Sunday, March 12, 2023

শ্যামল সাহার পাগলামো

- এই, আপনি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করতে এসেছেন?
- সে কী ডাক্তারবাবু, আপনি পাড়ার একজন রেস্পেক্টেড মানুষ৷ আপনার সঙ্গে ঠাট্টা করব? তা'ছাড়া আমি এমন একটা ট্র্যাজিক সমস্যার কথা বললাম, সে'টাকে এ'ভাবে উড়িয়ে দিচ্ছেন কেন৷
- দেখুন শ্যামলবাবু৷ আপনার দরকার ওঝার৷ সে এসে ঝ্যাঁটাপেটা করলে তবে আপনার মাথা থেকে এই বিটকেল ভূতটা নামবে৷
- আপনার ধারণা আমি ভুলভাল বকছি?
- ধারণা? না৷ আমি শ্যিওর৷
- আমায় অমনভাবে ঠেলে সরিয়ে দেবেন না প্লীজ৷
- আমি আর একবার গুছিয়ে বলি? আপনি বেড়ালের ভাষা বুঝতে পারছেন, এ'টাই আপনার রোগ, তাই তো?
- স্পষ্ট৷ ক'দিন ধরেই হচ্ছে৷ এই যেমন স্বপন জোয়াদ্দারের খয়েরি রঙের বেড়ালটা কাল রাত্রে আমায় "মিচকে শয়তান" বলে টোন কাটলে৷ বিশ্বাস করুন, আমি স্পষ্ট শুনেছি৷ আবার ওই মোড়ের মাথায় যে বেঢপ সাইজের হুলোটা ঘুরঘুর করে, সে রীতিমত সদালাপী৷ আজ সকালে আমি রতনের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম৷ আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুধোলে, "ক'টা বাজে কাকা"? আমি স্যাট করে বললাম "পৌনে আট"৷ বলেই বুক কেঁপে উঠল৷ বেড়ালের সঙ্গে গপ্প জুড়েছি? কিন্তু উত্তর দিয়ে ফেলেছি, তাই দু'চারটে কথা বলতেই হল৷ ওই, ওয়েদার, পলিটিক্স, ইত্যাদি৷ যাওয়ার আগে সে হুলো বলে গেল "রতনমামা বড্ড কেয়ারলেস৷ আমি যে দুধ চেটে গেলাম, সে'টা দিয়ে চা বানিয়ে খদ্দেরদের গেলাচ্ছে"। কী ডেঞ্জারাস ভাবুন ডাক্তারবাবু৷
- শ্যামলবাবু৷ এই, একটু চুপ করবেন? আপনার ফীজ আমার চাই না৷ এ'বারে আসুন দেখি৷
- ডাক্তারবাবু...।
- প্লীজ৷ আর না শ্যামলবাবু৷ আসুন এ'বারে।
- বেশ৷
***
"বেশ করেছেন ডাক্তারবাবু। শ্যামল সাহার পাগলামোটা দিনদিন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে"।
মাথা নাড়লেন ডাক্তার, " শ্যামলবাবু সজ্জন মানুষ। তার এমন দূর্দশা, ইশ্...ভাবা যায় না"।
বলেই চমকে উঠতে হল৷ আরে, শ্যামলবাবু চেম্বার থেকে বেরোনোর পর তো আর কেউ ঢোকেনি ঘরে। চোখে ঝিমটি লেগে গেছিল কি? কণ্ঠস্বরটা কেমন যেন...।
"পরেরবার শ্যামল সাহা এলে সোজা বিদেয় করে দেবেন৷ ব্যাটা গুলবাজ"।
এ'বারে সোজা হয়ে বসলেন ডাক্তার৷ কে? কে কথা বলছে? কাউকে দেখা যাচ্ছে না অথচ..।
ঠিক তখুনি, একটা সাদার-ওপর-খয়েরি-ছোপ বেড়াল তড়াং করে ডাক্তারের টেবিলে উঠে পড়ল৷ ডাক্তার অবাক হয়ে শুনলেন, বেড়ালটা অবিকল শ্যামলবাবুর কণ্ঠস্বরে বলে উঠলে, "ওই শ্যামলকে বেশি পাত্তা না দিয়ে ভালোই করেছেন৷ ব্যাটা নুইসেন্স ক্রিয়েট করতে ওস্তাদ"৷ এই বলেই সে বেড়ালটা একলাফে প্রেশার মাপার যন্ত্র উলটে দিয়ে উত্তর দিকের জানালা দিয়ে গায়েব হয় গেল৷
আধঘণ্টা মত গুম হয়ে বসে থাকার পর ব্যাপারটা ডাক্তারবাবুর মগজে একটু স্পষ্ট হল৷ চট করে শ্যামলবাবুর মোবাইলে ফোন করলেন তিনি৷
- শ্যামলবাবু! আপনি কোথায়?
- এই বাড়িতে ঢুকলাম খানিকক্ষণ আগে৷ ইন ফ্যাক্ট আপনাকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম..।
- শুনুন। আপনার বেড়ালের কথা শোনার সমস্যাটা আচমকা কেটে গেছে, তাই না ? এ'টুকু সময়ের মধ্যেই..।
- কী আশ্চর্য! সে'টা বলতেই তো ফোন করার তাল করছিলাম৷ বাড়ি ঢোকার মুখে একটা মেনিকে দেখতে পেয়ে দরাজ গলায় শুধোলাম, "কেমন আছো মা"?৷ আমি ভাবলাম স্কুল-কলেজ কেমন চলছে সে'খবর দেবে৷ ও মা, সে বিড়ালটি বললে, " ম্যাঁও, মিঁউউউ"৷ কী আশ্চর্য ব্যাপার বলুন দেখি।

