Wednesday, January 26, 2022

এম্পলয়ার



- প্রবীর? আয়, বস।

- সময় কম বড়দা। টাকাটা?

- ওই যে৷ টেবিলের ওপর। এনভেলপ।

- চললাম।

- গুনে দেখবি না?

- থাক।

- চারটেকেই কি গঙ্গায় ফেললি?

- বড়দা। কাজ হাসিল। নগদ হিসেব মিটিয়ে দিয়েছ৷ খেল খতম। হিসেব জেনে কী করবে৷

- কাল পরশু আবার কোথায় ভেসে উঠবে৷ পুলিশ খামোখা দৌড়ঝাঁপ শুরু করবে। তাই আর কী..।

- এদ্দিনে তোমার হয়ে অন্তত শ'তিনেক লাশ ফেললাম৷ তোমার দিকে কেউ আঙুল বাড়িয়েছে কি?

- আসলে কী জানিস, চারজনকেই সরাতে বলতাম না৷ কিন্তু ওই, বিজনেসে এমন গোলমাল পাকাতে শুরু করেছিল৷

- আমি মাইনে করা মানুষ৷ ও গল্পে আমার কাজ নেই৷

- প্রবীর।

- কিছু বলবে বড়দা?

- সিংঘানিয়ার পোষ্যরা কেউ তোকে দেখেনি তো?

- জিতু দেখেছিল।

- ওদের সেই ম্যানেজার? অবশ্য সে ব্যাটা নিজেও গুণ্ডা৷ কিন্তু সে যদি দেখে থাকে..। ঝামেলা পাকাবে না তো? ভালো করে শাসিয়ে এসেছিস তো?

- লাশকে শাসিয়ে কী হবে৷

- ওহ৷ ওকেও তুই...।

- দেখে ফেলেছিল৷ না দেখলে বেঁচেবর্তে থাকত৷ 

- তোর মাথাটা বড্ড গরম।

- জিতুর জন্য তোমায় তো বাড়তি টাকা দিতে বলিনি। কোল্যাটেরাল ড্যামেজ৷ 

- বলছি, বুলেটেই নামিয়েছিস তো সবকটাকে?

- বুলেটের যা দাম আজকাল৷ অবশ্য প্রসেসটা তোমার জেনেও কাজ নেই।

- তোর মেজাজটা দিনদিন বড় খটখটে হয়ে যাচ্ছে প্রবীর। আমি তোর এম্পলয়ার৷ ভুলে যাস না। 

- তুমি এম্পলয়ার৷ তা ঠিক৷ তবে আমি তো ক্লার্ক নই।

- লাশ কোথায় ফেলেছিস৷ সে'টা আমার জানা দরকার।

- এদ্দিন তো সে দরকার পড়েনি। 

- আজ পড়ছে৷

- থাক৷ আজ আসি।

- ও কী রে৷ এনভেলপটা রেখে যাচ্ছিস কোথায়।

- লাশের হিসেব যে দেবে, কাজ তাকেই দিও৷ টাকাটা রইল।

- উফ। তোর সব কথাতেই রাগ। নে, টাকাটা রাখ। ইয়ে, চা খাবি?

- আসি।

- চ', তোকে এগিয়ে দিই একটু।

***

- প্র..প্র..প্রবীর।

- বড়দা৷ বলো।

- আমি..আমি কোথায় বল দেখি..।

- বেশি ভেবে কী হবে বড়দা। থাক না।

- আমায় কোথায় এনেছিস?

- বড্ড বেশি ভাবছ।

- তুই..তুই সন্ধ্যেবেলা বাড়ি এলি, যাওয়ার সময় আমি তোকে এগিয়ে দিতে এলাম..। তারপর কিছু মনে পড়ছে না কেন?

- জিরিয়ে নাও বড়দা৷ 

- তুই আমায় কিডন্যাপ করেছিস? গুম করবি তুই আমায় রাস্কেল?

- আমি কিডন্যাপার নই৷ জানোই তো। 

- আমি নিজের বাড়িতে নেই কেন? এই ঘুপচি ঘরটায় আমায় এনেছিস কেন প্রবীর? তুই আমায় আটকে রাখবি? র‍্যানসম চাইবি? তুই এত বড় নিমকহারাম? 

