Friday, July 9, 2021

সব চুকেবুকে গেলে



সব চুকেবুকে গেলে, লঞ্চে চড়ে হাওয়া খেতে বেরোনো যাবে।  

সে টিকিটঘর দেশলাই বাক্সের চেয়ে সামান্য বড়।আর সেই টিকিট যেমন সরু, তেমনই পাতলা - সামান্য অসাবধান হলেই  বাবাজী ফুড়ুৎ।  

দাঁড়ানো লঞ্চে হ্যাংলার মত উঠে পড়ার মানেই হয় না। ছুটির বিকেল খরচ হবে রসিয়ে রসিয়ে৷ জেটিতে এসে আগে দরকার এক ঠোঙা ঘটিগরম। সুখা মুখে জেটিতে বসে থাকা মানে ইডেনের গ্যালারিতে বসে এলসিএম জিসিএম কষা- সে অন্যায় ঘটতে না দিলেই মঙ্গল।

লঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেই জেটির ব্যাস্ততা হাওয়া। তখন একটু নজরুল আর অল্প আর ডি বর্মন গুনগুন করা যেতেই পারে। গলায় সুর না থাকলেও, মন এক্কেবারে নিয়মিত রেওয়াজ করা ওস্তাদ। 

মুখে গঙ্গার মিঠে বাতাস, পকেটে পুরনো চিঠি। দু'একটা সস্তা চুটকি মনে পড়ায় হুট করে হেসে ফেলাই যাবে। রোব্বারের বিকেলের জেটির আশ্রয়ে কাউকে তো আর কৈফিয়ৎ দেওয়ার নেই৷ 

একসময়, ও'দিকের ঘাট ছুঁয়ে লঞ্চ ব্যাটা ফের এসে জুটবে। অমনি জেটিতে ব্যস্ততার হাওয়া। লঞ্চে ওঠার মুখেই মোবাইল বেজে উঠবে হয়ত। ফোনার ওপার থেকে অফিসের কোনও তাবড় কর্তা জিজ্ঞেস করবেন, "কোথায় আছ মুকর্জি"?

ঘটিগরম আর নজরুলে পুষ্ট উত্তর যাবে তৎক্ষনাৎ, "জিমে ঢুকছিলাম যে। সানডে এইসময়টা আই ইনভেস্ট ইন মাইসেল্ফ"।

মিটার

- মনটন বেজায় খারাপ ব্রাদার৷

- সে কী! কারণ?

- ঠিক ধরতে পারছি না৷ একজন গোয়েন্দা লাগাতে হবে দেখছি সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে।

- ডিটেকটিভ?

- ফেলু মিত্তিরের সঙ্গে আড্ডা জমাতে পারলে বেশ হত।

- অন্য মিত্তির সাজেস্ট করতে পারি৷ সে মিত্তির কারণটারণ খুঁজে সময় নষ্ট করার বান্দা নয়৷ সোজা মনখারাপ তাক করে ঢিঁশকাও!

- পি সি মিটার নয়? অন্য মিটার?

- এস মিটার৷ শ্যামল মিত্তির৷

ফুটবলিষ্ঠ



- হ্যাঁ রে গুপে, টিভিতে আজকাল কোনও ফুটবল ম্যাচট্যাচ কিছু হচ্ছে নাকি?

-  ফুটবল?

- ফুটবল। 

- ভটকাইদা, তোমার হঠাৎ ফুটবলের খবরে কী দরকার?

- ফুটবল কি জাহাজ? আমি কি আদার বিজনেস করছি?

- তেমনটাই তো জানি। সে'বছর পাড়ার মাঠে হঠাৎ ফুটবল খেলতে নেমে গোলকিপারের এগেন্সটে লেগ বিফোর উইকেটের অ্যাপীল করে রেফারি স্বদেশ জ্যেঠুর গাঁট্টা খেয়েছিলে মনে নেই?

- আরে ওটা রিফ্লেক্সে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছিল। তবে ফ্র‍্যাঙ্কলি বলি গুপে, খেলতে নেমে অমন গায়ে পড়াপড়ি আমার ধাতে সয় না৷ যাকগে, আমি ফুটবল খেলতে চাইছি না৷ দেখতে চাইছি।

- কিন্তু হঠাৎ ফুটবল দেখার শখ হলই বা কেন? ও'দিকে তোমার আদৌ কোনও ইন্টারেস্ট আছে কি? কোনও ফুটবলারকে চেনো?

- আলবাত চিনি। পেলে। মারাদোনা। কৃশানু।  মেসি। চীমা। গোষ্ঠ পাল। 

- বাহ্। তা, নিয়মিকানুন সব জানা আছে?

