Thursday, March 25, 2021

গানের দাওয়াই


- এই যে৷ স্যার! শুনেছেন কী? ওরা গান গাইছে৷

- বাহ্৷ বাহ্৷ কদ্দিন গজল-টজল শুনিনা ভাই সেক্রেটারি৷

- আরে! আপনার এগেইন্সটে গান গাইছে৷ সং অফ প্রটেস্ট!

- তা'তে কী?

- আপনার লেগপুল করে গান গাইছে যে!

- তা'তেই বা কী? 

- আরে! আরে আপনাকে ইনসাল্ট করে গান বেঁধেছে!

- এই সেরেছে! তুমি কি নিশ্চিত সেক্রেটারি?  ও গানে আমায় ইনসাল্ট করা হচ্ছে?

- রীতিমতো জুতো মারা হচ্ছে৷ এর একটা বিহিত না করলে আপনার নাকের ডগায় ফোস্কা পড়বে৷ 

- আরে সামান্য গানই তো গেয়েছে৷ সৈন্যসামন্ত তো জড়ো করেনি৷ তুমি বড় খামোখা চিন্তা করো সেক্রেটারি। 

- দেখুন স্যার৷ বন্দুক চালালে কামান দাগা যায়৷ তর্ক জুড়লে খিস্তি করা যায়৷  কুস্তি করলে লেঙ্গি মারা যায়৷ কিন্তু গান গাইলে মহামুশকিল মাল্টিপ্লাইড বাই কেলোর কীর্তি৷ কলার টেনে মানুষের পিলে চমকানো যায়, সুর ভোলানো মুশকিল৷ 

- গান কী ডেঞ্জারাস ভাই সেক্রেটারি! 

- টোটাল বিষ!

- তবে? উপায়? কানটান মুলেটুলে যদি...?

- এ কী ক্লাস-পালানো ছেলেছোকরা পেয়েছেন? 

- ছেলেপিলে লেলিয়ে ওদের হারমোনিয়াম সরিয়ে নেওয়া যায় যদি? 

- কাঁচকলা হবে৷ একজনের হারমোনিয়াম কাড়লে দশজন বাক্স বাজিয়ে গান জুড়বে৷ শেষে পাড়ার জলসা রুখতে গিয়ে ডোভারলেন বসে যাবে৷ 

- টেরিফিক ক্যালামিটি৷ তা'হলে কী হবে হে? মগজধোলাই যন্ত্র?

- ধ্যাত্তেরি৷ ও'সব মান্ধাতা আমলের জিনিস আপনার গ্রেট-গ্রেট-গেট গ্র‍্যান্ডফাদারের আমলে চলত স্যার৷ ও'সব প্রিহিস্টরিক কন্সেপ্ট শুনে লোকে ফিকফিক করে হাসবে৷  

- তা'হলে কি কোনও উপায়ই নেই ভাই সেক্রেটারি?

- উপায়? উপায় আছে৷ 

- আছে? মাইরি?

- আলবাত আছে৷ ওরা নতুন নতুন গান বাঁধবে, আর আমরা নিত্যনতুন নিউজচ্যানেল খুলব! 

- নিউজচ্যানেল?

- ওদের তৈরি গানের ভাইরাসকে কাবু করার একমাত্র ভ্যাক্সিন - আমাদের তৈরি নিউজ৷ পারমিশন দিন স্যার, একটা নতুন নিউজচ্যানেল আর চারটে নতুন নিউজপোর্টাল শুরু করি৷

- এইত্তো চাই৷ এতেই তো ইকনমিক প্রগ্রেস ভাই সেক্রেটারি! সাবাশ! সাবাশ!

- থ্যাঙ্কিউ স্যার৷ থ্যাঙ্কিউ। 

মনখারাপিস্ট বনাম মামলেটিয়ে


মনখারাপ জমাট বাঁধলে সে এসে পিঠে হাত রেখে বলবে, "যত্ন করে জোড়া ডিমের মামলেট ভেজেছি ভাই৷ এসো, ব্যালকনিতে বসে খাবে"।

আমি মুখভার করে বলব "এই অসময়ে আবার মামলেটের কী দরকার"!

