Monday, December 27, 2021

লংঅফ থেকে লাদাখ



- কী রে, বসে পড়লি কেন..চ'! ওঠ! ক্যুইক!
- কোথায়?
- এরপর এখনও তিনটে স্পট দেখা বাকি আছে৷ সব কভার করতে করতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে যে..।
- উঠতেই হবে?
- বাহ্ রে৷ মাপা হিসেব এ'দিক ও'দিক হয়ে গেলে যে ক্যালামিটি৷
- সাইট সিয়িং যে অফিস করার থেকেও ট্যাক্সিং হয়ে যাচ্ছে রে৷ আর্লি মর্নিং, ডেডলাইন, ডিসিপ্লিন৷
- আহ, বোঝার চেষ্টা কর। ফ্যান্টাস্টিক সব জায়গা দেখতে হবে তো। আলো পড়ে গেলেই ঘোরাঘুরি মাটি৷
- প্লীজ, ডাকওয়ার্থ ল্যুইস লাগিয়ে দু'একটা জায়গা ড্রপ কর৷ ব্যাগে কাপ নুডলস আছে৷ ফ্লাস্কে গরম জল৷ টী ব্যাগসও আছে৷ আজ লাঞ্চ আর টী ক্লাসিকাল হিসেবে ক্রিকেট মাঠেই হোক না৷
- কিন্তু লাদাখ ঘুরতে এসেছি...এত সব এক্সোটিক জায়গা..বাদ দেব?
- গ্রাউন্ড কন্ডিশন দেখেছিস? এর চেয়ে বেশি এক্সোটিক ক্রিকেট সেটিং সহজে পাবি?
- উম..পাব না৷ তাই না?
- মাইনাস টেম্পারেচার, চারদিকে পাহাড়, হাইক্লাস অ্যাকশন৷ সোয়েটার জ্যাকেটের ওপর শাল জড়িয়ে, মাঙ্কিটুপি চাপিয়ে পাশে এসে বস।
- বসে যাব?
- আলবাত বসে যাবি।
- সা..সাইট সিয়িং?
- এর চেয়ে উচ্চমার্গের সাইট সিয়িং আর কী হবে বল৷ ইডেনে এমন মেজাজ পাবি?
- একটা স্পেয়ার কম্বল এনেছিলাম গাড়িতে৷ মাদুরের মত পেতে নেব? মানে যদি জাঁকিয়ে বসতেই হয়..। ফিরে গিয়ে লন্ড্রিতে পাঠালেই হবে।
- ব্রাভো৷

ল্যাদ ও লাদাখ



লেপের তলে শুয়ে, ঢাউস জানালার বাইরে; পাহাড়ে দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকাটা অতি স্বাস্থ্যকর একটা ব্যাপার৷ দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে নির্ঘাৎ আমায় বয়স আড়াই মিনিট কমেছে৷ খাদের দিকে তাকিয়ে বুক ঢিপঢিপ নেই, কয়েক কোটি ছবি তুলে মোবাইল বোঝাই করা নেই৷ শুধু তাকিয়ে থাকা৷ আর অঙ্ক স্যারের ভাষায়; "গোটা সিচুয়েশনটাকে অ্যাবজর্ব করা", বাট ফ্রম দ্য সেফটি অফ নরম বিছানা আর সাদা ওয়াড়ে মোড়া জবরদস্ত লেপ।
আর যদি বিছানার পাশের টেবিলের ওপর রাখা প্লেট থেকে আলুভাজা তুলে চিবুতে চিবুতে সে পাহাড় উপভোগ করা যায়, তবে তো সোনায় সোহাগা৷ ইয়ে, আলুভাজা হলেই ভালো, গাম্বাট ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মধ্যে ঠিক পোয়েট্রি নেই৷
