Sunday, January 24, 2021

প্রিয় ফুল


- ইয়ে,তোমার কোন ফুল পছন্দ যেন?
- ফুল?
- বলো না৷
- তোমার শরীরটরীর ঠিক আছে? এতবছর পর আজ হঠাৎ প্রিয় ফুলের খোঁজ নিচ্ছ যে বড়?
- আহ, বলই না৷ তোমার সবেতেই একটা ইয়ে..।
- এই শোনো, ঝেড়ে কাশো দেখি৷
- মানে ওই৷ আসলে, এদ্দিনের ওই ঝুলে থাকা প্রমোশনটা শেষ পর্যন্ত হচ্ছে৷ বড়সাহেব আজ কনফার্ম করলেন৷ মেয়ের জন্য একটা জবরদস্ত কলম কিনলাম৷ ওই যে, যে'টা ও গত হপ্তায় দেখেছিল৷ ফাউন্টেন৷ তারপর ভাবলাম তোমায় সারপ্রাইজ দিয়ে যদি এক গোছা..কিন্তু ফুলের দোকানে এসে সব গুলিয়ে গেল। এত কিছু এ'খানে, অথচ আমি ওই জবা, রজনী, গাঁদার বাইরে কিছুই ঠিক ঠাহর করতে পারিনা৷
- ভালো মাফলারটা নিয়ে যেতে ভুলে গেছ আজ,শীতের সন্ধ্যেয় টইটই করে না ঘুরে সোজা বাড়ি ফেরো দেখি৷ আজ একটা ট্যাক্সি নিও বরং৷ আর শোনো, ভালো ফুলকপি উঠেছে আজকাল৷ দু'জোড়া এনো, কেমন?

ডিসিপ্লিন

কিছুদিন আগেই টের পেলাম যে কথায় কথায় কারণে-অকারণে রোজ রোজ সন্দেশ রসগোল্লা খাওয়া হয়ে যাচ্ছে৷ ব্যাপারটা আদৌ স্বাস্থ্যকর নয়। আবার মিষ্টি একদম ঘ্যাচাং করে বাদ দিলেও মন আনচান করবে৷
কাজেই বাড়িতে এলো তালমিছরি। একটুকরো মুখে দিলেই আনচান কেটে যাবে। রোজ রোজ সন্দেশ-রসগোল্লা খাওয়ার যে বিশ্রী অপরাধ-বোধ; সে'টাও পাশ কাটানো যাবে। এক্কেবারে কম্পাস-বসানো হিসেব।
তাই বলে রোজ রোজ তালমিছরি খাব? সামান্য 'ভ্যারাইটি' না হলে কি চলে?
বেশ, ঘরে এলো পাটালি। রাতের খাবার পর, একটা ছোট্ট টুকরো - নিজেকে কথা দিলাম। তোফা।
এ'বার গত দিনচারেক ধরে গুড়ের রসগোল্লার পাশাপাশি পাটালি আর তালমিছরি একসঙ্গে নিজের ওপর ফায়্যার করে চলেছি।
মুক্তি নেই। নেই।

নির্ভুল

গিজার অন করলাম। বাহ্৷
দু'টো শ্যামল মিত্রের গান শুনলাম, এ সময়ে জল যথেষ্ট গরম হওয়া দরকার। নির্ভুল জানুয়ারিস্ট স্ট্র্যাটেজি।
বোনাসে শুনলাম মান্নাবাবুর "এ নদী এমন নদী"৷ জল এক্কেবারে ঘ্যাচাং-গরম চাই৷ বহুত খুব।
এরপর সেই মখমলে সুরে ভেসে ভেসে বাথরুমে গেলাম৷ দু'টো সুপরিচিত নল৷ তবে আগে মিনিট দুই গিজারের জ্বলন্ত লাল আলোটার দিকে তাকিয়ে থেকে গাইলাম
"এখনও ডুব না দিলে হায়গো স্নান করবে কবে"?
গানের সুর স্তিমিত হয়ে আসার আগেই নল চালু করলাম। বালতি ভরল৷ তারপর ঝপাৎ স্পীডে আধ-মাইক্রোসেকেন্ডে কয়েক মগ স্ট্রেট-টু-তালু৷
ঠাণ্ডা জলের নল খুলেছিলাম৷
পরাস্ত বিধ্বস্ত বরফকুচি মাখানো দেহটাকে কোনও মত টেনে হিঁচড়ে সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে গিজার বন্ধ করে বেরিয়ে এলাম৷

ব্যস্ত

- কী রে৷ এত রাত হল, খেয়ে নে৷
- উঁ।
- কই ওঠ৷ খেতে চ'।
- উঁ?
- আরে, সেই সন্ধ্যে থেকে শুয়ে আছিস। ওঠ।
- উঠতেই হবে রে মেজদা?
- খেতে হবে না?
- আমি ব্যস্ত।
- ব্যস্ত?
- আই অ্যাম ল্যাদগুইশিং।
- ল্যাদগুইশিং?
- ল্যাদ খেয়ে খেয়ে ল্যাংগুইশিং।
- তোর হবে।
- টু কোট চন্দ্রবিন্দু; কে জানে বাবা কবে।

