Sunday, April 10, 2022

শক্তিগড় অপটিমাইজেশন থিওরি



দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে হুশহাশ বেরিয়ে গেলেই হল নাকি৷ শক্তিগড় এলে আপনাকে দাঁড়াতেই হবে৷ সঙ্গে জ্ঞানগর্ভ জ্যেঠু বা পিউরিটান পিসেমশাই থাকলে সেই পিটস্টপটা আরও মজাদার হয়ে উঠবে৷ তাঁরা হাইক্লাস ল্যাংচা সম্বন্ধে একটা ছোটখাটো লেকচার দিয়ে জানান দেবেন যে হাইওয়ের পাশের এইসব 'পেটি' দোকানের ল্যাংচাকে আদৌ পাত্তা দেওয়া উচিৎ নয়৷ তারপর আপনার অর্ডার দেওয়া  ল্যাংচাকে ক্রিটিসিজিমে ফালাফালা করতে করতে নির্দ্বিধায় উড়িয়ে দেবেন৷। এরা মিহিদানা সম্বন্ধেও তেমনই একটা চমকদার অ্যানালিসিস তুলে ধরবেন এবং বলাই বাহুল্য যে স্যাট করে মিহিদানার প্লেটটা সাফ করে আলাদা এক ডিবে প্যাকও করিয়ে নেবেন৷ আর তাঁরা এও জানাবেন যে সীতাভোগ ক্লাসিকাল মিষ্টির ব্র‍্যাকেটে পড়েইনা৷ আবারও আপনি অবাক হবেন দেখে যে সেই অখাদ্য সীতাভোগকে তাঁরা কী'ভাবে আলগোছে কাছে টেনে নিয়েছেন গল্পগুজবের আড়ালে৷ 

যাকগে৷ জ্যেঠু-পিসেমশাইদের বাদ দিয়ে বলি। শক্তিগড়ে হাইওয়ের পাশে না দাঁড়ানোটা অন্যায়৷ দেশে ডিসিপ্লিন বলে এখনও তো কিছু আছে, না কী! দেখবেন, গাড়ির ইঞ্জিন কেমন আপনা থেকেই ঢিমে হয়ে আসে শক্তিগড় পৌঁছনোর কয়েক মাইল আগে থেকে৷ আর বাসটাস হলে তো থামতেই হবে, পঞ্জিকায় বোধ হয় তেমনটাই প্রেসক্রাইব করা আছে। 

আর শক্তিগড় নেমে কচুরী তরকারি (বা ডাল) না খাওয়ার মানেই হয় না৷  আর হ্যাঁ, সে কচুরীর-তরকারি জমে ভালো মিহিদানা মিশিয়ে খেলে৷ একটা টুকরো কচুরী, তার মধ্যে তিনভাগ তরকারি আর একভাগ মিহিদানা৷ পরের কচুরী-গ্রাস মুখে পোরার আগে আগে আর এক ভরাট চামচ মিহিদানা৷ এইভাবেই সে মিহিদানার কদর করতে হবে। 

তবে হ্যাঁ৷ সীতাভোগকে কিন্তু মিহিদানার ফর্মুলায় ফেলা যায় না৷ সে জিনিস বেশ স্বতন্ত্র, লুচি-কচুরীর সঙ্গে খাপ খায় না। ইয়ে, সীতাভোগের 'এফেক্টিভনেস এনহান্স' করার একটা আলাদা ফর্মুলা রয়েছে বটে৷ শক্তিগড়ে হাইওয়ের পাশের প্রায় সমস্ত মিষ্টির দোকানের সামনেই রয়েছে ডিম-পাউরুটির ঠেলা৷ কাগজের প্লেটে সার্ভ করা ডিম-পাউরুটি সাপটে শেষ করুন৷ তারপর সেই প্লেটেই ঢেলে নিন সীতাভোগ। সে প্লেট কাছিয়ে সীতাভোগ খাওয়ার আনন্দই আলাদা৷

সবশেষে ঘিয়ে ভাজা ল্যাংচা এক বাক্স প্যাক করিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসুন৷ তারপর জ্যেঠু-পিসের মুখে "মিষ্টান্ন খাইবার আদর্শ উপায়" বিষয়ক পাঁচালী শুনতে শুনতে ফরওয়ার্ড মার্চ৷ শক্তিগড়কে ষোলোআনা উশুল করতে হবে তো, নাকী!