- না বড়দা৷ খানিকক্ষণ পরেই ছেড়ে দেব। তোমার অনেক কাজ।

- হেঁয়ালি ছাড়৷ ব্যাপারটা ভালো হচ্ছে না৷

- এম্পলয়ারের মেজাজ বিগড়োচ্ছে নাকি?

- আমি তোকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি। কোন সাহসে আমায় ধরে এনেছিস রে তুই? কী ভেবেছিস, তুই কি আমার একমাত্র পোষা গুণ্ডা?

- না। তোমার তো রীতিমত নারায়ণী সেনা পোষা রয়েছে। আর সে জন্যেই তোমার মনে হচ্ছিল আমায় একটু শায়েস্তা করা দরকার৷ তাই না? 

- মাইনে দিয়ে পুষি তোকে৷ তোর কাজের মেথড জানার রাইট আমার আছে। 

- আর সে'টা জানতে না পেরে তুমি আমার পিছনে স্পাই লাগিয়েছ। পুলিশে ফাঁদে ফেলার ধান্দাও করছিলে৷ জানি৷ খবর পেয়েছি৷ 

- ইয়ে, শোন প্রবীর৷ তুই ওভাররিয়্যাক্ট করছিস৷ আমায় ফিরিয়ে নিয়ে চ'। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় না হয়..।

- কোথায় ফিরবে?

-ও মা৷ বাড়িতে।

- সে সুযোগ আর কোথায় বলো।

- কী ব্যাপার বল তো৷ কী সব আজেবাজে কথা বলছিস।

- তোমায় এম্পলয়ার হিসেবে বয়ে বেড়াতে বেড়াতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম বড়দা। এ'বার আমিই তোমার এম্পলয়ার৷ 

- তোর মাথাটা গেছে৷ তুই বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছিস।

- বড়দা৷ আমার কাজের মেথডটাও এ'বারে জানবে৷

- আমায় তুই ধরে রাখতে পারবি না!

- তোমায় তো আমি বেঁধে রাখিনি৷ দরজাটাও হাট খোলা৷ এই দ্যাখো, হাতে ছুরি পিস্তর কিস্যু নেই৷ তুমি ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছ না কেন?

- আমি..আমি..আমি..।

- কেন পারছ না?

- প্রবীর, আ..আমি বেরোতে পারছি না কেন?

- কারণ আমি এখন এম্পলয়ার৷ আমি না বলা পর্যন্ত পারবে না। তবে চিন্তা কোরোনা৷ তুমিও পাতি ক্লার্ক নও৷ 

- আমি..আমি কোথায়..।

- আমার অফিসে। একটু পরেই জিতু এসে তোমায় সব বুঝিয়ে দেবে। 

- জিতু?

- ওই যে, সিংঘানিয়াদের ম্যানেজার৷ 

- তুই ওকে খুন করিসনি?

- কথার খেলাপ আমি করিনা৷ আমি খুনি, তাই বাজে মিথ্যেও বলিনা৷ যে'টা তোমার মত বিজনেসম্যানের জন্য জলভাত।

- আমি কিছুই..।

- আমার খুনের কারখানাটা বড্ড বড় বড়দা৷ রোজ কত শত অর্ডার৷ অত লাশ নদীতে ফেললে দেশে মড়ক লাগবে যে৷ আর গুণী মানুষের হাতে প্রতিটা লাশই প্রডাক্টিভ রিসোর্স। নষ্ট করলে আমার ব্যবসাটা চলবে কেন? কাজেই তারা আমার হয়ে কাজ করে বেড়ায়।  আমিই তাদের এম্পলয়ার৷ বড়দা, এখন আমিই তোমার মালিক। সবচেয়ে বড় কথা মাইনে দেওয়ারও ঝামেলা নেই, বেগার খাটার আর্মি আর কী৷ 

- তুই কী সব...!

- খবরদার..আর তুই নয়৷ মালিককে তুই বলে ডাকাটা ভালো দেখায় না। যাক৷ তোমায় জিতুই সব বুঝিয়ে দেবে৷ সামনের হপ্তা থেকে ফিল্ডে নামবে'খন৷ এখন আসি৷ কেমন?

