Monday, August 7, 2023

মুরারিলাল



- ভায়া!

- উঁ...?

- ও ভায়া..।

- কী ভাইটু?

- এ'বারে তো বাড়ি ফিরতে হয় নাকি! সন্ধ্যে হলো বলে।

- বাড়ি? ধের ধের ধের৷ বাড়িফাড়ি ফিরে লাভ নেই৷ খোঁজ নিয়ে দ্যাখো দেখি, কুতুব মিনারটা কেনা যায় কিনা। অন্তত আশেপাশের দু'কাঠা জমি যদি পেতাম ভায়া মুরারিলাল..। রোজ রাত্তিরে উঠোনে মাদুর পেতে লম্বা হয়ে মিনারের দিকে তাকিয়ে গান ধরতাম। ঠুমরি৷ বা গজল।

- নাহ্। অতগুলো বিয়ারের বোতল ফস্ করে উড়িয়ে দিয়ে মোটেও ঠিক কাজ করোনি। 

- তুমি ভাই বড়ই নেকু মালুম হচ্ছে৷ অথচ খানিকক্ষণ আগে মনে হচ্ছিল শের কা বচ্চা৷ মনে হচ্ছিল, নাহ্, একজন মজবুত লোকের সঙ্গে ইয়ারি হয়েছে বটে৷

- তুমি সত্যিই কবি মানুষ ভাই আনন্দ৷

- শায়র বলো৷ শায়র৷

- গোস্তাখি মাফ।

- ভায়া মুরারিলাল,  তোমার সঙ্গে আলাপ হয়ে কী ভালোই যে লাগছে৷ কয়েকঘণ্টার আলাপ, অথচ মনে হচ্ছে কত জন্ম ধরে অপেক্ষা করছি এমনই এক বন্ধুর৷

- নেশাটা ভালোই চড়েছে তোমার৷

- করেক্ট৷ কিন্তু ইমোশনটা খাঁটি। জানো মুরারিলাল৷ মাঝেমধ্যে বড্ড একলা লাগে৷

- জানি৷ তাই তো এলাম।

- তুমি জানো আমি একা? তাই তুমি যেচে এসে আজ আলাপ করলে? কুতুব মিনার চত্ত্বরে এসে বিয়ার খাইয়ে আউট করলে? তুমি কি দেবশিশু? না ভূত? হে হে হে হে হে হে..বলো না ভাই।

- আমি মুরারিলাল।  সে পরিচয়টুকু কি যথেষ্ট নয়?

- দেখো৷ ফাঁকি দিয়ে সরে পড়ো না৷ গেলে ফোন নম্বর বা ঠিকানাটা অন্তত..।

- তোমার ছেড়ে আর যাব কোথায় বলো৷ হাঁক দিলেই হবে, আমি আসব। ঠিকানা, ফোননম্বর; এ'সব জোলো ব্যাপারে কাজ কী।

- তুমি তো অন্তর্যামী দেখছি৷ বেশ৷ তাই হোক৷ দেখি শ্রীবদনটা..মনের মধ্যে ছাপিয়ে নিই।

- এই চেহারায় আটকে থেকে কী হবে। বোধিসত্ত্বকে আজ দেখছ দিল্লী পোস্টআপিসের ক্লার্কবাবুটি হিসেবে৷ তাই বলে কালকেও সেই শেপ আর ফর্মেই পাবে ভেবেছ?

- আইব্বাস৷ তুমি যে মিস্টিরিয়াস ম্যাজিক ভাই মুরারিলাল। এনিগমা!

- আনন্দ, মনে দিয়ে খুঁজলেই আমায় পাবে৷ মিলের কর্মী, খবরের কাগজ ফেরিওয়ালা, পেটমোটা ব্যবসায়ী বা রিক্সাওলা; ডাকে যদি আন্তরিকতা থাকে বন্ধু, তোমার এই মুরারিলাল কাছে এসে তোমায় জড়িয়ে ধরবেই।

- প্রমিস করছ তো ব্রাদার?

- আলবাত! তবে এ'বার আমি আসি৷ তোমার ঢুলুঢুলু অবস্থা, খানিক পর নেশা হালকা হলে বাড়ি ফিরে যেও।

- আসছ মুরারিলাল?