সে বলবে, "অসময়েই তো আমরা গীতবিতান হাতড়ে মরি৷ অসময়েই তো আমরা বাউল শুনে আঁকুপাঁকু করি৷ অসময়েই তো মনের শ্যামল মিত্র ভ্যাক্সিনের প্রয়োজন হয় ভায়া৷ সুসময়ে তো নিউজচ্যানেলকেও রাগসঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা যায়৷ এই ডিমভাজা তো সুসময়ের অমলেট নয়, বরং দুঃসময়ের মামলেট৷ তোমার জন্য সময়টা গোলমেলে বলেই তো এমন যত্ন করে ফার্স্টক্লাস ডিম ভেজে আনলাম"৷

গড়িমসি করে মামলেটের প্লেটখানা হাতে নিয়ে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে যাব৷ মোড়ায় বসে ইতিউতি চামচ চালিয়ে মামলেটে কাটাকুটি শুরু করব।

মুখে দু'এক টুকরো ডিমভাজা পড়তেই গায়েমুখে মিঠে হাওয়া এসে ঠেকবে৷ তখন সে শুধোবে, " কী ভায়া, কেমন"?

আমি তৃপ্তি চেপেচুপে রেখে দায়সারাভাবে মাথা নাড়ব৷ 

সে বলবে, "এ'বার একটু বিভূতিভূষণ রিসাইট করব"।

আমি মৃদুকণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়ে বলব, "তার আবার কী দরকার"!

সে বলবে, " ভায়া, কলকাতায় বইমেলার কী দরকার? মহাভারতে কেষ্টরই বা কী দরকার ছিল? এ'সব প্রশ্ন করতে নেই হে৷ করতে নেই৷ বিভূতিভূষণের আবার দরকার-অদরকার কী৷ সাপ্লাই যত বাড়বে, মার্জিনাল ইউটিলিটি তত লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরের দিকে যাবে৷ 

তারপর ক্রমশ টের পাব যে মামলেটে-বিভূতিভূষণে মন তরতাজা হয়ে উঠছে৷ মনের ঘোলাটে ভাব কেটে যাচ্ছে৷ বুকের মধ্যে দিব্যি হাতেগরম ভালোলাগা তৈরি হচ্ছে৷ 

দু'চার পাতা আরণ্যক পড়ার পর সে কাছে এসে বলবে, "মন কেমন এখন ভায়া"? ততক্ষণে আমার মুখে দিব্যি আলো-আলো হাসি - মান-অভিমান গায়েব, খিটখিট ভ্যানিশ। 

সে বলবে, "এ'বার তা'হলে আসি ভাই? পরেরবার তোমার মনখারাপের ঘুমের স্বপ্নে এসে লুচি-আলুভাজা খাইয়ে যাব৷ আর বিভূতিভূষণের বদলে পূর্ণেন্দু পত্রী৷ কেমন"?

সেই আশ্বাস দিয়ে, স্বপ্নের সেই  অমায়িক ডিম-ভাজিয়ে আমিটি কেটে পড়বে৷  মনখারাপ-কেটে বেরিয়ে আসা যে আমি পড়ে থাকব, তার মনের মধ্যে "মন্দ কী আর৷ ভেসে যাইনি তো এখনও"-মার্কা সুবাতাস।  

Saturday, March 20, 2021

গোলেমালে

চারপাশের সমস্ত কিছু কেমন যেন স্বপ্নের মত ঠেকছিল। কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না৷ কল্পলোক না কী যেন বলে? তেমনই কিছু একটা যেন৷ উপযুক্ত ইমোজির অভাবে নিজের মনের অস্থির অবস্থাটা সঠিকভাবে কাউকে বুঝিয়ে উঠতেও পারছিলাম না৷ 

চারপাশটা মন দিয়ে দেখেশুনে স্তম্ভিত হতেই হলো - এ যে কোয়াড এইচ-ডি ডিস্প্লেকেও হার মানাচ্ছে৷ সবকিছুই কী  স্পষ্ট, যেন চাইলেই ছুঁতে পারব৷ ওই দেখো, সত্যিই ছুঁতে পারছিলামও৷ বালিশের ওয়াড়, বিছানার চাদর, খাটের পাশের টেবিলের ওপর ওপরে সাজানো ফুলদানি - হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে৷ ও মা, সে ফুলদানিতে আবার রজনীগন্ধা- রীতমত ছোঁয়া যায়, সে মিষ্টি সুবাসও নাকে আসছে বইকি। কিন্তু ছুঁলে কোন কাঁচকলাটা হবে? ফুলদানি বা রজনীগন্ধা কোনওটাই তো পিঞ্চ-টু-জুম করা যাচ্ছিল না। অস্বস্তিটা ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছিল৷ 

