সুতো বাঁধলেও তার ওজন এর চেয়ে বেশি মনে হবে। বৃষ্টিতে ভিজলে বা ঘড়ি হাতে শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে পড়লেও চিন্তা নেই। বাঘা ঘড়ি অথচ কোনও বাড়তি ঘ্যাম নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ঘড়ির একটা বোতাম টিপলে একটা ফিকে হলুদ আলো জ্বলে ওঠে। সে আলো এতটাই ফিকে যে তা'তে ঘড়ির ছোট্ট স্ক্রিনের একটা কোণাও স্পষ্ট ভাবে জ্বলে ওঠে না। তবে যতবার সেই আলো জ্বালি (দিনে চোদ্দবার জ্বেলে দেখি), ততবার মনে হয়ে ছেলেবেলার পাড়ায় ফিরে গিয়ে চৌকস পাড়াতুতো-দাদাদের ডেকে দেখাই, "এই দ্যাখো দাদারা, তোমাদের মতই ডিজিটাল ঘড়ি আমার হাতে! এই দ্যাখো আলো জ্বেলেছি। এই দ্যাখো অ্যালার্ম দিয়েছি। দ্যাখো দ্যাখো"।

মোটের ওপর, এ ঘড়ির সংস্পর্শে এসে ক'দিন বড়ই তৃপ্তিতে রয়েছি।

জ্বর



আধঘণ্টার ওপর হতে চললো, অথচ বৃষ্টি ধরার কোনো নাম নেই৷ বিপ্লব বেশ ফাঁপরে পড়ে গেছে৷ রামতনু মিত্র লেনের একটা বাড়ির জানালার মাথায় নুয়ে থাকা অ্যাসবেস্টসের নীচে দাঁড়িয়ে একটানা৷ সেলসের কাজে এ অঞ্চলে এসেছিল, এখন এই মুষলধার বৃষ্টিতে আটকে গেছে৷ অবশ্য সে ব্যাচেলর মানুষ, বাড়ি ফেরার যে সবিশেষ তাড়া আছে তা নয়। তা'ছাড়া সদ্য জ্বর সেরে উঠেছে৷ এখন আর কাকভিজে হয়ে কাজ নেই৷

জানালাটা বন্ধ, নীলরঙচটা কাঠের পাল্লা আর লোহার শিক; দু'টোরই জরাজীর্ণ অবস্থা৷ ঝমঝমে বৃষ্টি সত্ত্বেও জানালার ও'পাশ থেকে নানারকম কথাবার্তা ভেসে আসছিল৷ এক মা তার স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে পড়াশোনা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন৷ ইংরেজি ডিকটেশন শুনে মনে হলো ক্লাস থ্রি কি ফোর হবে৷ মেয়েটি চটপটে, মা তাকে ধরে ধরে আদর করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন৷ বেশ লাগছিল বিপ্লবের৷

ইংরেজির পর এলো অঙ্ক৷ বৃষ্টি তখন তুঙ্গে৷ পাটিগণিত। বৃষ্টিতে সময় নষ্টের ব্যাপারে বিপ্লবের খুঁতখুঁত ততক্ষণে কমে এসেছে৷ মা-মেয়েটির তালে তাল মিলিয়ে মনে মনে যোগ-বিয়োগে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে৷ আচমকা এক পুরুষকণ্ঠ এসে ছন্দে সামান্য বিঘ্ন ঘটালো৷
"মিউ, পড়তে বসেছিস বাবু? অঙ্ক করছিস? ভেরি গুড৷ সোনামেয়ে"।

বৃষ্টির ছাঁটে জামার ডান দিকটা ততক্ষণে ভিজতে শুরু করছে৷ কিন্তু বিপ্লব সবিশেষ পাত্তা দিলে না৷ বেশ লাগছে কিন্তু৷ বাচ্চা মেয়েটার ডাকনাম তা'হলে মিউ। কী সুন্দর৷ কী মিষ্টি৷ এখন নিশ্চয়ই বাপ-মা-মেয়ে মিলে আড্ডা বসবে। অঙ্কের পাশাপাশি থাকবে বাবা-মায়ের চা, মিউয়ের বোর্নভিটা৷ বাবা কি বাড়ি ফেরার পথে নিমকি-টিমকি কিছু নিয়ে এসেছেন? তবে তো আসর জমজমাট।

