Friday, May 14, 2021

একা নই

দেখাসাক্ষাৎ তো দূরের কথা, বহু বছর সে ব্যাটাচ্ছেলের সঙ্গে কথাবার্তাই নেই। ' আউট অফ দি  ব্লু' সে বন্ধুটির ফোন পেয়ে চমকে গেছিলাম।

এদ্দিন পর? 
কী ব্যাপার?

প্রথমত, মতলবটা কী?
"মতলব" শব্দটা বাংলায় ব্যবহৃত হলে ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে৷ মনে একটানা যে'সব জিলিপির প্যাঁচ জেনারেট হয়ে চলেছে, সে'সব মূলত মতলব-সন্ধানি, সন্দিগ্ধ৷ বস মিষ্টি হেসে কথা বললেন কেন? নিশ্চয়ই কোনও মতলব আছে৷ দোকানি অমায়িক সুরে গল্প জুড়লেন কেন? নিশ্চয়ই ওজনে কম দেওয়ার মতলব৷

দ্বিতীয়ত,আশঙ্কা৷
অসহায় হতচ্ছাড়া গলা-টেপা আশঙ্কা৷ এ'সময়ে যে'টা   করোনার চেয়েও দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে৷ আবার কি কেউ চলে গেল? দড়াম করে শুনব কোনও সুস্থ সবল সুপরিচিত মানুষ আর নেই? হুঠ করে মনে পড়বে শেষবারের দেখা হওয়াটা? এ তো এখন দৈনিক ড্রিল; এক আত্মীয় ফোন করে জানাচ্ছেন অন্য আত্মীয়ের চলে যাওয়া, এক বন্ধু জানাচ্ছে অন্য বন্ধুর ব্যাপারে কোনও দুঃসংবাদ অথবা কোনও সহকর্মী জানাচ্ছেন যে শত চেষ্টা করেও আর এক সহকর্মীকে টিকিয়ে রাখা গেল না৷

কিন্তু, এই বন্ধুটি  ফোন তোলা মাত্রই সপাটে জিজ্ঞেস করলে;
"সাবধানে আছিস তো? 
তুই কি এখনও বরফ ঠাণ্ডা জলে স্নান করিস ভাই?
গোলমেলে সময় বুঝলি; বুকে ঠাণ্ডা বসলেই গোলমাল। বি কেয়ারফুল"।

অযাচিত ভূমিকা নেই,
ইতস্ততভাব নেই।
সোজা সহজ সুরে, "সাবধানে আছিস তো"?
যেন মাঝের কথা-না-বলা বছরগুলো ছিলই না। 

নাহ্, আমরা একা নই।

Sunday, May 2, 2021

রাজার মেলা

- এই যে! মন্ত্রী! 

- আজ্ঞে, হুকুম করুন রাজামশাই।

- শুনেছি দেশের লোকের নাকি বড় কষ্ট?

- তা ওলাউঠা না কী একটা রোগ ছড়িয়েছে বটে৷ গাঁয়ে গাঁয়ে মড়ক৷ 

- মড়ক? তা'বলে আবার চড়কের মেলাটা বানচাল হবে না তো?

- সে কী কথা রাজন! পরশু যে সে মেলার উদ্বোধন! আপনি ফিতে কাটবেন৷ পায়রা ওড়াবেন৷ মেঠাই বিলি করবেন৷ 

- বেশ বেশ বেশ৷ তা ওই কাঙাল ভোজনের ব্যাপারটা রেখেছ তো? চাষাভুষোর ব্যাটাগুলোর প্রতি আমার বড় মায়া৷ 

- আজ্ঞে, ওলাউঠায় লোকে একটু হয়রান। এর মধ্যে ওরা পাত পেড়ে খেতে চাইবে কি?

- কেন চাইবে না? সারাদিন খালি রোগ, মহামারী,  মড়ক নিয়ে কান্নাকাটি করলে হবে? একটু পজিটিভিটি চাই যে৷ 

- তবু...কাঙালিভোজনের জন্য যদি যথেষ্ট কাঙাল না জোটে?

