Monday, August 7, 2023

নিউ লক্ষ্মী ভাণ্ডার

- এই যে স্বপনদা! বাহ্৷ দোকানে দেখছি বড় ফ্রিজ বসিয়েছ মামা? চাল-ডালের পাশাপাশি এ'বার আইসক্রিমও গছাবে নাকি?

- আইসক্রিম, কোল্ডড্রিঙ্কস। ছোট ফ্রিজটায় তো মাখনটাখনের বেশি কিছু..। যাক গে৷ তোর অত খবরে কাজ কী রে মদনা!

- আমাদের অত সময়ও নেই৷ হপ্তা বের করে দাও৷ কেটে পড়ি। বুলবুলদা আর হ্যাঁ, এ'মাসে বাজারের সবার থেকে দু'শো টাকা এক্সট্রা নিচ্ছে৷ পুজোফুজো আসছে তো।

- হপ্তা বলিস কেন রে ইডিয়ট? বল তোলা আদায় করতে এসেছিস। বাবা, বাঙালির ছেলে মাস্তানিতে নেমেছিস, বাঙালির নেকু কেরানী বদনাম ঘুচোচ্ছিস; তা তো ভালো কথা৷ কিন্তু বাংলা ভুললে চলবে কেন? আর হ্যাঁ। বুলবুলকে বলে দিস এ'টা মামার বাড়ি নয়, যে দু'শো এক্সট্রা চাইলেই দু'শো পাবে।

- স্বপনদা, বুলবুলদাকে রঙ দেখাতে যেওনা৷ কেলিয়ে কেলো মুখ ফর্সা করে দেবে৷

- আরে থাম। যে মাস্তান দু'শো বেশি চেয়ে ঘ্যানঘ্যান করে তার জাত আমার জানা আছে৷ ক'দিন পর তো সিঁদ কাটতে নামবি।

- বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু স্বপনদা। বুলবুলদা যদি জানতে পারে..।

- মদনা, আমার বাজে বকার সময় নেই৷ এই নে টাকা৷ আর বুলবুলকে বলে দিস আমি দু'শো টাকা কেটে রেখেছি৷ আগের কিছু বাকি ছিল৷

- দেব নাকি চামড়া গুটিয়ে?

- তবে রে রাস্কেল! তুই গোটাবি আমার চামড়া? ডাক বুলবুলকে৷ তুই ডাক হারামজাদা।

- তোমার কি মাথাটাথা গেছে?

- বুলবুলের ডানা আমি যদি না ছেঁটেছি..তবে আমার নাম স্বপন দত্ত নয়।

- তোমার ব্যবস্থা হচ্ছে। বুলবুলদা তোমার নতুন ফ্রিজ তুলে নিয়ে গিয়ে তা'তে বিয়ারের বোতল রাখবে৷ দেখে নিও। আর তোমায় ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে কয়েক ঘা না দেওয়া পর্যন্ত..।

- টিংটিঙে লগবগ্গার দল! তাদের নাচনকোঁদন দেখে হেসে বাঁচিনে৷

- আমি এখুনি গিয়ে বুলবুলদাকে খবর দিচ্ছি...তোমার দোকান যদি না তুলিয়েছি আজ..।

********

- স্বপনদা, আধকিলো মুসুরডাল আর আড়াইশো গুড়ের বাতাসা দাও।

- এই দিই৷ মদনা। এই ব্যাটা! হাফকিলো মুসুরি আর আড়াইশো লাল বাতাসা দে দেখি৷ চটপট৷ কাস্টোমারকে এই রোদে বেশিক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখিস না বাপ। চট করে নিয়ে আয়৷ তা, আর কিছু দেব নাকি হরিহর?

- না না। আর কিছু না।

- বেশ বেশ।

- তা স্বপন, সাতদিন ধরে দেখছি মদন গুণ্ডা তোমার দোকানে ফরমাশ খাটছে। ব্যাপারটা কী?  বুলবুলের স্যাঙাৎগিরি ছেড়ে তোমার দোকানে চাল-ডাল ওজন করছে..ও কি মাস্তানি ছেড়ে দিল?

