Monday, January 3, 2022

যুধিষ্ঠির আর পয়লা জানুয়ারি

দু'হাজার বাইশ৷ পয়লা জানুয়ারি৷ রাত একটা। 

নিউ ইয়ার পার্টিতে নেচে-কুঁদে, রিমঝিমে নেশায় বুঁদ হয়ে, যুধিষ্ঠির বাড়ি ফিরছিলেন। কেলোর কীর্তিটা টের পেলেন বাসস্ট্যান্ডে এসে৷ কোন শালা পকেট কেটে মানিব্যাগ নিয়ে হাওয়া৷ 

নেশা গেল চটকে। ধেচ্ছাই৷ মানিব্যাগে তিনশো বাইশটাকা ছিল, পুরোটাই গচ্চা। এ'দিকে মানিব্যাগ ছাড়া শেষ ইন্দ্রপ্রস্থ মিনিটায় ওঠা যাবে না। এখন উপায়? 

কপাল একেই বলে, এত রাত্তিরেও বাসস্ট্যান্ড এক্কেবারে ফাঁকা নয়৷ বেঞ্চিতে আধশোয়া হয়ে যে মাতালটা শুয়ে সে ব্যাটা যুধিষ্ঠিরের রীতিমতো চেনা; যক্ষ৷ 

পিঠে চাপড় খেতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসলে যক্ষ৷ 

- আরে! যুধিদা যে।

- হ্যাপি নিউ ইয়ার ভাইটি।

- হ্যাপ্পি হ্যাপ্পি ন্যু ইয়ার ধম্মরাজ৷ তা লাস্ট ইন্দ্রপ্রস্থ মিনি ধরবে তো? পাঁচ মিনিটে আসছে।

- যক্ষ৷ ভাইটি। কুড়ি টাকা ধার দে দেখি৷ পরশুই দিয়ে দেব।

- তুমি শালা মহাফেরেব্বাজ৷ বড় গলায় বলছ দিয়ে দেব৷ অথচ কে জানে, ফিসফিস করে হয়ত বলবে 'ইতি গজঃ'৷ আমি কি দ্রোণের মত বুড়োহাবড়া নাকি৷ 

-  অমন বলিস না ভাই৷ কে যেন মানিব্যাগটা মেরে দিয়েছে৷ কুড়িটাকা না হলেই নয়৷ লাস্ট বাস কিছুতেই মিস করা চলবে না। এই শীতের রাতে বেশিক্ষণ বাইরে থাকলে আমার সাইনাস মাইনাস হয়ে যাবে।

- টাকা দিতে পারি৷ তবে সেই পুরনো শর্ত যুধিদা।

- সেই কফি উইথ যক্ষ খেলতে হবে?

- করেক্ট। ছ'টা প্রশ্ন। সবকটার সঠিক উত্তর দিতে পারলেই জ্যাকপট। তা'হলে শুধোই?

- দেরী করে লাভ নেই৷ শীত বাড়ছে। জিজ্ঞেস কর৷ 

- ইয়ে, বিড়ি আছে?

- আছে।

- আহ, সে'টা প্রশ্ন নয়৷ দাও দেখি একটা।

- ওহ হো৷ এই যে৷

- থ্যাঙ্কিউ৷ এ'বার। শুধোই৷ কেমন?

- হোক। 

- এ দুনিয়ায় সবচেয়ে আশ্চর্যের কী যুধিদা?

- জীবনে কেউ ফেসবুক ট্যুইটারে তর্কে জেতেনি৷ অথচ তবু মানুষের টাইমলাইন কাঁপানো তর্কের শখ আর আগ্রহ কিছুতেই কমে না৷ 

- ঠিক৷ সবচেয়ে সুখী কে?

- যে মানুষ খবরের কাগজ রাখে স্রেফ অরিগ্যামি প্র‍্যাক্টিস করতে৷ আর যে নিউজ চ্যানেল ব্যবহার করে স্রেফ বারান্দায় বসা কাকচিল তাড়ানোর জন্য। 

- বাতাসের চেয়েও দ্রুতগামী কে?

- মিম। 

- স্বর্গের চেয়েও উঁচু কী?

- ল্যাদ।

- পৃথিবীর চেয়েও ভারী কী?

- নিউইয়ার রিজোলিশনের বোঝা।

- গুড৷ গুড৷ তুমি গুরু হাইক্লাস মানুষ৷ ফাইনাল প্রশ্ন৷ করি?

- নিশ্চয়ই।

- ভালোবাসা কী গুরু?

