Tuesday, December 5, 2023

জোড়াডিম চ্যাটার্জির স্বপ্ন



সে কতদিন আগের কথা৷ জোড়াডিম চ্যাটার্জি তখন সবে কলেজে ঢুকেছে। দু'চোখ জুড়ে স্বপ্ন; সে একদিন নামজাদা অমলেট হবে৷ চিজ অমলেট বা মসালা অমলেট বা আরও কত কী ধরণের মুরুব্বি হওয়ার সম্ভাবনা তার। একদিন সবাই তাকে কেউকেটা বলে সমীহ করবে,  পাড়ার ক্লাব তাকে ডেকে মানপত্র দেবে, নামী পত্রিকায় তার ছবি জ্বলজ্বল করবে, বাপ-মা চোখ মুছে বলবে "আহা, আমাদের সোনার ছেলে"।

কিন্তু সে স্বপ্নের নির্মল বাতাসে ভবিতব্য কালো ধোঁয়া মিশিয়ে দিলে। বেনিয়ম, বেহিসেব আর বেআক্কেলেপনা এসে তার অমলেট হওয়ার সাধ দিল ঘুচিয়ে। সামান্য ভুর্জি হয়ে যখন সে দ্য গ্রেট চাটু ইউনিভার্সিটি ছেড়ে বেরোলে, তখন জোড়াডিম টের পেলে যে সে হারিয়ে যাচ্ছে; সমস্ত স্বপ্ন মিথ্যে হয়ে যেতে বসেছে। 

সত্যি বলতে কী, জোড়াডিম চ্যাটুজ্জ্যে হারিয়েই যেত যদি না সে বাসিভাত মাস্টারের সান্নিধ্যলাভ করত। বাসিভাত মাস্টার ভারি খামিখেয়ালী মানুষ, জিনিয়াস কিন্তু বেপরোয়া। এক রাত্রে ফ্রিজপাড়ার শুঁড়িখানা থেকে বেরোনোর  সময় পথের ধারের বেঞ্চিতে গা এলিয়ে পড়ে থাকা যুবক জোড়াডিমের দিকে তার নজর গেল। নেশাগ্রস্ত অবস্থাতেও বাসিভাতবাবু প্রতিভা চিনতে কসুর করলেন না। বুঝলেন, বেঞ্চিতে শুয়ে থাকা ছেলেটা ভদ্রসন্তান, তার প্রতিভা আছে। ক্ষণিকের অন্ধকারে সে বিভ্রান্ত বোধ করছে বটে, তবে তার সামনে প্রদীপ জ্বেলে ধরলেই সে ফ্লাডলাইট হয়ে ঘুরে দাঁড়াবে।

ব্যাস, যেমন ভাবনা তেমনি কাজ৷ বাসিভাত মাস্টার জোড়াডিম চ্যাটুজ্জ্যের সঙ্গে গিয়ে আলাপ জমালেন৷ খানিকক্ষণ পর বাসিভাতবাবু বলেই বসলেন;

- তুমি তো ভুর্জি৷ কিন্তু তোমার ইচ্ছে ছিল অমলেট হওয়ার। কী, তাই তো?

- অদ্ভুত! আপনি কী ভাবে বুঝলেন?

- আমি জাতে মাস্টার। পথভোলাদের কান টেনে পথে আনাটাই আমার কাজ৷ শোনো, তুমি যদি আমার সঙ্গে আসতে রাজি হও; আমি কথা দিচ্ছি তোমার জীবনের মোড় আমি ঘুরিয়ে দেব।

- কিন্তু আমি ঠিক..।

- কী? ভুর্জি হয়ে শেষ না হয়ে চাও না বড় কিছু করতে? চাও না?

- কিন্তু অমলেট হওয়া তো আর সম্ভব নয়!

- যদি বলি এর চেয়েও বড় সম্ভাবনা অপেক্ষা করে আছে তোমার জন্য? কী, পারবে আমায় বিশ্বাস করতে?

