Saturday, February 19, 2022

সুন্দর নার্সারি




দিল্লীর সুন্দর নার্সারি যেমন সবুজ, তেমনই ছিমছাম৷ জানুয়ারির উইকেন্ড-ভিড়েও দেখেছি যে নিজেদের জন্য নিরুপদ্রব, ঘেসো এবং পরিস্কার এলাকা দিব্যি জুটিয়ে নেওয়া যায়৷ আজ একাই দুপুর-দুপুর ঝোল-ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম৷ প্রথমে ভাবলাম নতুন কোনও জায়গায় যাই, তারপর মনে পড়ল সুন্দর নার্সারির কাছাকাছিই রয়েছে নিজামুদ্দিন মার্কেট যে'খানে দিনকয়েক আগেই এসেছিলাম চমৎকার কাবাব খেতে৷ কাজেই নার্সারি ঘুরে সুন্দর কাবাব খেয়ে বাড়ি ফেরার প্ল্যানটাই যুক্তিযুক্ত মনে হল৷ 


প্রথম দিল্লী এসে যখন সুন্দর নার্সারির কথা শুনেছিলাম তখন ভেবেছিলাম  শৌখিন মানুষের ডালিয়া পিটুনিয়া আর ভালো কোয়ালিটির সার কিনবার জায়গা বোধহয়৷ ইতিহাস আর জেনারেল নলেজে কাঁচা হলে যা হয়৷ কিন্তু ভুল ভাঙার জন্য সশরীরে আসার দরকার নেই, গুগল করলেই হল৷ ষোলো শতকে মুঘলরা বানিয়েছিল পেল্লায় আজিম বাগ, সাহেবসুবোদের হাতে এ'খানে নার্সারি তৈরি হল ১৯১৩ নাগাদ৷ বর্তমানে নাকি শ'তিনেক রকমের গাছপালা রয়েছে এ'খানে৷ আমার মত অসবুজ গাম্বাট মানুষের জন্য অবশ্য গাছপালা মূলত চার রকমের; পেল্লায়, মাঝারি,  ছোটখাটো আর ঘাস-জাতিয়৷ কাজেই 'রেয়ার প্ল্যান্টস' দেখে লাফিয়ে ওঠার জ্ঞানগম্যি আমার নেই, যাদের আছে তাদের জন্য সুন্দর নার্সারি আরও উপভোগ্য৷ 


আমার জন্য সুন্দর নার্সারির মূল টান হল ওই সুবিশাল এলাকা, তাও আবার শহরের ঠিক মধ্যিখানে৷ এ বিষয়ে অবশ্য দিল্লীর জবাব নেই৷ লোধি গার্ডেন, সুন্দর নার্সারি ছাড়াও অজস্র এমন জায়গা রয়েছে যে'খানে হাত-পা ছড়িয়ে দিব্যি একটা বেলা কাটানো যায়; ভালোমন্দ খেয়ে, গা এলিয়ে গল্পের বই পড়ে ফেরা যায়৷ ভিড়ের চোটে এক বাড়ির লুচির পাশে অন্য বাড়ির চচ্চড়ি পড়ে যায়না৷  এই সুন্দর নার্সারিতে আর একটা দারুণ ব্যাপার হল কানে দিব্যি ঘণ্টাখানেক স্রেফ হেঁটেও কাটিয়ে দেওয়া যেতে পারে, গোটা ব্যাপারটাই একটা হাইক্লাস 'ওয়াক ইন দ্য পার্ক' আর কী৷


