Wednesday, January 19, 2022

চলো অঞ্জন!



অঞ্জন দত্তর গান নিয়ে কোনও গুরুগম্ভীর আলাপ-আলোচনাকে কোনওদিনই পাত্তা দিইনি৷ নিন্দে তো নয়ই, অন্যের প্রশংসার সঙ্গে তাল মেলানোরও প্রয়োজন বোধ করিনি৷ অঞ্জনবাবুর গান একটা অভ্যাসের মত জুড়ে গেছিল৷ তার ভালোমন্দ হয়না, ডিসেকশন হয়না৷ ভালো লাগা থাকে। আর গানের ক্ষেত্রে, সেই ভালোলাগাটুকুই বোধহয় একমাত্র ডিসিপ্লিন, অন্তত আমার মত অতিপাতি মানুষের জন্য৷ 

প্রথমবার অঞ্জনবাবুর গান ক্যাসেট ধার করে শোনা৷ স্কুলবয়সে৷ সে'সব গান প্রথমবার শুনেই লাফিয়ে ওঠার নয়৷ 'ওয়াহ তাজ' বলে সেলাম ঠোকার নয়৷ কিন্তু৷ অঞ্জনবাবুর গানগুলোয় রয়েছে বার বার ফিরে যাওয়ার সুর৷ আর স্কেল-বসানো সোজাসাপটা সরলসিধে কথা৷ প্রথম শোনায় যে ক্যাসেট 'ঠিকই আছে' মনে হয়েছে, বাহাত্তর নম্বর শুনানির সময় সেই ক্যাসেটই ইয়ারদোস্ত৷ 

ভদ্রলোকের বেশ কিছু গোবেচারা গান রয়েছে৷ একসময় তারা মাঝেমধ্যেই টেপরেকর্ডারে বাজছে৷ বিরক্ত করছে না, আবার মনে ইয়াব্বড় দাগও কাটছে না৷ কিন্তু আচমকা একদিন খেলা ওলটপালট৷ হয়ত কেমিস্ট্রির খাতার পিছনে মন দিয়ে বুক ক্রিকেটের স্কোর লিখছি৷ তখন দুম করে টের পেলাম - আরে! "শুনতে কি চাও তুমি"র সুরে কী দারুণ মায়া৷ কী অপূর্ব স্নেহ৷ আর কী, অমনি সে গানের সঙ্গে দোস্তি হয়ে গেল৷ 

ব্যাপারটা ঠিক কীরকম? ধরুন আপনি সন্ধ্যে ছ'টা বেয়াল্লিশের ব্যান্ডেল লোকালের ডেলিপ্যাসেঞ্জার। ইঞ্জিনের দিক থেকে তিন নম্বর কামরাটি আপনার নিয়মিত অফিস-ফেরতা ঠাঁই। সেই কামরায় এক মুখচোরা মিষ্টি স্বভাবের ভদ্রলোকের সঙ্গে রোজই দেখা হয়, চোখাচোখির আলাপ৷ 'সব ভালো তো' গোছের ইশারা রোজই আদানপ্রদান হয়,থাকে মাথা নাড়া প্রত্যুত্তর৷ আচমকা একদিন, হঠাৎ সেই মুখচোরা মানুষটি যেচে এসে আলাপ জমাবেন৷ তখন জানা যাবে আপনাদের দু'জনেরই ওলসেদ্ধ দিয়ে ভাত মেখে খেতে ভালো লাগে, আর ভালো লাগে দীঘা, আর শীর্ষেন্দু, আর আশাপূর্ণাদেবীর লেখা৷ ব্যাস, জমে গেল বন্ধুত্ব৷ তেমনই, অঞ্জনবাবুর সবচেয়ে প্রিয় গানগুলোও একদিন অতর্কিতে এসে আলাপ জমিয়েছে, এবং তল্পিতল্পা সমেত থেকে যায়৷ 