মনোজবাবুর লেখালিখি

- কী রে, খুব ব্যস্ত নাকি?
- আরে, মনোজ। বাঁচালি ভাই। কদ্দিন ধরে ভাবছি কবে তুই আসবি। তা, একটা ফোন করে এলি না কেন? ইদানীং শ্যামলাল একটা নতুন ধরণের ডিমের চপ ভাজা শুরু করেছে। তবে সে'টার জন্য আগে থেকে কিমা আর কুচোচিংড়ি আনিয়ে রাখা দরকার।
- সে'সব গুরুপাক পরে হবে'খন। এখন আগে ওঁকে দু'কাপ চা করতে বল দেখি দেবু। জরুরী কথা আছে।
- দাঁড়া, এ'সময়টা শ্যামলাল একটা সিরিয়াল দেখে। এখন ওকে ডিস্টার্ব করাটা সমীচীন হবে না। দু'মিনিট বস, আমি চা বসিয়ে দিচ্ছি।
- না না, তুই বস বরং। আমার তো আর তাড়াহুড়ো নেই। জরুরী কথাটা আগে সেরে নিই।
- নভেলটা শেষ করেছিস মনে হচ্ছে?
- আজ সকালেই শেষ চ্যাপ্টারটা লিখলাম। জানিস তো আমায়, তোকে না শোনানো পর্যন্ত সোয়াস্তি পাচ্ছিলাম না।
- এক্সাইটিং। উফ, কদ্দিন পর গল্প পড়বি বলে এলি ভাই। আজ কিন্তু জমিয়ে আড্ডা হবে।
- আলবাত। তোর ফিডব্যাক ছাড়া তো আর প্রকাশকের কাছে পাঠিয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না।
- আমি আর সাহিত্যের কীই বা বুঝি। তবে তোর লেখার প্রতি আমার আগ্রহটা বরাবরই পার্সোনাল। বইটই তো নেহাত কম পড়ি না। তোর লেখা আমায় যে'ভাবে ইনফ্লুয়েন্স করে, মুগ্ধ করে...।
- দেখিস। আবার হেগিওগ্রাফি লিখতে বসিস না যেন।
- আরে কী যে বলিস। ইউ ডিজার্ভ ইট। তা'ছাড়া পশ্চিমবাংলায় তোর ভক্তদের সংখ্যা যে'ভাবে এক্সপোনেনশিয়ালি বাড়ছে, সে'টাই প্রমাণ করে যে তোর লেখার ডেপ্থ ঠিক কতটা। আর খামোখা প্রশংসা করার লোক আমি নই, জানিস তো ভাই। তোর জন্য আমার সত্যিই গর্ব হয়। আফটার অল, ক্লাসমেট বলে কথা।
- সে জন্যই তো তোর কাছে বারবার ছুটে আসি দেবু। হ্যাঁ, লিখেটিখে আজকাল একটু সুনাম হয়েছে বটে, তবে কী জানিস...।
- কী ব্যাপার বল তো। তোকে একটু ডিস্টার্বড মনে হচ্ছে?
- আমার বইপত্তর নিয়ে কাগজপত্রে আজকাল বেশ লেখালিখি হচ্ছে। প্রকাশকদের খাতির দিনদিন বাড়ছে। ভিড়ের মধ্যে মানুষজন চিনতে পেরে অটোগ্রাফের খাতা এগিয়ে দিচ্ছে।
- প্রতিপত্তি বাড়ছে, তাই ডিস্টার্বড?
- সত্যি কথা বলতে কী দেবু, সে'সব আমার ভালোই লাগে। লাইমলাইটে থাকতে কে না চায়...কিন্তু মাঝেমধ্যে মনে হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রশংসাগুলো বেশ ফাঁপা। বিশেষত যার যেচে আলাপ করে, গায়ে পড়ে লেখার প্রশংসা করে, তাঁদের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ লেখা না পড়ে কথা বলে। আর লেখক হিসেবে সেই দেখনাই ব্যাপারগুলো বড় গায়ে লাগে।
