Monday, August 3, 2020

প্ল্যানপ্ল্যানানি


- গত পুজোয় আমরা হিমাচল যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম৷ তাই না বউ?

- তাই তো। ট্রেনে দিল্লী। দিল্লী থেকে বাসে চেপে শিমলা।

- আর তারপর একটা প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে দু'হপ্তার ভ্রমণ। শিমলা, মানালি, রোটাং, কাজা, চিতকুল। আহা।

- তোমার ফ্যাক্টরির হইহইরইরই নেই৷ আমার স্কুলের গোলমাল নেই৷ অ্যাই, ওয়েলিংটন থেকে দু'টো জ্যাকেট এনেছিলে তুমি, মনে আছে? কত ভাবলাম হিমাচলের কনকনে শীতে ওই জ্যাকেট দু'টো কাজে লাগবে৷ 

- সে জ্যাকেট-জোড়ার কথা মনে থাকবে না আবার? বেশ ভালো দরে বাগিয়েছিলাম কিন্তু। আর টপ কোয়ালিটি।

- স্পিতি নদীর ধারে বসে ডিমসেদ্ধ আর ম্যাগি খাবো ভেবেছিলাম। তাই না গো বর?

- আর কাজা নামের ওই গ্রামটায় দিন-তিনেক গা এলিয়ে কাটিয়ে দেওয়া? সকালে হাঁটাহাঁটি? দুপুরে আমার গান শোনা আর তোমার বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকা?

- আর সন্ধ্যেবেলা জমিয়ে গল্প আর তাস। তাই না গো?

- টাকাপয়সার সামান্য ইয়ের জন্য হিমাচল যাওয়া হল না বটে। কিন্তু যাই বলো, অমন জব্বর প্ল্যান ছকেও আরাম।

- বটেই তো৷ কেন, তার আগের পুজোয় সেই যে আন্দামান যাব ভাবলাম? সে'টা মনে নেই?

- মনে নেই আবার। সে তো গ্র‍্যান্ড প্ল্যান ছিল। তাই না গো বউ? প্লেনে পোর্ট ব্লেয়ার৷ সাতদিন লাটিয়ে জাহাজের ঘ্যামে ওয়াপিস কলকাতা।

- উফ। ভাবলেই থ্রিল। গায়ে কাঁটা।

- ট্র‍্যাভেল ম্যাগাজিনের সেই ছবিগুলো এখনও চোখে ভাসে জানো। আন্দামানের সেই নীল সমুদ্দুর...। আহা। দীঘার সমুদ্র সে নীলের কাছে পাতি চৌবাচ্চা।

- রাধানগর বীচ, হ্যাভলক, ভাইপার, নীল...।

- আহা। পোয়েট্রি। পোয়েট্রি। রাতের পর রাত আমরা গুগল ঘেঁটেছি। তাই না গো?

- রাতের পর রাত। আহা। সত্যিই। 

- সে'টাও তো গেল ভেস্তে। মাঝেমধ্যে মনে হয় বছরে একটা করে যদি লটারি পাওয়া যেত..।

- বছরে একটা বঙ্গলক্ষ্মী বাম্পার? বরকুমার, তা'হলে তার আগের পুজোয় লাদাখ যাওয়ার পরিকল্পনাটাও ভেস্তে যেত না গো। 

- আর তার আগের পুজোর রাজস্থান ট্রিপটাও...বানচাল হত না।

- আর তার আগের পুজোয়? তাত আগের পুজোয় কোথায় যাওয়ার প্ল্যান ক্যান্সেল করেছি আমরা?

- নাহ্। সে'পুজোর প্ল্যান ভোগে যায়নি গো৷ তখন তো আমাদের নন্দনে দেখা হচ্ছে প্রতি সন্ধ্যেয়।  অথবা মিলেনিয়াম পার্ক৷ 

- ও হ্যাঁ। সে বছর তো সদ্য আলাপ। আর চটজলদি হুজুগে পুজোয় বিয়ের প্ল্যান।

- ভাগ্যিস রেজিস্ট্রি বিয়েতে ট্রেনের টিকিট বা হোটেল বুকিংয়ের খরচটুকু ছিলনা। সেই পুজোর প্ল্যানটা তাই ভেসে যায়নি। কী বলো?

