Thursday, June 17, 2021

ডিভাইডেড আইল্যান্ড



কিছুদিন আগে ফ্যামিলি ম্যান -২ দেখলাম৷ টানটান, ঝকঝকে; ওই যাকে আমরা বলি "অ্যাকশন প্যাকড"৷ আর পাঁচজনের মত আমারও ভালো লাগল৷ সে'খানেই দাড়ি টেনে দিলে হত৷ কিন্তু সেই সিরিজের অন্যতম প্রধান চরিত্র রাজিকে ছুঁয়ে আগ্রহের নিশানা গিয়ে ঠেকল শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে৷ সে বিষয় নিয়ে একটা আলগা ধারণা যে ছিল না তা নয়৷ ওই তামিল ইলম, এলটিটিই, প্রভাকরণ ইত্যাদি৷ এলটিটিইকে দুরমুশ করে যুদ্ধে ইতি টানা হয়েছে, নিউজচ্যানেল এবং ইন্টারনেটের বদান্যতায় তাও খানিকটা জানা ছিল৷ অবশ্য শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের বাইরে সে'খানকার ইতিহাস সম্বন্ধে তেমন আগ্রহ এর আগে টের পাইনি৷ শেষে একটা ওটিটি থ্রিলার সে আগ্রহটা সামান্য উস্কে দিল৷ আমি যে কোম্পানিতে কাজ করি, তাদের অফিসপাট রয়েছে শ্রীলঙ্কায়। কাজেই শ্রীলঙ্কায় কিছুদিন চাকরী করে আসা কিছু মানুষজনকে চিনি৷ কলোম্বোর জীবন সম্বন্ধে খানিক গল্পগুজবও জুড়েছি তাদের সঙ্গে কয়েকবার৷ তবে অফিস পরিসরে যা ঘটে, গল্প-আলোচনা গভীরে পৌঁছয় না৷ 

এই বইটার খোঁজ দিল আমার শ্রীলঙ্কা-বিশেষজ্ঞ বন্ধু সুহেল৷  বই জোগাড় হল। পড়াও হল৷  গোড়াতেই সহজ কথাটা বলে দেওয়া যেতে পারে। এ বই না পড়লেই নয়৷ শ্রীলঙ্কার ব্যাপারে আগ্রহী না হলেও, মানুষের মানুষামি এবং অমানুষামি সম্বন্ধে সচেতন হওয়ার জন্য এ বই প্রায় মেড-ইজি-গাইডের মত৷ ক্ষুরধার সাংবাদিকতার সঙ্গে গভীর সংবেদনশীলতা না মিশলে এমন লেখা বোধ হয় সম্ভব নয়৷ শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের নির্মম ইতিহাস পরিপাটি ভাবে সাজিয়ে দিয়েছেন সামন্থ। গোটা বইটাই উঠে এসে সাধারণ মানুষের কথায় ভর দিয়ে। সে দেশের আনাচেকানাচে ঘুরে, বহু মানুষকে বড় কাছ থেকে চিনে, তাঁদের জ্বালা-যন্ত্রণাকে পাশে থেকে অনুভব করে এই বই লিখেছেন সামন্থ৷ আর ভদ্রলোকের লেখার সবচেয়ে বড় গুণ হলো 'ব্যালেন্স'৷ টাইগার আর সিংহ; দু'দলেরই গোলমেলে দিক নিয়ে নির্দ্বিধায় আলোচনা করা হয়েছে এ বইয়ে৷ এমন একটা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে এতটা ব্যালেন্সড লেখা বেশ একটা অসাধ্যসাধন করা ব্যাপার৷ 

কিছু গা-কাঁপানো ব্যাপার সামন্থের ঈর্ষনীয় ডিটেলিংয়ের মাধ্যমে উঠে আসেঃ

- যুদ্ধের পাগলামি কাউকেই রেয়াত করেনা।

- দুর্বলের প্রতি চড়াও হওয়ার পাশবিক বাসনা মানুষের মজ্জাগত, এর অন্যথা কোনওদিন ঘটেনি, ঘটবেও না৷ আমাদের যাবতীয় ইন্টেলেক্ট আর সভ্যভব্য বাতেলার আড়ালে একটা পাশবিক মব-মেন্টালিটি লালন করে চলা ধান্দাবাজ বসে আছে৷ ধান্দাবাজিটুকুই সিভিলাইজেশন বোধ হয়; মমনমোহন মিত্তির অন্তত ঠারেঠারে তেমন কিছুই বলতে চেয়েছিলেন৷ 

