Monday, December 27, 2021

প্ল্যাটফর্ম আর টিকিট কাউণ্টার



- সাহেব, কফি চলবে নাকি?
- কফি?
- এখন তো সবে পৌনে বারোটা। যা খবর তা'তে ট্রেন অন্তত দেড় ঘণ্টা লেট। ভোর হয়ে যাবে আসতে। গাঁওদেহাতের শীতের রাত। তাই বলছিলাম..।
- টিকিট কাউন্টারের লোকটা ছাড়া আর কেউ আছে নাকি আশপাশে? চায়ের দোকান দেখলেন নাকি কোনও অজয়বাবু?
- হেহ্। কী যে বলেন সাহেব। স্টেশন আসার পথে তো দেখলেন, মাইল পাঁচেকের মধ্যে কোনও গেরস্থালী নেই।
- তা'হলে কফি..?
- এই যে।
- ওহ্। আপনার ফ্লাস্ক!
- দিল্লী থেকে এদ্দূরে ইন্সপেকশনে এসেছেন সাহেব। সরকার বাহাদুরের রিপ্রেজেনটেটিভ বলে কথা৷ যদিও আমি নেহাতই কপালজোরে আপনার লেজুড় হয়ে জুটে গেলাম। তবু, আপনার সামান্য যত্নটত্ন তো ফেলো-বাঙালি হিসেবে আমায় করতেই হবে, কী বলুন! আসুন, এই যে এক কাপ। ব্ল্যাক। তবে চিনি আলাদা করে চাইলে পাবেন।
- নাহ্। ব্ল্যাক ইজ গুড।
- দেহাতের শীতে কেমন কামড় দেখেছেন?
- মারাত্মক। যাক গে৷ কাল বিকেলের আগে পাটনা পৌঁছনো যাবে বলে তো মনে হচ্ছে না৷
- তাই তো মনে হচ্ছে৷
- বাহ্৷ কফিটা দিব্যি অজয়বাবু৷ থ্যাঙ্কিউ।
- সাহেবের ভালো লেগেছে৷ আমি তাতেই তৃপ্ত।
- আচ্ছা! টিকিট কাউন্টারের লোকটা যেন কেমন, তাই না?
- হ্যাঁ। হাবাগোবা।
- শুধু তাও নয়৷ চাউনিটাও কেমন যেন৷ অবশ্য এই শীতের রাতে প্ল্যাটফর্মে উটকো প্যাসেঞ্জার এসে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবে, এটা বোধ হয় সে আশা করেনি। কিন্তু কী অদ্ভুত, আমাদের এত হাঁকডাক শুনেক টুশব্দটি করল না! যাক গে, আপনার সিগারেট চলে নাকি?
- নাহ্ সাহেব। বছর সাতেক হল স্মোকিং ছেড়েছি। আপনি খান।
- না থাক। পরেই ধরাবো না হয়।
- আপনার সুটকেসে একটা কম্বল আছে না? পারলে জড়িয়ে এই বেঞ্চির ওপরেই লম্বা হয়ে পড়ুন৷
- এ হাড়কাঁপানো শীতে দু'চোখের পাতা এক করতে পারব বলে মনে হয় না৷ তার ওপর এই কড়া কফি। তবে চেষ্টা করতে পারি।
- বেশ৷ কফিটা শেষ করে আপনি বেঞ্চিতে কম্বল পাতার জোগাড়যন্ত্র করুন। আমি বরং কাউন্টারের লোকটাকে আর একবার জ্বালিয়ে আসি৷ ট্রেনের নতুন কোনও খবর হল কিনা জানা দরকার। অবশ্য, যদি রেস্পন্ড করে৷ অদ্ভুত ক্যারেক্টার একটা।
- এত অল্প সময়ের পরিচয়ে আপনি যে'ভাবে আমায় সাহায্য করছেন অজয়বাবু..আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ৷ মাঝরাস্তায় আচমকা গাড়িটা ব্রেকডাউন হওয়ায় যেন অথৈজলে পড়েছিলাম। ভাগ্যিস আপনার সঙ্গে দেখা হল তাই..।
- এ'সব বলে আবার লজ্জা দেওয়া কেন সাহেব৷ আমি সামান্য কেরানী মানুষ, আপনার জন্য এ'টুকু করতে পারছি, সে'টা তো আমারই গুড ফরচুন। নিন, রাজশয্যা পেতে ফেলুন। আমি ঘুরে আসি।
**
- এই যে! এই য্যো! শুনছেন?
