Friday, July 9, 2021

পলাশী



তেইশে জুন ১৭৫৭, পলাশী। বাঙালা এবং ভারতের হাহাকার, কান্নাকাটি, হায়-হায়-এ-কী-হল, ইত্যাদি।  

ওদিকে ব্রিটেনে ফুর্তির ঝড়। 
কোম্পানির পৌষমাস। 
আর রবার্ট ক্লাইভের পৌষ ম্যাক্স আল্ট্রা। আন্ডার দ্য টেবিল বেশ টু-পাইস বাগিয়ে বিলেতে ফিরলেন। সে টাকা নির্বিচারে উড়িয়ে পার্লামেন্টের সীটও  বাগালেন। আয়ার্ল্যান্ডে নিজের এস্টেটের নাম দিলেন - পলাশী (Plassey)। 

ক্লাইভের সেই বিলিতি পলাশী রয়েছে লিমেরিক কাউন্টিতে। লিমেরিক নামটায় সামান্য দাঁড়াতে হল। বহু বিষয়ের মত কবিতা-টবিতার ব্যাপারেও আমার অজ্ঞতা সুগভীর। তবে লিমেরিক ব্যাপারটা ফেলুদার মুখে শুনে বেশ মুচমুচে লেগেছিল। 

তাই হত্যাপুরীতে জটায়ুকে নিয়ে লেখা সেই লিমেরিক এ'দিক ও'দিক করে  দিয়ে দিলামঃ

বুঝে দ্যাখো ক্লাইভের বরাতের জোর
ঘুরে গেল ইতিহাস, এলো কলি ঘোর
ট্রেটার যেদিকে যারা
পকেটে নোটের তাড়া
কোম্পানি  মসনদে, নবাবী নো-মোর।

(২৬ জুন ২০২১, ফেসবুকে পোস্ট করা)

Thursday, July 1, 2021

দ্য রেস অফ মাই লাইফ



গতকাল পড়লাম এই বইটা৷ এর বছরখানেক আগে লোপেজ লোমংয়ের একটা দুর্ধর্ষ আত্মজীবনী পড়েছিলাম, সে'টাও এক অদম্য অ্যাথলিটের গল্প। কিন্তু সে জীবনীতে রীতিমতো উপন্যাসের মশলা ছিল৷ গৃহযুদ্ধ,  রাজনীতি,  খিদের জ্বালা; সব মিলে টানটান৷ প্রবল মনকেমনের লেখা৷ মিলখার আত্মজীবনী ঠিক সেই ধরণের লেখা নয়৷ তবে সে'টা অভিযোগ নয়৷ সাহিত্যের উপাদান তাঁর জীবনেও কম ছিল না। দেশভাগের দাঙ্গায় পরিবার খোয়ানো কিশোর, প্রবল আর্থিক অনটন, ভেসে যাওয়ার অজস্র সম্ভাবনাকে প্রতি নিয়ত ডজ করে এগিয়ে চলা, ভালোবাসা-মায়া-মমতা-বিশ্বাসঘাতকতা, দুর্দান্ত উত্থান আর সাহেবি কেতায় যাকে বলে "মেজর হার্টব্রেক"; সবই ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সযত্নে ছুঁয়ে ফেলাই যেত এই বইয়ে৷ যে'টা লোপেজ করেছেন৷ অথবা আগাসির মত সিনেম্যাটিক ভঙ্গিমায় ফ্রেম করা যেত বায়োগ্রাফিটা। মিলখা সে পথে হাঁটেননি৷ কিন্তু সহজ সরল স্টাইলে যে ন্যারেটিভটা তৈরি হয়েছে সে'টা দিব্যি ঝরঝরে৷ মিলখা নিজের কথা বলেছেন, ইতিহাস-টিতিহাস নিয়ে বিশেষ হোঁচট খাননি৷ একটা সুবৃহৎ সাক্ষাৎকার হিসেবে এ বই চমৎকার৷ 

গতকাল থেকে মিলখা সিংয়ের একটা 'কোটেশন' সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব চালাচালি হচ্ছে - "The track, to me, was like an open book, in which I could read the meaning and purpose of life. I revered it like I would the sanctum sanctorum in a temple, where the deity resided and before whom I would humbly prostrate myself as a devotee"।  কথাটা এই বইতেই বলেছেন মিলখা৷ আর এ কথাটা যে স্রেফ এস্যে লিখতে বসে ভারি ইংরেজি ফলানো নয়, মিলখার আন্তরিক স্টাইলেই সে'টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে৷ মিলখা শুধু ঘাম নয়, রক্তও ঝরিয়েছেন ট্র‍্যাকে - আর মিলখার সে গল্প পড়তে পড়তে পাঠক অনায়াসে নিজের মনের মধ্যে একটা মোতি নন্দী 'Re-telling' কল্পনা করে নিতে পারবেন৷ 