- বলিস কী...।
- বোঝা যায় রে। একটু খুঁচিয়ে দিলেই ফাঁপা প্রশংসা, আর লোকদেখানো পিঠচাপড়ানি ধরে ফেলা যায়। লেখক হিসেবে, আমি অন্তত পড়তে পারি।
- বেশ তিতিবিরক্ত মনে হচ্ছে তোকে মনোজ।
- বিরক্ত হওয়াটা তো অস্বাভাবিক নয়৷ লোকে এক'দু'পাতা পড়ে গোটা নভেলের রিভিউ লিখে ফেলছে। সাহিত্যসভায় ভারিক্কি চাল ফলিয়ে ভুলভাল রেফারেন্স দিয়ে বাহবা জানাচ্ছে। অনেকে অল্পবিস্তর হয়ত পড়েওছে, অথচ সে'টা নিয়ে বাতেলা ঝাড়বে চোদ্দগুণ৷ বুক বাজিয়ে তাঁরা এই উপন্যাসের নায়কের সঙ্গে অন্য উপন্যাসের ভিলেনকে গুলিয়ে ফেলে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলবে। তুই বল দেবু, গায়ে পড়ে বেফালতু প্রশংসা না করে কথা বলা যায়না নাকি? আমার লেখা পড়তেই হবে এমন দিব্যি কে দিয়েছে?
- তোর মাথাটা দেখছি আগুন হয়ে আছে।
- এই ধর, আজ সকালে অনিল দত্তর সঙ্গে দেখা হল..।
- দিবানিশি পত্রিকার সেই সম্পাদক?
- হ্যাঁ, ওই৷ সে কী বলে জানিস? আমার মরুভূমি উপন্যাসে আমি পরিবেশের রুক্ষতাকে যে' মুন্সিয়ানার সঙ্গে ব্যাবহার করেছি; নায়কের মনের অসহায় অবস্থাকে তুলে ধরতে তার নাকি কোনও জবাব নেই৷ ভাবা যায়! আরে বাবা, মরুভূমির প্লটটা যে আমি চেরাপুঞ্জির ব্যাকগ্রাউন্ডে লিখেছি আর সে'টায় মূল চরিত্র যে সুচরিতা নামের একজন নারী, সে'টা ভদ্রলোক জানেন না কারণ বইটা তিনি পড়েনইনি৷ গাজোয়ারি দু'টো কথা না বললে সম্পাদকে পেটের ভাত হজম হয় কী করে।
- হা হা হা হা হা হা...।
- তুই হাসছিস দেবু?
- হাসব না? মরুভূমির ব্যাপারে তোকে জ্ঞান দিলে অথচ সে ব্যাটা সুচরিতার কথা জানে না!
- তোর এ'টা শুনে গা জ্বলছে না?
- তুই বেশি পাত্তা দিচ্ছিস মনোজ৷ বেনোজল থাকবেই৷ ফোকাস অন দ্য পসিটিভস।
- অসুবিধে হচ্ছে এরাই মেজরিটি৷ সে'দিন কফিহাউসে একজন মহিলা যেচে আলাপ করতে এলে। নিজের পরিচয় দিলে, পেল্লায় কলেজের প্রফেসর৷ স্মার্ট, কথাবার্তায় ধার আছে। সবে যখন মনে হচ্ছে এর সঙ্গে আলাপ হয়ে ভালোই হল; অমনি সে বললে আমার লেখা অনিমিখ সান্যাল চরিত্রটা নাকি তাকে সাংঘাতিক ইনফ্লুয়েন্স করেছে৷ ও'রকম রোম্যান্টিক ক্যারেক্টার নাকি শেষ সে পড়েছে বিভূতিভূষণের লেখায়৷
- অনিমিখ?
- অনিমিখের কথা তুই শুনিসনি, পড়িসনি৷ স্বাভাবিক। কারণ ও'নামে কোনও চরিত্র নিয়ে কোনোদিন কিছু আমি লিখিনি৷ ভদ্রমহিলা শুভময় লাহার একটা উপন্যাসের সঙ্গে আমার লেখা গুলিয়ে ফেলেছেন৷ ওই ভদ্রলোকের লেখা তো বোধ হয় তুই পড়িসটড়িস না, তাই না?