সরি



র‍্যান্ডি পশ 'সরি বলার সঠিক পদ্ধতি' জলের মত সহজ ভাষায় বুঝিয়ে গেছেন৷ সবার আগে কোনও রকম 'কিন্তু', 'যদিও', 'আসলে কী হয়েছিল' মার্কা কেরদানি বাদ দিয়ে নির্ভেজাল 'সরি'টা বলতে হবে৷ তারপর স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করতে হবে "দোষটা পুরোপুরি আমার"৷ আর সবশেষে থাকবে আসল ব্যাপারটা যে'খানে নিজেকে এগিয়ে এসে বলতে হবে, "ভুল তো করেইছি৷ এ'বার কী করলে সে ভুলের খেসারত দেওয়া হবে সে'টুকু জানা দরকার"। 

কিন্তু এই ধরণের হাইক্লাস মেন্টোস সলিউশন আমাদের ধুরন্ধর আম জিন্দেগীতে সবসময় চলবে না। অতএব উপায়? ওই, গোপন কোডে 'সরি' চালান করার বিভিন্ন পদ্ধতি আমরা খুঁজে বের করি৷ সে কোড অবশ্য এনিগমার মতই জটিল৷ কিন্তু সংসার, প্রেম এবং ইয়ারদোস্তি গোছের সমস্ত ব্যাপারগুলোই যে হাজারো এনিগমা-সঙ্কেতের ওপর দাঁড়িয়ে। সে হেঁয়ালির তল না পেলে সম্পর্কের পেল্লায় সব জাহাজ ভুলবোঝাবুঝির ইউবোটের আক্রমণে ডুবতে বাধ্য। 

তা কী ধরণের সাঙ্কেতিক ভাষায় আমরা 'সরি' বলার চেষ্টা করে থাকি?

"আরে ভাই, শোন না। আজ ভাবছি তোকে শ্যামলদার দোকানে মোগলাই খাওয়াব। না না, কিছুতেই না শুনছি না৷ তোকে আসতেই হবে৷ আরে না হয় ক্রিকেট মাঠে সামান্য ইয়েটিয়ে হয়েছে, তা হতেই পারে৷ তুই ভাবলি লেগস্টাম্পের বাইরে বল পিচ করেছে, তাই আমার লেগ বিফোর আপিল উড়িয়ে দিলি। আমি বল আর লেগস্টাম্প বগলদাবা করে টিউশনি পড়তে চলে গেলাম৷ ওই সামান্য ব্যাপারের জন্য তুই মোগলাই রিফিউজ করবি"?

অথবা, 

"সুমি, নীল শাড়িতে তোমায় যা মানায় না..কী বলব..চোখ ফেরানো যায়না মাইরি...। শোনো না, আজ চলো গড়িয়াহাট ঘুরে আসি। গড়িয়াহাট নাপসন্দ? পার্কস্ট্রিট চলো! কী বললে? আমি মনে মনে সমুদের তাসের আড্ডা প্রেফার করি? ধুস্! সে তো বোগাস একটা গুড-ফর-নাথিং জায়গা৷ শুধু বাজে গপ্প আর সিগারেট। ননসেন্স৷ তার চেয়ে চলো না, প্রিন্সেপ থেকে ঘুরে আসি"৷ 

অথবা,

আয়নার দিকে তাকিয়ে; "এই যে ব্রাদার,  একটা গোটা ক্যাজুয়াল লীভ শুধু তোমারই জন্য বাগিয়েছি৷ ওই যে, বাঁদিকে দেখো, পুরনো পুজোসংখ্যার বান্ডিল৷ আর ডানদিকে একগাদা কমিক্স। ফোন স্যুইচড অফ৷ বাড়ির সবাই ঘুরতে গেছে৷ আর ফ্রিজে বাসি বিরিয়ানি, ফর ব্রেকফাস্ট,  লাঞ্চ অ্যান্ড ডিনার৷ জানি ভাই, বড্ড হুড়মুড় যাচ্ছে। আর এর মধ্যে যে তোমার দিকে দু'দণ্ড তাকাবো, সে সুযোগটুকুই জুটছে না৷ যাক গে৷ আজ একটু গা এলিয়ে বসো দেখি"৷

