Saturday, July 17, 2021

ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স



- এই যে, সামন্ত। আগামীকাল অফিসে এসো কিন্তু। 

- কাল?

- কাল।

- কিন্তু কাল তো শনিবার।

- তা'তে কী?

- না মানে স্যার...উইকেন্ডে..।

- আহ, যুদ্ধে যেতে তো বলছি না। অফিসে এসো। 

- এমার্জেন্সি কিছু কি?

- একটা ট্রেনিং আছে। ডেভেলপমেন্টাল। 

- কীসের ওপর?

- ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স। হাইক্লাস একজন লাইফ কোচ আসছেন। টেড স্পীকার। গত মাসে মুম্বই টীমকে ঘ্যাম লেভেলে ইন্সপ্যায়ার করে গেছেন। কাজেই কাল তোমায় আসতেই হবে। টীমের সবাই আসছে। আর হ্যাঁ, কাল একটু সকাল সকাল এসো। 

- শনিবার। তাড়াতাড়ি অফিস আসব ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্সের ট্রেনিং করতে?

- উইকডেজ শুড বি অল আবাউট ওয়ার্ক ওয়ার্ক অ্যান্ড ওয়ার্ক। কালকের ব্যাপারটা তো একটা ফান এক্সারসাইজ। 

- ফান?

- রীতিমতো।  আই প্রমিস। 

- বেশ। তা'হলে আজ বেরোই এখন স্যার। 

- ও মা, এখনও তো সাড়ে সাতটাও বাজেনি। এই ভেতো বাঙালিদের এই একটা সমস্যা। অফিসে আসা মাত্রই বাড়ি যাব বাড়ি যাব বায়না। হেডঅফিস একটা জুম মিটিং রেখেছে সাড়ে আটটায়। সে'খানে তোমার থাকাটা মাস্ট। 

- ওহ। 

- দ্যাখ সামন্ত। নিজের মধ্যে একটু কিলার ইন্সটিঙ্কট তৈরি করো।  সব সময় অমন ন্যাতা হয়ে থাকলে কর্পোরেটে চলে না। এনার্জি চাই। ডাইনামিজম চাই। চাই ফায়্যার ইন দ্য বেলি। 

- একটা রিকুয়েস্ট ছিল স্যার। 

- এনিথিং। শুধু ছুটি চেয়ো না ভাই। 

- না, তা নয়। আসলে সামনের রোব্বারটা একটু ফাঁকা পড়ে যাচ্ছে। খুব ভয় হচ্ছে বাড়িতে বসে একটু রিল্যাক্স না করে ফেলি। 

- হোয়াট?

- বলা তো যায় না স্যার, দিনকাল যা পড়েছে। রোব্বারের অলস মন, একটা সর্বনাশ না ঘটিয়ে ফেলি। দুম করে হয়ত আপনার সামনে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার বদলে বৌয়ের সঙ্গে কথা বলে ফেলব।

- সামন্ত! হোয়াট ইজ দিস।

- মাইরি স্যার। খুবই নার্ভাস হয়ে আছি৷ ছুটির দিন বাড়িতে থাকলে যদি কোনও ক্যালামিটি ঘটে যায়? যদি অফিস ফাইলের বদলে টিনটিন পড়ে ফেলি? যদি মিটিং ভুলে হপ্তায় একদিন আড্ডা দিতে বসে যাই? যদি এক্সেলশিট সরিয়ে রেখে খোকার সঙ্গে আধঘণ্টা ক্যারম খেলে ফেলি? না না। রিস্ক নিয়ে লাভ নেই স্যার। আমার রোব্বারে বাড়িতে ফেলে রাখবেন না প্লীজ। অফিসে ডেকে নিন। প্লীজ। প্লীজ।

- ওয়ার্থলেস! তোমাদের সঙ্গে কোনও রকমের এনরিচিং ইনসাইট শেয়ার করতে যাওয়াটাই ভুল। ব্লাডি ক্লারিকাল মাইন্ডসেট।

