Sunday, July 24, 2022

বিনোদবাবু আর আদা-চা



মার্ক অ্যান্ড ডগলাস কোম্পানির ফাইলটা ছুঁড়ে ফেললেন বিনোদবাবু। ফাইলের ভিতরের কাগজগুলো এলোমেলো হয় ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল৷ টানা আড়াইমাস বড় খেটেখুটে প্রপোজালটা তৈরি করেছিলেন৷ নিখুঁত ভাবে সাজানো প্ল্যান৷ মার্ক অ্যান্ড ডগলাসের পারচেজ ম্যানেজার মিস্টার পোদ্দার সে প্রপোজালে একবার নজর বুলিয়েই বলেছিলান, "বিউটিফুলি ডান"। সিনহা সাহেব বিনোদবাবুর পিঠ চাপড়ে পোদ্দারকে বলেছিলেন, "বিনোদ আমাদের অ্যাসেট৷ ও' যখন উঠেপড়ে লেগেছে, আপনার কোনও চিন্তাই নেই"৷ বিনোদবাবুর সেই প্রপোজালটা আজ পাস হয়ে গেল, কিন্তু প্রজেক্ট সামলানোর দায়িত্ব পেল সৌম্য দত্ত৷  প্রতিবাদ করেছিলেন বিনোদবাবু, কিন্তু লাভ হয়নি৷ বরং সিনহা সাহেব দাঁত চেপে বললেন যে বিনোদবাবু যেন 'নুইসেন্স ক্রিয়েট' না করেন৷ 

অভয়চরণ আদা দেওয়া চা নিয়ে এসেছিল, মুখঝামটা দিয়ে তাকে কফি আনতে বললেন বিনোদবাবু৷ হতবাক অভয়চরণ কথা বাড়ায়নি৷ ছেলেটা এমনিতেই বেশ নম্র। এরপর  কম্পিউটারে বসেই বিনোদবাবু দেখলেন সিনহা সাহেব ইমেলে নতুন প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরির হুকুম দিয়েছেন।  মেজাজটা আরও ঘেঁটে গেল৷ ইনবক্স বন্ধ করে পায়চারি শুরু করলেন তিনি৷ বয়ে গেছে এমন বিচ্ছিরি পরিবেশে দিনরাত খাটতে৷ বিনোদবাবু মনস্থ করলেন এ'বার থেকে তিনক মনপ্রাণ দিয়ে কাজে ফাঁকি দেবেন। 

হ্যাঁ! ফাঁকি দেবেন৷ সিনহাদের দল বুঝুক ঠ্যালা৷ কিন্তু কী'ভাবে ফাঁকি দেবেন কাজে? চট করে মোবাইলে মিনিট চারেক লুডো খেললেন৷ কিন্তু সে'ফাঁকিটা তেমন মজবুত মনে না হওয়ায় কম্পিউটারের দিকে খামোখা তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ৷ তারপর মনে পড়ল হরপ্রসাদের কথা৷ অ্যাকাউন্টসে কাজ করে। কিন্তু নিজের সীটে তাকে  দেখাই যায়না, দিনরাত শুধু অফিসের বাইরের চায়ের দোকানে গিয়ে চা-মামলেট খাচ্ছ আর বিভিন্ন আড্ডিয়ে দলের সঙ্গে আড্ডা জমাচ্ছে৷ সমস্ত ফিচেল আড্ডার মধ্যমণি হরপ্রসাদ কারণ সে  হল অফিস গসিপের চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া৷ 

যথারীতি সেই চায়ের দোকানের বেঞ্চিতেই পাওয়া গেল হরপ্রসাদ ধরকে৷ গলায় আই-কার্ড, ঠোঁটে সিগারেট, চোখে ঝিলিক৷ দু'জন নতুন ছোকরাকে গ্লোবাল ইকনমি নিয়ে দেদার জ্ঞান দিচ্ছিল৷ বিনোদবাবুকে চা-মামলেটের অর্ডার দিতে দেখে এক গাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো হরপ্রসাদ; "এ কী! বিনোদদা এ'সময় এ'দিকে? স্প্রেডশিট থেকে চোখ সরাবার সময় পেলেন এদ্দিনে"?