Monday, January 24, 2022

কাজের মত কাজ



কর্মব্যস্ত এবং তৃপ্ত মানুষের দিকে একমনে তাকিয়ে থাকতে কী ভালোই না লাগে৷ হাজারখানা 'ইন্সপিরেশনাল' সেল্ফ-হেল্প বই পড়ার চেয়ে অমন একজন হাসিখুশি শশব্যস্ত মানুষের দিকে মিনিট দুয়েক তাকিয়ে থাকাটা বেশি কাজের বোধ হয়৷ 

অফিসে যখন দেখি কেউ কাঠশুকনো কোনও রিপোর্টও এক গাল হাসি আর ম্যাক্সিমাম ফোকাস নিয়ে লিখছে, মন ভরে যায়৷ সে রিপোর্ট তিনি ধীরেসুস্থে পড়বেন। রিপোর্টের প্রতিটি শব্দকে কড়াভাবে ঝালিয়ে নেবেন; যেমনভাবে কোনও কবি নিজের সদ্যলেখা কবিতাকে পালিশ করে থাকেন৷ এলেবেলে ভুল চোখে পড়লে এমনভাবে চমকে উঠবেন যেন পোলাও চিবুতে গিয়ে দাঁতে পাথরকুচি পড়েছে৷ শুধু তাই নয়, খসখসে রিপোর্টকে তিনি মখমলে করে তুলবেন নিজের একনিষ্ঠ রিসার্চে। এ'সব মানুষ সুযোগ পেলে এমন মনপ্রাণ ঢেলে মাটি কোপাবেন যে মরুভূমিতেও বাসমতি ফলিয়ে ছাড়বেন। 

রিপোর্ট যত এগোবে, তাদের মুখের হাসিও ততটাই চওড়া হবে৷ মাঝেমধ্যে হয়ত টাইপিং থামিয়ে টেবিল ঠুকে তাল দেবেন, সামান্য গুনগুন না করলে যে খেটে-কামাল-করা কাজের মজাটাই মাটি৷ রিপোর্টের জটিলতম অংশটা নিখুঁতভাবে নামিয়েই হয়ত তিনি হাঁক পাড়বেন এক কাপ চায়ের জন্য, আদা দেওয়া৷ নিজেকে মাঝেমধ্যে বখশিশ না দিলে চলবে কেন?

রিপোর্ট শেষ হয়েও শেষ হবে না৷ কাজের অমোঘ মায়াটুকু তিনি হেলাফেলায় এড়িয়ে যেতে পারবেন না৷ ফন্ট কী হবে, স্পেসিং কেমন হবে, মার্জিন কতটা থাকবে, জটিল টেবিলগুলো কী টেম্পলেটে বসবে; এমন হাজারো বিষয় নিয়ে তাঁর মনের মধ্যে তোলপাড় চলবে৷ বহুরকম এ'দিক-ও'দিক, ওপর-নীচ, ডায়ে-বাঁয়ে করে তবে তিনি থামবেন৷ তারপর কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বুদ্ধের হাসি হেসে মত মাথা দোলাবেন, "এইবারে মনের মতন, এতক্ষণে রিপোর্ট বাবাজীকে বাগে আনা গেছে। এইবারে৷ এতক্ষণে"।

যদি সে রিপোর্টের প্রিন্ট নেওয়া জরুরী হয়, তা'হলে সে কাগজের গায়ে খানিকক্ষণ হাত বুলোবেন তিনি৷  লোকে পাত্তা দিক না দিক, নিজের কাজকে যে নিজেই বুকে করে আগলে রাখতে হয়, সে সত্যটা তিনি বিলক্ষণ জানেন৷ নিজের সেই রিপোয় বা সাধারণ মেমোটি পড়তে পড়তে হয়ত তিনি কল্পনায় শুনবেন এক স্টেডিয়াম " বাহ্, বাহ্"। তিনি চেষ্টা করবেন যাতে স্টেপলারের খটাসটুকুও জ্যামিতি মেনেই সে কাগজের গায়ে নেমে আসে৷ ময়লা ফোল্ডার দেখলে তিনি শিউরে উঠবেন৷ নিজে গিয়ে স্টোররুম ঘেঁটে বের করে আনবেন উজ্জ্বল একটা ফোল্ডার, যার মধ্যে সেই রিপোর্টকে আদুরে হাতে শুইয়ে রেখে তবে তার নিশ্চিন্দি৷ হয়ত একটু গজল বা দু'লাইন শ্যামাসঙ্গীত গেয়ে নিয়ে তিনি সে রিপোর্ট পর্বে ইতি টানবেন৷ 