Tuesday, July 13, 2021

ক্রিকেটের তুকতাক




নিজের মুখে নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো প্রসঙ্গে ফলাও করে কিছু বলতে চাই না, তাই বাধ্য হয়ে লিখতে হচ্ছে৷ তবে তার আগে একটা মিথকে ধ্বংস করা দরকার৷ অনেক প্রাচীনপন্থী কূপমণ্ডূক ক্রিকেট ভক্তদের ধারণা যে ক্রিকেটের যাবতীয় হিসেবনিকেশ তৈরি হয় বাইশ গজ বা তার আশেপাশে; ব্যাট, বল অথবা জিঙ্ক অক্সাইড সহযোগে৷ ব্যাপারটা যে আদৌ সে'রকম কিছু নয়৷ ক্রিকেটে তন্ত্রমন্ত্র এবং তুকতাকের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে৷ না না, আমি খেলোয়াড়দের মাদুলি বিশ্বাসকে পাত্তা দিচ্ছি না, ব্যাট আর বল ছাড়া সত্যিই তাদের কোনও অস্তিত্ব নেই৷ কিন্তু সমর্থকদের তুকতাক যে যে কোনও ম্যাচের ভোল পালটে দিতে পারে; এ অমোঘ সত্য যে অস্বীকার করে তার মাথায় পড়ুক বাজ, বিরিয়ানিতে পড়ুক নকুলদানা, ইত্যাদি৷ কেউ এক চেয়ারে সাড়ে চার'ঘণ্টা ঠায় বসে থেকে প্রিয় দলের ফলো-অন আটকান, কেউ একটানা পেনিসিল চিবিয়ে উইকেট ফেলে দেন, কেউ টিভির সামনে থেকে উঠে গিয়ে নিজেকে শহিদ করেন রিকোয়্যারড রান রেট সামাল দিতে, কেউ আবার নিজের প্রিয় ব্যাটার অপয়া সংখ্যক রানে পৌঁছলে "সরি লেনিনদা" বলে গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ করে থাকেন ফাঁড়া কাটানোর জন্য৷ আর আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ'সব তুকতাকেই আদত এস্পারওস্পার ঘটে; মাঠের খেলোয়াড়রা স্রেফ দাবার ঘুঁটি৷

এক একজনের তুকতাকের অস্ত্র এক এক রকম৷ অর্জুন গাণ্ডিব দিয়ে মাঠ কাঁপালে ভীমের পছন্দ গদা৷ আর ক্রিকেট সমর্থক হিসেবে আমি চিরকাল ব্যবহার করে এসেছি Pessimism বা নৈরাশ্যবাদ। ভারী কাজের জিনিস, যেমন ধারালো তেমনি, তেমনি কাব্যিক৷ ফিলোসোফিটা বেশ সোজাসাপটা,  ভবিতব্যের কাছে এমন নাকিকান্না জুড়তে হবে যে ভবিতব্য নিজেই ঘাবড়ে গিয়ে ভুলচুক করে ফেলবে৷ ক্রিকেটিয় নৈরাশ্যবাদ নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট দলকে আমি বহু যুদ্ধে উতরে দিয়েছি৷ তার জন্য কোনও রকম অমরত্ব বা খ্যাতির প্রত্যাশা বা দাবিদাওয়া আমার নেই৷ একজন ক্রিকেট সৈনিক হিসেবে আমার কাজ শুধু লড়ে যাওয়া, মাঠের এগারোজনকে জেতাতে পারলেই আমি তৃপ্ত৷ আপনার প্রশ্ন করতেই পারেন, পেসিমিজমের যদি অতই তেজ হবে, তা'হলে ভারতীয় ক্রিকেট সব ম্যাচে জিততে পারে না কেন? উত্তরটা একটু ঘুরিয়ে দিতে হবে, শচীন তেন্ডুলকার সব ম্যাচে সেঞ্চুরি করতে পারেনি বলে তো তাঁর স্কিলসেটকে উড়িয়ে দেওয়া যায়না৷ 