মাঝামধ্যেই রয়েছে বিভিন্ন মোগলাই স্থাপত্য।  কোনওটাই পেল্লায় নয় তবে সুন্দর, যেমন সুন্দর বুর্জ (সুন্দর নার্সারি এই সুন্দরেই সুন্দর), সুন্দরওলা মহল, লক্কড়ওলা বুর্জ ইত্যাদি৷ সুন্দত বুর্জের সামনে যে সেন্ট্রাল অ্যাক্সিস এবং খানিকটা এগিয়ে যে জলাশয়, সে'সবই অতি চমৎকার৷ আর্কিটেকচার নিয়ে কিছু বলার ক্ষমতা আমার নেই, তবে অন্য একট বিষয়ে নিজের ভালো লাগা জাহির করতেইব হয়৷ সবচেয়ে সুন্দর নার্সারির মধ্যের স্থাপত্যগুলোর মধ্যে একটা দুর্দান্ত মিঠে আর মনোগ্রাহী নাম রয়েছে; ছোটা বাতাসেওয়ালা৷ ওই নামে একটা রেলস্টেশন, একটা হিলস্টেশন আর একটা গ্রাম্য মেলাও থাকা উচিৎ৷ এ'ছাড়া রয়েছে প্রচুর ফুল। আর লক্কড়ওলা বুর্জের সামনের গোলাপ বাগানটা অত্যন্ত চমৎকার।


যা হোক৷ সুন্দর নার্সারিতে আমার মূল টান অবশ্য শীতের দুপুরে ঘাসের ওপর চাদর পেতে গা এলিয়ে বসায় (এবং শোওয়ায়)৷ সঙ্গে সামান্য খানাপিনা না থাকলে আসর জমজমাট হয় না৷ গতমাসে যখন সবাই মিলে এসেছিলেম তখন সঙ্গে ছিল তিনকোণা পরোটা, ডিম কষা, কাশ্মিরি আলুর দম, গাজরের হালুয়া আর সি আর পার্ক থেকে কেনা রসের মিষ্টি৷ বিকেলের জন্য কফিও আনা হয়েছিল ফ্লাস্কে, সঙ্গে নিমকিটিমকি৷ 

আজ হুট করে একাই চলে আসায় সে আড়ম্বর বাদ পড়েছে৷ চাদরের বদলে ঘাসের ওপরেই গা এলিয়ে বসতে হয়েছে। তবে ইয়ারফোনে গান ছিল, আর ছিল বই৷ মুখ চালানোর জন্য এক প্যাকেট বাপি চানাচুর এনেছিলাম অবশ্য। দিল্লীতে এখন সেই কড়া ঠাণ্ডা আর নেই, দিব্যি আরামদায়ক দুপুরের রোদ৷ গান, বই সরিয়ে রেখে খানিকক্ষণ ঝিমটিও দেওয়া গেল৷ তরতর করে দুপুর গড়িয়ে গেল৷ সন্ধ্যে নামার আগে হাঁটাহাঁটি করে খিদেটাকে চাগিয়ে তুলতে হবে, নয়ত নিজামুদ্দিনের কাবাব-সাফারিটাই মাটি৷

Wednesday, February 16, 2022

মাল্টিটাস্কিং

মাল্টিটাস্কিং ব্যাপারটা ভারী অদ্ভুত৷ কাজ এগোয় না, শুধু মাল্টিটাস্কিংই চলতে থাকবে৷

সবার কম্পিউটারেই আজকাল বিরাশি সিক্কার র‍্যাম। কেন?
ব্রাউসারে বাহাত্তরখানা ট্যাব খোলা থাকবে,
সতেরোটা এক্সেল, বারোটা ওয়ার্ড ডুকুমেন্টে কাজ চলবে,
পাশাপাশি ইমেল চালাচালি৷
আর সবার ওপরে চলবে জুম মিটিংয়ের 'জী হজৌরি'।

এ'সব দিয়ে কী হবে? হবে মাল্টিটাস্কিং৷ এক কাজ নিয়ে পড়ে থাকা মানে আধুনিক কর্পোরেট জগতের বিরিয়ানিতে কুমরোর টুকরো হয়ে পড়ে থাকা।

বড়বস চাইবেন রিপোর্ট,
মেজোবস খুঁজবেন ইমেল,
সেজবস দেখবেন পাওয়ারপয়েন্ট,
ছোটবস ডাকবেন মিটিংয়ে,
আর আপনি? আপনার ইএমআই-য়ে ম্যারিনেট করা কপালে রয়েছে 'যে আজ্ঞে' আর মাল্টিটাস্কিং৷