- ভালোবাসা?

- কী হল গুরু৷ আউট অফ সিলেবাস? ভেবড়ে গেলে দেখছি৷ 

- ভালোবাসা..। হুঁ..। ভা..লো..বা..সা..।

- তোমার বাড়ি ফেরা আটকে গেল যে গুরু৷ কুড়ি টাকা তো পেলে না।

- ভালোবাসা কী..এ'টাই তোর প্রশ্ন?

- একদম৷ হোয়াট ইজ লাভ যুধিদা? টেল মি!

- শীতের রাত৷ এখন রাত সোয়া একটা৷ নিউ ইয়ার। শহর জোড়া হুল্লোড়৷ অথচ তুই একা এই বাসস্টপের বেঞ্চিতে নেতিপেতি হয়ে পড়ে রয়েছিস৷ মনখারাপ ভাই দক্ষ?

- এ কী! প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এ'সব কী যুধিদা!

- তোর প্রশ্ন ভুলিনি৷ উত্তরও দেব৷ তুই জিজ্ঞেস করেছিস ভালোবাসা কী। ভালোবাসা কী জানিস? তোর কুড়িটাকার দরকার আপাতত আমার নেই৷ ভোরের দিকে দিলেই হবে। 

- ও মা৷ সে কী!

- লাস্ট বাসে ফিরে আর কাজ নেই৷ 

- কেন? ফিরবে না?

- তোর সঙ্গে গেঁজিয়ে কাটাবো ভাবছি রাতটা৷ নতুন বছরের প্রথম রাত, এমন একাবোকা হয়ে পড়ে থাকবি কেন রে রাস্কেল? তার চেয়ে দু'ভাই গপ্পটপ্প করে কাটিয়ে দেব'খন৷ কী বলিস?

- পার্ফেক্ট। ছ'টা প্রশ্নের উত্তরই তুমি ঠিকঠাক দিয়েছ৷ আর ভোরের দিকে কুড়িটাকা নয়৷ তোমায় আমি রীতিমতো ট্যাক্সিতে বসিয়ে দেব। 

- হেহ্। 

- থ্যাঙ্কিউ যুধিদা। হ্যাপি নিউ ইয়ার। 

- হ্যাপি। হ্যাপি।

Friday, December 31, 2021

অভি, মানুদা আর নিউ ইয়ার



- অভি, লেট বাই থার্টি ফাইভ মিনিটস।

- সরি মানুদা৷ মাইরি, সরি৷ আসলে নিউইয়ারের মুখে লোকজনের এত হুজুগ৷ ট্র‍্যাফিকে ফেঁসে গিয়েই..।

- বাজে কথা না বাড়িয়ে আগে চা চাপিয়ে দে।

- আহ, তোমার বাড়িতে এলাম৷ কোথায় তুমিই স্টোভ জ্বালিয়ে..।

- গুরুজনের মুখে ওপর বেশি কথা বলতে নেই। 

- আচ্ছা, পাঁচ মিনিট দাও। একটু জিরিয়ে নিই। বাপ রে! বাসে সে যে কী ভিড়! 

- চায়ের সঙ্গে একজোড়া অমলেটও ভেজে আনিস, কেমন? ফ্রিজে আছে ডিম৷ 

- উফ, তোমার সেবা করতে এলাম নাকি?

- রাতের বিরিয়ানিটা আমিই খাওয়াব তো৷ অত তিতিবিরক্ত হচ্ছিস কেন।

- বলছিলাম, আর কেউ আসছে নাকি মানুদা?

- সে কী! আমার বাড়িতে আর আসবেটা কে৷ আত্মীয়স্বজন বলতেও তুই৷ বন্ধুবান্ধব বলতেও তুই৷ তুই কি নিউ ইয়ার্স ইভ পার্টি এক্সপেক্ট করে এসেছিস এ'খানে? তা'হলে পত্রপাঠ তোর ওই গদাই দত্তদের তাসের আড্ডায় চলে যা৷ চাই কী সে'খানে দু'দাগ দামী মদও জুটতে পারে৷ মাগনায়। 

- গদাই দত্তের আড্ডায় আজ সিঙ্গল মল্টের পাশাপাশি শুনেছি বিপুল সেনও থাকবে৷ স্টার অ্যাট্রাকশন! 

- থিয়েটার অভিনেতা বিপুল সেন?

