Thursday, July 30, 2020

কবীরিয়ানি


- পুরস্কারটা পেয়ে কেমন লাগছে অপূর্ববাবু?

- কী বলব। এত বড় একটা সম্মান৷ সে'টাও মুখ্যমন্ত্রী নিজে আমার হাতে তুলে দিলেন। ভাবলেই এখনও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।

- মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন আপনার নোবেল পাওয়া উচিৎ। আফটার অল, একটা গোটা রাজ্যের ভাগ্যপরিবর্তন ঘটেছে আপনার এই আবিষ্কারের হাত ধরে।

- আজ্ঞে..ইচ্ছেটা আমার মনেও যে ছিল না তা নয়। সুইটেবল ক্যাটেগরির অভাবে অ্যাপ্লিকেশনটা ফাইল করা গেলনা। যাকগে, বাংলার মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি৷ সে'টাই অনেক।

- শুনেছি গত সাতমাস ধরে ট্রায়াল চালিয়েছেন?

- প্যান্ডেমিকের বাজারে পাবলিক হেলথ নিয়ে তো আর ছেলেখেলা চলেনা। এই আবিষ্কার নিয়ে সাতটি স্তরে হিউম্যান ট্রায়্যাল চালিয়েছি। হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাকসেস রেট। একশোয় একশো।

- কবীরয়ানি নামটার পিছনে কোনও ইন্সপিরেশন? 

- ‘‘মায়ায় অন্ধ বসুন্ধরায় কেউ চেনেনা আমাকে। বাতাসও নই মাটিও নই, আমি শুধুই জ্ঞান। সবার ঊর্ধ্বে আমি শুধুই সুবাসের এক ফেরিওয়ালা’’। শুনেছেন তো?

- কবীরের দোঁহে?

- রাইট। তবে সামান্য ট্যুইস্ট করে চালাই৷ কবীর বলেছিলেন 'আমি শুধুই শব্দের এক ফেরিওয়ালা'। আমি বলি 'আমি শুধুই সুবাসের এক ফেরিওয়ালা'। কখন কোন ম্যাজিকে কাজ হয় তা কে বলতে পারে। কবীরে শব্দে কেল্লা ফতে করেছিলেন। আমি ফোকাস করেছি সুবাসে।

- আর সেই সুবাসে সমস্ত বাঙালি নিজের অসাবধানতা ঝেড়ে ফেলে জেগে উঠল। বাজার করে নিকেশ হয়ে যাবে; এই বিশ্রী বদনাম উড়িয়ে দিয়ে এখন বাঙালি গোটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য সচেতন। পরিসংখ্যানও তাই বলছে, করোনার দাপট বেশ কমে এসেছে আপনার আবিষ্কৃত বিরিয়ানি ফ্লেভারের হ্যান্ডস্যানিটাইজার বাজারে আসার পর।

- কবীরিয়ানি তো শুধু সুগন্ধ নয়৷ এক্কেবারে আদত ফ্লেভার৷ কবীরিয়ানিতে হাত কচলে মুলোশাক মাখা ভাত খেলেও যে কারুর মগজ আচ্ছন্ন থাকবে খাঁটি কলকাতা বিরিয়ানি মার্কা ভালোবাসায়। আর সেখানেই মানুষ কনভিন্সড হয়েছেন, বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন কবীরিয়ানিকে। রোজ রোজ গলায় মাস্ক ঝুলিয়ে, ঠেলাঠেলি করে ভালোমন্দ বাজার করার হ্যাপা নেই। টোটাল নিশ্চিন্দি। আমার এই হ্যান্ডস্যানিটাইজার হাত ডলে ভাতেভাত খেতে বসেও সবাই 'বহুত খুব, নাজুক' বলে টেবিল চাপড়াচ্ছেন। বাজারের ভীড় কমে যাওয়ার গোটা রাজ্যে এখন প্রবল ডিসিপ্লিন, তাই না?