নৈরাশ্যবাদ ব্যাপারটা ঠিক কেমন ভাবে ক্রিকেট তুকতাকে সাহায্য করে? বুঝিয়ে বলতে হলে ২০০২ সালের ন্যাটওয়েস্ট ফাইনালের অভিজ্ঞতাটা ঝালিতে নিতে হয়৷ ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই প্রবল নাকিকান্নায় দুনিয়া ভাসিয়ে দেওয়ার উপক্রম করেছিলাম। "ইন্ডিয়া ফাইনালে বরাবর হারে, ইংল্যান্ডের হোম-অ্যাডভান্টেজ, আমার বাঁ হাতের কনুইতে একটা সুড়সুড়ে অস্বস্তি, খেলা শুরুর আগেই আমি পান্তুয়া খেয়ে ফেলেছি আর আমি পান্তুয়া খেলেই ইন্ডিয়া হোঁচট খেয়ে পড়ে", ইত্যাদি ইত্যাদি৷ প্রথমে ব্যাট করে ইংল্যান্ড যখন কয়েক হাজার রান (ওই তেমনই কিছু একটা মনে হয়েছিল) তখন অবশ্য নাকিকান্নার নেকুপনা ঝেড়ে ফেলে বুক বাজিয়ে হাহাকার করতে পেরেছিলাম; "এরা খেলতে যায় কেন? ইংল্যান্ডে না গিয়ে কিনিয়ায় গেলেই পারত! ভাগ্যিস ওয়ানডেতে ইনিংস ডিফীটের গল্প নেই৷ আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি ভারত দু'শোর কমে বান্ডিল হবে" ইত্যাদি ইত্যাদি। 

ওই হাহাকারের জেরে যে'টা হল সে'টা হল ভারত ব্যাট করতে নেমে দিব্যি শুরু করল৷ সৌরভ দিব্যি স্টেপআউট করছে, আর কনেক্ট করছে৷ ব্যাস, আমি ধুন্ধুমার চালু করে দিলাম; "এ বাবা, ক্যাপ্টেন হিসেবে কোনও সেন্স নেই? এমন আনতাবড়ি চালাচ্ছে? আর এমন ল্যালল্যাল করে চালাচ্ছে কেন? আমি চ্যালেঞ্জ করব বলতে পারি এখুনি আউট হবে"।    শেওয়াগও ফুরফুরে মেজাজে খেলতে শুরু করেছে৷ দশটি ওভার পার, ছয়ের ওপর রানরেট৷ আমি ডোজ বাড়িয়ে দিলাম; "শেওয়াগের কোনও গেমসেন্স আছে নাকি? ধুর ধুর৷ এই ডোবালো, আমি লিখে দিচ্ছি"৷ চোদ্দ ওভার নাগাদ একশো উঠে এলো৷ ব্যাট সৌরভ-শেওয়াগের হাতে কিন্তু চালিয়ে খেলতে হচ্ছে আমাকেই৷ সাধ্যমত চেষ্টাও করছিলাম, গলা চড়িয়ে বললাম "গেমপ্ল্যানের অভাব। স্পষ্ট দেখতে পারছি"। কিন্তু এত করেও গোলমালটা রোখা গেল না৷ 

সৌরভ আউট হল দলের ১০৬ রানে। ১১৪য় শেওয়াগ। ১২৬য়ে দীনেশ মোঙ্গিয়া৷ আমি হাঁ, মাথা ফাঁকা৷ দ্রাবিড় আর শচীনকে খেলাতে হলে পেসিমিজমের বন্যা বইয়ে দিতে হবে, কিন্তু কোমর বেঁধে 'সব জলে গেল, ডকে উঠল, অক্কা পেল' বলে কাঁদুনি গাওয়ার আগেই দু'টো খতরনাক থাপ্পড়; ১৩২য়ে দ্রাবিড় গায়েব আর ১৪৬য়ে শচীন হাওয়া৷ কে এক পাড়ার পুজোর চাঁদা তোলা ছোকরা রনি ইরানি আর  জাইলস মিলে সব গুলিয়ে দিল। 