- গতবছর তিনটে সিনেমাও রিলিজ করেছে ওর৷ তিনটেই সুপারহিট৷ 

- গদাই দত্ত আসর জমাতে জানে বটে৷  তা' সে'খানে তো তোর অবাধ যাতায়াত৷ সেই হাইক্লাস ফুর্তি ছেড়ে এই ব্যাচেলরের বিমর্ষ আস্তানায় কী করছিস রে অভি?

- অ্যানুয়াল হ্যাবিট৷ এ'বারেও ভাবলাম যাই৷ তোমায় চা-অমলেট খাইয়ে আর বিরিয়ানি প্রসাদ পেয়ে বছর শেষ করলে আগামী বছর ভালো কাটবে৷ 

- তা অবশ্য ঠিক৷

- চাকরীটা ভাবছি ছেড়ে দেব।

- আমায় দিয়ে রেসিগনেশন লেটার লেখাবি?

- ধুস৷ 

- তবে?

- আমি কিন্তু সিরিয়াস। 

- এ তো ভালো কথা। কদ্দিন আর ন'টা-ছ'টার ছকে আটকে থাকবি৷ তোর ট্যালেন্ট আছে৷ অধ্যাবসায় আছে৷ ভাবনা কী?

- এই এনকারেজমেন্টের জন্যই তোমার কাছে আসা৷ 

- চট করে চা'টা বানিয়ে আন৷ তারপর তোর চাকরী ছাড়ার প্ল্যান সবিস্তারে শোনা যাবে৷ 

**

- সত্যি অভি, তুই চা'টা বড্ড ভালো বানাস৷ দশে সাড়ে দশ।

- অমলেটটা কত স্কোর করেছে?

- দশে সোয়া সাত৷ পেঁয়াজটা যথেষ্ট মিহি করে কুচোসনি৷ সামান্য বেশি ভেজে ফেলেছিস৷ তাই সামান্য নম্বর কাটতে হল। 

- ডিউলি নোটেড।

- কবে ছাড়ছিস? চাকরী?

- ভাবছি সামনের হপ্তাতেই বসকে চিঠি ধরিয়ে দেব।  তারপর মুক্তি।

- মুক্তি! বাহ্!

- তুমিই বলো মানুদা৷ এই অজস্র ফাইল, খামোখা মিটিং, গাম্বাট সব টার্গেট; দিনের পর দিন, মাঝেমধ্যে মনে হয় জম্বি হয়ে পড়েছি৷

- জ্যান্ত লাশ হয়ে পড়ে থাকা মোটেও কাজের কথা নয়। 

- থ্যাঙ্ক ইউ৷ আমি জানতাম তুমি অন্তত বুঝবে।

- তা, রেসিগনেশনের পর?

- প্ল্যানটা এখনই ঠিক কষে রাখিনি৷ তবে লেখালিখি করেই আয়টায় করার চেষ্টা করব'খন৷ কিছুদিনের স্ট্রাগল৷ তবে ম্যানেজ ঠিক হয়ে যাবে। 

- এই তো চাই৷ রিস্ক না নিলে চলবে কেন? চিরকাল দুধেভাতে নেকুপুষু হয়ে পড়ে থাকলে শাইন করবি কী করে?

- মানুদা৷ তোমার কথা শুনে বুকে বল পাচ্ছি৷ সামনের বছরটা অন্তত অন্যরকম একটু..।

- এই দাঁড়া, বিরিয়ানিটা অর্ডার দিই।

**

- উফ্৷ বিরিয়ানিটা এক্কেবারে টপক্লাস ছিল মানুদা। দশে বারো।

- আর চাপটা?

- দশে নয়৷ আর একটু ঝাল দিতেই পারত।  

- কী ভাবলি? রেসিগনেশনটা নিয়ে?

- নামিয়েই দি৷ 

- নিশ্চয়ই নামাবি।

- সুমি একটু চিন্তিত৷ অবশ্য ওর আপত্তি নেই৷ তাছাড়া ওর চাকরীটাই তো আমার ভরসা।

- সুমি কনফিডেন্ট মেয়ে৷ তোকে ঠিক সামলে নেবে।

- মানুদা।

- বল।

- গদাই দত্তের তাসের আড্ডায় কেউ কোনওদিনও বিশ্বাস করবে না যে এই পনেরো বছরের চাকরীটা ঝুপ করে ছেড়ে দেওয়ার দম আমার আছে। যতবার বলেছি, উড়িয়ে দিয়েছে।

- দ্যাখ অভি, গদাই দত্তের আড্ডায় সিঙ্গল মল্ট থাকতে পারে৷ কিন্তু তোর মত ক্রিয়েটিভ মানুষকে চেনার ধক ওদের নেই৷

- ওদের আমি থোড়াই পাত্তা দি৷ তোমার ওপিনিওনটাই জানার দরকার ছিল। 

- তুই যাই করিস, শাইন করবি৷ এ আমি নিশ্চিত।

- আর এক কাপ চা বসাই মানুদা?