এমন সময় পাশের ঘর থেকে খোকা দুদ্দাড় করে ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরল৷ আমার আদরের খোকা, দেখেই বড় সাধ করল লাভ্ রিয়্যাকশন দিতে। ও মা, সে উপায়ও নেই৷ বাধ্য হয়ে রসকষহীন একখানা চুমু বসিয়ে দিতে হল খোকার গালে৷ এরপর গজরগজর করতে করতে ঘরে এসে ঢুকলো বউ। সে আবার আর এক সমস্যা- চারপাশ হাতড়েও মিউট করার কোনও বোতাম খুঁজে পেলাম না৷ অগত্যা ওর দিকে তাকিয়ে দু'টো কথা বলতে হলো৷ পিং-য়ের বদলে 'ওগো হ্যাঁগো' - এক্কেবারে ক্যালামিটি যাকে বলে৷ ওর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আবার অস্বস্তিটা দ্বিগুণ হল, টের পেলাম যে ইন্সট্যা-ফিল্টার ছাড়া একে-অপরের মুখ আমরা বহুদিন পর দেখছি। গোড়ার দিকে তো বলতে যাচ্ছিলাম "নাইস ডিপি, কখন চেঞ্জ করলে"? কিন্তু শেষ মুহূর্তে সামলে নিলাম! 

ক্রমশ কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠছিল৷ খানিকক্ষণ লগ আউট বোতাম খুঁজলাম কিন্তু তারপর মাথায় এলো অ-স্ক্রিন দুনিয়ার এই এক বিশ্রী সমস্যা - লগঅফ সাইনআউটের কোনও সুযোগ নেই৷ দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম৷ চেনা পৃথিবীটা ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল৷ ওই ভাবে আর আধঘণ্টা থাকতে হলেই নিজেকে ফর্ম্যাট করে ফেলতে হত। তবে বিশ্রী কোনও গোলমাল ঘটার আগেই ডাউন হওয়া হোয়্যাটস্যাপ, ফেসবুক আর ইন্সট্যাগ্রাম সচল হল৷ জটিল ভাষায় বলতে গেলে - ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল৷ সহজভাবে বললে - ফিলিং রিলীভড উইথ বৌ, খোকা অ্যান্ড আ বিলিয়ন আদার্স৷

Tuesday, March 16, 2021

সুমন আর দাদু

আমি আর দাদু একসঙ্গে সুমন আবিষ্কার করেছিলাম৷ বন্ধুর থেকে ধার করা ক্যাসেটে - "ইচ্ছে হল"। তখন সবে ক্লাস টেনের বোর্ড পরীক্ষা শুরু হয়েছে৷ দুপুরের দিকে পরীক্ষা, তাই সকাল থেকেই বুক ধড়ফড়, গা-কাঁপুনি৷ গোটা বছর মন দিয়ে পড়াশোনা না করার বিশ্রী গ্লানি। সে অস্বস্তি কাটাতে ভরসা ছিল ফিলিপ্সের টেপ-রেকর্ডার আর দাদুর 'আরে এগজামই তো, হাতিঘোড়া-বজরাপানসি তো নয়' মার্কা হাসি৷ 

সেই সকালগুলোর স্মৃতি ফিকে হওয়ার নয়৷
সুমনের সুরে দাদু মাথা দুলিয়ে চলেছে, হাঁটুতে তাল ঠুকছে, আর 'বাহ্ বাহ্' বলে বিড়বিড় করে চলেছে৷ একদিকে অধরা সিলেবাস মনের কলার টেনে ধরছে আর অন্যদিকে সুমনের বাঁশুরিয়াদাদা বুকের মধ্যে ঢুকে ঝাড়পোছ শুরু করে দিয়েছে৷ মা হাঁকডাক শুরু করেছে স্নানে যাওয়ার জন্য, পরীক্ষার জন্য সময়মত না বেরোলেই নয়৷ কিন্তু ক্যাসেটের সেই দাপুটে সুমন থামছেন না। খাটের এককোণে সুমনাপ্লুত দাদু, ডায়াগোনালি অন্যকোণে আমি৷ মাঝে অদরকারী কিছু বইখাতা৷ 