- অপরাধ নেবেন না৷ কিন্তু আমি এক এলেবেলে মানুষ৷ আপনি কি পারবেন আমায় বিশ্বাস করতে মাস্টারমশাই? আর আমি কি সত্যিই পারব বড় কিছু একটা করতে? 

- আমি তো হীরে চিনতে ভুল করি না হে জোড়াডিম। চলো, এ'বার। আর বিলম্ব নয়।

- যাব? কোথায় যাব?

- বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, বাজে প্রশ্নে বহুদূর।  এ'বার চলো জোড়াডিম। অনেক কাজ পড়ে আছে।

নতুন প্রজেক্টের আগ্রহে বাসিভাত মাস্টারের নেশা ততক্ষণে ছুটে গেছে৷ হন্তদন্ত হয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন, তার সঙ্গে তাল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে জোড়াডিম।

খানিকক্ষণের মাথায় একটা জরাজীর্ণ ক্লাবঘরের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন বাসিভাত মাস্টার। জোড়াডিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা জবরদস্ত হাঁক পাড়লেন তিনি; "তোরা কে কোথায় আছিস, বেরিয়ে আয়৷ দ্যাখ কে এসেছে আমার সঙ্গে"।

অমনি ক্লাবঘরের ভিতর থেকে একদল তরুণ বেরিয়ে এসে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলে, "আরে মাস্টারমশাই আপনি এদ্দিন পর৷ আমরা সেই কবে থেকে আপনার অপেক্ষায় বসে....আর এ'টা কে"?

স্মিত হেসে মাস্টার বাসিভাত বললেন, "পেয়েছি! এদ্দিনে পেয়েছি৷ ক্লাবের নতুন সেক্রেটারি; এর নাম জোড়াডিম। তোরা একে জোড়াডিমদা বলে ডাকবি৷ আর বাবা জোড়াডিম, আলাপ করিয়ে দিই৷ এই হল পেঁয়াজ দাস, ও গাজরচন্দ্র, ও'দিকে বীনস সেন, ওই যে কাঁচালঙ্কা খাসনবিস, আদা আলি, রসুন দত্ত, সোয়্যাসস্ হালদার, আর ভিনিগার ভট্ট৷ আরও কয়েকজন আছে, তারাও এলো বলে৷ এসো জোড়ডিম, এ'বার তোমার উত্তরণের পালা"।

তখনই আপ্লুত জোড়াডিমের চোখ গেল ক্লাবঘরের বাইরের দেওয়ালে ঝোলানো আধভাঙা সাইনবোর্ডটার দিকে যে'খানে বড় বড় হরফে লেখা আছে;

"হঠাৎ-ইচ্ছেয়-সহজে-বানানো এগ ফ্রায়েড রাইস সঙ্ঘ"।

পার্ফেকশন প্যারাডক্স



- বুঝলে গো শ্যামলদাদা, কিস্যুটি ঠিকঠাক হচ্ছে না। কিস্যু না।

- ও কী ভায়া৷ ভরসন্ধ্যেবেলা নেতিয়ে পড়লে দেখছি৷ মেজাজটা তুঙ্গে না রাখলে চলবে কেন? হরনাথবাবু আর নাড়ু এসে পড়লে বলে৷ তারপর টুয়েন্টি নাইনের মহাযুদ্ধ..গলায় একটু তেজ না আনলে খেলা জমবে কী করে?

- সে না হয় খেলব৷ কিন্তু মনের মত তাস যে আমি কোনওদিনই পাইনা। কাজেই আমার মত পার্টনার নিয়ে তাসের আড্ডা হোস্ট করাটা আপনারই লস্।

- তাস আজ গোলমেলে হলে হবে৷ কাল দেখবে সিঙ্গল হ্যান্ডে মাত করছ। দাঁড়াও, তোমার দরকার এককাপ কড়া কফির৷

- হবে না শ্যামলদা। হবে না৷ কফিতে সাঁতার কাটলেও আমার কপালে পার্ফেকশন জুটবে না৷ মিডিওক্রিটির সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে কাটানো ছাড়া আমার কোনও গতি নেই।

- ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাকগলানো শ্যামল চ্যাটুজ্জ্যের অত্যন্ত নাপসন্দ। তবু তুমি টুয়েন্টিনাইন পার্টনার। একটু খুঁচিয়ে দেখি না হয়৷ বলছিলাম ভায়া দিবাকর, মনটন খারাপ নাকি?