বুক ভেঙে চুরমার৷ সামনে টিভি চলছে, বাবা হতাশায় পায়চারি করছে, মা বলে চলেছে " নতুন ছেলে দুটো কী সুন্দর খেলছে, দ্যাখ"৷ আমার সব কিছুতেই বিরক্ত লাগছে৷ ঘরের পর্দার খয়েরী রঙ দেখে বিরক্তি, বাবার পায়চারীতে বিরক্তি, মায়ের একের পর এক প্রশ্নে বিরক্তি (যুবরাজ বোধ হয় আমাদের বাপতুর বয়সী হবে, তাই না? কাইফকে দেখেই মনে হয় খুব শান্তশিষ্ট,  তাই না? লর্ডসেই সৌরভ প্রথম সেঞ্চুরিটা করেছিল না)। পরে বুঝেছিলাম, আমার যেমন নৈরাশ্যবাদ, মায়ের ক্রিকেট তুকতাকের অস্ত্র হল লাখ লাখ কোটি কোটি প্রশ্ন৷ আর বাবার ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট হয় পায়চারিতে। তা মায়ের প্রশ্নের স্টেনগান আর বাবার সতেরোশো মাইল হাঁটাহাঁটির ফলে ভারত ২০০ পেরিয়ে গেল৷ যুবরাজ আর কাইফ সেট। 

আমি নড়েচড়ে বসলাম৷ বুকে সামান্য আশার আগুন জেগে উঠেছিল, তড়িঘড়ি সে আগুনের ওপর গ্যালন গ্যালন পেসিমিজমের জল না ঢাললেই নয়৷ 
"আরে ধুর ধুর, শচীন দ্রাবিড় গেল তল, যুবরাজ কাইফ বলে কত জল"।
" বড়জোর আড়াইশো করবে৷ গোহারান হারটা রুখে দেবে। লজ্জাটা একটু কম হবে৷ এ'টাই যা"।
"যুবরাজের ডিফেন্সে প্রচুর ফাঁকফোকর৷ আর কাইফের হাতে বড় শট আছে বলে মনে হচ্ছে না"। 

একসময় যুবরাজের হাফসেঞ্চুরি হল, ভারতের জিততে একশো'র কম রান দরকার৷ " জলে জলে, সব জলে"; আমার ফেভারিট ডায়লগ। এক কথায় সব উড়িয়ে দেওয়া যায়৷ 

আড়াইশো পেরোল। কাইফের পঞ্চাশও হল৷ "ধুর ধুর, এই গেল বলে৷ এ'সব সিচুয়শনে নাসের হুসেন ম্যাচের রাশ আলগা হতে দেবে ভেবেছ? এই ফাইনাল হুসেনের পকেটে রাখা মানিব্যাগে- পুজোর ফুল, ট্রেনের মান্থলি আর অফিসের আইকার্ডের পাশেই রাখা আছে৷ 

যা হওয়ার তাই হল৷ মাখনে ছুরি চালাতে চালাতে আচমকা সে ছুরি বুকে উঠে এলো; যুবরাজ আউট, কলিংউডের খুচরো বোলিংয়ে৷ 

"কফিনে শেষ পেরেক", ডিক্লেয়ার করলাম। বাবা ফের সোফা ছেড়ে উঠল৷ মা প্রশ্নে ফিরে গেল, " যুবরাজ সত্যিই আউট হয়ে গেল রে? যুবরাজ কি কাঁদছে"? 