- আমরা সবাই স্রেফ সুযোগের অভাবে অন্যের বুকে ছুরি বসিয়ে মুনাফা লুটছি না৷ আওয়ার ভালোমানুষি ইজ প্রবাবলি দ্য অভাব অফ সুযোগ৷

- ভেঙেচুরে যাওয়া হেরো মানুষদের ঝাড়পোছ করে সাফ করে দিতে পারাটাই ইতিহাস। (সামন্থ পেরেছেন অ-ইতিহাসটুকু নিয়ে কথা বলতে, সে'খানেই এই বই সার্থক)।

যাকগে৷ লাইক আ ট্র‍্যু ঢেঁকি ধান-ভাঙিং ইন স্বর্গ; শ্রীলঙ্কা আর বাংলার যোগাযোগ নিয়ে দু'টো ট্রিভিয়া দিই (অবশ্যই এ বই থেকে ধার করে)ঃ

প্রথমত, 
রাজপুত্র বিজয় সিংহের কথা৷ এ'টা হয়ত অনেকরই জানা৷ সাতশোজন অনুচর নিয়ে বিজয় সিংহ প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে শ্রীলঙ্কায় পৌঁছন৷ সেই বিজয় সিংহ থেকেই সিংহলদের যাত্রা শুরু৷ এ' ভদ্রলোকের বাপের রাজত্ব নাকি ছিল বাংলায়। ক'দিন আগে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন নিয়ে খানিকটা পড়েছিলাম, তিনিও এই বিজয় সিংহের লঙ্কাকাণ্ড নিয়ে ফলাও করে একটা মহাকাব্য লেখার ছক কষেছিলেন (শেষমেশ  সে লেখা অবশ্য এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি)। 

দ্বিতীয়ত,
সত্যজিতের গল্প৷ এ যোগাযোগটা একটু প্যাঁচালো তবে ব্যাপারটা বড় সুন্দর৷ বিজয় সিংহের লঙ্কা আগমনের পর হাজার দুই বছর কেটে গেছে৷ একদিন, সাংবাদিক ও কার্টুনিস্ট প্রগিথ একনালিগোডা (বানানটা বাংলায় ঠিক লিখলাম না হয়ত, ইংরেজিতে Prageeth) মন দিয়ে সত্যজিৎ রায়ের একটা স্কেচ আঁকছিলেন৷ ঘটনাচক্রে ঠিক সেই সময়ই একটা বিশেষ প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন এক এনজিওর কর্মী সন্ধ্যা। সেই প্রথম তাঁদের আলাপ৷ আলাপ থেকে বন্ধুত্ব, প্রেম, সাদামাটা বিয়ে আর প্রবল ভালোবাসার সংসার৷ প্রগিথ আর সন্ধ্যা তাঁদের প্রথম ছেলের নাম রাখা রেখেছিলেন সত্যজিৎ; নিজেদের প্রথম আলাপের কথা মনে রেখে৷ ঘটনাচক্রে,  সেই সত্যজিতের জন্মও হয়েছিল ২-মে৷

এই প্রথম ও দ্বিতীয় ঘটনাটির মাঝখানে শ্রীলঙ্কার বড় হয়ে ওঠা, বুড়িয়ে যাওয়া, এবং আর পাঁচটা দেশের মতই; বিষিয়ে যাওয়া। সরকারের না-পসন্দ কথাবার্তা নিজের আঁকা ও লেখার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছিল প্রগিথ৷ বিভিন্ন হুমকি অগ্রাহ্য করে যুদ্ধের বিরুদ্ধে লেখালিখি শুরু করেছিল সে৷ একের পর এক হুঁশিয়ারি অগ্রাহ্য করার মাশুল তাকে অবশেষে দিতে হয়৷ আচমকা একদিন কাজের শেষে আর বাড়ি ফেরা হয়না প্রগিথের৷ বাতাসে মিলিয়ে যায় সে; সরকার বিরোধী সমস্ত প্রতিবাদের যেমন দশা হওয়া উচিৎ আর কী৷ শ্রীলঙ্কার সেই সত্যজিতের বাবা আর ফেরেননি৷