আর থেকে যাওয়া মানে থেকে যাওয়া? এক্কেবারে জাঁকিয়ে বসেছে৷ কাজেই চৌধুরীদের  একুশতলার নির্লজ্জ ঝগড়াঝাটি এখন আমার সুপরিচিত৷ বাবা-মায়ের সিনেমা ফেরত রোলটা ডাবল এগ ডাবল চিকেন, আমার অন্তত সে'টাই বিশ্বাস; আর খোকার ডিনারের ট্যালট্যালে ঝোলের হলদেটে বিস্বাদ রংটাও আমি দিব্যি চিনি; অঞ্জনবাবুর সুরের মধ্যে দিয়ে৷ আমি মাঝেমধ্যেই গুগলম্যাপে বেনিয়াপুকুর আর বেহালা যাওয়ার রুট দেখি৷ কমলা এজেন্সির ছোট্ট অফিসের কোণে অর্ণবের কাগজ বোঝাই টেবিলটা আমি ভীষণ চেনা, সেই টেবিলের পিছনের দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারটাও আমি চিনে রেখেছি; ডাল লেকের ওপর শিকারা। আর বৃষ্টিতে চটি ছিঁড়ে যাওয়ার মধ্য যে চিনচিনে সুরটা মিশে থাকে, সে'টা আমি দিব্যি চিনি। 

এমন কত হাজার চেনাজানা, পরিচিতি, স্নেহ-মায়া সুট করে গছিয়ে দিয়েছেন অঞ্জন৷ তার গানগুলো আমাদের এই এলেবেলে জীবনের লাগসই ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, এ নিয়ে আমার কিন্তু কোনও সন্দেহই নেই৷ 

নারায়ণ দেবনাথ



আমি নিজের আগ্রহে প্রথম পড়া শুরু করি মূলত ছবি সর্বস্ব ছোটদের বইগুলো৷ দাদু উপহার দিত সে'সব বিভিন্ন বাহারে বই৷ আমার উপহার পাওয়া প্রথম বই যে'টা উল্টেপাল্টে গিলে খেয়েছিলাম, সে'টা হল একটা বাংলা ছড়া সংকলন। সে'খানে ছিল ছোটছোট প্রচলিত ছড়া, আর চমৎকার সব স্কেচ৷ আমার আগ্রহ ছিল ওই স্কেচগুলোর ওপর। বইটার নাম ছিল বোধ হয় 'ছোটদের ছড়া সঞ্চয়ন'। তার প্রথম পাতায় দাদু নীল কালিতে লিখে দিয়েছিল আমার পড়া প্রথম কবিতাঃ
"দাদু, আমার বড় ভালো,
ছড়াগুলো পড়ে ফেলো"৷ 
এর বাইরে ছিল দাদুরই দেওয়া রাদুগা প্রকাশনীর ইয়াব্বড় কিছু বই, পাতা জোড়া ঢাউস সব চমৎকার আঁকা আর অল্প কথা, সহজ শব্দে সাজানো সরল প্লটের মজাদার গল্প৷ এ'ছাড়া ওই ছবিতে রামায়ণ বা মহাভারত তো ছিলই৷ মোট কথা হল সে'সব ছবি গিলতে গিলতে কয়েক লাইন পড়ে ফেলতাম৷ ছবি উপভোগ করাটাই ছিল আমার আদত পড়া। পারতপক্ষে ছবিবিহীন গল্পওলা বইটইয়ের দিকে তেমন ঘেঁষতাম না৷ সত্যি কথা বলতে কি, সেই খুদে বয়সে কমিক্সের দিকেও তেমন ঝুঁকিনি৷ বাড়িতে রাখা বাংলা কাগজে তখন নিয়মিত স্পাইডারম্যান আর ফ্ল্যাশ গর্ডনের কমিক্স প্রকাশ হত৷ দাদুর দেওয়া ছবির বইগুলোর তুলনায় সেই কমিক্সগুলোকে আমার একটু জটিল বোধ হত৷ সে'সব কমিক্সে আমি মন দিয়ে শুধু ছবিগুলো দেখতাম, স্পীচ বাবলে কী লেখা আছে তা নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। আমি খুঁজতাম সরল ভিসুয়াল প্লট, জলের মত ভাষা আর চমৎকার সহজবোধ্য অ্যাকশন। 