এরপর গোটা ব্যাপারটাই একটা ঝড়ের মত ঘটে গেল৷ উত্তেজনা যত বাড়ছে, আমি তত পেসিমিজমের গুঁতোগুঁতি চালিয়ে যাচ্ছি৷ 

কাইফের ওভারবাউন্ডারি৷ ঘ্যাম কভার ড্রাইভ৷ গফ ঘেঁটে ঘ৷ জিততে হলে পঞ্চাশেরও কম দরকার। আমি বলে চলেছি, "এর চেয়ে কোনও মেগা সিরিয়াল দেখলে ভালো হত"। 

কাইফ চালিয়ে খেলছে৷ লোয়ার অর্ডারে হরভজনও টুকটাক চমকে দিচ্ছে৷ আমি দূর্গ আগলে রেখেছে, "আচ্ছা ডোবালে দেখছি এরা"৷ 

স্যাটাস্যাট হরভজন আর কুম্বলে আউট৷ হাতে হারাধনের দু'উইকেট৷ তবে রানও বেশি নয়, খান বারো৷ কাইফ ততক্ষণে বলের বদলে চালকুমড়ো দেখছে৷ কিন্তু আসল দায়িত্ব তখন আমার কাঁধে; পেসিমিজমের স্লগওভার। 
"তিনশো করেছে এই অনেক"। "জাহির আবার ব্যাট ধরতে শিখলো কবে"। "আর দেখে হবেটা কী৷ চ্যানেল ঘোরাও বাবা, নিউজ দেখা যাক"। 

ওই যে বললাম। হাইক্লাস নাকিকান্নায় ভবিতব্যকে দিব্যি টলানো সম্ভব৷ ওভারথ্রোয়ে শেষ রান তুলে নেওয়ার আড়াই সেকেন্ড আগে পর্যন্ত বলে গেলাম, " ইম্পসিবল। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি হারছি৷ বন্ড পেপারে লিখে দিতে পারি দরকার হলে"৷

ভালো পার্ফর্মেন্সের মূলে রয়েছে নিরবিচ্ছিন্ন মনসসংযোগ ; ক্রিকেট তুকতাকও একটা পার্ফর্ম্যান্স। সৌরভ যখন জামা খুলছে তখনও আমি বিড়বিড় করে বলে চলেছি, "স্কোরবোর্ডটা ঠিকঠাক চলছে কিনা কে জানে৷ বলা তো যায় না, যদি কিছু ভুলচুক হয়ে থাকে"৷ আর মায়ের প্রশ্ন সিরজিও তখনও থামেনি, "এহ হে, খালি গায়ে ও'ভাবে হাওয়া লাগাচ্ছে?  বুকে ঠাণ্ডা বসে যাবে না তো"?