(ছবিটা বছর পাঁচেক পুরনো)

প্রিয় রেস্টুরেন্ট




আমার অন্যতম প্রিয় 'রেস্তোরাঁ'; এই বহু ঘষটানো গাড়িখানা৷ 

দোকান থেকে খাবারদাবার নিয়ে এসে ধীরেসুস্থে সাজিয়ে বসা৷ ব্যাকগ্রাউন্ডে গাড়ির স্টিরিওতে নিজের প্রিয় প্লেলিস্টের গান (মোবাইলে ক্রিকেট চললে তো কথাই নেই)৷ আর হ্যাঁ, ভ্যাপসা গরম বা ধুলোর উপদ্রব না থাকলে আর একটা সুবিধে আছে; চাইলেই জানালার কাচ নামিয়ে 'ওপেন এয়ার অ্যাম্বিয়েন্স' ৷ এর ওপর ধরুন ঘ্যাম রেস্টুরেন্টের মতই নরম হলদেটে আলো৷ আর এমন আরামদায়ক সুপরিচিত চেয়ার অন্য কোথাও পাওয়া সহজ নয়, সীটে ঠ্যাং তুলে বসলেও কেউ হা-হা করে উঠবে না৷ সুড়ুৎ-সড়াৎ করে আঙুল চাটলেও কেউ বাঁকা চোখে তাকাবেনা, এটিকেটের খোঁটা দেবে না৷ মেজাজটাই আসল রাজা, মেজাজ খোলতাই হওয়াটাই তো ফাইন ডাইনিংয়ের মূলে৷ 

সবচেয়ে বড় কথা; এই রেস্টুরেন্টের একমাত্র ওয়েটার হিসেবে আমি নিজেকে দারুণ খাতিরযত্ন করে থাকি৷ সর্বক্ষণ মুখে হাসি, সর্বক্ষণ তৎপর। সময়মত নিজেকে টিস্যু পেপার এগিয়ে দেওয়া, চেবানো হাড় ফেলবার ঠোঙা এগিয়ে দেওয়া; সব ব্যাপারেই আমি অত্যন্ত চটপটে৷ আর হ্যাঁ, গাড়িতে মৌরিমিছরি গোছের মুখশুদ্ধিরও একটা স্টক মেন্টেন করা থাকে। 

একসময় যখন সেলসের কাজে বিহারের গ্রামেগঞ্জে ঘোরাঘুরি করতাম, তখন গাড়িতে ছাতুর ডিবে আর নুনের প্যাকেটও রেখেছি৷ আর থাকত স্টিলের গেলাস, চামচ আর অবশ্যই জল। আচমকা খিদেপেটে ধাবাটাবার খোঁজ না পেলে দিব্যি ছাতুর সরবতের গেলাস হাতে, সীট রিক্লাইন করে, সিঙ্গল মল্ট-লেভেল ঘ্যাম নিয়ে গা এলিয়ে বসেছি৷ গাড়ি তখন অলিপাব। স্টিরিওতে পঙ্কজ উদাস তালে তাল দিয়ে বলতেন; "গাড়ির ঘুপচি নয় হে এ'টা এখন৷ এ'টা পানশালা। তুমিই সাকী, তুমিই নেশায় আলুথালু পথিক। থোড়ি থোড়ি পিয়া করো। ইত্যাদি৷ ইত্যাদি"।

Saturday, April 9, 2022

মাধববাবু আর শনিবারের চা



দুপুরের মেনুতে মাংসভাত থাকার ফলে যা হওয়ার তাই হলো৷ ভাতঘুম হিসেবের বাইরে চলে গেল। সন্ধে সোয়া সাতটা নাগাদ চোখ কচলাতে কচলাতে রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের জল বসালেন মাধব চ্যাটার্জী৷ 