মনে আছে, যে কোনও পত্রিকাও তেমন টেনে দেখার আগ্রহ ছিল না সেই কচি বয়সে৷ পত্রিকা মানেই মনে হত কাটখোট্টা একটা ব্যাপার; বড্ড বেশি লেখা, ছবি কম৷ আমার এক দূরসম্পর্কের মামা তখন স্কুলেই পড়ে, তবে উঁচু ক্লাসে৷ তার বাড়িতে মাঝেমধ্যে যেতাম, তখন আমি খুব ছোট হলেও মামা সঙ্গে দিব্যি গল্প জমত। সেই মামার পড়ার টেবিলেই আমি প্রথম শুকতারা দেখি। অন্য কোনও সুবিধেজনক বই না পেয়ে বা খেলার সুযোগ না থাকায় শুকতারাটাই উল্টেপাল্টে দেখি৷ পত্রিকা হলেও সে'টাকে ঠেলে সরিয়ে দিইনি কারণ সে'টার প্রচ্ছদ উল্টেই দেখেছিলাম বাঁটুলকে৷ বাঁটুলের গল্পে হোঁচট খাওয়ার প্রশ্নই নেই৷ প্রাঞ্জল ভাষা৷ একটা শব্দও কঠিন নয়। যেন পাড়াতুতো কোনও পিসেমশাই পাশে বসিয়ে মুড়িচানাচুর চিবুতে চিবুতে, চোখ গোলগোল করে গল্প শোনাচ্ছেন৷ আর গল্পের রসিকতাগুলো এতই সোজাসাপটা যে পড়তে পড়তে দিব্যি হেসে গড়িয়ে পড়া যায়৷ সে'গল্পের চরিত্রগুলো যেমনি সাদাসিধে, তাদের মুখের ভাষাও তেমনি৷ আর থপাস, গ্লাব গ্লাব, ইয়াইকস, গেলুম, সাঁইইই-হুইইইই, দমাস, গালগ, গদাম-ঘ্যাঁক, গেছি রে, দমাস-দমাক; এমন হাজারো শব্দ মিলে কানের মধ্যে চমৎকার সব সিনেম্যাটিক এফেক্ট তৈরি হচ্ছে৷ তারপর খুঁজে পেলাম বাহাদুর বেড়াল আর হাঁদাভোঁদা। সেই একই ধরণের সব আলাভোলা চরিত্র, আর তাদের নিয়ে জমজমাট কয়েকটা পাতা৷ ব্যাস, নারায়ণ দেবনাথই একা হাতে আমায় প্রথম কোনও পত্রিকার দিকে টেনে নিয়ে গেছিলেন। সেই মামার পুরনো বইয়ের আলমারি ঘেঁটে সমস্ত পুরনো শুকতারা বের করে চড়াও হয়েছিলাম। শেষে আমাদের বাড়ির কাগজকাকুকে বলে দেওয়া হল শুকতারা দেওয়ার কথা৷ 

শুকতারা আসলেই আমি চটাপট বাঁটুল, হাঁদাভোঁদা আর বাহাদুর বেড়াল পড়ে ফেলতাম৷ এবং বারবার পড়তাম একই স্ট্রিপগুলো৷ নারায়ণ দেবনাথের ভাষার মাটিতে এলোপাথাড়ি গড়াগড়ি খেয়েই আমার ভালোবেসে বাংলা পড়া শুরু৷ এই প্রথম ছবির পাশাপাশি লেখার মায়া আমায় টেনে ধরল। পড়ার সাহস বাড়ল৷ কিছুদিনের স্রেফ নারায়ণ বাবুর কমিক্সে আটকে থাকার পর হুট করে এগিয়ে গেছিলাম অন্য কমিক্সে; 'বিলির বুট'। তদ্দিনে নারায়ণবাবু বাংলা পড়ার কনফিডেন্স সামান্য বাড়িয়ে দিয়েছেন, চিনিয়েছেন কমিক্সের অলিখিত সব নিয়মকানুন৷ এ'বার আর বিলির বুটের অসুবিধে হল না।