- তা কেন হবে? মদনা আমার সঙ্গে বুলবুলের নাম নিয়ে অসভ্যতামি করেছিল৷ আমি তাই দিলাম বুলবুলকে জোর এক ধমক৷ লজ্জায় পড়ে গিয়ে একমাসের জন্য মদনাকে আমার পদসেবায় লাগিয়েছে বুলবুল৷ বিকেল পর্যন্ত দোকান দেখে৷ সন্ধ্যেবেলা আমার গা হাত-পা টিপে দেয়৷ রাত্রে আমার জন্য বটতলার হাট থেকে বাজার করে থলি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তবে ওর ছুটি।

- বুলবুল তোমায় এত সমীহ করে?

- না করে উপায় কী বলো..।

- ব্যাপারটা কী..।

- বুলবুল সদ্য বিয়ে করেছে জানো তো? সে ভারি গদগদ প্রেম৷ আমাদের গো বুলবুলকে আর চেনার উপায় নেই৷ গুণ্ডা-মাস্তানি যে'টুকু করে, নেহাতই পেটের দায়ে। আদতে সে এখন প্রেমিক মানুষ। আর ওর বউ, বুল্টি,  সেলাই স্কুলের দিদিমণি।  বুঝলে? ভারি ভালো মেয়ে৷ সেই সকাল সাতটায় বেরোনো, ফেরা রাত আট্টায়৷ কী খাটনিটাই না খাটে৷ এ'দিকে বুলবুলের যা কাজের নেচার, সে'টা তো ওয়ার্ক ফ্রম হোমই বলা যায়৷ কাজেই রান্নার ভারটা এখন তার কাঁধে৷ 

- বলো কী!

- এ'তে অবাক হওয়ার কী আছে৷ ন্যাচরাল ডিভিশন অফ লেবার৷ অবশ্য আমাদের সমাজের ভদ্দরলোকেরা ও'সবের তোয়াক্কা করে না৷ কিন্তু মাস্তান বুলবুলের জ্ঞানগম্যিটুকু আছে আর সে বুল্টিকে সত্যিই ভালোবাসে৷ আজকাল তাই মনের সুখে হেঁসেল সামলায়৷ তার রান্নার হাতও মন্দ নয়৷ বুলবুল জানে যে হাইকোয়ালিটির মশলাই হল রান্নার প্রাণ৷ আর বেস্ট মশলাপাতির ব্যাপারে স্বপন দত্তর নিউ লক্ষ্মী ভাণ্ডারের ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়৷ আমায় তো জানো, এই টিট্যুয়েন্টির যুগে দাঁড়িয়েও প্যাকেট মশলায় নেমে যাইনি৷ নিজে গিয়ে শুঁকে নেড়েচেড়ে জিনিসপত্র আনি৷ তাই তো আমার দোকানের এক চিমটি লঙ্কা গুঁড়োর যা ঝাঁজ, তা প্যাকেট মশলার চার চামচেও হবে না৷ সে ভরসার দাম যে তোলা আদায়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

- সে কথা তো আমিও বারবার বলি।

- দ্যাখো হে, বন্দুক দেখিয়ে একদিন-দু'দিন কাজ চলতে পারে৷ কিন্তু বুলবুল জানে, রান্নার ইনগ্রেডিয়েন্ট সোর্সিংয়েও ভালোবাসা আর সম্মান থাকা দরকার৷ যেকোনও গুণী রাঁধুনি তোমায় বলে দেবে; হাইকোয়ালিটি  ইকোসিস্টেম না হলে হাইকোয়ালিটি কুকিং অসম্ভব৷ মদনা ব্যাপারটা না জেনে সেই ইকোসিস্টেম ঘেঁটে দিতে গেছিল, তাই বুলবুল ওকে দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করাচ্ছে।

- সত্যি স্বপন। যো বিবি সে করে প্যার, উয়ো নিউ লক্ষ্মী ভাণ্ডারকো ক্যায়সে করে ইনকার।