আড়াই সেকেন্ড হে-হে করে হরপ্রসাদের পাশে এসে বসলেন বিনোদবাবু৷ হরপ্রসাদ তার ইকনমিক লেকচারে ফেরত গেল৷ বিনোদবাবু বুঝলেন যে এ আড্ডায় সবচেয়ে বড় সুবিধে হচ্ছে বেশি কথা না বললেও চলে কারণ হরপ্রসাদের কথা শেষ হয়না৷ এই ভালো; আড্ডাও হল, অসময়ে মামলেটও হল, আবার কাজে ফাঁকিও দেওয়া যাচ্ছে৷

ভিয়েতনামের ইকনমি থেকে হরপ্রসাদের মনোলগ যখন কানাডার ফিসকাল পলিসিতে পৌঁছেছে,  তখনই বিনোদবাবুর মোবাইলে বেজে উঠল, কনিষ্ঠ পুত্রটি ফোন করেছে, গত মাসে তার পাঁচ  বছর পূর্ণ হয়েছে৷ অতএব সে এখন লায়েক হয়েছে।

"বাবা! তুমি কী করছ"? 

বিনোদবাবুর মুখের মামলেটটা সুট করে বিস্বাদ ঠেকল৷ প্লেটটা নামিয়ে রেখে তড়াং করে উঠে দাঁড়ালেন৷ হরপ্রসাদের লেকচারে ছন্দপতন ঘটল৷ নতুন শ্রোতা হারানোর ভয় বড় সাংঘাতিক৷ 

- ও কী বিনোদদা, চললেন কই? অমলেটটা শেষ করুন৷ আর চা তো আসেইনি৷ আমাদের নির্মল লেবুচা-টা যা বানায় না, এ-ক্লাস৷ আরে বসুন না, এই তো এলেন।

- আসলে হঠাৎ মনে পড়ল, বুঝলে, একটা আর্জেন্ট রিপোর্ট শুরু করতে হবে। দেরী হলেই আবার..।

- কেন এত চাপ নিচ্ছেন৷ রিপোর্ট বানাবেন আপনি। আর প্রজেক্ট পাবে মৃণাল সিনহার পেয়ারের ওই সৌম্য দত্ত। ছাড়ুন না৷ তারচেয়ে বরং জ্যাপানের ইকনোমিক মডেলের ব্যাপারে একটা অদ্ভুত গল্প বলি শুনুন..।

- সৌম্য ইয়ং এনার্জেটিক চ্যাপ৷ কাজ পাক না, ক্ষতি কী৷ আমি বরং আসি৷ মামলেট আর জ্যাপান পরে হবে'খন৷ 

নিজের অফিসঘরে এসেই মেঝেয় ছড়িয়ে থাকা মার্ক অ্যান্ড ডগলাসের কাগজগুলো যত্ন করে ফের ফাইলে গুছিয়ে রাখলেন তিনি৷ অভয়চরণ কফি রেখে গেছিল, ঠাণ্ডা হয়ে গেছে৷ "অভয়" বলে একটা পেল্লায় হাঁক পাড়লেন বিনোদবাবু৷ অভয় এলে তিনটে কাজ সারতে হবে।

এক নম্বর, অকারণ খারাপ ব্যবহার করার জন্য অভয়কে একটা জবরদস্ত 'সরি' বলতে হবে।
দু'নম্বর, আদা দেওয়া চা এক কাপ চাইতে হবে।
তিন নম্বর, মার্ক অ্যান্ড ডগলাস কোম্পানির ফাইলটা অভয়চরণের হাত দিয়ে সৌম্যর কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে৷ ওর বেশ কাজে লাগবে৷ 
অভয় আসার আগেই সে ফাইলে একটা হলুদ স্লিপ এঁটে একটা "অল দ্য বেস্ট" লিখলেন বিনোদবাবু৷

