Monday, October 4, 2021

হ্যারিস থেকে কেপি



জর্জ হ্যারিস সাহেব ১৮৯০ থেকে ১৮৯৫ পর্যন্ত বম্বে প্রেসিডেন্সির গভর্নর ছিলেন। তার আগে ছিলেন ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন। এ দেশে ক্রিকেটকে দাঁড় করানোর ব্যাপারে হ্যারিস সাহেবের নাকি বিস্তর অবদান৷ কিন্তু সেই অবদানের গল্পগাছাগুলো রামচন্দ্র গুহ তাঁর 'আ কর্নার অফ আ ফরেন ফিল্ড' বইতে সুচারুভাবে খণ্ডন করেছেন৷ সাহেব নেহাতই বিদেশবিভুঁইয়ে এসে নিজেকে 'এন্টারটেনড'রেখেছিলেন দামী মদে আর ক্রিকেটে, তার খানিকটা প্রসাদ বড়জোর প্রজারা লাভ করেছিল। প্রজাদের ভালোমন্দ নিয়ে হ্যারিস সাহেবের তেমন মাথাব্যথা ছিল, এ বদনামও তাকে দেওয়া চলে না। তবে রাম গুহর বইটা নিয়ে লিখতে বসিনি, সে বই সবে পড়া শুরু করেছি।
এই হ্যারিস সাহেবের আত্মজীবনী ছাপা হয় ১৯২১ সালে, সে বইয়ের একটা অধ্যায় জুড়ে রয়েছে তাঁর বম্বে অভিজ্ঞতা। স্বাভাবিক কারণেই, রাজ্যশাসনের অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারস্যাপার নিয়ে নাকি সাহেব তেমন কালি-কাগজ খরচ করেননি, বরং সেই চ্যাপ্টার জুড়ে রয়েছে ক্রিকেট। সে'খানে সাহেব বলেছেন, "গাদাগুচ্ছের নেটিভ ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছে বটে, কিন্তু ব্যাটাদের ধৈর্যের বড়ই অভাব। কাজেই গোটা দেশ মিলে চেষ্টা করলেও এরা কোনওদিন আমাদের কোনও কাউন্টি দলের সমকক্ষ হতে পারবে না" (অনুবাদটা রসালো করতে গিয়ে সামান্য রঙ জুড়তে হলো বটে, তবে সাহেবের মূল বক্তব্য এ'টাই ছিল)।
ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাইতে হল। আসল প্রসঙ্গে আসি। হ্যারিস সাহেবের আত্মজীবনী প্রকাশের তিরানব্বুই বছর পর আর এক ইংরেজ ক্রিকেট ক্যাপ্টেনের আত্মজীবনী ছেপে বেরোয়। কেভিন পিটারসেনের 'কে পিঃ দ্য অটোবায়োগ্রাফি'। তিরানব্বুই বছরের তফাতে থাকা দু'জন মানুষ বা দু'টো দেশের তুলনা টানা বাড়াবাড়ি, তবে বাড়াবাড়ি এড়িয়ে চলতে হলে এক্সেলে হিসেব কষতাম, ব্লগে বা ফেসবুকে পোস্ট লিখতাম না। কেপির বইজুড়ে জীবনটীবনের মত পাতি-বিলাসিতা নিয়ে তেমন খোলতাই কিছু নেই। গোটাটাই বিতর্কের গরমমশলায় ঠাসা। সঞ্জয় দত্তের জীবনী পড়েও এত গসিপের নাগাল পাইনি যতটা কেপির লেখা পড়ে পেয়েছি।