Monday, July 12, 2021

সাফ টেবিল



অফিসে একটা জমজমাট প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। "সাফ টেবিল প্রতিযোগিতা"। সবচেয়ে জমাটি ব্যাপার হল যে এ খেলায় আলাদা করে খেলতে নামার সুযোগ নেই, বিচারকরাই এক্ষেত্রে মাঠে নেমে দাপাদাপি করে থাকেন। বিনা নোটিশে তাঁরা ঘুরে ঘুরে সবার অফিস ডেস্ক জরীপ করে নম্বর দেবেন। কার টেবিলে জঞ্জাল কম, কে সমস্ত কাগজপত্র মনিকা-গেলার-গোছের হাড়-জ্বালানো জ্যামিতিতে সাজিয়ে রেখেছে, কে আবার বাড়তি সৌন্দর্য যোগ করেছে অনাবিল টবে বাহারে পাতার ছোট্ট গাছ সাজিয়ে রেখে। আচমকা যখন বিচারকরা হেলতেদুলতে আমার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন তখন আমার টেবিলে তখন আস্ত চিৎপুর বাজার উপুড় হয়ে রয়েছে। অন্তত খান পাঁচেক ফাইল ছড়িয়েছিটিয়ে, সবক’টাই খোলা। এ ছাড়া একটা পেন স্ট্যান্ড যে’টার মধ্যে সাতটা কলমের ঢাকনি আর একটাও পেন নেই। সতেরো রকমের তার টেবিলের নীচে ওপরে জড়াজড়ি করে পড়ে। গাছপালা নেই তবে দু’তিনটে প্রিন্টআউটের মরা বাঁশ শুয়ে পড়ে আছে অযত্নে। এ ছাড়া একটা ঢাউস টিফিনবাক্স, দু’টো জলের বোতল, একটা ব্যাকপ্যাক, দু’টো স্টেপলার আর দু’টো পিনের বাক্স (কিন্ত স্টেপলারে পিন ভরা নেই, প্রতিবার স্টেপল করার দরকার হলেই ভাবছি এইবারের মত কমন প্রিন্টারের কাছে বেঁধে রাখা স্টেপলার ব্যবহার করে কাজ চালিয়ে নিই, তারপর না হয় স্টেপলারে পিন ভরে নেওয়া যাবে'খন), একটা জেমস ক্লিপের ডিবে (যে’টা বোধ  হয় ১৯৯৭ সাল থেকে এই টেবিলে পড়ে রয়েছে কিন্তু কেউই তাদের ব্যবহার করে উঠতে পারেনি), দু’টো টেবিল ক্যালেন্ডার (একটা গত বছরের, সরানো হয়নি। অন্যটা এ বছরের কিন্তু মার্চের পর থেকে পাতা পালটানো হয়নি), একটা হলুদ আর একটা কমলা হাইলাইটার (কমলা হাইলাইটারের মাথায় হলুদ খাপ আর হলদের মাথায় কাঁচকলা)। একটা বদখত সাইজের ডায়েরি, সে'টাও আধখোলা। আর কিউবিকেলের একদিকে সাঁটানো রঙবেরঙের অজস্র স্টিকি-নোটস (সে স্টিকি-নোটে যেহেতু আমার হাতের লেখা, সেহেতু সেগুলোর দিকে আধ-মিনিটের বেশি একটানা তাকিয়ে থাকে ব্লাড-প্রেশার বেড়ে যেতে বাধ্য)। 

প্রথম বিচারক বিহ্বল হয়ে আমার দিকে চাইলেন, বিব্রত হলেও আমায় খানিকটা হাসতে হল। এমন গোলমেলে পরিস্থিতিতে হ্যা-হ্যা করতে পারলে দেখেছি অস্বস্তি খানিকটা কাটানো যায়। খানিকক্ষণ আমার টেবিলের দিকে তাকিয়ে চুকচুক শব্দ করলেন এক’দুবার। তারপর বললেন; 
“ট্যু ক্লাটার্ড মুকর্জি”! 

অগত্যা আমি হাসির ডোজ বাড়িয়ে দিলাম। দ্বিতীয় বিচারক ভদ্রলোক আমার নার্ভাসনেস ধরতে পেরে খানিকটা নরম ভাবে বললেন,
“ঘাবড়ে যেও না ব্রাদার, আইনস্টাইন মানবজাতীর উদ্দেশ্যে একটা মোক্ষম প্রশ্ন ভাসিয়ে দিয়ে গেছেন। সে’টা জানা আছে তো? If a cluttered desk is a sign of cluttered mind, of what then, is an empty desk a sign”? 

Friday, July 9, 2021

ছিদ্রান্বেষী


লোকজন বড্ড বেশি ছিদ্রান্বেষী হয়ে পড়েছে। কথায় কথায় শুধু খুঁত ধরে গপ্প ফাঁদা। গা জ্বলে যায়। ইচ্ছে করে দি কষিয়ে দু’ঘা। এই সবে একটু বাজারে বেরিয়েছি টপ কোয়ালিটি পাবদা খুঁজতে। সবেমাত্র খান-সাতেক দোকান ঘোরাঘুরি করে পাবদার পাশাপাশি সামান্য চিংড়িও তুলে নিয়েছি। সবে একটু দেশী মুর্গির খোঁজ করব কিনা ভাবতে ভাবতে একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একটা স্পেশ্যাল আদা চা অর্ডার করেছি। সবে ভাবতে শুরু করেছি ফেরার পথে সামান্য রাবড়ি আর জিলিপি নিয়ে ফিরব। এমন সময় নজরে পড়ল; কী বিশ্রী ভিড় বাজারে। 