লোক পোক



স্বপ্নের সিকুয়েন্স।

মেসবাড়ি। যেমন হয় আর কী। সাতপুরনো, জীর্ণ। তবে জমজমাট। 

দেওয়ালে ঝোলানো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ মনের সুখে দাড়িতে কলপ লাগাচ্ছেন। আর গুনগুন করছেন; "রিমঝিম গিরে সাওয়ান"।

পাশের চৌকিতে আধোশোয়া শিব্রাম সেই সুরের তালে ঠ্যাং নাচাচ্ছেন আর চোখ বুজে মনের মধ্যে ফাউল কাটলেটের ছবি আঁকছেন।

ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে ঘনশ্যাম দাস একটা ভারিক্কি  ডায়েরি উল্টেপাল্টে দেখে বলছেন, "এ'সব ছাইপাঁশ পাবলিশ করার তাল করছেন নাকি রবিদা"?

শিব্রামের উল্টোদিকের চৌকিতে ম্যাদা মেরে বসে আছেন এক গোবেচারা ভদ্রলোক। মুখে একরাশ বিরক্তি। 

ঘনশ্যাম দাসের প্রশ্নের উত্তর এলো না।
রবীন্দ্রনাথের গুনগুন থামল না।
শিব্রামে ততক্ষণে কাটলেট ছেড়ে রাবড়িতে গিয়ে ঠেকেছেন, ঠ্যাং নাচানো অবশ্য থামেনি।
এর পাশাপাশি  মান্ধাতা আমলের সিলিং ফ্যানের ক্যাঁচক্যাঁচর। 

সে গোবেচারা মানুষটি এ'বার হুঠ করে উঠে দাঁড়ালেন। আচমকা চেঁচিয়ে বলে উঠলেন;
"তোমাদের মত ইরেস্পন্সিবল ইয়ারদোস্ত আমি আর দেখিনি। আমি এত বড় একটা কনসার্ন শেয়ার করলাম অথচ কারুর কোনও হেলদোল নেই। এর চেয়ে ফুটপাতে শুয়ে থাকলে বরং বেশি লোকের দরদ পাওয়া যেত"।

ঘনশ্যাম দাসের ডায়েরি থেকে মুখ তুলে চাইলেন।
রবীন্দ্রনাথের গুনগুন থামল।
শিব্রামে ততক্ষণে রাবড়ি ছেড়ে  রুই কালিয়ায় পৌঁছেছেন, ঠ্যাং নাচানোও থামেনি। 

"বলি আমার প্রব্লেমটা নিয়ে কেউ কি কিছুই বলবে না"?, গোবেচারা ভদ্রলোকের মধ্যে আচমকা একটা খেপচুরিয়াস ভাব।

ঘনশ্যামবাবু এ'বার ভুরু কুঁচকে বললেন, "এমন ডিলেমায় পড়েছিলাম সে'বার ভ্ল্যাডিভস্টকে"।

"এই আবার শুরু হল", চুপসে যাওয়া বেলুনের মত ধপাস করে চৌকিতে বসে পড়লেন গোবেচারাটি, "আমার কী করা উচিৎ সে ব্যাপারে কেউ কি কিছুই বলবে না"?

ঘন কালো দাড়ির আড়াল থেকে রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলেন, "তুমি ফিরে যাও মুকুল"। 

"বলছেন ফিরব"? গোবেচারা মানুষটি যেন বুকে বল পেলেন, " লোকে আবার ট্রোল-ঠ্রোল করবে না তো"?