- তবে শালাগুলোকে টেনেহিঁচড়ে এনে বসানো চাই৷ রাজা নিজে খাওয়াতে চাইছে, খাবে না মানে? ওদের বাপ খাবে। শোনো মন্ত্রী৷ প্রচার চাই। বিশ্বের সেরা কাঙালি ভোজন করিয়েছে রাজা; এ খবর লোকের মুখেমুখে ঘোরা চাই৷ 

- যেয়াজ্ঞে রাজন৷ রাজ্যের সব দেওয়াল জুড়ে লেখা হবে৷ ইস্কুলে পড়ানো হবে৷ দোরে দোরে গিয়ে বোঝানো হবে। আর ইয়ে, নেহাৎ কেউ বুঝতে না চাইলে তাকে দু'ঘা দেওয়া হবে৷ 

- তোফা! আর শোনো হে, প্রথম কাঙালির পাতে খিচুড়িটা আমি দেব৷ নিজের হাতে৷ তা দেখে লোকে ধন্য ধন্য করবে৷ 

- রাজা দয়ার সাগর৷ তাই হবে৷ 

- তবে শোনো, মন্ত্রী৷ মহামারীর মধ্যে আবার যেন ওই ছোটলোকগুলোকে আমার ছুঁতে না হয়৷ 

- তাই হবে৷ 

- বেশ বেশ৷ তা, যা জিজ্ঞেস করার জন্য তোমায় ডেকেছিলাম৷ দেশের লোকজন নাকি কষ্টে আছে?

- ওই যে৷ মহামারী৷ মড়ক। আর নিন্দুকে যা বলে আর কী৷ ডাক্তার বদ্যি কম, চিকিৎসে হচ্ছে না৷ এদের হাজার রকমের বায়নাক্কা।

- শালা অকৃতজ্ঞের দল। আরে জন্মিলে টেঁসিতে হবে, অমর কে কোথা কবে; এ তো শাস্ত্রের কথা৷ দু'চারজন লোক না হয় টপাটপ মরলই বা৷ আগামীকাল না মরে আজ মরল না হয়৷ তা'তে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হল শুনি? আর এ'দিকে এই যে এত্তবড় মেলার আয়োজন করছি, তার কি কোনও দাম নেই? 

- কুকুরের দল মহারাজ৷ কুকুরের দল৷ ওরা কি আর ঘিয়ের মর্ম বুঝবে? ওদের সেই একই ঘ্যানঘ্যান। ওষুধ দাও রে, পথ্য দাও রে৷ 

- যত হাড়বজ্জাত প্রজা জুটেছে আমার কপালে! 

- সত্যিই মহারাজ৷ সত্যিই। 

Sunday, April 11, 2021

ওই মেজদাদা


- এই যে, চাঁদু৷ ইদিকে এসো দেখি মাল৷ 

- আমায় ডাকছেন? 

- ওরে আমার নেকুচাঁদ হুশিয়ার রে৷ রাস্তায় এখন আর আছেটা কে। আয় দেখি ইদিকে। 

- কী ব্যাপার দাদা?

- ওরে আমার সোন্টুমনা রে৷ "কী ব্যাপার দাদা"! ভোম্বলমণি আমার৷ তা বাবু, এই ভরদুপুরে এ পাড়ায় ঘুরঘুর করছ কেন? তুমি তো এলাকার ছেলে নও। 

- ইয়ে, আসলে..।

- আসল নকল আবার কী৷ এ পাড়ায় কী মতলবে সোনা?

- না মানে, ওই একটা দরকারে এসেছিলাম..।

- কী দরকারে?

- থাক। তেমন কিছু নয় স্যার৷ এই আমি চলে যাচ্ছি। 

- চলে যাবি?

- এই এখুনি। আসি?

