Thursday, June 2, 2022

ভাণু সমগ্র



ভানুবাবুর লেখালিখিগুলো(ওঁর নিজের লেখালিখি আর ওঁর সম্বন্ধে অন্যদের লেখালিখি) জড়ো করে একটা দুর্দান্ত কাজ করেছে পত্রভারতী। এই ভানু সমগ্রের অর্ধেক জুড়ে রয়েছে ভদ্রলোকের একটা জমজমাট আত্মকথা, বইয়ের মূল আকর্ষণ সে'টাই।
বড় শিল্পীদের আত্মকথা অনেকক্ষেত্রেই "গোস্ট রিটেন" হয়। তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়না বোধ হয়। কিন্তু ভানুবাবুর লেখার সোজাসাপটা স্টাইল,তাঁর কপিবুক ধারালো উইট এবং রসালো
আড্ডার যে মেজাজ প্রায় প্রতিটি লাইনে রয়েছে; তা'তে মনে হয় এ জিনিস এক্কেবারে "রাইট আউট অফ হর্সেস মাউথ" না হলেই নয়। সাহিত্যের নিয়মকানুন রুচির তোয়াক্কা তেমন করেননি। গোটাটাই একটা দিলখোলা গপ্পগুজব, ওঁর সেই "একপেশে স্টাইলে"। পাঠক হিসেবে বরাবরই মনে হয়ে ভালো আত্মকথায় স্রেফ "আমি,আমি,আমি" থাকলে সমস্তটাই মাটি। আমার অমুক, আমার তমুকে আটকা পড়ে বহু সম্ভাবনাময় বায়োগ্রাফি ভেসে গেছে। ভারতীয় ক্রিকেট তারকাদের কিছু জীবনে সে ব্যাপারে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ভানুবাবুর এই ছোটখাটো লেখার ক্ষেত্রে আর যাই হোক সে অভিযোগ আনা যায় না। ভদ্রলোক নিজের জীবনের একটা ফ্লো দিব্যি সাজিয়েছেন বটে। তবে তাঁর লেখায় দুর্দান্তভাবে স্পষ্ট হয়েছে সে সময়ের বাংলা সিনেমা জগতের বেশ কিছু জরুরী ব্যক্তিত্ব। সে'সময়ের বাংলা সিনেমার (বিশেষত বিয়ন্ড-সত্যজিৎ জগতের) লেজেন্ডদের বিষয়ে লেখালিখি ঠিক সহজলভ্য নয়। ভানুবাবুর এই গল্পগাছা সে আগ্রহকে খোঁচা দেয় বইকি। মাঝেমধ্যে সিনেমার বাইরেও গিয়ে পড়েছেন ভানু। তাঁর বর্ণময় জীবন তুলে ধরতে গিয়ে উঠে এসেছে দেশভাগ, কলকাতা, রাজনীতি আর আরও কত কী।
লেখাটা পড়তে গিয়ে বারবার মনে হইয়েছে বাংলা সিনেমার সে'যুগের মানুষজন সম্বন্ধে আমরা (অন্তত আমি) কত কম জানি। সিনেমার স্ক্রিনের বাইরেও তাঁদের সরেস উপস্থিতি, ব্যক্তিত্ব, রকমারি বাতিক; এ'সব আর এ'যুগের মানুষের দৃষ্টিগোচর হল কই। এই যেমন ক্যামেরা বা স্টেজের আড়ালেও ছবি বিশ্বাসের যে কী সাংঘাতিক একটা দুনিয়া-কাঁপানো স্টাইল ছিল! ছবিবাবুকে নিয়ে একটা পেল্লায় বই লেখা উচিৎ, তরতরে ঝরঝরে ভাষায়। সে কাজটা কে করবেন আমার জানা নেই। অভিনেতা ছবি বিশ্বাস সকলের অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তবে ভানু খোলসা করেছেন ওঁর ব্যক্তিগত স্টাইল আর হিউমরের দিকটা। আমার চোখে সে'টাই এ বইয়ের অন্যতম হাইপয়েন্ট। এই যেমন ধরুন স্টেজে সহঅভিনেতাদের কী'ভাবে ভড়কে দিতেন ছবিবাবু? বিকাশবাবুকে 'বেগুনপোড়া'র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন কেন? উত্তমকুমারকেই বা ছবিবাবু ঠিক কী'ভাবে ইন্সপ্যায়ার করেছিলেন? আর নিজের জমিদার মেজাজের ঘ্যাম কী'ভাবে 'ক্যারি' করতেন ভদ্রলোক? প্রাণখুলে লিখেছেন ভানুবাবু। তবে শুধু ছবি বিশ্বাস নয়। উত্তমের ফোকাস, সাবিত্রীর দুর্দান্ত প্রতিভা, বিকাশ রায়ের ইন্টেলিজেন্স, পাহাড়ি সান্যালের সারল্য; এমন আরও কত মানুষ সম্বন্ধে কত কিছু। তবে শুধু প্রশংসায় আটকে যাওয়ার মানুষ তো ভানু নন। কড়া কথা এবং অভিযোগগুলোও চেপে রাখার প্রয়োজন মনে করেননি।