"লোক না পোক", শিব্রামের ঠ্যাং নাচানো ততক্ষণে থেমেছে, " আখের শুনেছি আখের রসের মতই সুমিষ্ট৷ তুমি ফেরো মুকুল। আমি অভয় দিচ্ছি। ফেরো, আর ফেরার পথে দু'ঠোঙা চপ নিয়ে ফিরো"।



বোধদয়



স্যাঁতসেঁতে একটা ঘর৷  একটা দেওয়ালে পাশাপাশি দু'টো ক্যালেন্ডার, একটা বাংলা আর একটা ইংরেজি৷ মা তারা হার্ডওয়্যার স্টোর্সের বাংলা ক্যালেন্ডারটা চার বছর পুরনো, গ্রীনপ্লাইয়ের ইংরেজিটা বছর দুই আগের৷ টিউবের আলোতেও ঘরের ঘোলাটে ভাব কাটছে না। হলুদ দেওয়ালগুলো বেশ বিবর্ণ৷ যে দেওয়ালে ক্যালেন্ডার-জোড়া ঝুলছে, তার উলটো দিকের দেওয়ালে একটা অজন্তার দেওয়াল ঘড়ি৷ ঘড়িটা বন্ধ৷ তবে সময়টা সন্ধ্যের পরেই হবে। 

সে ঘড়ির নীচেই ঘরের একমাত্র জানালা, সে'টা বন্ধ৷ জানালা ঘেঁষে রাখা একখানা টেবিল যার বয়স অন্তত আশি হওয়ার কথা৷ সে টেবিলের ওপর বইয়ের স্তুপ। আর একটা কলমদানি। আর একটা টেলিফোন। ঘরের আসবাব বলতে একটা চৌকি, আর দু'টো আলমারি৷ একটা আলমারি স্টিলের, অন্যটা কাঠের৷ কাঠের আলমারিটাও বইয়ে বোঝাই৷ 

 সেই স্টাডি টেবিলের সামনে একটা চেয়ার৷ সে চেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছেন এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক৷ মাথায় যে ক'গাছা চুল পড়ে রয়েছে তার অর্ধেকের বেশিই পাকা কিন্তু মুখ দেখলে মালুম হয় যে বয়স নিশ্চয়ই বাহান্নর বেশি নয়৷ পরণে হাফ শার্ট আর পাজামা৷ 

আচমকা৷ 
ঘরের দরজাটা ঘটাং শব্দে খুলে গেল আর ভদ্রলোকের ঝিমুনি গেল চটকে। ঘরে ঢুকল এক ছোকরা গোছের ছেলে, বয়স বাইশ চব্বিশের বেশি হবে না৷ হালকা গোঁফ, বাহারি টেরি আর তার কালো টিশার্টে একটা হলুদ বেড়ালের ছবি৷ ছোকরার হাতে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট। 

চেয়ারে বসা ভদ্রলোক খেঁকিয়ে উঠলেন।

- ঘরে ঢোকার আগে নক করতে হয় রে রাস্কেল!

- আরে মামা! তুমি এখন সে'সব ছেঁদো এটিকেটের থেকে অনেক দূরে চলে গেছ। রিল্যাক্স।

- ফের শুরু হল যত অলুক্ষুণে কথাবার্তা৷

- ট্রুথ ইস নট অলুক্ষুণে মামা৷

- যত আগডুমবাগডুম৷ কতবার বলেছি আমায় জ্বালাতে আসিস না।

- না এসে উপায় কী? তুমি এ ঘর ছেড়ে না বেরোলে আমাদের লাইটইয়ার্স ক্লাবের ঘর হিসেবে এ'টাকে ব্যবহার করব কী করে বলো। 

মামা এ'বার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ 

- এ ঘরে আমি আঠাশ বছর ধরে আছি৷ এ ঘর  আমি ছাড়তে যাব কোন দুঃখে রে হারামজাদা?

- ল্যাঙ্গুয়েজ মামা। প্লীজ। ল্যাঙ্গুয়েজ।

- দ্যাখ পটা, তোর এই বদমায়েশি আমি অনেকদিন ধরে সহ্য করছি৷ প্র‍্যাক্টিকাল জোক খানিকক্ষণ ভালো লাগে তবে এ'টা জাস্ট সমস্ত লিমিট ছাড়িয়ে যাচ্ছে৷

- আচ্ছা ঝামেলা তো। নিজে মরে ভূত হয়ে এ ঘর আটকে বসে আছ!অথচ সে'টা বললেই দোষ?