কর্পোরেটে প্রায়ই একটা খেজুরে প্রসঙ্গ নিয়ে " ডোন্ট বি আ আ মিনিমাম গাই" গোছের সাহেবরা জ্ঞান ঝাড়েন - এক্সেলেন্স৷ মিলখার মজ্জায় এককণাও দেখনাই-কর্পোরেট পালিশ নেই৷ কাজেই তার জীবনীতে পাওয়ারপয়েন্ট জ্ঞান নেই, রয়েছে আদত এস্কেলেন্সের প্রসঙ্গ৷ ফুংসুক ওয়াংড়ু যে কথাটা সিনেম্যাটিক ব্রিলিয়ান্স আর "হাইক্লাস এন্টারটেনমেন্টে"র মাধ্যমে বুঝিয়েছেন, মিলখার বইয়ে সে'টাই রয়েছে একটু সাদামাটা ভাষায়, কখনও প্রায় সভাসমিতির মাইক্রোফনের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার ভাষায়।

দেশভাগ আর বাপ-মা হারানোর যন্ত্রণা, আর্মি ব্যারাকের নিরস ডিসিপ্লিনের ওজন বইতে বইতে নিজের প্যাশন খুঁজে পাওয়া, আকাশ ছোঁয়া সাফল্য, আর রোম অলিম্পিকের যন্ত্রণা। সবই রয়েছে৷ ব্যাক্তিগত ধ্যানধারণা আর সম্পর্কগুলোও বাদ যায়নি৷ তবে এ বইতে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে; ভারতের স্পোর্টস 'সিস্টেম' নিয়ে মিলখার খোলামেলা মতামত এবং খানিকটা হতাশা। 

চট করে পড়ে ফেলাই যায়৷

Tuesday, June 29, 2021

বই কেনা ও পড়া




*নতুন বইয়ের খবর পাওয়া গেল*

দু'সেকেন্ডের মাথায়ঃ
গুডরীডস ঘেঁটে দেখা বইটা সম্বন্ধে কে কী বলছে।

আড়াই মিনিটের মাথায়ঃ
গুগলে অন্যান্য রিভিউয়ের খোঁজ৷

সতেরো মিনিটের মাথায়ঃ
বন্ধুকে ফোনঃ ওই বইটা পড়েছিস ভাই? কেমন বল দেখি? অমুক বইটার তুলনায় কেমন? তমুক বইটার তুলনায়? তুই নিশ্চিত ভালো? মা কালীর দিব্যি? দ্যাখ! কিনে ফেলছি কিন্তু।

বাইশ মিনিটের মাথায়ঃ
অন্য বন্ধুকে ফোনঃ হ্যাঁ রে ভাই, ভটকাই বলছে বইটা বেশ ভালো৷ ওর কথা বিশ্বাস করাটা ঠিক হবে কি? অন্যের বোলিংয়ে ব্যাটা একদম মন দিয়ে ফিল্ডিং করত না কিনা..তুই বলছিস বইটা ভালো? সিরিয়াসলি? 

তেত্রিশ মিনিটের মাথায়ঃ
আমাজনে (বা অন্য কোথাও) অর্ডার। 

দু'দিনের মাথায়ঃ
আমাজনের প্যাকেটটা রাক্ষুসে ভাবে ছিঁড়ে ফেলে বইটা বের করে হুড়মুড় করে চার পাতা পড়ে, 
তাকে সাজিয়ে রেখে;
স্নান করতে যাওয়া/হাতের জরুরী কাজগা সেরে ফেলা/খেতে বসা। 

আড়াই বছর পরঃ
তাকে রাখা সে বইটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস; সামনের মাসের মধ্যে বইটা পড়ে না ফেললেই নয়৷

Monday, June 21, 2021

যোগসাধনা




বছর তিনেক আগে৷ 
অফিস থেকে বেরোনোর মুখে ব্রজদার ফোন৷ ভদ্রলোক আমার বাপের বয়সী৷ তবে কফিহাউস আলাপের ক্ষেত্রে বয়স নিয়ে শুচিবাই চলেনা৷ ব্রজদা ব্যাচেলর দিলদরিয়া মানুষ৷ আড্ডায় সরেস, খাওয়াতে ভালোবাসেন৷ প্রচুর ঘুরে বেড়ান, তাই গল্পের স্টক অফুরন্ত৷ বদগুণ একটাই; বড্ড বেশি কবিতা লেখেন আর সে'সব মাঝেমধ্যে হাসি মুখে শুনতে হয়৷ 