কালী

গুপ্তিপাড়ায় মায়ের পিসির বাড়ি। ছোটবেলায় সে'খানে কয়েকবার গেছি রটন্তী কালীপুজো দেখতে। সে পুজো হত মাঝরাতে, শীতের অমাবস্যার কনকন ছাপিয়ে জমজমাট আয়োজন। গুপ্তিপাড়ার দাদু, অর্থাৎ মায়ের পিশেমশাই নিজেই পুজো করতেন। ঋষিসুলভ মানুষ; শান্ত, গম্ভীর অথচ হাসিহাসি মুখ। প্রচুর আত্মীয়স্বজন জড়ো হত। নিপাট ভক্তির সঙ্গে হইহইরইহই মিলেমিশে সে অন্ধকার রাত্রি আলোআলো হয়ে উঠত। সন্ধ্যে থেকে বড়রা পুজোর আয়োজনে ব্যস্ত, ছোটরা খামোখা ছুটোছুটি করে হন্যে হত এবং এন্তার কানমলা খেত। পুজো শুরু হতে হতে মাঝরাত। নেহাতই ছোট ছিলাম, রাত জেগে পুরো পুজোটা ঠিক দেখা হয়ে উঠত না। 

পরের দিন দুপুরে একটা জবরদস্ত ব্যাপার ঘটত। দুপুরবেলা খাওয়ার পাতে জুটত ভোগের নিরামিষ পাঁঠার মাংস। পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া রান্না, অতএব নিরামিষ। এই অকাট্য যুক্তির কাছে মাথা না নুইয়ে উপায় নেই। আর সেই ভোগের মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত মাখার সময়ই প্রথম টের পেয়েছিলাম যে বাঙালির কালীপুজোয় নিরামিষের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

Wednesday, July 6, 2022

ভবেন সমাদ্দার আর লজেন্সওলা



১। 

- লজেন্স দেব বড়দা?

- দেবেন?

- দিয়েই দি', নাকি?

- অমন করে বলছেন যখন, দিন। আর তো তিনটে স্টেশন। লজেন্স চুষতে চুষতেই ব্যান্ডেল চলে আসবে'খন।

- মিনিমাম দু'টো লজেন্স লাগবে কিন্তু। তিনটে স্টেশন কভার করতে। 

- একটা আদা দিন। আর একটা লেবু।

- ভেরি গুড। আসুন।

- থ্যাঙ্কিউ। তা, বিক্রিবাটা কেমন চলছে?

- রোববারের সন্ধ্যেটা এলেবেলেই থাকে। দেখছেন না, ফাঁকা কামরা।

- আগে কোনটা মুখে দেওয়া যায় বলুন দেখি। আদা না লেবু?

- লেবু আগে। লেবু আগে। লেবু জিভকে শানাবে কিন্তু একটা টক ভাব ফেলে রেখে যাবে। আদা সে টক-ভাব উড়িয়ে দিয়ে পালিশ দিয়ে যাবে।

- ঠিক, ঠিক। আচ্ছা লজেন্সভাই, প্যাকেটে ক'টা করে লজেন্স থাকে?

- পাঁচটা করে। দেব নাকি? একটা আদা আর একটা লেবুর প্যাকেট?

- নিশ্চয়ই। 

২।

- এই যে, লজেন্সদাদা, ঘুম ভাঙল?

- আমি...আমি কোথায়...। 

- ভবেন সমাদ্দারের বাড়িতে। 

- আপনি ভবেন সমাদ্দার?

- আমিই।

- ব্যান্ডেল লোকালে আপনিই আমার থেকে লজেন্স কিনলেন তো...। 

- দু'টো লুজ। আর দু'টো প্যাকেট।

- কিন্তু তারপর আর কিছুই মনে পড়ছে না কেন...। আচ্ছা, আপনি কি আমায় কিডন্যাপ করেছেন?

- লজেন্সদাদা, একটা জরুরী কাজের জন্য আপনাকে আমার আস্তানায় নিয়ে এসেছি।

- দেখুন, আমি গরীব হকার। আমায় এ'ভাবে ধরে-বেঁধে রেখে কিন্তু কিছুই পাবেন না। আমার সংসারে আছে বলতে এক ভাই। সে এখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। বাপ-মা অনেকদিন আগেই গত হয়েছেন। এখন আমার কিছু হলে সে ভেসে যাবে।

- লজেন্সদাদা। একজন আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়। 

- কে? এ'সব কী হচ্ছে!