- ক..কউন..।
- এইত্তো৷ তা বলছি পাটনা যাওয়ার ট্রেনের আর কোনও খবর এসেছে? আরও লেট করছে কী?
- কউনসা টিরেন?
- আপনি তো বাংলা জানেন সাহেব৷ খামোখা হিন্দী বলা কেন। কাউন্টারে যতই কম্বলমুড়ি দিয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকুন, আমি আপনাকে চিনি।
- আ..আমি..ত..তাই তো। আমি বাংলা জানি।
- আলবাত জানেন৷ অবশ্য, আপনি ভুলেও যান৷ তবে ক্ষতি নেই৷ আমি আছি তো মনে করিতে দেওয়ার জন্য৷
- আ..আপনি..আপনি..আপনি তো..।
- আমি অজয়৷ আপনার বহুবছরের সঙ্গী। একমাত্র বন্ধু৷
- বন্ধু? আমি..আমি আপনার বন্ধু নই৷ আমি বন্দী। আমার...আমার মনে পড়েছে..।
- কী মনে পড়েছে সাহেব?
- ইন্সপেকশন সেরে পাটনা ফিরছিলাম৷ গাড়ি বিগড়ে যায়৷ তারপরই আপনি আচমকা উদয় হন৷ ট্রেনে পাটনা যাওয়া যাবে বলে এই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসেন৷ তারপর...তারপর..।
- আপনাকে কফি খাওয়াই৷ প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে শুতে বলি৷ আর তারপর আপনি স্রেফ হারিয়ে যান৷ মাঝেমধ্যে আপনার ঘুম ভাঙে। আপনি জেগে ওঠেন এই টিকিটকাউন্টারের একছত্র অধিপতি হিসেবে৷ থ্রিলিং না?
- আমি..আমি..আমি বেরোতে চাই।
- ও মা। আমি তো নিজের ম্যাজিকে বছরের পর বছর সুখে বাস করছি৷ দিব্যি ঝাড়াহাতপা। এই প্ল্যাটফর্ম কারুর চোখেও পড়েনা, কেউ আমাদের জ্বালাতেও আসে না৷ শুধু সেই পাটনার ট্রেনের অপেক্ষা৷ যে অপেক্ষা শেষ হবে এমন আশঙ্কাও নেই। সে ট্রেনও আবার দেড়ঘণ্টা লেটের হিসেবে আটকে, ওই বছর কুড়ি ধরে৷ এমন দুর্দান্ত জায়গা থেকে আপনাকে বেরোতে দিলে চলবে কেন? যাক গে৷ জানেন, মাঝেমধ্যে; কুড়ি বছর আগের আপনার ইন্সপেক্টরসাহেব অবতারটি আপনার বর্তমান টিকিট কাউন্টারে বসা গ্রাম্য চেহারা আর চাউনি দেখে অবাক হয়ে পড়ে? আপনাকে সে বিস্তর ডাকাডাকিও করে, কিন্তু আপনি সাড়া দিতে পারেন না৷ ঠিক যেমন কুড়ি বছর আগেও সাড়া দিতে পারেননি! ম্যাজিক! ও কী, ঝিমিয়ে পড়ছেন যে ফের..ও মশাই..।
- ট্রেন..ট্রে...টিরেন দেড় ঘণ্টা লেট ছে..।
- বেশ৷ আপনি ঘুমোন৷ আমি বছর কুড়ি পুরনো আপনিকে আমার এই জাদু ফ্লাস্কের কফি খাইয়ে আসি'খন।

চাইনিজ ও বাঙালি



চাইনিজ রেঁধে চীনাদের তৃপ্তি দেওয়া তাও সম্ভব। কিন্তু কলকাতার মানুষদের কলকাতার বাইরে চাউমিন অফার করা মানে আইনস্টাইনকে এলসিএম জিসিএম শেখাতে বসা।