- হেহ্। এ'বার পুজোয় অবিশ্যি প্ল্যান ছকেও লাভ নেই। করোনা সে'সমস্ত ভাসিয়ে নিয়েছে।

- করোনা না থাকলেও যেতে পারতাম কই? একজোড়া সেল্ফিশ জায়্যান্টের মত দেশভ্রমণে বেরোলে, তোমার মায়ের ট্রিটমেন্ট আমার বোনের কোর্সফীর খরচ কে দিত?

- উম। তা ঠিক। কাজেই পুজোর ছুটিতে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যানটুকু অন্তত না করার কোনও মানেই হয়না। তাই না গো?

- শাবাশ ওয়াটসন! শাবাশ!

Sunday, August 2, 2020

সুবিনয় দাসগুপ্তর বন্ধু


- অতনু গাঙ্গুলি। রাইট?

- হ্যাঁ।

- বায়োডেটা তো বেশ ইম্প্রেসিভ।

- থ্যাঙ্ক ইউ।

- টেল মি সামথিং আবাউট ইওরসেল্ফ।

- মিস্টার দাসগুপ্ত, আমি ঠিক চাকরীর জন্য আসিনি।

- এক্সকিউজ মি?

- মাফ করবেন। আপনার সঙ্গে একটা জরুরী দরকার ছিল। কিন্তু কিছুতেই আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছিলাম না। আর আপনার ওই পেল্লায় বাড়িতে ঢোকার কথা তো ভাবতেই পারিনা। তাই বাধ্য হয়ে চাকরীর এই দরখাস্তটা করে বসলাম। ডাকও চলে এলো। এই রোলের জন্য ক্যান্ডিডেটদের যে আপনি নিজে বাছাই করেন, সে খবরটা আমি পেয়েছিলাম। 

- যে কোনও টম-ডিক-হ্যারির সঙ্গে দেখা করার জন্য অ্যালকেমিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের এম-ডি বসে নেই।

- আমি সত্যিই দুঃখিত কিন্তু..।

- লুক হিয়ার গাঙ্গুলি, আমার সময়ের দাম আছে। এই অসভ্যতাটা না করলেই পারতে।

- ব্যাপারটা সত্যিই জরুরী..। প্লীজ।

- ইউ হ্যাভ ট্যু মিনিটস।

- আমার বাবা অমল গাঙ্গুলি। লোকনাথপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে আপনার সহপাঠী ছিলেন।

- অমল..অমল..।

- আপনার হয়ত মনে নেই, তাই না?

- না নেই। আর শুনে রাখো,  যদি ভাবো পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে আমার থেকে কোনও ফেভার আদায় করবে, তা'হলে সে'গুড়ে বালি। এ'সব ধান্দাবাজি আমার সঙ্গে চলবে না।

- ধান্দাবাজি ঠিক নয়। শুধু এ'টা দেওয়ার ছিল।

- হোয়াট ইজ দিস? এই প্যাকেটে কী আছে?

- অরণ্যদেব সমগ্র। খণ্ড দুই। আর খণ্ড তিন।

- হোয়াট ননসেন্স। এই রাবিশ নিয়ে আমার অফিসে আসার কী মানে!

- বাবা বারবার বলে গেছিলেন এই পুরনো বই দু'টো যেন আপনার কাছে পৌঁছে দিই। 

- অমল..? বলে গেছে মানে?

- বাবা গতমাসে মারা গেছেন।

- অ। আই সী৷ আই অ্যাম সরি। 

- আমি এখন আসি।

- অমল এই সাতপুরনো বইদু'টো আমায় দিতে বলে গেছে? আমায়?