সসপ্যানে জল ফুটছে। মাধববাবু দু'কলি কিশোরকুমার গুনগুন করতে শুরু করেছেন৷ দুনিয়াটা ভীষণ রঙিন৷ 

চায়ের কাপ তৈরি৷ আদা-চায়ের প্রাণকাড়া সুবাসে ঘর গুলজার। কিশোর ততক্ষণে মাধববাবুর গলা ছেড়ে বসার ঘরে রাখা ব্লুটুথ স্পীকারে গিয়ে সেঁধিয়েছে৷ এমন সময় কলিংবেলের ট্যাঙট্যাঙানিতে রোম্যান্সের সুতো গেলো কেটে৷ বিকেলের চায়ের সঙ্গে অযাচিত আলাপটালাপ ভদ্রলোকের নিতান্তই না-পসন্দ৷ 

দরজা খুলে একটা ছোটখাটো আর একটা বড়সড় বিষম খেলেন মাধববাবু৷ দু'জন সরকারি অফিসার কটমটিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে। তাদের বিটকেল নীল-সবুজ চেক জামা আর কালো চশমাতেই মালুম হয়৷ একজনের হাইট অন্তত সাড়ে ছ'ফিট৷ অন্যজন নির্ঘাত পাঁচের নীচে৷ ছোটখাটো লোকটাই নেতা গোছের, কথাবার্তা তার সঙ্গেই হল৷

- আমি এজেন্ট ভবেশ দাস৷

- আজ্ঞে, আমি মাধব চ্যাটার্জী। 

- আমরা জানি৷ আপনার বয়স বাহান্ন৷ বিপত্নীক৷ নিঃসন্তান। পাইকারি বাজারে হালুয়ার ব্যবসা আছে আপনার৷ ট্যাক্সে ফাঁকি নেই৷ পুলিশের খাতায় কেস নেই৷

- আজ্ঞে৷ কিন্তু আপনারা..।

- আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে৷

- যেতে হবে?

- এখুনি৷ 

- আসলে চা'টা এখনও খাওয়া হয়নি৷

- পরশু থেকে যুদ্ধ৷ সেনাবাহিনীর লোক দরকার৷ আপনি চা নিয়ে চিন্তিত?

- স্যার, শনিবার বিকেলের চা। হেলাফেলা করলে দেশের অমঙ্গল যে।

- সময় নেই৷ বাজে কথা বন্ধ৷ ক্যুইক৷ কোনও জিনিসপত্র নেওয়ার দরকার নেই৷ ক্যুইক মার্চ জওয়ান।

- ভুঁড়ির ডেপথ দেখেছেন? হুটহাট দৌঁড়নোর কি উপায় আছে?

- বুস্কিয়ানাল্যান্ড আমাদের আক্রমণ করতে চলেছে।  অমন ঢিলেঢালা মেজাজ হলে চলবে না৷  আপনাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাওয়া হবে। এজেন্ট হারু, ওঠাও মাধব চ্যাটুজ্জেকে।

**

এন্তার গোলাগুলি৷ রাস্তার এ'দিকে একজন বন্দুক হাতে তম্বি করছেন, অন্যদিক থেকে শত্রুপক্ষের এক সৈনিক ঠারেঠোরে জবাব দিচ্ছেন৷ এমন সময়, একদিকের বন্দুক থেমে গেল৷ একটা ভাঙা দেওয়ালের আড়াল থেকে ভেসে এলো চিৎকার। 

- রোক্কে রোক্কে রোক্কে।

- কী ব্যাপার হারামজাদা? রোক্কে রোক্কে করছিস কেন? হেস্তনেস্ত কর আগে৷ তারপর রোক্কে৷ এই চালালাম গুলি৷ 

- দেখুন স্যার৷ আমার একটা মাইডিয়ার নাম আছে। মাধব চ্যাটার্জী।  খামোখা হারামজাদা বলছেন কেন?

