Saturday, April 9, 2022

ভোগ ও ভোগান্তি



- দেখেছিস?

- দেখছি।

- ঢালবে৷

- নির্ঘাত।

- ভোগান্তি।

- হবেই।

- জ্যাম।

- কাদা।

- প্যাচপ্যাচ।

- ম্যাজম্যাজ।

- তবে..।

- তবে?

- ভাল্লাগবে।

- জলকাদা?

- হাঁটব।

- বৃষ্টিতে?

- আলবাত।

- জ্বরকাশি?

- নেকু।

- হাত?

- ধরিস।

- ইয়ে।

- বাধা?

- না।

- তবে..।

- ঠোঙা।

- ঠোঙা?

- হাতে।

- কীসের?

- চপের।

সর্বঘটে চিলি চিকেন



বরাবরই বলে আসছি চিলি চিকেনের মত ফ্লেক্সিবল ব্যাপার আর হয়না৷ এমন মজবুত আইটেমকে স্রেফ চাউমিনের সঙ্গতে ফেলে রাখাটা অনুচিত। 

একসময় দুর্গাপুরে পরেশের ধাবার বিস্ফোরক ঝাল চিলি চিকেনের সঙ্গে অজস্র রুটি উড়িয়েছি৷ দিলখুসাতেও হাফ প্লেট চিলি চিকেনের সঙ্গে মিনিমাম ছ'খানা হাতরুটি অনায়াসে উড়ে যেত৷ শেয়ালদার কাছে অন্নপূর্ণা রেস্টুরেন্টে আবার চিলি চিকেন গ্রেভিতে ডুবিয়ে খেতাম রুমালি রুটি৷ বেগুসরাইতে একবার নেহাতই বিপদে পড়ে বাসি চিলিচিকেন আর তাজা পাউরুটি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরেছি; অতি উপাদেয়। বলাই বাহুল্য যে সেদ্ধচালের ভাত চিলিচিকেনের ঝোল দিয়ে কষে মাখাটা অত্যন্ত সহজসরল আর স্বাভাবিক ব্যাপার; সে ঝোলভাতের পাশাপাশি সামান্য বিউলির ডালের বড়ার মুচমুচ অন্য ডাইমেনশন যোগ করে৷ 

তা দিল্লীর ইউনাইটেড কফিহাউস জবরদস্ত চিলিচিকেন বানায়, কলকাতার সঙ্গে দিব্যি টক্কর দেওয়ার মত। সে'খানে গতকাল খেলাম চিলিচিকেন পিজ্জা৷ দিব্যি জমজমাট।  সম্ভবত তাদের সিগনেচার ড্রাই চিলি চিকেনের টুকরোগুলো পিজ্জা ব্রেডের ওপর সাজিয়ে বেক করে দেওয়া৷ চমৎকার। বেজিং আর রোম যেন হাওড়া-ব্যান্ডেল মেনলাইনে পাশাপাশি দু'টো স্টেশন৷ 

এ'বার ভাবছি একদিন হাইক্লাস চিলিচিকেনের ঝোল দিয়ে মুড়ি মেখে দেখব৷ সঙ্গে মাংসের চপ। বলা যায়না, খাপে খাপ পড়তেও পারে৷

বিরিয়ানির টেক-আনবক্সিং

টেক রিভিউয়াদের চ্যানেলে,
তাঁদের মনোগ্রাহী একপেশে স্টাইলে;

বিরিয়ানির আনবক্সিং ও রিভিউ দেখতে চাই৷ 

প্রথমে দেখানো হবে কনফিগারেশনঃ
৮ জিবি মাটন,
অক্টাকোর আলু,
কোয়াড এইচডি চাল,
তেলতেলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর,
ইত্যাদি। 

তারপরে পার্ফমেন্স টেস্টিং৷

দেখনাইয়ের রেজোলিউশন,
ফাস্টচার্জিং সুবাস৷
বোকে মোডে নলিহাড়ের মায়া,
হাইডেফিনিশন মশলার মাপা ম্যাজিক,

সবশেষে ফাইনাল রেটিং;

জিভে ক'লিটার জল বইবে।
ট্যাঁক কতটা ধসবে। 
আর, মনের গোরিলা গ্লাসে সে বিরিয়ানি কতটা দাগ ফেলবে৷

তবেই না রিভিউ৷ 

কবে পাবো আমরা বিরিয়ানির MKBHD বা "'মোস্ট-কাব্যিক-বিরিয়ানি-হাভাতে-ডিউড"কে?

