Thursday, January 4, 2024

"আমার"




কোনো ভালো লাগার জিনিসকে বাড়তি অবাস্তব প্রশংসায় ভাসিয়ে দেওয়ার মধ্যে একটা মারাত্মক তৃপ্তি রয়েছে৷ 

এই যেমন অকারণ একটানা বলে যাওয়া যে চন্দ্রবিন্দুর 'সোনামন'য়ের মত সুন্দর গান গোটা দুনিয়ায় আর নেই৷ ওই গানে রোদ্দুরে চাঁদিফাটা দিনকেও মিষ্টিভাবে মেঘলা মনে হয়৷ ঢাকুরিয়া ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে, কানে ইয়ারফোন গুঁজে সে সুর শুনলে মনে হয় মুখে সমুদ্রের হাওয়ার ঝাপটা লাগছে৷ 

তেমনই।

বেলিয়াতোড়ের লাল্টুর চা সেই কবে খেয়েছি, এখনও সবার কলার টেনে বলে বেড়াই যে অমন চা খেলে নির্ঘাৎ আড়াই মাস আয়ু বাড়ল।

ছোটোবেলার স্কুলের পাশের নিরিবিলি রাস্তা দিয়ে শীতের সন্ধেবেলা হাঁটার সময় মনে হয় আমার মত জবরদস্ত ইয়ারদোস্ত এ দুনিয়ায় আর কেউ পেয়েছে কি?

পুরনো কলকাতাইয়া গলির জীর্ণ মেসবাড়ির জানলা ঘেঁষা চৌকিটায় গা এলিয়ে দিয়ে মনে হত "এই হলো গিয়ে রাজার মেজাজ, জমিদারি ঘ্যাম আর লাটসাহেবি কেত"।

এমন কত অবাস্তব প্রশংসার ঝড় ওঠে মাঝেমধ্যেই। উচ্ছ্বাসের পারদ সামান্য নেমে এলে একটু লজ্জা পাই৷ তবে সে ক্ষণিকের লজ্জা। পরক্ষণেই গর্জে ওঠা, "ও'টা আমার গান৷ আমার চা। আমার রাস্তা। আমার জানালার পাশে আমার বিছানা। ও'গুলো আমার। ও'গুলোয় কোনো খুঁত নেই, থাকতে পারে না।।

যদ্দিন অযৌক্তিক এই "আমার" গুলো আছে, তদ্দিনই।

উপাসক



- ফুচকা-দা'ভাই৷ খাওয়ান দেখি। 

- ঝাল হবে?

- তা হবে। তবে ইয়ে, ফ্রেশ আলু মাখুন না৷ 

- আলুমাখা আছে তো৷

- আছে৷ তবে৷ যদি ফ্রেশ মাখা হয়, দারুণ লাগবে৷ জানেন। অনুরোধ৷ 

- দারুণ লাগবে? বেশ তবে মাখি।

- হে হে৷ থ্যাঙ্কিউ।

- একটু ভালো করে..একটু কষে মাখবেন দাদাভাই..ডুমো ডুমো আলুর টুকরো মুখে পড়লে ফুচকা চেবানোর ফ্লো নষ্ট হয়ে যায়৷ 

- আপনি বেশ সমঝদার মনে হচ্ছে।

- আপনাদের মত গুণীমানুষদের সমাদর করার চেষ্টা করি। এ'টুকুই। কিন্তু শুনুন..ছোলাসেদ্ধ দেবেন না প্লীজ৷ তা'তে আলুমাখার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে।

- আলুমাখার কীসের কী হবে?

- ওই৷ ছোলাসেদ্ধ দেবেন না দাদাভাই।

- পেঁয়াজকুচি? 

- বাহ্৷ দিব্যি কুচিয়েছেন দেখছি৷ মিহি, কনসিস্টেন্ট। দিন না, দিন৷ তবে অল্প।

- লঙ্কাকুচি?