দাদু মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে বলছে, "সবজিওয়ালা বন্ধু তো বটেই৷ এই সুন্দর সেন্টিমেন্টটা নিয়ে আমরা আগে গান বাঁধিনি বা শুনিনি কেন বলো দেখি ভাই"? অরুণ মিত্রের উঠে দাঁড়ানোর অ্যাডভেঞ্চার শুনে দাদুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে - সেই ঔজ্জ্বল্যে ভর দিয়েই আমার সুমন-ভালোবাসার দিকে এগিয়ে যাওয়া৷ 

দাদুর চলে যাওয়া বছর সাতেক আগে, মার্চের এই ১৬ তারিখেই।
সুমনের গান কখনও কোত্থাও যাবে না, সে'টাই বাঁচোয়া৷ 

শুভ জন্মদিন, সুমন৷

Monday, March 1, 2021

এমন একটা সোমবার


সহকর্মী মিহি সুরে ডেকে বলবেন, "ভাই, তোমার জন্য আজ পান্তুয়া এনেছি, বাড়িতে বানানো৷ তোমার বৌদির স্পেশ্যালিটি৷ লাঞ্চের পর আমার টেবিলে একবার আসা চাই কিন্তু"।
বস পিঠ চাপড়ে বলবেন, " গত হপ্তায় তো রোজই দেরী করে বেরিয়েছ৷ আমার নজর এড়ায়নি কিন্তু৷ শোনো, আজ বিকেলে চটপট বেরোবে৷ আরে বাবা যন্ত্র তো নও, মানুষ তো! আর শোনো, সবসময় অমন গোমড়াথেরিয়াম হয়ে ঘুরে বেড়াও কেন বলো তো? একটা হোমওয়ার্ক দিলাম, রোজ রাতে শোওয়ার আগে মিনিমাম আধঘণ্টা তারাপদ পড়বে, কেমন"?
লাঞ্চের সময় টিফিন খুলে মন-প্রাণ-বুক রোববার দুপুরে রাঁধা বাসি বিরিয়ানির সুবাসে আচ্ছন্ন হবে৷
হঠাৎ কোনও ক্লায়েন্ট ফোন করে বলবেন,"রোজই তো কোনও না কোনও কম্পলেন নিয়ে ফোন করি৷ আজ কিন্তু স্রেফ থ্যাঙ্কিউ বলতে ফোন করেছি৷ সার্ভিসের ব্যাপারে আপনাদের সিরিয়াসনেসটা বেশ ইম্প্রেসিভ, চালিয়ে যান৷ আর শুনুন, একদিন আমাদের অফিসের দিকে চলে আসুন না৷ একটু আড্ডা মারা যাবে। হাইক্লাস দার্জিলিং টী থাকবে৷ আর জানেন তো, আমাদের ক্যান্টিনের ফিশ কাটলেটের একটা কাল্ট-স্টেটাস আছে অফিস-পাড়ায়"।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি নামবে, কিন্তু ভাসিয়ে দেবে না৷ স্রেফ গুমোট কাটানো ফুরফুরে কলেজ-প্রেম-মার্কা বাতাস শহরময় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যত'টুকু দরকার, ততটুকুই৷
অটোর লাইনে দুম করে দেখা হবে পুরনো বন্ধুর সঙ্গে৷ দু'জনে মিলে দিব্যি উড়িয়ে দেওয়া যাবে দু'ঠোঙা চীনেবাদাম আর বিটনুন৷
ট্রেনে ভীড় সামান্য কম হবে৷ ডেলিপ্যাসেঞ্জারি ইয়ারদোস্তরা কোনও এক জাদুমন্ত্রবলে সে'দিন মোবাইল স্ক্রিনে না আটকে থেকে খেলা বা সিনেমা নিয়ে গপ্প জুড়বে৷ হঠাৎ কেউ দু'কলি গেয়ে উঠলেও ক্ষতি নেই, বরং সে মানুষের গলায় এমন সুর লুকিয়ে ছিল যেনে বুকের মধ্যে চনমনে একটা ভালো লাগা তৈরি হবে৷
এমন, ঠিক এমন একটা সোমবার যেন প্রতিটা মানুষেরই মাঝেমধ্যে জোটে৷