দিনের অর্ধেকটা কেটে যায় এক্সেল থেকে জুমের মধ্যে দৃষ্টি চালাচালি করে,  ইমেল থেকে পাওয়ারপয়েন্টে ফোকাস জাগলিং করে, আর ফোনে খেজুর চালাতে চালাতে মেমো পড়ে৷ ওইটুকু পথ চলাতেই আনন্দ। শ্বাস ফেলতে না পারার মধ্যেই উত্তরণ সুপার এফিশিয়েন্ট কর্পোরেট সৈন্যদের। তারা লাঞ্চ সারবে কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ রেখে। তারা মুখ খুললেই বুলেট পয়েন্ট ছিটকে বেরোবে। তাদের টু-ডু লিস্ট সাইজে নভেলদের টেক্কা দেবে। তাদের ডেস্কটপের পাশেই জ্বলজ্বল করে মারকাটারি মোটিভেশনাল বই আর তার পাশেই ছড়িয়ে শতসহস্র স্টিকিনোট; 'ইয়ে করেঙ্গে', 'উয়ো করেঙ্গে' ইত্যাদি৷ 

এতসব করে কী বেরোয়?

অন্তঃসারশূন্য রিপোর্ট,
কেঠো গতে বাঁধা অ্যানালিসিস,
আর বাতেলা পাওয়ারপয়েন্ট।  
ও'দিকে "এক্সেলেন্স' শব্দটা বিভিন্ন অফিস পোস্টারে দোল-দোল-দুলুনি মোডে সেঁটে থাকে৷

কিন্তু কোন ব্যাপারটা সঠিক ভাবে চলতে থাকে?
মাল্টিটাস্কিং৷ 

কারুর "কী খবর ভাইটি" বলতে পারার সময় থাকা মানেই সে 'আন্ডারইউটিলাইজড'। কেউ তলিয়ে ভাবার সময় পাচ্ছে মানেই সে পাশবালিস৷ 

যার কানে ল্যান্ডলাইন রিসিভার, এক হাত কীবোর্ডে, অন্য হাত মোবাইলে, আর চোখ কম্পিউটার স্ক্রিনে; সেই ঘ্যাম৷ বাকি সমস্তটাই ফাঁকি৷

Friday, February 11, 2022

পুলিন আর সমুদ্র



পুলিন ছিলেন মেজমামার ভক্ত৷ ছেলেবেলায় মামার সঙ্গে কতবার সমুদ্রের ধারে ছুটি কাটাতে গেছেন৷ পুরীর পড়ন্ত বিকেলে মেজমামা সৈকতে এসে দাঁড়াতেন হাঁটু পর্যন্ত পাজামা গুটিয়ে। সমুদ্রের দিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়তেন৷ ঢেউয়ের আরামদায়ক আসা-যাওয়ায় গোড়ালি ভিজত বারাবার, নরম হয়ে আসত মন৷ গপ্পিয়ে মানুষটা নিশ্চুপ হয়ে আসতেন, মুখে লেগে থাকত ভালোবাসাবাসির হাসি৷ হাওয়ার ঝাপটার পাশাপাশি ঢেউ ভাঙার শব্দ, ভেজা বালির গন্ধ আর সন্ধ্যের আকাশের রঙ সমস্তটুকুই মেজমামা নিজের মধ্যে শুষে নিতেন৷ সে নাকি এক তপস্যার মত ব্যাপার৷ চল্লিশ বছর আগে পরীক্ষায় বসে কষতে না পারা অঙ্কের সলিউশন মনের মধ্যে উঁকি দেয় সে সময়৷ সতেরো বছর আগে হারিয়ে ফেলা ফাউন্টেন পেনটা আদতে কোথায় ফেলে এসেছিলেন তা ঠিক মনে পড়ে যায়। রীতিমত ম্যাজিক! 