- তুমি বড় ভালোমানুষ ভাই আনন্দ৷ মনে রেখো, আমি আছি। আর আমি থাকতে তোমার আর একা থাকার চিন্তা নেই৷ প্রাণ খুলে হাঁক পাড়লেই হবে।

- আসবে? ডাকলে এসো কিন্তু মুরারিলাল। এসো৷ কেমন? এসো। 

- আসব৷ কে জানে৷ হয়ত কোনও দিন বাউল হয়ে ফিরে আসবো আর গাইব; " ফিরেও আসব আমি তোমার সুবাসে, থাকবো তোমার বুকে আর আশেপাশে। আমাকে পড়লে মনে খুঁজো এইখানে, এ'খানে খুঁজছি আমি জীবনের মানে"। কেমন দিব্যি হবে না?

- সে'দিন যদি আমি না থাকি মুরারিলাল?

- গানটা তবুও আনন্দেরই থাকবে৷ 

- সাবাশ৷ তুমি ব্যাঘ্রশাবক মুরারিলাল!

Saturday, August 5, 2023

সমর চ্যাটার্জীর সমাধান

- এক্সকিউজ মী৷ আপনি সমরবাবু তো? সমর চ্যাটার্জী?
- হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে তো ঠিক..।
- আপনার হয়ত মনে নেই৷ আমি অরূপ দাস। বার্ন্স অ্যান্ড সন্ডার্সে যখন জয়েন করি তখন আপনি ম্যানেজার।
- অরূপ। অরূপ। মনে পড়েছে৷ আসলে এদ্দিন পর তো..রিটায়ার করেছি তাও তো বছর দশেক হল...মেমরিটা ঠিক..। যাক গে, তুমি তো ফিনান্স ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছিলে? তাই তো?
- আপনার মনে আছে? হ্যাঁ। ইন ফ্যাক্ট, কিছুদিন আপনি হাতে ধরে কন্ট্র্যাক্টের ব্যাপারস্যাপার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সে কৃতজ্ঞতাটা..।
- আই ওয়াজ অনলি ডুয়িং মাই জব। তা তুমি কি এখনও সে অফিসেই..?
- আজ্ঞে হ্যাঁ। এদ্দিন পর পুরীর সৈকতে আপনার সঙ্গে দেখা হবে ভাবিনি৷ তাও এই অসময়ে..রাতের সমুদ্র আপনাকেও টানে দেখছি।
- তা টানে বইকি৷ তা'ছাড়া এ'দিকটা শুনেছি সেফ৷ দশটা না বাজা পর্যন্ত তাই উঠি না৷
- এদিকটা বেশ নিরিবিলি৷ ভীষণ সুন্দর।
- দাঁড়িয়ে রইলে কেন? মাদুরে বসো। একাই বসে থাকি৷ পুরনো আলাপি একজন জুটেছে যখন..।
- থ্যাঙ্কিউ। আপনি কি নিয়মিত পুরী আসেন?
- এই সমুদ্রের সঙ্গে একটা নাড়ির যোগ হয়ে গেছে বোধ হয়..।
- স্যার, একটা প্রশ্ন ছিল, যদি কিছু মনে না করেন..।
- অফ কৌর্স।
- হয়ত আপনার কিছুই মনে নেই৷ তবু৷ আগ্রহটা ছিল তাই..আপনি রিটায়ার করার সাত দিন আগে সানফ্লাওয়ার শিপিং কোম্পানির একটা কন্ট্রাক্ট তাড়াহুড়ো করে প্রসেস করা হয়৷ ম্যানেজমেন্টর হুকুমেই। যদিও ব্যাপারটা ঘটানো হয় আমার হাতে দিয়ে৷ সে'দিন সমস্তটা বুঝিনি৷ কিন্তু এদ্দিন পর একটা অডিটে সানফ্লাওয়ার শিপিং নিয়ে একটা বড় গোলমাল ধরা পড়েছে৷ বেশ বড় ফিনান্সিয়াল স্ক্যান্ডাল৷
- এ ব্যাপারে আমায় আবার কেন..।
- আপনি আমায় কিছুই বলেননি সে সময়৷ কিন্তু গোলমালের ব্যাপারটা আপনি ঠিক আঁচ করেছিলেন। তাই তো?
- এ'বারে আমি উঠব৷
- সরি মিস্টার চ্যাটার্জি৷ কিন্তু ব্যাপারটা এতই..। পুলিশের হাতে যে কী বিশ্রী হেনস্থা হতে হয়েছে..আমার ফ্যামিলিটা শেষ হয়ে যাচ্ছে..।
- তুমি কাকতালীয় ভাবে পুরী আসোনি তা'হলে৷ রীতিমতো খোঁজখবর নিয়ে আমার পিছনে লেগেছ..।
- স্যার, প্লীজ..।
