Saturday, March 20, 2021

গোলেমালে

চারপাশের সমস্ত কিছু কেমন যেন স্বপ্নের মত ঠেকছিল। কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না৷ কল্পলোক না কী যেন বলে? তেমনই কিছু একটা যেন৷ উপযুক্ত ইমোজির অভাবে নিজের মনের অস্থির অবস্থাটা সঠিকভাবে কাউকে বুঝিয়ে উঠতেও পারছিলাম না৷ 

চারপাশটা মন দিয়ে দেখেশুনে স্তম্ভিত হতেই হলো - এ যে কোয়াড এইচ-ডি ডিস্প্লেকেও হার মানাচ্ছে৷ সবকিছুই কী  স্পষ্ট, যেন চাইলেই ছুঁতে পারব৷ ওই দেখো, সত্যিই ছুঁতে পারছিলামও৷ বালিশের ওয়াড়, বিছানার চাদর, খাটের পাশের টেবিলের ওপর ওপরে সাজানো ফুলদানি - হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে৷ ও মা, সে ফুলদানিতে আবার রজনীগন্ধা- রীতমত ছোঁয়া যায়, সে মিষ্টি সুবাসও নাকে আসছে বইকি। কিন্তু ছুঁলে কোন কাঁচকলাটা হবে? ফুলদানি বা রজনীগন্ধা কোনওটাই তো পিঞ্চ-টু-জুম করা যাচ্ছিল না। অস্বস্তিটা ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছিল৷ 

এমন সময় পাশের ঘর থেকে খোকা দুদ্দাড় করে ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরল৷ আমার আদরের খোকা, দেখেই বড় সাধ করল লাভ্ রিয়্যাকশন দিতে। ও মা, সে উপায়ও নেই৷ বাধ্য হয়ে রসকষহীন একখানা চুমু বসিয়ে দিতে হল খোকার গালে৷ এরপর গজরগজর করতে করতে ঘরে এসে ঢুকলো বউ। সে আবার আর এক সমস্যা- চারপাশ হাতড়েও মিউট করার কোনও বোতাম খুঁজে পেলাম না৷ অগত্যা ওর দিকে তাকিয়ে দু'টো কথা বলতে হলো৷ পিং-য়ের বদলে 'ওগো হ্যাঁগো' - এক্কেবারে ক্যালামিটি যাকে বলে৷ ওর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আবার অস্বস্তিটা দ্বিগুণ হল, টের পেলাম যে ইন্সট্যা-ফিল্টার ছাড়া একে-অপরের মুখ আমরা বহুদিন পর দেখছি। গোড়ার দিকে তো বলতে যাচ্ছিলাম "নাইস ডিপি, কখন চেঞ্জ করলে"? কিন্তু শেষ মুহূর্তে সামলে নিলাম! 

ক্রমশ কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠছিল৷ খানিকক্ষণ লগ আউট বোতাম খুঁজলাম কিন্তু তারপর মাথায় এলো অ-স্ক্রিন দুনিয়ার এই এক বিশ্রী সমস্যা - লগঅফ সাইনআউটের কোনও সুযোগ নেই৷ দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম৷ চেনা পৃথিবীটা ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল৷ ওই ভাবে আর আধঘণ্টা থাকতে হলেই নিজেকে ফর্ম্যাট করে ফেলতে হত। তবে বিশ্রী কোনও গোলমাল ঘটার আগেই ডাউন হওয়া হোয়্যাটস্যাপ, ফেসবুক আর ইন্সট্যাগ্রাম সচল হল৷ জটিল ভাষায় বলতে গেলে - ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল৷ সহজভাবে বললে - ফিলিং রিলীভড উইথ বৌ, খোকা অ্যান্ড আ বিলিয়ন আদার্স৷

Tuesday, March 16, 2021

সুমন আর দাদু

আমি আর দাদু একসঙ্গে সুমন আবিষ্কার করেছিলাম৷ বন্ধুর থেকে ধার করা ক্যাসেটে - "ইচ্ছে হল"। তখন সবে ক্লাস টেনের বোর্ড পরীক্ষা শুরু হয়েছে৷ দুপুরের দিকে পরীক্ষা, তাই সকাল থেকেই বুক ধড়ফড়, গা-কাঁপুনি৷ গোটা বছর মন দিয়ে পড়াশোনা না করার বিশ্রী গ্লানি। সে অস্বস্তি কাটাতে ভরসা ছিল ফিলিপ্সের টেপ-রেকর্ডার আর দাদুর 'আরে এগজামই তো, হাতিঘোড়া-বজরাপানসি তো নয়' মার্কা হাসি৷ 