পুলিন নিজে অবশ্য সে ম্যাজিকের তল পেতেন না৷ মেজমামা চলে যাওয়ার পরেও তাঁর স্মৃতির টানে বারবার সমুদ্রের দিকে ঘুরতে গেছেন পুলিন৷  ট্রাউজার গুটিয়ে দাঁড়িয়েছেন সমুদ্রে, পা ভিজিয়েছেন ঢেউয়ে৷ কিন্তু মেজমামার সেই সমুদ্র-নির্বাণ আয়ত্ত করা যায়নি৷ বারবার নিজেকে সান্ত্বনা দিতে হয়েছে, মানুষ দিনদিন ক্ষুদ্র হয়ে পড়ছে; মনের ফ্লেক্সিবিলিটি কমে আসছে, আত্মার কোয়ালিটি গাম্বাট হয়ে পড়ছে৷ তার আর মেজমামার মত তপস্বী হওয়া হল না৷ মেজমামার মামা নিশ্চয়ই সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে লেভিটেট করতে পারতেন৷ তাই হবে হয়ত।  ধান্দাবাজি বাড়ছে আর মানুষের মানুষেমি কমে আসছে৷ এই থাম্বরুলটাই নিজেকে বারবার বোঝাতেন পুলিন৷

কিন্তু সেই ভুল ভাঙলো আলিসাহেবের এই আড়ম্বরহীন মাংস-রুটি-কাবাবের দোকানটির খোঁজ পেয়ে৷ প্রতি শনিবার এ দোকানের সামনে বেঞ্চিতে বসে মাংস রুটি আর অল্প কাবাব খেয়ে রাতের খাওয়া সারেন পুলিন৷ কিন্তু এ দোকানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শনিবার রাতের মাখোমাখো রোম্যান্সের চেয়েও অনেক বেশি নিবিড়৷ চাকরীর টানে এই দূর-শহরে ঠাঁই খুঁজে পাওয়ার পর থেকেই আলিসাহেব তার বন্ধু৷ আলি সাহেব কবিতা আর ইতিহাস ভালোবাসা মানুষ, কাবাব-মাংসরুটিতে তাকে বাঁধা যাবে না৷ পুলিনের পেট তেমন মজবুত নয়, হপ্তায় একদিনের বেশি মোগলাই খানা তার সয়না৷ কিন্তু হপ্তায় বার-তিনেক; সন্ধ্যের পর আলিসাহেবকে সেলাম না ঠুকলে তাঁর চলেনা৷ এক কাপ চা খেতে খেতে আলিসাহেবের শায়েরি আর গল্প শোনা। গপ্প সেরে আলিসাহেব ফিরে যান খদ্দের সামলাতে৷ 

ঠিক তারপর, কিছুটা দূরে সরে গিয়ে খানিকক্ষণের জন্য পুলিন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন আলিসাহেবের মাংসের কড়াইয়ের দিকে৷ আলিসাহেবের আত্মমগ্নতা, খদ্দেরদের হইহই, মোগলাই ঝোলের সুবাস, উনুনের তাপ; এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে যে অ্যালকেমি, সে'টা পুলিনকে জাপটে ধরে৷ সে মুহূর্তে পুলিন টের পান বুকের মধ্যে যেন অজস্র জানালা খুলছে, বিভিন্ন মনকাড়া সুর তৈরি হচ্ছে৷ মনকেমন করা সব অচেনা সুর৷ অথচ বাথরুমের আবডালেও পুলিনের গলা দিয়ে গান বেরোয় না৷ আস্তে আস্তে মাথায় ঝিম লাগে পুলিনের, টের পান পায়ে ঢেউ এসে ঠেকছে, পায়ের নীচে ফুটপাথের বদলে নরম বালি৷ মনে পড়ে মেজমামার গায়ে লেগে থাকা পরিচিত গন্ধটা; খবরের কাগজ আর সিগারেট মেশানো৷ মনের পড়ে মা দুপুরবেলা উপুড় হয়ে বই পড়ছে, আর বছর পাঁচেকের একটা চঞ্চল ছেলে মায়ের শাড়ির আঁচল টেনে নিয়ে মাথায় পাগড়ি বাঁধার চেষ্টা করছে৷ 

এমনই এক সন্ধ্যেয় ব্যাপারটা হুশ করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল পুলিনের কাছে৷ আরে, মেজমামার সমুদ্র-ম্যাজিকের তল পাওয়া গেছে যে৷ সবার সমুদ্দুর তো বে অফ বেঙ্গলে পড়ে নেই৷ নিজের সমুদ্র নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। আর সে খোঁজ একবার পেলেই কেল্লা ফতে!