- তেমন নতুন কিছু নয়, আলাদা করে কিছু ঘটেনি। তবে জীবনে কিছু না ঘটাটাও তো দুর্ঘটনার সামিল। একদিকে চাকরী, অন্যদিকে সংসার, পাশাপাশি অমুক প্যাশন, তমুক শখ; যুদ্ধ তো কম নয়৷ কিন্তু কিছুতেই পার্ফেকশন খুঁজে পেলাম না।

- ব্যবসায়ী মানুষ আমি। সংসারও করলাম না। ও'দিকে আমার প্যাশন বলতে রান্নাবান্না আর শখ বলতে টুয়েন্টিনাইন৷ তবু, তুমি অপরাধ না নিলে, একটু জ্ঞান দিই ভায়া?

- ইরশাদ!

- অর্জ কিয়া হ্যায়৷ নিখুঁত কত কিছু আমাদের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যায় ভায়া, রোজ। তারা কিনা সহজে এসে ধরা দেয়, তাই তাদের কদর কম। আর যা জোটে না তা নিয়েই আমাদের যত হাহুতাশ।

- হবে হয়ত। কিন্তু আমার পোড়া কপালের গল্প তো তোমার কিছুই অজানা নেই দাদা! নিখুঁত কবে কী জোটাতে পেরেছি বলো? সে'সব ভেবে মাঝেমধ্যেই বুকটা হুহু করে ওঠে৷ এক্কেবারে হুহু হুহু..।

- খানিকক্ষণ আগে যে ডিমটা ভেজে দিলাম, সে'টা চেটেপুটে খেলে, আহা-বাহা করলে; কিন্তু কদর করলে না। সমাদর করলে না। যে'দিন সে ডিমভাজার কদর করতে পারবে, সে'দিন বুঝবে বাবু দিবাকর দত্ত.. পার্ফেকশন প্রতিনিয়ত আমাদের ছুঁয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ আমরা তাদের ছুঁতে পারছি না। সে'টাই প্যারাডক্স৷ সে'টাই ট্র‍্যাজেডি।

- কফিটা আমি বানাই শ্যামলদা। আপনি বরং আর এক রাউন্ড ডিমভাজায় মন দিন৷ আজ টুয়েন্টিনাইনের ব্র‍্যাডম্যান হতে মন চাইছে।

ছোটদের লেখা



কিশোরভারতীর আত্মপ্রকাশের বছর তিনেকের মাথায় প্রথম পুজোসংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে, দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়।

সম্প্রতি  পত্রভারতীর তরফ থেকে সে'সংখ্যাটি বইয়ের আকারে নতুন ভাবে ছেপে বের করা হয়েছে। এই ধরণের জরুরী কাজ দেব সাহিত্য কুটীরও করে চলেছে পুরনো শুকতারাগুলো নতুন করে ছেপে৷ 

যা হোক, যে'কথাটা বলতে এই পোস্ট৷ ছোটরা যথেষ্ট বাংলা গল্পের বই ও পত্রিকা পড়ছে কিনা, এ নিয়ে আমরা প্রচুর আলাপ-আলোচনা শুনতে পাই৷ সে আলোচনাগুলো জরুরীও বটে৷ সব ভাষাতেই চিরকাল তেমন বিশ্লেষণ হয়েছে, আরও হবে৷ এর পাশাপাশি ছোটদের আমরা কী পড়তে দিচ্ছি, সে'সম্বন্ধেও জোরদার আলোচনা হবে এমনটাই  কাম্য।