- হোক।

***

- বাহ্৷ এই না হলে চা৷ চমৎকার বানিয়েছিস অভি।

- আরে, বারোটা বেজে দুই৷ হ্যাপি নিউ ইয়ার মানুদা।

- হ্যাপি নিউ ইয়ার। 

- জানো,  চাকরীটা ছাড়তে একটু হলেও বুক কাঁপবে।

- স্বাভাবিক।

- আসলে..নিজের ক্রিয়েটিভ প্যাশনকে আদৌ পাত্তা না দেওয়াটা যে অন্যায় হচ্ছে..সেই অনুভূতিটা মাঝেমধ্যেই ট্রাবল দেয়।

- এই যে ছটফট তোর মধ্যে আছে। সে'টাই তোর প্যাশন অভি। 

- গদাই দত্তরা যাই বলুক৷ আমি ভীতু নই মানুদা৷ চাকরী ছাড়ার সাহস আমার আছে৷ 

- আলবাত আছে৷ কিন্তু তোর প্রমাণ করার কিছুই নেই৷ আর একটা কথা বলি অভি? একত্রিশ  ডিসেম্বর রাত্রে তুই এই বুড়োটার সঙ্গে আড্ডা জমাতে এসেছিস, সে'টাও কম দুঃসাহস নয়।

- আমি তো প্রতি বছরই শেষ দিনটা তোমার সঙ্গেই কাটাই মানুদা। 

- রাইট।

- প্রতি বছর চাকরী ছাড়ার প্ল্যানটাও বুক বাজিয়ে বলতে আসি। 

- আসিস।

- অথচ ছাড়া হয় না।

- একদিন ঠিক ছাড়বি। একদিন অন্য কিছু করবিই, দারুণভাবে৷ 

- ঠিক ছাড়ব একদিন না একদিন! শালা গদাই দত্ত আর তার দলবল যতই খোঁটা দিক। ও'দের ঠিক দেখিয়ে দেব।

- আলবাত!

**

- হ্যালো!

- হ্যালো, মানুদা৷ 

- বল সুমি।

- অভি আছে?

- ও তো এই বেরোল৷ ট্যাক্সি নিয়েছে৷ আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে।

- শুনেছ নিশ্চয়ই৷ প্রতিবারের মত এ'বারেও ওর নিউ ইয়ার রেজোলিউশন; চাকরী ছেড়ে লেখালিখি নিয়ে পড়ে থাকবে। 

- জানি। 

- তোমার কী মনে হয়, এ'বারে সত্যিই ছাড়বে?

- প্রতিবারের মত এ'বারেও অভি গদাই দত্তের আড্ডায় নিজের স্টেটাস আপগ্রেড করতে চেয়ে চাকরী ছাড়তে চাইছে রে সুমি। নিজের প্যাশনের টানটা হয়ত এখনও সে'ভাবে চাগাড় দেয়নি ওর মধ্যে৷ তুই তো জানিস, আমার কাছে সে ফিবছর আসে শুধু সে'টুকু নিজেকে মনে করাতে। আর হ্যাঁ, আমার কাজ ওকে মনে করানো গদাই দত্তদের জাজমেন্টাল জ্ঞান-টীকা-টিপ্পনিই শেষ কথা নয়, ওর মধ্যে সত্যিই সৎসাহস আছে৷ আর আছে হাইক্লাস চা বানানোর ক্ষমতা। তোর বরটা সত্যিই একটা ক্রিয়েটিভ জিনিয়াস।

- হে হে৷ তা বটে৷ পরের বছর আমিও কিন্তু যাব অভির সঙ্গে, তোমার ফ্ল্যাটে৷ বিরিয়ানি আমাকেও খাইও৷ 