থ্রিল

- ভুতো৷ চ'৷ একটু হাওয়া খেয়ে আসি৷

- এখন পারব না মামা।

- আরে চ' না৷ ডিমরুটি খাওয়াবো। 

- ধুস।

- চিকেন রোল?

- আমি ব্যস্ত।

- রাস্কেল ছেলে! সামনের বোর্ডের পরীক্ষা আর তুই বসে মোবাইলে গেম খেলছিস৷ কচু ব্যাস্ত!

- গেমিংয়ের থ্রিল তুমি বুঝবে না মামা৷ বয়স হয়েছে তো৷ তু মি হাওয়া খেয়ে এসো৷ 

- থ্রিলের তুই কী বুঝিস রে?

- আরে মামা। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ পাশ কাটিয়ে টার্গেটের দিকে এগিয়ে যাওয়া৷ পদে পদে খুনোখুনির আশাঙ্কা৷ ডায়ে গেলে গাড়িচাপা, বাঁয়ে ক্লিক করলে অতল খাদ৷ সামনে স্নাইপার, পিছনে ড্র‍্যাগন৷ এই হল আলটিমেট থ্রিল৷ 

- ওহ৷ বুঝেছি৷ 

- কী বুঝেছ মামা?

- তুই বেসিক্যালি আইআরসিটিসিতে টিকিট বুক করছিস৷

Wednesday, February 9, 2022

নিরুপম আর ব্রেকিং নিউজ



বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসেছিলেন নিরুপম৷ দুপুরে জব্বর বৃষ্টি হয়েছিল, তাই সন্ধ্যের হাওয়ায় একটা দিব্যি ফুরফুরে ছিল। সে হাওয়া উপভোগ করতে করতে ভুলভাল লিরিক্স আর গোলমেলে সুরে ডাকটেলসের হিন্দী টাইটেল সং গুনগুন করছিলেন তিনি৷ 
"জিন্দেগী তুফানি হ্যায়, যঁহা হ্যায়, ডাকটেলস"৷ 

দুনিয়াটা সত্যিই রঙিন৷ 

এমন সময় কাঁধে টোকা৷

- শুনুন৷

- আমায় বলছেন?

- আপনার গায়ে টোকা মেরে অন্যকে কিছু বলতে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?

- টিকিট কেটেছি৷ এই যে৷

- আমার কাঁধে ব্যাগ ঝুলছে? আঙুলের ফাঁকে খুচরো আছে? কথায় হাইস্পীড আছে?

- না। 

- কাজেই আমি কন্ডাক্টর নই। দরকারটা অন্য। এবং জরুরী। 

- কী ব্যাপার বলুন তো..আর আপনি কে?

- আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী।  এ'বার যা বলছি শুনুন মন দিয়ে। এই যে গান গাইছেন..।

- সরি...খুব লাউডলি গেয়ে ফেলেছি কি? কিছু মনে করবেন না ভাই..। জানি, আমার সুরতাল বোধ কিঞ্চিৎ গোলমেলে, গলা ছেড়ে গাইলে একটা সোশ্যাল আনরেস্ট তৈরি হওয়াটা আশ্চর্য নয়..। আসলে আজ হাওয়াটা এমন স্যুইট..বুঝলেন..যে একটা আমেজ..।

- না। লাউডনেস নিয়ে অসুবিধে নেই।

- ও মা। তবে?

- ও গান আপনি গাইবেন না।

- আজ্ঞে?

- গাইবেন না৷ ট্রেনেবাসে তো নয়ই৷ বাথরুমেও নয়৷ নিজের মনে মনেও নয়।

- কিন্তু কেন?