সদ্য কেনা সেই নতুন করে প্রকাশিত প্রথম কিশোরভারতী পুজোসংখ্যার সম্পাদকীয়টি পড়লাম৷ ছোটদের জন্যই লেখা; সুমিষ্ট ও সরল। কিন্তু সে'লেখায় বাবা-বাছা করে সেরেল্যাক গুলে খাইয়ে দেওয়া নেই। বরং ঝরঝরে স্মার্ট ভাষায় সম্পাদক দাগিয়ে দিয়েছেন কিশোরভারতী কী এবং কেন৷ এবং তার চেয়েও বড় কথা; ধারালো সব বক্তব্য রাখঢাক ছাড়াই পেশ করা হয়েছে৷ ছোটছেলেমেয়েদের কাতুকুতু আর আশীর্বাদ ছাড়াও অনেক কিছু দেওয়ার আছে, সে দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি সম্পাদক৷ সে'খানেই আমাদের কতকিছু শেখার। 

সে সম্পাদকীয়র কিছুটা অংশ তুলে দিলাম; বড়দের জন্য৷ এ'টা মনে করিয়ে দিতে যে এই লেখা অনায়াসে ছোটদের পাতে দেওয়া হত এককালে (এখন হয় না তা বলছি না, আমি কতটাই বা পড়ি - তবে এমনটাই আরও হওয়া উচিৎ)। এ'ভাবেই ছোটদের মন জয় করা সম্ভব; কারণ ওরা আমাদের চেয়ে ঢের বেশি স্মার্ট- জগতসংসারের নিয়মই তেমন।

তিপ্পান্ন বছর আগেকার ছোটদের পুজোসংখ্যার সম্পাদকীয় থেকে তুলে দেওয়া, পড়ুন:

"..মনে আজ শান্তি নেই, সে আনন্দও নেই।

কিছুদিন আগে অতি বর্ষণের ফলে পশ্চিমবাংলায় যে ভয়াবহ বন্যা হয়ে গেল, ব্যাপ্তি ও গভীরতায় তার বুঝি তুলনা নেই-অন্ততঃ স্মরণকালের ইতিহাসে তার নজির মিলবে কিনা সন্দেহ। এই বন্যার ফলে জেলার পর জেলায় সুবিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘর ভেঙেছে, সংসার ভেসে গেছে, প্রাণহানি হয়েছে, স্থাবর-অস্থাবর সব সম্বল প্রায় ধ্বংস হয়েছে, গবাদি গৃহপালিত পশু ডুবে মরেছে আর মাঠের ও বাগানের ফসলের অর্থাৎ ধান ও শাক-সব্জির যে ক্ষতি হয়েছে তার পরিমাপ করা দুঃসাধ্য। এই লক্ষ লক্ষ সর্বস্বান্ত আর্ত ছাপোষা মানুষ আমাদেরই আপনজন। বিনা অপরাধে আজ তারা সর্বহারা। আমাদের আজ সবচেয়ে বড় কর্তব্য, অবিলম্বে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো, সর্বশক্তি দিয়ে তাদের সাহায্য করা।

কিন্তু যে গুরুতর প্রশ্নটি আমাদের সবচেয়ে বেশী বিচলিত ও অস্থির করে তুলেছে, তা হলো- এর থেকে নিষ্কৃতি কোথায়? প্রতি বছর দেশের কোন-না-কোন অঞ্চলে একটু বেশী বৃষ্টি হলেই এই যে ভয়াবহ বন্যা নামছে, ধনপ্রাণ নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণে, এটাকে কি আমরা বিধাতার রুদ্ররোষ ও অখণ্ডনীয় বিধিলিপি হিসাবে গ্রহণ করবো, না গ্রহণ করবো একদল মানুষের চরম অপদার্থতা, দুর্নীতি ও হৃদয়হীনতার ভয়ঙ্কর নিদর্শন হিসাবে?