কবিতা ব্যাপারটা ভালো লেখেন না খারাপ সে সম্বন্ধে আমার কোনও ধারণাই নেই৷ কবিতা ব্যাপারটাই গোলমেলে এবং সম্ভবত লোকঠকানো৷ কাজেই এ বিদঘুটে ব্যাপার আমি চিরকালই এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করেছি৷ কিন্তু ব্রজদার কবিতাগুলো অবশ্য হাসিমুখেই হজম করে থাকি, কারণ চপ-কাটলেট না খাইয়ে উনি কবিতার ডায়েরি নামান না৷ 

- ব্রাদার, একটি বারে জন্য যে আমার বাড়িতে আসতে হবে। এখুনি।

- কী ব্যাপার ব্রজদা?

- না এলেই নয়৷ চট করে চলে এসো দেখি৷ তারপর ডিটেলে বলছি৷

- শনিবার কফিহাউস থেকে বেরিয়ে না হয় আপনার ফ্ল্যাটে ঢুঁ মারব..আজ একটু..।

- বড় দেরী হয়ে যাবে ভায়া৷ ইট ইজ অ্যান এমার্জেন্সি৷ স্পেশ্যাল মোগলাই পরোটা আর মাটন কষা অর্ডার করেছি৷  ক্যুইকলি চলে এসো৷ 

এরপর আর না বলা সম্ভব নয়৷

**

নেহাৎ বিভূতি রেস্টুরেন্টের হাইক্লাস মোগলাই আর জিভ কাঁপানো কষা মাংস আগেভাগেই পেটে পড়েছিল। নয়ত নার্ভাস হয়ে হাঁটু ক্র‍্যাশ করে যেত৷ ব্রজদাই বলেছিল "আগে ডিনারটা সেরে নেওয়া যাক"৷ কিন্তু তারপর ব্রজদা যে খেল দেখালে, আমি তো থ৷ 

ডিনারের পর, "এক মিনিটে আসছি" বলে ব্রজদা ভিতরের ঘরে মিনিট কুড়ির জন্য গায়েব হলেন৷ সে ফাঁকে ব্রজদার রেফ্রিজারেটর জরীপ করে এক বাক্স চমচম পাওয়া গেল। সে বাক্স অনেকটা হালকা করে এনেছিলাম৷ এমন সময় ব্রজদা ফিরল।  আর ব্রজদাকে দেখে একটা বিশ্রী বিষম খেতে হল যার ফলে মুখ থেকে এক টুকরো চমচম উড়ে গিয়ে থিতু হয় বসল দেওয়ালে টাঙানো গ্রিনপ্লাইয়ের ক্যালেন্ডারে৷ 

স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি ছেড়ে ব্রজদা গেরুয়া জোব্বা পরে বেরিয়ে এসেছে৷ গলায় কয়েক'ছড়া রুদ্রাক্ষের মালা৷ কাঁধে একটা হলদে ঝোলা আর ডান হাতে একটা সুটকেস৷ আর মুখের হাসি অত্যাধিক চওড়া আর অস্বস্তিকর ভাবে দেখনাই৷ 

হাসিটাকে আরও একটু চওড়া করে, সুটকেসটা নামিয়ে রেখে আমার সামনে ক্যাটওয়াকের ভঙ্গীমায় তিরিশ সেকেন্ড মত হাঁটলেন৷ তারপর আচমকা হাঁটা থামিয়ে আমার দিকে উৎসুকভাবে তাকালেন। 