- দিব্যি বই পড়ছি, পোয়েট্রি লিখছি৷ আর তুই ব্যাটা এ ওবেলা এসে এ'সব রিউমর ছড়িয়ে যাচ্ছিস৷ আমি তোকে পুলিশে দেব।

- ছ'মাস আগেই পটল প্লাক করে ফেলেছ মামা৷ এমন ঢ্যাঁটামোর কোনও মানে হয়? 

- মহাঝ্যামেলা। দিব্যি বেঁচেবর্তে আছি৷ এই দ্যাখ, পিঠে ঘামাচিও বেরোচ্ছে।

- ও'সব তোমার মনের ভুল৷ হাবুল তান্ত্রিক এসে বারবার তোমায় রিয়ালিটিটা জানিয়ে যাচ্ছে অথচ তোমার সুবুদ্ধি উদয় হচ্ছে না৷ 

- হাবুলটা একটা ফোর টুয়েন্টি৷ ফ্রড৷ তুই জানিস এককালে সে লোক ঠকিয়ে এক জালি কোম্পানির ইন্স্যুরেন্স গছাতো মানুষকে?

- এখন হাবুলদা রিফর্মড মানুষ মামা৷ কেবল-টিভিতে বসে প্রতি অমাবস্যার রাত্রে লোককে কনসাল্ট করে৷ মেজমাসী বলে ধন্বন্তরি।  

- বুল্টিটা একটা গবেট৷ 

- মামা, আবারও বলছি। ছ'মাস হল৷ সেরিব্রাল। ম্যাসিভ৷ এ'বার এ ঘরটাকে হন্টেড করে না রেখে মানে মানে সরে পরো দেখি৷ লাইটইয়ার্স ক্লাবের ফিউচার নষ্ট করছ তুমি৷ এই ঘরটা বাগাতে পারলে আমি ক্লাবের সেক্রেটারি হব, সেটিং করা আছে।

- আরে মহামুশকিল। নিজের আখেরের জন্য জ্যান্ত মানুষকে মড়া বলবি?

- ইউ আর অনলি অ্যান আত্মা।

- দ্যাখ, ফের যদি তুই হাবুলকে এনেছিস..।

- না মামা। আমি হাবুলের চেয়েও এফেক্টিভ প্রমাণ এনেছি৷ 

- প্রমাণ? আমি মারা গেছি তার প্রমাণ? 

- অকাট্য।

লায়েক ছোকরাটি প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে একটা সাদা কাগজের বাক্স বের করে সে'টা মামার সামনে টেবিলের ওপর রাখে৷

- এ'টা কী রে?

- এ'টাই প্রমাণ। যে তুমি মৃত।

- ইয়ার্কি হচ্ছে?

- আগে বলো, সর্দি হয়েছে তোমার?

- না৷ ন্যাসাল প্যাসেজ ক্লীন৷ 

- মনের মধ্যে আচমকা ফুর্তি টের পাচ্ছ?

- নট অ্যাট অল। এ'সব কী রকমের হেঁয়ালি?

ভাগ্নে চোখ গোলগোল করে এগিয়ে এলো মামার দিকে। 

- কোনও সুবাস পাচ্ছ না মামা?

- নাথিং৷ তা'তে কী?

পি সি সরকারের মত বরফ গলানো হাসি ভাসিয়ে পটা ফের জিজ্ঞেস করলে;

- কোনও গন্ধই কি পাচ্ছ না? মনে কি কোনও আনচানই নেই?

- নেই! আরে খুলে বল না কাঁচকলা!