Sunday, April 3, 2022

নাগরদোলা



হুড়মুড়, হইহল্লা, আলো ঝলমল; মেলার সন্ধ্যে যেমনটা হয় আর কী৷ অঙ্ক টিউশনের গুমোট কাটিয়ে একদল ছেলেমেয়ে সেই মফস্বলি মেলা চষে বেড়াচ্ছে৷ ঢাউস খানতিনেক চপের দোকান, সে'খানে সবচেয়ে সস্তা এবং হাই-সেলিং আইটেম হল আলুর চপ৷ ছাত্রসমাজে আলুর চপের ভূমিকা নিয়ে রীতিমত এস্যে লিখতে পারে অনি৷ কিন্তু ক্লাস টুয়েলভের ছাত্রেদের সে'সব জরুরী বিষয়ে ভাবতে শেখায়না সিলেবাস৷
হাওয়াই মিঠাইয়ের চিনিগোলা ব্যাপারটা অনির তেমন পছন্দ নয়, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে হাওয়াই মিঠাই হাতে খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি না করলে মেলা আলুনি হয়ে পড়ে৷ সে ব্যাপারটা প্রায় ডিসিপ্লিনের পর্যায় পড়ে৷ এ'ছাড়া রয়েছে বন্দুকবাজি, বেলুন ওড়ানোর হুল্লোড়৷ সস্তা মনকাড়া জিনিসপাতির দোকানও অজস্র, সে'গুলো ঘুরে দেখাটাও গুরুদায়িত্ব৷ তবে আলুর চপ আর বন্দুকে উজাড় হয়ে যাওয়ার পর আর টিউশনফেরত ছেলেমেয়েদের তেমন কিছু কেনাকাটির দম থাকে না৷ বড়জোর দু'একটা পোস্টার, সস্তা ম্যাজিকের রসদ৷ আর সামান্য কিছুটাকা বাঁচিয়ে না রাখলেই নয়; মেলার স্লগওভারঃ নাগরদোলা৷
টিউশনির ব্যাচের সকলেই নাগরদোলায় চড়বে৷ ঢাউস একখানা চাকায় খানকয়েক টিনের আলখাল্লা বাক্স ঝোলানো। দোলা ঘুরবে, বাক্সগুলো মচমচ করে দুলবে৷ চলন্ত বাসের জানালায় কনুই রেখে বাপ-মায়ের ধমক খাওয়া ছেলেমেয়েরা এই খতরনাক চাকায় ঘুরপাক খেয়ে ফুর্তি করে৷ তবে অনির ব্যাপারটা আলাদা। ট্রেনের আপার বার্থে উঠতে গেলে তার বুক কাঁপে, রেলিং ছাড়া সিঁড়ি দেখলে গলা শুকিয়ে আসে৷ কাজেই নাগরদোলা অনির ধাতে সয়না৷
কিন্তু সে'দিনকার ব্যাপারটা আলাদা। সস্তা রেক্সিনের মানিব্যাগে রাখা শেষ দশটাকার নোটখানা বের করে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেছিল অনি। কারণ তেমনটাই কথা ছিল।
- অনি! তুই এমন কাঠ হয়ে বসে আছিস কেন?
- কাঠ? ক..কই না তো দিব্যি তো। রি..রিল্যাক্স করছি।
- তোর ভয় করছে।
- ধ..ধুস। আসলে..এ'ভাবে বসলে ইকুলিব্রিয়ামটা নষ্ট হবে না। তাই।