আর তারপর৷ যদি কানে স্টিফেন ফ্রাইয়ের কণ্ঠে উডহাউসের ভাষায় খতরনাক জীভসের গল্প শোনা যায়, তবে সেই গোটা আমেজটাকে আরও খানিকটা লেভিটেট করিয়ে দেওয়া যায়।

লেহ্‌ ও ফুর্তি



পাহাড়ের গায়ে লেহ্৷ চোখধাঁধানো চারপাশ৷ ঘ্যাম সব পাহাড়, দিল্লীকে টেক্কা দেওয়া শীত৷ টুরিস্টরা এ'সব জায়গায় এসেই কবিতা লিখতে শুরু করবেন৷ নেহাত লিখতে না পারলে কফিহাউস-মুগ্ধ একটা হাবভাব নিজের মুখে ফুটিয়ে তুলবেন, সে'টাই অন্তত কপিবুক রেস্পন্স৷ এমন শহরে ঘুরতে এসে তাই প্রাণে ফুর্তি বাড়বেই৷ তাই লেহ্ এয়ারপোর্ট থেকেই চনমনে মনমেজাজ৷
কিন্তু কী ক্যালামিটি! এ'খানে অলটিচিউড সিকনেসের ভয় আছে৷ প্রথম দিন থেকেই বেশি লম্ফঝম্প করলে নাকি বিস্তর গোলমালের সম্ভাবনা৷ শ্বেতা জানালে প্রথম দিন নাকি কোনও সাইটসিয়িং নয়, শুধুই নির্ভেজাল বিশ্রাম৷
অতএব...ফুর্তি ডবল হল।
এরপর আর এক কেস-জন্ডিস ব্যাপার। দেখলাম ফোনে সিগন্যাল নেই৷ আমার সার্ভিস প্রোভাইডার এ'খানে এখনও সুবিধে করে উঠতে পারেনি কী মুশকিল৷ ম্যানুয়ালি খুঁজেও সিগন্যাল জুটল না৷ বুঝলাম, ভরসা বলতে স্রেফ হোটেলের ওয়াফাই৷ কোনও জরুরী কল আসবে না৷ রাতবিরেতে কেউ ফোন করে কাজকর্মের কথা ঝালিতে নিতে পারবে না৷ এমন ম্যাদামারা জীবনের কোনও মানে হয়?
অতএব..ফুর্তি চারগুণ হল৷
এয়ারপোর্টে থেকে দর্জেবাবুর গাড়িতে চেপে সোজা হোটেল৷ একটা দেওয়াল জোড়া জানলার ও'পাশের ভ্যিউ অতি চমৎকার। কিন্তু এখানে আবার এক অন্য সমস্যা৷ ঘরের মধ্যেও বাতাসে এমন কনকনে শীত যে রুমের মধ্যে পায়চারি করতে গিয়েও রাম-কাঁপুনি৷ কী মুশকিল৷ কাজেই গোটাদিন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই৷ বিস্তর শখসমেত ঘুরতে এসে শেষে কম্বলবন্দী হয়ে দিন কাটাতে হবে? স্রেফ বই পড়ে, নেটফ্লিক্স দেখে, রুমসার্ভিস মেনুকার্ড ঘেঁটে খাবারদাবার অর্ডার করে, আর চমৎকার কফিতে চুমুক দিয়ে দিনটা ফুরিয়ে যাবে? ভাবিইনি এমনটা৷
অতএব, স্পীকিং অ্যাজ আ লেহ্-ম্যান, ফুর্তি এখন ষোলোগুণ।

জগা মল্লিকের শাস্তি



- ব্রাদার৷ ও ব্রাদার। শুনছেন? জ্ঞান ফিরেছে?