ম্যান ঈটারস অফ করবেট



জিম কর্বেট ন্যাশনাল পার্ক লাগোয়া রিসর্ট।
মধ্যরাত৷

নদী? আছে৷ এক্কেবারে কুলকুল করে বইছে। সাউন্ডটা ভীষণ কমফর্টিং।
নিকালো কিন্ডল, চলে যাও পছন্দসই বইটির আশ্রয়ে।

পাহাড়? তাও আছে। এক্কেবারে চার্মিং । এইত্তো চাই।
এ'বার চেয়ারে গা এলিয়ে ঠাং ছড়িয়ে জুত করে বসো দেখি৷

জ্যোৎস্না? মেঘের ইন্টারফারেন্স নেই, অতএব চাঁদ চালিয়ে খেলছে৷ চাদ্দিকে এক্কেবারে মায়াময় একটা ইয়ে৷ ইয়ে বলতে; মনের ভাবটা বুঝে নিতে হবে৷
এ'বারে দু'পাতা 'ম্যান ঈটার অফ কূমায়ুন' আর দু'মিনিট প্রকৃতি৷ দু'পাতা বই, দু'মিনিট নদী-পাহাড়-এটসেটেরা। আহা। 

সবে জুত করে বসেছি। দেড় পাতা এগিয়েছে৷ এমন সময় বার্মুডা ছাপানো টিঙটিঙে ঠ্যাংজোড়া জানান দিলে, প্রকৃতির আর একটা মারাত্মক এলিমেন্টও আছে যে'টা ফুর্তির আবহে ঠাহর করতে খানিকটা দেরী হয়েছে। মশা। অসংখ্যা হতচ্ছাড়া-হাড়বজ্জাত মশাদের দল।

অমনি টুপ করে পাহাড়ি চাঁদনি আর তিরিতিরি নদীর কম্বিনেশন ছাপিয়ে মনে পড়ল একটা এসি আর অলআউট লিকুইডেটর সমৃদ্ধ আরামদায়ক রুম আমায় অনুপস্থিতিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।

সাময়িক উচ্ছ্বাস কেটে যেতে মন ফিরে এলো আনন্দ-নিকেতনে। হোটেল রুমের নরম খাটে গা এলিয়ে করবেট বা বিভূতিভূষণ পড়াটাই যে আদত প্রকৃতি-পুজো, এই অমোঘ শহুরে সত্যটা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয় না৷

ডিম্বড়া



ফ্রিজে তেমন কিছু নেই৷ কিন্তু নোলার আনচান বহাল রয়েছে (আরে নোলান বলিনি রে বাবা)।  এমন পরিস্থিতিতে চটজলদি সলিউশন হল ভাতেভাত (হেঁসেল আমার পাল্লায় পড়লে ম্যাগি), বা শর্টকাট ভাজাভুজি৷ কিন্তু অল্পসময়ের মধ্যেই রান্নাঘরে পিঞ্চহিট করার ব্যাপার মায়ের জুড়ি নেই৷ এই  প্রসঙ্গে মায়ের ম্যাজিক বাটিচ্চড়ির নিয়ে একটা দরদী এস্যে লেখাই যায়৷ তবে সে ব্যাপারে অন্যদিন গপ্প ফাঁদা যাবে৷

চচ্চড়ি-সেদ্ধ-ভাজার বাইরে গিয়ে আলগোছে হাইপাওয়ার ঝোলভাত নামিয়ে দেওয়াটাও মায়ের বাঁ হাতের খেল৷ ডিমকষাও সেই ক্যুইক-কামাল ক্যাটেগরিতে পড়ে। ডিমের ঝোলের একটা সরেস 'দুসরা' ভার্সনেও মায়ের হাত শানানো আছে। ডিমের বড়ার ঝোল৷ আলুসেদ্ধয় ডিম দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে নিয়ে সে'টার বড়া ভেজে নেওয়া৷ তারপর তার জমজমাট ঝোল৷ দু'টো মাঝারি সাইজের আলু প্রতি চারটে ডিম; মোটামুটি ওই রেশিওতেই ব্যাপারটা নাকি ভালো দাঁড়ায়৷ তুলতুলে বড়াগুলো ঝাল-ঝাল ঝোল অবলীলায় শুষে নেয়। ফলত, সে ডিমের বড়া হয়ে ওঠে হাইক্লাস আর সুপারঘ্যাম৷

