Monday, August 7, 2023

ডিম্বড়া



ফ্রিজে তেমন কিছু নেই৷ কিন্তু নোলার আনচান বহাল রয়েছে (আরে নোলান বলিনি রে বাবা)।  এমন পরিস্থিতিতে চটজলদি সলিউশন হল ভাতেভাত (হেঁসেল আমার পাল্লায় পড়লে ম্যাগি), বা শর্টকাট ভাজাভুজি৷ কিন্তু অল্পসময়ের মধ্যেই রান্নাঘরে পিঞ্চহিট করার ব্যাপার মায়ের জুড়ি নেই৷ এই  প্রসঙ্গে মায়ের ম্যাজিক বাটিচ্চড়ির নিয়ে একটা দরদী এস্যে লেখাই যায়৷ তবে সে ব্যাপারে অন্যদিন গপ্প ফাঁদা যাবে৷

চচ্চড়ি-সেদ্ধ-ভাজার বাইরে গিয়ে আলগোছে হাইপাওয়ার ঝোলভাত নামিয়ে দেওয়াটাও মায়ের বাঁ হাতের খেল৷ ডিমকষাও সেই ক্যুইক-কামাল ক্যাটেগরিতে পড়ে। ডিমের ঝোলের একটা সরেস 'দুসরা' ভার্সনেও মায়ের হাত শানানো আছে। ডিমের বড়ার ঝোল৷ আলুসেদ্ধয় ডিম দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে নিয়ে সে'টার বড়া ভেজে নেওয়া৷ তারপর তার জমজমাট ঝোল৷ দু'টো মাঝারি সাইজের আলু প্রতি চারটে ডিম; মোটামুটি ওই রেশিওতেই ব্যাপারটা নাকি ভালো দাঁড়ায়৷ তুলতুলে বড়াগুলো ঝাল-ঝাল ঝোল অবলীলায় শুষে নেয়। ফলত, সে ডিমের বড়া হয়ে ওঠে হাইক্লাস আর সুপারঘ্যাম৷

করোলবাগের চিঠি



- যাই বলুন মশাই! এক্কেবারে চ্যাম্পিয়ন কোয়ালিটির বিকেল। রোদের কোয়ালিটি নরম, বৃষ্টিশেষের মিঠে হাওয়া। রোম্যান্টিক-ম্যাক্স।

- তা গোলাপবাবু, হাওয়া যে মিঠে সে'টা ফ্লাইটে বসেই টের পাচ্ছেন?

- আগামী নভেম্বরে ফিফটু ক্রস করে ফিফটি থ্রিতে পড়ব৷ তা'ছাড়া অল্প বয়স থেকেই আমি বিকেলের ব্যাপারে অবজার্ভ্যান্ট। এই বলে রাখলাম গোলদারবাবু; ল্যান্ড করার পর টের পাবেন কী প্রিসাইসলি বিকেলের কোয়ালিটি অ্যাসেস্ করেছি।

- তা এমন হাইকোয়ালিটি বিকেল, এমন বিটকেল কাজে নষ্ট করা কি ঠিক হবে?

- প্রফেশনটাই তো বিটকেল গোলদারবাবু৷

- তা এই প্রফেশনে থেকে বিকেল অবজার্ভ করার আদেখলাপনা দিয়ে হবেটা কী।

- বাহ্। ফ্রিল্যান্স তোলাবাজির কাজ করি বলে কি বিকেলের ভালোমন্দের ব্যাপারে সেনসিটিভ হওয়া বারণ?