সেই সময়ের কমার্শিয়াল বাংলা সিনেমা জগতের পরিবেশ, রাজনীতি, আর সম্পর্কগুলো সম্বন্ধে বেশ সোজাসাপটা ভাষায় লিখেছেন ভদ্রলোক। সে'দিক থেকে এ লেখা যাকে বলে বেশ জরুরী দলিল। সবচেয়ে বড় কথা, অভিনয় আর কমেডি সম্বন্ধে কিছু জরুরী অবজার্ভেশন শেয়ার করেছেন তিনি। রবি ঘোষও নিজের জীবনীতে অভিনয়ের টেকনিকালিটি নিয়ে মনোগ্রাহী স্টাইলে বেশ কিছু জরুরী কথা লিখেছেন। ভানুবাবুর লেখার মধ্যেও একই প্যাশন। রবিবাবু যেন একটু বেশি সেরেব্রাল,ভানু খানিকটা প্র্যাক্টিকাল। বাংলা সিনেমার অতিরিক্ত কান্না-প্রীতিতে দু'জনেই বিরক্ত এবং হতাশ। আর সিনেমায় রিলিফের খাতিরে কমেডির অপব্যবহারে দু'জনেই মর্মাহত।
ভানুবাবুর কেরিয়ার কার্ভটা বড্ড সিনেম্যাটিক। কমেডিতে আসর কাঁপানোর পাশাপাশি সিনেমার হিরো হয়েও বিভিন্ন সিনেমা হিট করিয়েছেন। বেশ নেতাগোছের মানুষ। সাঙ্ঘাতিক উইট এবং রসবোধ। সেই উইট ছাপিয়েই তিনি আবার দামাল, দুর্দান্ত। ঠাস ঠাস করে কড়া কথা শোনাতে পারেন। খানিকটা বেপরোয়া (নইলে অন্যদের ব্যাপারে অমন কামান দাগা সম্ভব নয়। নিজের ছেলেকেও রেয়াত করেননি অবশ্য)। সেই বেপরোয়া বিচ্ছু ভদ্রলোকই একটা সময় এসে নিজেকে ভাঁড় হিসবে সিনেমায় দাঁড় করাতে বাধ্য হয়েছেন; বারবার। ওই, প্রেম,ট্র্যাজেডি এ'সবের ফাঁকে দর্শকদের কমিক রিলীফ যোগাতে হবে। কমেডিয়ান এসে উঁচু মাত্রায় কিছু চুটকি মাঠে ফেলবেন। ওঁর মত ধারালো অভিনেতাকেও সেই টেমপ্লেটের বশ্যতা স্বীকার করতে হয়েছিল। আবার একটা বয়সের পর সে'সুযোগগুলোযও হারিয়ে যেতে শুরু করেছিল। রাগ, বিরক্তি, অভিমান আর সর্বোপরি টাকার অভাব; সব মিলে বাধ্য হয়ে এগোলেন যাত্রাকে এক্সপ্লোর করতে। কিন্তু জাত শিল্পীদের ব্যাপারটাই আলাদা। আমরা কর্পোরেটে একটা বুলি খুব কপচাই; যাই করো, এক্সেলেন্স থেকে ফোকাস সরলে চলবে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা বলি এক্সেলেন্স আর বানাই গাম্বাট পাওয়ারপয়েন্ট। ভানুবাবু তো কর্পোরেট স্টুজ নন, শিল্পি। যাত্রাতে লোক মাতালেন। আর্টফর্মটাকে ভালোবাসলেন। সিনেমাতেও দুর্দান্ত কিছু কামব্যাক পারফর্ম্যান্স দিলেন। কিন্তু কমেডিয়ান তকমাটা আর ঝেড়ে ফেলতে পারলেন না। এই যে দুর্দান্ত একটা কার্ভ, যে'টা শুধুই 'রাইজিং' নয়, ভানুবাবুর প্রাণখোলা লেখার গুণে সে'টা একটা চমৎকার নভেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের বিরক্তির ওপর সাহিত্যের পালিশ চালাননি ভদ্রলোক, সে'টাই এই লেখার বড় ব্যাপার।
উত্তমের গালে চুমু খেতেন ভানু, সৌমিত্রর প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা- নিজের গার্জেন বলে মনে করতেন, সত্যজিৎকে সম্মান করতেন আবার সামান্য় অভিমানও পুষে রেখেছিলেন। ও'দিকে গুপী গাইন বাঘা বাইন রিলিজের সময় উত্তম আর ভানু একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন। অবাক কাণ্ড, সত্যজিতের সিনেমায় চান্স না পাওয়া ভানু কিন্তু ছিলেন সত্যজিতেরই দলে। নিশ্চিন্তে থাকুন; এ'গুলো স্পয়লার নয়, খোঁচা। এইসব ইনফর্মেশনগুলো আড়ালে যে'সব রিয়েললাইফ গল্প লুকিয়ে আছে, সে'গুলোকে টেনে বের করে আনতে হলে এ লেখা পড়া ছাড়া উপায় নেই। বাংলা-সিনেমার ভক্তদের জন্য সে'সব অ্যানেকডোটের মূল্য অপরিসীম। তবে সেই সিনেমার জগতের পরিচয়টাই ভানুবাবুর বায়োডেটার শেষ কথা নয়। ওঁর শিক্ষকদের একটা ফর্দ করলে তাজ্জব বনে যেতে হয়। দীনেশ গুপ্ত থেকে সত্যেন বসু হয়ে আর কত দুর্দান্ত সব মানুষ। আর সবচেয়ে বড় কথা, দেশভাগের জ্বালাযন্ত্রণা তাঁর কমেডির সঙ্গে মিলেমিশে গেছিল।
ভানুবাবুকে নিয়ে একটা জবরদস্ত বায়পিক কে বানাবেন? স্নেহ-ভালোবাসা-ট্র্যাজেডি; মশলাপাতির তো অভাব নেই। শুভস্য শীঘ্রম!