- কেমন বুঝছ ভায়া?
- কী ব্যাপার ব্রজদা? হঠাৎ এই পোশাকে..থিয়েটার টিয়েটারে চান্স পেয়েছেন নাকি?
- ঘাবড়ে গেছ দেখছি।
- হ্যাঁ মানে আচমকা এ'ভাবে..।
- একটা সিগারেট দাও..বলাই বাহুল্য..মাই লাস্ট সিগারেট।
- সিগারেট ছেড়ে দেবেন? 
- মোগলাই আর মাটন ছেড়ে দিলাম হে৷ এ তো স্রেফ ধোঁয়া৷
- ওহ আজ তাহলে..।
- লাস্ট সাপার ছিল৷ ঠিকই ধরেছ।
- কিন্তু আপনি হঠাৎ..। 
- চললাম। হে বন্ধু, বিদায়। এই ক্যালক্যাটা, অফিস; সব নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম৷ 
- ডিটক্স?
- পার্মানেন্ট৷ সন্ন্যাস। গত হপ্তাতেই এক বাবাজী জোগাড় করতে পেরেছি৷ গোট দেশে তাঁর খানসাতেক আশ্রম৷ ব্রশার পাঠিয়েছিল। আমি হিমাচলের একটা স্পট সিলেক্ট করেছি৷ আজ রাতের ফ্লাইটে দিল্লী চললাম৷ সে'খানে বাবাজীর হেডঅফিস৷ একটা কন্ডিশনিং কোর্স করতে হবে সে'খানে। দিন সাতেক পর সোজা কোর্স কম্পলিশন সার্টিফিকেট হাতে সোজা আশ্রম৷ পাহাড়ের কোলে, সাররিয়াল, পীসফুল৷ ভাবতেই ভালো লাগছে।
- বাবাজীর আশ্রমের ব্রশার? কন্ডিশনিং কোর্স?
- ব্রশারের সফটকপিও আছে৷ তোমায় হোয়্যাটস্যাপ করে দেব'খন। 
- ওহ্। 
- তা, মহাপ্রস্থানের জন্য আজকের দিনটা প্রেফার করলাম কেন আশা করি বুঝতে পারছ৷ ইন্টারন্যাশনাল ডে অফ ইয়োগা আজ। অফিসের কচকচি, লিটল ম্যাগাজিনের ইন্টেলেকচুয়াল ভাঁওতা, কফি হাউসের কলার টানাটানি আর এই চপ-কাটলেটের লোভের অন্ধকার থেকে নিজেকে লেভিটেট করিয়ে তুলে নিচ্ছি৷ এরপর আমার গোটা জীবনটাই হয়ে উঠবে যোগসাধনা৷ প্রতিটি মুহূর্তই প্রাণায়াম।  
- আপনি কলকাতা ছেড়ে যাচ্ছেন ব্রজদা?
- ফর এভার৷ ট্যু ক্রাউডেড৷ চারদিকে ধান্দাবাজি৷ বছরে সাড়ে এগারো মাস প্যাঁচপ্যাঁচে গরম৷ ভাজাভুজিতে ভেজাল তেল। অফিসে ল্যাং মারামারি৷ বাসে ঝুলোঝুলি, ফুটপাতে ধাক্কাধাক্কি৷ ফেড আপ৷ আশ্রমে একটা বড় খোলামেলা ঘর পেয়েছি, রিভার ফেসিং - বুঝলে! বাবাজির ট্রাস্টে একটা বড় আমাউন্ট দিতে হয়েছে অবিশ্যি সে'সবের জন্য৷ এখন সেই পীস হ্যাভেনে শুধু আমি আর আমার যোগসাধনা৷ 