- দেখুন গোলাপবাবু৷ আপনার ভালো চাই তাই বলি৷ আর ঘণ্টা দুইয়ের মাথায় করোলবাগের ব্যবসায়ীর ভুঁড়িতে বন্দুকের নল চেপে পঞ্চাশ লাখ বের করবেন৷ সে'খান থেকে চল্লিশ ক্লায়েন্টেকে দিয়ে দশ পকেটস্থ করে রাতের ফ্লাইটেই আস্তানায় ফেরত৷ হাই-ফোকাসের কাজ, এক চুল এদিক ওদিক হলেই চালান হয়ে যেতে হবে৷ কাজেই এ'সবের মধ্যিখানে বিকেল-বিকেল করে নেত্য না করলেই আপনার মঙ্গল৷ 

- কিছু মনে করবেন না গোলদারবাবু। আপনি ভারি কাঠখোট্টা।  

- আমি আছি তাই আপনি ভেসে যাননি এদ্দিন।

- থামুন মশায়৷ করোলবাগ পৌঁছতে এখনও ঢের দেরী। তার আগে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে এমন হাইক্লাস বিকেলের শোভাটাকে যত্ন করে অ্যাবসর্ব করা।

- তা সেই অ্যাবসর্ব করার প্রসেসটা কী?

- করোলবাগের রাস্তায় শুনেছি মারাত্মক লেভেলের মনভোলানো ছোলেকুলচে পাওয়া যায়৷ 

- এই একরোগ৷ কথায় কথায় খালি গেলার স্বপ্ন দেখা৷ ধুর। কাজের আগে অত খাইখাই করতে নেই। 

- আরে, খাওয়ার কথা কে বলছে। ইম্যাজিন করুন, এমন সোনালী বিকেল আর সন্ধ্যের আবছায়া এসে মিশছে। বাতাসে রোম্যান্টিক 'আমিই উত্তম আমিই উত্তম' মার্কা একটা মিহি ইয়ে। আর সেই দিলদার আবহে...।

- দিল্লীতে এসে উত্তমের বদলে মুঘলাই কায়দা নামালে হয় না? মখমলের ওয়াড় দেওয়া বালিশ বুকে চেপে শায়রি ভাঁজা বাদশার রঙিন মেজাজ?

- আপ রুচি রোম্যান্স মশাই৷ যা হোক৷ সেই মাহেন্দ্রক্ষণে, ছোলেকুলচের সুবাস বুকে নিয়ে, সুমনাকে একটা চিঠি লিখব।

- সুমনা? গোলাপবাবু? ফিজিক্স অনার্স সুমনা?

- ফিজিক্স অনার্স সুমনা। 

- যে সামনে এসে পড়লে আপনার গলা দিয়ে ননস্টপ একটা নালায় লেংচে পড়া ঘোড়ার মত চিঁচিঁ শব্দ বেরোত?

- সেই সুমনা।

- তাকে চিঠি লিখবেন? সে কী! কয়েক যুগ ভদ্রলোকের সংস্পর্শ থেকে দূরে বাস করছেন। এখন কোথায় সুমনা, আর কোথায় ভাড়াটে গুণ্ডা গোলাপবাবু। ঠিকানা পাবেন কোথায়? 

- গোলদারবাবু৷ আপনার দ্বারা এ'সব ফাইন ব্যাপারস্যাপার বোঝা সম্ভব নয়। আরে সেরা চিঠিরা পোস্ট হয় না। ড্রয়ারের গোপন কোণায় বা বইখাতার ভাঁজে তাদের পুষে রাখতে হয়। 

- নাহ্৷ আজ আপনি ডোবাবেন দেখছি গোলাপবাবু।

- যদি সত্যিই মনোরোম বিকেলে; করোলবাগের রাস্তার ধারে বসে, ছোলকুলচার সুবাস ইন্সপায়ার্ড প্রেম-প্রেম চিঠি লিখতে গিয়ে তোলা আদায় ডুবে যায় গোলদারবাবু, তবে জানবেন এখনও বেঁচে থাকার ধক আছে এই শর্মার।

- এই সেরেছে!