- আপনাকে ধরে-বেঁধে রাখব বলে নিয়ে আসিনি লজেন্সদাদা। তার সঙ্গে কথা হয়ে গেলেই আপনাকে ছেড়ে দেব।

- কিন্তু কে কথা বলবে? আর তো কাউকে দেখছি না।

- আপনি তাকে দেখতে পাবেন না। তবে তার কণ্ঠস্বর শুনতে পারবেন। 

৩।

- দাদা!

- কে? কে?

- আমি অনি। 

- অনি, অনির গলা তো এ'রকম নয়। সে তো বাচ্চাছেলে। বারো বছর বয়স, পাতলা গলা...। 

- বারো বছর আগে আমায় বয়স বারো ছিল দাদা। তারপর অনেকদিন কেটে গেছে।

- এ'সব কী যাতা কথাবার্তা হচ্ছে অ্যাঁ! কে বলুন দেখি আপনি! এই ভবেন সমাদ্দার ট্রেনে লজেন্স কেনার নাম করে আমায় খামোখা উঠিয়ে এনে এখন হয়রান করছে। 

- দাদা, আমি অনিই। তোমার ভাই, তোমার অনু।

- সে এমন দামড়া হল কবে। আর তাকে আমি দেখতে পারছি না কেন। আপনারা আমায় ছেড়ে দিন। আমায় এখুনি বাড়ি ফিরতে হবে। অনু সে'খানে একা আছে। আমি গিয়ে ভাতেভাত বসালে তবে তার কপালে খাওয়া জুটবে।

- দাদা, এ'বার শান্ত হতে হবে তোমায়। 

- কী পাগলামো!

- আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। এক রাত্রে তুমি আচমকা আর ফিরলে না। আর কোনোদিনও ফেরোনি। ট্রেন-চাপা। ওই, আপ বর্ধমান লোকালের নীচেই।

- যতসব বাজে কথা...। 

- দাদা। আমি ভেসে যাইনি। গ্রাজুয়েশন করেছি। আর গত হপ্তায় একটা কারখানায় ছোটখাটো চাকরীও জুটে গেছে। স্টোরস ডিপার্টমেন্টে। আমি ভেসে যাইনি দাদা। তোমার অনু ভেসে যায়নি।

- এ'সব কী...কেন...তুই সত্যিই অনু?

- দাদা। বাবাকে আমার মনে নেই। তুমি আমার বাপের চেয়ে কম নও। কিন্তু দাদা, এমন ট্রেনে-ট্রেনে ঘুরে বেড়িয়ে কী পাও। রাতের দিকে ফাঁকা কামরায় মানুষজন মাঝেমধ্যে তোমায় দেখতে পারে। ভয় পায়। গত বছর খানেক ধরে একটা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে দাদা। লক্ষ্মীটি। 

- আমার মাথাটা কেমন...আমি কি মিথ্যে অনু?

- মিথ্যে কেন হবে? তোমার আত্মাটা ঝুটো হতে যাবে কেন। তবে আর কেন দাদা। আমিও তো দাঁড়িয়েই গেলাম। আর লজেন্স হেঁকে ট্রেনে ট্রেনে ঘুরবে কেন। ব্যান্ডেল লাইনের ট্রেনে উঠতে লোকে ভয় পাচ্ছে। এ'বার শান্ত হয়ে বসো। ভবেন সমাদ্দার নাম করা ওঝা। রেলের অফিস থেকে তাকে বহাল করে হয়েছে তোমায় পাকড়াও করতে। আর, আর আমায় ওরা সাহায্য করতে বলেছিল। 

- তুই ভালো আছিস তো অনু?