- গোল দেওয়া আর খাওয়া। মাঝে এন্তার ধ্বস্তাধস্তি। কুস্তির আবার নিয়মফিয়ম কী? আর তোর অত কৈফিয়তেই বা কাজ কী? এ'বার থেকে ফুটবল দেখব। ব্যাস। 

- ইউরো চলছে। কোপ আমেরিকা চলছে। লট অফ ফুটবল অন টেলিভিশন। 

- এ তো চেনা সব টুর্নামেন্টের নাম। লাভলি। বলছি, রোনাল্ডো এখনও খেলে?

- সুপারস্টার তো। 

- এই বয়সেও খেলতে পারছে? হাড়ে জোর আছে বলতে হবে। টাকটা মেন্টেন করছে না চুল বাগিয়েছে?

- টাক? তুমি কি ব্রাজিলের রোনাল্ডোর কথা বলছ?

- অফ কোর্স। ফুটবলের থাম্বরুল তো দুটোই। ব্রাজিল জিন্দাবাদ। ইস্ট বেঙ্গল হিপ হিপ হুররে। 

- পর্তুগালের রোনাল্ডো এখন মাঠ কাঁপাচ্ছে ভটকাইদা। নট দ্য ওয়ান ফ্রম ব্রাজিল। 

- দেশ পালটে ফেললে? কেপলার ওয়েসলসের মত? 

- উফ! না রে বাবা। এ আলাদা রোনাল্ডো।

- স্ট্রেঞ্জ৷ এ যেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়াসিম। ফ্যাসিনেটিং। ঠিক আছে৷ কিছুটা পড়াশোনা করতে হবে দেখছি।

- অত সাতপাঁচ না ভেবে ম্যাচ দেখে ফুর্তি করলেই তো মিটে গেল৷ পড়াশোনা করার দরকারটা কী? এ তো এগজ্যামিনেশন নয়। 

- ও মা। আকাটের মত দেখে হাততালি দিলে ফেসবুকে লিখব কী করে গুপে? খেলায় গোলটোল হলে শক্তির পোয়েট্রি কোট করে এসোটেরিক একটা কিছু বলে দেওয়াই যায় অবশ্য৷ তবু..।

- তুমি হঠাৎ ক্রিকেট ছেড়ে ফুটবল নিয়ে পড়লে কেন বলো তো?

- টেস্ট ফাইনালের হারটা ডাইজেস্ট করতে পারছি না রে ভাই৷ উইলিয়ামসনের ভালোমানুষ মুখটা মনে করে মনের মধ্যে "খেলায় হারজিত আছেই, স্পিরিট ইজ ইম্পর্ট্যান্ট" গোছের স্লোগান তোলার চেষ্টা করছি বটে...কিন্তু প্রাণে সইছে না। অন্য স্পোর্টসে ডাইভার্সিফাই না করলেই নয়৷

- তুমি ক্রিকেটের দুঃখে ফুটবল দেখবে?

- তেমনটাই ইচ্ছে। তবে আরও একটা ব্যাপার আছে বুঝলি৷ হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপগুলোতে আজকাল এত ফুটবল আলোচনা আর তর্ক চালাচ্ছে শালা ফুটবল পাগলের দল, সামান্য ফুটবল এ'বার না দেখলেই নই। খেলা বুঝেটুঝে কাজ নেই, কিন্তু স্রেফ ইনফর্মেশনের অভাবে তর্কে পার্টিসিপেট করব না...এ যন্ত্রণা বরদাস্ত করা যায় রে গুপে? অসম্ভব!

পলাশী



তেইশে জুন ১৭৫৭, পলাশী। বাঙালা এবং ভারতের হাহাকার, কান্নাকাটি, হায়-হায়-এ-কী-হল, ইত্যাদি।  

ওদিকে ব্রিটেনে ফুর্তির ঝড়। 
কোম্পানির পৌষমাস। 
আর রবার্ট ক্লাইভের পৌষ ম্যাক্স আল্ট্রা। আন্ডার দ্য টেবিল বেশ টু-পাইস বাগিয়ে বিলেতে ফিরলেন। সে টাকা নির্বিচারে উড়িয়ে পার্লামেন্টের সীটও  বাগালেন। আয়ার্ল্যান্ডে নিজের এস্টেটের নাম দিলেন - পলাশী (Plassey)। 

ক্লাইভের সেই বিলিতি পলাশী রয়েছে লিমেরিক কাউন্টিতে। লিমেরিক নামটায় সামান্য দাঁড়াতে হল। বহু বিষয়ের মত কবিতা-টবিতার ব্যাপারেও আমার অজ্ঞতা সুগভীর। তবে লিমেরিক ব্যাপারটা ফেলুদার মুখে শুনে বেশ মুচমুচে লেগেছিল। 

তাই হত্যাপুরীতে জটায়ুকে নিয়ে লেখা সেই লিমেরিক এ'দিক ও'দিক করে  দিয়ে দিলামঃ

বুঝে দ্যাখো ক্লাইভের বরাতের জোর
ঘুরে গেল ইতিহাস, এলো কলি ঘোর
ট্রেটার যেদিকে যারা
পকেটে নোটের তাড়া
কোম্পানি  মসনদে, নবাবী নো-মোর।