***

ভদ্রলোকের যেমন কথা তেমনি কাজ। অটোরিক্সা করোলবাগ অঞ্চলে পৌঁছতেই অটোচালককে নবাবি মেজাজে বললেন গোলাপ গোলদার;

"অটোমশাই, ইধর কিসি খাতাকলম কা দোকান মে রুকিয়েগা। দু'টো চিঠি লিখনে কা শৌখিন কাগজ অউর এক গুলাবি খাম, মানে ইয়ে, এনভিলপ লেনা হ্যায়৷ কেমন"?

ফুডভ্লগার

- কেমন আছেন শশধরবাবু?

- ও কী৷ বলা নেই কওয়া নেই৷ দুম করে আমার টেবিলে বসে পড়লেন যে? আর..আর..এই..এই..এক মিনিট, আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?

- গোটা কফিশপ ফাঁকা৷ আপনি খামোখা একা বসে হাহুতাশ করে কী করবেন বলুন৷ তাই, বসে পড়লাম, একটু সঙ্গ দিই না।

- এই খবরদার, একদম বাজে কথা বলবেন না৷ কীসের হাহুতাশ? দিব্যি একটু মী-টাইম এঞ্জয় করছিলাম৷ দিলে সব চটকে।

- আরে ছাড়ুন মশাই মি টাইম৷ আপনার বড়ছেলে ভটকাই তো মেডিকালে এ'বারেও লটকালো৷ সে নিয়েই দুশ্চিন্তা করছিলেন তো? ও আমি বুঝতে পেরেছি!

- হোয়াট ননসেন্স৷ আপনি কি টিকটিকি নাকি? আমি কিন্তু চিৎকার করে ম্যানেজারকে ডাকব! ফাইনাল ওয়ার্নিং! ও কী৷ আপনি ক্যামেরায় কী রেকর্ড করা শুরু করলেন! ও মাই গড! 

- ইএমআইয়ের প্রেশার সামাল দিতে ভল্ট থেকে বৌদির সোনার বালা সরিয়ে দিলেন৷ এত গলাবাজি আপনার সাজে?

- মিথ্যুক! জোচ্চোর! আমি..আমি...আমি পুলিশ ডাকব।

- মিথ্যে?  রিয়েলি? যাদবপুরের ব্রাঞ্চ থেকে গত শনিবার বেলা পৌনে দু'টোয়..।

- কী..কী হচ্ছে কী এ'সব।

- বাহ্৷ এইত্তো গলার সুর নরম হয়ে এসেছে। সেই ভালো। হাওয়াবদলের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে না পারলে চলবে কেন!  রাজনীতি নামার শখ আছে, গুণ্ডা পোষার টাকা আছে..আবার মিডিয়ার সঙ্গে মাখোমাখোটাও টিকিয়ে রেখেছেন। আপনার ফিউচার কিন্তু ব্রাইট। ভাববেন না, এইসব ফিনান্সিয়াল স্ট্রেস কেটে যাবে৷ সরকারপক্ষ বা অপোজিশিন, যে কোনও সোর্স থেকে একটা টিকিট পেলেই তো কেল্লা ফতে৷ কী, তাই তো?

- এই আপনি কে বলুন না৷ মন্টুদার দলের কেউ? ইয়ে, শোভা আপনাকে পাঠায়নি তো? আরে ধুর কাঁচকলা৷ রেকর্ডিংটা থামান না! আমার ভিতরটা কেমন আনচান করছে যে।

- শশধরবাবু৷ তলপেটের ব্যথাটাও অযথা চেপে যাচ্ছেন৷ এদ্দিনের নেশাভাঙের ইম্প্যাক্ট সহজে এড়ানো যাবে না৷ ডাক্তারের বলা টেস্টগুলো এ'বারে করিয়ে নিন। বয়স বাড়ছে। খুব দেরী হওয়ার আগে..।

- আপনি কে বলুন তো ভাই? আমায় ব্ল্যাকমেল করার জন্যই কী..?