- উঁ..।
- গা হাত পায়ে খুব ব্যথা নাকি? ব্রাদার? এহ্, আমার স্যাঙ্গাৎগুলো আপনাকে একটু বেশিই মারধোর করেছে। গোমুখ্যু ছেলেপিলে তো, মডারেশন ব্যাপারটা বোঝে না৷ তবে ভাববেন না৷ আমি ওদের খুব এক চোট ধমক দিয়েছি৷
- আমায় এ'ভাবে এদ্দিন আটকে রাখার মানে কী।
- এদ্দিন আবার কী৷ মাস তিনেকের বেশি তো হয়নি৷ বাড়ি ফিরে গুগুল ঘেঁটে দেখবেন শ্যামলবাবু৷ আপনার আগে বহু মানুষ মাসের পর মাস বন্দী থেকেছেন৷
- কী চান আপনারা৷ সে'টা তো এদ্দিনেও..।
- বলিনি৷ কারণ র্যানসম ট্যানসম নিয়ে আমরা মাথা ঘামাইনা৷ আমরা পেটি ক্রিমিনাল নই শ্যামলদা৷ কিছু মাইন্ড করবেন না, বাবুটাবু আমার পোষায় না৷ শ্যামলদাই ভালো৷ তাই তো?
- আপনারা টেররিস্ট?
- আমরা ভোট চাইলে আমাদের টেররিস্ট বলতেন না৷ তাই না?
- আপনি..আপনি কে?
- ওহ, আমার নাম জানা নেই বলে আলাপচারিতায় অসুবিধে হচ্ছে৷ তাই না ব্রাদার? বেশ৷ ধরুন আমার নাম জগা মল্লিক।
- কী চাই?
- আপনাকে মুক্তি দিতে চাই শ্যামলদা৷ মুক্তি৷
- এ'সব বাজে কথার কী মানে?
- বটেই তো৷ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কথা বলছি না৷ আপনার মত সিভিলাইজড মানুষের কানে সে'সব বাজেই ঠেকবে৷
- এদ্দিন তো আমার সঙ্গে কথা বলেননি৷ আজ হঠাৎ..।
- ওই যে বললাম৷ আজ আপনার মুক্তি৷ আপনাকে আমরা ছেড়ে দিতে চাই৷ এই ভজা, শ্যামলদার হাতের বাঁধনটা খুলে দে বাপ৷ তবে পা আর কোমরটা আপাতত বাঁধাই থাক।
- আপনার মতলবটা কী?
- আপনি আমলা মানুষ৷ ইন্টেলিজেন্স তালেবর। সো কলড টেররিজমের বিরুদ্ধে নিবেদিত প্রাণ৷ আপনাকে রগড়ে দেওয়াটাই উদ্দেশ্য ছিল৷ তবে আমরা ঠিক করেছি আপনাকে ছেড়ে দেব৷ আফটার অল আপনার বৌ-মেয়ে নির্দোষ৷ আপনার অপেক্ষায় তারা নাওয়াখাওয়া ভুলে বসে আছে৷ দে ডিজার্ভ পীস৷
- বলে যান৷
- একটা ছোট্ট কাজ আপনাকে করতে হবে৷ মানে কাজটা এতই এলেবেলে যে বলতেও লজ্জা লাগছে৷ কিন্তু কী করি বলুন৷ আমারও ওপরওলা আছে৷ এই নিন৷ এই রিমোটটা ধরুন।
- এ'টা...এ'টা কী..।
- আরে! সাধারণ রিমোট৷ আপনাকে শুধু ওই বোতামটা টিপতে হবে৷ কাজটা নেহাতই পাতি৷ আমরাও সেরে ফেলতেই পারি৷ কিন্তু আমরা চাইছি এই পুণ্যটা আপনার কপালেই থাক৷ নিন, বোতামটা টিপুন৷ তারপর ভজা আপনার বাকি বাঁধনগুলো খুলে, মাছের ঝোল ভাত-চাটনি-সন্দেশ খাইয়ে, আপনাকে ট্যাক্সি করে বাড়ি দিয়ে আসবে৷
- এই বোতামটা টিপলে কী হবে?
- এ'সব ছেলেমানুষি প্রশ্ন আপনাকে মানায়? দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী শ্যামল দত্তর মুখে এমন নেকু প্রশ্ন মানায়?
- কী হবে?