(২৬ জুন ২০২১, ফেসবুকে পোস্ট করা)

Thursday, July 1, 2021

দ্য রেস অফ মাই লাইফ



গতকাল পড়লাম এই বইটা৷ এর বছরখানেক আগে লোপেজ লোমংয়ের একটা দুর্ধর্ষ আত্মজীবনী পড়েছিলাম, সে'টাও এক অদম্য অ্যাথলিটের গল্প। কিন্তু সে জীবনীতে রীতিমতো উপন্যাসের মশলা ছিল৷ গৃহযুদ্ধ,  রাজনীতি,  খিদের জ্বালা; সব মিলে টানটান৷ প্রবল মনকেমনের লেখা৷ মিলখার আত্মজীবনী ঠিক সেই ধরণের লেখা নয়৷ তবে সে'টা অভিযোগ নয়৷ সাহিত্যের উপাদান তাঁর জীবনেও কম ছিল না। দেশভাগের দাঙ্গায় পরিবার খোয়ানো কিশোর, প্রবল আর্থিক অনটন, ভেসে যাওয়ার অজস্র সম্ভাবনাকে প্রতি নিয়ত ডজ করে এগিয়ে চলা, ভালোবাসা-মায়া-মমতা-বিশ্বাসঘাতকতা, দুর্দান্ত উত্থান আর সাহেবি কেতায় যাকে বলে "মেজর হার্টব্রেক"; সবই ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সযত্নে ছুঁয়ে ফেলাই যেত এই বইয়ে৷ যে'টা লোপেজ করেছেন৷ অথবা আগাসির মত সিনেম্যাটিক ভঙ্গিমায় ফ্রেম করা যেত বায়োগ্রাফিটা। মিলখা সে পথে হাঁটেননি৷ কিন্তু সহজ সরল স্টাইলে যে ন্যারেটিভটা তৈরি হয়েছে সে'টা দিব্যি ঝরঝরে৷ মিলখা নিজের কথা বলেছেন, ইতিহাস-টিতিহাস নিয়ে বিশেষ হোঁচট খাননি৷ একটা সুবৃহৎ সাক্ষাৎকার হিসেবে এ বই চমৎকার৷ 

গতকাল থেকে মিলখা সিংয়ের একটা 'কোটেশন' সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব চালাচালি হচ্ছে - "The track, to me, was like an open book, in which I could read the meaning and purpose of life. I revered it like I would the sanctum sanctorum in a temple, where the deity resided and before whom I would humbly prostrate myself as a devotee"।  কথাটা এই বইতেই বলেছেন মিলখা৷ আর এ কথাটা যে স্রেফ এস্যে লিখতে বসে ভারি ইংরেজি ফলানো নয়, মিলখার আন্তরিক স্টাইলেই সে'টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে৷ মিলখা শুধু ঘাম নয়, রক্তও ঝরিয়েছেন ট্র‍্যাকে - আর মিলখার সে গল্প পড়তে পড়তে পাঠক অনায়াসে নিজের মনের মধ্যে একটা মোতি নন্দী 'Re-telling' কল্পনা করে নিতে পারবেন৷ 

কর্পোরেটে প্রায়ই একটা খেজুরে প্রসঙ্গ নিয়ে " ডোন্ট বি আ আ মিনিমাম গাই" গোছের সাহেবরা জ্ঞান ঝাড়েন - এক্সেলেন্স৷ মিলখার মজ্জায় এককণাও দেখনাই-কর্পোরেট পালিশ নেই৷ কাজেই তার জীবনীতে পাওয়ারপয়েন্ট জ্ঞান নেই, রয়েছে আদত এস্কেলেন্সের প্রসঙ্গ৷ ফুংসুক ওয়াংড়ু যে কথাটা সিনেম্যাটিক ব্রিলিয়ান্স আর "হাইক্লাস এন্টারটেনমেন্টে"র মাধ্যমে বুঝিয়েছেন, মিলখার বইয়ে সে'টাই রয়েছে একটু সাদামাটা ভাষায়, কখনও প্রায় সভাসমিতির মাইক্রোফনের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার ভাষায়।

দেশভাগ আর বাপ-মা হারানোর যন্ত্রণা, আর্মি ব্যারাকের নিরস ডিসিপ্লিনের ওজন বইতে বইতে নিজের প্যাশন খুঁজে পাওয়া, আকাশ ছোঁয়া সাফল্য, আর রোম অলিম্পিকের যন্ত্রণা। সবই রয়েছে৷ ব্যাক্তিগত ধ্যানধারণা আর সম্পর্কগুলোও বাদ যায়নি৷ তবে এ বইতে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে; ভারতের স্পোর্টস 'সিস্টেম' নিয়ে মিলখার খোলামেলা মতামত এবং খানিকটা হতাশা। 

চট করে পড়ে ফেলাই যায়৷