- ছি: ছি:! এ'বাবা! তউবা তউবা! ওহহো৷ আমার পরিচয়টা দেওয়া হয়নি৷ আমি সুদর্শন গুপ্ত৷ ফুডব্লগার৷ এই আপনার ভিডিওটা আমার রেকর্ড করা একশো নম্বর ভিডিও৷ এই একশোটা ভিডিও নিয়ে কাল আমার ইউটিউব চ্যানেল লঞ্চ হবে৷ ফলো আর সাবস্ক্রাইব করতে ভুলবেন না।

- ক..ক..কিন্তু..।

- আরে আমি সমস্তটাই মিউটে রেকর্ড করেছি। মাইরি। আমাদের কথোপকথন কেউ শুনবে না। বললাম না, আমি ফুড ব্লগার। তবে উইথ আ ডিফারেন্স।

- কিন্তু ভাই সুদর্শন,  আমার টেবিলে তো এখনও খাবার কিছু আসেনি..। আমি কিছুই..।

- আরে মশাই ও'সব পাতি খাওয়া রেকর্ড করে ফুড ভ্লগিং ইকোসিস্টেমে ভীড় বাড়াতে চাইনা আমি৷ আমার ব্যাপারটা একটু স্পেশ্যাল।

- কী'রকম?

- ফুডভ্লগিং কী? এর খাওয়া আর ওর গেলাকে সাবজেক্ট করে উপাদেয় সব ভিডিও তৈরি৷ সিম্পল। আমি রকমারি মানুষের রকমারি স্টাইলে চাপ ও বিষম খাওয়া, আর কেস খেয়ে ঢোক গেলা রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলব৷ এই স্পেশ্যাল খাওয়াদাওয়া সবাই দেখতে চায়, দেখানোর লোক নেই। তাদের ডিমান্ড মীট করতেই আমার চ্যানেল লঞ্চ হচ্ছে কাল। হাইকোয়ালিটি ঢোক, বিষম, চাপ, ও কেস খাওয়ানো-গেলানো চাট্টিখানি কথা নয়, সে'টা হাইয়েস্ট লেভেলের রান্নাও বটে৷ আর সে'দিক থেকে আমি যে খুব বড় মাপের শেফ, তার প্রমাণ আপনি পেয়েই গেছেন৷ তাই তো? এ'বার আসি৷ সুদর্শন গুপ্ত, নামটা ভুলবেন না৷ আর কাল ইউটউবে একবার ঢুঁ মেরে সাবস্ক্রাইব অবশ্যই করবেন৷ কেমন?

মুরারিলাল



- ভায়া!

- উঁ...?

- ও ভায়া..।

- কী ভাইটু?

- এ'বারে তো বাড়ি ফিরতে হয় নাকি! সন্ধ্যে হলো বলে।

- বাড়ি? ধের ধের ধের৷ বাড়িফাড়ি ফিরে লাভ নেই৷ খোঁজ নিয়ে দ্যাখো দেখি, কুতুব মিনারটা কেনা যায় কিনা। অন্তত আশেপাশের দু'কাঠা জমি যদি পেতাম ভায়া মুরারিলাল..। রোজ রাত্তিরে উঠোনে মাদুর পেতে লম্বা হয়ে মিনারের দিকে তাকিয়ে গান ধরতাম। ঠুমরি৷ বা গজল।

- নাহ্। অতগুলো বিয়ারের বোতল ফস্ করে উড়িয়ে দিয়ে মোটেও ঠিক কাজ করোনি। 

- তুমি ভাই বড়ই নেকু মালুম হচ্ছে৷ অথচ খানিকক্ষণ আগে মনে হচ্ছিল শের কা বচ্চা৷ মনে হচ্ছিল, নাহ্, একজন মজবুত লোকের সঙ্গে ইয়ারি হয়েছে বটে৷

- তুমি সত্যিই কবি মানুষ ভাই আনন্দ৷

- শায়র বলো৷ শায়র৷

- গোস্তাখি মাফ।

- ভায়া মুরারিলাল,  তোমার সঙ্গে আলাপ হয়ে কী ভালোই যে লাগছে৷ কয়েকঘণ্টার আলাপ, অথচ মনে হচ্ছে কত জন্ম ধরে অপেক্ষা করছি এমনই এক বন্ধুর৷