এর উত্তর দেবার কথা দেশের সরকারের। কিন্তু আমাদের আশঙ্কা, তা দেবার মতো মনোবল তাদের বোধহয় নেই।

অত্যধিক বৃষ্টি হলে দেশের ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে এভাবে বিধ্বংসী বন্যা হবে কেন? দেশের অসংখ্য নদী-নালা-খাল যদি হেজে মজে ভরাট হয়ে না গিয়ে থাকে, তাদের খাত যদি গভীর থাকে এবং সুষ্ঠু স্রোত-চলাচলে যদি কোন বাধা না ঘটে, তাহলে যত বৃষ্টিই হোক, জল তো ঐ নদী-নালা-খাল দিয়ে বেরিয়ে যাবে। দেশের জল-নিষ্কাশনের এটাই তো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ব্যবস্থা।

নদী-নালা-খাল ঠিকমতো চালু ও বহতা থাকলে, খরা-অনাবৃষ্টিতে যেমন জলের অভাবে ফসল না হবার ভয় থাকে না, তেমনি অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ফসল ও ধনপ্রাণ নষ্ট হবারও আশঙ্কা থাকে না।

আমাদের দেহের রক্তবহা শিরা-উপশিরার মতো এগুলিই দেশের জলবহা শিরা-উপশিরা। দেহের শিরা-উপশিরায় রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটলে, যেমন গুরুতর রোগ ও শেষ পর্যন্ত মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী হবে দাঁড়ায়, তেমনি নদী-নালা-খাল যদি ঠিকমতো চালু না থাকে, তাহলে দেশের ক্রমাগত ক্ষয় ও শেষ পর্যন্ত ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আমাদের দেশও আজ সেই ধ্বংসের দিকে অনিবার্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। গুরুতর ক্ষয়রোগ ধরেছে তাকে অনেক দিন। কিন্তু কেন এই অবস্থা হলো, তার জবাব যাদের দেবার কথা, তারা কিন্তু নীরব।

দুনিয়ার প্রতিটি সভ্য অগ্রসর দেশের সরকার নিজের দেশের এই সব প্রকৃতিক শিরা-উপশিরা যাতে পুরোপুরি চালু ও বহতা থাকে, তার দিকে খরদৃষ্টি রাখেন। তাদের খাত যাতে ভরাট হয়ে না যায়, তার জন্য 'ড্রেজার' নামক অতিকায় যন্ত্র দিয়ে খাত থেকে মাটি কেটে তোলার নিয়মিত ব্যবস্থা করেন। উপরন্তু নতুন নতুন গভীর খাল কেটে তাঁরা দেশের শিরা-উপশিরার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট হন।

যে কোন প্রকৃত দায়িত্বশীল সরকারের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক। আর এই স্বাভাবিক কাজ করার ফলে, অনাবৃষ্টি হোক আর অতিবৃষ্টি হোক, জলসেচ বা জলনিকাশের কোন দুর্ভাবনা থাকে না। পারমাণবিক যুগে মানুষ আজ যেখানে মহাবিশ্বের রহস্য উদ্‌ঘাটনের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে নদী-নালা-খালের এই গভীরতা ও স্রোত-চলাচল ঠিক রাখা তাদের কাছে কোন সমস্যাই নয়।

কিন্তু তা, মনে হয়, বিষম সমস্যা আমাদের দেশের সরকারের কাছে। কেন? তেইশ বছর পরে দেশের এই ভয়ঙ্কর সর্বনাশ ও বিপর্যয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটাই আমাদের মনকে বিদ্রোহী করে তুলেছে।

বন্ধু, আগামী দিনে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করতে হবে তোমাদের, বাঁচাতে হবে আমাদের এই সোনার জন্মভূমিকে। তার জন্যেই আজ তৈরী হও তোমরা। তাহলেই সার্থক হবে কিশোর ভারতীর আত্মপ্রকাশ, তার এই দুর্গম পথ-পরিক্রমা আর ঐকান্তিক চেষ্টা, যত্ন ও পরিশ্রম।

***

( বলাই বাহুল্য, এমন মূল্যবান বইটা নির্দ্বিধায় সংগ্রহ করা যেতে পারে। এ'টা আমি অবশ্য উপহার পেয়েছি)।