- না, ভীষণ প্রিটেনশাস৷ সহ্য হয় না৷ তবে ভদ্রমহিলাকে বিশেষ দোষ দিতে মন সরছে না রে মনোজ৷ না হয় তোর মধ্যে সুপুরুষ লেখকের সঙ্গে আলাপ জমাতে গিয়ে নার্ভাস হয়ে গল্প-চরিত্র গুলিয়ে ফেলেছে৷ কিন্তু ও'সব রাগ পুষে রাখাটা কিন্তু তোর বাড়াবাড়ি৷
- না রে দেবু। গোটা ব্যাপারটা তুই যতই লঘু করে দেখতে চাস, ইস্যুটা সিরিয়াস৷ লেখক কি শুধুই নামধাম টাকাপয়সা চায় রে? জেনুইন অ্যাপ্রিশিয়েশন আর ক্রিটিসিজম কি পৃথিবী থেকে উবে গেছে?
- আমার মত কয়েকজন এখনও পড়ে আছি ভাই। সে'টার কি কোনও মূল্যই নেই? নাকি অচেনা মানুষের প্রশংসা না পেলে লেখকদের চলে না।
- সরি দেবু, সত্যিই। তোর মত পাঠক-বন্ধু এখনও আছে বলে আমার মত ওঁচা লেখকও লিখে তৃপ্তি পায়।
- ওই, শ্যামলালের সিরিয়াল শেষ হল। দাঁড়া, ওকে বরং আজ কফি বানাতে বলি। সঙ্গে পকোড়া।
- হোক। হোক।
***
নভেলের পাণ্ডুলিপি পড়ে, শ্যামলালের বানানো মুর্গির ঝোল আর এঁচোড়ের তরকারি দিয়ে ডিনার সেরে, দেবুকে টাটা বলে যখন মনোজবাবু ট্যাক্সিতে বসলেন তখন রাত সোয়া এগারোটা। শ্যামলালের রান্নায় সত্যিই জাদু আছে, ও ভাতেভাত রাঁধলেও সে'টা অমৃত মনে হয়। মনোজবাবুর মনের মধ্যে একটা বিশ্রী অন্ধকার জমাট বেঁধেছিল বটে, চমৎকার ডিনারের গুণে সে অন্ধকার খানিকটা কেটেছে। তবে মনের এই খচখচ সহজে যাওয়ার নয়। যে দেবুকে লেখা পড়িয়ে তাঁর এত আনন্দ, সে যে খুব একটা মন দিয়ে তাঁর গল্প-উপন্যাস পড়ে না বা শোনে না; এ'টা ভাবতেই কেমন বুকের ভিতরটা ঠাণ্ডা হয়ে আসে।
দেবু সত্যিই জানে না যে তাঁর মরুভূমি উপন্যাসের মূল চরিত্র সুজয় দত্ত নামের একজন রিটায়ার্ড ইতিহাসের প্রফেসর আর সে উপন্যাসের পটভূমি হল রাজস্থান। আর অনিমিখ সান্যাল যে মনোজবাবুরই কলমে তৈরি হওয়া লেখক, এবং তাঁর "ভোরবেলা" নভেলের নায়ক; সে'টাও দেবু হয় জানেনই না বা বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছেন। ভাবলে অবাক লাগে যে এ'দুটো উপন্যাস নিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে গেছেন মনোজবাবু। আর প্রত্যেকবারই মনে হয়েছে যে দেবু মুগ্ধ হয়ে সে'সব কথা শুনেছে। আজ ব্যাপারটা স্পষ্ট হল অবশ্য, দেবুর মাথা নাড়া ও স্মিত হাসির মধ্যে আস্কারা আছে, ধৈর্য নেই। তবে সে দুঃখ পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। শ্যামলালের রান্নার টানটা এড়িয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। অমন যাদু-রান্নার তুলনায় তাঁর লেখা ছেঁদো উপন্যাস-টুপন্যাস তো নেহাতই এলেবেলে ব্যাপার।