- একদম। তাছাড়া, থ্যাঙ্কস টু ইওর আবিষ্কার, কারণে অকারণে অফিসে, রাস্তায়, বাড়ির সোফায়;  সবাই এখন মাঝেমধ্যেই কবীরিয়ানি বের করে হাত কয়েক ফোঁটা ঢেলে নিচ্ছে। এ'টাই মনভালো করার সবচেয়ে সহজ ফর্মুলা। অনেকে বলছেন যে মনে ফুরফুর আনতে আপনার এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার নাকি সিঙ্গল মল্টের চেয়েও বেশি এফেক্টিভ।

- হেহ্। হেহ্।

- ইফ আই মে আস্ক, শুনেছি প্রধানমন্ত্রী নিজেও নাকি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন৷ 

- নিজের মুখে আর কী বলব বলুন। আমি পাতি মানুষ, সবার ভালোবাসায় এক্কেবারে ভেসে যাওয়ার উপক্রম। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন৷ নিরামিষ খাইয়েদের জন্য একটা নতুন স্যানিটাইজারের কথা ভেবেছি; ধোকলাইজার। অবিশ্যি সে'টার হিউম্যান ট্রায়াল শুরু হতে এখনও দেরী আছে। তবে করোনায় কাবু এই অন্ধকার সময়ে; গোটা দেশে যদি ডিসিপ্লিন, স্বাস্থ্য সচেতনতা আর পরিতৃপ্তির একটা ঢেউ ছড়িয়ে দেওয়া যায়, ক্ষতি কী বলুন?

Saturday, July 25, 2020

বিপ্লবের ঘুম


- ডাক্তার।

- হুম...।

- ডাক্তার!

- হুঁ।

- ডাক্তার চৌধুরী! ব্যাপারটা কী?

- ওহ। সরি বিপ্লববাবু। সরি। একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম।

- চুপ করে রয়েছেন অনেকক্ষণ।  তাই ভাবলাম...দেখুন...আপনি আমার কাউন্সেলর..আপনিও যদি চুপ থাকেন..।

- আসলে...কী বলব সে'টা ঠিক..। আপনার কথাগুলোই প্রসেস করার চেষ্টা করছিলাম..।

- ওহ। আই সী৷ 

- আপনার ধারণা...।

- ধারণা?  রিয়ালিটি৷ অবিশ্যি, অনেকগুলো রিয়ালিটির একটা। 

- লেট মী সামারাইজ। আপনার ধারণা প্রতিবার ঘুম থেকে ওঠার পর আমাদের একটা নতুন জীবন শুরু হয়।

- দ্যাট ইজ করেক্ট।

- অর্থাৎ আমি আজ রাত্রে ঘুমোতে গেলাম ডাক্তার রীতা সান্যাল হিসেবে। আমার ধারণা আমি আগামীকাল সকালবেলা আমার সাদার্ন এভিনিউয়ের ফ্ল্যাটে; ঘুম থেকে উঠে, ব্রেকফাস্ট সেরে চেম্বারে এসে বসব, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে টেনিস খেলতে যাব। কিন্তু আদতে কাল সকালে আমার ঘুম ভাঙবে সম্পূর্ণ অন্য একটা জগতে।  যে'খানে বয়স, শরীর, চেহারা সব এক থাকলেও আমার পরিচয়, মন ও চারপাশটা একদম আলাদা। আগামীকাল হয়ত আমাত ঘুম ভাঙবে বাঁকুড়ার সুতপা দত্ত হিসেবে,  হাইস্কুল টীচার। আর আমার আগের দিনের ডাক্তার রীতা সান্যালের স্মৃতি সমস্ত ধুয়েমুছে সাফ। বরং ঘুম ভাঙার পর আমার মাথার মধ্যে গোটা জীবন সুতপা দত্ত হয়ে থাকার স্মৃতি মজুত থাকবে। 

- একদম। তবে শুধু বাঁকুড়ার সুতপা দত্ত কেন, আফ্রিকার কোনও এক দেশেও আপনার ঘুম ভাঙতে পারে। এমন দেশও হতে পারে যে'টার অস্তিত্ব আপনার এই কলকাতার চেম্বারওলা জগতে নেই। সে'টাই প্রসেস।

- প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন প্রতিবার ঘুম থেকে ওঠার পর এই মেটামরফোসিসের মধ্যে দিয়ে যায় কিন্তু কেউই সে'টা টের পায় না।

- ইনফাইনাইট নাম্বার অফ প্যারালাল ওয়ার্ল্ডস। ঘুম ভেঙে কখন কোন দুনিয়ায় কী রোলে অবতীর্ণ হতে হবে, কেউ ঠাহর করতে পারেনা। করতে পারার কথাও নয়। সবারই ঘুম ভাঙে একটা কন্টিনিউয়িটির বোধ নিয়ে। কিন্তু সবই ফাঁপা, প্ল্যান্টেড।

- প্ল্যান্টেড? ঈশ্বর? 