- তুমি কি আমায় চোর ভেবেছ? ঘুষখোর?
- অন দ্য কনট্রারি, আমার বিশ্বাস আপনি এর বিরুদ্ধে ছিলেন। নেহাত ম্যানেজমেন্টের জারিজুরির ওপরে কিছু করতে পারেননি..।
- এ ব্যাপার নিয়ে আমি আর একটাও কথা বলব না৷
- সমরবাবু। স্যার, তখন আমি অফিসে নতুন৷ অল্প বয়স। আটঘাট কিছুই বুঝতাম না৷ অথচ আজ এদ্দিন পর বিশ্রীভাবে আমায় ফাঁসানো হয়েছে৷ আমার মানসম্মান সমস্তই...। আপনি যদি আমায় একটু গাইড করতে পারেন..আপনার নিশ্চয়ই কিছু মনে আছে..। ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধে প্রমাণ না পেলে..আমার নামের ওপর থেকে কালিটা আর মোছা যাবে না।
- দেখো অরূপ..।
- প্লীজ স্যার৷ প্লীজ৷
- সতেরোর বি বাই টু এইটি সিক্স বাই ডি। স্টোররুমের আর্কাইভ থেকে এই ফাইলটা বের করতে পারলে বাঁচলেও বাঁচতে পারো৷ আমি নিজের হাতে সানফ্লাওয়ারের গোলমালের ব্যাপারে টপ-ম্যানেজমেন্টের কমিউনিকেশন রেকর্ড সরিয়ে রেখেছিলাম। ও ফাইলের খবর কেউ জানে বলে মনে হয় না৷ দ্যাখো, সে ফাইল খুঁজে পাও কিনা।
- সেভেন্টিন বি বাই টু এইটি সিক্স বাই ডি।
- করেক্ট।
- সব যখন জানতেন, আমায় সাবধান করে দিলেন না কেন সে সময়?
- ওরা আমার রিটায়ারমেন্ট বেনেফিট আটকে দিত। আমি..আমি ভয় পেয়েছিলাম অরূপ। সরি।
- ওহ৷
- অরূপ। একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
- বলুন।
- তুমি আমার খোঁজ পেলে কী করে?
- খোঁজ পাওয়ার কথা তো নয়৷ তাই না?
- কী করে পেলে?
- হেহ্৷ বুঝতেই তো পারছেন।
- অরূপ!
***
- মিসেস দাস৷ এই সেভেনটিন বি বা টু এইটি সিক্স বাই ডি-য়ের ফাইলটার খবর আপনি জানলেন কী করে?
- সেই ইনফর্মেশন আমি শেয়ার করত পারব না৷ মিডিয়ার কাছে শুধু একটাই অনুরোধ। আপনাদের মাধ্যমে সবাই যেন জানতে পারে যে বার্ন্স অ্যান্ড সন্ডার্সের ম্যানেজমেন্ট কতটা কোরাপ্ট৷ শুধু কোরাপ্ট নয়, খুনিও বটে৷ আমার হাসব্যান্ড অরূপ দাসকে তারা খুন করেছে। হয়ত বুকে ছুরি বসায়নি৷ কিন্তু মিথ্যে বদনামের বোঝা চাপিয়ে তাকে শেষ করা হয়েছে।
- সে'টা এখন প্রমাণিত। কোর্ট ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিচ্ছে৷ কিন্তু মিসেস দাস, এই গোপন ফাইলটার খবর তো কেউ জানত না! ফাইলটা যিনি গোপনে বানিয়ে রেখে গেছিলেন, বার্ন্স অ্যান্ড সন্ডার্সের রিটায়ার্রড ম্যানেজার সমর চ্যাটার্জি, তিনি মারা গেছেন বছর সাতেক হল৷ অর্থাৎ তাঁর রিটায়ারমেন্টের বছর তিনেকের মধ্যেই। অরূপবাবুও নিশ্চয়ই সে'টা জানতেন না, জানলে তিনি সুইসাইড করতেন না। কাজেই হঠাৎ আপনি কী'ভাবে..।
- যদি বলি অরূপ ওই ফাইলের খবর আমায় স্বপ্নে দিয়ে গেছে? তা'হলে বিশ্বাস করবেন? আমার আর কিছুই বলার নেই৷ প্লীজ, আমায় এ'বারে একটু একা থাকতে দিন।

হেঁসেল আয়ুর্বেদ



পরিস্থিতি:
গোটাদিন হাবিজাবি খাওয়া হয়েছে,
অসময়ে যা-নয়-তাই গেলা হয়েছে।

প্রাথমিক প্ল্যান:
আজ তবে ডিনারটা বাদ থাক৷

পরক্ষণেই দুশ্চিন্তা: এক্কেবারে বাদ যাবে?