উত্তর না দিয়ে পটা এগিয়ে এসে সে কাগজের বাক্সের ঢাকনাটা খুলে দিল। 

বাক্সের ভিতরে তাকিয়ে থমকে গেলেন মামা। গলার স্বর বুজে এলো৷ চোখ ছলছলিয়ে উঠল৷ কাঁপতে কাঁপতে সে বাক্সের ওপর ঝুঁকে পড়লেন তিনি৷ কয়েক ফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়িয়েও ম্যাজিকের মত গায়েব হয়ে গেল। উদ্ভ্রান্তের মত মাথা নাড়তে লাগলেন তিনি। 

আর পটা বিকট ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করলে, যেন সে ঠাকুর বিসর্জনে চলেছে আর মাইকে লারেলাপ্পা গান বাজছে৷ 

খানিক পর মামাই অস্ফুটে বলে উঠলেন;

- আ...আমি..আমি বিরিয়ানির সুবাস পেলাম না?

- দ্যাট ট্যু মামা, আরসালানের বিরিয়ানি। প্যাক করিয়ে ডাইরেক্টলি নিয়ে আসছি।

- আমি বিরিয়ানির সুবাস পেলাম না!

- বিলকুল পেলে না।

- বিরিয়ানির সুবাস পেলাম না৷ মনটা আনচান করে উঠল না। বুকের মধ্যেও নো-মোচড়!

- পেলে না৷ উঠল না। মোচড়ালো না।

- আমি সত্যিই মরে গেলাম রে পটা৷ এমন এলেবেলে ভাবে? জাস্ট মরে গেলাম?

- জাস্ট মরে গেলে মামা।

- ক্লাবঘর করবি কর। বইগুলোর অযত্ন করিস না। কেমন? 

- যো হুকুম মামা৷ এ'বার এসো দেখি৷ দুগ্গা দুগ্গা!

মামার চেহারাটা আবছা হয়ে আসছিল৷ আর ও'দিকে পটা ততক্ষণে 'বলো হরি হরি বোল' ডিস্কো সুরে গাইতে গাইতে বিকট নাচ শুরু করেছে।

Sunday, June 6, 2021

মেটিয়াবুরুজের নবাব




বিরিয়ানির উল্লেখ ছাড়া ওয়াজিদ আলি শাহ, লখনৌ আর মেটিয়াবুরুজ একটা জবরদস্ত বই লিখেছেন শ্রীপান্থ। বিরিয়ানি ভক্ত হয়েও বলতে পারি সে'টা একটা প্লাস পয়েন্ট। কারণ একবার বিরিয়ানির আলোচনায় ঢুকে পড়লে বাঙালি পাঠকের ফোকাস ডকে ওঠার সম্ভাবনা।

সে'সময়ের লখনৌয়ের আড়ম্বর, তেহজিব আর বাদশাহী রসবোধ সম্বন্ধেও ধারণাটা বেশ খানিকটা স্পষ্ট হল (বলা ভালো, মাথা ঘুরে গেল)। একের পর এক ট্রিভিয়া সাজিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে শ্রীপান্থর জুড়ি মেলা ভার, এ বই সে'দিক থেকে টানটান।

তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ওয়াজিদের চরিত্র যে কতটা ইন্ট্রিগিং, তা মালুম হল। তাঁর চরিত্রের বেশ কিছুদিক নিয়ে এর আগে তেমন মাথা ঘামাইনি কখনও; যেমন শাসক ওয়াজিদ আলি কেমন ছিলেন? সত্যিই কি অপদার্থ ছিলেন নাকি কোম্পানির বদমায়েশিটাই আদত ব্যাপার? এ বই পড়ে সে'সব বিষয়ে খানিকটা জ্ঞান অর্জন করা গেল বটে। আর তৈরি হল আগ্রহ; ওয়াজিদ আলির শাহয়ের ব্যাপারে আরও বিশদে খানিকটা না পড়লেই নয়।