- নেশাটা ভালোই চড়েছে তোমার৷

- করেক্ট৷ কিন্তু ইমোশনটা খাঁটি। জানো মুরারিলাল৷ মাঝেমধ্যে বড্ড একলা লাগে৷

- জানি৷ তাই তো এলাম।

- তুমি জানো আমি একা? তাই তুমি যেচে এসে আজ আলাপ করলে? কুতুব মিনার চত্ত্বরে এসে বিয়ার খাইয়ে আউট করলে? তুমি কি দেবশিশু? না ভূত? হে হে হে হে হে হে..বলো না ভাই।

- আমি মুরারিলাল।  সে পরিচয়টুকু কি যথেষ্ট নয়?

- দেখো৷ ফাঁকি দিয়ে সরে পড়ো না৷ গেলে ফোন নম্বর বা ঠিকানাটা অন্তত..।

- তোমার ছেড়ে আর যাব কোথায় বলো৷ হাঁক দিলেই হবে, আমি আসব। ঠিকানা, ফোননম্বর; এ'সব জোলো ব্যাপারে কাজ কী।

- তুমি তো অন্তর্যামী দেখছি৷ বেশ৷ তাই হোক৷ দেখি শ্রীবদনটা..মনের মধ্যে ছাপিয়ে নিই।

- এই চেহারায় আটকে থেকে কী হবে। বোধিসত্ত্বকে আজ দেখছ দিল্লী পোস্টআপিসের ক্লার্কবাবুটি হিসেবে৷ তাই বলে কালকেও সেই শেপ আর ফর্মেই পাবে ভেবেছ?

- আইব্বাস৷ তুমি যে মিস্টিরিয়াস ম্যাজিক ভাই মুরারিলাল। এনিগমা!

- আনন্দ, মনে দিয়ে খুঁজলেই আমায় পাবে৷ মিলের কর্মী, খবরের কাগজ ফেরিওয়ালা, পেটমোটা ব্যবসায়ী বা রিক্সাওলা; ডাকে যদি আন্তরিকতা থাকে বন্ধু, তোমার এই মুরারিলাল কাছে এসে তোমায় জড়িয়ে ধরবেই।

- প্রমিস করছ তো ব্রাদার?

- আলবাত! তবে এ'বার আমি আসি৷ তোমার ঢুলুঢুলু অবস্থা, খানিক পর নেশা হালকা হলে বাড়ি ফিরে যেও।

- আসছ মুরারিলাল?

- তুমি বড় ভালোমানুষ ভাই আনন্দ৷ মনে রেখো, আমি আছি। আর আমি থাকতে তোমার আর একা থাকার চিন্তা নেই৷ প্রাণ খুলে হাঁক পাড়লেই হবে।

- আসবে? ডাকলে এসো কিন্তু মুরারিলাল। এসো৷ কেমন? এসো। 

- আসব৷ কে জানে৷ হয়ত কোনও দিন বাউল হয়ে ফিরে আসবো আর গাইব; " ফিরেও আসব আমি তোমার সুবাসে, থাকবো তোমার বুকে আর আশেপাশে। আমাকে পড়লে মনে খুঁজো এইখানে, এ'খানে খুঁজছি আমি জীবনের মানে"। কেমন দিব্যি হবে না?

- সে'দিন যদি আমি না থাকি মুরারিলাল?

- গানটা তবুও আনন্দেরই থাকবে৷ 

- সাবাশ৷ তুমি ব্যাঘ্রশাবক মুরারিলাল!

