Saturday, July 1, 2023

ট্রেনের জানালা



ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকার নিয়মাবলি:

১-ক: ট্রেন নন-এসি হলে, জানালার গ্রিলে থুতনি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে হবে৷
১-খ: ট্রেন এসি হলে, জানালার কাচে নাক ঠেস দিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিতে থাকতে হবে।
খ: মনে রাখতে হবে, কোনও দৃশ্যপটই অদরকারী নয়।
গ: পাশে বসে কেউ বাজে প্রশ্ন করে চললে অন্যমনস্ক অনিচ্ছুক "হুঁ হাঁ" দিয়ে তাকে নিরস্ত করতে হবে।
ঘ: অচেনা প্ল্যাটফর্ম পেরোনোর সময় বাড়তি মনযোগ দরকার। প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিগুলো কেমন? খাবারদাবারের দোকান কিছু আছে কি? টিকিটঘর, ওয়েটিংরুম, জলের ব্যবস্থা ইত্যাদি চোখে পড়ছে কি? এ'সব জিনিস মনেমনে নোট করতে বা পারলে জানালার সীটটাই মাটি৷
ঙ: মাঠ-ঘাট-গাছপালা সাঁইসাঁই করে পেরনোর সময় দু'চারকলি গান গুনগুন না করলেই নয়৷ তবে ট্রেনের আওয়াজ ছাপিয়ে সে সুর যেন নিজের কানে না ঢোকে, তা'তে সঙ্গীতরসে বিঘ্ন ঘটার সমূহ সম্ভাবনা৷
চ: রেলের ব্রিজ (যে সাইজেরই হোক) পেরোলেই, বাড়তি উত্তেজনাটাকে ফ্লো করতে দিতে হবে৷ কেউ পাত্তা না দিলেও বলে উঠতে হবে "আইব্বাস, দ্যাখ দ্যাখ দ্যাখ"!
ছ: মাঝেমধ্যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য অবাক হয়ে দেখতেই হবে যে কী'ভাবে গাছপালা সব একটা দ্রুতগতির কনভেয়ার বেল্টে উল্টোদিকে ছুটে চলেছে আর ট্রেন একই জায়াগায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷

ক্রিকেট দেখুন



মনকে ভালো রাখতে,
মেজাজকে চনমনে রাখতে,
ক্রিকেট দেখুন।

মোবাইলে, ল্যাপটপে, টিভিতে, ক্রিকইনফোতে;
প্রয়োজনে পাশে বসা মানুষটার স্ক্রিনে উঁকি মেরে।
যে'খানে জোটে, ক্রিকেট দেখুন।

লাইভ ম্যাচে সুবিধে না করতে পারলে, ইউটিউবের দ্বারস্থ হোন।
প্রিয় ব্যাটসম্যান বোকার মত আউট হলে বা প্রিয় বোলার বেদম ঠ্যাঙানি খেলে; তাঁদের পুরনো পার্ফর্ম্যান্স দেখে গর্জে উঠুন।
কিন্তু দেখুন, ক্রিকেট দেখুন।

মনভার বুকে-হুহু যাই হোক, ক্রিকেট ছাড়বেন না।
কারণ আপনার শত দুঃসময়েও; ক্রিকেট আপনাকে ছেড়ে যায়নি।