- নাহ্৷ অত তাড়া কীসের৷ দাঁড়া, আগে একটু আপ্যায়ন করি৷ 

- না না। ও'সব পরে কোনওদিন হবে'খন৷ আমি বরং আজ আসি৷ হঠাৎ একটা জরুরী কাজ মনে পড়ে গেছে৷ ভালো থাকবেন, কেমন? আর ওয়েদার চেঞ্জের সময়৷ জামার বোতামগুলো খোলা রাখবেন না প্লীজ, চট করে বুকে ঠাণ্ডা বসে যেতে পারে৷ ঠিক আছে? আজ আসি৷ 

- শোনো ভাই ভিজেবেড়ালকুমার৷ ফের যদি এ পাড়ায় দেখি, তা'হলে একটা ঠ্যাং খুলে সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসেব রেখে নেব৷ 

- আমি..আমি..আমি..।

- নেকুপুষুসুন্টুনিমুন্টুনি..কথাটা মনে থাকবে? 

- আ..আ..আ..।

- রোজ তুমি দত্তবাড়ির সামনে গিয়ে ঘুরঘুর করবে৷ আর রঞ্জনা বারন্দায় এসে তোমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসবে, সে'টা আমি সহ্য করব না। 

- আর করব না স্যার। 

- শোন শালা। আমি রঞ্জুর মেজদাদা। তোর জন্য দুপুরে রঞ্জুর দুপুরের ঘুম বন্ধ হয়ে গেছে৷ তা'তে ওর স্কিনের গ্লেজ নষ্ট হচ্ছে, জানিস?

- আমি আর ও'মুখো হব  না স্যার, শুধু আমার কলারটা যদি রিলিজ করে দেন..।

- কলার বোন খুলে নিচ্ছি না এই তোর বাপের ভাগ্যি৷ 

- থ্যাঙ্কিউ স্যার৷ থ্যাঙ্কিউ৷ গ্রেটফুল টু ইউ৷ 

- শোন৷ আজ শুধু সাইকেলের চাকার হাওয়া খুলে ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু ফের যদি এ'পাড়ায় দেখি..তবে..।

- ঠ্যাং৷ ঠ্যাং খুলে নিয়ে নেবেন। 

- মনে রাখিস, আমি এ পাড়ার আর্সের প্রেসিডেন্ট৷

- আর্স? আর্স মানে তো..ইয়ে..ওই..আর্স মানে তো পশ্চাদ্দেশ..।

- কী? তবে রে রাস্কেল! দেব তোর পশ্চাদ্দেশে ছাপ মেরে?  আর্স হচ্ছে শর্ট ফর্ম৷ এ আর এস-য়ের৷ অ্যান্টি রোমিও স্কোয়্যাড৷ আমি এ পাড়ার স্কোয়্যাডের প্রেসিডেন্ট। কাজেই আমার সামনে মুখ সামলে। একদম ওপর-চালাকি নয়৷ 

- সরি স্যার৷ আমি জানতাম না৷ এ ভুল আর হবে না৷ 

- একদিন সব্বাই জানবে৷ জানবেই৷ জয় হিন্দ৷ 

- জয় হিন্দ৷ 

- এ'বার এসো চাঁদ৷ এসো।

Sunday, April 4, 2021

খবরটবর


- এ কী! এ'সব কী দেখাচ্ছে মামা?

- খবর পড়ছে। 

- খবর? ও'টা খবর পড়া?

- লেট নাইনটিন এইটিজ তো। তখন এ'টাই ছিল স্টাইল৷

- তুমি শিওর মামা? এ'টা খবরই পড়ছে?

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট। একসময় নিজের চোখে দেখেছি এ'সব৷

- নাহ্৷ কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে৷ 

- স্পষ্ট শুনছিস তো৷ রয়েসয়ে খবরাখবর পড়ে জানাচ্ছে। 

- এমন নিরামিষ মোডে?

- সে'সব গোলমেলে সময় ছিল রে ভাগ্নে৷ পাতে তখন আমিষ থাকলে কেউ গাঁইগুঁই করত না, অথচ খবরে টোটাল নিরামিষ। 

- স্ট্রেঞ্জ। রীতিমত অ্যানার্কি তো!