পেটের টানেই দুনিয়াদারী, কাজ বেছে নেওয়ার বিলাসিতা সবার তো জোটেনা৷ কিন্তু সবার কপালে যেন কর্মব্যস্ততাটুকু জুটে যায়৷ আর ইয়ে, সে কর্মব্যস্ততা যেন খিটখিটে-মেজাজের চৌবাচ্চায় চুবনি না খাওয়ায়৷ প্রতিটি কাজ-পাগল মানুষ যেন তৃপ্তির সমুদ্দুরে গা ভাসিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিরে পারে। 

এ'টুকুই, দু'দিন বইতো নয়।

Friday, January 21, 2022

আদত আদবকায়দা



আদত অসাবধানতা।

রোলের অর্ডার দিয়ে রোলের চাটুর ওপর শ্যেনদৃষ্টি না রাখা৷

আদত অসহিষ্ণুতা।

রোলের পরোটা ভালোভাবে ভাজা হওয়ার আগেই রোলদাদা বা রোলদিদিকে "হল কী" বলে বেফালতু তাড়া দেওয়া।

আদত অজ্ঞানতা।
প্লেটে বা বাটিতে রোল সাজিয়ে দেওয়া।

আদত অসতর্কতা।
রোল থেকে চিকেনের টুকরো পড়ে যাওয়া। 

আদত অভব্যতা।
রোলের কাগজ খোলাটা শিল্প। মিহিভাবে, সরু পরতে পরতে, নরম ভাবে সে কাগজ না খুলে, খাবলে ছিঁড়ে ফেলা।

আদত অসভ্যতা।
ধীরেসুস্থে রোলের রোলত্ব উপভোগ না করে, রোল কামড়াতে কামড়াতে অফিস-ব্যবসা কাজকর্ম-ব্যস্ততার গল্প ফাঁদা।

ভূত নামানোর ব্যবসা



- এ কী৷ আবার এসেছেন?

- চিন্তা নেই৷ এ'বারে আর ভূত দেখতে আসিনি৷ 

- তাই বলে ফিজ না দিয়ে যেতে পারবেন না কিন্তু৷ আমার সময়ের দাম আছে৷ 

- রাখুন আপনার সময়ের দাম৷ বাইরে তো কেউই বসে নেই৷ ভূত নামানোর বাজার ডাউন যাচ্ছে? 

- আসলে দু'দিন আগেই পূর্ণিমা গেল তো৷ এ'সময়টায় ঠিক তেনারা অদরকারে ঘুরঘুর করতে পছন্দ করেননা৷ তাই এ'কদিন বিজনেস একটু ওই...যাকে বলে..।

- অত কথায় কাজ নেই৷ আপনার ফিজ একশো বত্রিশ টাকা তো? দেব। ইয়ে, আমায় মনে আছে আশা করি।

- ভাস্কর তান্ত্রিক একবার কাউকে দেখলে সহজে ভোলে না৷ আর আপনি মাইরি ভুলবার মত লোকও নন৷ গত হপ্তায় কী কাণ্ডটাই না ঘটালেন..। আপনি তো ব্যারাকপুরের প্রবীর দত্তগুপ্ত৷ তাই তো? দিব্যি, দিব্যি মনে আছে।  

- দেখুন ভাস্করবাবু..।

- ও কী! আমি আপনার অফিস কল্যিগ নই৷ বাবা বলুন, গুরুজীও চলতে পারে৷ 

- যাকগে৷ অকারণ খেজুর করতে আমি আসিনি। গতবার আপনাকে একটু অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিলাম৷ গোটা পরিস্থিতিটাই কেমন গোলমাল হয়ে গেছিল৷ তাই ভাবলাম..।