সেই সকালগুলোর স্মৃতি ফিকে হওয়ার নয়৷
সুমনের সুরে দাদু মাথা দুলিয়ে চলেছে, হাঁটুতে তাল ঠুকছে, আর 'বাহ্ বাহ্' বলে বিড়বিড় করে চলেছে৷ একদিকে অধরা সিলেবাস মনের কলার টেনে ধরছে আর অন্যদিকে সুমনের বাঁশুরিয়াদাদা বুকের মধ্যে ঢুকে ঝাড়পোছ শুরু করে দিয়েছে৷ মা হাঁকডাক শুরু করেছে স্নানে যাওয়ার জন্য, পরীক্ষার জন্য সময়মত না বেরোলেই নয়৷ কিন্তু ক্যাসেটের সেই দাপুটে সুমন থামছেন না। খাটের এককোণে সুমনাপ্লুত দাদু, ডায়াগোনালি অন্যকোণে আমি৷ মাঝে অদরকারী কিছু বইখাতা৷ 

দাদু মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে বলছে, "সবজিওয়ালা বন্ধু তো বটেই৷ এই সুন্দর সেন্টিমেন্টটা নিয়ে আমরা আগে গান বাঁধিনি বা শুনিনি কেন বলো দেখি ভাই"? অরুণ মিত্রের উঠে দাঁড়ানোর অ্যাডভেঞ্চার শুনে দাদুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে - সেই ঔজ্জ্বল্যে ভর দিয়েই আমার সুমন-ভালোবাসার দিকে এগিয়ে যাওয়া৷ 

দাদুর চলে যাওয়া বছর সাতেক আগে, মার্চের এই ১৬ তারিখেই।
সুমনের গান কখনও কোত্থাও যাবে না, সে'টাই বাঁচোয়া৷ 

শুভ জন্মদিন, সুমন৷

Monday, March 1, 2021

এমন একটা সোমবার


সহকর্মী মিহি সুরে ডেকে বলবেন, "ভাই, তোমার জন্য আজ পান্তুয়া এনেছি, বাড়িতে বানানো৷ তোমার বৌদির স্পেশ্যালিটি৷ লাঞ্চের পর আমার টেবিলে একবার আসা চাই কিন্তু"।
বস পিঠ চাপড়ে বলবেন, " গত হপ্তায় তো রোজই দেরী করে বেরিয়েছ৷ আমার নজর এড়ায়নি কিন্তু৷ শোনো, আজ বিকেলে চটপট বেরোবে৷ আরে বাবা যন্ত্র তো নও, মানুষ তো! আর শোনো, সবসময় অমন গোমড়াথেরিয়াম হয়ে ঘুরে বেড়াও কেন বলো তো? একটা হোমওয়ার্ক দিলাম, রোজ রাতে শোওয়ার আগে মিনিমাম আধঘণ্টা তারাপদ পড়বে, কেমন"?
লাঞ্চের সময় টিফিন খুলে মন-প্রাণ-বুক রোববার দুপুরে রাঁধা বাসি বিরিয়ানির সুবাসে আচ্ছন্ন হবে৷
হঠাৎ কোনও ক্লায়েন্ট ফোন করে বলবেন,"রোজই তো কোনও না কোনও কম্পলেন নিয়ে ফোন করি৷ আজ কিন্তু স্রেফ থ্যাঙ্কিউ বলতে ফোন করেছি৷ সার্ভিসের ব্যাপারে আপনাদের সিরিয়াসনেসটা বেশ ইম্প্রেসিভ, চালিয়ে যান৷ আর শুনুন, একদিন আমাদের অফিসের দিকে চলে আসুন না৷ একটু আড্ডা মারা যাবে। হাইক্লাস দার্জিলিং টী থাকবে৷ আর জানেন তো, আমাদের ক্যান্টিনের ফিশ কাটলেটের একটা কাল্ট-স্টেটাস আছে অফিস-পাড়ায়"।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি নামবে, কিন্তু ভাসিয়ে দেবে না৷ স্রেফ গুমোট কাটানো ফুরফুরে কলেজ-প্রেম-মার্কা বাতাস শহরময় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যত'টুকু দরকার, ততটুকুই৷
অটোর লাইনে দুম করে দেখা হবে পুরনো বন্ধুর সঙ্গে৷ দু'জনে মিলে দিব্যি উড়িয়ে দেওয়া যাবে দু'ঠোঙা চীনেবাদাম আর বিটনুন৷
ট্রেনে ভীড় সামান্য কম হবে৷ ডেলিপ্যাসেঞ্জারি ইয়ারদোস্তরা কোনও এক জাদুমন্ত্রবলে সে'দিন মোবাইল স্ক্রিনে না আটকে থেকে খেলা বা সিনেমা নিয়ে গপ্প জুড়বে৷ হঠাৎ কেউ দু'কলি গেয়ে উঠলেও ক্ষতি নেই, বরং সে মানুষের গলায় এমন সুর লুকিয়ে ছিল যেনে বুকের মধ্যে চনমনে একটা ভালো লাগা তৈরি হবে৷
এমন, ঠিক এমন একটা সোমবার যেন প্রতিটা মানুষেরই মাঝেমধ্যে জোটে৷