- টোটাল৷ 

- এ'টা কোনও খবর পড়া হল? প্যানেলিস্ট কই?

- নেই৷ শুধু নিউজরীডার।

- লে হালুয়া৷ তা'হলে ঝগড়া-খামচাখামচি করবে কারা?

- ও'সব ছিল না রে ভাগ্নে৷ স্রেফ ম্যাদা মেরে যাওয়া সুরে খবর পড়ে যাওয়া৷ 

- প্যানেলিস্ট না থাকলে, সঞ্চালক চেল্লাবে কার ওপর? চেল্লানো না হলে খবরটা স্মুদলি পরিবেশিত হবে কী করে! আউটরেজাস৷ আর মামা, সঞ্চালক রেগেমেগে কথা বলছে না কেন? 

- কী আর বলব রে, সে'সব প্রিহিস্টোরিক এরা। ম্যাড়মেড়ে খবর পড়াই তখন রীতি৷ আদত ইভোলিউশন হল তো তার পরে৷ মিউমিউ খবরের ঘুমপাড়ানি কাটাতে এলো অ্যাকশন-প্যাকড, ঝগড়ায় ভরপুর- রগরগে মেগাসিরিয়াল। আর সে মেগাসিরিয়ালকে ডেসিবেল-মাত দিয়ে তৈরি হলো আধুনিক নিউজরুম। 

- থ্যাঙ্কগড, দ্য এজ অফ ঘ্যানঘ্যানানি-নিউজ ইজ ওভার! 

- থ্যাঙ্কগড, কলারটানাটানি কালচার ইজ দ্য নিউনর্মাল! 

**

(মূল ছবিটা @IndiaHistoryPic ট্যুইটার হ্যান্ডেল থেকে পাওয়া)।

ইয়ের ইয়ে


সে যাকে বলে এক প্রি-হিস্টোরিক সন্ধ্যে৷
মগজ মাঝেমধ্যে স্মৃতির অ্যালবামে  ব্যাকগ্রাউন্ড-স্কোর জুড়ে দেয়, এ ক্ষেত্রে যেমন জুড়েছে পান্নালালের শীতলপাটি মার্কা গুনগুন - "যেথা আছে শুধু ভালোবাসাবাসি, সেথা যেতে প্রাণ চায় মা"। 

সে'দিন৷ ঘাসের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে, দু'চারজন বন্ধুর সঙ্গে বেশ রগরগে পলিটিকাল আড্ডা জমেছিল। সে ঘাসের গন্ধের সঙ্গে বিকেলের ফিনফিনে হাওয়া আর কাগুজে কাপের কফির সুবাস মিলেমিশে মনের মধ্যে আলসেমির এক প্রকাণ্ড ডাইনোসর তৈরী হয়েছে৷ 

দুম করে, গা-জোয়ারী গল্প-আড্ডা-তর্কাতর্কি থামিয়ে, পাশে বসা এক বন্ধু হঠাৎ বলে উঠেছিল "কলকাতা আমরা নিয়ে যতই গজরগজর করি, শহরটার মধ্যে বেশ আলাদাই একটা ইয়ে  আছে, তাই না রে ভাই"? এদ্দিন পর হঠাৎ সেই ইয়ের উল্লেখ মনে পড়ায় বুকের মধ্যে বেশ একটু মনোরম ইয়ে তৈরি হল। পাশাপাশি মনকেমন৷ 

প্রতিটি শহর, গাঁ, পাড়া, গলি, পার্কের বেঞ্চি, ঘাটের সিঁড়ি বা ছাতের কোণেরই একটা নিজস্ব ইয়ে রয়েছে, সম্ভহবত।  সে ইয়ের নাগাল একবার পেলেই ভালোবাসিয়েরা বর্তে যান, বরফিস্টরা গলে হদ্দ হয়ে বয়ে যান, পাথুরিয়াঘাটা-মুখো মিনিবাস কুসুমুপুরে এসে জিরোয়৷ সে ইয়ে স্পর্শ করতে পারলেই এস্পারওস্পার৷