**

- এই যে ভায়া!
- আরে ব্রজদা না?
- এটা নতুন নম্বর, সেভ করে নাও৷
- হোয়াট আ সারপ্রাইজ৷ আছেন কেমন?
- জাস্ট তোফা৷
- কদ্দিন পর কথা হচ্ছে বলুন তো?
- পাক্কা তিন বছর পর।
- রাইট৷ তাই তো৷ তা আছেন কেমন? মোক্ষলাভ হল কি? এখনও সেই রিভার ফেসিং রুমেই আছেন নাকি হিমালয়ের কোনও গুহায় কৌপীন পরে গাঁজা টানিছেন? 
- আপাতত বিভূতি রেস্টুরেন্ট ফেসিং ব্যালকনিতে বসে তোমায় ফোন করছি।
- সে কী? কলকাতায় ফিরেছেন? কদিনের জন্য? ভক্ত সমাগম কেমন? দর্শন দেবেন কি?
- এক ইন্টারন্যাশনাল ডে অফ ইয়োগাতে প্রস্থান৷ অন্য এক ইন্টারন্যাশনাল ইয়োগাতে রিটার্ন।
- বলেন কী! আশ্রম ছেড়ে দিয়েছেন?
- সমস্তটাই যোগসাধনার স্বার্থে৷ তোমায় তো বলেইছিলাম, ইয়োগা ইস মাই লাইফ৷
- কেন? আশ্রমে সাধনায় ব্যাঘাত ঘটছিল বুঝি ব্রজদা?
- মনের মত আসনটা ঠিক হয়ে উঠছিল না৷ 
- মনের মত আসন?
- তিনটি বছর লাগল সত্য অনুধাবন করতে৷ একমাত্র একটাই যোগে আমার মুক্তি৷ প্রাণখুলে নিজের লেখা কবিতা শোনানো; অনলি ফর্ম অফ ইয়োগা আই নীড ভায়া৷ এ তিন বছরে কম আশ্রম আখড়া ঘুরলাম না। কিন্তু আমার সমস্ত ধরেবেঁধে কবিতা শোনানোর বন্ধুদের যে কলকাতাতেই ফেলে গেছিলাম ভায়া৷ কবিতা না শোনাত পেরে মনের ভিতর ময়লা জমতে শুরু করেছিল, পেট ফেঁপে ওঠার উপক্রম৷ কাজেই, যোগদিবসে তাই ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন৷ শোনো, চলে এসো৷ এখুনি! তিন বছরে দিস্তে দিস্তে পোয়েট্রি লিখেছি। সে'সবের শ্রোতা না পেলে আমার যোগসাধনা বৃথা।
- ইয়ে,  মানে...সামনের উইকেন্ডে আসব না হয়? গোটাদিন বেশ আড্ডা জমানো যাবে৷ আজ একটু কাজ জমেছিল..।
- আশ্রমে থেকে আমার আমিষে আগ্রহ সত্যিই গেছে৷ নিজের জন্য কয়েকটা লুচি ভাজব বলে ময়দা মেখে রেখেছি৷ আর বেগুনভাজা৷ তোমার জন্য অবশ্য রুমালি রুটি, মাটন চাপ, ব্রেনকারি, মেটে চচ্চড়ি আর মুর্গ পোলাও আনিয়ে রেখেছি৷ চলে এসো৷ আমি বাহাত্তরটা কবিতা শর্টলিস্ট করে রেখেছি পড়ব বলে। ক্যুইকলি চলে এসো ভাই।

এরপর আর না বলা সম্ভব নয়৷

Friday, June 18, 2021

নিউনর্মাল বিরিয়ানি



- লাঞ্চে বাসি বিরিয়ানির জবাব নেই ভায়া৷

- ট্রু৷ তবে ইয়ে, থার্ড ওয়েভ ঠেকিয়ে রাখা যাবে বলে মনে হচ্ছে না৷

- মাংস হয়ত পাতে সামান্য কম রয়েছে, কিন্তু ওভারনাইট রেফ্রিজারেশনের ফলে ফ্লেভারে একটা অন্য ঘ্যাম চলে আসে, তাই নয় কী?

- একদম৷ ইয়ে, এইমাত্র একটা গা-কাঁপানো আর্টিকল পড়লাম। বম্বেতে ইতিমধ্যেই নাকি তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে৷ অবশ্য ঠেকানোটা ওয়াজ নেভার অ্যান অপশন, শুধু ইম্প্যাক্টটাকে যদি একটু মিনিমাইজ করা যেত৷ আসল অস্ত্র হল পাইকারি ভ্যাক্সিনেশন৷ খোলামকুচির মত ছুঁচ গেঁথে যেতে হবে৷ 

- ডিম সেদ্ধটা অবভিয়াসলি টাটকা৷ বাসি বিরিয়ানির আলু আর তাজা ডিমসেদ্ধর কম্বিনেশনটা কিন্তু আউটস্ট্যান্ডিং। 

- একদম তাই৷ আচ্ছা, মাস দেড়েক আগের সেকেন্ড ওয়েভের সেই ডিসাস্টার যেন গত জন্মের কাহিনী মনে হচ্ছে৷ তাই না? অথচ  দু'দণ্ড মন দিয়ে সে'সব কথা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। মেজপিসেমশাই চলে গেলেন৷ পাড়ার মন্টু মাত্র তিনদিন ভুগে...। অফিসেই তো অন্তত জনা চারেক..। অথচ আজ দেখো, সে'সব যেন অন্য জগতের ঘটনা মনে হচ্ছে৷ 

- আমার একটা পার্সোনাল থিওরি আছে জানো৷ টাটকা বিরিয়ানির স্কেলে সিরাজ সামান্য এগিয়ে৷ কিন্তু বাসিতে আরসালাম ফটোফিনিশে বেরিয়ে যাবে৷ 

- হুম৷ পরের ফেজে শুনছি ছোট ছেলেমেয়েদেরও বিস্তর ভুগতে হতে পারে। খোকার সেফটির কথা ভেবেই বুকে মোচড় দিয়ে উঠছে৷ নট টু মেনশন; বাপ-মাকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই৷

- আসলে কী জানো, বিরিয়ানি বাসি হলে তার গায়ে মায়া লাগে।

- নাহ্, লাইফটাকে কচুকাটা না করে এ প্যান্ডেমিক সরবে না।

- দু'দিন বইতো নয় ভায়া৷ রাত্রে গুরুপাক না রেখে সামান্য চাপ আর রুমালি রুটি জোম্যাটো করা যাক৷ কী বলো?