- সফটওয়্যার হলেও হতে পারে৷ আমি তো বিশারদ নই ডাক্তার। শুধুই একটা বাগ ইন দ্য সিস্টেম। ভুক্তভুগী।

- বাগ, কারণ আপনার ক্ষেত্রর ঘুমের পরেও আগের স্মৃতিগুলো মুছে যাচ্ছে না। 

- গতকাল আমার নাম ছিল আবিদকেহ, ধেজসিসব বলে একটা শহরে উটের মাংসের ব্যবসা করতাম। প্রায় র‍্যাগস টু রিচেস স্টোরি। বশেকুয়াক ভাষায় কথা বলতাম। এই শহর আর ভাষা কোথায় আছে জানতে চেয়ে লজ্জা দেবেন না। তার আগের ঘুমের আগে আমার নাম ছিল হান্স। মগজে ছিল অন্য একটা জীবনের গল্প। মাস দেড়েক আগে একবার কলকাতার বাঙালি হয়ে একটা দিন কাটিয়েছিলাম বটে। নাম ছিল রজত মল্লিক।

- ঘুম ভাঙার পর আগের জীবনের স্মৃতি মুছে গিয়ে মাথায় নতুন একটা জীবনের স্মৃতি এমনভাবে প্ল্যান্ট হওয়ার কথা যাতে আড়মোড়া ভাঙা মানুষটির মনে হয় যে এই নতুন জীবনেই সে আজন্ম রয়েছে৷ রাইট? কিন্তু যেহেতু আপনি সিস্টেমের বাগ, সেহেতু আপনার মনের মধ্যে...।

- কয়েক হাজার জীবনের স্মৃতি স্পষ্ট হয়ে আছে। জাতিস্মরদের কথা ভাবুন ডাক্তার৷ গতজন্মের কথা মনে পড়াটা কিন্তু আদৌ কোনও সুপারপাওয়ার নয়, সে'টা বরং একটা অপরিসীম যন্ত্রণা। থিওরেটিকাল লেভেলে সোনার কেল্লার মুকুলের কথাই ভাবুন না। এ জন্মে নিজের বাবা মায়ের সঙ্গে কনেক্ট করতে ওর অসুবিধে হচ্ছিল কেন? কারণ পূর্বজন্মের বাপ, মা, ছেলেবেলার স্মৃতি এসে এই জন্মের রিয়ালিটিকে গুলিয়ে দিয়েছিল৷

- রাইট। আপনার ব্যাপারটাও অনেকটা ওই জাতিস্মরের মতই..।

- তফাৎ একটা আছে। প্রতিবার ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে একটা গোটা জীবনের স্মৃতি আমার মনের মধ্যে জুড়ে যায়৷ সে এক নিদারুণ যন্ত্রণা ডাক্তার। কয়েক হাজার বাপ মায়ের স্নেহ, কত প্রেম, কত বন্ধুত্ব, কত জীবনসঙ্গী৷ কত অন্যায়ের স্মৃতি। কত অপরাধবোধ।  

- বিপ্লববাবু, আমি হয়ত বুঝতে পারছি আপনার যন্ত্রণাটা কতটা গভীর।

- সে জন্যেই তো আপনার কাছে আসা ডাক্তার৷ ঘুম পেলেই ভয়ে বুক কাঁপে। কোনও জীবন ভালো লাগলে দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে থাকার চেষ্টা করি, কিন্তু একটা সময় তো চোখের পাতা লেগে আসবেই। তাই না?

- সে জন্যেই আমার কাছে আসা? ঘুমোতে যাওয়া নিয়ে ডিলেমা? 

- খুলেই বলি৷ এ জীবনের মেয়াদ কয়েক ঘণ্টার বেশি তো নয়, ভণিতার আর অবকাশ কই। আর ডাক্তারের বদলে না হয় রীতাই বলি। দেখো রীতা, বেশিরভাগ জীবনেই আমার পাশে তুমি থাকো। আর যে জীবনগুলোয় তুমি থাকোনা, তোমার খুঁজে বের করার আপ্রাণ চেষ্টা করি। ঘুম ভাঙতেই দেখি পাশে তুমি আছ কিনা। মাঝেমধ্যে অন্য কাউকে দেখি,  তখন কুঁকড়ে যাই, সুযোগ খুঁজি ফের ঘুমিয়ে অন্য জীবনে পৌঁছে যাওয়ার। 