করোলবাগের চিঠি



- যাই বলুন মশাই! এক্কেবারে চ্যাম্পিয়ন কোয়ালিটির বিকেল। রোদের কোয়ালিটি নরম, বৃষ্টিশেষের মিঠে হাওয়া। রোম্যান্টিক-ম্যাক্স।

- তা গোলাপবাবু, হাওয়া যে মিঠে সে'টা ফ্লাইটে বসেই টের পাচ্ছেন?

- আগামী নভেম্বরে ফিফটু ক্রস করে ফিফটি থ্রিতে পড়ব৷ তা'ছাড়া অল্প বয়স থেকেই আমি বিকেলের ব্যাপারে অবজার্ভ্যান্ট। এই বলে রাখলাম গোলদারবাবু; ল্যান্ড করার পর টের পাবেন কী প্রিসাইসলি বিকেলের কোয়ালিটি অ্যাসেস্ করেছি।

- তা এমন হাইকোয়ালিটি বিকেল, এমন বিটকেল কাজে নষ্ট করা কি ঠিক হবে?

- প্রফেশনটাই তো বিটকেল গোলদারবাবু৷

- তা এই প্রফেশনে থেকে বিকেল অবজার্ভ করার আদেখলাপনা দিয়ে হবেটা কী।

- বাহ্। ফ্রিল্যান্স তোলাবাজির কাজ করি বলে কি বিকেলের ভালোমন্দের ব্যাপারে সেনসিটিভ হওয়া বারণ?

- দেখুন গোলাপবাবু৷ আপনার ভালো চাই তাই বলি৷ আর ঘণ্টা দুইয়ের মাথায় করোলবাগের ব্যবসায়ীর ভুঁড়িতে বন্দুকের নল চেপে পঞ্চাশ লাখ বের করবেন৷ সে'খান থেকে চল্লিশ ক্লায়েন্টেকে দিয়ে দশ পকেটস্থ করে রাতের ফ্লাইটেই আস্তানায় ফেরত৷ হাই-ফোকাসের কাজ, এক চুল এদিক ওদিক হলেই চালান হয়ে যেতে হবে৷ কাজেই এ'সবের মধ্যিখানে বিকেল-বিকেল করে নেত্য না করলেই আপনার মঙ্গল৷ 

- কিছু মনে করবেন না গোলদারবাবু। আপনি ভারি কাঠখোট্টা।  

- আমি আছি তাই আপনি ভেসে যাননি এদ্দিন।

- থামুন মশায়৷ করোলবাগ পৌঁছতে এখনও ঢের দেরী। তার আগে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে এমন হাইক্লাস বিকেলের শোভাটাকে যত্ন করে অ্যাবসর্ব করা।

- তা সেই অ্যাবসর্ব করার প্রসেসটা কী?

- করোলবাগের রাস্তায় শুনেছি মারাত্মক লেভেলের মনভোলানো ছোলেকুলচে পাওয়া যায়৷ 

- এই একরোগ৷ কথায় কথায় খালি গেলার স্বপ্ন দেখা৷ ধুর। কাজের আগে অত খাইখাই করতে নেই। 

- আরে, খাওয়ার কথা কে বলছে। ইম্যাজিন করুন, এমন সোনালী বিকেল আর সন্ধ্যের আবছায়া এসে মিশছে। বাতাসে রোম্যান্টিক 'আমিই উত্তম আমিই উত্তম' মার্কা একটা মিহি ইয়ে। আর সেই দিলদার আবহে...।

- দিল্লীতে এসে উত্তমের বদলে মুঘলাই কায়দা নামালে হয় না? মখমলের ওয়াড় দেওয়া বালিশ বুকে চেপে শায়রি ভাঁজা বাদশার রঙিন মেজাজ?

- আপ রুচি রোম্যান্স মশাই৷ যা হোক৷ সেই মাহেন্দ্রক্ষণে, ছোলেকুলচের সুবাস বুকে নিয়ে, সুমনাকে একটা চিঠি লিখব।

- সুমনা? গোলাপবাবু? ফিজিক্স অনার্স সুমনা?