- আপনি কিন্তু আমায় সত্যিই ভেবড়ে দিয়েছিলেন প্রবীরবাবু৷ নিজের বাবার আত্মার সঙ্গে কমিউনিকেট করতে চেয়ে আমার কাছে এলেন৷ ভালো কথা। অথচ আমি তেনাকে ডাক দেওয়ার আগেই এমন বিশ্রীভাবে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন..৷ আরে বাপের নামটাও বলতে পারলেন না কান্নার চোটে৷ তারপর তো প্রায় ছুটে পালালেন..। আমি তো হতবাক। 

- জানি৷ ব্যাপারটা নেহাতই ছেলেমানুষির পর্যায়ে চলে গেছিল আর কী৷ তাই পরে মনে হয়েছে ব্যাপারটা আপনার কাছে একটু খোলসা করে যাওয়া দরকার৷ যদিও আপনার এ ব্যবসাটাকে আমি ঠিক সৎ বলে মনে করিনা, তবু ভাবলাম...।

- ব্যবসা? ব্যবসা? শুনুন মশাই৷ এ'টা হলো সাধনা৷ বুঝেছেন? সাধনা৷ ফিজটা নিই শুধু এস্টাবলিশমেন্ট মেন্টেনেন্স কস্ট হিসেবে। 

- যাক গে। ভাস্করবাবু..থুড়ি..শ্রী শ্রী ভাস্করতান্ত্রিক..যে'টা বলতে ব্যারাকপুর থেকে হালিশহর ছুটে আসা৷ আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি চেয়েছিলাম আমার মৃত বাবার আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে৷ কারণ..কারণ আমি পাগল হয়ে গেছিলাম৷ জানেন ভাস্করবাবু, আমার বাবার নাম অবনী দত্তগুপ্ত। পেশায় স্কুল মাস্টার ছিলেন৷ অতি সৎ একজন মানুষ ছিলেন৷ বহু সহায়সম্বলহীন ছেলেমেয়েকে পড়িয়ে গেছেন মারা যাওয়ার দিন পর্যন্ত৷ ছাত্রছাত্রীরাও বাবাকে বড় ভালোবাসতো৷ আর বাবা তাদেরকে একটা শিক্ষাই দিতেন, সমস্ত ঝুটো বিশ্বাস আর কুসংস্কার উড়িয়ে দিয়ে সৎপথে থাকার শিক্ষা৷ বাবার গর্ব ছিল, যে তাঁর ছাত্ররা প্রত্যেকেই বিজ্ঞান-মনস্ক। অথচ আমিও তো বাবারই ছাত্র৷ বিশ্বাস করুন, বাবার বাকি স্টুডেন্টদের মত আমার মধ্যেও কুসংস্কার নেই৷ শুধু বাবা মারা যাওয়ার পর ক্ষণিকের জন্য মনটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল৷ বুকের মধ্যে একটানা একটা বিশ্রী হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড়। আর তাই ব্যারাকপুর স্টেশনের ল্যাম্পোস্টে সাঁটা আপনার ওই ভূত নামানোর বিজ্ঞাপন দেখে হঠাৎ যেন জ্ঞানগম্যি হারিয়ে ফেলেছিলাম৷ কিন্তু আপনার কাছে এসে বসার পর সম্বিৎ ফিরে পেলাম। আর তারপর একটা বিশ্রি লজ্জা আমার প্রায় গলা টিপে ধরেছিল। অবনী মাস্টারের ছেলে হয়ে তাঁর শিক্ষাকে এমন হেলায় ভাসিয়ে দিয়েছি ভেবে আমার বড় কষ্ট হয়েছিল ভাস্করবাবু৷ তাই আপনার সামনে থেকে অমন দৃষ্টিকটু ভাবে ছুটে পালিয়েছিলাম। কিন্তু পরে মনে হল, ব্যাপারটা আপনাকে জানানো দরকার..।

- আপনি আজ আসুন প্রবীরবাবু।

- আমার কথাগুলো একটু কটু শোনাচ্ছে বোধ হয়৷ মাফ করবেন কিন্তু আপনাকে না জানালে...।

- আপনি আসুন। আসুন।  

**

- আরে এতবার কলিংবেল! কে? ওহ! আপ..আপনি?

- কী,  চিনতে অসুবিধে হচ্ছে না তো প্রবীরবাবু? 