"আরে এই চাউমিন গাম্বাট মোটা যে, হোস পাইপ চেবাচ্ছি মনে হচ্ছে"।
"এত মশলা দিয়ে মাছের কালিয়া রাঁধা উচিৎ ভাই, চাউমিন নয়"।
"এ তো ম্যাটম্যাটে! আলুনি! এর চেয়ে ভাতেভাত খাওয়া ভালো"।
"এ'টা গ্রেভি চাউ? সে কী! কবে শুনব ব্রয়লারের পিসকে ট্রায়্যাঙ্গুলার শেপে কেটে বলবে ইলিশের পেটি"।
"আজ সামোসার মধ্যে চাউমিন ঢুকিয়েছে, কাল এগরোলে রসগোল্লা কুচি ছড়াবে"।
" রাখ তোর ফাইন ডাইনিংয়ের এক্সোটিক নুডলস৷ সেলিমপুরের ফুটপাত আলো করে দাঁড়ানো চাউমিন দাদা এই জিনিসকে বলে বলে হাফডজন গোল দেবে"।
এহেন কলকাতার মানুষ যখন কলকাতা থেকে হাজারখানেক মাইল দূরে বসে, আচমকা চাউমিন চেখে "বাহ্, দিব্যি তো" বলে ওঠে; তখন জানবেন সে "বাহ্" আঁকড়ে থাকা চলে। কলকাতার কসম, দিল্লী হাটের মেঘালয়ের স্টলের এই চিকেন চিলি গার্লিক চাউমিন প্রশংসার দাবী রাখে।

রমাপদর ক্রাইম



রাত পৌনে একটার সময় বিশুর চায়ের দোকানে লোকজনের আনাগোনা বাড়ে৷ হাইওয়ে ঘেঁষা জীর্ণ দোকানঘরটা গোটা দিন ঝিমিয়েই থাকে, কিন্তু রাত বাড়ালেই চনমনে ভাব৷ মূলত যাদের আড্ডা বসে, তারা সকলেই গোলমেলে৷ চোর, মাস্তান, ছিনতাইবাজ, তোলাবাজ, এমন কী খুনি মানুষজনের আনাগোনাও রয়েছে৷ কিন্তু বিশুর ব্যবসাটা ষোলোআনা সৎ৷ চায়ের কোয়ালিটি টানটান, বিস্কুট টাটকা এবং মুচমুচে, মামলেটের পেঁয়াজ লঙ্কা তরতাজা আর থালা-বাসন-প্লেট সবই ঝকঝকে তকতকে৷ খদ্দেরদের হাঁড়ির খবর নিয়ে সাধারণত মাথা ঘামান না বিশু৷ তাদের জামাই-আদরে চা-বিড়ি-বিস্কুট-মামলেট-ডিমরুটি খাইয়ে, সে'সবের দাম বুঝে নিলেই বিশুর কাজ শেষ৷ আর হ্যাঁ, নিজের চায়ের দোকানের পরিসরে মদ ও মাতলামি ব্যাপারটা বরদাস্ত করেন না তিনি৷ তবে তার চায়ের এমনই টান, যে মাস্তানরা চোলাই বাদ দিয়ে সে চা খেতে তার দোকানে ছুটে আসে৷ তাদের আবদার সামাল দেওয়া কি কম কাজ? সঙ্গত দেওয়ার জন্য দু'টো ছোকরা রয়েছে, তবুও রোজ সন্ধের পর থেকে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা ভুলে বিশুকে ছুটে বেড়াতেই হবে৷