এমনিতেই যে লেখায় কোদালকে কোদাল বলা হয়, সে লেখা পড়ে বড় আরাম। কেপি মাঝেমধ্যে কোদালকে ডাবল ডেকার বাস বলেছেন, কাজেই এ বই এক্কেবারে যাকে বলে পপকর্ন-সম্মৃদ্ধ। যা হোক, কেপির বইয়ের যাবতীয় বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ 'ট্রিগার' হল আইপিএলের প্রতি পিটারসেনের নিখাদ ভক্তি ও ভালোবাসা। পিটারসেন বলছেন 'আইপিএল খেলেগা', আর ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেট সমাজ চেঁচিয়ে চলেছে 'অমন আদেখলাপনা ভালো নয় ভাইটি'। এ নিয়ে যে কত চুলোচুলি আর কত খামচাখামচি! তবে, আমার মনে হয় এই সমস্ত মশলা পেরিয়ে, আইপিএলের গুরুত্ব খানিকটা ঠাহর করার জন্য অন্তত এ বই পড়াই যায়। হ্যারিস আর পিটারসেনের মধ্যে যে ক'সমুদ্র জল যে গঙ্গা আর থেমস দিয়ে বয়ে গেছে, তা ভাবলেও কেমন লাগে যেন।
এ বই ঠিক সে অর্থে আইকনিক বায়োগ্রাফি হয়ে না উঠলেও আমার পড়তে বেশ লেগেছে। প্রায় প্রতি পাতায় রিভার্স স্যুইপ চালিয়ে গেছেন ভদ্রলোক। কুক, স্ট্রস, ভন; কাউকে তেমন তোয়াক্কা করেননি। আর অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার আর ম্যাট প্রায়্যোরকে প্রায় 'তুই খারাপ, তোর গুষ্টি খারাপ' লেভেলে গিয়ে তুলোধোনা করেছেন। তবে, আমার অন্তত পড়ে মনে হয়েছে কেভিন হিসেব কষে নিজের হয়ে ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করেননি। মারকুটে মেজাজে প্রাণ খুলে নিজের কথা বলেছেন, পাঠকের সে'টা মন্দ লাগার কথা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, ইংল্যান্ড ক্রিকেটের একটা বেশ গোলমেলে অধ্যায় সম্পর্কে বেশ কিছুটা খবর এ বই থেকে আদায় করা যায়। আর পাঠকের যদি কেপির প্রতিটি 'বোমা' পড়ার পাশাপাশি সেই ঘটনার ব্যাপারে সামান্য গুগল করে নেওয়ার ধৈর্য থাকে, তা'হলে 'রীডিং এক্সপিরিয়েন্স' আরও জমাটি হবেই।
আর একটা কথা। আমার ধারণা, নিজের জীবনীতে সৌরভও যদি কেপির মত এমন ফ্রন্টফুটে খেলতে পারতেন, তা'হলে সে বই অনেক বেশি সুখপাঠ্য হত।