ভোলার দাওয়াই



বড় কঠিন সময়৷ মানে, এই চল্লিশ-হল-বলে বয়সটা। মানুষজনের প্রতি নিষ্ফল রাগ বেড়েছে অথচ রাগপ্রকাশ করার সাহস কমেছে৷ মিডলাইফ ক্রাইসিসের কেমিক্যাল ইকুয়েশন বোধ হয় এ'টাই। তবে মাঝেমধ্যে মনকে শান্ত করতে বিভিন্ন দুঃসাহসী সিচুয়েশন কল্পনায় সাজিয়ে নিই৷
এই যেমন কখনও ভাবি ব্রেনের সুইটস্পট থেকে স্মার্ট সারকাজম তুলে এনে কোনও বাটপারকে চুপ করিয়ে দিচ্ছি৷ (আদতে অবশ্য স্মিত হেসে মাথা নেড়ে কথার পিঠে তাল দিয়ে যাওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না)।
অথবা, হয়ত ভাবছি যে প্রচণ্ড ধারালো সব যুক্তি আর ইন্টলেকচুয়াল গাম্ভীর্য দিয়ে তর্কবাগীশদের জাস্ট শুইয়ে দিচ্ছি৷ তারপর রণেভঙ্গ দিয়ে সে'সব ডিবেট-ব্র্যাডম্যানরা আমায় স্যালুট ঠুকছে৷ (আদতে হয়ত বলতে হচ্ছে, "মার্ভেলাস কথা বলেছেন মশাই৷ এক্কেবারে একঘর)৷
কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় কাল্পনিক প্রত্যুত্তরে থাকে একটা ষাঁড়৷ সেই যমালয়ে জীবন্ত মানুষের ভোলা। যখন জ্ঞানগর্ভ কথার গদা দিয়ে কেউ এলোপাথাড়ি ঠোকাঠুকি করে চলে, মনে মনে ভাবি সেই ভোলা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে৷ আর আমি আচমকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ষাঁড়টাকে ইন্সট্রাক্ট করছি, "গুঁতো ভোলা, গুঁতো"!