-  জো হুকুম। হ্যাপি নিউ ইয়ার সুমি।

- হ্যাপি নিউ ইয়ার মানুদা৷ গুড নাইট৷

চাষবাস



জটিল কিছু যদি কেউ সহজ ভাষায় ফুসমন্তরে বুঝিয়ে দেন, তা'হলে তার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকা ছাড়া কোনও উপায় থাকে না৷ সে'দিক থেকে, য়ুভাল নোয়াহ্ হারারি সাহেবের প্রতি আমি বেশ খানিকটা ঋণী। আজ হঠাৎ ভদ্রলোকের কথা ফের মনে পড়ল কারণ ওঁর স্যাপিয়েনস বইটার মধ্যে যে চ্যাপ্টারটা আমার সবচেয়ে প্রিয়, সে'টা আজ আর একবার পড়লাম৷ বলে রাখা ভালো, 'এগ্রিকালচারাল রিভোলিউশন' নিয়ে লেখা ওই কয়েক পাতায় আমি মাঝেমধ্যেই ফেরত যাই। ঠিক যেমন ভাবে মাঝেমধ্যেই ঘুরেফিরে আগন্তুক সিনেমার সেই দৃশ্যটা দেখি যে'খানে মনমোহন মিত্র আর পৃথ্বীশ সেনগুপ্তর তর্কের চোটে অনীলা আর সুধীন্দ্রর ড্রয়িংরুম সরগরম হয়ে ওঠে৷

আগন্তুক যখন প্রথম দেখি, তখন আমি নেহাতই ছেলেমানুষ। তবে সে সংলাপ এতটাই তীক্ষ্ণ  যে সেই স্কুলবয়সেও মনমোহনের ভক্ত হয়ে উঠতে সময় লাগেনি। কিন্তু সে সংলাপ নিয়ে 'বলে কী রে ভাই' মার্কা বিস্ময় বোধ করেছি অনেক পরে। স্যাপিয়েনসের ওই চ্যাপ্টারটার মতই, ওই দৃশ্যটা বারবার দেখেও ক্লান্তি আসেনা। আমার মত বহু ছাপোষা মানুষ নিশ্চয়ই মনমোহনের বাগ্মিতায় বারবার মুগ্ধ হয়েছেন। ফেসবুক টাইমলাইন বা ইউটিউবে সে দৃশ্য মাঝেমধ্যেই চলেও আসে। সভ্যতা কী, টেকনোলজি কী, মানবাধিকার কী, স্বাধীনতা কী; এ'সব ভারিক্কি প্রশ্নকে প্রায় টেনিস বল লোফালুফির পর্যায় এনে আলোচনা করেছেন মনমোহন।  সারকাজম এড়াতে পারেননি, পৃথ্বীশের উস্কানিতে বারবার রেগেও উঠেছেন। কিন্তু মনমোহন নিশ্চিত ভাবেই দর্শকের ভাবনাচিন্তা এলোমেলো করে দিতে পেরেছেন৷ কিন্তু, পৃথ্বীশের জেদকে ঠিক ভাঙতে পারেননি মনমোহন। অবশ্য অমন একবগগা মানুষকে বাগে আনা সহজ নয়৷ সেই গাম্বাটপনার জন্যই তর্কটা জমে ওঠার আগেই সুতো ছিঁড়ে গেল।

আজ এই পোস্ট লিখতে বসা একটাই কারণে। আগন্তুকের সেই দৃশ্য যদি আমার মত অন্য কারুরও অসম্পূর্ণ ঠেকে, তাদের জন্য হারারির লেখা ওই কয়েকপাতা বেশ জরুরী। মানুষের চাষবাস কী ভাবে শুরু হল, সে গল্প হারারি বলেছেন যে'খানে, সেই অধ্যায়ের নাম; "হিস্ট্রিজ বিগেস্ট ফ্রড"। বনেজঙ্গলে শিকার করে, ফলমূল খেয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষ আচমকা একসময় চাষবাস শুরু করলে। সে'খান থেকে গড়ে উঠল বসতি। মানব সভ্যতা তরতরিয়ে এগোতে লাগল। পৃথ্বীশ নিশ্চয়ই যে'টাকে বলতেন; 'অভাবনীয় প্রগ্রেস'। কিন্তু সেই প্রগ্রেস যে কতটা গোলমেলে, সে'টাই বুঝিয়েছেন হারারি সাহেব; বরফ-মার্কা সব যুক্তি সাজিয়ে। গোটা মানব সভ্যতার মূলেই যে 'আশায় মরে চাষা'র ট্র‍্যাজেডি, তাই ধৈর্য ধরে বুঝিয়েছেন হারারি।