পুজোর ছুটির দরখাস্ত



**সেপ্টেম্বর ১৮**

- স্যার৷
- বলে ফেলো ভাইটি।
- বিশ্বকর্মা পুজো ওভার৷
- বাঁচা গেছে৷ ফ্যাক্টরি শপফ্লোরে ওই হইহল্লা সহ্য করা দায়৷
- সেপ্টেম্বর শেষ হতে চলল৷
- করেক্ট। কোয়ার্টার এন্ড৷ মারমার কাটকাট সিচুয়েশন৷ প্রডাকশনে জান লড়িয়ে দিতে হবে৷
- তা তো বটেই৷ অফ কোর্স। জানটান লড়িয়েটড়িয়ে দেব'খন৷
- দ্যাটস দ্য স্পিরিট ভাইটি। জীবনের দু'টো সত্য, বুঝলে। পারলে নোটবুকে লিখে রাখো৷ নাম্বার ওয়ান, জন্মিলে মরিতে হবে৷ নোট করছ তো? গুড৷ নাম্বার ট্যু, প্রডাকশন টার্গেট মিট না করলে কেস খেতে হবে।
- পোয়েট্রি স্যর৷ পোয়েট্রি৷
- গুড। এ'বার তা'হলে এসো৷
- আসি৷ ইয়ে, তবে তার আগে৷ স্যার আসল কথাটাই বলা হয়নি৷
- বলে ফেলো।
- না মানে, সামনে পুজো।
- সামনে কোয়ার্টার এন্ড৷ তারপর ক্যালেন্ডার ইয়ার এন্ড৷ তারপর ফিনান্সিয়াল ইয়ার এন্ড৷
- স্যার, দিন চারেকের ছুটির বড় দরকার৷ সপ্তমী টু একাদশী৷ মাঝে বিজয়াটা অটোমেটিকালি ছুটি৷
- সর্বনাশ৷ ভাই, পারলে শরীর থেকে দু'চার পিস হাড়গোড় খুলে দিয়ে দিতে পারি, ডাংগুলি খেলো৷ কিন্তু ছুটি চেওনা৷
- ওকে স্যার৷ পুজোটো তা'হলে জলে গেল৷
- ব্রাভো৷ ইউ আর আ সোলজার ভাইটি৷ সেল্যুট।
**
**অক্টোবর ৩**
- এই যে ভাইটি৷ তুমি বাড়ি ফেরার টিকিট কবে কেটেছ?
- বাড়ি ফেরার টিকিট?
- ওই যে৷ সপ্তমী টু একাদশী৷
- আপনি ছুটি রিফিউজ করলেন তো৷
- এই নেদু বুদ্ধি নিয়ে তুমি ফ্যাক্টরি শপফ্লোর সামলাচ্ছো কী করে ব্রাদার?
- মানে?
- আমি বস! তুমি জুনিয়র৷ আমার কাজ তোমায় টাইট দেওয়া৷ টাইট না দিলে টীম গোল্লায় যাবে৷ ডিসিপ্লিন ঘেঁটে যাবে৷ প্রডাকশন লাটে উঠবে৷ এ তো কমনসেন্স৷ আর ছুটি চাইলেই যদি হরির লুটের মত বিলিয়ে দিই, তা'হলে তো তোমার মত জুনিয়ররা মাথায় উঠে নাচবে হে৷
- আমি ঠিক বুঝছি না স্যার৷
- তোমার কাজ প্রয়োজনে ছুটি চাওয়া৷ মাইন্ড ইউ, অপ্রোয়োজনে নয়৷ প্রয়োজনে ছুটি চাইবে৷ আমার কাজ সেই হকের ছুটি রিফিউজ করা৷ ক্লীয়ার?
- জলের মত৷
- তারপর তোমার কাজ সে রিফিউজালে আটকে না পড়ে ছুটি ম্যানেজ হবেই ধরে নিয়ে সমস্ত প্ল্যান প্রগ্রাম সেরে ফেলা। আরে! বাপ ধমকে জিওগ্রাফি পড়তে বসাচ্ছে বলে লুকিয়ে কমিক্স পড়বে না?
- কমিক্সটা পড়াই উচিৎ বোধ হয়৷ তাই না?
- হান্ড্রেড পার্সেন্ট৷ তারপর শেষ মুহূর্তে দেখবে ছুটি ঠিক ম্যানেজ হয়ে গেছে৷ ওই যে বললাম৷ কমনসেন্স৷
- হেহ্৷ মানে কী বলে যে আপনাকে স্যার...থ্যাঙ্কিউ৷ আসলে পুজোয় বাড়ি ফিরতে না পারলে মনটা কেমন..। বুঝতেই পারছেন৷ বলছি স্যার, আপনার বাড়িও তো এখানে নয়৷ আপনি পুজোয় বাড়ি ফিরবেন না?
- ভাইটু৷ হেড অফ ফ্যামিলি হওয়ার যে কী জ্বালা। এ ফ্যাক্টরিতে আমার উপরে কেউ নেই, আমার ছুটি রিজেক্টও তাই কেউ করে না৷ আর যে ছুটির আবেদন নাকচ করার কেউ নেই, সে ছুটি আদায় করা যে বড় মুশকিল ভাই৷ তোমরা ক'জন বাড়ি যাও৷ ঘুরে এসো, আই উইল হোল্ড দ্য ফোর্ট৷ কিন্তু মনে রেখো, ছুটি থেকে ফিরে এসে কিন্তু তুমি প্রডাকশনের জন্য বলি প্রদত্ত। মনে থাকবে?