- এ'বার ব্যাপারটা বাড়াবাড়ির পর্যায় চলে যাচ্ছে বিপ্লববাবু। 

- প্রায়ই তুমি আমারই পাশে লেপ্টে থাকো। অথবা পাশের ঘর থেকে তোমার গুনগুন শুনতে পাই, বুঝি আমার হয়েই আছ। আর ঘুম ভেঙে তোমায় আশেপাশে না পেলে? তোমায় খুঁজতে বেরোই। কত জীবন প্রাণপণে খুঁজেও তোমার দেখা পাইনি।  কতবার এমনও হয়েছে তোমায় অন্য কারুর হয়ে থাকতে দেখেছি। চুরমার হই বটে কিন্তু জানি, বেশিদিন তোমার থেকে দূরে থাকতে হবে না। কয়েক ঘুম দূরেই তুমি আছ। আমি ছাড়া তোমারও কোনও গতি নেই। কোনও নতুন দেশে তোমায় জড়িয়ে ধরে ঘুম ভাঙবে, এ ভরসাটুকু তো থাকেই। 

- দেখুন বিপ্লববাবু। আপনি একটা আস্ত ফ্রড! আর রীতিমতো অসভ্য একজন মানুষ।

- এ জীবনে তুমি আমায় আগে দেখোনি। অথচ তোমার পিঠের ওই তিলের ত্রিভুজটার কথা আমি জানলাম কী করে?

- বেরিয়ে যান। এখুনি।

- প্লীজ রীতা। এ'বারে সাতসাতটা ঘুম পেরিয়ে তোমার দেখা পেয়েছি। তাও নিজের করে নয়। অমন ভাবে দূরে ঠেলে দিও না। 

- গেট আউট।

- আমাদের কত নাম রীতা। কত বাড়ি, কত জড়িয়ে ধরা মুহূর্ত।  কত রঙিন পৃথিবী আমরা ভাগ করে নিয়েছি।  এই পৃথিবীর একটা গান...আমাদের জন্য যে কী প্রবল ভাবে সত্যি। 'যতবার তুমি জননী হয়েছ ততবার আমি পিতা'।

- বিপ্লববাবু, আপনি এখনই আমার চেম্বার থেকে বিদেয় না হলে আমি সিকিউরিটি ডেকে আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দিতে বাধ্য হব।


***

- কী গো! ওঠো!

- উম!

- আরে আর কত ঘুমোবে। 

- পাশে এসো একটু।

- ন্যাকাপনা।  শনিবার তোমার অফিস ছুটি, আমার নয়। ওঠো এ'বার। 

- মিতুল, পাশে এসো না। প্লীজ।

- ধুস। এমন ভাব দেখাও মাঝেমধ্যে যেন সাতজন্ম পর দেখছ। গা জ্বলে যায়।

- তা প্রায় সাত জন্মই হবে। ইনফ্যাক্ট, গত জন্মে তুমি বড় নির্মম ভাবে আমায় ঘাড় ধাক্কা দিয়েছ।

- কী যে আজেবাজে সব গপ্প ফাঁদো তুমি মাঝেমধ্যে। ধেত্তেরি। 

- তুমি টেনিস খেলবে মিতুল?

- জীবনে র‍্যাকেট ধরিনি। আমার ওই লুডোই ভালো। 

- পিঠে তিলের ত্রিভুজ থাকলে টেনিসে গ্র‍্যান্ডস্ল্যাম লাভ হয়। লেগে পড়ো।

- তুমি একটা আস্ত পাগল। ঠিক আছে, ঘুমোও আরও।

- নাহ্, ভাবছি দিন তিনেক না ঘুমিয়ে থাকব। তোমায় জাপটে।

প্যান্ডেমিকের পুজোর প্ল্যান


- কী ব্যাপার ছোটকা? ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে মেডিটেট করছ নাকি?

- জুলাই মাস শেষ হতে চলল রে নিতাই।

- তা'তে কী?

- বছর এই সময়টা..।

- এই সময়টায় কী?

- এই সময় আমার বসকে তেল দেওয়ার কথা। বস নাচতে বললে ধেইধেই করব, বাজে চুটকি বললে হেসে গড়াগড়ি খাব, বসের ক্যাটক্যাটে রঙের বিশ্রী শার্ট দেখে বলব 'লুকিং অসাম'।

- বসকে তেল? ও মা, তুমি নাকি কেরিয়ারের জুজুকে পাত্তাটাত্তা দাও না৷ তা'হলে আবার আপিসিও তৈলমর্দন কেন?