- মৃতুশয্যাতেও কথাটা বারবার বলে গেছেন। আর পোস্টে পাঠাতে বারণ করেছিলেন তাই..। উনি চেয়েছিলেন যেন আপনার হাতেই তুলে দিই।

- অ।

- আমি আসি। নমস্কার।

**

অতনু,

অমলকে চিরকালই আমার আলাভোলা ইডিয়ট মনে হত৷ স্কুল ছাড়ার পর তাই আপ্রাণ চেষ্টা করেছি অমন রাস্টিক ইডিয়টের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে। 

যাকগে।

তিনটে পুরনো বই ফেরত পাঠালাম। অরণ্যদেব সমগ্র এক, দুই ও তিন। 

ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় অমলের বাবা ওর জন্মদিনে বই তিনটের সমগ্র উপহার দিয়েছিলেন ওকে। বিদেশে ছাপা এই ইংরেজি কমিক্সের বইগুলোর জেল্লাই আলাদা ছিল। আমাদের গড়পড়তা ইন্দ্রজাল কমিক্স সে তুলনায় বেশ সাদামাটা। গোটা স্কুলের ছেলেপিলে হামলে পড়েছিল যে'দিন অমল বই তিনটে নিয়ে স্কুলে এসেছিল।

আমার খুব হিংসে হয়েছিল। হিংসে আর ছেলেমানুষির মিশেল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর৷ অমলের ব্যাগ থেকে সংগ্রহের এক নম্বর খণ্ডটা আমি সরিয়ে ফেলি৷ অমল কোনওদিন সন্দেহ করেনি। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমার এই নিরেট বোকা ক্লাসমেটটি আমার কুকর্মটি ধরতেই পারেনি৷ কিন্তু সে'দিন অফিসে তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বুঝলাম যে অমলের কোনওদিন সন্দেহ হয়নি কারণ সে আগাগোড়াই জানত বইটা কে সরিয়েছে।অথচ, একদিনের জন্যেও অমল আমায় বুঝতে দেয়নি যে ব্যাপারটা সে জানে। 

অমলের মত বন্ধু আর একটিও দেখলাম না। আর আমি নিজে ধান্দাবাজ,  জীবনটা ধান্দাবাজদের সান্নিধ্যেই কাটিয়ে দিলাম। 

অমল চিরকালই প্রাণ দিয়ে বই ভালোবাসত৷ রক্ত-মাংসের বন্ধুদের মত বই কোনওদিন লোক ঠকায়না৷  প্রথম ও তৃতীয় খণ্ডের সঙ্গে দ্বিতীয় খণ্ডের বিচ্ছেদটা ওকে ওই অল্পবয়সেও বড় দাগা দিত৷ মরার আগে সেই বিচ্ছেদ ঘোচানোর ব্যবস্থাটা সে করে গেল। 

আমার অপরাধটা ক্ষমার যোগ্য মনে হলে একদিন বাড়িতে এসো, ইন্টারভিউয়ের দরখাস্ত ছাড়াই। 
কেমন?

ইতি,

সুবিনয় দাসগুপ্ত।

আড্ডার আমরা

১। গসিপের তুলনায় রসগোল্লা হল খটখটে বাটখারা মত।

২। সাহিত্য, সিনেমা, খেলা, সঙ্গীত; এ'সব নিয়ে ভিডিওকলে আড্ডা দেবে প্যারিসের নিখিলেশ আর পাগলাগারদের রমা রায়। আগন্তুক সিনেমার প্রডিগাল মামার 'ভালো আড্ডা' বিষয়ক ওপিনিওনকে আমি ফেসবুক-স্যেলুট জানাতেই পারি। কিন্তু লজিক বহির্ভূত খিস্তি ছাড়া আড্ডায় খুশির তুফান ওঠে না। উঠতে পারেনা।

৩। টেনিদা লেভেলের যুক্তিনিষ্ঠা নিয়ে শার্লক-মেজাজে ধারালো হিসেব কষব। ফড়িং-লেভেলের দম নিয়ে কমল মিত্তিরের মত চেবানো-সারকাজম ছুঁড়ব। ঘ্যাম তা'তেই।

৪। এইত্তো সে'দিন৷ মিনিবাসে মেজমামার পকেটমার হল। এর থেকে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারব;
এক, মেজ মাত্রই অসতর্ক। মেজদা, মেজপিসি, মেজকা; প্রত্যেকে আদতে কেয়ারলেস ক্যালানে।
দুই, মিনিবাসে যে কারুর মামা উঠলেই মানিব্যাগ গায়েব হতেই হবে। এ নিয়ে মিনিমাম আড়াই দিন চিৎকার চ্যাঁচামেচি করব। কেউ বেশি আপত্তি করলে এপিজে আবদুল কালামের 'মিনিবাসে-ওঠা-মামাদের মানিব্যাগ খোয়া যাবেই' মার্কা কোটেশন ছুঁড়ে মারব।