- হাজার খানেক লোক সমেত কোনও ট্রেনে উড়ে যাবে হয়ত৷ অথবা ধরুন জমজমাট একটা গোটা বাজার ফুশ্ করে গায়েব৷ বলা যায় না, হাওড়া ব্রিজটাই হয়ত উবে যাবে৷ পসিবিলিটিস আর এন্ডলেস৷ তবে সে'সব ভেবে আপনার কাজ নেই৷ আসুন৷ বোতামটা টিপুন৷ অ্যান্ড দেন, মুক্তি৷ প্রমিস৷
**
মেয়ের মুখ বারবার মনে পড়ে৷ বুক ফেটে যায় শ্যামল দত্তের৷ কাছেই একটা টুলের ওপর রাখা রিমোটটা মাঝেমধ্যেই নেড়েচেড়ে দেখেন৷ হাত বোলান সে রিমোটের প্লাস্টিকে৷ কাঁপা কাঁপা আঙুলে হালকা স্পর্শ করেন লাল বোতামটা৷ আর তারপর সাবধানে সেই টুলের ওপর রেখে দেন৷
এ'ভাবেই কতদিন কেটে গেল৷ প্রতি মুহূর্তে মুক্তির হাতছানি; সে হাতছানি যে কী যন্ত্রণার৷ খুকির মুখ তাকে টানে, আবার খুকির মুখটাই মনে করিয়ে দেয় আর পাঁচটা খুকির প্রাণ তাঁর হাতের মুঠোয়৷ মাসখানেক পর সমস্ত বাঁধনই খুলে দিয়েছিল জগা মল্লিকের স্যাঙাৎরা৷ বন্দী হলেও হাঁটাচলা আটকে থাকেনি৷ শুধু সেই রিমোটটার দিকে তাকিয়ে প্রতি মুহূর্তে অজস্রবার ছিন্নভিন্ন হতেন শ্যামল৷
**
- ব্রাদার।
- জ..জগা..জগা মল্লিক?
- নামটা সাজানো নয় স্যার৷ এত বছর পরেও আপনি মনে রেখেছেন, থ্যাঙ্কিউ।
- আমি যার আস্তানায় বন্দী, তার নাম ভোলাটা গোস্তাখি।
- কেমন বোধ করছেন?
- এ'বারে সত্যিই মুক্তি হে জগা।
- ডাক্তার আজ আপনাকে দেখে গেলেন। ঘুমিয়েছিলেন আপনি।
- ডাক্তারির আওতায় আর কি আছি হে? এ'বার মুক্তি৷ দিন কয়েক, বড়জোর৷ তোমার রিমোটের বোতাম আর টিপতে হল না৷ এই বাঁচোয়া।
- তেরোটা বছর এইভাবে থেকে গেলেন৷ অথচ রিমোটের বোতামটা টিপলেই আপনি বেরিয়ে যেতে পারতেন৷
- আমায় খুন করতেই পারতে৷ তবে আমায় দিয়ে অকারণ মানুষ খুন করাতে পারবে না৷ কিছুতেই না৷ তা, ক'জন মারা যেত আমি এ বোতাম টিপলে?
- একজন।
- হুম?
- আমাদের দল আমায় বিশ্বাসঘাতক ভেবেছিল। আমার শাস্তিবিধান কী ছিল জানেন? আমার বন্দী..অর্থাৎ আপনার হাতে নিজের মেয়ের খুন হতে দেখা৷ আমার মেয়ে গত তেরো বছর একটা লকেট পরে রয়েছে৷ যে'টা সঙ্গে সঙ্গে তারও উড়ে যাওয়ার কথা, আপনি এই রিমোটের বোতাম টিপলে।
- জগা..!
- নিজের খুকির থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে আমার খুকিকে আপনি বাঁচিয়ে রেখেছেন শ্যামলদা৷ এ পাপ থেকে আমার মুক্তি নেই জানি৷ শুধু পারলে বিশ্বাস করবেন..আপনার খুকিকে আমি ভেসে যেতে দিইনি৷ আড়াল থেকে হলেও তাকে আগলে রেখেছি৷ আগলে রাখবও৷ আর বিশ্বাস করুন, গত তেরো বছরের প্রতিটি মুহুর্ত, আমি আপনার চেয়েও বহুগুণ বেশি যন্ত্রণায় কাটিয়েছি৷
- আই ট্রাস্ট ইউ ব্রাদার৷

প্ল্যাটফর্ম আর টিকিট কাউণ্টার



- সাহেব, কফি চলবে নাকি?