- তোমার জন্য মন কেমন হয় দাদা খুব। কিন্তু তোমার মত এমন মাটির মানুষের আত্মাকে সবাই ভয় পাবে, এ ব্যাপারটা আমার বড় খারাপ লাগে।

- তাই তো। তোর মান-সম্মান নষ্ট হচ্ছে হয়ত। অনু, নিজে মরে ভূত হয়ে গেছি বলে যে দুঃখ, তুই চাকরী পেয়ে জীবনে দাঁড়িয়ে গেছিস জানতে পারে তার বহুগুণ বেশি আনন্দ পেয়েছি রে। আমার আর কোনও আকাঙ্ক্ষা রইল না। আর আমার লজেন্স বিক্রি করার নেই। এ'বারে মুক্তি। 

- এই ভবেন সমাদ্দারের আস্তানা ছেড়ে আর বেরিও না। কেমন?

- এই তোকে আমি কথা দিলাম অনু। সমাদ্দার ওঝার পারমিশন ছাড়া আমি আর এক পাও নড়ব না। তুই ভালো থাকিস অনু, কেমন? এ'বার আয়। আমি সামলে নেব'খন। 

৪। 

- থ্যাঙ্কিউ ডক্টর সমাদ্দার। এ যে এমন শান্ত হয়ে আপনার ছত্রছায়ায় পড়ে থাকতে রাজি হবে, সে'টা আমরা ভাবিনি। রেলওয়েজের পক্ষ থেকে উই মাস্ট থ্যাঙ্ক ইউ এগেন।

- আ ভেরি কিউরিয়াস কেস, আপনাদের এই লজেন্স-বাউল।

- ওই রুটের লোকজন কিন্তু ওকে লজেন্স-খ্যাপা বলে।

- মানুষ ইনসেনসিটিভ, এ আর নতুন কী। তবে আমার কাছে ও বাউলই। লজেন্স বিক্রির প্রতি ওঁর যে ডিভোশন, সেলাম না করে উপায় নেই। মানছি, খালি বয়াম নিয়ে লজেন্স লজেন্স করে ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়িয়ে যাত্রীদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। কিন্তু কোনোদিন কারুর অনিষ্ট তো করেনি। তাছাড়া, মানুষটা আগাগোড়া ভালোবাসার। আনফরচুনেটলি, সেই ভালোবাসা দিয়েই ওঁকে বেঁধে রাখতে হল। খুব অপরাধ বোধ হয় মাঝেমধ্যে। 

- এ'ছাড়া তো কিছুতেই ওকে কাবু করা যাচ্ছিল না। অ্যান্ড আই এগ্রি উইথ ইউ। লোকটা পাগল...সরি...একটু অসংলগ্ন হলেও...নিপাট ভালোমানুষ। আপনার অ্যাসাইলামে স্বেচ্ছায় থাকতে না চাইলে ওকে হয়ত হাজতে পুরতে হত। কারণ ধরতে গেলেই ও বড্ড ভায়োলেন্ট হয়ে উঠত। আর রেলের অফিসার হয়ে আমাদের তো প্যাসেঞ্জার সেফটিটা ইগনোর করলে চলে না ডক্টর সমাদ্দার।

- আপনাদের সিচুয়েশনটা আমি বুঝি। চিন্তা করবেন না স্যার, ওঁর যথাযথ চিকিৎসা হবে এ'খানে। তবে ট্রমাটা বড্ড সিরিয়াস। ভাবুন, নিজের সন্তানসম ছোটভাইটিকে লাইনে কাটা পড়ে থাকতে দেখেছে। সেই মারাত্মক রিয়ালিটিকে রিফিউজ করা ছাড়া আর ওঁর সামনে কোনও পথ ছিল না। আমার খুব খারাপ লাগছে, সেই মরা ভাইকে জ্যান্ত সাজিয়ে, সেই অভিনয় করে ওকে এখানে আটকে রাখতে হল। তবে ভালোবাসা কী অদ্ভুত জিনিস দেখুন, নিজের মৃত্যুটা বিশ্বাস করে নেওয়া ওঁর কাছে অনেক সহজ, নিজের ভাইয়ের মৃত্যু মেনে নেওয়ার থেকে। এ'ব্যাপারটা বাদ দিয়ে ওকে এ'খানে আনতে পারলে ভালো হত। কিন্তু আই ওয়াজ হেল্পলেস।

- ব্যাপারটা ট্র্যাজিক। ইয়েস। তবে আই মাস্ট কঙ্গ্রাচুলেট ইউ এমন একটা মিরাকুলাস ব্যাপার ঘটাতে পারার জন্য। ওয়েল ডান ডক্টর সমাদ্দার। নাকি আপনাকে সমাদ্দার ওঝা বলে ডাকব এ'বার থেকে?