অমল দারোগা আর ফুল



"শুঁকে দ্যাখ", অমল দারোগা বেশ গম্ভীরভাবেই বললেন৷
আমি অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে রিফিউজ করলাম। একজন নিষ্ঠাবান পকেটমার হয়ে দারোগার হাতের অচেনা ফুল শুঁকে দেখাটা সমীচীন হবে না৷ পুলিশের পেটে পেটে হাজার রকমের বদ মতলব ঘুরে বেড়ায়৷ গম্ভীর হয়ে বললাম,
"আমার ফুলে অ্যালার্জি আছে"।
"তোরই লোকসান", অমল দারোগা চুকচুক করে বললেন৷
"লোকসান কেন"?
"এই ফুল আগে দেখেছিস"?
" না দেখার কী আছে৷ ওই৷ গোলাপ জবা কুমড়ো কিছু একটা হবে"।
"শাটাপ৷ পকেট মারছিস তার পাপ অল্পই৷ পলিটিক্সে তো নামিসনি৷ কিন্তু এই পিকিউলিয়ার ফুলকে তুই জবা বলছি? ধর্মে সইবে"?
ভরদুপুরে বাইশ বাই বি বাস থেকে সাত নম্বর পকেট কাটার সময় ধরা পড়েছিলাম৷ কতবার বললাম পাবলিককে, এন্তার চড়থাপ্পড় কষিয়ে ছেড়ে দিন৷ আমার থানা পর্যন্ত যাওয়ার সময় নেই৷ খেটে খাওয়া মানুষ, থানায় এসে রিল্যাক্স করলে চলবে কেন? আগের দিনের মানুষ অত নেকু ছিল না, কথায় কথায় পুলিশ পুলিশ করে হন্যে হত না৷ হাতের সুখ করে একটা অন-দি-স্পট ফয়সালা করে মিটিয়ে নিত। কিন্তু ইয়ং জেনারেশন অত্যন্ত লালুভুলু৷ সোজা পুলিশের কাছে নিয়ে এলে৷ তাও এক্কেবারে অমল দারোগার থানায়৷ কোনও মানে হয়? দু'রাত্তির জেলের লপসি খেতে আপত্তি নেই৷ কিন্তু এখন এ'ভদ্রলোকের খোশগল্প থেকে গা বাঁচাবো কী করে? এর আগেও দেখেছি, ডায়েরি লেখার নাম নেই৷ থার্ড ডিগ্রি দেওয়ার আগ্রহ নেই৷ লকাপে পোরার ব্যাপার মহাআলিস্যি৷ শুধুই বাজে গল্প। আজ পড়েছে কী এক ফালতু ফুল নিয়ে৷
বাধ্য হয়ে একটু গলা উঁচু করে বললাম, " স্যার, একটু লাঠিপেটা করে ছেড়ে দিন না। সাতটা বাইশের লোকালটা হ্যাইভ্যালু মার্কেট৷ ও'টা ছাড়তে চাইছি না"।
"আরে হরেন৷ তোর সব কথাতেই খালি ছটফট৷ এ'জন্যেই স্রেফ মোটামুটি লেভেলের ভালো পকেটমার হয়েই রয়ে গেলি৷ লেজেন্ডারি পিকপকেট আর হতে পারলি না৷ ফুলটা শুঁকে দ্যাখ। আমি তোর শত্তুর নই"।
বাধ্য হয়ে সেই অচেনা ফুলটার কাছে নাক নিয়ে গেলাম।
কী আশ্চর্য! ডাল-ভাতের গন্ধ এলো নাকে৷ ঠিক যেন কেউ পেঁয়াজ দেওয়া মুসুরডাল দিয়ে বাঁশকাঠি চালের ভাত মেখেছে, সামান্য লেবুও কচলে নিয়েছে। আর এস সঙ্গে মিশে যাছে ডিমসেদ্ধর গন্ধ। কোনও ভুল নেই, এ কম্বিনেশন আমার সুপরিচিত।
" কী! কেমন বুঝছিস হরেন"?
"কী অদ্ভুত দারোগাবাবু! ঠিক যেন, ঠিক যেন..."।
"ডাল, ভাত, ডিমসেদ্ধ৷ তাই তো"?
"নির্ঘাৎ। এ ফুল আপনি কোথায় পেলেন? আর সবাইকে আড়াল করে আমার মত চোরছ্যাঁচড়কে দেখাচ্ছেন কেন"?