লিঙ্কডইন ও মুড়ি-বেগুনি

লিঙ্কডইন আমি: ভুলে যেওনা ব্রাদার, লাইফ ইজ নট আ বেড অফ রোজেস। স্ট্রাগল তো থাকবেই, সে'সব পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে পারাটাই হল এক্সেলেন্স।
মুড়ি-বেগুনি আমি: এই একটা দামী কথা বলেছ।
লিঙ্কডইন আমি: কথা দামী না হলে সে'সব মার্কেটে ছাড়বই বা কেন।
মুড়ি-বেগুনি আমি: মার্কেটে আমাদের মত মর্কটদের জায়গা নেই বলছ?
লিঙ্কডইন আমি: মার্কেটে নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে হবে৷ নিজেকে এস্টাব্লিশ করতে হবে৷ দাপট না দেখালে চলবে কেন? ওই যে বললাম, মনে রাখতে হবে যে লাইফ ইজ নট আ বেড অফ রোজেস।
মুড়ি-বেগুনি আমি: আহা! ভারী দামী কথা৷ লাখটাকা ভরি একএকটা শব্দ।
লিঙ্কডইন আমি: এই, ঠাট্টা করছ না তো?
মুড়ি-বেগুনি আমি: সিরিয়াসলি ভাই৷ সত্যিই তো, জীবনকে গোলাপ ছড়ানো বিছানা ভাবলেই গা কেমন ঘিনঘিন করছে। জীবন অত খেলো নয়৷ জীবন হল গিয়ে..! এই যে ভাইটি..শোনো না৷ এ'বার আমিও একটা দামী কথা বলব। বলি?
লিঙ্কডইন আমি: তুমিও দামী কথা বলবে? মার্কেটে অতিরিক্ত দামী কথা চালাচালি হলে কথার দাম পড়ে যাবে যে। বেসিক ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই ইস্যু। তবে ইচ্ছে হয়েছে যখন বলো। শুনি।
মুড়ি-বেগুনি আমি: অর্জ কিয়া হ্যায়..।
লিঙ্কডইন আমি: এই আবার নাটুকেপনা শুরু হল..উফ!
মুড়ি-বেগুনি আমি: লাইফ ইজ নট আ বেড অফ রোসেস। বাট লাইফ ক্যান বি আ কাঁথা অফ নয়নতারাস৷ একটু চোখকান খোলা রাখলেই হল।
লিঙ্কডইন আমি: তুমি কান ধরে বাহাত্তরবার ওঠবস করো ব্রাদার।

বার্ডস আর নট রিয়েল

আমি সম্প্রতি একটা জরুরী ফেসবুক গ্রুপ জয়েন করেছি। বার্ডস আর নট রিয়েল।
প্রথম দু'দিন চরম বিরক্তিতে কেটেছে। মহাগুলবাজদের গ্রুপ। পাখি মানেই নাকি ড্রোন। পাখি আদতে আদিম বট। ইত্যাদি। ইত্যাদি। ঘ্যাচাং করে আনফলো করে দিলাম। কিন্তু কী মনে হলো, বেরিয়ে আসিনি গ্রুপ থেকে।
এরপর একটা অদ্ভুত ব্যাপার শুরু হলো। টাইমলাইনে আর সে গ্রুপ থেকে পোস্ট আসে না। কাজেই আমি সেই গ্রুপে যাতায়াত আরম্ভ করলাম। কেন করলাম? জানি না। দিন পাঁচেকের মাথায় আমার প্রাথমিক অবজ্ঞার মধ্যে সামান্য সন্দেহ এসে মিশলো। তলিয়ে ভেবে দেখলাম, পাখিরা আদতে কিন্তু মহাফেরেব্বাজ। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি। ডানাওলা জিনিস, সুটসাট উড়ে বেড়ায়। এত হাজার বছরে মানুষকে তারা কনভিন্স করতে পেরেছে যে তাদের মুখ দিয়ে বেরোনো চ্যাঁ-চোঁ চিকিরমিকির মার্কা হেজিপেজি শব্দ আসলে গান। গান না হাতির মাথা। এই জাতকে চোখ বুজে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। কেমন?
মানছি, ৯৯% সম্ভাবনা যে তারা রিয়েল। কিন্তু ১% সন্দেহ ওদের প্রতি রাখতে পারলে মানুষের মঙ্গল। কাজেই আজকাল পায়রা দেখলেই বাঁকা চোখে দেখছি। পালকের আড়ালে স্ক্রু-পেরেক যদি কিছু নজরে পড়ে। একটা কাকের ইয়ে গায়ে পড়ল। ঘেন্নার মধ্যে সামান্য আতঙ্কের চোনা মিশে গেল; কোনও ঘ্যাম লেভেলের কেমিকাল এজেন্ট নয় তো?
দিনকাল ভালো না। উড়ুউড়ু বদখত জিনিসপত্র দেখলেই আদেখলাপনা করব না ঠিক করেছি।