মায়ের মজবুত উত্তর: "না"।

মায়ের সলিউশন:
দু'চামচ মাখন।
তার ওপর তিন হাতা ফেনাভাত, গোবিন্দভোগের।
পাশে; সর্ষের তেল-ভাজা শুকনোলঙ্কা দিয়ে কষে মাখা আলুসেদ্ধ।

তারপর যা হওয়ার তাই হয়; ঘণ্টাখানেক আগে রিলিজ করা ডিনার বাতিলের প্ল্যান বেমালুম চেপা যাওয়া হয়৷

এরপর।
ডাইনিং টেবিলে বসে চোখ, নাক, প্রাণ আগে জুড়োয়৷ তারপর জিভ। আর তারপর বাবু আত্মারাম মিউমিউ করে খাঁচায় ফেরত এসে ল্যাজ নাড়ে।

গোটা দিনের হুড়মুড়, ছোটাছুটি আর মেজাজ খটমটানোর ক্লান্তি; নিমেষে হাওয়া। এ'টাই বোধহয় হেঁসেল আয়ুর্বেদ। 

আলুভাজায়নম্‌

১। বুঝলি রে, এ'ভাবে কেউ আলু কাটে না৷ আনইভেন, ইনকসিস্ট্যান্ট৷ নাহ্, এদ্দিনেও কিছু শেখাতে পারলাম না।

২। আরে ধুর ধুর, এ'ভাবে কেউ আলু ভাজে না৷ আরও তেল, আরও ধৈর্য। দেখেও কি শিখতে পারিস না?

৩। এহ্ হে। আলুভাজাতে সত্যিই ডোবালি রে তুই ভাই। দেখেই ভক্তি আসছে না৷ যাক গে।দেখি ক্যালামিটিটা কতটা সিরিয়াস৷ প্লেটে অল্প দে ৷ ডিনারে আদৌ সার্ভ করা যাবে কিনা..চেখে দেখি৷ অতটা নয়, অল্প৷ আর একটু কমা৷ আর একটু। আর একটু কমা। আর একটু? কমা? গুড৷

৪। হুম। ওকে৷ ভেবে দেখি।

৫। আরও একটু দে দেখি৷ যত্ন করে চিবুতে হবে। আহ্। চামচে দিয়ে তুলিস না৷ কিপটেচন্দ্র চিপ্পুসদাস। একটা হাতা আন।

৬। আরও একটু দে বুঝলি৷ কোয়ান্টিটি চেপে দিলে আলুভাজা অ্যাপ্রিশিয়েট করা যায় না।

৬। আরে ধেচ্ছাইছাতারমাথা। ভালো করে দে না শালা!

৭। বলছি, রাতের জন্য কি খুব কম পড়বে? আর দু'টো দিবি? ও কী..হামানদিস্তা তো চাইনি, ও'টা নিয়ে কী করছিস?

সিনেমার চরিত্র এবং মুহূর্তরা



সিনেমার চরিত্র এবং মুহূর্তরা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে। তাদের স্ক্রিনে দেখছি না বলে তাদের সিনেমাত্ব কিছুমাত্র খর্ব হয় না৷ এই যেমন বাজারঘাটে খোশমেজাজি দরদামের দৃশ্যপট অবলীলায় কোনও বাসু চ্যাটার্জির সিনেমার অংশ হতে পারত। হয়নি। তবে সে না হওয়ায় তার 'সেলুলয়েড ভ্যালু' কম হয়না৷

যারা সিনেমা তৈরি করেন, তাদের কথা ভেবে সত্যিই মাথা নুইয়ে আসে। এ জীবনে শাহরুখ সৌমিত্র নাসিরের ধারেকাছে ঘেঁষা গেল না৷ কিন্তু তাঁদের সৃষ্টি করা কত চরিত্র যে আমাদের অজান্তেই আমাদের পাশে এসে বসেছে; ট্রেনে-বাসে, বাজারঘাটে, বা চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে; সে'সব ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।