- কেরিয়ার? প্রমোশনটমোশনের তোয়াক্কা? তা আমি সত্যিই করিনা। একার সংসার। ইএমআইয়ের ফাঁদে পা দিই না।  বসের তোয়াক্কা আমি করবই বা কেন? তবে...।

- তবে?

-  তবে পুজোর ছুটি আদায় করার জন্য আমি  মা কালীর পায়ে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো ঠেকিয়ে নিতেও হেসিটেট করব না। বসকে তেল তো কুছ ভি নহি।

- ও। তা, তুমি বুঝি জুলাই মাস থেকে বসকে তেল দেওয়া শুরু কর? পুজোর ছুটি আদায়ের জন্য?

- শুরু করি জুন থেকে। মালিশ করে করে তাঁর ঘেউঘেউ মেজাজ নরম করে মিউমিউতে আনতে মাসখানেক লাগে। আর তারপর শুরু হয় রিয়েল স্ট্রাগল। 

- লেট মি গেস। আইআরসিটিসির ওয়েটিং লিস্ট?

- পেরেকের মাথায় ঘা দিয়েছিস। এই সময়টায় শিলিগুড়িমুখো সমস্ত ট্রেন ওয়েটলিস্টে থাকার কথা। মেজদা রেলের বড় অফিসার, ওর কাছে দু'দিন রাবড়ি নিয়ে যেতে হবে। যদি একটু বলেকয়ে কনফার্ম করাতে পারে। ওর আবার বড় বেফালতু আইডিয়ালিজমের বাতিক। মেজদার রাবড়ি ফেল করলে লাটুগুণ্ডার কাছে রামের বোতল নিয়ে যাওয়া। 

- লাটু? বোমা বাঁধতে গিয়ে যার..?

- লাটুর নিজের ডানহাতটা নেই বটে। তবে ও পাড়ার এমএলএ'র রাইট হ্যান্ড। লাটু চাইলে হিল্লে একটা হয়েই যায়। জুলাইয়ের মধ্যে টিকিটের ব্যাপারটা ফাইনাল হলেই মন ফুর্তিতে ডগমগ। তখন জমে অন্য খেল, দ্য গ্রেটেস্ট পুজো কনানড্রাম। 

- পাহাড় না জঙ্গল...তাই তো?

- ইউ আর আ ব্রাইট চ্যাপ নিতাই। এই জন্যেই যখনই আমি পাঁঠা কষাই; তোকে ডাকি৷ 

- পাহাড় আর জঙ্গলের হিসেবটা কী'ভাবে ম্যানেজ করো?

- নট ইজি। নিজের মনের মধ্যে ডুবসাঁতার দিতে হয়। নিজের মেজাজকে অ্যানালাইজ করতে হয়, বুকের ধুকপুককে ডিকোড করতে হয়। কখনও নিজেকে দাদার কীর্তির কেদারের সঙ্গে আইডেন্টিফাই করি; ওই যে, 'স্বপ্নের নেচারটা ফোকাস'। তখন বুঝি যে এ'বারে পাহাড়ের ভাবগম্ভীর স্নেহ ছাড়া গতি নেই। আবার কোনও বছর নিজের মনের গভীরে পৌঁছে টের পাই যে আমি ওই সাহেব সিনেমার গোলকিপারের মত অস্থির হয়ে আছি; এ'বার জঙ্গলের মায়ায় নিজেকে বেঁধে না ফেললেই নয়। এই গোটা প্রসেসটা যেমন পোয়েটিক, তেমনই মিউজিকাল। 

- আর এ'বারে সেই কবিতা আর সঙ্গীত দু'টোই গেল জলে।

- রাস্কেল করোনা। নিনকমপুপ। হাড় জ্বালিয়ে ছাড়লে। কবিতা ডকে আর সঙ্গীত গোল্লায়৷ জুলাই শেষ হতে চলল অথচ পুজোয় ছুটি বাগানোর কোনও গা নেই। বসের গাম্বাট ঠাট্টাগুলো শুনলেই গা চিড়বিড়িয়ে উঠছে। ব্রাউজারে আইআরসিটিসি টাইপ করলেই কান্না পাচ্ছে৷ মেজদা রাবড়ির আব্দার করে ফোন করেছিল, ওর শুগার তুলে খোঁটা দিয়ে ফোন কেটে দিয়েছি৷ লাটুকে দেখলেই ইচ্ছে করছে কান মলে দিতে। 

- খুবই চিন্তার ব্যাপার ছোটকা।

- ক্যাটাক্লিজমিক কেস। জুলাই শেষ হতে চলল। কোথায় এখন স্টলে গিয়ে পুজোবার্ষিকী আনন্দমেলার খোঁজ করব! তা না! পুজোয় কী ব্র‍্যান্ডের অক্সিমিটার কিনব সেই ভেবে হদ্দ হচ্ছি। 

- মনখারাপ? খুব? ছোটকা?