মজার ব্যাপার হল, বাঁটুল পড়তে পড়তে একদিন দুম করে 'দাদুমণির চিঠি' (শুকতারার সম্পাদকীয়) পড়তে শুরু করলাম৷ যদিও সে চিঠিতে ছবি নেই। কিন্তু বাঁটুল হাঁদাভোঁদা তদ্দিনে এন্তার পড়ে ফেলেছি৷ নারায়ণবাবুর গোয়েন্দা কৌশিক আবার একটু সিরিয়াস, বাঙালি বন্ড যে সে৷ সে'কমিক্সও দিব্যি পড়ে চলেছি৷ এরপর দেখলাম দাদুমণির চিঠিও তেমন জটিল নয়৷ আমি নিশ্চিত, নারায়ণবাবু সাহস দিয়েছিলেন বলেই সে চিঠি পড়ার চেষ্টা করেছিলাম৷ এরপর ধীরে ধীরে শুকতারার অন্যান্য গল্পে গিয়ে পড়লাম৷ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ তৈরি হল৷ এলো শারদীয় শুকতারার চমক, দুয়ের বদলে চার পাতার বাঁটুল ও হাঁদাভোঁদা, একের বদলে দু'পাতার বাহাদুর বেড়াল৷ সে যেন এক কার্নিভাল৷ প্রথম শারদীয়া শুকতারা হাতে পেয়ে  সে'সব কমিক্স বোধ হয় শ'খানেকবার পড়ে ফেলেছিলাম৷ নারায়ণবাবু আমায় পড়িয়ে ছেড়েছেন৷ পড়ার নেশা ধরিয়ে ছেড়েছেন তদ্দিনে৷ তারপর যা হওয়ার তাই হল৷ সাহস করে পড়ে ফেলেছিলাম ফ্রান্সিসের অ্যাডভেঞ্চার। অন্যান্য গল্প উপন্যাস৷ খুঁজতে শুরু করেছিলাম অন্যান্য গল্পের বই৷ ধীরে ধীরে এলো শঙ্কর-আলভারেজ, ফেলুদা-তোপসে, কাকাবাবু, টেনিদা এবং আরও কত ভালোবাসার মানুষজন৷  

কাজেই নারায়ণ দেবনাথকে ছুঁয়েই আমার গল্পের বই পড়া শুরু,  বাংলা ভাষা তরতরিয়ে পড়তে পারার অনাবিল আনন্দটুকু চিনতে শেখা৷ আর আমি নিশ্চিত যে এ ব্যাপারে আমি একা নই৷

লিঙ্কডনইন মেড-ইজি সিরিজ - প্রথম পর্ব


।। শব্দঃ DISRUPTOR।। 

ডিসরাপ্টর কে?

মিটিং চলাকালীন যে দুম করে 'ইয়ে, আজ লাঞ্চে মটন আছে শুনেছি' বলে জরুরী আলোচনার সুরতাল ঘেঁটে দেয়।

জরুরী ইমেলে সঠিক রিপোর্ট অ্যাটাচ না করে যে প্রাইভেট স্প্রেডশিটে বানানো মুদীখানার ফর্দ পাঠিয়ে ফেলে৷

অন্যমনস্ক হয়ে 'ইয়েস স্যারে'র বদলে যে ধের্বাল বলে ফেলে জিভ কাটে। 

পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের থ্যাঙ্কিউ স্লাইডের পর যে একখানা চোরাগোপ্তা ক্যালভিন-হবস বা হাঁদা-ভোঁদার ছবি সাঁটা স্লাইড জুড়ে দেয়, তুকতাক হিসেবে।