- অবশ্যই। তবে লঙ্কাটা ফ্রেশ কেটে নেবেন? একটা লঙ্কা কুচিয়ে দিলেই হবে।

- হুম৷ বেশ৷ ঠিক আছে। এই যে।

- আসলে কাঁচালঙ্কা তো ঝালের জন্য নয়৷ তার জন্য রয়েছে লঙ্কাগুঁড়ো আর কাঁচালঙ্কা বাটা। সুবাসের জন্য কাঁচালঙ্কা; সে'টা টাটকা কুচোনো হলে যে তাজা গন্ধ..।

- আর কোনো ফরমায়েশ? 

- ফরমায়েশ বলবেন না দাদাভাই৷ এ'টা ওই, মিনতি করি পদে ধরণের সিচুয়েশন৷ মিনতিটা হলো; তেঁতুলজল সামান্য, আর অতি অল্প গন্ধরাজ৷

- সে তো থাকবেই।

- সেই তো৷ তবে, পরিমিত।  আপনি ঝালের ব্যাপারে বরং আর একটু চালিয়ে খেলতে পারেন৷ আর অল্প লঙ্কাবাটা..এই জাস্ট এক চিমটি..।

- এতটুকু?

- আর সামান্য কম..। না না..বেশি কমে গেল..।

- এ'বার?

- পার্ফেক্ট। আর ইয়ে৷ নুনটা সামান্য কম দিন৷ একটু বিটনুন পাঞ্চ করুন৷ বাটিতে আছে দেখছি তো।

- অল্প নুন আর অল্প বিটনুন?

- সবই ব্যালেন্সের খেল।

- এ'বার হয়েছে?

- আরে দাদাভাই আমি বলার কে। শিল্পী তো আপনি৷ আমি তো উপাসক।

- এ'বার তা'হলে দিই? ফুচকা?

- গোটা ব্যাপারটা আর এক রাউন্ড মেখে নেবেন? মারাত্মক স্মুদ হবে ব্যাপারটা৷ 

- শুনুন না দাদা৷ আপনি এ'দিকে আসুন৷ এই যে গামলা। নিজে মেখে নিন৷ তৃপ্তি পাবেন।

- গ্যালারিতে বসে "উই ওয়ান্ট সিক্সার" বলা হুজুগে মানুষকে ব্যাট হাতে পিচের দিকে ঠেলে দিতে নেই। খাওয়ান দাদা। খাইয়ে যান।

- মাইরি৷ আপনার মত দু'টো খদ্দের দিনে পেলে ফুচকার ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।

- ও দাদাভাই৷ আমায় দু'টো কটু কথা বলতে হয় বলুন৷ কিন্তু নিজেকে ফুচকা ব্যবসায়ী বলে গুণগ্রাহীদের ব্যথা দেবেন না৷ হেমন্তবাবু কি সঙ্গীত-ব্যবসায়ী ছিলেন? মাইকেল মধুসূদন কি পদ্য-ব্যবসায়ী?