Saturday, August 5, 2023

সমর চ্যাটার্জীর সমাধান

- এক্সকিউজ মী৷ আপনি সমরবাবু তো? সমর চ্যাটার্জী?
- হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে তো ঠিক..।
- আপনার হয়ত মনে নেই৷ আমি অরূপ দাস। বার্ন্স অ্যান্ড সন্ডার্সে যখন জয়েন করি তখন আপনি ম্যানেজার।
- অরূপ। অরূপ। মনে পড়েছে৷ আসলে এদ্দিন পর তো..রিটায়ার করেছি তাও তো বছর দশেক হল...মেমরিটা ঠিক..। যাক গে, তুমি তো ফিনান্স ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছিলে? তাই তো?
- আপনার মনে আছে? হ্যাঁ। ইন ফ্যাক্ট, কিছুদিন আপনি হাতে ধরে কন্ট্র্যাক্টের ব্যাপারস্যাপার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সে কৃতজ্ঞতাটা..।
- আই ওয়াজ অনলি ডুয়িং মাই জব। তা তুমি কি এখনও সে অফিসেই..?
- আজ্ঞে হ্যাঁ। এদ্দিন পর পুরীর সৈকতে আপনার সঙ্গে দেখা হবে ভাবিনি৷ তাও এই অসময়ে..রাতের সমুদ্র আপনাকেও টানে দেখছি।
- তা টানে বইকি৷ তা'ছাড়া এ'দিকটা শুনেছি সেফ৷ দশটা না বাজা পর্যন্ত তাই উঠি না৷
- এদিকটা বেশ নিরিবিলি৷ ভীষণ সুন্দর।
- দাঁড়িয়ে রইলে কেন? মাদুরে বসো। একাই বসে থাকি৷ পুরনো আলাপি একজন জুটেছে যখন..।
- থ্যাঙ্কিউ। আপনি কি নিয়মিত পুরী আসেন?
- এই সমুদ্রের সঙ্গে একটা নাড়ির যোগ হয়ে গেছে বোধ হয়..।
- স্যার, একটা প্রশ্ন ছিল, যদি কিছু মনে না করেন..।
- অফ কৌর্স।
- হয়ত আপনার কিছুই মনে নেই৷ তবু৷ আগ্রহটা ছিল তাই..আপনি রিটায়ার করার সাত দিন আগে সানফ্লাওয়ার শিপিং কোম্পানির একটা কন্ট্রাক্ট তাড়াহুড়ো করে প্রসেস করা হয়৷ ম্যানেজমেন্টর হুকুমেই। যদিও ব্যাপারটা ঘটানো হয় আমার হাতে দিয়ে৷ সে'দিন সমস্তটা বুঝিনি৷ কিন্তু এদ্দিন পর একটা অডিটে সানফ্লাওয়ার শিপিং নিয়ে একটা বড় গোলমাল ধরা পড়েছে৷ বেশ বড় ফিনান্সিয়াল স্ক্যান্ডাল৷
- এ ব্যাপারে আমায় আবার কেন..।
- আপনি আমায় কিছুই বলেননি সে সময়৷ কিন্তু গোলমালের ব্যাপারটা আপনি ঠিক আঁচ করেছিলেন। তাই তো?
- এ'বারে আমি উঠব৷
- সরি মিস্টার চ্যাটার্জি৷ কিন্তু ব্যাপারটা এতই..। পুলিশের হাতে যে কী বিশ্রী হেনস্থা হতে হয়েছে..আমার ফ্যামিলিটা শেষ হয়ে যাচ্ছে..।
- তুমি কাকতালীয় ভাবে পুরী আসোনি তা'হলে৷ রীতিমতো খোঁজখবর নিয়ে আমার পিছনে লেগেছ..।
- স্যার, প্লীজ..।
- তুমি কি আমায় চোর ভেবেছ? ঘুষখোর?
- অন দ্য কনট্রারি, আমার বিশ্বাস আপনি এর বিরুদ্ধে ছিলেন। নেহাত ম্যানেজমেন্টের জারিজুরির ওপরে কিছু করতে পারেননি..।