বাঁধা প্রমোশন হাতছাড়া হওয়ার পর যে পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড ওয়ার্ড ডকুমেন্টে সিস্টেম বিরোধী বিরাশিখানা স্লোগান লিখে মন শান্ত করে এবং তারপর আড়াই মিনিট বাউল শুনে,প্রমোশনের চিন্তা হাওয়ায় ভাসিয়ে; হাইক্লাস শিঙাড়া খুঁজতে বের হয়।

যে অমুক ডিডাকশন তমুক ডিডাকশনে ফালাফালা স্যালারি স্লিপের প্রিন্ট নিয়ে, দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে; সে কাগজের পিছনে চন্দ্রবিন্দুর বুক-কাঁপানো সমস্ত গান থেকে ধার করা মনগলানো বিভিন্ন লাইন টুকে রাখে৷  

যে রিভিউতে ছিন্নভিন্ন  হওয়ার পর হাফ-ডে ক্যাসুয়াল লীভ নিয়ে অফিসের ছাতে বসে শিব্রাম পড়তে পড়তে ভেজিটেবল চপ খায়৷

Monday, January 17, 2022

স্পষ্টবাদ

স্পষ্টভাষী হয়ে উঠতে পারায় যে কী পরম তৃপ্তি। সত্যিই, কাঠখোট্টা কথাগুলো সপাটে অন্যদের দিকে ছুঁড়ে মারার মধ্যে যেন দু'চামচ পাটালির পায়েস মুখে পোরার তৃপ্তি রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা; ধারালো স্পষ্টভাষী হয়ে ওঠার মধ্যে একটা মায়াবী উত্তরণ রয়েছে৷ তবে ভেবে খারাপ লাগে যে সকলে এখনও হাইক্লাস স্পষ্টবাদিতার দিকে এগিয়ে যেতে পারেননি৷ কাজেই সে বিষয়ে কিছু টিপস শেয়ার না করলেই নয়।

প্রথম।
আপনার পছন্দ, ভালোবাসা এবং ভালোলাগাগুলো; সে'সব সস্তাসরল ব্যাপার নিয়ে পড়ে থাকলে কিছুতেই কপিবুক স্পষ্টবাদি হয়ে ওঠা সম্ভব নয়৷ 'ভালো ভালো' জপ করে চলা মানুষদের দিয়ে আর যাই হোক রক্তগরম করা সেন্টিমেন্ট ছড়ানো সম্ভব নয়। নিজের খারাপলাগাগুলোকে আঁকড়ে ধরুন, দিনরাত সে'গুলোকেই বারবার কপচে নিজের মেজাজকে তিরিক্ষি করে তুলতে হবে৷ সে'টাই প্রথম ধাপ। মেজাজ খিটখিটে না হলে স্পষ্টবাদি ব্যাক্তিত্ব খোলতাই হয় না৷ 

দ্বিতীয়।
সবার কলার ধরে নিন্দে করাটা আপনার দায়িত্ব৷ কিন্তু সাবধান, ন্যাকাপনা করে গঠনমূলক আলোচনার দিকে ঝুঁকলে কিন্তু সমস্তটা মাটি৷ মনে রাখবেন, আপনি অভিনয় করছেন ছবি বিশ্বাস-প্যারোডি ফ্লেভারের ভূমিকায়। আন্তরিক পাহাড়ি সান্যাল হয়ে কারুর পিঠ চাপড়ে তার মঙ্গলসাধন করতে চেয়ে গল্প জুড়বেন না যেন। আপনার কাজ ক্যাঁক করে ভাষার লাথি কষিয়ে সরে পড়া৷ সেই ধরণের স্পষ্টবাদই পাবলিক খাবে, থুড়ি, উপভোগ করবে৷ 

তৃতীয়৷
সারকাজম মসলিনের মত মিহি হতেই হবে, এমন ধারণা বঙ্কিমের যুগে চলত৷ এই পোস্ট-মডার্ন যুগে অন্যের গলায় গামছা পেঁচিয়ে টেনে ধরাটাই সারকাজম৷ যত খিস্তি, তত রোয়াব৷ আর স্পষ্টবাদীদের মূল অস্ত্রই হল রোয়াব।