- গেরুয়া লুঙ্গি আর খালি গায়ের বদলে হাফশার্ট আর ট্রাউজারে আপনাকে দেখতে হবে সে'টা কোনওদিনও ভাবিনি ভাস্করবাবু৷ আর আপনার মতলবটা কী বলুন তো? আমায় ফলো করছেন নাকি? হালিশহর ছেড়ে হঠাৎ ব্যারাকপুরে?

- ভিতরে আসা যায়?

- আমি ঠিক নিশ্চিত নই৷ বললাম তো। আপনার মতলবটা জানা দরকার৷ 

- আগের দিন মনে হল, অন্ধবিশ্বাসের টানে একবার আমার ডেরায় এসে পড়ার পর থেকে আপনি খুবই মনকষ্টে আছেন৷ তাই ভাবলাম..।

- মতলবটা কী আপনার?

- মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে আসব, তার জন্য আবার মতলবের দরকার হবে কেন?

- মাস্টারমশাই? আপনি কি বাবাকে..।

- চিনতাম। সাতাশির উচ্চমাধ্যমিক ব্যাচ৷ তখন অবিশ্যি আপনি নিতান্তই শিশু৷ সে'জন্যই আমি প্রথমদিন ঠিক আপনাকে চিনতে পারিনি৷ পরের দিন গিয়ে যখন অবনী স্যারের নাম করলেন, বুকের ভিতরটায় কেমন ছ্যাঁকা লাগল যেন৷ তবে মাস্টারমশাইয়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে আমি এদ্দূর আসিনি প্রবীরবাবু৷ আমি শুধু বলতে এসেছি একটা সহজ কথা জানাতে৷ শুনুন, ভূত নামানোর টানে আমার ডেরায় গিয়ে আপনি মাস্টারমশাইয়ের স্মৃতির অপমান করেননি৷ আপনি কুসংস্কারের টানে আদৌ ছুটে যাননি৷ আপনি গেছিলেন ভালোবাসার টানে, প্রবল মনকেমন বুকে নিয়ে৷ বাপের চলে যাওয়া যে ছোটখাটো ব্যাপার নয় প্রবীরবাবু৷ একটু পাগলামো চলতেই পারে৷ 

- ভাস্করবাবু..আমি যে কী বলব..।

- আপনি হয়ত আমায় দেখে ভাবছেন, মাস্টারমশাইয়ের ছাত্র শেষে ভূত নামানোর ব্যবসায় ঢুকলে? তবে কি মাস্টারমশাইয়ের শিক্ষায় ফাঁক ছিল? অভয় দিয়ে বলি, আপনার মতই আমিও অবনীবাবুর একনিষ্ঠ ছাত্র৷ কুসংস্কার আমায় সহজে ঘায়েল করতে পারবে না৷ তবে আপনার মতই, বাপের মৃত্যুটা আমাকে বিশ্রীভাবে ঘায়েল করেছিল বটে৷ আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্য৷ ইয়াব্বড় সংসার ফেলে বাবা দুম করে সরে পড়লেন৷ টের পেলাম; পেটের দায় বড় দায়৷ ভালোবাসাও মিইয়ে যায়৷ পড়াশোনা ছাড়তে হল, মাস্টারমশাইয়ের শাসন এবং স্নেহও বাদ পড়ল কারণ বাড়ির খরচ চালাতে গেলে অঙ্ক টিউশনিতে পড়ে থাকা চলবে না৷ চাকরী না থাক, বিজনেস খুঁজে নিতে হবে।  হিপনোটিজম আয়ত্ত করে তাই চলে এলাম ভূত নামানোর ব্যবসায়, নেহাতই দায়ে পড়ে। শুনুন, মাস্টারমশাইয়ের শিক্ষা জলে যায়নি প্রবীরবাবু৷ যেতে পারে না৷ কেমন? মনে থাকবে? এ'টুকু বলার জন্যই ছুটে আসা৷ আজ আসি।

- ভাস্করদা৷ চা না খাইয়ে তো আপনাকে ছাড়া যাবে না৷ আর বাবার কাছে অঙ্ক পড়েছেন যখন, মায়ের হাতের ডিমের কচুরির স্বাদও নিশ্চয়ই আপনার অজানা নয়৷ সে'স্বাদও না হয় আর একবার ঝালিয়ে নেবেন৷ আপনাকে ভিতরে আসতেই হবে৷