কী বিশ্রী ভীড়। দেশে আলফা বিটা গামা ল্যাম্বডা আর কত রকমের বিশ্রী করোনা ভ্যারিয়ান্ট নেচে বেড়াচ্ছে অথচ লোকে যেন সাপের পাঁচ দেখে রাস্তায় নেচে বেড়াচ্ছে। এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে, এ ওর সঙ্গে গপ্প জুড়েছে; যেন কল্পতরু মেলা। মাছের দোকানে ভীড়, মুর্গির দোকানে ভীড়, মাংসের দোকানে ভীড়, রাস্তায় অটো আর রিক্সার ভীড় – যাচ্ছেতাই! আরে এ’দিকে দেশে যে প্যান্ডেমিক চলছে সে’বিষয়ে কারুর কোনও হেলদোল নেই। এই ইনডিসিপ্লিনের জন্যই এ দেশের কিস্যু হল না আর হবেও না। অকারণে এত লোকের বাইরে বেরোনোর দরকারটা কী? দিব্যি ভাবলাম ফাঁকায় ফাঁকায় অল্প মাছ আর যৎসামান্য মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাব – কিন্তু তার কি আর উপায় আছে?

চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে তৃপ্তি পেলাম বটে কিন্তু মনে স্বস্তি ফিরল না। আশেপাশের মানুষজনের ওপর একটা বিশ্রী রাগ তৈরি হচ্ছিল। এমন লারেলাপ্পা পপুলেশন নিয়ে দেশের প্রগ্রেস ঘটবে কী করে? লোকে মাস্কটাও ঠিক করে পরছে না! রাবিশ! এ দেশে দরকার ডিকটেটরিয়াল শাসন। এক্কেবারে কড়া হাতে শাসন না করলে এ সমাজ যে লাটে উঠবে। বিরক্তি যখন চরমে উঠল তখন দু’নম্বর চায়ের কাপের অর্ডার দিয়ে চায়ের দোকানের সামনে রাখা বেঞ্চিতে বসে পড়লাম। খুব খারাপ লাগছিল দেশের এবং দশের কথা ভেবে। এমন অবক্ষয় দেখলে মাস্টারদা বড় কষ্ট পেতেন, সুভাষবাবু বোধ হয় লজ্জায় প্লেন থেকে স্বেচ্ছায় ঝাঁপিয়ে পড়তেন; অবশ্যই মাস্ক পরে তবে প্যারাসুট ছাড়া। গান্ধীজী সুতো বোনা ছেড়ে আনমনে চরকায় তেল দিয়ে যেতেন শুধু। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক থেকে। 

ভাবনার মধ্যে সবে একটা পোয়েটিক ফ্লো এসেছে, এমন সময় অনিরুদ্ধর সঙ্গে দেখা। ছোকরা আমার চেয়ে বয়সে ছোট, একসময় আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকত। ভারী মুখচোরা ছিল এক সময়। তবে বাবুটি এখন লায়েক হয়েছেন, কী’সব এনজিওর সঙ্গে মিলেমিশে এদিকওদিক ফোঁপরদালালি করে বেড়ায়। কথায় কথায় ডোনেশন চায় বলে আমি সচরাচর এড়িয়ে চলি। কিন্তু আজ এক্কেবারে দুম করে সামনে চলে এলো, পাশ কাটাতে পারলাম না। 