বিশের সাহস



- বিশে, কী খাবি বল৷ ট্রীট কিন্তু আমার৷
- হেহ্৷ থ্যাঙ্কিউ।
- কই। মেনুটা দ্যাখ৷
- সাত পাতা৷ কদ্দিন যে ধৈর্য ধরে একটানা সাত পাতা বই পড়িনি৷
- এদ্দিন পর তোর সঙ্গে দেখা হয়ে যে কী ভালো লাগছে।
- আমারও৷
- শেষ বোধ হয় সেই থার্ড ইয়ারে দেখা হয়েছিল, তাই না?
- ট্যু থাউজ্যান্ড অ্যান্ড ফাইভ৷
- এক যুগ প্রায়৷
- তা বটে।
- কই, কী খাবি বল৷
- এত বড় মেনু..। আচ্ছা, এদের চিলি চিকেন নেই? আর হাক্কা চাউ?
- খুঁজলে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে৷ কিন্তু এই হাইক্লাস থাই রেস্টুরেন্টে এসে সেই কলেজ পাড়ার দিলবাহার রেস্টুরেন্ট মার্কা আইটেম অর্ডার করবি?
- সন্তু, তোর মনে আছে দিলবাহারের কথা?
- কলেজের প্রফেসরদের নামধাম তেমন মনে নেই বটে৷ তবে দিলবাহারকে ভোলার দুঃসাহস আমার নেই৷
- হেহ্৷
- তুই কি সত্যিই চিলি চিকেন আর চাউমিন অর্ডার করবি নাকি বিশে?
- অন্য কিছু অর্ডার করার ঠিক সাহস নেই৷ আসলে কী জানিস, এই সুখের চেয়ে সোয়াস্তি ভালো পলিসি আঁকড়েই জীবন কেটে গেল। ভয় হয়, যদি নতুন কিছু খেতে গিয়ে বিটকেল লাগে?
- ভয়?
- ওই৷ যে ভয়ে কলকাতা ছেড়ে যাওয়া হল না৷ পোস্ট অফিসের এই চাকরীটা ছাড়া হলো না৷
- এত ভয় না থাকলে সময় মত রিমির চিঠির উত্তরটাও দিতেই পারতিস৷
- হয়ত পারতাম৷
- আফশোস হয় না?
- আফশোস? আমি একটু নার্ভাস বটে, কিন্তু তৃপ্তির অভাব নেই জীবনে৷ বুঝলি৷ কড়া ঝাল চিলি চিকেন আর মিক্সড হাক্কা গিলে অতৃপ্ত থাকা কি আদৌ সম্ভব?
- বেশ৷ আজ তা'হলে আমারও ওই চিলিচিকেন আর মিক্সড হাক্কা৷
- ঠকবি না৷ গ্যারেন্টি৷
- তুই অদ্ভুত৷
-তেমন কিছু করা হলো না হয়ত। কিন্তু তেমন কিছু করার ডেফিনিশনটা কী সন্তু? 'দিব্যি আছি ভাই' - এ কথাটা মন থেকে বলতে পারাটা একটা সুপারপাওয়ার৷ জানিস?
- আচ্ছা, এই যে খানিকক্ষণ আগে বললি তুই নিয়মিত আরসালানে যাস৷ সে'খানে চিকেন স্ট্যুটা কিন্তু টেরিফিক৷ সে'টা চেখে দেখার রিস্ক নিসনি নিশ্চয়ই কোনওদিন৷
- স্পেশ্যাল মাটন বিরিয়ানি। স্টার্টার৷ স্পেশ্যাল মাটন বিরিয়ানক। মেনকোর্স৷ স্পেশ্যাল মাটন বিরিয়ানি৷ ডেজার্ট। অলওয়েজ৷ উইদাইট ফেল৷
- হেহ্৷ কিন্তু সেই স্ট্যুয়ের স্বাদ কোনওদিন জানতেই পারলি না তো।
- পারলাম না৷ কিন্তু দিব্যি আছি যে ভাই৷
- রিমি তোর চিঠির অপেক্ষা করেছিল কিন্তু৷
- দিব্যি ছিলাম যে রে ভাই৷
- তাতে মনে পড়ল৷ আসল কথাই তো জানা হয়নি৷ তুই বিয়েথা করেছিস নিশ্চয়ই?
- তুই কি সত্যিই চিলিচিকেন চাউমিন অর্ডার করতে দিবি না?
**
- কেমন লাগল দেখা করে?
- বিশে ব্যাটা ওই আগের মতই রয়ে গেছে।
- তাই?
- তা, তোমার ব্যথা আছে এখনও?
- তুমি একটা যাতা৷ এত বছর পর এইসব লেগপুল করার কোনও মানে হয়৷ একটা প্রেমের চিঠি না হয় লিখেইছিলাম ওকে। সে'টা জাস্ট ঝোঁকের মাথায়৷ প্রেমবিয়ে শেষ পর্যন্ত তো তোমার সঙ্গেই সারলাম৷
- নাহ্৷ তোমার ভাগ্যে সে স্বর্গসুখ ছিলই না৷ বিশের জীবনের চিলিচিকেন-চাউমিন হয়ে ওঠা চাট্টিখানি কথা নয়৷
**
সন্তুর সঙ্গে ডিনার সেরে বাড়ি ফেরার মুখে একটা ছোট বারে ঢুকে পড়েছিলেন বিশেকুমার। ওল্ড মঙ্ক ছাড়া কোনও মদ অর্ডার করতে কোনও দিনই সাহস হয়নি৷ তিন পেগ খেয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। খানিকক্ষণ পর দেরাজ থেকে পুরনো ফাইল বের করে বছর সতেরো আগের লেখা খানসাতেক চিঠি বের করে এনেছিলেন ভদ্রলোক৷ প্রতিটাই রিমিকে লেখা৷ সাতখানা চিঠিতে অন্তত চুয়াত্তরখানা 'ভালোবাসি'৷ তবে একটা চিঠিও রিমিকে দেওয়া হয়নি৷ কারণ সন্তুর বন্ধুত্বের কলকাতা-চাউমিন-পোস্টঅফিস স্বস্তি খোয়ানোর সাহস বিশেকুমারের সে'দিনও ছিল না, আজও নেই।