অভ্রর জন্মদিন



- অভ্র! মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্য ডে!
- থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ অরূপদা।
- কেমন আছ?
- খুব ভালো৷ অনেকদিন পর তোমার মেসেজ পেয়ে কী'ভালোই না লাগছে। আর আজকাল জন্মদিন-টন্মদিন বেশ মনে রাখছ দেখছি৷ বিয়েটা তা'হলে ক্যারেক্টার রিফর্মেশনে হেল্প করছে বলো।
- হা হা! বিয়ের খবরটা পেয়েছ দেখছি।
- ফেসবুক থাকতে এ'সব ব্যাপার চুপচাপ সেরে ফেলা ইম্পসিবল৷ যা হোক, কনগ্র্যাচুলেশনস। আমাদের পাওনা-ভোজটা ভুলে যেও না৷ তুমি শহরে ফিরলেই একটা আসর বসা চাই।
- লাইক গুড ওল' টাইমস। হ্যাঁ রে, তোর সেই গান-বাজনার অভ্যাসটা আছে তো?
- আজকাল হারমোনিয়াম ছেডে য়্যুকুলেলে ধরেছি বুঝলে। টুংটুং বাজিয়ে একের পর গাইছি আর ইন্সট্যাগ্রামে আপলোড করছি৷
- রিয়েলি! লিঙ্ক পাঠাস তো। শুনব।
- এই'যে। এ'টা গতকালই আপলোড করলাম৷ <লিঙ্ক>।
- বাহ্৷ এ তো দেখছি বাউল। শুনব।
- আরও কিছু আছে প্রোফাইলে৷ সময় পেলে সে'গুলোও শুনো। আর ফীডব্যাক দিও।
- এই ভিডিওতে দেখছি আমাদের পাড়ার দীপকও তোর সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে। ও কেমন আছে?
- তোমারই ক্লাবে ভিড়েছে। মাসখানেক আগে বিয়েটা সেরে ফেললে।
- বটে! দাঁড়া। ওকে কংগ্রাচুলেট করে মেসেজ করি।
- লাভ নেই মেসেজ করে। সে এখন সোশ্যাল মিডিয়া ডিটক্সে আছে৷ হোয়্যটাস্যাপ বা কোনও মেসেঞ্জারে পাবে না। এসএমএস-ও সে দেখবে না৷ তাকে পেতে হলে একমাত্র উপায়, আদি অকৃত্রিম টেলিফোন।
***
অ্যালার্মটায় চমকে উঠলে অরূপ।
ফোন হাতে তুলে দেখলে:
"ওয়ান নিউ কনভার্জেশন ইনিশিয়েটেড অ্যান্ড সাকসেসফুলি কনক্লুডেড৷
ওয়ান পেন্ডিং অ্যাকশন পয়েন্ট"।
নোটিফিকেশনটা পড়ে মনটা দিব্যি ভালো হয়ে গেল৷ ব্যাক্তিগত এ-আই বটটা যে কী উপকারি। অরূপের আনসোশ্যাল বদনামটা এদ্দিনে ঘুচেছে। হুররাহ্ বলে একটা মার্কিন কোম্পানির তৈরি এই বট-অ্যাসিসস্ট্যান্ট কিনতে বেশ খানিকটা খরচের ধাক্কা, তবে একবার কিনে ফেললে কাজ হয় ম্যাজিকের মত। বট-বাবাজি দিব্যি নিজের প্রভুর কথাবার্তার স্টাইল ও ভাষার মারপ্যাঁচ রপ্ত করে নেয়; একশো বারোটা ভাষায় নিখুঁত ভাবে কাজ করে। ব্যাপারটাও জলবৎ। নিজের সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকসেস দিয়ে দাও। নিজের ব্যাপারে শ-খানেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বায়ো আপলোড করে দাও। তারপর, ইউজারকে ঠিক করতে হবে সে কোন ডিগ্রীর সামাজিক জীব