চাষবাসের ফলে মানুষের খাটনি বাড়ল।
খাবারের পরিমাণ বাড়লেও পুষ্টি কমল, কারণ এর আগে মানুষ রকমারি ফল, সবজি, মাংস খেয়ে বেড়াত। অথচ কৃষিকাজ শুরু করার পর পাতে পড়তে লাগল কাঁড়িকাঁড়ি ভাত বা আটা।
শিকার করা বা গাছ থেকে ফল পাড়ার চেয়ে চাষবাসে অনেক বেশি খাটুনি। কাজেই জ্বালাযন্ত্রণা বাড়তে শুরু করল।
একদিকে।খাবার উৎপাদন যেমন বাড়ল, খেতখামারে কাজের জন্য বাড়তি লোকজনেরও দরকার পড়ল।
শিশুরা এর আগে স্রেফ মায়ের দুধের ওপর নির্ভরশীল ছিল, এখন 'আধুনিক' খিচুড়িটিচুড়ি পাতে পড়তে শুরু করল। ফলে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বাড়তে লাগল, কমল ইমিউনিটি। শিশুমৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেল। সামগ্রিক রোগভোগও বাড়ল। 
দু'এক রকম ফলনের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা বহুগুণ বেড়ে গেল, ফলে অতিবৃষ্টি খরা এইসব নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তায় বাড়ল বহুগুণ।  
এরপর এলো আর এক গেরো। বাড়তি উৎপাদন সামলে রাখার দায় বাড়লো যাতে ভবিষ্যতে ফলন কম হলেও পেটে দানাপানি পড়ে। এরপর এলো একের ভরাগোলা দেখে অন্যের চোখ টাটানোর পালা। শুরু হলো চুরি। এলো যুদ্ধ। বসলো ট্যাক্স। শেষে সেই চিরপরিচিত ট্রাজেডি; কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনির ওপর ট্যাক্স বসিয়ে সিংহাসনে বসলেন রাজা, তৈরি হল শহর,  গড়ে উঠল সেনাবাহিনী, এলো রাজনীতি,  এলো যুদ্ধ। 

মোদ্দা কথা হল চাষবাস শুরু করার পর থেকেই হোমো স্যাপিয়েনদের রসেবশে থাকার দিন খতম। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই বোধ হয় সুখে থাকতে ভূতে কিলোনোর শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ।  

আর এ'খানেই একটা সামান্য খটকা। আগন্তুক সিনেমার সেই মারকাটারি তর্কের দৃশ্যে মনমোহন বন্যসভ্যতার পক্ষে সওয়াল করে বলছেন জংলি মানুষের 'এগ্রিকালচার, পটারি, উইভি''ও সমীহের দাবী রাখে। কিন্তু ওই এগ্রিকালচার থেকেই যে মানুষের পতনের শুরু। অবশ্যই সে পতনের মধ্যে দিয়েই রবীন্দ্রনাথ উঠে এসেছেন। সে'টা নিশ্চয়ই হেলাফেলার ব্যাপার নয়। 

মনমোহনের আর্তনাদ মনে আছে? যে'খানে উনি প্রায় চিৎকার করে ঘোড়েলশ্রেষ্ঠ পৃথ্বীশকে বলছেন, "আপনি কেন বুঝতে পারছেন না আমি নিজে জংলি নই! এ'টা আমার পরম আক্ষেপের বিষয় যে আমি জংলি নই।...কিন্তু উপায় কী বলুন। ঘর ছাড়ার অনেক আগেই আমার মজ্জার মধ্যে ঢুকে গেছে শেকসপিয়ার, বঙ্কিম, মাইকেল, মার্ক্স, ফ্রয়েড, রবীন্দ্রনাথ.."।

" মজ্জায় রবীন্দ্রনাথ ঢুকে গেছে" - আমার মত এলেবেলে মানুষকে যদি এই আক্ষেপের মূলে পৌঁছতে হয়, তবে হারারি সাহেবের এই চমৎকার বইটা বোধ হয় অত্যন্ত জরুরী।