- তাই হোক৷ আর ইয়ে, অক্সিমিটারটা ট্রাবল দিচ্ছে৷ ব্যাটারি চেঞ্জ করেও লাভ হল না৷ আর একটা কিনতেই হবে৷ অর্ডার দিয়েই ফেলি৷ এ'সব ব্যাপারে দেরী করে লাভ নেই৷

**

খেতে বসে নিজের সঙ্গে গল্প না জুড়ে উপায় থাকছে না৷ খেলোয়াড়দের দেখেছি হাইভোল্টেজ মুহূর্তে নিজেদের সঙ্গে কথা বলতে৷ শেষ বলে জিততে হলে চার রান দরকার, বোলার রানআপের গোডায় দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছেন "কাম অন, কাম অন। বোল ইট ওয়াইড আউটসাইড দ্য অফ স্টাম্প । স্কেলে মাপা বল; কাম অন! ইউ ক্যান ডু ইট"। পাড়াতুতো এক জ্যেঠুকে দেখেছি শেষ বয়সে এসে অনবরত নিজের সঙ্গে গল্প জুড়ছেন; নিজেই গোলমেলে প্রশ্ন করছেন, নিজেই লাগসই উত্তর দিয়ে কেল্লা ফতে করছেন৷ আমার এক বন্ধুকে দেখতাম জটিল অঙ্ক কষার সময় মশগুল হয়ে চাপা সুরে অঙ্কের স্টেপগুলো আউড়ে যেত; কোনও জব্বর কঠিন কোনও প্রব্লেমকে জব্দ করতে পারলে নিজেই নিজেকে সাবাশ বলে উঠত। 

নিজের সঙ্গে নিজের বিড়বিড়গুলো বোধ হয় এক ধরণের মেডিটেশন৷ ধরা যাক ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে, সাতাশ ঘণ্টা অনবরত শত্রুপক্ষের বুলেট এড়িয়ে হয়ত কোনও সৈনিক নিজের বাঙ্কারে এসে পৌঁছেছে৷ ঘামরক্তভেজা জামাকাপড় ছেড়ে কফির মগ হাতে দু'দণ্ড গা এলিয়ে দিয়ে প্রিয় গানের সুর গুনগুন করতে শুরু করেছে। কিন্তু সেই গানের সুরে আর কফির গন্ধে ভেসে গেলে তো তার চলবে না৷ মনের মধ্যে একটা বেসুর বেজেই চলবে "ঘণ্টাখানেক পরেই যুদ্ধ ব্রাদার! যুদ্ধ। গুলি। বুঝেছ? ব্লাডি ওয়ার! মুহূর্তের অসাবধানতায় স্নাইপারে সাফ হয়ে যাওয়া বা ল্যান্ডমাইন ফেটে উড়ে যাওয়া"। কফি শেষ হয়, গান থামে; কিন্তু স্নায়ু গা এলাবার তাল করলেই চিমটি৷ 

এই নিউ নর্মালে নিজেদের নির্ভেজাল ভালোলাগাগুলোকেও আর নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না৷ পছন্দের খাবার, ভালো লাগা বই, মনভালো করা আড্ডা; এ'সমস্ত কিছুর মধ্যেই নিজের সঙ্গে জরুরী আলোচনাগুলো চালিয়ে যেতে হচ্ছে৷ এ যুদ্ধ সহজে শেষ হওয়ার নয়৷ সমস্ত ভালোলাগাগুলোকে মুলতুবি রাখার উপায় নেই, আবার সহজে ভেসে যাওয়ারও উপায় নেই। 

নিজের মধ্যে বাস করা বিরিয়ানি ভালোবাসা আলাভোলা মানুষটার আস্তিন মাঝেমধ্যেই টেনে ধরছে যে ভদ্রলোক, সেও ভুরু কুঁচকে আমার মধ্যেই গ্যাঁট হয়ে বসে রয়েছে৷