- তোর গলা কাঁপছে।
- ন..না রে ঝুমি। খুব হাওয়া তো। খুব। প্লাস এই মুভমেন্টটা..সব মিলে তোর কানের মধ্যে যে ভাইব্রেশন হচ্ছে..।
- আর এই যে...তোর হাত বরফের মত ঠাণ্ডা..।
- হা..হাত?
- বরফের মত।
- ও। ও আমার বডি টেম্পারেচার একটু..একটু..কমের দিকে। থার্মোমিটারে নিরানব্বুই মানে..মানে আমার ধুম জ্বর।
- তুই ভালো করে চোখ খুলতে পারছিস না অনি।
- ম..মিঠে..মিঠে হাওয়া..আরামে চোখ বুজে আসছে..।
- তোর মুখ শুকিয়ে গেছে। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। ঠিক করে তাকাতে পারছিস না। থামাতে বলব? চিৎকার করলেই হবে।
- ধ..ধুর..আমি তো ভাবছিলাম..আরও বার চারেক ঘুরব।
- এত ভয় যখন নাগরদোলায় উঠতে গেলি কেন?
- ভয়? ছোহ্! আমি..আমি দাবা খেলতে পারি এ'খানে বসে..ই..ইজি।
- তুই এত বড় গাধা কেন রে?
**
"অনি। কেমন আছিস?"
এই ফোনটা ছ'মাসে ন'মাসে একবার আসে অনির মোবাইলে। অফিস মিটিং, ডাক্তারের চেম্বার, বাজারঘাট; যে'খানেই থাক সে ফোন অনি ধরবেই। অবশ্য কথা বেশি দূর এগোয় না৷ কিন্তু বছর কুড়ি আগের সেই পাড়ার মেলার গন্ধ নাকে এসে ঠেকে; হাওয়াই মিঠাই, আলুর চপ মেশানো।
এই ফোনটা এলেই নাগরদোলায় বসা ধুকপুক ফেরত আসে। অনি টের পায় নিজের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।
তবে ভয়ের চোটে ঝুমির হাত টেনে ধরা আর নেই।
আছে শুধু অনির গলা-বুক শুকিয়ে যাওয়াটা।
আর আছে অনির তলপেট ফাঁকা হয়ে কথা বন্ধ হয়ে যাওয়াটা।
আরও একটা ব্যাপার উবে যায়নি। ফোন রাখার আগে ও'পাশ থেকে ভেসে আসা চাপা ধমকঃ "তুই এত বড় গাধা কেন রে"?
**
- অনি, আজ টিউশনির পর সবাই মিলে মেলায় যাব। তুই যাবি তো?
- সদাগোপান রমেশের পোস্টার পাওয়া যাচ্ছে মেলায়। রেয়ার। কলেক্ট করতে হচ্ছে।
- আমরা নাগরদোলায় চড়ব, কেমন? ওই ঢাউসটায়। একসঙ্গে। পাশাপাশি।
- নাগরদোলায়?
- হ্যাঁ। সবার সামনে তোকে আলাদা করব বলতে পারব না। চুপচাপ পাশে এসে বসবি।
- নাগরদোলাফাগরদোলা আমার পোষায় না।
- তুই ভয় পাস?
- ভয়? কী যে বলিস তুই ঝুমি। ব্যাপারটা অত্যন্ত জুভেনাইল। হাস্যকর।
- তুই এত বড় গাধা কেন রে?