- বাটি এগিয়ে দিন দাদা৷ আর দেরী নয়। প্লীজ।

Tuesday, January 2, 2024

অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরীর ল্যান্ডিং



স্পেস-ক্র্যাফট ল্যান্ড করেছে আড়াই ঘণ্টা আগে। এক্কেবারে মাখনের মত ল্যান্ডিং, অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরীকে সামান্য বিষমও খেতে হয়নি। বেশ চনমনে মেজাজে ককপিটের মধ্যে খানিকক্ষণ ইউরেকা-মারদিয়াকেল্লা-উরিউরিবাবা-কীদারুণ বলে নাচানাচি করবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু স্পন্ডেলাইসিসের জ্বালাতনের কথা ভেবে লাফালাফির ব্যাপারটা বাদ দিলেন চৌধুরীবাবু। স্পেস-ক্র্যাফট নেভিগেশন কনসোল স্পষ্ট বাতলে দিচ্ছে যে ল্যান্ডিং একদম খাপেখাপ হয়েছে। তিনি এসে পড়েছেন গ্রহ কোড ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২-তে, এই গ্যালাক্সির নাম উরগেন। পৃথিবী থেকে উড়ে আসতে সময় লেগেছে সতেরো মাস বাইশ দিন সতেরো ঘণ্টা উনিশ মিনিট তেত্রিশ সেকেন্ড। কলকাতা স্পেস সেন্টারে বসে হিসেব কষে যা দেখে গেছিল, তার থেকে রীতিমত আড়াই মিনিট কম। ফিরে গিয়ে একটা মেডেল-টেডেল পাওয়া যেতে পারে, কপালে থাকলে সরকারের থেকে কোনও বাহারে খেতাব আর তার পাশাপাশি স্পেশ্যাল বখশিশ হিসেবে মিক্সারগ্রাইন্ডার বা সরবতের গ্লাসের সেটও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পৃথিবীতে সুখবরটা পাঠানোর আগে একটু এই নতুন গ্রহে নেমে হাঁটাহাঁটি করে নেওয়া দরকার। জরুরী কিছু ডেটা আর স্যাম্পল সংগ্রহ হয়ে গেলেই বাহাদুরির ব্যাপারটা স্পেস-সেন্টারে জানিয়ে দেওয়া যাবে'খন। লোকে জানুক, অরবিন্দ চৌধুরী এলেবেলে অ্যাস্ট্রনট নয়। হিসেব অনুযায়ী ঘণ্টা-চারেকেই কাজ সেরে ফেলা যাবে। তারপর স্পেস-ক্রাফটের সিঁড়ি গুটিয়ে দুগগা বলে বাড়ির দিকে রওনা হওয়া। বেরোনোর আগে গ্রহটার একটা নাম দিয়ে যেতে হবে। গিন্নীর অনারে এ গ্রহের নাম সুতপাস্ফেয়ার দেওয়ার ইচ্ছে অরবিন্দবাবুর। আশা করা যায় এই রোম্যান্টিক চমকের ফলে বিবাহবার্ষিকীর খরচ কিছুটা কমানো যাবে।

ফ্রুটজ্যাম আর পার্মাফ্রেশ পাউরুটির চার স্লাইস খেয়ে টেস্টিং আর স্যাম্পল কালেকশন কিট গুছিয়ে নিলেন অরবিন্দবাবু। এক্সিট ডোরের দিকে এগোনোর আগে এনভারোনমেন্ট-চেক মনিটরের দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ অবাক হতে হলও অরবিন্দবাবুকে। এ গ্রহের বাতাস-টাতাস যে অনেকটা পৃথিবীরই মত, বিজ্ঞানীদের হিসেব তেমনটাই আভাস দিয়েছিল বটে। এ অবশ্য নতুন কিছু নয়, আজকাল গোল্ডিলক কন্ডিশনস সমেত প্রচুর গ্রহেই পৃথিবীর মানুষ ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে। বহু এলিয়েন প্রজাতির চোখ ধাঁধানো সভ্যতা সম্বন্ধে পৃথিবীর মানুষ এখন সবিশেষ ওয়াকিবহাল। এই উরগেন গ্যালাক্সির ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ গ্রহে যে কী সারপ্রাইজ অপেক্ষা করে আছে তা অরবিন্দবাবুর জানা নেই; তবে মনিটরের দিকে তাকিয়ে গ্রহের এ অঞ্চলের পলিউশন কাউন্ট দেখে চমকে যেতেই হলও; যেন অবিকল পৃথিবী।

তবে কি এই প্রথম মানবসভ্যতার কাছাকাছি কিছু নজরে পড়তে চলেছে? উফ্‌, ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।