" কারণ হরেন৷ ইউ আর আ গুড বয়৷ আগডুমবাগডুম কথাকে চট করে উড়িয়ে দিসনা৷ আর তদুপরি তুই হাড়বজ্জাত পকেটমার৷ লোকে তোর কথায় পাত্তা দেবেনা৷ তাই নিশ্চিন্তে বলা যায়৷ দু'দিন আগে বৌকে বলতে গেছিলাম এ'কথা৷ আমার ফোরটুয়েন্টি বলে এমন খেইমেই করে উঠল যে চেপে গেলাম৷ অডাসিটি ভাব, দারোগাকে ফোরটুয়েন্টি বলছে"।
আমি একটু নরম হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "এই ডালভাত ফুলের কথা বৌদিকে বলে খামোখা ঝামেলা বাড়ালেন৷ যাকগে৷ আপনি নিজের লোক৷ তাই বলেই দিই৷ এদ্দিন পকেটমারি করছি৷ মানিব্যাগের গন্ধ ছাড়া মনে তেমন কিছুই দাগ কাটে না৷ কিন্তু এমন বিটকেল কেস আগে শুনেছি বলে তো মনে পড়ছে না"।
" বিটকেল৷ মিস্টিরিয়াস। গতকাল ছিল আচার তেলে মুড়ি মাখার সুবাস৷ পরশু ছিল ঘি দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধ আর পাঁপড়ভাজা৷ এ'দিকে ডাক্তারের তড়পানিতে আমার কপালে স্টু আর স্যালাড ছাড়া কিচ্ছুটি বরাদ্দ নেই৷ এ'সব গন্ধে যে আমার প্রাণপাত হওয়ার অবস্থা৷ আমার যে বড় লোভ হরেন৷ এ ফুল ব্যাটাচ্ছেলে আমায় এমন ক্রিমিনালের মত তাড়া করেছে কেন কে জানে"।
"কী কাণ্ড। তা এই মারাত্মক ফুল আপনি পাচ্ছেন কোথা থেকে"?
"সে'টাই তো সবচেয়ে বেশি ডেঞ্জারাস রে৷ আমি এ ফুল পাই না৷ এ ফুল আমায় পায়৷ আমার ইউনিফর্মের বুকপকেটে রোজ একটা করে ফুল উদয় হয় বুঝলি। ওই দুপুরনাগাদ। এই ফুলটা যেমন৷ রোজ একই ফুল। একই রঙ, একই সাইজ। শুধু গন্ধটা রোজই আলাদা। কিন্তু রোজই মনোরম। আর রাত হলেই শুকিয়ে ঝুরঝুরে হয়ে ধুলো হয়ে যাচ্ছে"।
" তা দারোগাবাবু, এই ভূতুড়ে ফুলটুল শোঁকালেন। গপ্পগুজব করলেন৷ এ'বারে এক কাপ চা খাওয়ান দেখি৷ গলাটা শুকিয়ে কাঠ"।
"খাওয়াব৷ কিন্তু খবরদার বাইরে গিয়ে কাউকে বলবি না যে অমল দারোগা তোকে ডেকে আদর করে চা বিস্কুট খাইয়েছে৷ আমার একটা রেপুটেশন আছে দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী দারোগা বলে৷ পকেটমার এসে আমার সামনে খেজুর করে যাবে, সেই গপ্প ছড়ালে চলবে না"।
হেসে হাত কচলে বললাম, "চায়ের সঙ্গে আবার বিস্কুট কেন৷ চট করে একটা মামলেট ভেজে আনতে বলুন না৷ ফস করে খেয়ে আবার কাজে বেরোই"।
" সে বলে দিচ্ছি৷ কিন্তু তুই আমার প্রবলেমটাকে সিরিয়াসলি নিলি না হরেন"৷ দারোগাবাবু নরম সুরে অভিযোগ জানিয়ে ক্রিং ক্রিং করে বেল বাজিয়ে নিজের আর্দালিকে ডাকলেন।
**
- আজ কী এঁকেছিস বুবলু?
- ফুল৷
- আবার ফুল?
- আবার। এই দ্যাখো বাবা।
- রোজ এই একই ফুল এঁকে কী আনন্দ পাস বল দেখি৷
- আমার ভালো লাগে৷
- এই ফুলটার নাম দিয়েছিস একটা?
- খাবার ফুল।
- সে কী৷ এমন বিটকেল নাম কেন?
- রোজ মা খাইয়ে দেওয়ার সময় আঁকি৷ তাই৷
- বড় অদ্ভুত অভ্যাস করেছিস৷ তা আজ কী খেলি দুপুরে?
- ডাল৷ ভাত৷ আর ডিমসেদ্ধ।