Wednesday, February 24, 2021

হাবুডুবু


- ইয়ে...।

- তুমি অসময়ে ইয়ে বললেই আমার বুক কাঁপে..।

- তুমি না! বড্ড পেসিমিস্ট।

- নয় নয় করে কুড়ি বছর সংসার করছি৷ তোমার এই ধান্দাবাজি "ইয়ে" আমি খুব চিনি।

- শোনো না, বউ..।

- মিউমিউ গলায় "ইয়ে"। কুঁইকুঁই সুরে "শোনো না"। তোমার মতিগতি আমার মোটেও ভালো ঠেকছে না৷

- বলছিলাম যে..ডিনার তো হলো..তবু কোথাও যেন ফাঁক থেকে গেছে..।

- মাছের ঝোল দিয়ে দিব্যি সাবড়ে খেলে, তবু ফাঁক রয়ে গেল? পেট না ট্যাঙ্কি?

- আহ, তা নয়৷ পেট ভরেছে৷ ফাঁকটা মনে৷ বুকে একটু মাইল্ড হুহু রয়ে গেছে।

- ফ্রিজে মিষ্টি নেই স্যার৷ 

- হুহুটা মিষ্টির জন্যে নয়৷ বলছিলাম যে, বড় সাধ আমার- একটু আলু ভেজে খাবো। কুচুরমুচুর করে আলুভাজা খাবো আর মান্নাদের গান শুনব৷

- সে তো ভালো কথা৷ আলু ভেজে নাও,  তার জন্য অত ঘ্যানঘ্যানানি কেন।

- তোমার একটু কুঅপারেশন চাই যে৷ আলুটা কুচিয়ে দাও প্লীজ।

- নোলার ছোঁকছোঁক আমার নেই৷ আলু পটল স্নোলেপার্ড যা খুশি কুচিয়ে নিয়ে ভাজোগে৷ এই রাতবিরেতে আমি আলু  কাটতে পারব না৷

- ভাজব তো আমি।

- কুচোবেও তুমি।

- কিন্তু রামকৃষ্ণ যে বলেছেন বৌ, এক্সেলেন্স শিকেয় তুলে কোনো কাজ করবে না৷ আলু ভাজায় আমার এলেম আছে বটে৷ কিন্তু আলু কাটার সাবজেক্টে আমি ভীষণ ইনকনসিস্টেন্ট৷ আর আলু এবড়োখেবড়ো হলে ভাজার ম্যাজিকটাই মাটি৷

- রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যার আলু কুচোনোর মুরোদ নেই,  অসময়ে আলুভাজা খাওয়ার শখ উথলে উঠলে তার উচিৎ নিজেকে ঝ্যাঁটাপেটা করা৷ 

- এক সময় পূর্ণেন্দু পত্রী মার্কা প্রেম ছিল আমাদের গিন্নী৷ আর এখন? এখন শুধু পার্লামেন্ট মার্কা গুঁতোগুঁতি৷ 

- উফ!

- এক সময় ছিল "তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার" লেভেলের সোহাগ৷ আর এখন স্রেফ "বাগিয়ে কালী লোক হাসালি"।

- এই শুরু হল।

- বিয়ের পর পর ছিলাম উত্তম সুচিত্রা৷ এখন হয়েছি হ্যাডক আর ক্যালকুলাস।

- থামবে এ'বার?

- কলেজ প্রেমের সময় হপ্তায় মিনিমাম এক ডজন চিঠির আদানপ্রদান হত৷ আর এখন মাসে একবার মাসকাবারির লিস্টি। 

- অসহ্য!

- একসময়ে আমি তোমার বুকের পাশবালিশ, মনের মাইডিয়ার। আজ কালের ফেরে তোমার চোখে আমি মিটমিটে গাম্বাট৷ 

- এই শোনো৷ আলু আমি কুচিয়ে দিচ্ছি৷ আলুভেজে ওভেন পরিষ্কার করে, কড়াই মেজে তারপর বেরোবে রান্নাঘর থেকে৷ নয়তো তোমারই একদিন কি আমারই একদিন। 

- আমি তোমার পিএইচডি জানো। ইন আদার ওয়ার্ডস, আমি তোমার প্রেমে হাবুডুবু।

- যত্তসব!