৫। নিজের মনের মধ্যে যে কুচুটেপনাগুলো আছে, মাঝেমধ্যেই সেগুলোর মাথায় হাত বোলাব। দুধভাত মেখে তাদের খাওয়াব৷ বাবুসোনা বলে আদর করব। আর সু্যোগ পেলেই সে কুচুটেপনাগুলোকে অন্যদের পিছনে লেলিয়ে দেব। ব্যাপারটা যাকে বলে ডীপলি স্যাটিসফায়িং৷

৬। 'ফ্যাক্ট' সম্বন্ধে নিশ্চিত না হয়ে কাউকে গাল পাড়ব না? ছোহ্। এ থিওরি যারা কপচায় তারা হল মদে মেশানো জেলুসিল, অষ্টমী সন্ধ্যেজোড়া বৃষ্টি, গলায় ঝোলানো ফেসমাস্ক বা প্রেমের চিঠিতে জ্যামিতির থিওরেম; আগাগোড়াই বিষাক্ত।

হরনাথের কাণ্ড


- উফ৷ হাড় জ্বালিয়ে খেলে দেখছি হরনাথ।

- রাগ করলেন কত্তা?

- রাগ করব না? মাসে দশবার তোমার আপিসে এসে হাজিরা দিতে হবে? ওঝা হয়ে কি মাথা কিনে ফেলেছ নাকি?

- আজ্ঞে। চাইলেই বা আপনার মাথা কিনতে পারছি কোথায় বলুন।

- অ। আমি স্কন্ধকাটা বলে এ'বার আমায় বডিশেম করবে?

- কত্তা।  একটু বসুন না৷ ওই যে, ঘরের কোণে টাটকা আঁশ জমিয়ে রেখেছি। আতিথিয়েতায় কোনও খামতি পাবেন না। এই  আমি কথা দিলাম।

- রুই না কাতলা?

- কত্তার যে কাতলা পছন্দ, তা কি আর জানিনা?

- চালানি না লোকাল মাছের আঁশ?

- আজ্ঞে, বাজারে কিপটে বলে আমার একটা বদনাম আছে বটে। তবে আপনার মত হাইক্লাস আত্মাকে ডাকার আগে ও'সব টুপাইস নিয়ে ভাবিনা।  কাছারিপাড়ার পুকুর থেকে তোলা, মাইরি কত্তা। 

- উম। গন্ধটায় টান আছে বটে।

- কত্তা। একটা জরুরী কথা বলার ছিল।

- তুমি যে পয়লা নম্বরের ধান্দাবাজ তা আমি জানি। বলেই ফেলো।
 
- বলছিলাম যে, গিন্নীমার অবস্থা তেমন সুবিধের দেখছিনা। 

- সে এখনও তোমার কাছে আসে? আমি পইপই করে বারণ করা সত্ত্বেও? 

- আজ্ঞে, অমন মাথাগরম করবেন না প্লীজ।

- মাথাই নেই ছাই তায় মাথাগরম। ফের যদি স্কন্ধকাটাকে মাথার খোঁটা দিয়েছ হরনাথ...।

- চটবেন না কত্তা। চটবেন না।

- তা, কী বললে গিন্নী?

- ওই। প্রত্যেকবার যা বলেন। আপনার ভুল ভাঙাতে পেরেছি কিনা জানতে চাইলেন।

- কী আশ্চর্য। মরে ভূত হয়েও এমন পাগলামোর কোনও মানে হয় হরনাথ? আজ সাত বছর হল আমরা দু'জনে এক সঙ্গে মোটরদুর্ঘটনায় নিকেশ হলাম। সাত বছর৷ আমার তো মাথাটাই ভেঙেচুরে এক্কেবারে...৷ সে যাকগে। কিন্তু সাতবছর পরেও গিন্নী এখনও ভাববে আমরা দু'জনেই বেঁচে আছি? কোনও মানে হয়? কী বিশ্রী গোঁয়ার্তুমি।