- ফিজিক্স অনার্স সুমনা। 

- যে সামনে এসে পড়লে আপনার গলা দিয়ে ননস্টপ একটা নালায় লেংচে পড়া ঘোড়ার মত চিঁচিঁ শব্দ বেরোত?

- সেই সুমনা।

- তাকে চিঠি লিখবেন? সে কী! কয়েক যুগ ভদ্রলোকের সংস্পর্শ থেকে দূরে বাস করছেন। এখন কোথায় সুমনা, আর কোথায় ভাড়াটে গুণ্ডা গোলাপবাবু। ঠিকানা পাবেন কোথায়? 

- গোলদারবাবু৷ আপনার দ্বারা এ'সব ফাইন ব্যাপারস্যাপার বোঝা সম্ভব নয়। আরে সেরা চিঠিরা পোস্ট হয় না। ড্রয়ারের গোপন কোণায় বা বইখাতার ভাঁজে তাদের পুষে রাখতে হয়। 

- নাহ্৷ আজ আপনি ডোবাবেন দেখছি গোলাপবাবু।

- যদি সত্যিই মনোরোম বিকেলে; করোলবাগের রাস্তার ধারে বসে, ছোলকুলচার সুবাস ইন্সপায়ার্ড প্রেম-প্রেম চিঠি লিখতে গিয়ে তোলা আদায় ডুবে যায় গোলদারবাবু, তবে জানবেন এখনও বেঁচে থাকার ধক আছে এই শর্মার।

- এই সেরেছে!

***

ভদ্রলোকের যেমন কথা তেমনি কাজ। অটোরিক্সা করোলবাগ অঞ্চলে পৌঁছতেই অটোচালককে নবাবি মেজাজে বললেন গোলাপ গোলদার;

"অটোমশাই, ইধর কিসি খাতাকলম কা দোকান মে রুকিয়েগা। দু'টো চিঠি লিখনে কা শৌখিন কাগজ অউর এক গুলাবি খাম, মানে ইয়ে, এনভিলপ লেনা হ্যায়৷ কেমন"?

ফুডভ্লগার

- কেমন আছেন শশধরবাবু?

- ও কী৷ বলা নেই কওয়া নেই৷ দুম করে আমার টেবিলে বসে পড়লেন যে? আর..আর..এই..এই..এক মিনিট, আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?

- গোটা কফিশপ ফাঁকা৷ আপনি খামোখা একা বসে হাহুতাশ করে কী করবেন বলুন৷ তাই, বসে পড়লাম, একটু সঙ্গ দিই না।

- এই খবরদার, একদম বাজে কথা বলবেন না৷ কীসের হাহুতাশ? দিব্যি একটু মী-টাইম এঞ্জয় করছিলাম৷ দিলে সব চটকে।

- আরে ছাড়ুন মশাই মি টাইম৷ আপনার বড়ছেলে ভটকাই তো মেডিকালে এ'বারেও লটকালো৷ সে নিয়েই দুশ্চিন্তা করছিলেন তো? ও আমি বুঝতে পেরেছি!

- হোয়াট ননসেন্স৷ আপনি কি টিকটিকি নাকি? আমি কিন্তু চিৎকার করে ম্যানেজারকে ডাকব! ফাইনাল ওয়ার্নিং! ও কী৷ আপনি ক্যামেরায় কী রেকর্ড করা শুরু করলেন! ও মাই গড! 

- ইএমআইয়ের প্রেশার সামাল দিতে ভল্ট থেকে বৌদির সোনার বালা সরিয়ে দিলেন৷ এত গলাবাজি আপনার সাজে?