হাই কোয়ালিটির চা-পাতা

- মেসোমশাই!
- কে? অভ্র? কখন এলি?
- সাতটা বাজে, আলো জ্বালোনি কেন?
- এ বয়সে চোখ অন্ধকারেও ঝাপসা। আলোতেও৷
- দ্যাখো দেখি৷ জানালা-টানালা বন্ধ করে কী গুমোট অবস্থা। তোমার শরীর ভালো হবেটা কী করে।
- একটু চা বসাবি বাবা?
- তোমার বলার আগেই বসিয়ে দিয়েছি৷ আজ বিপুলদার দোকান থেকে শিঙাড়া এনেছি৷ চায়ের সঙ্গে দিচ্ছি, দাঁড়াও।
- শিঙাড়া? সইবে রে? আজকাল তো ভাতেভাত খেলেও অম্বল হচ্ছে।
- দ্যাখো মেসো! বয়স তো কম হল না৷ ফ্যামিলি বলতে ফক্কা, কেউ কোত্থাও নেই। তাই অম্বল-টম্বল নিয়ে বেশি ভেবো না৷ যে'কদিন ভাগ্যে আছে, মনের সুখে ভোগ করে যাও।
- বলছিস? দে' তা'হলে। বুঝলি অভ্র, শিঙাড়ার সঙ্গে যদি দু'টো দানাদার হত..।
- দ্যাখো বুড়োর শখ৷ আজ চা দিয়েই সেরে ফেলো। পরের দিন বরং..আচ্ছা মেসো, সামনের শনিবার সিনেমা দেখতে যাবে? বাংলা সিনেমা এসেছে অপর্ণাতে। প্রসেনজিৎ ঋতুপর্ণা। হেবি হিট করেছে।
- নাহ্, তিন ঘণ্টা বসতে পারব না।
- তোমার সব কিছুতেই বাগড়া। আরে চলো৷ ইভনিং শো, তারপর অলকানন্দা রেস্টুরেন্টে মোগলাই পরোটা। ফেরার পথে দানাদারও হবে।
- ও'সব খেলে পরের দিনই হার্ট অ্যাটাক।
- আরে ধুর। তুমি বড্ড নেগেটিভ মেসোমশাই।। একটু সাহস না করলে চলবে কেন৷
- বেশ বেশ। দেখা যাবে৷ তা, হ্যাঁ রে অভ্র..।
- বলো..।
- তুই ছোকরা মানুষ। ইয়ারদোস্ত আছে৷ হাবেভাবে মনে হয় প্রেমট্রেমও করিস৷ তার ওপর এই বাড়িবাড়ি কাগজ দেওয়ার কাজটা নিশ্চয়ই খুব খাটনির৷ রোজ বিকেলে যে এসে পড়ে থাকিস..কেন?
- তোমার সম্পত্তি হাত না করে ছাড়ছি না৷