শুধু রমাপদ এলে ব্যস্ততা বাদ দিয়ে দু'দণ্ড তার কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসেন তিনি৷ রমাপদর পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল, আলাভোলা চোখের দৃষ্টি, মুখে সর্বক্ষণ হাসি। হাফ শার্ট আর ট্রাউজার দেখে মনে হয় যেন সে বিশুর চায়ের দোকানের রাতের আড্ডায় খানিকটা বেমানান৷ ভদ্রলোক চোর, খুনি না মাস্তান; বিশু তা জানেন না৷ পুলিশের ইনফর্মার হলেও আশ্চর্যের কিছু নয়৷ বিশু শুধু জানেন যে রমাপদর কথা শুনতে তার ভালো লাগে৷ ব্যবসা হিসেব ছুটোছুটি; এ'সব কিছুর মাঝে রমাপদ যেন নদীর গা ছুঁয়ে ভেসে আসা মিঠে বাতাস৷ রমাপদকে বন্ধু হিসেবে ভাবতেই ভালো লাগে বিশুর৷ হপ্তা-পনেরোদিনে একবার আসেন রমাপদ৷ টেবিলে বসে বিশুর নাম ধরে হাঁক পাড়লেই হল৷ নিজের হাতে বাড়তি দুধে চা বানিয়ে নিয়ে আসবেন বিশু৷
তারপর শুরু হবে গল্প৷ আজ চায়ের সঙ্গে আলুর চপ ভেজে এনেছিল বিশু৷ চপে কামড় পড়তেই রমাপদর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷ খুশি হল বিশু৷
- বিশু, এমন নিখুঁত চপ ভেজেছ! মুচমুচে, অথচ তেল চুপচুপে নয়৷ ভিতরের আলু যেমন মোলায়েম তেমনই তার স্বাদের স্পার্ক৷ অথচ মশলার বাড়াবাড়ি নেই৷ তুমি যে শিল্পী ভায়া৷
- আহ, তোমার সবেতেই বাড়াবাড়ি রমা।
- আমাদের জীবনে অত হিসেব করে চললে চলবে কেন বলো৷ এই আছি, এই নেই৷ আজ ঝাড়াহাতপা, কাল চালান৷ বাড়াবাড়ি ছাড়া আমাদের চলবে কেন?
- ইয়ে, ভাই রমা৷ তুমিও কি এই বাকি ছেলেপিলেগুলোর মতই..। ইয়ে..মানে..।
- ক্রিমিনাল? হ্যাঁ।
- ও মা। ওইভাবে বলতে চাইনি।
- ক্রিমিনালের আবার এইভাবে ওইভাবে কী?
- মানে..ও'ভাবে জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হয়নি৷
- এমন আলুর চপ খাইয়ে তুমি যদি দু'এক পিস হাড়গোড় খুলে দিতে বলতে, না করতাম না৷ বিশ্বাস করো।
- হে হে৷ কী যে বলো।
- কাজেই ভাই বিশু৷ তোমার মত সৎপথে খেটে খাওয়া মানুষ আমি নই৷ তোমার বেশিরভাগ খদ্দেরের মত, আমিও ক্রিমিনাল৷
- মাস্তানি?
- ছোহ্৷ ও'সব তো ছেলেখেলা।
- ইয়ে, চুরিটুরি?
- ফুহ্৷ ও'সব এলেবেলে ব্যাপার।
- তবে..তবে কি ওই ব্যাঙ্ক ডাকাতি টাকাতি? শোনো রমা, আমি কিছু মনে করব না৷ তুমি আমার বন্ধু।
- তুমিও যে আমার বন্ধু ভাই বিশু৷
- ইয়ে মানে, খুনটুন গোছের কিছু? মানে..কপালের ফেরে পড়ে মানুষকে কবে যে কী করতে হয়..।
- না ভাই৷ খুন তো ফটাফট এস্পারওস্পার৷ তাছাড়া ইতিহাস পড়লে জানবে কত দেশের হর্তাকর্তারা হাজারে হাজারে মানুষ সাফ করে দেবতার আসন আলো করে বসেছেন৷ কাজেই মানুষ খুন ব্যাপারটা মানেই যে ক্রাইম, সে'টা ঠিক নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না৷
- তবে?