পিলে চমকানো কিছু আবিষ্কার করতে পারলে কালীঘাটে জোড়া পাঁঠা বলি দেবেন ফিরে গিয়ে, এমন প্রার্থনা করেই স্পেস-ক্র্যাফটের দরজা খুললেন অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। 

***

মিনিট দুয়েকের মধ্যে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। একের পর এক চমক। আর এক বিশ্রী আতঙ্ক যা বর্ণনা করার ভাষা অরবিন্দবাবুর জানা নেই।

স্পেস-ক্র্যাফটের দরজা খুলতেই অদ্ভুত কতগুলো জিনিস ধাক্কা দিল ভদ্রলোককে।

প্রথমত, গন্ধ। আলুর চপ, এগরোল, ঘাম, পারফিউম, আর ডিজেল পোড়া ধোঁয়ার ককটেল। এ ককটেল তার সুপরিচিত।

দ্বিতীয়ত, শব্দ। এ'খানেও রকমারি ব্যাপারস্যাপার; হাজার-হাজার মানুষের হইহই আর সে হইহইয়ের সিংহভাগই যে মোটা-দরের কলকাতাইয়া বাংলা, তা বলে দেওয়ার দরকার নেই। এমন কি মাইকে দু'বার ঘোষণাও শুনতে পেলেন; "বজবজ থেকে চোদ্দ বছরের বাপটু সান্যাল মেলায় এসেছেন ছোটদাদু হরিহর সান্যালের সঙ্গে। বাপটু হারিয়ে গেছে, ছোটদাদুর ধারণা বাপটু ছোটদাদুকে ফাঁকি দিয়ে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে। বাপ্টু তুমি যে'খানেই থাকো আমাদের কমিট অফিসের সামনে চলে এসো। তোমার ছোটদাদু রেগে বোম হয়ে এ'খানে পায়চারি করছেন"। দূরে ফাটা মাইকে কুমার শানুর গান ভেসে আসছে - "অমর শিল্পী তুমি কিশোরকুমার, তোমাকে জানাই প্রণাম"।  আর সব ছাপিয়ে; স্পেস-ক্রাফটের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের করতালি আর উল্লাস। পিলে চমকে কানে তালা লেগে অরবিন্দবাবুর সে এক বিশ্রী অবস্থা।

তৃতীয়ত, একটা হাড়-হিম করে দেওয়া দৃশ্য। অরবিন্দবাবু নিশ্চিত যে তার স্পেস-ক্র্যাফট এসে নেমেছে কলকাতার মিলন-মেলা প্রাঙ্গণে। নির্ঘাত মরশুমি আনন্দমেলা বসেছে। 

এত বড় ভুল হলটা কী করে? পকেট থেকে ইন্টার-গ্যালাক্টিক নেভিগেশনট্র্যাকার বের করে দেখলেন - কী আশ্চর্য, হিসেবে কোনও ভুল নেই। তিনি রয়েছেন উরগেন গ্যালাক্সির ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ গ্রহে। কিন্তু, এ'সব তবে কী?

ঠাহর করার আগেই অরবিন্দবাবু বুঝতে পারলেন যে মেলার ঠিক মাঝখানে এসে নেমেছেন তাঁর স্পেস-ক্র্যাফট। আর মেলা-কমিটির করিতকর্মা লোকজন একটা টিকিট কাউন্টার বসিয়েছে।  সর্বনাশ, লোকে লাইনে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্পেস-ক্র্যাফটে ঢুকবে বলে। চারজন ছোকরা ছেলে চোঙা হাতে ক্রমাগত চিল্লিয়ে যাচ্ছে; "আপনার ঠেলাঠেলি করবেন না। হাত টিকিট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকুন। শিগগিরি স্পেস-ক্র্যাফট ভ্রমণ শুরু হবে। লাইন ভাঙবেন না, লাইন ভাঙলেই টিকিট ক্যান্সেল। আর হ্যাঁ, দয়া করে মুড়ি বেগুনির ঠোঙা বা এগরোল হাতে স্পেস-ক্র্যাফটে প্রবেশ করবেন না। সেলফি নিতে গিয়ে অযথা ভিড় বাড়াবেন না"। 