- আজ্ঞে, আমি নিজেও তো তার বিশ্বাস অর্জন করার চেষ্টা কম করিনি। মাসে অন্তত চারবার আমি নিজে গিন্নীমার সঙ্গে দেখা করি মনের ডাক্তার সেজে। তাঁকে আশ্বাস দিই যে আমি আপনার চিকিৎসা করছি। বারবার গিন্নীমাকে বলি যে একদিন আমি কত্তাকে ঠিক বোঝাব যে তিনি বেঁচে আছেন৷ অথচ তলে তলে আমার চেষ্টা হল কোনও ভাবে যদি গিন্নীমাকে বোঝানোর..যে আদতে তিনিও বেঁচে নেই।

- মন বড় খারাপ হয়ে যায় হে হরনাথ৷ গিন্নী এখনও সে বাড়ির মায়াও ত্যাগ করতে পারল না। তবে, ও'সব ঘুরপথে আর হবে না৷ 

- মানে? কত্তা? 

- এ'বার সোজাসুজি নিজের পরিচয়টা তোমার গিন্নীমাকে দাও। ওকে বলো সে আদতে একটা আস্ত ভূত আর তুমি আদতে ওঝা..।

- ঘুরপথে হবে না, তাই না কত্তা? 

- নাহ্। সোজাসুজিই বলতে হবে।

- সোজাসুজি যদি আপনাকে দু'টো কথা বলি কত্তা? যদি বলি যে আমি সত্যিই মনের ডাক্তার? আর আপনাদের মৃত্যু হয়নি? সত্যিই আপনি বেঁচে আছেন? আমি একটানা আপনার মনের ব্যামো সারানোর চেষ্টা করে চলেছি দিনের পর দিন?

**

- আজ ওকে দেখেছ ডাক্তার?

- দেখলাম গিন্নীমা।

- কেমন বুঝলে?

- ওই৷ একই বুলি। উনি নাকি স্কন্ধকাটা৷ আপনিও নাকি ছ'বছর ধরে ভূত হয়ে এই বাড়ির মধ্যে বসে।

- হর ডাক্তার৷ আমার বুক ফেটে যায় গো৷ লোকটা গোটাদিন পাগলের মত ঘুরে বেড়ায়৷ আর এক তুমি ছাড়া কিছুতেই কারুর সঙ্গে কথা বলে না। আর আমার সঙ্গে কখনও দেখা হলে এমন হাবভাব করে যে আমারই ভয়ে বুক কাঁপে।

- গিন্নীমা। আমার সঙ্গে উনি কথা বলেন কারণ ওঁর ধারণা আমি ওঝা। ওঁর আশা আমি সত্যিই আপনাকে একদিন বোঝাতে পারব যে আপনিও আদতে মৃত। 

- কুড়িটি বছর ওর সঙ্গে সংসার করেছি৷ ও যে কী বিশ্রী রকমের গোঁয়ারগোবিন্দ তা আমি বেশি জানি।  নরম কথায় তো অনেক চেষ্টা করলে ডাক্তার৷ এ'বার না হয় ওঁকে সোজাসুজি মুখের ওপর বলেই দাও না সত্যিটা৷ বলে দাও না যে তুমি আদতে মনের ডাক্তার।

- সোজাসুজি বলে দেব? মুখের ওপর?

- আর উপায় নেউ ডাক্তার। উপায় নেই।

- সোজাসুজিই যদি আপনাকে বলি গিন্নীমা? 

- আমায়? আমায় কী বলবে?

- যদি বলি, আমি সত্যিই একজন ওঝা? সে জন্যেই আমি আপনার সামনে নিয়মিত হাজির হতে পারি? যদি বলি, কত্তার চিন্তা অমূলক নয়?

সুমি আর বাবা


- বাবা?

- কেমন আছিস রে সুমি?