-সবার কাছে স্বীকার করতে সাহস পাইনা৷ তবে এই আলুর চপের প্রতিদান হিসেবে তোমায় আমার ক্রাইমের হদিস জানিয়ে রাখি৷
- আমি কিন্তু তোমার কথা পাঁচকান করব না।
- করলেও আমায় জেলে চালান করতে পারবে ভেবেছ? সে গুড়ে বালি। শোনো ভায়া, আমি রোজ গুম করি৷ কিডন্যাপ করি৷ কাকে? নিজেকে৷ হপ্তায় ছ'দিন, মাঝেমধ্যে সাতদিনই৷ সকাল ন'টা থেকে রাত আটটা৷ মাঝেমধ্যে মাঝরাত হয়ে যায়। যে কাজের প্রতি টান নেই, ভালোবাসা নেই; সে কাজে জানপ্রাণ লড়িয়ে দিই টিকে থাকার জন্য৷ কাদের জন্য এ'ভাবে টিকে থাকা? ভালোবাসার মানুষ৷ পরিবার৷ বন্ধুবান্ধব৷ যাদের ফোন আমি নিয়মিত কেটে দিই৷ যাদের মেসেজের উত্তর দিই না ব্যস্ততার অজুহাতে৷ যাদের কথা ভাবলেই মনখারাপ অথচ যাদের সামনে বসলে কথা ফুরিয়ে যায়৷ কারণ আমি ব্যস্ত মানুষ৷ ক্রিমিনাল নই কি? ভাই?
- আলুর চপ আর এক রাউন্ড ভাজতে বলে আসি ভাই রমা?
- তুমি যে আমার থেরাপিস্ট ভাই। তোমার প্রেসক্রাইব করা ওষুধ ফেরাই কী করে।
- আমি কী? ওই থেরা কী বললে ভাই?
- চপ নিয়ে এসো৷ বুঝিয়ে বলছি৷

কর্পোরেট লীডারশিপ

কর্পোরেট লীডারশিপের বাংলা তর্জমা হয়না৷ হওয়া উচিৎও নয়৷ এই ব্যাপারটা মূলত দু'রকমের৷ প্রথম ধরণেরটা পাওয়া যায় পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন এবং বক্তৃতায়৷ সে'খানে লীডারশিপ ব্যাপারটা ভরপুর বিভিন্ন গা-কাঁপানো শব্দে৷ অবশ্য এ ক্ষেত্রে, শব্দ মানে নিরেট 'সাউন্ড'; যেমন 'এমপ্যাথি' বা 'কমপ্যাশন', 'ইমোশনাল কোশেন্ট' ইত্যাদি৷
এরপর রয়েছে আদত কর্পোরেট লীডারশিপের ফল্গুধারা যার তুলনা স্রেফ সাঁড়াশির সঙ্গে চলতে পারে৷ এ জিনিস অবশ্য পাওয়ারপয়েন্টের বাজারে অচল। এই জবরদস্ত লীডারশিপ দিয়ে নিজের 'পয়েন্ট'গুলো, বোধ- বুদ্ধি-যুক্তি নির্বিশেষে অন্যদের ওপর 'পাওয়ার'ফুলি চাপিয়ে দেওয়ার যায়৷ এ'দিয়ে চিমটিও কাটা যায় আবার টাইটও দেওয়া যায়৷
এ প্রসঙ্গে বলি বলি, টাইট দিতে পারাটা একটি সুবৃহৎ কর্পোরেট 'কোয়ালিটি'৷ হাজার রকমের প্রেজেন্টেশন, পেপটক বা সেমিনার দিয়ে এ পরম সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব নয়৷ প্রসেস স্ট্রিমলাইন করতে চেয়ে সিস্টেম ওলটপালট করতে যাওয়া মানে বিস্তর খাটুনি। তার চেয়ে বরং দু'এক পিস এলেবেলেকে টাইট দেওয়াটা অনেক বেশি সহজ আর উপাদেয়৷
দেখুন, ভবিষ্যতের জন্য কী ভালো, দশের জন্য কোনটা উপকারি, কোন রিস্কগুলো আজ না নিলেই নয়; সে'সব নিয়ে বেশি মাথা ঘামালে রিভিউ মিটিংয়ে অস্বস্তি বাড়বে বই কমবে না৷ এর চেয়ে জমাটি হল টাইট দেওয়া-নেওয়ার গালগল্প৷ এক্সেলেন্সের দাবীর চেয়েও বেশি কাজ দেয় টাইট দেওয়ার হুমকি৷