জননেতা



- ভায়া, নমস্কার।
- আমি আপনার ইয়ারদোস্ত নই৷ বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। জননেতা৷ ভায়া আবার কী? স্যার বলুন৷ নিদেনপক্ষে দাদা।
- ওহো৷ সরি, সরি৷ হে হে৷ নমস্কার স্যার দাদা৷
- আহ৷ হয় স্যার নয় দাদা।
- বেশ বেশ৷ নমস্কার হয়স্যারনয়দাদা।
- ধের৷ যাকগে। তা আমার অফিসে কী মনে করে? কী চাই?
- আজ্ঞে, হয়স্যারনয়দাদামশাই। আমিও লাইনের লোক৷
- আপনিও লাইনের লোক? এর মানেটা কী?
- মানে ওই৷ কী বললেন যেন? রাজনীতিবিদ৷
- মস্করা হচ্ছে? বেশি ফচকেমো করলে ছেলেদের ডেকে দেব দু'ঘা!
- আরে মাইরি৷ আমিও রাজনীতিবিদ৷ আপনার অফিসের বাইরে দু'টো টেম্পো ভরে আমার ছেলেরাও অপেক্ষা করছে৷ আপনার ছেলেরা লাফালাফি করলেই তারাও নেত্য শুরু করবে৷
- এত পাঁয়তারা না কষে নিজের পরিচয়টা স্পষ্টভাবে দিন।
- হয়স্যারনয়দাদা, উত্তেজিত হবেন না প্লীজ৷ জননেতারা মেজাজ হারালে কী চলে? আরে সে কাজ তো তাদের পোষা মাস্তানদের। যাক গে, আমার নাম মনোহর ধর৷ অমুক পার্টিতে রয়েছি৷
- অমুক পার্টি? মানে আমাদের তমুক পার্টির আর্চ রাইভাল? কিন্তু আপনাকে তো কোথাও দেখেছি বলে..।
- আজ্ঞে আমি ব্যাকএন্ডের মানুষ৷ আপনার মত জননেতা আমায় দেখবেনই বা কেন৷
- ব্যাকএন্ড?
- ওই৷ হেডহান্টার৷ ডীল ক্লোজ করে থাকি৷
- তা আমার কাছে কী মনে করে ধরবাবু?
- আপনার জনসমর্থন আছে। লোকে আপনার কদর করে। আপনার পোষা গুণ্ডাদের ভয় পায়৷ এ'সব দেখে আমাদের হাইকম্যান্ড এক্কেবারে ইম্প্রেসড।
- আপনারা? গত ইলেকশনে গোহারান হেরেও ইম্প্রেসড?
- ইলেকশন-টিলেকশন বোঝার লোক আমি নই হয়স্যারনয়দাদা৷ আমি বুঝি ডীল৷
- তা এ'খানে কী ডীল চাই?
- ওই৷ আপনার জনসমর্থন আর গুণ্ডাবেস-সহ আপনাকে কিনতে চাই৷ আপনার প্রাইসটা কাইন্ডলি বলে দিন৷
- হাউ ডেয়ার ইউ? রাস্কেল কোথাকার!
- পাঁচ কোটি।
- আচ্ছা নচ্ছার লোক তো আপনি! যখন খুশি যাকে খুশি চাইলেই কেনা যায় ভেবেছেন?
- সাত কোটি।
- তবে রে শুয়ার! শুনে রাখ৷ আমায় লোকে ভালোবাসে। ভক্তি করে৷
- বেশ৷ দশ কোটি৷
- খবরদার বলছি৷ আইডিয়ালের জন্য প্রাণপাত করতে পারি আমি৷ আর একবার যদি শুনি..।
- পঁচিশ।
- ইয়ে..। পঁ..পঁ...!
- পঁচিশ বরং বাদ থাক৷ তিরিশ৷ কোটি।
- ইয়ে, স্যার৷ শুনুন।
- আমি পাতি মানুষ হয়স্যারনয়দাদা৷ আমায় মনোহর বলেই ডাকবেন৷ মনু বলেও ডাকতে পারেন৷ আর হ্যাঁ, চল্লিশ কোটি৷
- ওহ৷ মানে, মনুবাবু। ইয়ে, বুঝতেই পারছেন...এমন দুম করে পালটি খাওয়াটা ঠিক সমীচীন হবে না। আসলে মানুষ তো..।
- পঞ্চাশ কোটি৷
- আমি রাজী!
- ভেরি গুড৷ আপনার ছেলেদের নিয়ে তা'হলে কাল বেলা দশটা নাগাদ আমাদের অফিসে চলে আসবেন৷ দু'হপ্তার একটা কোর্স করে তারপর পার্টিতে জয়েন করে ফেলবেন৷
- কোর্স? কীসের?
- চামড়াটা একটু মোটা করিয়ে নেওয়ার৷ ও সিলেবাস রেডি আছে, আপনাকে ভাবতে হবে না৷ হয়ে যাবে।
- ইয়ে, চামড়া বুঝি এখনও যথেষ্ট মোটা হয়নি?
- হয়নি। এভ্রিওয়ান হ্যাস আ প্রাইস হয়স্যারনয়দাদা মশাই৷ সবারই ব্রেকিং পয়েন্ট আছে৷ আইডয়ালিজম, সততা, জনসমর্থন; সবকিছুই ভেঙে গড়িয়ে নেওয়া যায় সঠিক দাম জানলে। আপনাকে পারচেজ করার জন্য বাজেট ছিল আশি কোটির, অথচ আপনি পঞ্চাশেই কাত হলেন। গায়ের চামড়া সাফিশিয়েন্টলি মোটা হলে আরও কিছুক্ষণ আইডিয়ালিজমের দোহাই পেড়ে নিজের দর বাড়াতে পারতেন।
- এহ হে।
- এখন আসি হয়স্যারনয়দাদা মশাই৷ কাল তা'হলে আমাদের পার্টি অফিসেই দেখা হচ্ছে? আজ আবার শপিং ডে কিনা, আরও বেশ কয়েকটা জায়গায় ছুটতে হবে৷ আসি, কেমন?