গলা শুকিয়ে এলো অরবিন্দবাবুর। এ কী কাণ্ড! কিন্তু চট করে যে স্পেস-ক্র্যাফটে ঢুকে দরজা বন্ধ করবেন সে উপায়ও নেই, পা'দুটো একতাল লোহার মত ভারি। এমন সময় স্পেস-ক্রাফটের সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলেন এক মধ্যবয়স্ক হেডমাস্টার-গোছের এক ভদ্রলোক, বুকপকেটে ব্যাজ আঁটা, তা'তে লেখা, "অলোক হালদার, সভাপতি, কলকাতা আন্তর্জাতিক মেলা কমিটি। 

***

- আ...আ...আমি...।
- আপনি অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। ওয়েলকাম টু মিলন-মেলা প্রাঙ্গণ ইন কলকাতা, প্ল্যানেট পৃথিবীজ গ্রেটেস্ট সিটি।

- ইয়ে, আপনার কিছু ভুল হচ্ছে...অলোকবাবু। আমি এসেছি পৃথিবী নামক গ্রহের কলকাতা নামক শহর থেকে।

- হে হে। আপনি তেমনটা ভাবতেই পারেন। কিন্তু আমাদের কাছে আপনি এসেছেন গ্রহ কোড ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ থেকে।

- না না, সে'টা আপনাদের গ্রহের পোজিশন। আমাদের গ্রহ পৃথিবীর পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে।

- হে হে হে...আপনার কাছে যা সোজা, আমাদের কাছে তাই উলটো। অসুবিধে কীসের। তবে আপনার অনেক ধকল গেছে। আসুন, মেলা কমিটির অফিসে বসে বিশ্রাম নেবেন। আপনার জন্য ফাইভ স্টার অ্যাকোমোডেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে সে'খানে। আর ইয়ে, আমাদের এমএলএ বিপিনবাবু আসছেন স্পেস-ক্র্যাফট বিলাসভ্রমণ উদ্বোধন করতে। তিনি খুব আগ্রহী আপনার সঙ্গে আলাপ করতে।

- আমার মাথাটা কেমন গুলোচ্ছে অলোকবাবু। আমি অ্যাস্ট্রনট। আমার অনেক কাজ। আর স্পেস-ক্র্যাফটে এত লোক ঢোকানোটা কি ঠিক হবে?

- ও মা! যে'দিন আপনি যাত্রা শুরু করলেন, সে'দিনই গোটা শহর জুড়ে পোস্টার পড়ে গেল। এ'সব ইন্টার-গ্যালাক্টিক মুভমেন্ট আমরা ট্র্যাক করে থাকি কিনা। আপনি এ পাড়ায় পায়ের ধুলো দেবেন খবর পাওয়ায় মেলা বসার পারমিশন হয়ে গেল। ইকনোমি বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করল। আপনি সময়মত এসে পৌঁছনোয় আমরা খুব খুশি।

- আমার মাথাটা বনবন করে ঘুরছে যে।

- ডোন্ট ওরি। মেলা তো ক'দিন মাত্র। ক'দিন না হয় রিয়েল কলকাতা উপভোগ করে যান।

- রিয়েল কলকাতা যে রিয়েল পৃথিবীতে রয়েছে অলোকবাবু।

- রিয়েল এ'টাই স্যার।

- এ তর্কের কোনও মানে হয়? এ'সব বাদ দিন। আমায় ফেরত যেতে হবে।

- আপনি ভয় পাচ্ছেন অরবিন্দবাবু। ভয় পাচ্ছেন সেই ভয়াবহ আবিষ্কারের। আপনার পৃথিবী আদত পৃথিবী নয়, আপনাদের কলকাতা আদত কলকাতা নয়; এ ধাক্কা যে মারাত্মক ধাক্কা। তবে মনখারাপ করবেন না। অলটারনেট কলকাতা তো এ দুনিয়ায় কম নেই। গত বারো বছেরো আপনি এ নিয়ে সাত নম্বর মক্কেল। এর আগের ছ'জন নাকে খত দিয়ে স্বীকার করে গেছেন যে আসল কলকাতা এ'খানেই। 