- আছে বলতে এই চৌকি৷ ওই আলমারি। আর ব্যাঙ্কে দু'চার পয়সা যা আছে, তা দিয়ে তোর দীঘাও যাওয়া হবে না।
- মেসোমশাই..চা।
- শিঙাড়াটা?
- নোলা দ্যাখো। দাঁড়াও৷ আনি৷
- হে হে হে।
- মেসো। ও মেসোমশাই।
- যাবে? সিনেমা দেখতে?
- যাব?
- যাবে?
- যাব। বেশ।
- সুপার! টিকিট কেটে রাখব৷ এই যে, শিঙাড়া।
- কেন আসিস? অভ্র?
- কী'সব ফালতু প্রশ্ন আজ শুরু করেছ৷ বলি, কাগজের টাকা ফাঁকি দেবে না তো? ও'টা বিজনেস৷ ও'খানে কিন্তু বাপ-মাকেও রেয়াত করা নেই মেসো৷ বলে রাখলাম।
- বল না। খামোখা রোজ আসিস কেন?
- এই৷ তুমি বাপ-মা নও৷ ইয়ারদোস্ত নও। প্রেমিকা নও। তোমার সঙ্গে গপ্পে হিসেব নেই৷
- তুই হিসেব ছাড়া গপ্প করতে আসিস?
- জানো মেসো৷ তুমি আমায় কথা বলতে দাও৷ যা খুশি তাই৷ যা খুশি তাই৷ কাজেই, আমি কিন্তু নিজের ধান্দাতেই আসি৷
- কী'সব যে তুই বলিস।
- তুমি কি আমায় বাপ-মায়ের মত চেনো? কাঁচকলা। তুমি কি আমায় শ্যামলীর মত চেনো? ধুর ধুর৷ ঘোঁতনা, বাবলা, নীলু; এরাও আমায় তোমার চেয়ে অনেক বেশি চেনে, ছেলেবেলার বন্ধু বলে কথা৷ অথচ দ্যাখো, একমাত্র তুমিই জানো যে আমার হেমেন-পুরুতের মন্ত্র পড়ার স্টাইলে কাগজ পড়তে হেব্বি ভালো লাগে৷ শুধু তুমিই জানো যে আজকাল আমি চায়ে ডুবিয়ে আলুর চপ খাচ্ছি। শুধু তুমিই জানো আমার সাইকেলের সঙ্গে অটোর ধাক্কা লেগেছিল গত বিস্যুদে৷ সমস্ত হাবিজাবি কথা তোমায় যে কী'ভাবে বলে ফেলি..। কোনও কথাই কাজের নয়, অথচ..।
- অভ্র। শোন না৷ আমি টাকা দেব, কাল ভালো চা-পাতা এনে দিবি? আমি নাম বলে দেব৷
- ঠিক হ্যায়। এনে দেব।
- হাইকোয়ালিটির চা-পাতা না থাকলে বাজে গপ্প জমবে কী করে বল?
- হে হে হে।