চতুর্থ। 
স্পষ্ট কথা বলার আদত জায়গা হল ইন্টারনেট৷ খাটে শুয়ে যে সিনেমাকে বলবেন, 'তেমন পোষাল না', সে সিনেমা নিয়ে যদি ইন্টারনেটে আড়াই পাতার গাল নাই পাড়তে পারেন; তবে জানবেন আপনার কনফিডেন্সের দুধে বিস্তর জল মিশে গেছে৷ স্পষ্ট কথা আপনার দ্বারা ফায়্যার হবে না।

পঞ্চম। 
কেউ ফীডব্যাক চাইলে আপনার কর্তব্য কী? কথার মাধ্যমে তার তলপেটে লাথি মারা৷ এক্কেবারে এলোপাথাড়ি লাথি৷ তারপর তাকে বলা "কিছু মনে কোরো না, আমি ভাই স্পষ্ট কথার মানুষ৷ আই উইল কল আ স্পেড আ স্পেড"৷ সবচেয়ে বড় কথা, কোদালকে কোদাল বলার জন্য কোদাল চেনার কোনও দরকার নেই৷ ও যা কিছু একটা দুমফটাস জুতোজুতি মার্কা কিছু বলে দিলেই হল৷ 

কথাগুলো সোজাসুজিই বললাম, যেমনটা আমি বলে থাকি৷ আমি আবার সোজা কথার মানুষ কিনা, কোনও রাখঢাক আমার পোষায় না৷ পারলে সাজেশনগুলোর ওয়ার্ড ডকুমেন্টে ফেলে, একটা প্রিন্ট নিয়ে মানিব্যাগে রাখুন। তা'তে আপনাদেরই আখেরে মঙ্গল৷ 

পুনশ্চঃ

রবীন্দ্রনাথের একটা খেজুরে ছড়া খানিকক্ষণ আগে পড়ছিলাম৷ সোজাসুজি স্পষ্টভাবে টুকে দিলামঃ

"বসন্ত এসেছে বনে, ফুল ওঠে ফুটি,
দিনরাত্রি গাহে পিক, নাহি তার ছুটি।
কাক বলে, অন্য কাজ নাহি পেলে খুঁজি,
বসন্তের চাটুগান শুরু হল বুঝি!
গান বন্ধ করি পিক উঁকি মারি কয়,
তুমি কোথা হতে এলে কে গো মহাশয়?
আমি কাক স্পষ্টভাষী, কাক ডাকি বলে।
পিক কয়, তুমি ধন্য, নমি পদতলে;
স্পষ্টভাষা তব কণ্ঠে থাক বারো মাস,
মোর থাক্‌ মিষ্টভাষা আর সত্যভাষ"।

Saturday, January 15, 2022

মনুবাবু ও বনমালী



চৌরাস্তার মোড়ের এককোণে বঙ্কুর পানের দোকান। বঙ্কুর সেই পানের দোকান থেকে খান দশ পা এগোলেই একটা ইলেক্ট্রিক পোল। অবশ্য মনুবাবু গোপনে সে পোলটার একটা নাম দিয়ে ফেলেছেন; বনমালী। ব্যাপারটা মধ্যে একটু খ্যাপাটেপনার গন্ধ যে নেই তা নয়, কিন্তু তা সবিশেষ পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না মনুবাবু।

রোজ সন্ধ্যেয় অফিস থেকে ফিরে, বঙ্কুর দোকান থেকে একটা খয়ের ছাড়া সাদা পান মুখে পুরে; সোজা বনমালীর পাশে এসে দাঁড়ান মনুবাবু। আর তারপর প্রাণ খুলে যত অভাব-অভিযোগ-মনখারাপ, সমস্ত উজাড় করে দেন বনমালীর কাছে। 

"বুঝলে ভায়া বনমালী, এই চ্যাটার্জিটা নির্ঘাৎ ব্যাকস্ট্যাব করেছে৷ আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর। আমি নিশ্চিত ও বড়সাহেবের কান ভাঙিয়েছে৷ নয়ত এ'বারের প্রমোশনটা আটকায় কী করে বলো"!