এ বই থেকে একটা ছোট্ট অংশ কোট করতে পারার লোভ সামলাতে পারলাম না। রইলঃ

** কোট **

১৮৫৫ সালে কিছু মোল্লার নেতৃত্বে অযোধ্যায় হনুমান মন্দিরের কাছে একটি মসজিদ গড়ার জন্য আন্দোলন শুরু হয়৷ আন্দোলনকারীদের বক্তব্য ছিল, সেখানে মাটির তলায় একটি মসজিদ চাপা পড়ে আছে৷ দাঙ্গা হাঙ্গামার উপক্রম।
...
...
(শান্তি রক্ষার জন্য) ওয়াজিদ আলির সমস্ত উদ্যোগ ব্যর্থ হল৷ ৭ নভেম্বর,  ১৮৫৫ সন। মুসলিম ধর্মযোদ্ধারা এগিয়ে চললেন  হনুমানগড়ের দিকে৷ তাঁদের মুখোমুখি দাঁড়ালো অযোধ্যার বাদশা ওয়াজিদ আলির ফৌজ। যে করে হোক হিন্দু মন্দিরের ওপর আক্রমণ প্রতিহত করতে হবে, মুসলমান শাসক এ ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। 

**

(রক্তক্ষয় ভালোই হয়েছিল, দু'পক্ষেই৷ তবে ওয়াজিদের ফৌজ রুখে দিয়েছিল সেই ধর্মযোদ্ধাদের)

Saturday, June 5, 2021

স্ক্রিউ


- কী ব্যাপার দত্ত, অমন ব্যাজার মুখে বসে যে।

- ও কিছু না৷

- আরে ভায়া! বলো না৷

- বললাম তো মন্টুদা,  অল ইজ ওয়েল।

- অল যদি ওয়েলই হবে তবে সামনে রাখা ডিমটোস্টটা ঠাণ্ডা করে কলমের মাথা চেবাচ্ছ কেন? দস্তুরের ফাইল খুলে রেখে ফ্যাফ্যা করে জানালার দিকে চেয়ে আছ কেন? বলে ফেলো ভায়া৷ কল্যিগ হিসেবে আমার একটা রেস্পন্সিবিলিটি আছে তো। বলেই ফেলো৷ 

- বেশ৷ বলেই ফেলি৷ 

- ডিমটোস্টটা ওয়েস্ট করা ঠিক হবে?

- আপনিই খেয়ে নিন বরং৷ টাচ করিনি৷ মুখ বিস্বাদ হয়ে আছে৷ 

- বেশ৷ তা, বলো৷ হয়েছেটা কী।

- বাপের ওপর বড় রাগ হচ্ছে মন্টুদা।

-  সে কী! হঠাৎ? উনি তো বোধ হয় গত বছরই..।

- গত হয়েছেন। রাইট৷ এবং বিদেয় নেওয়ার আগে আমার জন্য টাকার গদি বিছিয়ে যাননি৷ কলকাতার বুকে দু'টো বাড়ি তিনটে ফ্ল্যাট রেখে যাননি। 

- ডিমটোস্টের কসম ভায়া৷ তোমার রাগের ডিরেকশনটা ঠিক ধরতে পারছি না..।

- বাবা যদি টাকার গদিতে বসিয়ে যেতেন তা'হলে বড়সাহেবের জোরজুলুম এমন নিশ্চুপ ভাবে হজম করতে হত না৷ মুখের ওপর একটা কড়া রেসিগনেশন ছুঁড়ে ভ্যাকেশনে বেরিয়ে পড়তাম মন শান্ত করতে। কোনও হিমালয়ান রিট্রীটে বসে পাইপের ডাঁটি চিবুতে চিবুতে পিয়ানো শুনতাম আর বলতাম, "আই ডোন্ট গিভ আ ড্যাম"।

- ওহ, রাগ তা'হলে বাপের ওপর নয়৷

- একশোবার বাপের উপর৷ টাকার গদিটা রেখে না যাওয়া ছাড়াও বহুবিধ কুকর্ম তিনি করে গেছেন।

- যেমন?

- টনটনে আত্মসম্মান বোধ আর তার পাশাপাশি সব হারানোর ভয় রক্তে ট্রান্সফার করে দিয়ে গেছেন৷ মনের মধ্যে প্রিন্সিপাল আর মর‍্যালিটির বাতিক ইঞ্জেক্ট করে করে এক্কেবারে নাম্বার ওয়ান নেকুমাল বানিয়ে ফেলে রেখে গেছেন৷ কাজেই রাগটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট তাঁর ওপরই৷

- বড়সাহেব খেপচুরিয়াস হলেন কেন বলো দেখি? অবশ্য প্রশ্নটা ভুল হল৷ খেপচুরিয়াস ব্যাপারটাই ওর নর্মাল স্টেট৷ তা আজ হয়েছেটা কী?