হতে চায়; দশটা লেভেল, অরূপ নিজেকে ছয়ের ঘরে রেখেছে। ব্যাস, নিশ্চিন্দি। বট বাবাজি নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে খবর রাখবে কোন আত্মীয় বা বন্ধু কী করছে, তাদের জীবনের ভালোমন্দ রাখবে নখদর্পনে। আর তারপর অবিকল ইউজারের ব্যক্তিগত স্টাইলেই সবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে, চ্যাটে গল্প-আড্ডা জমাবে। বিশেষ দিনগুলোয় বিশেষ-বিশেষ মেসজ পাঠিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে। আর অন্য কারুর বোঝার উপায় রইবে না যে সেই চ্যাটগুলো আদতে অরূপের বদলে তাঁর আজ্ঞাবহ দাস, হুররাহ্ কোম্পানির বট, চালিয়ে যাচ্ছে।
খানিকক্ষণ আগেই যেমন দিব্যি সেই বট-ভাইটি অরূপের হয়ে হাজার পুরনো পাড়ার পরিচিত মুখ অভ্রর সঙ্গে গল্প করে ফেলেছে খানিকটা। স্বাভাবিকভাবেই অভ্র টেরও পায়নি যে সে অরূপের বটের সঙ্গে গল্প জুড়েছে। ম্যাজিক সে'খানেই৷ এ বট কিনতে গিয়ে অরূপকে মোটা টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে বটে, কিন্তু গোটা ব্যাপারটা যে পয়সা-উশুল পর্যায় গেছে, এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। যাক, অভ্রর মাধ্যমে বট জানতে পেরেছে যে আর এক পরিচিত মুখ দীপক সদ্য বিয়ে করেছে। অভ্রর মত দীপকও ছেলেবেলার পাড়ার বন্ধুদের মধ্যে পড়ে। যেহেতু দীপক সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই, তাই বট পুরোপুরি কাজটা সেরে ফেলতে পারেনি।
এ'বার দীপককে একটা ফোন করতেই হয়।
***
- হ্যালো! দীপক?
- আরে। অরূপদা। কেমন আছ?
- আমি? ভালোই। কংগ্রাচুলেট করতে ফোন করলাম। বিবাহিত জীবন আশা করি ভালোই কাটছে।
- ওহ্। ধন্যবাদ অরূপদা।
- কী, ব্যাপার বল তো৷ এদ্দিন পর কথা হচ্ছে...তুই এত ঝিমিয়ে কথা বলছিস কেন?
- আমি ভাবলাম তুমি খবরটা জেনে ফোন করেছ..।
- কী খবর? খানিকক্ষণ আগে অভ্রর সঙ্গে হোয়্যাটস্যাপে কথা হচ্ছিল৷ সেই জানালে তুই বিয়ে করেছিস..।
- অভ্র? অভ্রর সঙ্গে তোমার খানিকক্ষণ আগে কথা হচ্ছিল?
- এই ধর, আধঘণ্টা আগে কথা হল। আজ সে ব্যাটার জন্মদিন তাই পিং করেছিলাম..।
- অরূপদা..।
- তা সেই বললে যে তুই নাকি..।
- অরূপদা। সামান্য গোলমাল হচ্ছে। ঘণ্টাখানেক আগেই একটা মোটরবাইক অ্যাকিসিডেন্টে সে..সে..। ঘণ্টাখানেক আগেই অভ্র মারা গেছে অরূপদা।
- কিন্তু..কিন্তু..।
- ও ফোনে কোনও এ-আই বট ব্যবহার করত শুনেছি। কী এক হুররাহ কোম্পানির সোশ্যাল বট..তা'তেই বোকা বনেছ হয়তো..সরি তোমার এ'ভাবে..।