***

মেলা-কমিটির অফিসের সোফায় গা এলিয়ে পড়েছিলেন অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। তাঁর চোখমুখ পরিতৃপ্ত, ঠোঁটে এক রোমান্টিক হাসি। আনন্দমেলা দু'দিন আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু মেলা কমিটির আতিথ্যে কোনও ঘাটতি পড়েনি। অলোক হালদার নিজে এ'বেলা ও'বেলা তাঁর খোঁজখবর নিয়ে যাচ্ছেন। ফিরতে হবেই, কিন্তু অরবিন্দবাবুর বিশেষ তাড়া নেই। এ'খানকার ক্যালেন্ডারে এখন মার্চের সতেরো তারিখ। আর অরবিন্দবাবুর সামনের টেবিলে থরে থরে সাজানো খাঁটি হাইকোয়ালিটি এবং টাটকা নলেন গুড়ের সন্দেশ। যে পৃথিবীর কলকাতায় নির্ভেজাল নলেনের বাস বছরে সাড়ে চার মাস, তার পৃথিবীত্ব ও কলকাতাত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করাটা মুর্খামি; এ সত্য অস্বীকার করার ক্ষমতা অরবিন্দবাবুর নেই। হপ্তা-খানেক পর অরবিন্দবাবু ফিরে যাবেন গ্রহ ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২-তে, যে'খানে সুতপা তাঁর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। স্পেস-ক্র্যাফটের কন্ট্রোলড পরিবেশে আদত কলকাতার কিলো দশেক টপ-ক্লাস নলেন সন্দেশ নিয়ে ফিরতে কোনও অসুবিধেই হবে না। বিবাহবার্ষিকীতে গিন্নীর জন্য এর চেয়ে ভালো উপহার আর কীই বা হতে পারে। 


(ছবিটা রেয়া আহমেদের আঁকা। বংপেন ৭৫-য়ের জন্য এ'টা আর আরো জমজমাট কিছু স্কেচ এঁকেছিল সে) 

তিয়াত্তর নম্বর হ্যাপি নিউ ইয়ার

বাহাত্তর নম্বর "হ্যাপি নিউ ইয়ার" আদানপ্রদান পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। মদনবাবু একগাল হেসে ঘাড় দুলিয়ে সামান্য ঝুঁকে বিগলিত ভঙ্গীতে বলে উঠছিলেন, "হে-হে-হে-সে-হে-হে-ম টু-হু-হু-হু ই-উ-হু-হু"। রাস্তায় দেখা হওয়া পাড়ার এমএলএ-য়ের পেয়ারের মাস্তান হুব্বা দত্ত বা অফিসের বারান্দায় মুখোমুখি হওয়া বড়সাহেব চৌহানের মত কেউকেটা হলে দরদ দিয়ে জুড়ে দিয়েছেন, "উইশ ইউ আ ফ্যান্টাস্টিক ট্যুয়েন্টি ট্যুয়েন্টি ফৌর"। সবই জ্যামিতির হিসেবে চলছিল। ব্যালকনির ওপার থেকে রাহাবাবু, মর্নিংওয়াকে লাফিং ক্লাবের দস্যু সদস্যরা, কাটোয়া লোকালের ডেলিপ্যাঞ্জার ক্লাব, অফিসের ইয়ারদোস্ত; বাহাত্তরখানা নিউইয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় দিব্যি ঘটেছে।