পুজোয় দু'জন



মনের সুখে নিজেদের দু:খ ও দুশ্চিন্তার দুর্দান্ত ফর্দ করছিলাম দু'জনে বসে। 
"কিস্যু হচ্ছে না, কিস্যু হবে না" বলে দিব্যি হাহাকার চলছিল। বুকের মধ্যে ছ্যাঁত জেনারেট করা যাবতীয় সম্ভাবনার কথা একটানা আলোচনা করতে পারাটাই আমাদের এই বয়সের 'প্যাশন'।

এ বলে "অমুক আশা গোল্লায় যাবে"।
তো ও বলে "তমুক প্ল্যান ডকে উঠবে"।
এ ভাবে "ওই স্বপ্নটা জলে যাবে"।
তো ও ফুট কাটে; "এই হিসেবটা মাটি হবে"।

তবে সে আলোচনা যতই জমাটি হোক; বিরিয়ানিও একটানা গেলা যায় না৷ জলমুড়িরও দরকার পড়ে, রুটি-আলুভাজার জন্যও মাঝেমধ্যে মন কেমন হয়, আর কাতলা মাছের পাতলা ঝোল দেখলেও কখনওসখনও বুকের মধ্যে উথালপাতাল হয়৷ অতএব শুক্রবার সন্ধ্যের রোমহষর্ক হাহাকার সিরিজ সামান্য হোঁচট খেল "আজ মহাষষ্ঠী, ফুচকা খাওয়া দরকার"য়ের হাইভোল্টেজ স্পার্কে।

বেরোলাম।

প্রতিবার এ'সময়ে বাড়ি ফিরি, এ'বার ফেরা হচ্ছে না। কিন্তু প্রবাসের অচেনা মণ্ডপে ঢুকে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে "এগরোলের গন্ধ পাচ্ছিস ভাই? স্টলটা নির্ঘাৎ আশেপাশেই" শুনতে পাওয়াটাও এক ধরণের ঘরে ফেরাই বটে। 

ঘণ্টাখানেকের জন্য দু:খ আর তিতিবিরক্তির ফর্দ ঝাপসা হয়ে গেল৷ আর নিয়ম মাফিক দু'জনেরই দিব্যি মনে পড়ল ছোটবেলার কথা- আমাদের বাবা-মায়েরা সম্ভবত ঠাকুর দেখতে বেরোত না; ঠাকুর দেখাতে বেরোত৷

অক্টোবর



তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় করা বেশির ভাগ চরিত্রর মতই; অক্টোবর একটি নিপাট ভালোমানুষ-মার্কা মাস। শত ব্যস্ততা আর দুশ্চিন্তা সত্ত্বেও যে মাস মনে করিয়ে দেয়, "আরে হবে হবে। সবই হবে। আর না হলে জানবে বেঁচে গিয়েছ। খামোখা হন্তদন্ত তিতিবিরক্ত হয়ে লাভ কী বলো ভায়া"।

বাতাসে দেদার ধুলোবালিময়লা অথচ মন বলবে "কীধর হ্যায় ছাতিম"। যে বাপের জন্মে কবিতার ধারকাছ দিয়ে ঘেঁষেনি, শিউলির গন্ধ আচমকা নাকে এলে সেও পুরনো ইয়ারদোস্তকে ফোন করে বলবে, "ভাই রে, এ'বারেও দেখা হল না। পরের বার কিন্তু দেখা করতেই হবে। তারপর জমিয়ে আড্ডা। আর ইয়ে, টুয়েন্টিনাইন হবে নাকি"?

আর আড্ডা?
আড্ডা খণ্ডাবে কে?
এ'সময় সক্কলে বাড়ি ফেরে। সক্কলে।
অনেকে হাজার মাইল দূর থেকে পুরনো পাড়ায় ফেরেন।
আর তাঁরা পাড়ায় ফিরে আসেন বলেন পাড়ায় থাকা গুটিকয় আত্মীয়বন্ধুদের মনে হয়; এইবার পাড়াটাকে পাড়া মনে হচ্ছে বটে।
আর "কদ্দিন পর দেখা"র আড্ডার যে তেজ, তা দিয়ে সহস্র টুনিবাল্ব জ্বালানো সম্ভব।