- কফি?
- এখন তো সবে পৌনে বারোটা। যা খবর তা'তে ট্রেন অন্তত দেড় ঘণ্টা লেট। ভোর হয়ে যাবে আসতে। গাঁওদেহাতের শীতের রাত। তাই বলছিলাম..।
- টিকিট কাউন্টারের লোকটা ছাড়া আর কেউ আছে নাকি আশপাশে? চায়ের দোকান দেখলেন নাকি কোনও অজয়বাবু?
- হেহ্। কী যে বলেন সাহেব। স্টেশন আসার পথে তো দেখলেন, মাইল পাঁচেকের মধ্যে কোনও গেরস্থালী নেই।
- তা'হলে কফি..?
- এই যে।
- ওহ্। আপনার ফ্লাস্ক!
- দিল্লী থেকে এদ্দূরে ইন্সপেকশনে এসেছেন সাহেব। সরকার বাহাদুরের রিপ্রেজেনটেটিভ বলে কথা৷ যদিও আমি নেহাতই কপালজোরে আপনার লেজুড় হয়ে জুটে গেলাম। তবু, আপনার সামান্য যত্নটত্ন তো ফেলো-বাঙালি হিসেবে আমায় করতেই হবে, কী বলুন! আসুন, এই যে এক কাপ। ব্ল্যাক। তবে চিনি আলাদা করে চাইলে পাবেন।
- নাহ্। ব্ল্যাক ইজ গুড।
- দেহাতের শীতে কেমন কামড় দেখেছেন?
- মারাত্মক। যাক গে৷ কাল বিকেলের আগে পাটনা পৌঁছনো যাবে বলে তো মনে হচ্ছে না৷
- তাই তো মনে হচ্ছে৷
- বাহ্৷ কফিটা দিব্যি অজয়বাবু৷ থ্যাঙ্কিউ।
- সাহেবের ভালো লেগেছে৷ আমি তাতেই তৃপ্ত।
- আচ্ছা! টিকিট কাউন্টারের লোকটা যেন কেমন, তাই না?
- হ্যাঁ। হাবাগোবা।
- শুধু তাও নয়৷ চাউনিটাও কেমন যেন৷ অবশ্য এই শীতের রাতে প্ল্যাটফর্মে উটকো প্যাসেঞ্জার এসে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবে, এটা বোধ হয় সে আশা করেনি। কিন্তু কী অদ্ভুত, আমাদের এত হাঁকডাক শুনেক টুশব্দটি করল না! যাক গে, আপনার সিগারেট চলে নাকি?
- নাহ্ সাহেব। বছর সাতেক হল স্মোকিং ছেড়েছি। আপনি খান।
- না থাক। পরেই ধরাবো না হয়।
- আপনার সুটকেসে একটা কম্বল আছে না? পারলে জড়িয়ে এই বেঞ্চির ওপরেই লম্বা হয়ে পড়ুন৷
- এ হাড়কাঁপানো শীতে দু'চোখের পাতা এক করতে পারব বলে মনে হয় না৷ তার ওপর এই কড়া কফি। তবে চেষ্টা করতে পারি।
- বেশ৷ কফিটা শেষ করে আপনি বেঞ্চিতে কম্বল পাতার জোগাড়যন্ত্র করুন। আমি বরং কাউন্টারের লোকটাকে আর একবার জ্বালিয়ে আসি৷ ট্রেনের নতুন কোনও খবর হল কিনা জানা দরকার। অবশ্য, যদি রেস্পন্ড করে৷ অদ্ভুত ক্যারেক্টার একটা।
- এত অল্প সময়ের পরিচয়ে আপনি যে'ভাবে আমায় সাহায্য করছেন অজয়বাবু..আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ৷ মাঝরাস্তায় আচমকা গাড়িটা ব্রেকডাউন হওয়ায় যেন অথৈজলে পড়েছিলাম। ভাগ্যিস আপনার সঙ্গে দেখা হল তাই..।
- এ'সব বলে আবার লজ্জা দেওয়া কেন সাহেব৷ আমি সামান্য কেরানী মানুষ, আপনার জন্য এ'টুকু করতে পারছি, সে'টা তো আমারই গুড ফরচুন। নিন, রাজশয্যা পেতে ফেলুন। আমি ঘুরে আসি।
**
- এই যে! এই য্যো! শুনছেন?