Sunday, June 19, 2022

বাবা আর ফিশ

আট কার্ডের খেলাটাকে আমরা 'ফিশ' বলি৷ তিন কার্ডের 'রানিং লাইসেন্স'৷ আমরাই আমাদের বিসিসিআই, কাজেই ইচ্ছেমত ঘরোয়া ইনোভেশন জুড়ে দেওয়া যায়৷ এই যেমন লাইসেন্স না হলে 'জোকার' দেখা যাবেনা, ইত্যাদি৷ ফেসবুকে লিখে সে'সব 'নুয়ান্স' বোঝানো সম্ভব নয়৷ দশ দানের পর যার পয়েন্ট সবথেকে কম, সে জিতবে৷ 

খেলতে বসে রেগেটেগে লাভ নেই৷ তবে 'ব্যান্টার' টীকাটিপ্পনী ছাড়া 'ফিশ' খেলার থেকে সুইচ অফ করা টিভির দিকে তাকিয়ে থাকা ভালো৷ এই হচ্ছে আমাদের থিওরি৷

এ খেলায় একদানে একজনকে ম্যাক্সিমাম আশি পয়েন্ট খাওয়ানো যেতে পারে৷ কিন্তু সে ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি, খানিকটা ওই এক ওভারে ছত্রিশ রান করার মত৷ কিন্তু যতক্ষণ একটা 'ম্যাথেম্যাটিকাল পসিবিলিটি' আছে, কয়েক কিলো পয়েন্টে পিছিয়ে গেলেও বাবা হাল ছাড়বে না৷ লজিক একটাই, "বলা তো যায় না, হলেও হয়ে যেতে পারে৷ আর না হলেই বা ক্ষতি কী, দু'দান দেখি"৷ 

আর সামান্য একটু জমি পেলে যে কোনও জায়গাতেই খেলতে বসে যাওয়া যেতে পারে৷ ডাইনিং টেবিল, সোফা, ট্রেনের বার্থ, পার্কের বেঞ্চি৷ হয়ত সময় খুব কম আছে, দশ দান খেলা সম্ভব নয়৷ তখনও বাবার ওই সহজ ফর্মুলা, "বলা তো যায় না, হলেও হয়ে যেতে পারে৷ আর না হলেই বা ক্ষতি কী, দু'দানই খেলব না হয়"৷ 




এই ছবিটা বারোটে (হিমাচল) তোলা। ২০১৫।


চালশে আর ফার্স্টইয়ারি



সুমনবাবুর চালশে গানটা প্রথম শুনেছি কৈশোরে৷ আমার অন্যতম প্রিয় 'সুমনের গান'। আজও এ গানটা আমার কৈশোরের গান। কলেজের গান৷ হাইস্কুলে থাকতে বাড়ির ফিলিপ্স টেপরেকর্ডারে এ গান বাজত। পরে কলকাতার মেসে বসে সস্তায় কেনা এফএম রেডিওতে সে গান মাঝেমধ্যেই শোনা যেত৷ সে বয়সে, গানটা গুনগুন শুরু করলেই আশেপাশের চালশেদের প্রতি অস্ফুট "আহা, উঁহু"-ভাব টের পেতাম৷ একটা প্রবল সিমপ্যাথি। 