- এ ব্যাপার নিয়ে আমি আর একটাও কথা বলব না৷
- সমরবাবু। স্যার, তখন আমি অফিসে নতুন৷ অল্প বয়স। আটঘাট কিছুই বুঝতাম না৷ অথচ আজ এদ্দিন পর বিশ্রীভাবে আমায় ফাঁসানো হয়েছে৷ আমার মানসম্মান সমস্তই...। আপনি যদি আমায় একটু গাইড করতে পারেন..আপনার নিশ্চয়ই কিছু মনে আছে..। ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধে প্রমাণ না পেলে..আমার নামের ওপর থেকে কালিটা আর মোছা যাবে না।
- দেখো অরূপ..।
- প্লীজ স্যার৷ প্লীজ৷
- সতেরোর বি বাই টু এইটি সিক্স বাই ডি। স্টোররুমের আর্কাইভ থেকে এই ফাইলটা বের করতে পারলে বাঁচলেও বাঁচতে পারো৷ আমি নিজের হাতে সানফ্লাওয়ারের গোলমালের ব্যাপারে টপ-ম্যানেজমেন্টের কমিউনিকেশন রেকর্ড সরিয়ে রেখেছিলাম। ও ফাইলের খবর কেউ জানে বলে মনে হয় না৷ দ্যাখো, সে ফাইল খুঁজে পাও কিনা।
- সেভেন্টিন বি বাই টু এইটি সিক্স বাই ডি।
- করেক্ট।
- সব যখন জানতেন, আমায় সাবধান করে দিলেন না কেন সে সময়?
- ওরা আমার রিটায়ারমেন্ট বেনেফিট আটকে দিত। আমি..আমি ভয় পেয়েছিলাম অরূপ। সরি।
- ওহ৷
- অরূপ। একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
- বলুন।
- তুমি আমার খোঁজ পেলে কী করে?
- খোঁজ পাওয়ার কথা তো নয়৷ তাই না?
- কী করে পেলে?
- হেহ্৷ বুঝতেই তো পারছেন।
- অরূপ!
***
- মিসেস দাস৷ এই সেভেনটিন বি বা টু এইটি সিক্স বাই ডি-য়ের ফাইলটার খবর আপনি জানলেন কী করে?
- সেই ইনফর্মেশন আমি শেয়ার করত পারব না৷ মিডিয়ার কাছে শুধু একটাই অনুরোধ। আপনাদের মাধ্যমে সবাই যেন জানতে পারে যে বার্ন্স অ্যান্ড সন্ডার্সের ম্যানেজমেন্ট কতটা কোরাপ্ট৷ শুধু কোরাপ্ট নয়, খুনিও বটে৷ আমার হাসব্যান্ড অরূপ দাসকে তারা খুন করেছে। হয়ত বুকে ছুরি বসায়নি৷ কিন্তু মিথ্যে বদনামের বোঝা চাপিয়ে তাকে শেষ করা হয়েছে।
- সে'টা এখন প্রমাণিত। কোর্ট ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিচ্ছে৷ কিন্তু মিসেস দাস, এই গোপন ফাইলটার খবর তো কেউ জানত না! ফাইলটা যিনি গোপনে বানিয়ে রেখে গেছিলেন, বার্ন্স অ্যান্ড সন্ডার্সের রিটায়ার্রড ম্যানেজার সমর চ্যাটার্জি, তিনি মারা গেছেন বছর সাতেক হল৷ অর্থাৎ তাঁর রিটায়ারমেন্টের বছর তিনেকের মধ্যেই। অরূপবাবুও নিশ্চয়ই সে'টা জানতেন না, জানলে তিনি সুইসাইড করতেন না। কাজেই হঠাৎ আপনি কী'ভাবে..।
- যদি বলি অরূপ ওই ফাইলের খবর আমায় স্বপ্নে দিয়ে গেছে? তা'হলে বিশ্বাস করবেন? আমার আর কিছুই বলার নেই৷ প্লীজ, আমায় এ'বারে একটু একা থাকতে দিন।