যেই না “আরে অনি যে” বলে আমি নিজের মাই-ডিয়ার স্টাইলে খেজুর করতে এগিয়ে গেছি, অমনি সে’ব্যাটা ফস করে বলে উঠলে, “এ বিচ্ছিরি সময়ে এমন রসিয়ে মাছের বাজার না করলেই নয় দাদা? আর ভীড়ের মধ্যে নিজে মাস্ক নামিয়ে চা গিলছেন গিলুন, অমন হা-হা করে আমার দিকে এগিয়ে আসার কী আছে। আমি একটা টীম নিয়ে এসেছি এ এলাকাটা ডিসইনফেক্ট করতে। চায়ের দোকানে বসে রকের আড্ডা পরে হবে’খন। আপনিও এ’ভাবে গা এলিয়ে বসে না থেকে বাড়ি ফিরে যান”। 

সাধে কি বলি লোকজন বড্ড বেশি ছিদ্রান্বেষী হয়ে পড়েছে? কথায় কথায় শুধু খুঁত ধরে  আর গপ্প ফাঁদে! আমি সাদা-মনে-কাদা-নেই সাতে-নেই-পাঁচে-নেই মানুষ, অনিরুদ্ধর এমন সব শুচিবাই ডায়লগ শুনে আমার গা জ্বলবে না? যত্তসব!

মিটিংবাজ



কারণে অকারণে মিটিং ডাকাটা একটা রোগ৷ স্যাটাস্যাট কাজকর্ম ফিনিশ হচ্ছে৷ তরতর করে সবকিছু এগোচ্ছে৷ এমন সময় কারুর কারুর মিটিং-মিটিং মনকেমন শুরু হবে। অমনি চারদিকে দৌড়ঝাঁপ৷ সক্কলে সন্ত্রস্ত৷ মিটিং হবে! হাবিজাবি প্রিন্ট আউট বেরোচ্ছে, দুদ্দাড় করে কেউ এজেন্ডা দাঁড় করাচ্ছে, কেউ কফি বিস্কুটের অর্ডার দিচ্ছে, কেউ "উই মাস্ট বি অন টাইম" বলে খামোখা চেল্লামেল্লি করছে, কেউ "আমি তাহলে ভোট অফ থ্যাঙ্কসটা দেব'খন"? বলে নব্য-কফিহাউস কবি মাফিক মিউমিউ করছে;মিটিং হবে! এককথায় রথের মেলা বসে যাবে৷ অবশ্য নিউনর্ম্যাল জমানায় আবার কনফারেন্স রুম ঝেড়েপুছে সাফ করারও দরকার পড়েনা৷ সোজা জুম লিঙ্কের চাক্কুতে এফোঁড়ওফোঁড়৷ মোদ্দা কথা হল মিটিং শুনলেই পাবলিককে বুলেট-প্রুফ জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে ইয়ারবাড হাতে যুদ্ধ শুরু করতে হবে৷ 

"ওগো শুনছো" দিব্যি পাশ কাটানো যায়৷ কিন্তু মিটিংয়ে আপত্তি মহাপাপ৷ কাজকর্ম দু'চার আনা কম-বেশি হলে ক্ষতি নেই, কিন্তু মিটিং ডেকে মার্তণ্ড-মার্তণ্ড-মার্তণ্ড স্টাইলে এক্সেলেন্স-এক্সেলেন্স-এক্সেলেন্স না করলে দুনিয়াটাই জলে। 

আর আউটপুট? যে কথা দিব্যি ফোন করে আড়াই মিনিটে সেরে নেওয়া যায়, তার জন্য বসবে আড়াই ঘণ্টার মোচ্ছব৷ ব্রেন-স্টর্মিং- অর্থাৎ একে অপরকে রকমারী কর্পোরেট ক্লীশের মুগুর দিয়ে পিটিয়ে শায়েস্তা করা৷  আড়াই ঘণ্টা ধ্বস্তাধস্তিতে সেই আড়াই মিনিটের সহজ-সরল ব্যাপারটা এমন গুবলেট হবে যে আগামী আড়াই হপ্তাতেও সে জট ছাড়বে না; মিটিংয়ের সার্থকতা সেখানেই৷