- বুঝলি নিতাই, পড়াশোনায় চিরকাল মিডিওকার ছিলাম। প্রেম ব্যাপারটাও ঠিকঠাক এক্সেকিউট করতে পারলাম না। এখন কলম পেষাই করে মাসমাইনে আদায় করি৷ এক্সট্রা কারিকুলার বলতে লবডঙ্কা।  জীবনে একটাই পয়েন্ট অফ এক্সেলেন্স ছিল; পুজোর ছুটির প্ল্যানিং। এই করোনার খপ্পরে পড়েও সে'টা গেল কেঁচে। গুরুদক্ষিণা সিনেমায় সুগায়ক ভালোমানুষটি যখন গাইতে চেয়েও গাইতে পারছেন না; সে না পারার যন্ত্রণাটা যে কী অপরিসীম তা আজ আমি ঠাহর করতে পারছি৷

Thursday, July 23, 2020

প্যান্ডেমিক


- ধুর শালা প্যান্ডেমিক! উফ!

- যা বলেছ ভায়া। প্রাণ ওষ্ঠাগত এক্কেবারে।

- কী খতরনাক ভাইরাসের পাল্লায় যে পড়লাম..।

- এক্কেবারে হুলুস্থুল অবস্থা। তাই না?

- গোড়ার দিকে কিছুতেই ঠাহর করতে পারিনি যে জল এদ্দূর গড়াবে।

- গভর্নমেন্টই ঘোল খেয়ে গেল হে। আমরা তো টোটাল আতিপাতি আর আলটিমেট এলেবেলে। 

- গভর্নমেন্টকে দোষই বা দিই কী করে বলো। এমন ক্যালামিটি এই সেঞ্চুরিতে আগে কেউ কি দেখেছে? বিলেত আমেরিকা টলে গেল, আমরা কোথাকার কোন হরিদাস পাল। তা ভায়া, ভ্যাক্সিনের খবর কিছু শুনেছ? আশার আলো আছে কিছু?

- কানাঘুষো যা শুনছি..তা খুব একটা কনফিডেন্স ইন্সপায়্যারিং নয়৷ অন্তত বছর দুয়েকের আগে তো তেমন কোনও আশা দেখছি না...।

- দু'বছর? দু'বছর ফেসমাস্ক না পরে থাকতে হবে?

- যে দেবতা যাতে তুষ্ট। মাস্ক পরলেই এই ভাইরাস এসে ক্যাঁক করে ধরবে। এমন খতরনাক ব্যাপার যে হতে পারে তা কেউ কোনওদিন ভাবতে পেরেছিল?

- সত্যিই, একটানা মাস্ক না পরে থাকা, সে যে কী অস্বস্তিকর।  মনে হয় যেন উলঙ্গ হয়ে ঘোরাঘুরি করছি৷ রাত্রে তো ঘুমই আসতে চায়না। মাঝেমধ্যে পাশবালিশ দিয়ে মুখ নাক ঢাকি বটে কিন্তু দুধের স্বাদ কি ঘোল চেটে মেটানো যায় বলো।

- গিন্নীকে দু'টো কাঞ্জিভরমের মাস্ক দিয়েছিলাম, জলে গেল। তবে শুধু তো সে'টুকুই নয়৷ মাস্ক ইন্ডাস্ট্রি যে পথে বসেছে। ইকোনমি গেঁজে যেতে বসেছে৷ চারদিকে হাহাকার। এ যে কী দুর্যোগ! 