রোব্বারের বই

প্রশ্নঃ
রোব্বারে কী ধরণের বই পড়ে সময় কাটাতে আপনার ভালো লাগে?

উত্তরঃ
রোব্বারে? দেখুন, সকালের দিকে, মাংস যখন ম্যারিনেট হচ্ছে, তখন সঞ্জীবই আইডিয়াল৷ একদিকে মাংস রসালো হয়ে উঠছে, পাশাপাশি ধৈর্য, স্নেহ আর ভালোবাসার মশলায় নিজের মনকে নরম করে নেওয়া যাচ্ছে৷ গোটা হপ্তার হাড়জ্বালানে দৌড়ঝাঁপ ধুয়েমুছে সাফ করার এ'টাই আদর্শ সময়৷
এরপর বেলা গড়ালে, রান্নার শেষ ধাপে যখন মাংস সেদ্ধ হচ্ছে, তখন অবশ্যই কয়েক পাতা শিব্রাম৷ পড়তে পড়তে নির্লজ্জ খ্যাকখ্যাক হাসি আর শিব্রামের জিনিয়াসকে ক্রমাগত বাহবা জানাতে থাকা প্রেশার কুকারের সিটি।
দুপুরবেলা, মাংস-ভাত চেটেপুটে সাফ করার পর অবশ্য বিভূতিভূষণ আর সাদার-ওপর-ছোট ছোট -নীল ফুল-প্রিন্ট ওয়াড় পরানো পাশবালিশের কম্বিনেশন ছাড়া দুনিয়া অন্ধকার৷