- মিথ্যুক! জোচ্চোর! আমি..আমি...আমি পুলিশ ডাকব।

- মিথ্যে?  রিয়েলি? যাদবপুরের ব্রাঞ্চ থেকে গত শনিবার বেলা পৌনে দু'টোয়..।

- কী..কী হচ্ছে কী এ'সব।

- বাহ্৷ এইত্তো গলার সুর নরম হয়ে এসেছে। সেই ভালো। হাওয়াবদলের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে না পারলে চলবে কেন!  রাজনীতি নামার শখ আছে, গুণ্ডা পোষার টাকা আছে..আবার মিডিয়ার সঙ্গে মাখোমাখোটাও টিকিয়ে রেখেছেন। আপনার ফিউচার কিন্তু ব্রাইট। ভাববেন না, এইসব ফিনান্সিয়াল স্ট্রেস কেটে যাবে৷ সরকারপক্ষ বা অপোজিশিন, যে কোনও সোর্স থেকে একটা টিকিট পেলেই তো কেল্লা ফতে৷ কী, তাই তো?

- এই আপনি কে বলুন না৷ মন্টুদার দলের কেউ? ইয়ে, শোভা আপনাকে পাঠায়নি তো? আরে ধুর কাঁচকলা৷ রেকর্ডিংটা থামান না! আমার ভিতরটা কেমন আনচান করছে যে।

- শশধরবাবু৷ তলপেটের ব্যথাটাও অযথা চেপে যাচ্ছেন৷ এদ্দিনের নেশাভাঙের ইম্প্যাক্ট সহজে এড়ানো যাবে না৷ ডাক্তারের বলা টেস্টগুলো এ'বারে করিয়ে নিন। বয়স বাড়ছে। খুব দেরী হওয়ার আগে..।

- আপনি কে বলুন তো ভাই? আমায় ব্ল্যাকমেল করার জন্যই কী..?

- ছি: ছি:! এ'বাবা! তউবা তউবা! ওহহো৷ আমার পরিচয়টা দেওয়া হয়নি৷ আমি সুদর্শন গুপ্ত৷ ফুডব্লগার৷ এই আপনার ভিডিওটা আমার রেকর্ড করা একশো নম্বর ভিডিও৷ এই একশোটা ভিডিও নিয়ে কাল আমার ইউটিউব চ্যানেল লঞ্চ হবে৷ ফলো আর সাবস্ক্রাইব করতে ভুলবেন না।

- ক..ক..কিন্তু..।

- আরে আমি সমস্তটাই মিউটে রেকর্ড করেছি। মাইরি। আমাদের কথোপকথন কেউ শুনবে না। বললাম না, আমি ফুড ব্লগার। তবে উইথ আ ডিফারেন্স।

- কিন্তু ভাই সুদর্শন,  আমার টেবিলে তো এখনও খাবার কিছু আসেনি..। আমি কিছুই..।

- আরে মশাই ও'সব পাতি খাওয়া রেকর্ড করে ফুড ভ্লগিং ইকোসিস্টেমে ভীড় বাড়াতে চাইনা আমি৷ আমার ব্যাপারটা একটু স্পেশ্যাল।

- কী'রকম?

- ফুডভ্লগিং কী? এর খাওয়া আর ওর গেলাকে সাবজেক্ট করে উপাদেয় সব ভিডিও তৈরি৷ সিম্পল। আমি রকমারি মানুষের রকমারি স্টাইলে চাপ ও বিষম খাওয়া, আর কেস খেয়ে ঢোক গেলা রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলব৷ এই স্পেশ্যাল খাওয়াদাওয়া সবাই দেখতে চায়, দেখানোর লোক নেই। তাদের ডিমান্ড মীট করতেই আমার চ্যানেল লঞ্চ হচ্ছে কাল। হাইকোয়ালিটি ঢোক, বিষম, চাপ, ও কেস খাওয়ানো-গেলানো চাট্টিখানি কথা নয়, সে'টা হাইয়েস্ট লেভেলের রান্নাও বটে৷ আর সে'দিক থেকে আমি যে খুব বড় মাপের শেফ, তার প্রমাণ আপনি পেয়েই গেছেন৷ তাই তো? এ'বার আসি৷ সুদর্শন গুপ্ত, নামটা ভুলবেন না৷ আর কাল ইউটউবে একবার ঢুঁ মেরে সাবস্ক্রাইব অবশ্যই করবেন৷ কেমন?