- সত্যিই৷ রোজ সকালে উঠে মনে হয় যেন কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছি। এই দেখ, চারপাশের সবকিছু রিয়েল কিনা ভেরিফাই করতে গিয়ে নিজের গায়ে এমন রাম-চিমিটি কেটেছি যে কালশিটে পড়ে গেছে।

- আহা রে। 

- আর সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা শুরু হয়েছে এই রোজ রোজ বাজার যাওয়া। ব্যাটাচ্ছেলে প্যান্ডেমিকের পাল্লায় পড়লাম  সমস্ত হোমডেলিভারি বন্ধ। বাপের জন্মে ভাবিনি যে এমন এক থার্ডক্লাস ভাইরাসের পাল্লায় পড়তে হবে যাকে আটকানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে মানুষের গিজগিজে ভীড়ে গিয়ে মেশা। উফ! ডিসগাস্টিং টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি।

- সত্যিই ভাবা যায়না। কী ডেঞ্জারাস ব্যাপার। রাস্তায় বেরোলেই বুক কাঁপছে।  প্রতিবেশী টু হাফ-চেনা পুলিশদাদাটি; যে কেউ গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে  কোলাকুলি করার জন্য। আহ্, ভাবলেই গা শিউরে উঠছে,গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। 

- সত্যিই। এ যন্ত্রণা আর নেওয়া যাচ্ছে না ভাই। তিন মাস ধরে মেগা সাইজের সব প্যান্ডেল দাঁড় করিয়ে পুজো হচ্ছে স্রেফ ভীড় জেনারেট করতে। বিজয়া আদৌ আসবে কিনা, আসলে কবে আসবে; কেউই জানে না।আর আজকাল তো লকডাউন ব্যাপারটাকেই অবাস্তব এক ইতিহাসের মত মনে হয়।

- এই একটানা পুজো হল আর একটা মেনেস! কী গা ঘিনঘিনে ব্যাপার। মোবাইলে পুজো অ্যাপের বোতাম ফিঙ্গারপ্রিন্টে অ্যাক্টিভেট না করে বারোয়ারী প্যান্ডেলে,  হাতে ফুল চটকে, ভীড়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে কম্পালসরি অঞ্জলি দেওয়ার এই যে ন্যাকাপনা; তা কহাতক বরদাস্ত করা যায়? আর তার ওপর গোঁদের ওপর বিষফোঁড়া হয়েছে এই ওয়ার্ক ফ্রম অফিস। 

- তা আর বলো কেন। ভাবতে পারো...ওয়ার্ক ফ্রম অফিসের জ্বালায় উইকডেতেও রাস্তাঘাটে রীতিমতো ট্র‍্যাফিক জ্যাম হচ্ছে? দিনে দিনে আর কত দেখব? 

- নাহ্। মনখারাপ ক্রমশ গভীর হচ্ছে ভায়া। শুধু আমার একার নয়, চারদিকেই এক অবস্থা। দেখো কপালে আর কত কী আছে। কবে শুনব ডিজিটাল বুকক্রিকেট-টুকুও ব্যান করে দেওয়া হবে। শুনেছ তো, নতুন স্টেডিয়াম তৈরি হচ্ছে দেশের প্রতিটি শহরে। 

- স্টে...স্টেডিয়াম? এ কোন মান্ধাতা আমালে আমরা ফিরে যাচ্ছি? শেষে কি আমরা ডার্ক-এজের মত কাঠের ব্যাট আর চামড়ার বল দিয়ে ক্রিকেট খেলা শুরু করব?

- করব। এবং জোর করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে মানুষকে স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হবে সে'খেলা দেখার জন্য। আর সে'খানেই শেষ নয়। তোমার পেয়ারের নেটফ্লিক্সও জলে গেল বলে। নেটফ্লিক্সের জন্য মানুষ বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে না, তাই রাস্তায় ভীড় তৈরি হচ্ছে না আর তার ফলে বেড়ে চলেছে ভাইরাসের অত্যাচার।

- নাহ্। এ অসহ্য৷ আর কয়েকমাসের মধ্যে বাজারে ভ্যাক্সিন না এলে...।

- না এলে?

- রিভোল্ট করব! সরকারি নির্দেশ অমান্য করব। অন্তত একটা টোকেন প্রটেস্ট করবই।

- প্রতীকী প্রতিবাদ? কী'রকম?

- হপ্তায় তিনদিন বাধ্যতামূলক ফুচকা খাওয়া? ভীড়ে দাঁড়িয়ে? লাইন দিয়ে? মানছি না! মানব না! আর দু'মাস অন্তর পুরী বা দার্জিলিং গিয়ে লাফালাফি? নেভার।  কভি নহি!

হেবো গুণ্ডার হবু স্যাঙাৎ

- নাম?

- আজ্ঞে, অনিন্দ্য।

- ঝাঁজ নেই।

- আজ্ঞে?