গোলমাল বাঁধল তিয়াত্তর নম্বর 'হ্যাপি নিউ ইয়ারে' এসে। রোজকার মত অফিস থেকে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডের কাছে পিন্টুর পানের দোকানে দাঁড়িয়ে একটা খয়েরছাড়া সাদাপান দিতে বলে গোল্ডফ্লেক ধরিয়েছিলেন। খদ্দেরদের ভীড় কম থাকলে পিন্টুর সঙ্গে সামান্য গপ্পগুজব চলে যতক্ষণ না হাওড়ার মিনি আসছে। আজ যে কী হলো, পানটা খিলি করে এগিয়ে দিতে দিতে পিন্টু বলে বসলে, "আসুন মদনদা, হ্যাপ্পি নিউ ইয়ার"।

মদনবাবুর বলার কথা ছিল, "হ্যাপি নিউ ইয়ার টু ইউ টু পিন্টু"। কিন্তু মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, "পিন্টু, বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না জানো"!

খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল পিন্টু, ভাব দেখালো যেন শুনতে পায়নি। কিন্তু এই তিয়াত্তর নম্বর 'হ্যাপি নিউ ইয়ারের' চাপে মদনবাবুর মাথাটা কেমন যেন একটু ঘেঁটে গেছিল।

- তুমি আদর করেই বলেছ হ্যাপি নিউ ইয়ার। সে'টা আমি বুঝেছি পিন্টু।

- হে হে...আপনি...।

- কিন্তু জানো পিন্টু, হ্যাপি-ট্যাপির বিশেষ কিছু নেই।

- অ। মনটন খারাপ নাকি মদনদা? শরীরটরীর?

- শরীর মজবুত আছে। কোলেস্টেরলের গ্যারেন্টি নেই অবশ্য। গতমাসে টেস্ট করিয়েছিলাম। ডাক্তার নস্কর বলে দিয়েছেন মটন খেয়ে ওঁর চেম্বারে ঢুকলে ঠ্যাঙ ভেঙে দেবেন। তবে এ'ছাড়া তেমন ইয়ে নেই। মনটা ততটা মজবুত হয়ত নেই জানো। অমন নড়বড়ে মন নিয়ে মিছিমিছি নিউ ইয়ার উইশ করে গেলাম বটে অনেকগুলো আজ। গুনে গুনে বাহাত্তরটা। কারুর ভালো চেয়ে উইশ করিনি জানো পিন্টু? কী বিষ লোক ভাবো আমি।

- ছি ছি মদনদা। অমনভাবে ভাবছেন কেন!

- এই তুমি...তুমি এত আদর করে রোজ পান খাওয়াও...তোমায় মিছিমিছি উইশ করতে ইচ্ছে হলো না।

- বেশ তো। আমায় না হয় মন থেকেই বলুন, হ্যাপ্পি নিউ ইয়ার। নিন, বলে দিন।

- সে'খানেই তো সমস্যা ভাইটি। নিজের মেজাজ এমন খিঁচড়ে থাকে, অন্যর জন্য মন থেকে ভালো কিছু চাইতে ইচ্ছে করে না।

- তা'হলে থাক না। ব্যস্ত হচ্ছেন কেন।

- পিন্টু, আমার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না।

- আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?

- ওহ। এদ্দিন পান খেলাম। এত গল্প করলাম; ক্রিকেট পলিটিক্স ইলিশের দাম কত কী। এ'সব বলা হয়নি। আমার বাড়িতে আমি আছি। আর আমার এক পিসেমশাই আমার সঙ্গে থাকেন। সম্ভবত নিজের পিসেমশাই নন। কী'ভাবে যেন লতায় পাতায় জড়িয়ে গেছি। তাঁরও কেউ নেই, আমারও...। কেউ না থাকাটাই আমাদের সম্পর্ক।

- বে-থা?