Wednesday, June 1, 2022

একদিকের বৃষ্টি আর অন্যদিকের বৃষ্টি

একদিকে

- হ্যালো ভটকাই! আপডেট আছে।
- জরুরী?
- জরুরী।
- শুনি।
- দিল্লীতে মারাত্মক বৃষ্টি নেমেছে। মারাত্মক।
- কতটা মারাত্মক?
- রেইনিং ক্যাটস অ্যান্ড ডগস যাকে বলে।
- এক্সপ্রেশন শুধরে নে।
- কী'রকম?
- বল ইট ইজ রেইনিং বেগুনিজ অ্যান্ড ফুলুরিজ।
- ওউক্কে। যাই। ব্যবস্থা করি গিয়ে।
- বারিষ মুবারক ব্রাদার।
- থ্যাঙ্কিউ।



অন্যদিকে

আজ দুপুরের দিকে আড়াই মিনিট বৃষ্টি হয়েছিল।
আনন্দের আতিশয্যে
আড়াই হাজার প্লুভিওফাইল মার্কা হোয়্যাটস্যাপ ফরওয়ার্ড দেওয়া-নেওয়া করেছি৷
আড়াইশোবার "ইশ্, গাড়িতে ছাতা রাখতে ভুলে গেছি" বলে জিভ কেটেছি৷
আড়াই ঘণ্টা লূপে 'আজি ঝরঝর মুখর বাদরদিনে' শুনেছি৷
আর ট্র্যাফিকে সম্ভবত আড়াই হাজার বছর আটকে ছিলাম।
আদেখলাপনার যোগ্য শাস্তি৷

সব আমাদেরই জন্য



কাল রাত্রে আমার বয়সী (বা খানিকটা ছোট এবং খানিকটা বড় যারা) বহুমানুষ ছোটবেলার বন্ধুদের কথা ভেবেছেন। টিউশনি, ছুটির দুপুর, বিকেলের খেলার মাঠ। প্রেম-ট্রেম। একটা অদ্ভুত ব্যাপার, ধেড়ে বয়সে এসে সেই পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যে বড়সড় মনমালিন্যগুলো ঘটেছে, কাল মাঝরাতের দিকে সে'গুলোকে আচমকাই খেলো মনে হয়েছে। হয়ত, অন্যদের হয়ে নিশ্চিত হয়ে আর কী ভাবে বলি। কাল হয়ত অনেকেই ভেবেছেন ছেলেবেলার সে'সব দুর্দান্ত স্মৃতিগুলো তরতাজা থাকতে এইসব বুড়োটে ধান্দাবাজ ঝগড়াদের পাত্তা দেওয়ার কোনও মানেই হয় না। আর সেই সব সাতপাঁচ ভেবে ভেবে সে কী বিস্তর মনখারাপ। হয়ত কাল রাতের চিন্তাগুলো আজ সকালেই অফিস-কাজকর্মের ঠেলায় ধুয়ে মুছে সাফ, কিন্তু সে মনভার ফেলনা নয়।

আমাদের দুঃখের সমস্তটুকুই যে কেকে নয়। তাঁর ফেলে যাওয়া গানগুলোর গুণগত পরিমাপই তো শেষ হিসেব নয়। আমার মত মানুষ ছাই গানের বোঝেই বা কী। কিছু গানের সুর সামান্য বেয়াদপ।
সে'সব সুরের ধাক্কায় কত কী মনের মধ্যে উদয় হয়;
কত বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ না থাকার দুঃখ,
ছোটবেলার সুপরিচিত নিরিবিলি রাস্তাগুলো চিরে এগিয়ে যাওয়া সাইকেলের প্যাডেলের মচরমচর কানে ভেসে আসার দুঃখ,
কত অদরকারী তিক্ততা বয়ে বেড়ানোর আফসোস।

এই সব মিলে বুকের মধ্যে হুহু, তার মধ্যে কেকে কম, আমরা নিজেরাই বেশি। আর সে'জন্যই কেকে অনন্য। কালই হঠাৎ আমরা অনেকে টের পেলাম যে কোন ফাঁকে যেন ভদ্রলোক নিজেরই কয়েকটা গান দিয়ে আমাদের বহু জরুরী স্মৃতিতে মলাট দিয়ে গেছেন।