"বনমালী! শুনেছ? রাণুর বাবা বলেছে আমি নাকি রাণুর যোগ্য পাত্র নই! আরে রাণুর সিটিসি আমার চেয়ে বেশি বলে আমি ওর যোগ্য নই? এরা কোন সেঞ্চুরিতে বাস করে বলো দেখি"!

"ভায়া বনমালী, গোটা দুনিয়াটাই উচ্ছন্নে গেছে। আরে বাসভাড়া দেওয়ার পর ছাই টিকিটটা হারিয়ে ফেলেছি।  তবু কন্ডাক্টর ব্যাটা বিশ্বাস করলে না? চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে সে কী ইনসাল্টটাই না করলে।  বাধ্য হয়ে ফের টিকিট কাটতে হল। এ যে দিনেদুপুরে ডাকাতি"!

"বনমালী, শুনেছ তো খবরটা? গুপ্তিপাড়ার পিসিমা আজ দুপুরে চলে গেলেন। গার্জেন বলতে আর কেউই রইল না। এ'বারেই বোধ হয় ভেসে যাওয়া, তাই না ভাই"?

এমন হাজার রকমের বুকের চিনচিন, হাড়ের জ্বালা, বা মনের হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় নিশ্চিন্তে বনমালীর কাছে সঁপে দেন মনুবাবু। তিনি জানেন, বঙ্কু আর তার দোকানের ফিচেল খদ্দেররা তাকে নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি করে। মাঝেমধ্যে বিশ্রী সব আওয়াজও ভেসে আসে। কিন্তু সে'সব গা করেন না মনুবাবু৷ কেন জানি তার মনে হয় বনমালীকে বলা কথাগুলো সমস্তই জলে যায় না৷ কেন জানি তার মনে হয় যে বনমালীকে সব বলতে পারলেই প্রাণ জুড়িয়ে আসে, বুকের মধ্যে আরামদায়ক হাওয়া বয়, মনের তিতিবিরক্ত ভাব কেটে গিয়ে শান্তি আসে, মুখের তিতকুটে ভাব কেটে গিয়ে ফার্স্টক্লাস খিদে পায়৷  বনমালীকে ছাড়ার কথা ভাবতেই পারেন না মনুবাবু।

**

- কী রোজ ওই ওয়্যারলেস রিসিভার কানে চাপিয়ে বসে থাকিস বল দেখি৷

- দিনের ঠিক এই সময়টা, দূরের কোনও গ্যালাক্সির কোনও গ্রহ থেকে একজন প্রাণীর শব্দ ভেসে আসে। সে গ্রহের এগজ্যাক্ট পোজিশন যদিও এখনও ট্র‍্যাক করতে পারিনি৷ 

- শব্দ? এলিয়েনের?

- নির্ঘাৎ। 

- ডিকোড করতে পেরেছিস?

- না৷ কী সব হিজিবিজি শব্দ৷ ও আমাদের বুঝে উঠতে মেলা সময় লাগবে৷ 

- কী'রকম সব শব্দ?

- গুপ্তিপাড়া পিসি গার্জেন..কী'সব হিজবিজবিজ। কিন্তু আমাদের ফিলিং ইন্টারপ্রেটেনশন ডিভাইস একটা জিনিস ক্র‍্যাক করতে পেরেছে৷ সে এলিয়েনের সবকথাই মনখারাপের।

- বলিস কী! এলিয়েনরা তোর কাছে মনখারাপের মেসেজ ট্রান্সমিট করছে?

- অদ্ভুতুড়েই বটে৷ আমি অবশ্য পালটা মেসেজ না পাঠালেও, আমাদের এই ইন্টার গ্যালাক্টিক ভাইব ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে 'ঘাবড়ে-যেওনা-হে-আমি-আছি-তো' ভাইব একটানা ট্রান্সমিট করে যাই৷ সে ভাইব যে ওই এলিয়েনবাবাজীর কাছে পৌঁছচ্ছে, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত৷