- এককালে একটা বিয়ে করেছিলাম। টেকেনি। আমারই দোষে জানো, ওই যে বললাম। মহাবিষ চীজ আমি। সে বেচারি পালিয়ে বেঁচেছে। সে যাওয়ার পর বছর দশেক ভাবলাম সব তারই দোষ, বদমাইস মেয়েমানুষ। তারপর টের পেলাম ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট আমার মধ্যে।

- ইয়ে, মদনদা...আপনার শরীর ভালো আছে তো?

- বিয়ের আসবাব সে কিছুই নিয়ে যায়নি। এমন ছ্যাঁকা খেয়ে সরে পড়েছে যে ও'সবের দাবী জানাতে আসারও সাহস পায়নি। সেই থেকে-যাওয়া আসবাবের মধ্যে একটা ঢাউস ড্রেসিং টেবিল আছে জানো। তার ইয়াব্বড় আয়না। ও'টায় আমি ভূতের ভয় পাই। আমার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না যে।

- মদনদা। ও মদনদা। আপনি একটু দেরী করে বাড়ি ফিরলে পিসেমশাই চিন্তা করবে না তো?

- টেরই পাবে না। লতা এসে খাবার দিয়ে যাবে, তা'হলেই হবে। খিদের কষ্ট টের না পেলে তিনি আমায় চিনতে পারেন না। খোঁজও করেন না।

- আপনি একটু ওই বেঞ্চিতে বসবেন? আধঘণ্টা নেব, তার মধ্যে ঝাঁপ নামিয়ে আসছি।

- তুমি দোকান বন্ধ করে দেবে?

- বছরের পয়লা, বেশিরভাগ অফিসই তো বন্ধ। আমার বাড়ি মেচেদায়। এখানে একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া করে থাকি। অবশ্য সে'টাকে গুমটি বললেও চলে। সে'খানে রোজ সন্ধ্যেবেলা তাসের আড্ডা বসে। রামি। আপনার চলে?

- রামি? চলে।

- চার নম্বর মক্কেল, স্ক্র্যাপের দালাল বল্টু সামন্ত দিনতিনেকের জন্য কলকাতার বাইরে। আপনি সঙ্গ দিলে আজকের সন্ধেটা জমে যাবে।

- ইয়ে, এ'সবের আবার কী দরকার..।

- রুটি, মুর্গির ঝোলে আপত্তি নেই তো মদনদা?

- দ্যাখো দেখি কাণ্ড, আমি উড়ে এসে তোমাদের ঘাড়ে উঠে বসলাম।

- মদনদা। স্বার্থ আমার। সস্তায় একটা সেকেন্ডহ্যান্ড ড্রেসিংটেবিল খুঁজছি অনেকদিন৷ একা মানুষ হলেও, টেরির শখটা বহাল আছে৷ হে হে।

- হ্যাপি নিউ ইয়ার ভাই পিন্টু৷ হ্যাপি নিউ ইয়ার টু ইউ।

টুপি

- ঘনাদা, আপনার টেবিলে ওই সবুজ ন্যাতাটা নতুন দেখছি? ওটার পিছনেও কোনও পেল্লায় গল্প আছে নাকি?

- কেন? আমার চারপাশে শুধুই গালগল্প থাকে নাকি? এ'টা দিয়ে গতকাল থেকে আমি টেবিল পরিষ্কার করছি৷

- ওহ্, আমি ভাবলাম..।

- ভাবা বন্ধ করো।

- আচ্ছা, আসি..।

- শোনো..।

- কিছু বলবেন?

- তোমার অস্ট্রেলিয়ায় যাতায়াত আছে?

- আজ্ঞে?

- অস্ট্রেলিয়া..ডাউন আন্ডার..সে'দিকে যাতায়াত আছে?

- কই..না তো..কেন বলুন তো?

- না, এমনি৷ খামোখা দাঁড়িয়ে না থেকে এ'বার এসো৷