গুলবাজ ও সত্য



- বাজে কথা বলার আর জায়গা পাননি?
- ধর্মাবতার, বিশ্বাস করুন৷ আমি গুলবাজ নই।
- আপনি ২০২১ সাল থেকে এসেছেন?
- আজ্ঞে৷
- আপনি ২০২১ সাল থেকে টাইমমেশিনে চড়ে এই ২০৯৪তে এসেছেন? সরকারি ইনাম পাওয়ার লোভে এত বড় একটা গাম্বাট মিথ্যে বলে যাচ্ছেন?
- আর কতবার বলব ধর্মাবতার৷ এ কথা সর্বৈব সত্য৷
- আপনি মহা ফেরেব্বাজ মানুষ মশাই৷ খামোখা আদালতের সময় নষ্ট করছেন৷ আপনাকে জেলে বন্দী করে টানা দেড় মাস দিনে আড়াই ঘণ্টা করে কাতুকুতু দেওয়া হবে৷
- দোহাই ধর্মাবতার, আমার টাইমমেশিন আবিষ্কার মিথ্যে নয়।
- তা'হলে সেই মেশিনে করে আপনি ফেরত যাচ্ছেন না কেন?
- ও মা৷ একবার ট্র্যাভেল করেই জ্বালানির কেরোসিন শেষ তো৷ আর আপনাদের এ যুগে দেখছি কেরোসিন আর নেই৷
- আপনার ওই টিনের ডিবে কেরোসিনে চলে?
- সঙ্গে একটু রসুনবাটা আর অল্প কর্পূর মিশিয়ে নিতে হয়৷ ফর বেটার মাইলেজ৷
- আপনি গুলবাজিতে নোবেল পাবেন।
- ২০৯৪ সালে গুলের নোবেলও চালু হয়ে গেছে কি? বাহ্৷ শুনে গর্ব হচ্ছে স্যার৷ তবে আমি যাহা বলিতেছি, সত্য বলিতেছি৷ বলুন গীতা, কোরান, বাইবেল..কোনটা ছুঁয়ে বলতে হবে।
- ন্যাকামো করবেন না৷ হাইয়েস্ট রিলিজিয়নের বই ছুঁয়ে বলুন দেখি যে আপনি ২০২১ সাল থেকে টাইম মেশিন বানিয়ে এসেছেন৷ আপনার সামনে ওই যে বই রাখা আছে৷ ওটা ছুঁয়ে বলুন৷
- ইয়ে, আসলে আমি যেহেতু ২০২১ সালের মানুষ৷ আমার জন্য ওই বাইবেল-কোরান-গীতাই ভালো৷ সব কটাই আনিয়ে দিননা৷ সে'গুলো ছুঁয়ে আমি হলফ করে বলে দিচ্ছি আমার এই টাইম মেশিনের কথা৷
- বেশ তো। আমাদের এই সর্বোচ্চ ধর্ম যদি আপনার কাছে গুরুত্বহীনই হয়, তবে এই ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে আপনার যা বলার বলে দিন৷
- ইয়ে মানে...।
- আদালতের হাতে অত খাজা সময় নেই৷ ক্যুইক ক্যুইক৷ ওই বই ছুঁয়ে বলে ফেলুন যে আপনি টাইমমেশিনে চড়ে এ যুগে এসেছেন৷ নয়ত কয়েকমাস কাতুকাতুসহ কারাবাস৷
- আসলে..হয়েছে কী...।
- এখুনি ও বই ছুঁয়ে বলুন নয়ত কিন্তু গোটা বছর কাতুকুতু ডাইজেস্ট করতে হবে৷ ও'সব ওপরচালাকি আমরা বরদাস্ত করব না৷
- মাফ করুন ধর্মাবতার৷ পায়ে পড়ছি৷ আমায় ক্ষমা করুন৷ নেহাতই ইনামের লোভে এত বড় গুল ঝাড়তে গেছিলাম৷ টাইমমেশিন কেন, আমি ভালো করে দেওয়ালে পেরেকও ঠুকতে পারিনা৷ কাজেই আবোলতাবোল ছুঁয়ে এত বড় মিথ্যে আমি বলতে পারব না ধর্মাবতার। আমি গুলবাজ হতে পারি, কিন্তু ধর্মকে কাঁচকলা দেখানোর দুঃসাহস আমার নেই।