হুট করেই কল্পনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল৷ বিপ্লব আচমকা শুনতে পেলে মা যেন একটু ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলছেন, "মিউ, তুমি পাশের ঘরে যাও৷ যাও বলছি৷ যাও! না একটু পড়ে নয়! এখুনি যাও। বড্ড বেশি কথা বলো তুমি। বললাম না এখুনি যাও"! মায়ের গলার হঠাৎ-দাপটে বিপ্লব নিজেই যেন কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে পড়লো। অস্পষ্ট মৃদু স্বরে কিছু একটা বলতে চাইছিল হয়ত মিউ, তারপর তার কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গেল৷ ঢোক গিললো বিপ্লব।

মহিলার কণ্ঠস্বর থেকে আদুর মা সরে গিয়ে কেমন একটুকরো ইস্পাত এসে ঠেকলো৷
"কতবার তোমায় বলেছি, ভরসন্ধ্যেবেলা বাড়িতে না আসতে। মিউ ঘুমোনোর আগে কেন আসো তুমি? তুমি জানো না এতে ওর কত ক্ষতি.."!

আচমকা সে পুরুষ কণ্ঠ ছোবলের মত এসে পড়লো বিপ্লবের কানে৷ " শাটাপ! হরির লুটের মত টাকা দিচ্ছি কি মাগনায়? আমার যখন খুশি আসব! সাতসকালে আসব, ভরদুপুরে আসব৷ তোর মত মেয়েমানুষের মুখচোপা আমি শুনব কেন"?

শিলাবৃষ্টি শুরু হয়েছে ততক্ষণে৷ কতদিন পর বিপ্লব শিলাবৃষ্টি দেখল৷ শেষ দেখেছিল পাণ্ডুয়ার বাড়িতে। মাধ্যমিক দেওয়ার পর এক দুপুরবেলায়, মা তখনও বেঁচে৷ দু'হাত ভরে শিল কুড়িয়ে ছাত থেকে নেমে এসেছিল মা, ভিজে সপসপে, একমুখ হাসি। 'দ্যাখ বাবু দ্যাখ, বরফকুচি', মায়ের হাত থেকে একটা টুকরো তুলে নিয়ে কী আনন্দই না পেয়েছিল বিপ্লব৷

বিপ্লবের জ্বরের ভয় ততক্ষণে উবে গেছে৷ একছুটে বৃষ্টি মাথায় বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল সে।

বই পড়া ক্রিকেট দেখা



অরিন্দমদার সঙ্গে কথা হচ্ছিল বই পড়া আর ক্রিকেট দেখা নিয়ে৷ সুবিধের ব্যাপার হলো, আমাদের দু'জনেরই সাহিত্যজ্ঞান আর ক্রিকেটবুদ্ধিতে আদৌ তেমন গভীরতা নেই; যে'টা আছে সে'টা হলো মুগ্ধতা। এই দু'টো ব্যাপারেই মজে যেতে পারলে যে কী প্রবল আনন্দ অনুভব করা যায়; সে'টা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল৷ ঘরে ভাজা ভালো শিঙাড়ার ওই একটা গুণ; আড্ডিয়েরা যতই খেলো হোক না কেন, আড্ডা অতি সহজেই ধারালো হয়ে ওঠে৷