- ক..কউন..।
- এইত্তো৷ তা বলছি পাটনা যাওয়ার ট্রেনের আর কোনও খবর এসেছে? আরও লেট করছে কী?
- কউনসা টিরেন?
- আপনি তো বাংলা জানেন সাহেব৷ খামোখা হিন্দী বলা কেন। কাউন্টারে যতই কম্বলমুড়ি দিয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকুন, আমি আপনাকে চিনি।
- আ..আমি..ত..তাই তো। আমি বাংলা জানি।
- আলবাত জানেন৷ অবশ্য, আপনি ভুলেও যান৷ তবে ক্ষতি নেই৷ আমি আছি তো মনে করিতে দেওয়ার জন্য৷
- আ..আপনি..আপনি..আপনি তো..।
- আমি অজয়৷ আপনার বহুবছরের সঙ্গী। একমাত্র বন্ধু৷
- বন্ধু? আমি..আমি আপনার বন্ধু নই৷ আমি বন্দী। আমার...আমার মনে পড়েছে..।
- কী মনে পড়েছে সাহেব?
- ইন্সপেকশন সেরে পাটনা ফিরছিলাম৷ গাড়ি বিগড়ে যায়৷ তারপরই আপনি আচমকা উদয় হন৷ ট্রেনে পাটনা যাওয়া যাবে বলে এই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসেন৷ তারপর...তারপর..।
- আপনাকে কফি খাওয়াই৷ প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে শুতে বলি৷ আর তারপর আপনি স্রেফ হারিয়ে যান৷ মাঝেমধ্যে আপনার ঘুম ভাঙে। আপনি জেগে ওঠেন এই টিকিটকাউন্টারের একছত্র অধিপতি হিসেবে৷ থ্রিলিং না?
- আমি..আমি..আমি বেরোতে চাই।
- ও মা। আমি তো নিজের ম্যাজিকে বছরের পর বছর সুখে বাস করছি৷ দিব্যি ঝাড়াহাতপা। এই প্ল্যাটফর্ম কারুর চোখেও পড়েনা, কেউ আমাদের জ্বালাতেও আসে না৷ শুধু সেই পাটনার ট্রেনের অপেক্ষা৷ যে অপেক্ষা শেষ হবে এমন আশঙ্কাও নেই। সে ট্রেনও আবার দেড়ঘণ্টা লেটের হিসেবে আটকে, ওই বছর কুড়ি ধরে৷ এমন দুর্দান্ত জায়গা থেকে আপনাকে বেরোতে দিলে চলবে কেন? যাক গে৷ জানেন, মাঝেমধ্যে; কুড়ি বছর আগের আপনার ইন্সপেক্টরসাহেব অবতারটি আপনার বর্তমান টিকিট কাউন্টারে বসা গ্রাম্য চেহারা আর চাউনি দেখে অবাক হয়ে পড়ে? আপনাকে সে বিস্তর ডাকাডাকিও করে, কিন্তু আপনি সাড়া দিতে পারেন না৷ ঠিক যেমন কুড়ি বছর আগেও সাড়া দিতে পারেননি! ম্যাজিক! ও কী, ঝিমিয়ে পড়ছেন যে ফের..ও মশাই..।
- ট্রেন..ট্রে...টিরেন দেড় ঘণ্টা লেট ছে..।
- বেশ৷ আপনি ঘুমোন৷ আমি বছর কুড়ি পুরনো আপনিকে আমার এই জাদু ফ্লাস্কের কফি খাইয়ে আসি'খন।