Monday, February 1, 2021

বাজেটের ব্যাপারস্যাপার


- শোনো বউ!

- বলে ফেলো।

- শুনতেই হবে কিন্তু।

- কান তো আর বন্ধ করে রাখার উপায় নেই৷ 

- একটা প্রপোজাল ছিল।

- শুনি৷

- প্রপোজালটা এক্সেপ্ট করতেই হবে কিন্ত।

- ঈশ্বর তো নই যে ডিসপোজ করব।

- আজ তোমারও স্যালারি ঢুকল৷ আমারও। 

- তা'তে কী?

- মাইনে পাওয়ার দিন আমরা মাসকাবারি সেরে বাড়ি ফিরি৷ সে'টাই ট্র‍্যাডিশন৷ তাই না?

- বীটিং আরাউন্ড দ্য বুশ? বলো প্রপোজালটা কী।

- বলছিলাম যে, আজ মাসকাবারিটা ড্রপ করে যদি..।

- যদি?

- অমন টেঁটিয়া সুরে 'যদি' বললেই আমি নার্ভাস হয়ে যাই বউ৷ 

- মাসকাবারি ড্রপ করে? কী?

- একট ট্যাক্সি নিয়ে সোজা পার্ক স্ট্রিট৷ সে'খানে মোকাম্বোয় বসে কবজি ডুবিয়ে দেব৷ পাশাপাশি একটু গলা ভিজিয়ে নেওয়া, সামান্য ঢুলুঢুলু৷ বুঝছ তো।

- খুব বুঝছি৷ ডেভিলড ক্র‍্যাব৷ স্টেক৷ সিজলার৷ টুটিফ্রুটি। স্ক্রুড্রাইভার৷ মোহিতো।

- তোমার তুলনা নেই বউ। মেনুটা তা'হলে ফাইনাল৷ আর তারপর মোকাম্বো টু বাড়ি ফেরাও তা'হলে ট্যাক্সিতেই৷ 

- বেশ৷ দু'রাউন্ড ট্যাক্সি, হাইক্লাস খাবারদাবার, ককটেল। সব মিলে অন্তত তিন হাজার।

- তিন?

- মিনিমাম। এ'দিক এ'মাসে ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম দিতে হবে।

- মাইল্ড কেলো।

- বাবার টেস্টগুলোও এ'মাসে না করালেই নয়..।

- স্লাইটলি মেজর কেলো।

- গত মাসে মাইক্রোওয়েভ কেনা হল৷ বাড়ল আর একটা ইএমআই।

- সিগনিফিক্যান্টলি মেজর কেলো৷

- অতএব?

- শালার বাজেট না তেলের বাঁশ৷ দু'পা রেভিনিউতে উঠি, সাত পা এক্সপেন্সে নামি৷ 

- তা বর, ট্যাক্সি ডাকি?

- ট্যাক্সি, মোকম্বো৷ তারপর বাজেট ডেফিসিটে অক্কা যাই আর কী৷

- অতএব? 

- ওই৷ আমাদের ডেস্টিনি৷ বাবুঘাট মিনি৷ তারপর লঞ্চ৷ তারপর ট্রেন৷ আর তারপর মুদীর দোকনে ফর্দ সাবমিশন। 

- শোনো৷ মাসকাবারি ফর্দে আজ কয়েকটা আইটেম যোগ করি বরং৷ তবে সে'সব আইটেম তুমি মুদীর দোকানে পাবে না৷

- কী জিনিস বউ?

- ভডকা। অরেঞ্জ জুস৷ ককটেল হম বানায়েগা। মুর্গিটা বরং তুমি ভেজো। আর টুটিফ্রুটির বদলে বাড়িতে পাটালি আছে৷ ফ্রেশ।

- ভডকা? আর এ মাসের বাজেট ডেফিসিট?

- ইকনমিক সার্ভে বলছে ভডকায় ঝিমুতে ঝিমুতে শীতের রাতে টোনাটুনির ঢলাঢলি করে ছাতে ওঠাটা হল জরুরী ইনসেন্টিভ প্যাকেজ৷

- তোমার তুলনা নেই বউ৷  

- বলছ?

- কলেজে আমার সঙ্গে প্রেম করে বখে না গেলে তুমি ধুরন্ধর পলিটিশিয়ান হতে৷ নির্ঘাৎ৷