মনে হত, "আহা রে, কত গুঁতোগাঁতা খেয়ে এ বয়সে এসে পৌঁছেছেন৷ মাঝবয়সী খিটমিটগুলোয় না জানি তাদের কতশত স্ট্রাগল আড়াল হয়ে যাচ্ছে"।  ফার্স্টইয়ারি মেজাজের সিংহাসনে বসে ভাবতাম, "আফটার অল, এই বাবা-জ্যাঠা-কাকা-মামাদের তো ইয়ুথটাই গন৷ লোহা চিবিয়ে হজম করার দম আর নেই৷ বেনিয়মে বন্ধুদের হুল্লোড় নেই। সোমবার বিকেলের কলেজ স্কোয়্যারের ঘটিগরম নেই৷ প্রেমের চিঠি নিয়ে ফলাও করে মেস-বৈঠক বসানোর সুযোগ নেই৷ বাজে গল্পে রাতকাবার করার ধক নেই৷ পুজোয় লম্বা ছুটি নেই৷ এদের আর আছেটা কী। আহা রে, এ'দের জীবনটাই তো ফিনিশ হয়ে গেছে৷ পড়ে আছে শুধু গাদাগুচ্ছের রেস্পন্সিবিলিটি"। ব্যাস, এইসব ভাবনাকে আরও একটু উস্কে দিত সুমনের এই গান৷

এ'বারে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল, আজও এই গানটা আমি সেই ফার্সইয়ারি ছেলেবেলার কান ছাড়া শুনতে পারিনা৷ এমন অনেক গানই রয়েছে অবশ্য, যে'গুলো শিল্পী, সুর, কথার ওপরে গিয়ে স্মৃতি-ফসিল হয়ে রয়ে গেছে৷ কে সুমন, কীসের দামী লিরিক্স, কীসেরই বা মনকেমনের সুর- চালশের গানে সেই ক্লাস টুয়েলভ বা কলেজের বিকেল-রাত্রির গন্ধ লেগে৷ সেই গন্ধই সে গানের আইডেন্টিটি। এ'সব গান একটু মন দিয়ে শুনলে এখনও ক্যালকুলাসের ভয়টা বুকের মধ্যে ছ্যাঁতছ্যাঁতিয়ে উঠবে বোধ হয়৷ যাক গে, এই চালশের গান শুনলে এখনও ওই ফার্স্টইয়ারি একটা কণ্ঠস্বর ভারী মিহি স্বরে আহা উঁহু করে বলে, "আহা রে, যাদের বয়স চল্লিশ পেরোল তাদের কী দুঃখ গো৷ প্রভিডেন্ট ফান্ড নিয়ে চিন্তা করেই দিন গুজরান করতে হয়, কলেজ ফেস্টের খোঁজখবর আর তাদের নিরেট জীবনে দাগ কাটে না৷ জোড়া রোল খাওয়ার বদলে তারা একটা ভেজিটেবল চপ ইন্সটলমেন্টে খায়৷ ইশ৷ আর এরা বেপরোয়া বিরিয়ানিতে রইল না, সুবোধ স্যান্ডুইচে এসে ঠেকেছে৷ দলবেঁধে দীঘা যাবে কী, গ্রুপ ইন্সুরেন্স ছাড়া আর কোনও ভাবনায় এদের স্বস্তি নেই৷  এদের জন্য কী মনকেমন গো"। 

সমস্যা হল, সে সিমপ্যাথির বেলুনে সুট করে চুপসে দেয় অন্য একটা গাম্বাট কণ্ঠস্বর, " ওরে আমার কচি খোকা এলেন হে৷ এ'সব ভাবনা হাউই নিয়ে পড়ে থাকলে হবে? অম্বলের ওষুধ কি তোমার গ্র‍্যান্ডফাদার খাবে"? অমনি, বুকের মধ্যে বরফঝড়।   এই গান যে আর 'ওদের' জন্য লেখা নয়। এ গান এখন ডাইরেক্ট আমার এবং আমাদের৷ আমি আর এ গানের অডিয়েন্স নই, সাবজেক্ট৷ আমি আর "আজকে যে.."র দলে নেই৷ সুট করে "কালকে সে.." টীমে এসে দু'দণ্ড জিরিয়ে নিচ্ছি৷ চল্লিশ আসছে, ছোটবেলার সুমন দিয়ে তাকে ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না কিছুতেই৷