- তুই শত্তুর৷ তোর মুখে ছাই দেওয়াটা আমার দায়িত্ব। আর তোদের সবার নাম হারামজাদা। 

- তা ঠিক৷ কিন্তু এ যে শনিবার সন্ধ্যে৷ 

- তা'তে কী রে রাস্কেল? ছুঁড়ব গ্রেনেড? 

- আরে ধেত্তেরিকা৷ বুস্কিয়ানাল্যান্ডের মানুষরা কি শনিবার বিকেলেও ব্যাজার মুখে খিটমিট করে চলে?

- খবরদার!  খবরদার যদি বুস্কিয়ানাল্যান্ডের বদনাম শুনেছি তোর মুখে৷ আর দেখে যাস উইকেন্ড ইভনিং কাকে বলে আমাদের দেশে৷ রিল্যাক্সিং টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। কেউ মগ্ন হয়ে বই পড়ছে৷ কেউ আলাভোলা গান গাইছে৷ কেউ সোফায় শুয়ে ভুলভাল কবিতা লিখছে৷ এক্কেবারে টোটাল শখের প্রাণ গড়ের মাঠ সিচুয়েশন৷

- তা আপনি এমন খ্যাটখ্যাট মাস্টার কেন? খালি গুলি গ্রেনেড বাতিক আর বাতেলা৷ আরে শনিবার সন্ধে হলো তো নাকি।

- আপনার মতলবটা কী বলুন দেখি মাধববাবু?

- আজ্ঞে৷ ফ্লাস্কে চা এনেছি৷ দুধ চা৷ আর ইয়ে, এই যুদ্ধের বাজারেও আদা জোগাড় করে চার্জ করেছি৷ তাছাড়া একটা ছোট ব্লুটুথ স্পীকার আছে, তা'তে কিশোরকুমার বাজিয়ে গান শোনা যাবে৷ 

- আদা চা? কিশোরকুমার?

- আজ্ঞে৷ 

- মাধববাবু৷ হারামজাদাটা উইথড্র করছি৷ তবে সে'টা শুধু চা শেষ হওয়া পর্যন্ত।

- হ্যাঁ৷ তারপরেই খুনোখুনি৷ বুস্কিয়ানাল্যান্ডকে ছেড়ে দেব ভেবেছেন? 

- ইয়ে মাধববাবু৷ আমার পকেটে দু'টুকরো ক্যারট কেক রয়েছে৷ আশা করি আপনার চায়ের সঙ্গে বেমানান হবে না৷

- আরে করছেন কী মশাই! মার্ভেলাস৷ 

- তা'হলে স্যাটার্ডে টী-ব্রেকের জন্য সীজ-ফায়্যারে বেরোচ্ছি কেমন?

- ওয়েলকাম স্যার৷ ওয়েলকাম।

- ইয়ে, আপনার প্লেলিস্টে 'পল পল দিল কে পাস' গানটা রয়েছে কি?

মিডিয়াম



হাইক্লাস মামলেট৷

তার বাইরেটা লালচে, অথচ ভিতরটা নরম। যথেষ্ট পরিমাণ পেঁয়াজ কাঁচালঙ্কায় পরিপুষ্ট৷

মিডিয়াম? অবশ্যই সর্ষের তেল৷

আবারও বলছি৷ মনে রাখবেন, ইংরেজি বাংলা- এ'সমস্তই মায়া। সেরা মিডিয়াম একটাই; খাঁটি সর্ষের তেল৷

ভোগ ও ভোগান্তি



- দেখেছিস?

- দেখছি।

- ঢালবে৷

- নির্ঘাত।

- ভোগান্তি।

- হবেই।

- জ্যাম।

- কাদা।

- প্যাচপ্যাচ।

- ম্যাজম্যাজ।

- তবে..।

- তবে?

- ভাল্লাগবে।

- জলকাদা?

- হাঁটব।

- বৃষ্টিতে?

- আলবাত।

- জ্বরকাশি?

- নেকু।

- হাত?

- ধরিস।

- ইয়ে।

- বাধা?

- না।

- তবে..।

- ঠোঙা।

- ঠোঙা?

- হাতে।

- কীসের?

- চপের।