- তুমি..এ'খানে..।

- এ'খানে আমার থাকার কথা নয়। এ'টা তোদের জামশেদপুরের শোওয়ার ঘর। জানি। আমার থাকার কথা পাটনায়। অথচ আমি এ'খানে আছি৷ কী'ভাবে যে এলাম।

- বাবা। তুমি দিব্যি আমার কথা শুনতেও পাচ্ছ।

- শুনতেও পাওয়ার কথা নয়৷ তাও জানি। বছর পাঁচেক হল আমি কানে কিছুই কিন্তু শুনতে পাইনা। টোটালি ড্যেফ৷ অথচ আজ তোর কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পারছি। ম্যাজিক।

- আমি বোধ হয়..বোধ হয়..স্বপ্ন দেখছি। 

- হতে পারে৷ তোর স্বপ্ন। হতেও পারে। কিন্তু..।

- কিন্তু? কিন্তু কী বাবা?

- এ'টা আমার স্বপ্নও হতে পারে তো। তাই না?

- যারই স্বপ্ন হোক,এদ্দিন পর দেখা হচ্ছে; এ'টাই বড় কথা৷ কদ্দিন তোমায় এত কাছ থেকে দেখিনি। 

- তা ঠিক।

- বাবা, তোমার আর মায়ের জন্য আমার খুব মনকেমন করে।

- স্বাভাবিক।  বুড়ো বাপ-মায়ের জন্য মনকেমন করবে।সে'টাই স্বাভাবিক। হ্যাঁ রে, সুমন কেমন আছে?

- ভালো। আমরা দু'জনে এ'বার পুজোয় উত্তরাখণ্ডের দিকে যাব ভেবেছিলাম। এই ভাইরাসের ঠেলায় সে'সব গোল্লায় গেল। সে নিয়ে যে সুমনের কী মনখারাপ।

- ভাইরাসের ঠেলাই বটে।

- মা কেমন আছে বাবা?

- আছে৷ মনমরা হয়ে থাকে গোটাদিন। যা বলে কিছুই তো ছাই শুনতে পাইনা।

- আমি মাঝেমধ্যে এমন ব্যস্ত থাকি বাবা, মায়ের কল এলেও রিসিভ করা হয়ে ওঠেনা৷ আর দিনের শেষে এত ক্লান্তি...তাই হয়ত রোজ কথা বলে ওঠা হয়না..কিন্তু বাবা..।

- আমরা কি তা বুঝিনা রে সুমি? তা নিয়ে তুই ভাবিসনা সুমি৷

- বাবা, আমায় পাটনা নিয়ে যাবে?

- যাবি সুমি? সুমনকে নিয়ে? জানি ওরও অফিসের ব্যস্ততা কম নয়..।

- বাবা, আমার বড় মনখারাপ। 

- সুমি। তুই এত ক্লান্ত কেন রে?

- আমায় পাটনা নিয়ে যাবে? বাবা? মা ঘি দিয়ে আলুসেদ্ধ মাখবে।  তুমি বেসুরো গলায় টপ্পা গাইবে। 

- এত মনখারাপ কেন সুমি?

- বাড়ি নিয়ে যাবে বাবা? আমায় বাড়ি নিয়ে যাবে?

- স্বপ্নটা যে ছাই কার। আমার না তোর..।

- আচ্ছা বাবা, শোনো। এ'টা যারই স্বপ্ন হোক। সে আগামীকাল অন্যজনকে ইমেল করে গুছিয়ে এই স্বপ্নের গল্প বলবে। 

- তোর এত মনখারাপ? সুমি?

- আলুসেদ্ধ আর টপ্পায় সেরে যাবে। 

- সুমি। আমারও মনখারাপ৷ খুব৷ তুই নেই, বাড়িটাকে বেসুরো টপ্পার মতই মনে হয়।

- বাড়ি ফিরব বাবা। পুজোয়৷ কেমন?

- পিতৃমনখারাপের শেষ। সুমিপক্ষের শুরু।

***

অবাক লাগে অনুপমার৷

এতগুলো বছর কেটে গেল অথচ আজও সুমি আর সুমির বাবার মনখারাপের কথা ভেবেই দিন কেটে যায়। নিজের মনকেমনগুলো ফিকে হতে হতে আজ এমন অবস্থা সে নিজের স্বপ্নেও সে'গুলো ধরা পড়েনা। 

নিজের স্বপ্নেও নিজের ঠাঁই নেই, এ কথা ভেবে হেসে ফেললেন অনুপমা।