ফিস্টি




পিকনিক ব্যাপারটা মন্দ নয়৷ তবে শীতের রাতে ছাতের ফিস্টি অনেক বেশি সুবিধেজনক মনে হত। ভোরবেলা কাগজের বাক্স থেকে ডিমসেদ্ধ আর মাখন-পাউরুটি বের করার চেয়ে ঢের ভালো হলো সন্ধ্যেবেলা এক ঠোঙা মুড়ি-বেগুনি হাতে বন্ধুর বাড়ির ছাতে উঠে যাওয়া৷ তাছাড়া পিকনিকের জন্য বাড়তি প্ল্যানিংয়ের দরকার৷ কোথায় যাওয়া হবে, কী'ভাবে যাওয়া হবে, কতজন যাবে। বাজারের ফর্দ তৈরি, বাজার করা, বাসনপত্র ভাড়া করা। ব্যাডমিন্টনের র‍্যাকেট, ক্রিকেট ব্যাট সমেত বিভিন্ন রকম খেলার সরঞ্জাম জোগাড় করা৷ বড়দের জন্য হাউজি খেলার ব্যবস্থা, ছোকরাদের লারেলাপ্পা হিন্দি গান চালানোর জন্য স্পীকার৷ আর সর্বোপরি পিকনিক স্পট বুক করা৷ হাজারো হ্যাপা৷ চড়ুইভাতি নিয়ে রচনা-টচনা লিখতে দিব্যি লাগলেও, কিন্তু আদত ব্যাপারটা সামাল দিতে মাথার ঘাম পায়ে না ফেললেই নয়৷  

পাড়ার ফিস্টিতে বরং সে'সব জটিল ছক কষা নেই৷ দুপুরের খামোখা হুজুগে রাতের জম্পেশ ফিস্টি নেমে যায়৷ বিকেলে খেলার মাঠ থেকে কেউ সোজা গেল মুর্গি কিনতে৷ কেউ গেল আলু, পেঁয়াজ, টমেটো গোছের খুচরো জিনিসপত্র জোগাড় করতে৷ ফাঁকিবাজ বন্ধুটি স্রেফ ট্যুয়েন্টি নাইনের তাস জোগাড় করেই খালাস৷ যার বাড়ির ছাতে পিকনিক, বাসনপত্র-রান্নার গ্যাসের দায়িত্ব তার৷ বিনিময়ে বাসন মাজা বা রান্নার হ্যাপা তার কপালে নেই। 

ফিস্টির মেনুতে গুরুপাক অচল; সাদামাটা সমস্ত পদ। আলুভাজা (শুধু শুধু খাওয়ার জন্য, স্টার্টার), মুর্গির টানটান ঝোল, গরম ভাত, টমেটোর চাটনি, রসগোল্লা আর গোল্ডফ্লেক। সে সামান্য রান্নাটুকু শেষ হতে রাত বারোটা বাজবেই৷ সে'টাই ট্র‍্যাডিশন। কারণ বাজে গল্প৷ গল্প ভালো এবং গভীর হলে যে ফিস্টিটাই মাটি। রান্না শুরু হওয়ার আগেই কয়েক রাউন্ড চা চাপানো হবে। 'লিকার' চা না হলে ফিস্টির গালগল্প জমবে কী করে? ফিস্টির প্রাণই তো হল মুর্গি ধুতে ধুতে আর পেঁয়াজ কুচোতে কুচোতে বারোয়ারী গল্প। 

রান্নার ক্যাপ্টেন চেয়ার আলো করে উনুনের সামনে বসে টীম পরিচালনা করবে।
জ্ঞানরত্ন খোকা দু'কোয়া রসুন ছাড়িয়ে নোবেলজয়ী হাসি হেসে, রিচি-বেনোর ঠাকুর্দা লেভেলের আত্মবিশ্বাস সমেত ক্রিকেট নিয়ে জ্ঞান দেবে।
আচমকা কোনও র‍্যান্ডম জ্যেঠিমা ছাতে উঠে এসে রান্নাবান্না নিয়ে দু'টো ভারিক্কি টিপস দিয়ে যাবেন।
টুয়েন্টি নাইনের আসর থেকে ইতিউতি দু'এক টুকরো ভাঙা প্রেমের মনোগ্রাহী গল্প উড়ে আসবে৷
আর, মুর্গি কড়াইয়ে পড়লেই কেউ না কেউ গান ধরবে। তার আচমকা বেসুরো আক্রমণে দমে না গিয়ে আরও জনা কয়েক সুর মেলাবে, তেমনটাই নিয়ম। 

আর,
বছর সতেরো বাদে, ডিসেম্বর রাত্রির বিটকেল প্রান্তে, কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে বেরসিক কেউ ফোন করে জানতে চাইবে, "ভাই, আজ অন্তত দিব্যি কেট বল! সে'বার তপাদাদার ছাতের ফিস্টিতে আমার ভাগের লেগপিসটা তুই মেরে দিসনি? এদ্দিন পর তো অন্তত স্বীকার কর রে রাস্কেল"!