- নামে ঝাঁজ নেই। অমন নেতানো নাম নিয়ে বড় জোর বেনামি জমির দালালি করা যেতে পারে,গুণ্ডামি নয়। হেবোগুণ্ডার স্যাঙাৎ হতে হলে নামে ধার চাই হে।

- অমন বলবেন না হেবোদাদা। অমন বলবেন না। বড় আশা করে এসেছি আপনার কাছে। গুগল দেখে বোমা বানানো শিখেছি, একলব্য হয়ে ঘরে বসে নিজের খাটের তোষকে ছুরি ঢোকানো প্র‍্যাক্টিস করেছি৷ সবই শুধু আপনার কথা ভেবে। বড় সাধ, একদিন আপনার চরণে নিজেকে সঁপে দেব। বড় সাধ। 

- সে কত লোকের কত রকমের সাধ হয়। কেউ চায় ওবামার সঙ্গে বসে লুডো খেলতে, কেউ চায় মুকেশ আম্বানির ক্যাশিয়ার হতে। চাইতে তো ক্ষতি নেই চাঁদ৷ কিন্তু রামকৃষ্ণ না অনুপম কে একটা বলে গেছে; সব পেলে নষ্ট জীবন।

- একবার যখন আপনার দেখা পেয়েছি হেবোদাদা , ওই শ্রীচরণের আশ্রয় ছেড়ে আমি আর নড়ছি না।

- আইআইটির ক্যাম্পাসে ঘুরতে গেলেই কি আইআইটির একজন হওয়া যায় রে পাগলা? সবুজ ঘাসে গড়াগড়ি খেলেই কি জন্টি রোডস হওয়া যায়? যায় না। আমার আশ্রয়ও ঠিক তেমনই৷ কত খতরনাক খুনী মাস্তান আমার পিছন পিছন ঘুরঘুর করছে। এই তো সে'দিন এক সিরিয়াল কিলার এসে হত্যে দিয়ে পড়ল। কিন্তু..।

- কিন্তু?

- ঘুরঘুর করলেই হল নাকি? আমার স্যাঙাৎ হতে চাইলে থাকতে হবে হাইভোল্টেজ কিলার ইন্সটিঙ্কট৷ মামুলি দশ বিশটা খুন করলেই হল না, ঘ্যাম থাকতে হবে৷ 

- ও নিয়ে ভাববেন না। এ তুলোতুলো নাম পাল্টে ফেলে জংধরা পেরেক মার্কা কিছু একটা রাখব'খন। ফাটাবাঁশ বা আসমানিবেল্লিক গোছের কিছু চলবে?

- বেশ। নামের ব্যাপারটা না হয় কিছু একটা ভেবে দেখা যাবে। কিন্তু শোন, স্যাঙাৎ গভীরভাবে নৃশংস না হলে আমার   চলবে না যে।

- আমি প্রচণ্ড নৃশংস তো। প্রচণ্ড।

- প্রচণ্ড?

- মাইরি হেবোদাদা। মাইরি।

- নৃশংসতায় আমার মন গলানো সহজ নয়৷ ওই যে বললাম, খুনোখুনি ভাংচুর করলেই হবে না৷ 

- আমি যে কী চিজ..।

- শুনি...।

- আমি বিরিয়ানিতে কড়াইশুঁটি আর শসাকুচি ফেলে খাই।

- ইইইইকী...।

- আমি গল্পের বইয়ের পাতায় মাসকাবারির ফর্দ লিখি। তাও স্কেচপেন দিয়ে। 

- না না..না..না। না!

- আমি কেসি দাসের রসগোল্লা চেবানো তৃপ্ত মানুষের কানে ফিসফিস করে কেসিনাগের খটরমটর অঙ্ক আবৃত্তি করে শোনাতে পারি। 

- কেমন একটু অস্বস্তি হচ্ছে এ'বার।

- আমি প্রিয় ব্যটসম্যানের উইকেটের তোয়াক্কা না করে পয়া বসবার জায়গা পাল্টে ফেলতে পারি।

- থাম, থাম, থাম।

-  বাইশটা লম্বা ওগো-হ্যাঁগো চিঠির উত্তরে একটা কাঠকাঠ পোস্টকার্ড পাঠিয়ে দায়িত্ব সেরে নিতে পারি।

-  এদ্দিন কোথায় ছিলি বাবু। বুকে আয় ভাই, বুকে আয়।