টাইটেই উত্তরণ।

গীতা দত্ত আর গানের ল্যাজামুড়ো



গানের ল্যাজামুড়ো বোঝা হলো না৷ সে বোঝা না বোঝায় অবশ্য ভালোবাসা আটকে নেই৷ এই যেমন চাষবাস জানা নেই বলে তো আর ঝোল দিয়ে ভাত সাপটে মেখে খাওয়াটা আটকে থাকে না। সুরের ওঠানামা, রাগরাগিণীর ক্যালকুলাস, ক্লাস-বনাম-মাস; অধ্যাবসায়ের অভাবে এ'সব জরুরী কনসেপ্টগুলো সম্বন্ধে সঠিক ধারণা গড়ে তোলা গেল না৷ তবে ভালোবাসাটুকু নিপাট৷
সে ভালোবাসার টানেই ভোররাতে মেসের ঢাউস জানালার ধারে বসে থাকা ছেলেটার বুকের ভিতরে একটা বিদঘুটে ভালোলাগা আর বেঢপ কান্না মেশানো অনুভূতি তৈরি হয়, রেডিওয় সুমনের জাতিস্মর শুনে৷ সে ভালোবাসায় হেমন্তর সুরে ঘুরপাক খেতে খেতে যাবতীয় গোপন যন্ত্রণা মেরামত করে নেওয়া যায়৷
আর সেই ভালোবাসাতেই নতজানু হয়ে একটা সত্যি স্বীকার করে নেওয়াই যায়৷ গীতা দত্তর কণ্ঠ শুনে 'আহা দিব্যি' বা 'কী সাংঘাতিক ভালো' মার্কা সেলুট ঠুকবে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়৷ আর পাঁচজনের মত আমিও শুনে আসছি, সেই ছেলেবেলা থেকে৷ স্মার্ট, রোম্যান্টিক, মায়াবী কণ্ঠ৷ কিন্তু সেই ভালো লাগাটুকুই গীতা দত্ত প্রসঙ্গে শেষ কথা নয়৷ আচমকা একদিন সমস্ত চেনা ভালো লাগাগুলোকে হুশ্ করে উড়িয়ে দিয়ে এক অচেনা গীতা দত্ত মনের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে'টাই নিয়ম বোধ হয়৷
আটপৌরে ভালোলাগায় সে নতুন ভাবে আবিষ্কার করে কণ্ঠের বর্ণনা হয় না৷ নিশির ডাকের যে গা ছমছম, শিউলি সুবাস মাখানো যে স্নেহ আর শীতের রাতে আচমকা ঘুম থেকে উঠে ছলছলে চোখে সাতপুরনো চিঠির উত্তর লিখতে বসার যে আনচান; সে'সমস্ত মিলেমিশে গড়ে ওঠা এক অন্য গীতা দত্তকে আবিষ্কার করার জন্যই যেন বহুবছরের অপেক্ষা৷ হাজারবার শোনা, সুপরিচিত গানগুলো নতুন ভাবে কানে এসে ঠেকবে৷ খানিকটা ভূতের ভয়ের মত ঘাড়ে চেপে বসবে সেই গানগুলোর নেশা৷
আজীবন গীতা দত্তর গানের ভক্ত হয়ে থাকাটা নেহাতই সহজ৷ কিন্তু প্রবল পাগলামোর মুহূর্তে, দুম করে এক অন্য গীতা দত্তকে আবিষ্কার করাই বোধ হয় গীতা দত্তর ম্যাজিকের নাগাল পাওয়ার একমাত্র উপায়। গীতা দত্তর সুরের আদত রোম্যান্সকে হয়ত প্রতিটি মানুষই এমনভাবে দু'ধাপে চিনতে পারেন৷ আর একবার সে পাগলাটে ভালোবাসা চিনতে পারলে আর মুক্তি নেই৷ অথবা হয়ত সে'খানেই মুক্তি৷