Monday, December 27, 2021

শ্যামল ডিলান তুকতাক



- এই যে৷
- আরে, তুমি? কী আশ্চর্য!
- চলে এলাম, ইচ্ছে হল৷ অবাক হওয়ার কী আছে!
- বসো।
- বসি, কেমন?
- একশো বার৷
- থ্যাঙ্ক ইউ।
- এই বেঞ্চটা বড় মায়ার৷ তাই না?
- যা শীত৷ বাপ রে৷ হাড় কনকনের মধ্যে মায়াটায়া টের পাচ্ছি কই৷
- হেহ্৷
- অনি কেমন আছে?
- দিব্যি৷ শখের প্রাণ৷ আজকাল হঠাৎ বাগানের শখ চেপেছে৷ হপ্তায় দু'দিন অফিস কামাই করছে পেয়ারের গাছেদের দেখভাল করতে৷ চাকরী বেশিদিন টিকলে হয়৷
- লোকটা খ্যাপাটেই রয়ে গেল৷
- আর নিপা?
- গোটা দিন ক্লাসে ছাত্র পড়ানো৷ সন্ধের পর নিজের পড়াশোনা, রিসার্চ৷
- ও'ও কিন্তু কম খ্যাপাটে নয়৷
- খ্যাপাটে না হলে ওই শীতের রাত্রে এই পাহাড়-পাড়ার এই বেঞ্চিতে বসে আর এক খ্যাপার সঙ্গে কেউ গল্প জোড়ে?
- তাই তো। আচ্ছা, নিপা এখন কী করছে বলো তো?
- মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করছে৷ কানে ইয়ারফোন। চোখ বোজা৷ আর তোমার অনি? সে কোথায়?
- শাল জড়িয়ে ছাতে দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ৷ ওল্ড মঙ্কের ঝিমঝিম। আর যথারীতি কানে ইয়ারফোন৷ চোখ বোজা৷
- আহ্। অফ কোর্স৷ তাই তো আমাদের দেখা হল৷
- বেঞ্চিটা সত্যিই মায়ার।
- ব্যাপারটা দিব্যি।
- আর খানিকটা ভূতুড়ে৷
- হেহ্ হেহ্।
**
- তা'হলে ছুটি শেষ!
- শেষ৷
- কাল থেকে ফের শহর৷ দৌড়ঝাঁপ৷ আমার সেই চাকরী৷ তোমার সেই কলেজ৷ ধুত্তোর।
- সত্যিই।
- নিপা, বিয়েটা কবে করছি আমরা?
- অনিবাবু যবে সিরিয়াসলি প্রপোজ করবেন, অমনি৷
- বাহ্৷ এখন বুঝি সিরিয়াস নই?
- কাঁচকলা।
- দু'দিন সময় দাও৷ সিরিয়াস প্রপোজাল দেখবে কাকে বলে।
- আচ্ছা, অনি! যদি আমারা দূরে সরে যাই?
- তুমি বড় পেসিমিস্ট নিপা।
- সে দুশ্চিন্তা কখনও তোমার হয় না?
- দাঁড়াও৷ জন্মজন্মান্তরের একটা সলিউশন তৈরি করে যাই৷ তোমার ইয়ারফোনে একটা গান পজ্ করা আছে৷ তাই না? যে'টা এ'খানে হেঁটে আসার সময় শুনছিলে? আমায় দেখে যে'টা থামালে?
- ডিলান।
- তোমায় দূর থেকে দেখে আমিও কান থেকে ইয়ারফোন সরালাম। আমি শ্যামল মিত্তিরে আটকে ছিলাম৷ এ'বার আমায় তোমার ফোন-ইয়ারফোন দাও, আমি ডিলানের গানটা শুনে শেষ করি৷ তুমি আমার শ্যামল সামাল দাও।
- তা'তে কী হবে?
- হাইক্লাস তুকতাক নিপা। তুমি আর আমি যদি ফস্কেই যাই, কোনওদিন যদি সে দুর্ঘটনা ঘটেই যায়..। এই দু'টো গান আমাদের হয়ে মাঝেমধ্যেই এই কার্শিয়াংয়ের বেঞ্চিতে এসে বসবে। নোটস এক্সচেঞ্জ করে সরে পড়বে।
- তুমি একটা অখাদ্য।
- কলকাতায় ফিরে একটা সুপারসিরিয়াস প্রপোজাল দিয়ে তোমায় জাস্ট ঘাবড়ে দেব৷ তখন আর অখাদ্য মনে হবে না!
- দাও দেখি তোমার শ্যামল মিত্র৷ আর এই নাও, ডিলান৷