হুতোমবাবু ও দাদা

- দাদা, হয়ে গেছে।
- হয়ে গেছে হুতোম?
- ঘরদোর সাফসুতরো। বাসনপত্র মেজে রেখেছি৷ বাথরুমের চারটে বালতিতে জল ভরে রাখা আছে৷ তোমার ওষুধের স্টক রিফিলিড৷ ডিনারে আলু পটলের তরকারি আর মাগুরের ঝোল৷ ফ্রিজে রাখা আছে৷
- তুই প্রতিবারই বড্ড বেশি পরিমাণে রেঁধে যাস৷ শেষে দু'বেলা ধরে খেতে হয়৷
- এমন হাইক্লাস রেঁধেছি দাদা, কম পড়লে হাত কামড়াতে।
- তোর তুলনা নেই হুতোম। তুই মার্ভেলাস।
- দাদা, এ'বার আমি আসি?
- বেরোবি?
- বেরোব না? সাতাটা বাজে৷ ট্যাক্সি নিলেও ফিরতে ফিরতে সেই রাত ন'টা৷ টিভি সিরিয়াল মিস হয়ে যাবে দাদা।
- শোন না হুতোম, আজ থেকেই যা না৷
- থেকে যাব? তা হয়না৷
- অদ্ভত গোঁয়ার গোবিন্দ তুই৷
- এ'টা গোঁয়ার্তুমি? যে বাড়ি থেকে বাবা আমায় তাড়িয়ে দিয়েছে, সে বাড়িতে আমি রাত্রিবাস করব? নেভার৷ দ্যাখো দাদা, আমি আসি তোমার টানে৷ একা মানুষ, অসুস্থ৷ মায়ের পেটের ভাই না দেখলে আর দেখবেটা কে৷ কিন্তু তুমি আমায় রাত্রিবাস করতে বলবে না৷ খবরদার।
- বাবা বুড়ো বয়সে অভিমানে কী না কী বলেছে, তার জন্য ভিটেমাটি ছেড়ে দিবি?
- বুড়ো সাংঘাতিক ধান্দাবাজ ছিল৷ সবে হিসেব করে বলেছে৷ আমায় স্ক্যান্ডালকুমার আর গবেটগ্যাম্বলার বলে খোঁটা দেওয়া? না হয় নিজের মাইনের দু'পয়সা জুয়ায় উড়িয়েছি৷ তার জন্য একটা দামড়া লোককে মাঝরাতে বাড়িছাড়া করবে?
- বাবা একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল বটে৷ কিন্তু যে বেঁচে নেই, তার ওপর রাগ পুষে রাখবি রে?
- দাদা, আসি৷ আর এ'বার আয়া চেঞ্জ করো দেখি৷ এত কামাই করে। রোজ রোজ তো আর এদ্দূর ছুটে আসা সম্ভব হয়না৷
**
হুতোমবাবু সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে সামনের পানদোকান থেকে একটা খয়ের ছাড়া সাদা পান কিনে মুখে দিলেন৷
দাদাকে দেখতে এসে প্রতিবারই রান্নাঘরে ঢোকেন তিনি৷ নিজের হাতে দাদাকে রেঁধে খাওয়ানোর যে আনন্দ৷ আহা৷ বাবার কথা মনে পড়ে৷ হুতোমের হাতের রান্না পেলে বাবা রেস্তোরাঁর খাবারদাবারও পাশে সরিয়ে রাখতেন৷ কতবার মাকে ঠেস দিয়ে বাবা বলেছেন, "তোমার ছোটছেলের থেকে রান্নার টিপস নিলে পারো তো"৷ মা মিচকি হাসতেন; বড় নরম মানুষ ছিল মা৷ বড় মায়ার৷
প্রত্যেকবার বাড়ি ফিরে দাদার জন্য মনপ্রাণ দিয়ে রান্না করেন হুতোম। প্রতিবার দুটো মানুষের জন্য রান্না করেন। কতবার মনে হয় "আজ থেকেই যাব। দুই ভাই মিলে এঁটো হাতে গপ্প জুড়ব"। কোনওবারই থাকা হয়না।
তবে হুতোমবাবু নিশ্চিত, একদিন ঠিক তিনি টিভি সিরিয়ালের টানে হুড়মুড় করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসবেন না। দু'জনের জন্য করা রান্না দাদাকে দু'বেলা জুড়ে একলা খেতে হবে না।