আড্ডা শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে, সেই আহ্লাদ গিয়ে গড়িয়ে পড়ল ক্রিকেট বিষয়ক বইয়ে। তারপর কী'ভাবে যেন মতি নন্দী হয়ে শান্তিপ্রিয় বন্দোপাধ্যায়ে নেমে ছেলেবেলায় পড়া গল্পের বইয়ে এসে পড়লো। আমরা বলছিলাম যে একবার বই পড়া বা ক্রিকেট দেখায় ডুব দিতে পারাটা যোগব্যায়ামের মত৷ অরিন্দমদা আমার ভাগের একটা শিঙাড়া খানিকটা ভেঙে নিয়ে একটা জরুরী কথা বললে, "ক্রিকেট বা বই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বুঝলি তো। আদত ব্যাপারটা হলো ডুব দিতে পারায়৷ যে কোনো বিষয়ে এক মিনিটের জন্যও ডুব যেতে বলে যে'টা দরকার সে'টা হলো সেল্ফ-ডিসিপ্লিন৷ কোনো কিছুকে দরদ দিয়ে কদর করতে হলে এই সেল্ফ-ডিসিপ্লিন অত্যন্ত জরুরী। অন্যের চাপিয়ে দেওয়া ডিসিপ্লিনে হাড় জ্বলে যায়, কিন্তু নিজের ভালো লাগাকে ডিসিপ্লিনে বেঁধে ফেলায় যে তৃপ্তি, তা তুলনাহীন"। এরপর বেহিসেবের শিঙাড়াটা পুরোটাই সাফ করে অরিন্দমদা যোগ করলে, "আরো একটা ব্যাপার আছে জানিস। রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্টের পরোয়া করলে সেই প্রোভার্বিয়াল ডুব দেওয়া যায় না৷ ইন ফ্যাক্ট, এ বই পড়ে কী হবে, ও ম্যাচ দেখে কী হবে; অত অঙ্ক করে বসলে সারাক্ষণ মনের মধ্যে খচখচ চলে। কিন্তু হাভাতের মত গা ভাসিয়ে দিতে পারাটাই হচ্ছে আদত থেরাপি"।

ম্যাটিলডার বাস রোল্ড ডাহলের কল্পনায়, কিন্তু ভদ্রলোকের লেখার গুণেই ম্যাটিলডা মেয়েটি জীবন্ত; প্রাণোচ্ছল। ছোট্ট ম্যাটিলডার জীবন না-পাওয়ায় ভরপুর অথচ সে'সব না-পাওয়া ছাপিয়ে ম্যাটিলডা আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে ডিকেন্সে৷ ম্যাটিলিডা জিনিয়াস বা সুপারগার্ল; বইয়ের মূল কথা সে'টা নয়। দু:খে জেরবার না হয়ে পুঁচকে একটা মেয়ে ডিকেন্সে ডুব দিয়ে আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে; আসল রূপকথা রয়েছে সেইখানে। অরিন্দমদার কথা শুনে মনে হলো অতটুকু মেয়ে ইয়াব্বড় সব বই পড়তে পারছে; সে'টা অবাক কাণ্ড বটে কিন্তু ম্যাজিক নয়৷ ম্যাজিক হলো ম্যাটিলডা এই যে মিসেস হ্যাভিশ্যাম, এস্টেলা আর পিপের জগতে হারিয়ে গিয়ে আনন্দ পাচ্ছে, সেই ব্যাপারটায়। আবার আহমেদনগর কেল্লায় বন্দী থেকে নেহেরু যতটুকু লেখালিখি করেছেন, সে'গুলো পড়েও স্পষ্ট যে ম্যাটিলডার মতই ভদ্রলোক পড়াশোনার ডিসিপ্লিনে ডুব দিয়ে নিজেকে মজবুত করছেন। সেই পড়া এবং লেখা কতটা ভালো এবং কতটা মন্দ হলো, সে হিসেবে না গিয়ে প্রসেসে গা ভাসাচ্ছেন।

আমি বা অরিন্দমদা ম্যাটিলডা বা জহরলালের নখের যোগ্য নই, তবে সামান্য গা-ভাসানোর সুযোগ আমাদেরও আছে, সে আনন্দ কম কীসে। সে আনন্দেই সে'দিন সেকেন্ড রাউন্ড শিঙাড়া ভাজতে গেছিলাম হয়ত।