- বিদেশি কার্টুন সিরিজের গান ধরেছেন৷ তা'তে আমাদের সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

- ইয়ে, ইয়ার্কি করছেন? হা হা হা...আচ্ছা গায়ে পড়া উজবুক তো মশাই আপনি..। হে হে হে..।

- এ'টা কী দেখেছেন?

- রিভলভার! আপনি আচ্ছা উন্মাদ তো..। আর সবাই দেখুন কাণ্ড..।

- বাসের কেউই আপনার এ অসভ্যতা বরদাস্ত করবে না৷ সবাই চায় আপনাকে টাইট দিতে। 

- আরে এ'টা একটা কার্টুন সিরিজের গান..কী মুশকিল..ছেলেবেলায় শোনা..।

- দেশ তখন গোল্লায় যাচ্ছিল৷ এখন আমরা ঘুরে দাঁড়াচ্ছি৷

- আরে গানটা হিন্দীতেই..।

- কার্টুনটা ম্লেচ্ছ৷ কই, বিক্রম বেতালের টাইটেল সং তো গাইলেন না? 

- লে হালুয়া৷

**

- নিরুপম সাঁতরার বাড়ি?

- হ্যাঁ। আমি ওর বাবা৷ অমল সাঁতরা৷ কী ব্যাপার? পু..পুলিশ কেন?

- আপনার বাড়ির তল্লাশি হবে। এই যে ওয়ারেন্ট!

- সে কী! কিন্তু..খোকা বাড়ি ফেরেনি এখনও..কী ব্যাপার আগে বলুন..।

- ফিরবেনও না। উনি আপাতত আমাদের হেফাজতে৷ সরে যান।

- খোকা গ্রেপ্তার হয়েছে? সে কী! 

- দেশবিরোধী গান গেয়ে বেড়াচ্ছে আপনার খোকা। সেসেশনিস্ট কন্সপিরেসি কপচে লোক খেপিয়ে বেড়াচ্ছে৷ গভর্নমেন্ট ফেলবার তাল করছে৷ 

- সে কী! 

- সরে যান৷ আমাদের কাজ করতে দিন৷

(আধঘণ্টা পর)

- অমলবাবু, আপনাকে আর আপনার স্ত্রীকেও আমাদের সঙ্গে যেতে হবে৷ ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।

- ব্যাপারটা কী আমি তো কিছুই..।

- আপনার বাড়িতে দু'টো ডোনাল্ড ডাকের পোস্টার আর একটা মিকি মাউসের ছবিওলা বেডশিট পাওয়া গেছে৷ আসুন আমাদের সঙ্গে..।

**

ব্রেকিং নিউজ। ব্রেকিং নিউজ৷ ব্রেকিং নিউজ৷ 

আজ সন্ধ্যেবেলা, 

শেয়ালদার কাছে এক মিনিবাস থেকে এক বিদেশী মদতপুষ্ট জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷ জঙ্গিটির নিজের পরিচয় নিরুপম সাঁতরা জানালেও পুলিশের বড়কর্তা জানিয়েছেন যে সে পরিচয়টা নির্ঘাৎ ভুঁয়ো।

রাতের দিকে, পুলিশ সেই জঙ্গির আস্তানায় হানা দিয়ে বেশ কিছু অবৈধ এবং বিপজ্জনক নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করে। পুলিশ এ বিষয়ে সমস্ত খোলসা না করলেও এক বিশেষ সূত্রের মারফৎ আমরা জানতে পেরেছি যে বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্র আর বিস্ফোরকও নাকি উদ্ধার করে হয়েছে জঙ্গিদের ডেরা থেকে৷ গ্রেপ্তার করা হয় জঙ্গিটির আরও দুই শাগরেদকে৷ 

সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে গ্রেপ্তার হওয়া তিন ব্যক্তিই কোনও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আর শহরে কোনও বড়সড় গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করছিল তারা৷ 

বিস্তারিত জানতে হলে সঙ্গে থাকুন৷ ফিরে আসছি একটা ছোট কমার্শিয়াল ব্রেকের পরেই..।