- হবে আবার কী। বড়সাহেব ফোন করেছেন৷ ও'দিকে আমি দস্তুরের ফাইল রিকনসাইল করার জন্য ম্যাক্সিমাম কনসেন্ট্রেশনে কাজ করব বলে ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছি৷ তিনবার রিং বেজে গেছে, আমি দস্তুরে দস্তুরমত ডুবে৷ ব্যাস, বস সে'টাকে অ্যানার্কি বলে ধরে নিয়েছেন৷ অতঃপর রেগে আগুন হয়ে তিনি আমার টেবিলের সামনে এসে বলে গেছেন, "আই উইল থ্রো ইউ আউট অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট অ্যান্ড পুট ইউ ইন আ হেল হোল৷ অ্যান্ড দেন আই উইল স্ক্রিউ ইউর কেরিয়ার"।

- বটে। স্ক্রিউ করবে বলেছে? ডিক্লেয়ার করেছে?

- তিরিশ সেকেন্ডের জন্য মনে হল যাই - হাইক্লাস ইংরিজি ঝেড়ে একটা গা কাঁপানো রেসিগনেশনের চিঠি লিখি আনি৷ কিন্তু ওই৷ ছেলের ফিউচার, নতুন ফ্ল্যাটের ইএমআই, বাপের গছানো নার্ভাসনেস; সব মিলে বুঝলাম যে জুতোর হাজার ঘা হজম করতে হলেও, স্যালারির গোদানটা রিফিউজ করার ধক আমার নেই৷ 

- মনখারাপ ভায়া?

- নিজেকে মিনিমাম বাহাত্তরটা চড় মারার ইচ্ছেটাকে মনখারাপ বলা চলে কিনা জানিনা।

- হায়্যারার্কিতে না হই, তোমার চেয়ে আমি বয়সে বড় তো বটেই৷ তাই সাহস করে একটা বাজে জ্ঞান দিয়ে যাই৷ কেমন?

- ইরশাদ।

- কেরিয়ার স্ক্রিউ করাটা বড়সাহেবের হাতে৷ হক কথা৷ কিন্তু দত্ত, এই মুখের সামনে রাখা ডিমটোস্ট বিস্বাদ করে দেওয়ার ক্ষমতাটা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছ কি মরেছ৷ 

- আপনিও লেগপুল করবেন মন্টুদা?

- বাপের জন্য মনকেমন করা খোকার লেগপুল করার আগে যেন আমি নরকের কড়াইতে বসে নিমপাতার পোলাও খাই হে দত্ত৷ শোনো, লোকজনকে দুরমুশ করে কেরিয়ার বাগানোটা কর্পোরেটে জগতে নতুন নয়। আর তেমন গুঁতোগুঁতি করে ভাবে বসের চেয়ারবাগানো মানুষের ইগো পোল্ট্রির ডিমের খোসার চেয়েও পাতলা। তারা পাওয়ার বলতে বোঝে 'কেরিয়ার স্ক্রু করে দেওয়া'৷ লেট মি টেল ইউ দত্ত, দে ডোন্ট উইন বাই স্ক্রুইং ইওর কেরিয়ার৷ বাট দে ডু উইন বাই রুইনিং ইওর ডিমপাউরুটিস; ইয়ে, ডিমপাউরুটিটা একটা মেটাফর। অবভিয়াসলি৷ প্রমোশন যায় যাক, ওই ডিমরুটি আর ঠাণ্ডা হতে দিও না ভায়া৷ আর যাই হোক, ওই গাম্বাট-বুদ্ধি বসদের অত সহজে জিততে দেওয়ার কোনও মানেই হয় না। 

- আর একটা ডিমটোস্ট অর্ডার করব তা'হলে বলছেন?

- বেড়ে বানিয়েছিল কিন্তু৷ আরও দু'প্লেট বলে দাও বরং৷