আর বলবেন না মশাই

মুখে (ছবি বিশ্বাস ঘ্যামে):
"একটা ফ্ল্যাট কিনেছি, বুঝলেন"। 😎

মনে মনে (তুলসী চক্কোত্তির হাঁপানি-সহ):
"আর বলেন কেন। ব্যাঙ্ক একটা ফ্ল্যাট কিনে আমায় বহু বছরের জন্য ভাড়া দিয়েছে। এমন বিটকেল বাড়িওলা যে উঠে যেতে চাইলেই জুতোপেটা করবে৷ কী ঝ্যামেলা বলুন দেখি"। 🥲

Thursday, March 2, 2023

লুচি-চাই লুচি-চাই



নিজেকে সবসময় বুঝিয়ে চলেছে যে  মনের মধ্যে সবসময় ওই লুচি-চাই লুচি-চাই ভাবটাকে জিইয়ে রাখতে হবে। লুচি-চাই লুচি-চাই ভেবে যাওয়া মানে অবশ্য গাণ্ডেপিণ্ডে লুচি গিলে যাওয়া নয়। শরীর -স্বাস্থ্য বলে একটা ব্যাপার আছে তো; সমুদ্র ভালো লাগে বলেই তো আর রোজ বিকেলে স্বর্গদ্বারের সমুদ্রে গোড়ালি ডুবিয়ে গামছা কাচতে বসব না। তাছাড়া বয়স ব্যাপারটা উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়, হজম-শক্তি আর আগের মত নেই। পোড়া তেলে কাউকে চপ-ফুলুরি ভাজতে দেখতেই গলার কাছটা কেমন জ্বালাজ্বালা করে। এ'সব রূঢ় সত্যকে তো পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তবে ওই লুচি-চাই লুচি-চাই ভাবটা হচ্ছে মনের তরতাজা থাকার লক্ষণ। সে'টাকে টিকিয়ে রাখাটা আমার দায়িত্ব।

ছোটবেলায় শরীর কেমন যাচাই করতে হলেই দাদু বলত, "জিভ বের করো দেখি ভাই"। জিভের রঙ বিচার করে দাদু অ্যানালাইজ করতেন শরীরস্বাস্থ্য কেমন আছে। সে'ভাবেই, মনের হাল-হকিকত বুঝতে হলে নিজেকে জিজ্ঞেস করি, "কী ব্রাদার, লুচি হবে নাকি খান কয়েক"? যদি মনের মধ্যে "একটু লুচি পেলে বড় ভালো হত" গোছের আনচান শুরু হয়ে যায়, তা'হলে বুঝতে হবে সমস্ত ঠিক আছে, সূর্য-চন্দ্র ঠিকঠাক ওঠানামা করছে, মানুষ এখনও কবিতা লিখছে, শ্যামল মিত্রের গান এখনও বুকে হুহু জেনারেট করছে, ইয়ারদোস্তরা এখনও টিকে আছে, প্রেমের চিঠি লেখার ক্ষমতা এখনও খতম হয়ে যায়নি, বাজে চুটকিতে এখনও হো-হো করে হাসতে হাসতে খাট থেকে গড়িয়ে পড়তে পারি। কিন্তু, যদি কখনও মনে হয়; নাহ্‌, এই অবেলায় লুচির কোনও দরকার নেই। তা'হলে বুঝতে হবে সর্বনাশ। লুচি-না-চাওয়া-ভ্যাপসা মন-মেজাজ দিয়ে এ দুনিয়ায় কোনও কাজের কাজ করা সম্ভব নয়। যে মন লুচি সম্বন্ধে নিঃস্পৃহ, তাকে ভরসা করলে ঠকতেই হবে যে। কাজেই, যদ্দিন মনের মধ্যে লুচি-চাই লুচি-চাই ভাব, তদ্দিনই জ্যান্ত।